সর্বাম্বা কাণ্ড (কৃতান্ত প্রথম কাণ্ড)

একদিকে যেমন মানস ও তাঁর সমস্ত প্রজা আশায় বুক বেঁধেছিলেন, আত্ম ও তাঁর পরিবার ভয়ার্ত হয়ে তন্য তন্য করে গুপ্তদ্বারের সন্ধান করে চলেছিলেন, তখন গুপ্তদ্বারের অন্তরে, এক নবহিল্লোল জাগরিত হয়েছিল, মিলনের হিল্লোল। বিচার সর্বদাই শিখাতে, বেগবতী সর্বদা বিবেকে আবিষ্ট থাকতো। আর মেধা! … মেধা বৈরাগ্যের প্রতি অতীব তীব্র ভাবে আকৃষ্ট থাকলেও, দায়িত্ব সামলানো যেন তাঁর কাছে একটা নেশা। তাঁর মাতাতুল্য ভগিনীদের সামলানোর চিন্তা যেমন তাঁর সর্বক্ষণ লেগে থাকতো, তেমনই তাঁর দুই ভ্রাতা, বিচার ও বিবেকের জীবনকে সহজ করে তোলার কর্মে তিনি সর্বদা নিয়জিত থাকতেন।

বৈরাগ্যের দেবী মেধার এই ভাবই সর্বোত্তম প্রিয়। মেধা নিজের দিকে তাকায়ই না, সর্বদা সকলের সেবার জন্য নিজেকে নিয়জিত রাখে, এতেই তাঁর আনন্দ, এতেই তাঁর জীবনের অর্থ খুঁজে পায় সে। তাই বৈরাগ্যকে প্রায়শই মেধার কাছে এসে, তাঁর অঙ্গচুম্বন করে, তাঁকে মোহিত করে করেই, মেধাকে বাধ্য করতে হয়, নিজের জন্য সামান্য চিন্তা করাতে।

সেই নিয়ে মেধার অভিযোগও আছে। তিনি প্রথমদিকে বৈরাগ্যের সাথে সংলাপে নিযুক্ত হতে ভয়ই পেতেন। আসলে বৈরাগ্যের স্বভাব একটু গুরুগম্ভীর। তাইই হয়তো সংলাপে যুক্ত হতেন না মেধা, তবে বৈরাগ্যের প্রতি, বৈরাগ্যের অদ্ভুত জীবন দর্শনের প্রতি মেধার অতীব সম্মান। বৈরাগ্যের অদ্ভুত ভাব। এই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড আত্মের নির্মিত হলেও, মাতার ইচ্ছা বিনা একটি পত্রিকাও নড়তে পারেনা, কারণ মাতাই হলেন সমস্ত কিছুর চেতনা।

স্বয়ং চেতনা হলেন মাতা, তিনি হলেন পরাচেতনা। তাই নিজের অন্তরে যে যতই আবেগদের নিয়ে উলমালা থাকুক না কেন, যেই শক্তিধারণ করে কনো কথার উচ্চারণ করে কেউ, তা স্বয়ং মাতার অধীনে স্থিত। তাই মাতার অনুমতি বিনা কেউ একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারেন না। যে যত খুশী ইচ্ছা চিন্তা ও কল্পনার কাছে বশীভূত হোকনা কেন, কেউ একটি ভাবও প্রদর্শন করতে পারেন না, মাতার অনুমতি বিনা।

তাই সম্মুখে যা কিছু উপস্থিত হচ্ছে, তা সমস্তই মাতার নির্দেশ। যা ভোগ করার আবাহন আসছে তাও, যা ত্যাগ করার আবাহন আসছে তাও; যা সম্মান আসছে তাও, আর যা অপমান আছে তাও। তাই বৈরাগ্য কনো আশা রাখেনা, কনো কামনা রাখেনা। সমস্ত ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার থেকে সম্পূর্ণ ভাবে মুক্ত। এক ও একমাত্র মাতার কাছেই তিনি বদ্ধ, আর মাতা কি করতে বলছেন, তা তিনি প্রকৃতি ও সময়ের থেকে অনুক্ষণ অনুধাবন করেন আর পালন করে চলেন।

বৈরাগ্যের এই বিশেষত্বই তাঁর মহাবল আর সেই বলের কাছে সকলেই প্রায় পরাজিত। তাই বিচার ও বিবেক বৈরাগ্যকে নিজেদের পিতাসমান জ্যেষ্ঠভ্রাতা জ্ঞান করে, কিন্তু মেধা বৈরাগ্যের এই ভাবের কারণে অত্যন্ত তৃপ্ত, অত্যন্ত আনন্দিত, এবং এই অসম্ভব বিশ্বাসের দ্বারে তিনি স্থিত হয়ে, মাতার প্রতি নূতন ধারার, শ্রেষ্ঠ রসে পরিপূর্ণ বিশ্বাসের শিক্ষা গ্রহণ করতে সদাতৎপর।

তাই বৈরাগ্য মেধার কাছে গুরু সমান, আর হতে পারে, সেই কারণেই মেধা একটিও কথা বলেন না বৈরাগ্যের সাথে, কেবলই বৈরাগ্যের থেকে নির্দেশ গ্রহণ করে তা পালন করতে তৎপর থাকেন। তাও একদিন মিলনপর্বের পর, সাহস করে মেধা বললেন, “একটি কথা বলবো নাথ!”

বৈরাগ্য হেসে বললেন, “যাক আমার প্রাণপ্রিয়া এবার আমার সাথে কথা বলতে রাজি হয়েছে!”

মেধা লজ্জিত হয়ে বললেন, “না না নাথ, এমন নয়। আপনার কথা শ্রবণ করতে আমি খুবই ভালোবাসি, তন্ময় হয়ে আপনার ভাষ্য শ্রবণ করি আমি। … আপনার সাথে মিলনে আমি সর্বদা তৎপরও থাকি, কিন্তু সাহস হয়না আপনাকে কিছু বলার। যদি তা মাতার নির্দেশ না হয়! তাহলে তো আপনাকে অহেতুক বিরক্ত করা হয়, তাই না!”

বৈরাগ্য হেসে বললেন, “এর অর্থ, আমার দর্শন হলেও, প্রকৃত বৈরাগী তুমি, তাই তো! … যখন আমি মিলনের আকুতি নিয়ে তোমার কাছে উপস্থিত হই, তখনই তুমি মিলনের জন্য নিজের অবগুণ্ঠন ত্যাগ করো, অন্যথা সর্বক্ষণ সেই অবগুণ্ঠন ধারণ করে রেখে দাও। কি তাই তো!”

মেধা মৃদু হেসে বললেন, “নাথ, এত বিচার করে তো এই কর্ম করিনা, তবে হ্যাঁ, সত্যই বললেন আপনি। যতক্ষণ না আপনি আমার কাছে মিলনের আবদার নিয়ে না আসেন, ততক্ষণ মিলন আমার কাছে মিলন নয়, সঙ্গম মাত্র, আর সঙ্গম যে বিলাসিতা ব্যতীত কিছুই নয়, ইচ্ছা চিন্তা ও কল্পনার বিস্তার ব্যতীত কিছুই নয়, তাই না নাথ!”

বৈরাগ্য হেসে বললেন, “যখন এমন বললেই তুমি, তাহলে একটি কথা বলি তোমাকে। মেধা তুমি এতটাই পবিত্র যে, তোমার প্রতি সঙ্গম চিন্তা আসলে, নিজেকেই ঘৃণা হয়। মনে হয় যেন, তোমার পবিত্রতাকে নষ্ট করে দেবার চিন্তা আসছে আমার মধ্যে। তাই নিজেকে আমি বিরত রাখি তোমার নিকট থেকে সেই কালে।

কিন্তু যখন তোমাকে দিবারাত্র আমার ভ্রাতা, তোমার ভগিনীদের, এবং এই স্থানের সেবা করতে দেখি, আর তা যখন মাতার সেবা করার মানসিকতা ধারণ করেই করো, এমন দেখি, তখন একসময়ে আমার সমস্ত বাঁধ ভেঙে যায়। মধুমক্ষিকার ন্যায় এই দিব্যপুষ্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যাই তখন। বুঝতে পারি, মাতা আমাকে আকৃষ্ট করে নিয়ে যাচ্ছে তোমার কাছে। তাই তোমার কাছে এসে উপস্থিত হই।

আর তারপর, আমাকে দেখা মাত্রই তোমার মধ্যে যেই স্বেদ আর তার সাথে সাথে তোমার স্বেদের সুগন্ধের বিস্তার হয়, তা আমাকে মোহিত করে দেয়, আর আমি তোমার কাছে মিলনে আবদ্ধ হই। তোমাকে আলিঙ্গন করা মাত্রই, তুমি এমন ভাবে নিজেকে সমর্পণ করে দাও আমার কাছে, আমি আর নিজেকে সামলাতে পারিনা, আর তোমার কাছে আমিও তাই সমর্পিত হয়ে যাই। …

মেধা, আমি এই সম্পর্ককে সম্মান প্রদান করতে চাই। আমি তোমাকে বিবাহ করতে চাই। যখন যখন তোমার সাথে মিলন অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়, নিজেকে ঘৃণা হয়। মনে হয় যেন, তুমি আমার প্রতি পূর্ণ ভাবে সমর্পিত, আর আমি সেই সমর্পণের মর্যাদা না দিয়ে, তাকে ভক্ষণ করছি। অপরাধী মনে হয় নিজেকে দেবী। মনে হয় যেন, আমি তোমার পবিত্রতার বিনাশ করছি। দেবী, অনুমতি প্রদান করো আমাকে। আমি তোমাকে বিবাহ করতে চাই।

স্ত্রী পুরুষের দ্বিতীয় জননী। জননীর ন্যায় তিনিও পতিকে সন্তানের মত করে লালনপালন করেন। আহার প্রদান করেন, স্নানে সাহায্য করেন, সমস্ত জীবনকে সুসজ্জিত করে দেন। কিন্তু যখন তোমাকে স্ত্রীর মর্যাদা না দিয়ে, কেবলই মিলনে আবদ্ধ হই, তখন নিজেকে অতি অধম জ্ঞান করি, নিজের প্রতি নিজেরই ঘৃণা জন্ম নেয়। … যিনি আমার দ্বিতীয় মাতা হবার সমস্ত কর্তব্য পালন করছেন, তাঁর রূপলাবণ্য, স্নেহ সমর্পণকে আমি সম্ভোগ করছি, এমন বোধ হয়। … দেবী, তোমাকে বিবাহ করে, তোমাকে স্ত্রীরূপী জননীর সম্মান প্রদান করতে চাই। অনুমতি দেবে!”

মেধা কনো কথা বলতে পারলেন না, নির্বস্ত্র হয়ে মিলন পশ্চাতে বৈরাগ্যের বক্ষে শয়ন করে ছিলেন তিনি। কনো কথা বলতে না পেরে, তিনি ক্রন্দন করে উঠলেন। বৈরাগ্য মেধাকে আঘাত করে ফেলেছেন, এমন জ্ঞানে তাঁকে আলিঙ্গন প্রদান করে সান্ত্বনা প্রদান করতে গেলেন, কিন্তু মেধা তাঁর সাথে বারংবার মিলনে আবদ্ধ হতে থাকলেন।

যেই কয়বার মিলন হয়েছে বৈরাগ্য ও মেধার, প্রতিবারই বৈরাগ্যই উদ্যোগী হতেন। কিন্তু আজ, এক এক করে ষোড়শবার মেধা মিলনে আবদ্ধ হতে থাকলে, অন্তে বৈরাগ্য প্রশ্ন করার ছলে বললেন, “মেধা! … আমি যে মোহিত হয়ে গেছি। আর মিলনে আবদ্ধ হলে, আমি তোমার মধ্যে বিলীন হয়ে যাবো। … এক এক করে ষোড়শবার তুমি আমাকে মিলনে আবদ্ধ করে নিলে। যেন তুমি আমার সাথে একাত্ম হয়ে গেছ। এমন কেন দেবী? একি আমাকে দেওয়া তোমার কনো পুরস্কার নাকি কনো কিছুর দণ্ড!”

ঘর্মাক্ত মেধার স্বেদসুগন্ধে সম্পূর্ণ গুহ্যস্থান সুগন্ধময় হয়ে গেছে। সেই সুগন্ধপ্রকাশক মেধা হেসে বললেন, “নাথ, এত সম্মান যে আজ পর্যন্ত কখনো পাইনি। স্ত্রীরূপী জননী আখ্যা দিয়ে যেই সম্মান প্রদান করলেন আপনি, আমি কনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিনা, এই সম্মানের প্রতিদান কি ভাবে ব্যক্ত করবো। তাই বারংবার আপনাকে আপ্লুত করে চলেছি। জননী হতে পারা যেন এক লালসা নাথ। জননী শব্দটা শুনেই এই বোধ হচ্ছে আমার”।

বৈরাগ্য হেসে বললেন, “অদ্ভুত ভাবে পবিত্র তুমি দেবী। তোমার শৃঙ্গারেও পবিত্রতা, তোমার মিলনেও পবিত্রতা। … একটি কথা বলতে ইচ্ছা করছে তোমাকে মেধা। আমার কি মনে হয় জানো, এক ও একমাত্র তুমিই মাতাকে গর্ভে ধারণ করার উপযুক্ত। এত পবিত্রপ্রেমের সম্মান আমরা কেউই দিতে সক্ষম নই মেধা। এক মাতাই এই প্রেমকে সম্মান প্রদান করার উপযুক্ত। দেখো, তুমি রত্নগর্ভা হবেই। … তবে এক্ষণে নয়”।

মেধা হেসে বললেন, “জানি নাথ। পঞ্চভূত একত্রিত না হলে, মাতা প্রকাশিত হননা। আমার পিতা ও মাতা রূপী দুই মহাভূত যে এখনো আত্মের কারাগারে বন্দী। তাঁদেরকে মুক্ত করে এখানে নিয়ে এসে, তাঁদের সেবা করে, তাঁদেরকে ঠিক সেই ভাবে আনন্দদান যদি করতে পারি, যেই ভাবে আমার ভগিনীদ্বয়কে আনন্দে বিভোররূপে দেখছি, ততদিন মাতার আগমন সম্ভবই নয়। কিন্তু কি করে নাথ! … উপায় কি?”

বৈরাগ্য হেসে বললেন, “উপায় তো এখনও উপলব্ধ দেবী। এই যে পথ দেখছো, যার মধ্যে অবস্থান করছি আমরা, জানো এই পথ অতিগুহ্য। এঁর তিনটি মুখ আছে, যা একত্রিত হয় সেই স্থানে, যেখান থেকে আমরা তোমাদের নিয়ে প্রবেশ করেছিলাম। এঁর একটি মুখ মাতা ব্রহ্মময়ীর পালঙ্কের নিম্নে উপস্থিত হয়, একটি পথ উপস্থিত হয় কারাগৃহের সম্মুখে, আর তৃতীয় আরো একটি পথ আছে, যার রহস্য আমারও অজানা”।

মেধা বস্ত্র পরিধান করতে করতে প্রশ্ন করলেন, “নাথ, এই গুহ্যদ্বার সম্বন্ধে আরো কিছু বলুন আমাকে। অতি রহস্যময় এই স্থান। এখানে আত্মের পুত্ররা প্রবেশ করতে পারলেন না কেন? আর আমরাই বা প্রবেশ করতে পারলাম কি ভাবে!”

বৈরাগ্য হাস্য প্রদান করে বললেন, “মেধা, জীবদেহ স্বয়ং একটি ব্রহ্মাণ্ড। প্রতিটি জীবের ব্রহ্মাণ্ড তাঁর তনু স্বয়ং, অন্য কিছুই নয়। যাকে জীব ব্রহ্মাণ্ড বলে থাকে, তা আত্ম নির্মিত ব্রহ্মাণ্ড নয়, তা সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের সমষ্টি মাত্র। আর এই যে প্রজাসমূহকে দেখো, এঁদের দুই ধারা আছে। অধিকাংশ প্রজার নির্মাতা আত্ম স্বয়ং, যাদেরকে কোষ বলা হয়ে থাকে। আর তোমার পিতার সমস্ত প্রজাগন হলেন ঈশ্বরীয় প্রজা, বা ঈশ্বরকোষ বা ঈশ্বরকণা।

এই ঈশ্বরকণাদের আবির্ভাবের হেতু আত্মের নির্মিত এই ব্রহ্মাণ্ড, যা মাতা ব্রহ্মময়ীর চেতনাকে আবদ্ধ করে রেখে নিজেকে ভগবান রূপে স্থাপিত করতে চায় আত্ম, সেই বন্ধন থেকে চেতনাকে মুক্ত করে তোলা। আর এই বন্ধন ও মুক্তির কারণেই এই ব্রহ্মাণ্ড চলমান।

মেধা, যদি মাতার সন্তান অর্থাৎ মাতার প্রকাশ বা চেতনাকে আত্ম বন্দী করে না রাখতো, তাহলে আত্ম ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণ করতেও পারতো না। কারণ আত্ম চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা ছাড়া কিছুই করতে সক্ষম নয়। কিন্তু যেহেতু মাতার সন্তান অর্থাৎ চেতনাকে আত্ম বন্দী করে রেখেছে নিজের মায়ার দ্বারা, সেই হেতু, মাতা তাঁর সন্তানকে মুক্ত করার জন্য, এই ব্রহ্মাণ্ডে ক্রিয়াশীল হয়ে মাতা।

প্রকৃত অর্থে মাতা, মাতাও নন। তিনি অনন্ত, অক্ষয়, অসীম, নির্গুণ ও নিষ্ক্রিয় ব্রহ্ম, বা পরমশূন্য ও পরমসত্য। কিন্তু নিজের বন্দী সন্তানদের মুক্ত করার উদ্দেশ্যে, তিনি নিজের নিষ্ক্রিয়তা ত্যাগ করে এই ব্রহ্মাণ্ডে পদার্পণ করেন মাতা বেশে, অর্থাৎ মাতা ব্রহ্মময়ী বেশে। আর তাঁর পদার্পণের কারণেই, তাঁর অবস্থানের কারণেই, আত্ম নিজের চিন্তা ইচ্ছা ও কল্পনা দ্বারা ব্রহ্মাণ্ড বিস্তার কর্মে সক্ষম, অর্থাৎ মাতারই সামর্থ্যের কারণে, মাতারই চেতনার কারণে সে সমস্ত কর্মকে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম, নিজের মায়া বিস্তারে সক্ষম।

তা জেনেও মাতা কেন এতে যুক্ত হন? কারণ তাঁর সন্তান, অর্থাৎ চেতনা এতে আবদ্ধ। জানো এই সন্তান কারা! এই সন্তান তোমরা মেধা। তুমি তোমার ভগিনী, তোমার পিতামাতা ও তোমার সমস্ত প্রজারা মিলিত ভাবে হলে সেই চেতনা, মাতার সন্তান। তোমরা একে অপরের থেকে পৃথক নও, বরং আত্মের মায়ার কারণে তোমরা পৃথক।

আত্মের মায়া কি? ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনাই আত্মের মায়াশক্তি, আর সেই মায়াশক্তির কারণেই তোমরা পৃথক না হয়েও পৃথক। আর মাতা তোমাদের এই বিন্যাস থেকেই মুক্ত করে, একাত্ম করে, তোমাদেরকে তাঁর সন্তানের রূপে প্রত্যাবর্তন করিয়ে, মুক্ত করতে উদ্যত। মেধা, আত্মের মায়াতে সম্যক চেতনা বশীভূত হলেও, যেই সামান্য চেতনাকে স্পর্শও করতে পারেনা আত্মের মায়া, তার নাম হলো মেধা (হাস্যমুখে) অর্থাৎ তুমি। আর তাই তোমাকে সর্বপ্রকারে বশ করতে উদ্যত আত্ম, কিন্তু তাও ব্যর্থ।

আর তুমি বাকি সমস্ত চেতনা-অংশ, অর্থাৎ তোমার ভগিনী, পিতামাতা সহ সমস্ত প্রজাকে একত্রিত করতে সদা উদ্যত, কারণ প্রত্যক্ষ ভাবে স্মরণ না থাকলেও, পরোক্ষভাবে তুমি ভুলে যাওনি যে, তোমরা এক ও অভিন্ন, কেন? কারণ তোমাকে যে বশীভূত করা সম্ভবই হয়নি আত্মের পক্ষে।

মেধা, এই সমস্ত কিছু কেন? কারণ মাতা তোমাদের পুনরায় একত্রিত করে, মুক্ত করতে চান। এমন ব্রহ্মাণ্ড প্রতিটি জীবের অন্তরে রয়েছে, আর এমন ভাবেই আত্মের বশ সকল চেতনা, আর এমন ভাবে সকল চেতনাই পঞ্চভূত ও ঈশ্বরকণাতে বিভক্ত। তাঁদেরকে একত্রিত করতে প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডেই মাতা উদ্যত, আর তাই আমাদের তিন বীজকে মাতা প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডেই বপন করে রেখে দেন।

কিন্তু প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ডে, এই ব্রহ্মাণ্ডের ন্যায়, মেধা প্রকাশিত নন। এই ব্রহ্মাণ্ডে তা স্বতঃপ্রসারিত কেন? কারণ এই ব্রহ্মাণ্ড মাতার নির্মিত ব্রহ্মাণ্ড, আত্মনির্মিত ব্রহ্মাণ্ড নয়। এই ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাণ মাতা স্বয়ং করেছেন, এবং এতে চেতনার মুক্তি অধ্যায়কে মাতা স্বয়ং রূপান্তরিত করতে চলেছেন, যাতে করে সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডে স্থিত সমস্ত চেতনা এই ব্রহ্মাণ্ডের থেকে শিক্ষা লাভ করেন, আর তাঁরাও এই ব্রহ্মাণ্ডের মতকরেই, নিজেদের মেধাকে জাগ্রত করে, যেই যাত্রা এই ব্রহ্মাণ্ডে সম্ভব হচ্ছে, অর্থাৎ আমাদের তিন বীজকে জাগ্রত করে, এই গুহ্যদ্বারের মধ্য দিয়ে জয়যাত্রা, তা সম্পন্ন করেন, এবং আত্মের কবল থেকে নিজেদের চেতনাকে মুক্ত করেন।

আর তাই এই ব্রহ্মাণ্ডকে বলা হয় অবতারতনু। হ্যাঁ মেধা, আমরা সকলেই এই অবতারতুনু ব্রহ্মাণ্ডের অধিবাসী, যেই অবতার তনুর নাম হলো ব্রহ্মসনাতন। মেধা যখন জাগ্রত হয়, তখন সে মাতার তিনবীজ অর্থাৎ বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যকে স্নেহ ও সেবা করে, তাঁদেরকে সক্রিয় করে তোলে, ঠিক যেমন তুমি করেছ।

আর একবার এই তিন সক্রিয় মাতা ব্রহ্মময়ীর গুণগন জাগ্রত হলে, শুরু হয় এই গুহ্যদ্বারে যাত্রার কর্ম। এই গুহ্যদ্বারকে কি বলে জানো? একে বলা হয় সূক্ষ্মদেহ। এঁর তিন ভাগ আছে, যারা তিন কাণ্ডনামে ব্রহ্মাণ্ডদের কাছে পরিচিত, সুষুম্না কাণ্ড, ইরা কাণ্ড ও পিঙ্গলা কাণ্ড। এঁদের মধ্যে ইরাকাণ্ড ধারণ করে, মাতা ব্রহ্মময়ী দেবী চন্দ্রপ্রভার কাছে উপস্থিত হয়েছিলেন, আর এই ইরা দ্বারের অপর প্রান্ত মাতা ব্রহ্মময়ীর পালঙ্কের নীচে অবস্থিত।

মেধা, এই পথের হদিশ তোমার জননী, দেবী ধরার কাছেও আছে, মাতা স্বয়ং তাঁকে সেই দ্বারের কথা বলেছিলেন। সেই পথ ধরেই, তোমার জননী সেই দিন উপস্থিত হয়েছিলেন, যেই দিন মাতা ব্রহ্মময়ী অন্তর্ধান লীলার শুরু করেছিলেন। তোমার পিতা, রাজা মানসকে উদ্ধার করতে, তোমার মাতা ইরা কাণ্ডের বা ইরা নাড়ীর পথ ধরেই মাতার কক্ষে উপস্থিত হয়েছিলেন, এবং তোমার পিতাকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছিলেন চন্দ্রপুরে।

পিঙ্গলা কাণ্ড অন্য এক পথ ধরে সেই দ্বারেই উপস্থিত হয়, যেই দ্বার দ্বারা আমরা তোমাদেরকে নিয়ে প্রবেশ করেছিলাম। এই দ্বারের অপর প্রান্ত কারাগৃহের সম্মুখে উপস্থিত হয়। আর সেই কাণ্ডে আমরা এক্ষণে অবস্থান করছি। আর এছাড়াও আরো একটি পথ আছে, যার নাম সুষুম্না কাণ্ড। সেই পথে কি আছে, বা সেই পথের রহস্য কি, তা আমার বা আমাদের তিনভ্রাতারই অজ্ঞাত।

তবে মাতার থেকে নির্মিত বীজ আমরা, তাই যেটুকু আমরা জানি, সেই অনুসারে এই সুষুম্না কাণ্ড ধরেই মাতা সমস্ত চেতনাকে একত্রিত করেন, এবং তাঁদেরকে আত্মের থেকে মুক্ত করার পদ্ধতি ধারণ করেন। তাই সেই পথ অতিগুহ্য। …

মেধা, এই ইরার পথে, মাতা ও মাতার আদেশপ্রাপ্ত হলে তবেই তোমরা গমন করতে সক্ষম, আর পিঙ্গলার পথে আমাদের হাত ধরে, তোমরা গমন করতে সক্ষম। তবে সুষুম্নার পথে আমরাও তোমাদের নিয়ে যেতে সক্ষম নই। সেই পথে কেবল ও কেবল মাতা যদি কারুর হাত ধরেন, তবেই তাঁর পক্ষে যাত্রা করা সম্ভব। আত্মের বিশ্বাস যে সেই পথে এমন কিছু শক্তি লাভ করা যায়, যা করা গেলে, সে অজেয় হয়ে যাবে। আত্মের এই ধারণার সত্যতা সম্বন্ধে আমার কনো ধারণা নেই, তবে হ্যাঁ সে সেই পথে চলার জন্য সদালালায়িত এবং মায়ার বিস্তারক, তা আমাদের জানা আছে।

এই হলো এই গুহ্যপথ সম্বন্ধে আমরা যা কিছু জানি সেই সমস্ত কিছু। এখানে তোমরা সুরক্ষিত, আর তোমাদের গর্ভে যারা আসছেন তাঁরাও। এই পথ ধরে আমরা এখনো কারাগৃহের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে, রাজা মানস, দেবী ধরা সহ সকল চেতনা অংশদের উদ্ধার করার প্রয়াস করতে সক্ষম, তবে তা এক্ষণে করা সঠিক হবে না”।

মেধা জিজ্ঞাসু হয়ে প্রশ্ন করলেন, “কেন নাথ? এখন তা করা কেন সঠিক হবেনা?”

বৈরাগ্য মৃদু হেসে বললেন, “এই পথে, দেবী চিন্তা, ইচ্ছা বা কল্পনা, বা তাঁদের তিনপুত্র বা তাঁর পুত্রদের সন্তানরা কেউই প্রবেশ করতে সক্ষম নন, কিন্তু আত্ম এই পথে প্রবেশ করতে সক্ষম, কারণ আত্ম স্বয়ংও স্বরূপে সেই ব্রহ্মই, কেবল আত্মসর্বস্ব ভাবে ভ্রমিত সে, তাই এহেন আচরণ করে ফেরে সে। আর দেবী, তাঁরা সকলেই এই গুহ্যদ্বারের যেই প্রান্ত ছায়াপুরের প্রাসাদে বা কারাগৃহে উপস্থিত হয়, তার সন্ধানে ব্যস্ত।

অর্থাৎ, যেই মুহূর্তে আমরা সেখানে এই গুহ্যপথ ধরে প্রবেশ করবো, সেই মুহূর্তে আত্ম ও তাঁর পরিবার আমাদের পিছন করে, এই স্থানে এসে উপস্থিত হবে। আর সে উপস্থিত হয়ে, তোমাদের গর্ভের সন্তানদের নষ্ট করে দেবে”।

মেধা মৃদু হেসে বললেন, “আপনারা তিনজন থাকতে, আত্ম সেই কাজে কিছুতেই সফল হবেনা নাথ, আমার বিশ্বাস তা”।

বৈরাগ্য মাথা নেড়ে বললেন, “তোমার বিশ্বাস আধারহীন দেবী। হ্যাঁ এই ক্ষেত্রে তা আধারহীন। আত্ম স্বয়ং সেই ব্রহ্মের প্রকাশ, যেই ব্রহ্মের সক্রিয় রূপ স্বয়ং মাতা ব্রহ্মময়ী। আর আমরা তিনজন মাতা ব্রহ্মময়ীর তিনবীজ। অর্থাৎ কনো ভাবে আমরা আত্মের সামর্থ্যের সমতুল্য নই। এমনকি আত্মকে প্রতিরোধ করার সামর্থ্যও আমাদের নেই। মেধা, তোমরা তিন ভগিনী স্বয়ং চেতনা অর্থাৎ ব্রহ্মেরই প্রকাশ, আর আমরাও। তাই আমাদের থেকে জাত সন্তানরা আত্মকে প্রতিরোধ করার সামর্থ্য ধরে। তাই একবার আমাদের সন্তান জাত হয়ে গেলে, তাঁরা তাঁদের পরিবারকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে যেতে পারবে।

তাঁদেরকে অনুসরণ করে আত্ম ও আত্মের পরিবার এখানে প্রবেশের প্রয়াস করবে অবশ্যই। সেই কর্মে আত্মের পরিবার ব্যর্থ হবে, আর আত্ম সফল হবে, আর হয়তো নিজের আধিপত্যের দ্বারা, আরো কারুকে প্রপবেশও করাতে সক্ষম। কিন্তু সে কিছুতেই তোমাদের ক্ষতিসাধন করতে সক্ষম হবেনা, কারণ সেও জানে যে তোমাদের ও আমাদের থেকে জাত সন্তানরা স্বয়ং মাতার ভাবপ্রকাশ, তাই তাঁরা তাঁর কনো ক্ষতি না করতে পারলেও, তাঁকেও কনো ক্ষতিসাধন করতে দেবেন না।

অর্থাৎ আমরা নই, আমাদের সন্তানরা সেই উদ্ধার কর্ম করার জন্য উপযুক্ত। তাই, তাঁদের আগমনের হেতু অপেক্ষা করো দেবী”।

মেধা হাস্যমুখে পুনরায় বৈরাগ্যকে আলিঙ্গন করলে, বৈরাগ্য প্রশ্ন করলেন, “কিছু বলবে দেবী? মিলন ভাব তো আমার মধ্যেও এক্ষণে নেই, আর তোমার এই আলিঙ্গনের মধ্যেও তা নেই। তবে কি ভাব এই আলিঙ্গনের মধ্যে অবস্থান করছে!”

মেধা হেসে বললেন, “প্রেমিকা, স্নেহা, সমস্ত কিছু পরে নাথ, প্রথম আমি আপনার শিষ্যা, আপনার থেকে জ্ঞান লাভ করাই আমার কাছে সর্বাধিক পছন্দের কর্ম। আর আপনি এক্ষণে যেই জ্ঞান প্রদান করলেন, তা আমাকে এতটাই আপ্লুত করেছে যে, আলিঙ্গনই আমার মধ্যে প্রকাশিত হলো”।

বৈরাগ্য মৃদু হেসে, মেধার মুখবদনকে স্নেহপ্রদান করে বললেন, “জানো মেধা, তোমার সব থেকে বড় বিশেষত্ব কি? তুমি শিশুর মত সরল। … এবার তুমি তোমার ও তোমার ভগিনীদের বিবাহের ব্যবস্থা করো। আমি আমার ভ্রাতাদের সাথে এই বিষয়ে কথা বলছি। তাঁরা একত্রেই অবস্থান করছেন এক্ষণে, চলো আমরা তাঁদের কাছে যাই”।

মেধা বললেন, “তাঁরা মিলনে আবদ্ধ, নির্বস্ত্র হবে নাথ। আমাদের তাঁদের সম্মুখে এই ভাবে যাওয়া সঠিক হবেনা। বরং আমি আহারের ব্যবস্থা করি। আহারের গন্ধতেই আমার দিদি শিখা, আর আমার ভ্রাতা বিবেকের সমস্ত অন্য কর্ম থেকে মন সরে যায়। তাহলে দুইজনেই আহারের জন্য ছুটে আসবেন, আর তখন আমরা আমাদের কথা তাঁদেরকে বলবো”।

বৈরাগ্য হেসে বললেন, “কে যে মাতৃসমা, তোমার দিদিরা তোমার, নাকি তুমি সকলের, তা বোঝা ভারি কঠিন দেবী। … বেশ তুমি আহার প্রস্তুত করো। আমি স্নান করে আসছি। তোমার মধু আমাকে এমন ভাবে বেষ্টন করে রয়েছে, স্নান না করলে, কে জানে আমি হয়তো আহার ত্যাগ করে, পুনরায় মিলনে আবদ্ধ হয়ে যাবো তোমার সাথে”।

মেধা লজ্জিত হয়ে বললেন, “আপনিও না! … রসিকতা করার কালে, নিজের ব্যঙ্গ করতেও ছাড়েন না। আপনি স্নান করে আসুন, আমি আহার প্রস্তুত করছি”।

মেধা আহার প্রস্তুত করার জন্য নিজের শিকারের সামগ্রী দ্বারা বাণ নিক্ষেপ করলে, সেই বাণে একটি হিরণ বধ্য হলো, এবং তাকে খুঁজে নিয়ে এসে, তাঁর দেহের মৃত্তিকাকে আহারের জন্য প্রস্তুত করলেন। আহার প্রস্তুতের ঘ্রাণ, যেমন মেধা জানতোই, তেমন ভাবেই দেবী শিখা ও বিবেককে প্রভাবিত করলে, তাঁরা মিলন কর্ম থেকে বিরত হলেন।

বেগবতী বিবেকের উদ্দেশ্যে হেসে উঠলেন, যখন বিবেক আহারের ঘ্রাণ লাভ করে চঞ্চল হয়ে উঠলেন। সেই দেখে বিবেক লজ্জিত হয়ে বললেন, “আসলে দেবী, আহারে আমার এমনিই রুচি অধিক, তাই আমাকে লম্বোদর বলা হয়। তা ছাড়া, মেধার হাতের রন্ধন খাওয়ার স্বপ্ন আমার তো কবে থেকে। মানবীয় বেশে ছিলাম না, তাই মৃত্তিকা থেকেই নিজের উদর পূর্তি করতে হতো। আজ তাঁর হাতের রন্ধনের ঘ্রাণ আমাকে লালায়িত করে তুলেছে”।

বেগবতী পুনরায় হাস্য প্রদান করলে, বিবেক অপরাধীর ন্যায় প্রশ্ন করলেন, “দেবী, মিলনের পথে বাঁধা স্থাপন করার জন্য, আপনি নিশ্চয়ই আমার উপর ক্ষিপ্ত, তাই না! নিজের ক্ষিপ্ততা ব্যক্ত করতে না পেরে, হাস্য প্রদান করে নিজেকে শান্ত করছেন, তাই না!”

বেগবতী মাথা নেড়ে, হাস্য প্রদান করে বললেন, “না নাথ, এমন কিছুই নয়। আমার শিখাদিদির বেশে, এই আহারের প্রতি আকর্ষণ তো আমি সেই ছোট থেকেই দেখছি। দিদি আমার আহারের থেকে অধিক গুরুত্ব কনো কিছুতে দেয়না। জানেন, আত্মের পুত্ররাও দিদিকে বশ করেছিলেন, এই আহার দিয়েই!”

বিবেক বস্ত্র পরিধান করতে করতে প্রশ্ন করলেন, “আর আপনাকে!”

বেগবতী লজ্জিত হয়ে মাথা নিচু করে বললেন, “অসুরক্ষার ভানের কারণে। কিসের যে আমার এত অসুরক্ষার চিন্তা, বুঝি না। মেধা থাকতে, আমার শিখাদিদি থাকতে, আমার কেই বা কি অনিষ্ট করতে সক্ষম। কিন্তু এই সত্য জানলেও, এই সত্য থেকে অজ্ঞান আমি। আর তাই …”

বিবেক নিকটে এসে, বেগবতীর মাথায় হাত রেখে বললেন, “বাদ দিন সেই সব দিনের কথা। … যা হয়ে গেছে, তা তো হয়েই গেছে দেবী। যা ভবিতব্য তাই হয়েছে। আমার ভ্রাতা, বৈরাগ্য বলেন, মাতার ইচ্ছা ব্যতীত একটি গাছের পাতাও নড়তে পারেনা। … তা এতো বশ্যতা আর সঙ্গমের মত এতো বড় কৃত্য! মাতার অঙ্গুলিহেলন ব্যতীত, কি করেই বা তা হতে পারতো!”

বেগবতী নিজের প্রতি গ্লানি, আর বিবেকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা এক ম্লান হাস্য প্রদান করে বললেন, “মেধা বলে, কর্মের ফলই কর্মকে সম্পন্ন করে। আর কর্ম তা নয়, যা আমি ভৌতিক ভাবে করলাম। কর্ম তা, যা আমার মানসিকতা প্রসার করে। আমার মানসিকতাতেই ছিল অসুরক্ষার ভাব, সেই ভাব যে এক পরিণতি ধারণ করেই থামতো। আমার বশ্যতা, আর আমার গর্ভ থেকে মদিনার ন্যায় নিকৃষ্ট তিন সন্তান জন্ম নেওয়া, এই ছিল আমার অসুরক্ষা নামক চয়নের পরিণাম। মাতাকে এঁর মধ্যে টেনে এনে, তাঁর নামে লাঞ্ছন দেবার কিই বা প্রয়োজন!

মাতা আমাদের তিনি। মেধা সর্বদা বলে, সন্তান অবাধ্য হলে, মাতা দণ্ড দেন, সন্তানকে সঠিক পথে আনার জন্য, তাঁকে বেদনা দেবার জন্য নয়। মাতা তিনি, সন্তানকে বেদনা কি করে দিতে পারেন তিনি!”

বিবেক নিজের উত্তরীয় দ্বারা বেগবতীর অঙ্গের স্বেদ সাফ করে দিতে দিতে বললেন, “শুদ্ধ বিচার, শুদ্ধতা। মেধা অত্যন্ত শুদ্ধ দেবী। আমার কাছে তিনি কনো দেবীর থেকে কম নন। অন্তরে অন্তরে তাঁর আরাধনা করে যাই, বিনা কনো প্রস্তুতি নিয়েই, বিনা কনো যোজনা রেখেই”।

বেগবতী নিজের বেখেয়ালে হেসেই বললেন, “মেধার স্কন্ধে মাথা রাখলে, অদ্ভুত ভাবে নিশ্চিন্ত হয়ে যাই। যেন মনে হয়, স্বয়ং মাতার স্কন্ধে মাথা রেখেছি। ভগিনী সে আমাদের। কন্যা সম। শিখাদিদি মাঝে মাঝেই বলেন, “কে যে কার কন্যাসম বুঝি না। মুখে আমরা বলি যে মেধা আমাদের কন্যাসম, কিন্তু বাস্তবে যেন আমরা তাঁর কন্যাসম। মেধার কাছে গেলেই যেন ছোট শিশু হয়ে যাই”।

আমারো এমনই মত, জানেন নাথ। যত রাজ্যের জিজ্ঞাসা, যত রাজ্যের মনের গুপ্ত কথা, যত মনের মধ্যে থাকা শঙ্কা, আশঙ্কা, সমস্ত কিছু যেন অনর্গল বলতে থাকি মেধাকে। যেন কনো প্রকার বাঁধা নেই, কনো প্রকার চিন্তা নেই। না মানের চিন্তা, না মানহানির চিন্তা। এক অনাবিল নিশ্চিন্ততার স্থান যেন মেধার স্কন্ধ। … সত্য বলতে কি জানেন নাথ, আপনার প্রতি স্নেহকে মিলন দ্বারা ব্যক্ত করা যায়, শিখাদিদির প্রতি স্নেহ তাঁকে একবার প্রাণভরে আলিঙ্গন করলেই ব্যক্ত করা যায়, কিন্তু মেধার প্রতি স্নেহ যেন ব্যক্তই করতে পারিনা।

বলে বোঝানো তো তখন সম্ভব হতো, যখন নিজে বুঝতে পারতাম যে কতটা স্নেহ করি তাকে। সঠিক করে বলতে গেলে, আমি নিজেও বুঝিনা যে ঠিক কতটা স্নেহ করি মেধাকে। মেধাকে দেখলেই, আমার মাতা ব্রহ্মময়ীর কথা মনে আসে। মনে হয় যেন, আমি অপরাধী কারণ আমি তাঁর থেকে পৃথক এক অস্তিত্ব। কেন আমি তাঁর থেকে পৃথক। মিলন নয়, মিলনেও তো যেই একাত্মতা সম্ভব, তা ক্ষণিকের! অনন্ত মিলনই সঠিক হবে, যেখানে আর কখনোই আমার নিজস্ব কনো অস্তিত্বই অবশিষ্ট থাকবেনা!”

বিবেক বেগবতীকে বস্ত্র পরিধান করাতে থাকলে, খেয়াল করলেন যেন বেগবতী নিজের মধ্যে নিজে নেইই। তাঁর প্রাণ যেন মেধাতে গত। সত্যই মেধাতে গত! নাকি, মেধার আধার ধরে মাতা ব্রহ্মময়ীতে! … মেধা সঠিক বলতো, তাঁর দিদিদের একটা একটা দুর্বলতা আছে ঠিকই, কিন্তু তাঁরা অশুদ্ধ নন, তাঁদের অন্তরমন পবিত্র, অতিশুদ্ধ।

বিবেক আরো বুঝলেন যে, এই মুহূর্তে যদি এই সমস্ত কথাকে থামানো না হয়, তাহলে হয়তো নিজের ভগিনীর আরাধনাই করে ফেলবেন, আর মেধাকে বিব্রত করে দেবেন। আসলে মেধা যে স্নেহলাভে বিশ্বাস রাখেন, স্নেহদানে বিশ্বাস রাখেন। আরাধনা তাঁর কাছে অত্যন্ত কৃত্রিম এক ভাব, যার মধ্যে আত্মীয়তা কম, অনাত্মীয় ভাবে বাণিজ্যিক লেনদেনের ভাব অধিক, আর তাই আরাধনা থেকে মেধা সর্বদা বিরত থাকে।

তাই তিনি বললেন, “দেবী, এবার কিন্তু আমার লম্বোদর কৃশোদর হয়ে যাবে। চলুন দেবী, স্নান করে আসি চলুন, স্নান করে মেধার হাতের আহার গ্রহণ করবো, কত দিনের সাধ, মেধার হাতের খাবার গ্রহণ করার। চলুন না!”

বেগবতী স্নান করতে করতে, পুনরায় মেধার কথা স্মরণ করলেন। যখন তিনি আত্মপুত্রদের মোহে আবদ্ধ ছিলেন, তখন মেধা একাধিকবার বলেছিল, “দিদি, তুমি মোহে আবদ্ধ হয়ে সঙ্গমকৃত্যে যুক্ত হয়েছ, মিলনে নয়”। … মেধার কথা যেন তখন অত্যন্ত কটু লাগতো, তাও সে বলেছিল, “দিদি, সঙ্গমের ক্ষেত্রে দেহের প্রতি আকর্ষণ থাকে। আর মিলনের ক্ষেত্রে দেহ একটি মাধ্যম মাত্র হয়ে থাকে”।

বেগবতী মেধার কথা স্মরণ করে করে, মৃদু মৃদু হাসলেন আর স্নান করতে থাকলেন বেখায়ালেই। তিনি বিচার করতে থাকলেন, “কতটা ঠিক ছিল মেধা! কই বিবেক তাঁর মিলনের সঙ্গী। বিবেক তো তাঁর দেহের প্রতি আকৃষ্ট নন! এমনকি আমিও বিবেকের দেহের প্রতি আকৃষ্ট নই! … আমরা একত্রে স্নান করছি, কই একে অপরের নগ্ন দেহ দেখে তো আকৃষ্ট হচ্ছি না! … শিশুর ন্যায় জলক্রীড়া করছি! অর্থাৎ মেধা সঠিক ছিল, সম্পূর্ণ ভাবে সঠিক ছিল। কি করে এতটা সঠিক হয় মেধা! কি করে!”

বিবেক কাছে এসে বেগবতীকে স্পর্শ করে বললেন, “দেবী, স্নান হলো! … চলুন না, মেধার হাতের রান্না খাবার জন্য আর তর সইছে না!”

বেগবতী স্নেহের হাস্য প্রদান করলেন বিবেকের প্রতি। মিলনসাথিতেই সীমিত নন বিবেক। সে যেন তাঁর কাছে সন্তানসম। মাতার কাছে এসে সন্তান যেন আবদার করছেন। বেগবতীর অন্তরে স্নেহ ও মমতা যেন সমুদ্রের লহরের ন্যায় আছড়ে আছড়ে পরছে। অন্তর্ভেদী দৃষ্টি দিয়ে বিবেক তা দেখে, বিবেক হাস্যছলে বললেন, “দেবী, আমাদের সন্তান আপনার মধ্যে সাগরের লহর নির্মাণ করছে। … শীঘ্রই আপনি মাতা হতে চলেছেন পুনর্বার”।

বেগবতী সেই কথাতে আনন্দিতও হলেন, আর খানিক ম্লানও হয়ে গেলেন, “কেন পুনর্বার! কেন প্রথমবার নয়! … না না, মেধা বলে কর্মের ফলকে অস্বীকার করার অর্থ, কর্মকে অস্বীকার করা, আর কর্মকে অস্বীকার করার অর্থ, নিজের অপূর্ণতাকে অস্বীকার করা। আর নিজের অপূর্ণতা অস্বীকার করার অর্থ, মাতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে বাঁধা নির্মাণ, কারণ নিজের অপূর্ণতার ভানই যে নিজেকে পূর্ণ করার সাধের জন্ম দেয়, আর পূর্ণতা মানেই তো মাতা ব্রহ্মময়ী। আমার মেধা! … সত্যই তো আমি পুনর্বার মা হতে চলেছি, প্রথমবার তো মা সেইদিন হয়েছিলাম, যেদিন মেধার জন্ম হয়েছিল!”

দেবী শিখার অবস্থা অন্যদিকে বিবেকের মতই। উৎকণ্ঠার সাথে বিচারের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন, “নাথ, চলুন স্নান করে আসি। … আহার করবো। আমার মেধা আহার প্রস্তুত করছে। আমি ঘ্রাণ পাচ্ছি, আর তিষ্ঠতে পাচ্ছিনা!”

কথাটি বলেই শিখার মধ্যে এক গ্লানির ভাব উদিত হলো। তিনি বিচারের উদ্দেশ্যে বললেন, “মিলনে রুচি ছিল আপনার, তাই না! … বিব্রত করে দিলাম আপনাকে”।

বিচার হেসে বললেন, “দেবী, মিলনে আবদ্ধ ছিলাম আমরা, সঙ্গমে নয়। নেশা করছিলাম না, নিজেকে অর্পণ করছিলাম। … তাহলে এই বিব্রত ভাবের প্রশ্নই বা কেন উঠছে! … প্রেমিকা আপনি আমার। প্রেমিকার প্রতিটি ভাবই প্রেমিকের কাছে বড় প্রিয় হয়। আমি তো দেখে আপ্লুত যে, আপনাদের ভগিনীদের মধ্যে জ্যেষ্ঠা যিনি, সেই দেবী শিখার মধ্যেও শিশুসুলভ ভাব উপস্থিত! … আহারের গন্ধ পেয়েই, তাঁর শিশু জেগে উঠেছে। চলুন দেবী স্নান করে আসি, মেধার হাতের রন্ধন আহারের সাধ তো আমারও বিস্তর। তবে আমার স্থির বিশ্বাস, একজন আপনারই মত লালায়িত মেধার হাতের আহার করার জন্য!”

দেবী শিখা স্নেহের কৌতূহল বশত প্রশ্ন করলেন, “কে নাথ!”

বিচার হেসে বললেন, “আমাদের অনুজ, বিবেক। এমনিই সে আহারের প্রতি আকৃষ্ট, তারপর মেধার হাতের নির্মিত আহার। সর্বদা সে বলে, শুদ্ধ যিনি, তাঁর প্রতিটি কর্মের মধ্যে শুদ্ধতা থাকে। যেদিন দেবী মেধা আহার করে আমাকে খাওয়াবেন, জানবো স্বয়ং মাতা আহার করাচ্ছেন আমাকে”।

দেবী শিখা সেই কথা শুনে হেসে বললেন, “শুদ্ধতাই প্রতিভার মাধ্যমে নিজেকে ব্যক্ত করে দেব, এই সত্য আমি আমার প্রাণপ্রিয়া মেধাকে দেখে দেখেই জেনেছি। আর আপনাদের সকলকে দেখে বুঝেছি, বিশ্বাসই সমস্ত সম্পর্কের মূল ভিত্তি। … নাথ, মাতার কাছে আমাদের যেতে হলে, এই জিজ্ঞাসা আর বিশ্বাস অত্যন্ত আবশ্যক। যতক্ষণ না আমাদের শুদ্ধতা প্রতিভার আকার ধারণ করে, আমাদের মাতার প্রতি বিশ্বাসকে ব্যক্ত করতে পারছে, ততক্ষণ যেন মাতা আমাদের কাছে থেকেও অধরা”।

বিচার হেসে দেবী শিখার হাত ধরে, পিঙ্গলার উষ্ণজলে স্নান করতে নেমে, দেবী শিখার উদ্দেশ্যে বললেন, “দেবী, আপনি বোধ করি মাতা হতে চলেছেন। জিজ্ঞাসা আর বিশ্বাসের জননী হতে চলেছেন আপনি। … প্রথমবার আপনি মাতা হতে চলেছেন”।

দেবী শিখা হেসে বললেন, “প্রথমবার নয় নাথ, আমি তো এর পূর্বেও জননী হয়েছি। আপনি তো তা জানেন দেব!”

বিচার হেসে বললেন, “কিন্তু দেবী, সেই স্মৃতি তো আপনাকে বেদনাই প্রদান করে। তবে কেন সেই স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে রয়েছেন! … কেন ফেলে দিচ্ছেন না সেই স্মৃতিকে!”

দেবী শিখা নিজের গাত্রবারির উপর মুলতনি মৃত্তিকার প্রলেপ লাগাতে লাগাতে বললেন, “নাথ, প্রথম আমি মা হয়েছিলাম, যখন মেধার জন্ম হয়েছিল। বিশ্বাস করুন নাথ, একটিবারের জন্যও আমি তৃপ্ত ছিলাম না, এটা মেনে যে, মেধা আমার ভগিনী। মেধা আমার কন্যা, আমার নিজের কন্যা।

আমার মাতা, আমাদের মাতা, দেবী ধরার কাছে মেধা অপ্রয়োজনীয় সন্তান ছিলেন। তিনি তৃতীয় সন্তানের জননী হতে চাননি। পিতা মানস অবশ্যই মেধাকে প্রাণভরে স্নেহ করতেন, কিন্তু আমাদের জননীর প্রেম মেধা পায়নি। কিন্তু মেধা যখন হয়, নাথ তখন আমি আর বেগবতী বেশ বড় হয়ে গেছি, আমাদের মাসিকধর্মপালনও শুরু হয়ে গেছিল। … মেধা মাতার স্তনপানের জন্য কাঁদতো, আর মাতা তাঁকে একপ্রকার ফেলেই চলে যেতেন।

বেশ কিছুদিন আমি আর বেগ সেই দৃশ্য দেখে অন্তরে বুকফাটা কষ্ট ভোগ করে কাঁদতে না পেরে, কেবলই কম্পনে লিপ্ত থাকতাম। শেষে একদিন, আর আমরা থাকতে পারলাম না। আমরা দুইজনে সিদ্ধান্ত নিলাম। প্রথমবার কনো শিশুকে আমার স্তনের বাটে মুখ লাগিয়েছিলাম। স্তন আছে, বাট আছে, কিন্তু দুগ্ধ নেই। কিন্তু মেধার যেন দুগ্ধের দরকারই ছিলনা। তাঁর দরকার ছিল, মায়ের বক্ষের উষ্ণতা!”

কথা বলতে বলতে শিখার নয়ন অশ্রুতে ভরে এলো। সে আমার স্তনদেশকে আঁকরে ধরলো, আমার মনপ্রাণ যেন তাঁকে নিজের সন্তান ব্যতীত কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু ভাবতে পারলো না। দুগ্ধ না পেয়েও, আমার স্তনের বাট সে টানতেই থাকলো। টানতে টানতে, তাঁর মধ্যে নেশা এসে গেলে, বেগবতী একটি বস্তু নির্মাণ করেছিল মেধার জন্য, তা মেধার মুখে লাগিয়ে দিত।

স্তনের মতই নরম তা, আর যেটা মেধার মুখে লাগানো হতো, তার অনুভবই বাঁটের মতই। মেধাকে এইভাবে আমরা দুই ভগিনী দুগ্ধ প্রদান করতাম। জানেন এই দুগ্ধ কার ছিল! … এই দুগ্ধ ছিল, আমাদের দিদিমা, চন্দ্রপ্রভা দেবীর গরু, সর্মিলার। আমাদের দিদিমা যখন দেবী চন্দ্রপ্রভা ছিলেন না, তখন এই গরুর দুগ্ধ বিক্রয় করেই তিনি জীবিত থাকতেন। মাতা ব্রহ্মময়ী যখন আমার দিদাকে দেবী চন্দ্রপ্রভা করে দেন, তখন লীলাবশত এই সর্মিলার বাটে মুখ দিয়ে তিনি দুগ্ধ পান করেছিলেন। আর তবে থেকে সর্মিলার দুগ্ধ প্রদান ততদিন বন্ধ হয়নি, যতদিন না তাঁর দেহাবসান হয়।

সেদিন বুঝিনি, আজ বুঝি, লীলা দেখাতে নয়। মাতা তিনি, লীলা দেখাতে তিনি কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু করেন না। মেধার দুগ্ধপানের ব্যবস্থা করে গেছিলেন জগন্মাতা সেদিন, সর্মিলার বাটে মুখ দিয়ে। আর মেধা সেই দুগ্ধ পান করে, আজ আমাদের প্রিয়তমা। … নাথ, আপনি বললেন, আমাদের বেদনা আমাদের পূর্বসন্তানরা, সঠিক কথা তা। কিন্তু তাদেরকে ভুলতে হলে যে, আমাদের মেধাকেও ভুলতে হয়! … মেধা যে আমাদের প্রথম সন্তান। আমার আর বেগবতীর, উভয়েরই প্রাণ বসে তাতে। তাঁর স্মৃতি কি করে বেদনা দিতে পারে নাথ!”

বিচার দেবী শিখাকে দেখছিলেন মনদিয়ে, আর অন্তরে অন্তরে তাঁর স্নেহ লাভ করে নিজেকে ধন্য মানছিলেন। এমনই সময়ে শিখা বললেন, “আহার আমার বরাবরের দুর্বলতা নাথ। এই আহার দিয়েই আত্মের পুত্ররা আমাকে বশ করেছিল, আর তারপর যত্‌পরনাস্তি সম্ভোগ করে আমাকে। … তাই আহারের কালে, আমি সমস্ত কিছু ভুলে যাই। আমার ভগিনীও নিশ্চিত ভাবে তা জানে। এর অর্থ, সুস্বাদু আহার ব্যঞ্জন করছে মেধা মানে আমাদেরকে সে ডাকছে। কিছু তো বলার আছে আমাদেরকে নাথ। … চলুন নাথ, এবার আমাদের যাওয়া উচিত”।

সকলে মেধার রন্ধনের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে, স্নান করে আহারের জন্য উপস্থিত হলে, মেধা সকলকে দেখে, আনন্দের সাথে আহার পরিবেশন শুরু করলেন। বৈরাগ্য একদিকে, ঠিক তাঁর বিপরীতে উপস্থাপন করলেন বিবেক ও বিচার। বিবেক বিচারদের বামদিকে এবং বৈরাগ্যের ডানদিকে উপস্থাপন করলেন শিখা ও বেগবতী। মেধা সকলকে আহার পরিবেশন সম্পন্ন করে, বৈরাগ্যের বামদিকে ও বিচার বিবেকের ডানদিকে উপস্থাপন করলে, সকলে মনোযোগ সহকারে আহার করা শুরু করলেন।

মেধার হাতের রন্ধন যে ঠিক কতটা সুস্বাদু, তা শিখা ও বেগবতী জানেন। তাঁরা অতি তৃপ্তির সাথে সেই আহার গ্রহণ করলেন। অন্যদিকে বিবেক বিচার ও বৈরাগ্যের সেই আহারের স্বাদ এতটাই তৃপ্তি প্রদান করলো যে, তাঁদের নেত্র বন্ধ হয়ে এলো। নেত্র বন্ধ করেই তাঁরা আহার গ্রহণ করতে থাকলেন।

এমন ভাবে বেশ কিছুক্ষণ আহারের স্বাদ গ্রহণের পর, বৈরাগ্য বললেন, “ভ্রাতারা, আশা করি তোমরা রিপুপাশ সন্তান অর্থাৎ আবেগদের থেকে মুক্ত। আমি কি সত্য বললাম!”

বিবেক হেসে বললেন, “ভ্রাতা, দাবি তো সকলেই করেন যে তাঁরা রিপুপাশ থেকে ও আবেগ থেকে মুক্ত, কিন্তু সেই দাবির কিই বা উপযোগিতা, যদি তার ভিত্তিই না থাকে! তাই ভ্রাতা, আপনি আমাদের পরীক্ষণ করে, সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে আমরা সত্যই রিপু পাশ ও আবেগশূন্য, নাকি তাঁদের পাশে জরাজীর্ণ”।

বৈরাগ্য বিবেকের যথার্থ উত্তরে তৃপ্ত হয়ে বললেন, “বেশ তাহলে আমাকে একটি কথা বলো, স্ত্রীপুরুষের থেকে কি ভাবে সন্তানের জন্ম হয়?”

বিচার উত্তর দিলেন, “দুই প্রক্রিয়াতে তা সম্পন্ন হতে পারে ভ্রাতা। প্রথমটি মিলন, ও দ্বিতীয়টি সঙ্গম”।

বৈরাগ্য ও তাঁর ভ্রাতাদের বার্তালাপ যেন সামান্য বার্তালাপ নয়, তা যেন এক গুরুপ্রদত্ত শিক্ষাদান, এমনই বোধ হতে থাকলো শিখা ও বেগবতীর। মেধার কাছে তো তাঁরা সকলেই গুরু, পূর্বথেকেই। বৈরাগ্য পুনরায় প্রশ্ন করলেন, “মিলন ও সঙ্গমের মধ্যে পার্থক্য কি ভ্রাতারা!”

বিবেক উত্তর দিলেন, “ভ্রাতা, সঙ্গম শরীরের সাথে শরীরের হয়, আর মিলন সত্ত্বার সাথে সত্ত্বার হয়, চেতনার সাথে চেতনার হয়। সঙ্গম যেহেতু কেবলই শারীরিক, তাই সম্ভোগ সর্বস্ব হয়, অর্থাৎ স্ত্রী ও পুরুষ একে অপরের দেহের প্রতি আকৃষ্ট হন, এবং একে অপরের দেহের বলে নিজের দেহকে সুখদানে উন্মত্ত ও লালায়িত থাকেন। অন্যদিকে, মিলনের ক্ষেত্রে দেহের বোধ থাকেনা। স্ত্রী তখন না পুরুষের আর না নিজের তনুর দিকে নজর রাখেন। একইভাবে পুরুষও না নিজের আর না স্ত্রীর তনুর দিকে নজর রাখেন।

একে অপরের প্রতি কিছু লাভের জন্য আকৃষ্ট থাকেন না, উপরন্তু স্ত্রী ও পুরুষ, উভয়েরই থাকে একে অপরের প্রতি সম্মান, সম্ভ্রম ও স্নেহ। একে অপরকে সেই সম্মান, সেই সম্ভ্রম ও সেই স্নেহ প্রদান করতে তৎপর থাকেন, আর তাই একে অপরের কাছে নিজেকে অর্পণ করেন। স্ত্রী পুরুষকে এবং পুরুষ স্ত্রীকে আবদ্ধ করেন না মিলনের ক্ষেত্রে, বরং স্ত্রী নিজেকে আবদ্ধ করেন পুরুষের কাছে নিজেকে অর্পণ করার জন্য, এবং পুরুষ নিজেকে আবদ্ধ করেন স্ত্রীর কাছে নিজেকে অর্পণ করার জন্য”।

বৈরাগ্য তৃপ্ত হলেন উত্তরে। কিন্তু তাঁর প্রশ্ন শেষ হয়নি। তাই তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলেন, “প্রতিটি চয়নের নির্দিষ্ট পরিণাম হয়, তাহলে আমাকে বলো ভ্রাতারা, সঙ্গমরূপ চয়নের পরিণাম কি হয়, আর মিলনরূপ চয়নের পরিণাম কি হয়?” 

বিচার উত্তরে দিলেন, “ভ্রাতা, যদি একটিই পরিণামের কথা বলেন, তাহলে সঙ্গমের ফলে আসুরিক মানসিকতার জীবের জন্ম হয়, অর্থাৎ যিনি রিপুপাশ ও আবেগদের প্রতি সহজাত ভাবেই আকর্ষিত হন, তাদের জন্ম হয়; আবার মিলনের ফলে যাদের জন্ম হয় তারা সহজাত ভাবেই এই সমস্ত আবেগদের থেকে, এমন কি সমস্ত আত্মভাব থেকে মুক্ত হতে ব্যস্ত থাকেন”।

বিবেক আবার বললেন, “কিন্তু ভ্রাতা, এই দুই পরিণামেই সীমিত থাকেনা সঙ্গম ও মিলন। হ্যাঁ, ভ্রাতা বিচার যা বললেন, তাই হলো প্রত্যক্ষ পরিণাম, তবে এঁর অন্তরালে অনেক অনেক পরোক্ষ পরিণামও থাকে”।

বৈরাগ্য হাস্যমুখে বললেন, “বেশ বলো সেই পরোক্ষ পরিণামের প্রসঙ্গে”।

বিবেক বলা শুরু করলেন, “ভ্রাতা, সঙ্গমের ভাবের উদয় হয়, শারীরিক আকর্ষণের প্রতি, এই কথা যথার্থ নয়। যথার্থ কথা এই যে, সঙ্গমের ভাবের উদয় হয়, শারীরিক আগ্রাসনের থেকে। অর্থাৎ, যখন স্ত্রী পুরুষকে বশীভূত করতে আগ্রহী হন, এবং পুরুষ স্ত্রীকে, তখনই সঙ্গমের ভাব উদিত হয়, অন্যথা নয়। এবার কথা এই যে, স্ত্রী পুরুষকে বা পুরুষ স্ত্রীকে কখন বশ করতে উদ্যত হন!

যখন স্ত্রীর মধ্যে এমন ভাবনার উদয় হয় যে পুরুষ তাঁকে বশ করতে চাইছেন, বা পুরুষের মধ্যে এমন ভাবের উদয় হয় যে স্ত্রী তাঁকে বশ করতে চাইছেন, তখনই এই বিচিত্র প্রতিস্পর্ধার উদয় হয়। কথা এই যে, তখনই স্ত্রী চাইতে শুরু করেন যে, পুরুষের তনুকে বশ করে, তিনি নিজের দেহসুখ অর্জন করবেন, আর পুরুষেরও এমন ইচ্ছার জাগরণ ঘটে যে, স্ত্রীর তনুকে অন্বেষণ করে, তিনি নিজের দেহসুখ লাভ করবেন। অর্থাৎ একে অপরকে অন্বেষণের ভাব রাখেন তখন, আর যখন এই ভাবের বিস্তার হয়, তখনই সঙ্গমের সূচনা হওয়া শুরু হয়”।

বৈরাগ্য আবার প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু এই প্রতিস্পর্ধার ভাবের উদয় কখন হয় ভ্রাতা?”

বিচার উত্তর দিলেন এবার, “স্ত্রী সন্তানের জন্ম দেবার উদ্দেশ্যে, প্রতিমাসে ডিম্বাণু উপস্থিত করেন নিজের গর্ভে, আর তার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেন ও বেদনা সহ্য করেন। স্ত্রী এর পরেও সন্তান জন্ম দেবার কালে মৃত্যুতুল্য বেদনা সহ্য করেন, এবং সন্তানের জন্ম দেন। এরপরেও স্ত্রী হলেন সন্তানের প্রথমগুরু, অর্থাৎ সন্তানকে জীবনের পথে অগ্রগতিশীল করে তোলেন স্ত্রী। কিন্তু যখন স্ত্রী দেখেন যে, পুরুষ তাঁদের এই সমস্ত পরিশ্রমের গুরুত্বই প্রদান করেন না, উপরন্তু তাঁদের এই সমস্ত বেদনা সহনকে স্ত্রীদের কর্তব্য ধরে নিয়ে, সেই কর্তব্য পালনের জন্য পেষণ করতে থাকেন, তখন স্ত্রীর মধ্যে আগ্রাসনের জন্ম নেয়।

স্ত্রীর মধ্যে মাতার সামর্থ্যবল থাকে, যেহেতু তাঁর মধ্যে প্রজনন সামর্থ্য থাকে, সেই হেতু। তাই যখন স্ত্রী আগ্রাসনের দ্বারস্থ হন, তখন সমাজে পুরুষ যেই অধিকার স্থাপন করে রাখে, সেই অধিকারে হস্তক্ষেপ করেন, এবং পুরুষকে সমাজে বিপন্ন করে দেন, সমাজ থেকে পুরুষের প্রাধান্যের হ্রাস ঘটান। আর এর ফলে, পুরুষও আগ্রাসনের আসনে স্থিত হয়ে যান, এবং তাঁর মধ্যেও স্ত্রীকে বশ করে রাখার মানসিকতার বিস্তার হয়”।

বৈরাগ্য প্রশ্ন করলেন, “আর কখন মিলনের ভাব উদিত হয়?”

বিবেক উত্তরে বললেন, “যখন পুরুষ স্ত্রীর মাসিকধর্মপালনকে, সন্তান জন্ম দেবার অসীম বেদনাসহনকে, সন্তানের প্রথমগুরু হবার কর্তব্যপালনকে, এবং তাঁদের প্রতিও স্ত্রীর মাতৃত্বসুলভ আচরণকে অন্তরমন থেকে কুর্নিশ জানানো শুরু করেন, তখন পুরুষদের মধ্যে স্ত্রীর প্রতি সম্মান, স্নেহ ও প্রীতি জাগরিত হয়। মাতার ভাব তাঁদের মধ্যে পূর্ব থেকেই থাকে, সন্তানের জন্ম দেবার সামর্থ্য ধরেন স্ত্রীরা, তাই। সেই হেতু, স্ত্রীর মধ্যে মমতার বিস্ফোরণ ঘটে, যা-ই স্ত্রী ও পুরুষকে সঙ্গম থেকে অপসারিত করে, মিলনের পথে চালিত করে”।

বৈরাগ্য হেসে বললেন, “তোমাদের সমস্ত কথাকে ধরলে, পুরুষ যখন স্ত্রীর প্রতি সম্মান ধারণ করেন হৃদয় থেকে, তখনই স্ত্রীর মধ্যে স্নেহের উদ্বেগ হয়, আর স্ত্রীর স্নেহের ফলে, স্ত্রীপুরুষ মিলনে আবদ্ধ হন। আর যখনই পুরুষ স্ত্রীর প্রতি এই সম্মান ধারণ করেন না, তখনই স্ত্রীর মধ্যে প্রতিস্পর্ধার জাগরণ ঘটে, আর পুরুষস্ত্রী উভয়েই তখন সঙ্গমে লিপ্ত হন, যা একপ্রকার একে অপরকে বশীকরণ করার সংগ্রাম ব্যতীত কিছুই নয়। আর যেহেতু তা একটি সংগ্রাম, তাই সেই সংগ্রাম থেকে আসুরিক সন্তানের জন্ম হয়। কি তাই তো?”

বিবেক বললেন, “ভ্রাতা, সমাজের নির্মাতা পুরুষ, আর পুরুষের মানসিকতার নির্ধারক স্ত্রী। যদি স্ত্রীকে তুষ্ট, তৃপ্ত ও প্রফুল্লিত না রাখা যায়, তাহলে পুরুষের মধ্যে অত্যাচারী ও স্বৈরাচারী মানসিকতার বিস্তার করে স্ত্রীরা, যা তাঁরা নিজেদের তুষ্টি, তৃপ্তি ও প্রফুল্লতার অভাবে, নিজেদের দেহরূপ দ্বারা বশীভূত করে পুরুষদের মধ্যে বিস্তার করেন। আর একবার যদি পুরুষের মধ্যে এই স্বৈরাচারী মানসিকতার প্রবেশ করে, তবে সমাজ হয়ে ওঠে স্বার্থান্বেষী ও বাণিজ্য সর্বস্ব।

তখন সমাজে সকলে সকলকে পিশে দিতেও কুণ্ঠা করেনা, নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে। সম্পূর্ণ সমাজ তখন আসুরিক হয়ে ওঠে। তাই সমাজ যাতে আসুরিক না হয়, অর্থাৎ স্বার্থান্বেষী ও স্বৈরাচারী বা বাণিজ্যসর্বস্ব অর্থাৎ লাভক্ষতির গণিতে গণিতজ্ঞ হওয়াকেই শ্রেষ্ঠত্বলাভ না মনে করে, তার কারণে স্ত্রীর প্রতি হৃদয় থেকে সম্মান আবশ্যক। আর সত্য বলতে, তাঁরা তো সত্য সত্যই সম্মানের অধিকারী ভ্রাতা। তাঁরা যে যৎপরনাস্তি ত্যাগ ও বেদনা গ্রহণ করে করে, সত্যই সম্মানের অধিকারী। আমার তো মনে হয়, তাঁদেরকে সম্মান না দেওয়া স্বয়ংই এক আসুরিকতা। কি বলো ভ্রাতা বিচার?”

বিচার বললেন, “সত্য বচন। কিন্তু আমার কাছে একটি বিষয় বোধগম্য নয়, আর তা হলো, ভ্রাতা বৈরাগ্য, কেন এই প্রসঙ্গের উত্থাপন করলেন?”

বৈরাগ্য হেসে বললেন, “তোমাদের কি মনে হয়না যে, কনো স্ত্রীকে সামাজিক ভাবে গ্রহণ না করে, তাঁর সাথে দিনের পর দিন মিলনে লিপ্ত হতে থাকা, সেটিও স্ত্রীকে অপমান করাই?”

বিবচার ও বিবেক মাথা নত করে রইলেন এই কথাতে। সেই দেখে বৈরাগ্য হেসে বললেন, “এমন অপরাধবোধ যথার্থ নয় ভ্রাতারা। যদি একে অপরাধ বলো, তাহলে তো এই অপরাধে আমিও অপরাধী। নিষ্কলঙ্কা দেবী মেধাকে সামাজিক ভাবে স্বীকৃতি প্রদান না করে, তাঁর আমার প্রতি অগাধ বিশ্বাস, সমর্পণ ও প্রেমকে দিনে পর দিন গ্রহণ করে চলেছি, অথচ তাও আমি তাঁকে সামাজিক স্বীকৃতি প্রদান করছি না! … ভ্রাতা, আমার হৃদয় এই বিচারে তমসাচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে। দিবারাত্র মনে হচ্ছে, এই ফুলের মত পবিত্র স্ত্রী, মেধাকে আমি দিনের পর দিন ঠকাচ্ছি। তাঁর বিশ্বাসের অমর্যাদা করেই চলেছি। … ভ্রাতা, আমি তোমাদের সকলকে সাক্ষী রেখে, তাঁকে আমার দ্বিতীয় মাতা, অর্থাৎ পত্নীরূপে গ্রহণ করতে চাই।

তিনি গর্ভবতী হয়ে যান, তার অঙ্গে কলঙ্ক লেগে যাক, তার পূর্বেই আমি তাঁকে সমস্ত কালঙ্কের কালিমা থেকে মুক্ত রাখতে ব্যকুল। … তাঁর বিশ্বাসের অমর্যাদা হলে, আমি নিজেকে নিজে কনো দিনও ক্ষমা করতে পারবো না। দিবারাত্র তাঁর থেকে সন্তানের ন্যায় স্নেহ ভোগ করে চলেছি, অথচ তাঁকে মাতার সম্মান প্রদান করতে আমার কুণ্ঠা কেন থাকবে? কেন তাঁকে বিবাহ করে বলতে পারবো না যে, তিনি আমাকে যেই অপরিসীম স্নেহ উপাহার দিয়েছেন, সেই স্নেহ লাভ করে, আমি ঐশ্বরিক তৃপ্তি লাভ করেছি, আর এই সমস্ত কিছুর জন্য আমি তাঁকে বারংবার ধন্যবাদ প্রদান করতে ব্যকুল!”

বিচার মাথা নত করে বললেন, “সঠিক বলতে ভ্রাতা, মেধা তো নিস্কলঙ্কা, ফুল নয়, অমৃতের ন্যায় তিনি পবিত্র। … শিখার অঙ্গে তো ইতিমধ্যেই কালিমা লাগানো হয়েছে, কারণ তিনি মোহিনীর ন্যায় কুচক্রীর জননী বলে, কারণ তিনি আত্মপুত্রদের মায়াতে বদ্ধ হয়ে তাঁদের সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছিলেন বলে। … এই সমস্ত কিছু জেনেও, ভুলে গিয়ে মিলনেই আবদ্ধ থেকে, নিজের কাছে নিজেকেই লজ্জিত পাচ্ছি আজ”।

বিবেক মাথা নত করে বললেন, “বেগবতী কখনোই আমার থেকে এই স্বীকৃতির দাবি করেনি। আর আমি জানি শিখাদিদি বা মেধা, এঁরা কেউই এই স্বীকৃতির অপেক্ষা করেন না, বিশেষ করে তখন যখন স্নেহদানের প্রসঙ্গ ওঠে। এঁরা সকলে একাকজন দাতা। দান করার কালে এঁরা স্বীকৃতিকে তোয়াক্কাও করেন না। … কিন্তু অধম তো আমরা যে, তাঁরা স্বীকৃতি চাইলেন না বলে, আমরাও সেই স্বীকৃতি দেবার প্রয়োজনই মনে করলাম না। ছি ছি, ধিক্কার দিতে ইচ্ছা করছে নিজেকে”।

বেগবতী এক নেত্র অশ্রু ধারণ করে বললেন, “এমন ভাবে নিজেকে তিরস্কার করবেন না নাথ। পুরুষ সঙ্গ আমি আর দিদি আগেও করেছি। তাই আমার সাথে দিদিও সম্মত হবেন যে, আপনাদেরকে দেখেই আমরা জেনেছি যে পুরুষও কতটা পবিত্র হতে পারে। … আপনারা আমাদের নেত্রে কনো কারণে, কখনোই অপবিত্র নন”।

দেবী শিখা আহার গ্রহণ করতে করতেই বললেন, “আমার চোখে, আমার কাছে, আমার জীবনে পবিত্রতার প্রতিমূর্তি আমার মেধা। তারপর যদি কেউ পবিত্র হন, তা আপনারা তিনভ্রাতা। … তাই নিজেদের এই ভাবে অপরাধী রূপে স্থাপিত করবেন না কৃপা করে”।

বিচার এবার বললেন, “ভ্রাতা বৈরাগ্য, একই দিনে আমরা বিবাহ করবো তিন কন্যাকে”।

দেবী শিখা ও বেগবতী একত্রে বললেন, “না!”

দেবী শিখা থামলে, বেগবতী বললেন, “আমাদের দুইজনেরই, বিশেষ করে দিদির স্বপ্ন ছিল, আমাদের মেধাকে নিজের হাতে শৃঙ্গার করিয়ে, তাঁকে বিবাহের আসরে স্থাপিত করে, তাঁর বিবাহ দেব। … তাই কৃপা করে আমাদের দুইজনের বিবাহ আগে হোক। অতঃপরে আমরা এয়োস্ত্রী হয়ে, আমাদের প্রাণের থেকেও অধিক প্রিয় ভগিনীকে নিজের হাতে শৃঙ্গার করিয়ে, তাঁর বিবাহ দিতে চাই”।

বিচার ও বিবেক এবার একত্রে বললেন, “কিন্তু ভ্রাতা বৈরাগ্য আমাদের জ্যেষ্ঠ! সেই সূত্রে মেধা আমাদের জ্যেষ্ঠা!”

শিখা এবার বললেন, “আমাদের হৃদয়ের কথাটা একবার বোঝার প্রয়াস করুন! মেধা আমাদের কাছে পবিত্রতার আধার। সে আমাদের কাছে কন্যার থেকেও অধিক কিছু। তাঁর প্রতি আমরা সমস্ত কারণে কৃতজ্ঞ। সে যে আমাদের কন্যারূপে স্থিতা, ভগিনীরূপে স্থিতা, আমাদের সখী হয়ে স্থিতা, সেই সমস্ত কারণে আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। এই বিবাহদানের ইচ্ছা আমাদের, তা সেই কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করার প্রয়াস। আমাদের অপরূপা সুন্দরী ভগিনীকে শৃঙ্গার করিয়ে, তাঁর মধ্যে নিজেদের অর্জিত সমস্ত শৃঙ্গাররসকে সঞ্চিত করে, তাঁর মিলনকে দিব্যতার আশীর্বাদ করা, আমাদের কাছে পরম সৌভাগ্য”।

বৈরাগ্য হেসে বললেন, “দেবী, যেখানেই কিছু নিঃস্বার্থ ও নিঃশর্ত ভাবে দেবার ব্যকুলতা, সেখানেই পবিত্রতা। আর আমরা মাতার বপন করা তিন বীজ থেকে উৎপন্ন বৃক্ষস্বরূপ। পবিত্রতার বিরোধিতা আমরা কি করেই বা করতে পারি! … অবশ্যই আপনারা এয়োস্ত্রী হয়ে আপনাদের ভগিনীর সুহাগ রূপে আমাকে তাঁর কাছে দান করবেন। … আমি কথা দিচ্ছি দেবী, আপনাদের আশীর্বাদে স্নাত হয়ে যতক্ষণ না মেধা আপমাদের প্রদত্ত শৃঙ্গার রসে পরিপূর্ণ হচ্ছে, ততক্ষণ আমি তাঁর নিকটেও যাবো না। আপনারা তাঁকে আমার কাছে, আমার কবচ করে দান করলে, তবেই আমি তাঁর কাছে নিজেকে অর্পণ করবো”।

বিবাহ সম্পন্ন হলো তিন ভ্রাতার, ও একটি বৎসর পর, মেধা, শিখা ও বেগবতী তিনজনেই অন্তঃসত্ত্বা হলে, শিখা বিচারের ঔরস ধারণ করে জিজ্ঞাসারূপী এক কন্যার ও বিশ্বাস রূপী এক পুত্রের জন্ম দিলেন। বেগবতী বিবেকের ঔরস ধারণ করে স্নেহা রূপী ও মমতা রূপী দুই কন্যার জন্ম দিলেন, আর মেধা এক দিব্য কন্যা, সমর্পিতার জন্ম দিলেন।

দিব্যতা এই এক পুত্র ও চার কন্যার মধ্যেই প্রস্ফুটিত ছিল। আর এঁরা সকলেই মেধা, শিখা ও বেগবতীর মমতার আচ্ছাদনে, ও বৈরাগ্য, বিচার ও বিবেকের মার্গদর্শনে পিঙ্গলার মধ্যে স্থিত হয়ে ক্রমশ শৈশব ত্যাগ করে কৈশোরে স্থিত হলেন।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22