৪.২। জাগরণ পর্ব
যখন মূর্ছা ত্যাগ হলো, তখন সকলে একপ্রকার ধরমরিয়ে উঠে বসলেন, আর মেধার সন্ধান করতে থাকলেন আশেপাশে। কেবলই তিন বিশাল বৃক্ষের পতিত রূপ তাঁদের ঘিরে ছিল। তাই নিজেদের জখম নিয়ে, সেই বনলতার ভেদ অতিক্রম করতে তাঁদের বেশ কিছুক্ষণ সময় অতিবাহিত হয়। যখন তাঁরা সমস্ত বনলতার বেষ্টন কাটিয়ে মুক্ত হলেন, তখন দেখলেন, দূরে তিন বিশালাকায় মানবীয় মূর্তি, একটি একটি করে কন্যার হাত ধরে পলায়ন করছেন কোথাও।
বুঝতে অসুবিধা হলো না তাঁদের যে, সেই তিন বিশালাকায় মানবীয়মূর্তি এই তিন বৃক্ষেরই সত্ত্বা, আর তাঁদের হাত ধরে থাকা তিন কন্যা হলেন শিখা, বেগবতী ও মেধা। তাই দ্রুতপদে পশ্চাৎগমন করলেন সকলে। কিন্তু বেশিদূর যেতে হলো না, তার আগেই দেখলেন, সাগরের মাঝে কোথাও তাঁরা বিলীন হয়ে গেলেন।
দ্রুতপদে সেখানে উপস্থিত হলেন অহমপুত্র ও অষ্টপাশগন। কিন্তু এই অদৃশ্য গুহ্যদ্বার তাঁরা ভেদ করতে পারলেন না। অষ্টপাশরা বললেন, “রাজপুত্ররা, আর যে এই সাগরের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছেনা। আর অধিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে, নির্ঘাত আমরা সাগরে ডুবে প্রাণ হারাবো। এই দ্বার আমরা ভেদ করতে পারবো না। আমাদের মাতার থেকে শুনেছি যে, ঠিক এই স্থান থেকে মাতা ব্রহ্মময়ী উদিত হয়েছিলেন, দেবী চন্দ্রপ্রভার সম্মুখে উপস্থিত হয়েছিলেন, এবং তাঁর অঙ্গনে তিন বৃক্ষরোপণ করেছিলেন। আর আমাদের ধারণা যে, এই দ্বারের ওপারে, আমাদের প্রবেশ অসম্ভব। এই দ্বার কেবল মাতা ব্রহ্মময়ী ও তাঁর শরণাগতদের জন্যই প্রবেশযোগ্য। আমরা তাঁর শরণার্থী নই, তাই আমাদের প্রবেশ সম্ভব নয় এখান দিয়ে”।
রজনী বললেন, “এর অর্থ, আজকে যেই ঘটনা ঘটবে, তার কি সম্পূর্ণ ধারণা ছিল মাতা ব্রহ্মময়ীর কাছে! … সেই কারণেই কি তিনি এই দ্বার দিয়ে প্রবেশ করেছিলেন চন্দ্রপুরে! আমরাও শুনেছি যে, যখন সমস্ত চন্দ্রপুর অধিবাসী সম্মুখে পাহারের দিকে চোখ রেখে বসে ছিলেন যে মাতা ব্রহ্মময়ী সেখান দিয়ে প্রবেশ করবেন, তখন তিনি এই সাগর পেরিয়ে এসেছিলেন, আর দেবী চন্দ্রপ্রভাকে তিন বৃক্ষ উপহার দিয়েছিলেন।
আর সেই তিন বৃক্ষই আজ আমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করে, সেই একই দ্বার দ্বারা প্রবেশ করে গেলেন, আর আমাদের কাছে মেধা, শিখা ও বেগবতীর কাছে উপস্থিত হওয়ার সমস্ত পথ বন্ধ করে দিলেন। … এই দ্বারের গুহ্যতত্ত্ব উদ্ধার করতেই হবে আমাদেরকে। কিন্তু কি করে?”
তামস বললেন, “ভ্রাতা, আমার মনে হয়, এই দ্বারের আরেকটি প্রান্ত আছে। থাকতেই হবে। সেই প্রান্ত দিয়ে মাতা ব্রহ্মময়ী প্রবেশ করেছিলেন, আর এই প্রান্ত দিয়ে তিনি বাইরে এসেছিলেন। একবার যদি আমরা সেই প্রান্তকে লাভ করে ফেলতে পারি, তাহলে নিশ্চিত ভাবে আমাদের এই দ্বার দিয়ে প্রবেশের প্রয়োজনই পড়বে না। আমরা অনায়সেই এই দ্বারের অন্যদিক দিয়ে প্রবেশ করে, মেধা, শিখা বা বেগবতীকে হনন করে নিতে পারবো”।
প্রভাত বললেন, “কিন্তু সেই দ্বার আমরা পাবো কি করে?”
রজনী বললেন, “আমাদের পিতা বলতে পারেন। কারণ এটা তো নিশ্চিত যে, এই দ্বারের দ্বিতীয় প্রান্ত আমাদের রাজ্যতেই রয়েছে। … চলো ভ্রাতারা, পিতার কাছে যাই, আর সম্যক বিবরণ তাঁদের প্রদান করি”।
রাজ্যে প্রবেশ করে, যেখানে মহারাজ আত্ম বিরাজ করছিলেন তাঁর রানীদের নিয়ে সেখানে গমন করলেন তিন অহমপুত্র। … সেখানে প্রবেশ করতে মহারাজ আত্ম মৃদু হেসে বললেন, “তোমাদের জননীদের কথা শুনে লাভ হলো না পুত্ররা! মেধাদের বশ করতে পারলেনা!”
পিতা সমস্ত কিছু জানেন দেখে, আত্মপুত্রদের মধ্যে যেই সামান্য কুণ্ঠা ছিল, এই বিষয়ে কথা বলার, তাও কেটে গেল। প্রভাত বললেন, “পিতা, যেই গুহ্যদ্বার ধারণ করে, মাতা ব্রহ্মময়ী চন্দ্রপুরে প্রবেশ করে ত্রিবৃক্ষরোপণ করেছিলেন, সেই দ্বার দিয়েই ত্রিবৃক্ষ মানবীয় দেহ ধারণ করে মেধা, শিখা ও বেগবতীকে নিয়ে পলায়ন করেছেন”।
রজনী এবার নিজের কূটনৈতিক চালে বললেন, “পিতা, বড় কথা এটা নয় যে, ত্রিবৃক্ষ মানবীয় দেহ ধারণ করেছেন, বড় কথা এটা যে, সেই গুহ্য দ্বারের আরো একটা প্রান্ত আছে নিশ্চিত ভাবে। অর্থাৎ মাতা ব্রহ্মময়ী এখানে এই রাজপুরের মধ্য হতে সেই দ্বারে প্রবেশ করেছিলেন, আর সেই গুহ্যদ্বার থেকে মুক্ত হয়েছিলেন।
হ্যাঁ পিতা, আমরা সেই গুহ্যদ্বার ভেদ করতে পারলাম না ঠিকই, কিন্তু একবার যদি সেই দ্বারের অপর প্রান্ত খুঁজে পেয়ে যাই, তাহলে আমরা অনায়সেই প্রবেশ করতে পারবো সেই দ্বার দিয়ে, আর পৌঁছে যেতে পারবো মেধাদের কাছে”।
তামস নিজের উগ্রস্বভাব নিয়েই বললেন, “আর একবার তাঁদের কাছে পৌঁছে গেলে, ত্রিবৃক্ষ মানব দেহ ধারণ করুক আর না করুক, তাতে আমাদের কিচ্ছু এসে যায়না”।
পরমাত্ম পরমহাস্য প্রদান করে বললেন, “তোমরা জানো পুত্ররা, সেই ত্রিবৃক্ষ, যাদের কথা তোমরা বলছো, তাঁরা মাতা ব্রহ্মময়ীর বপন করা বীজের পরিণাম! … খেয়াল পরে, তোমাদের মাতারা তোমাদের কি বলেছিলেন, তাঁদের ব্যাপারে! … কি বলেছিলেন তোমাদের তাঁরা! একবার সেই বৃক্ষরা সম্মুখে প্রকাশিত হলে, তাঁদেরকে বার্তা প্রদান করতে!”
রজনী বললেন, “এর অর্থ কি আমরা এই ধরে নেব যে, আমরা সেই তিনবৃক্ষকে পরাস্ত করতে পারবো না!”
অহম পরমহাস্য প্রদান করে বললেন, “পুত্ররা, মিথ্যা এই জগত, যাকে সত্য রূপে প্রতিপন্ন করে, আমরা সেখানে রাজত্ব বিস্তার করতে ব্যস্ত, সেই মিথ্যা জগতে সত্য যখন নিজকে প্রকাশিত করেন, তাঁর নাম হলেন মাতা ব্রহ্মময়ী। তাঁর অঙ্গজাত যারা যারা হন, তাঁরা তাঁরা এমনই বলে বলিয়ান হন যে, তাঁদেরকে বাকিরা স্পর্শ করার সামর্থ্যও ধরে না। কিন্তু এই অঙ্গজাতদের মধ্যেও ভেদ আছে। কিছুজনকে মাতা ব্রহ্মময়ী সাগ্রহে জন্মদান করেন, আর কিছুজন তাঁর আগ্রহ বিনাই নিজদের প্রকাশিত করেন।
এই যেমন ধরো আমি বা তোমাদের মাতারা, আমরা সকলে মাতার অঙ্গজাতই, কিন্তু আমাদের তিনি আগ্রহ দ্বারা প্রকাশ করেন নি। আবার ধর চন্দ্রনাথ, সূর্যনাথ, চন্দ্রপ্রভা, এঁদেরকেও মাতা স্বেচ্ছায় অঙ্গজাত হতে দেন নি, তবে এঁদের প্রকাশে মাতা প্রফুল্লিত হন, অর্থাৎ এঁরা মাতার কাছে বিশেষ। কিন্তু এই ধর মানস, মাতার অঙ্গজাত সে, আর মাতার প্রিয়ও, তাই সে অত্যন্ত বলশালী।
মানসের সামর্থ্য আছে আমাকে পরাস্ত করারও। কিন্তু তাঁর স্বভাবের কারণে সে দুর্বল, তাই সে আমার সম্মুখীন হতেও ভীত। তেমনই মাতার অঙ্গজাত এবং যাদের জন্মদান করাতে মাতার বিশেষ আগ্রহ ছিল, তাঁরা হলেন এই তিনবৃক্ষ। তাই এই তিনবৃক্ষকে তোমরা স্পর্শ করার সামর্থ্যও ধরো না। তাঁদের সম্মুখীন হবার সামর্থ্য তোমাদের মাতার আছে।
আর যদি আমার কথা বলো, তাহলে আমি যতটা না বলশালী ছিলাম, তার থেকে অধিক বলশালী করে নিজেকে স্থাপিত করেছি। নিজের অন্তরে থাকা সমস্ত পঞ্চভূতকে আমি বশ করে নিয়ে, তাদের থেকে অসংখ্য জীবের নির্মাণ করে শক্তিশালী হয়েছি। তাই আমার সম্মুখীন হবার সামর্থ্য আজকে কারুর নেই, না এই ত্রিবৃক্ষের, না তোমাদের মাতাদের আর না মানসের। আমি আজ সর্বশক্তিমান। আমাকে যদি পরাস্ত করতেই হয়, তাহলে স্বয়ং মাতা ব্রহ্মময়ীকে দেহধারণ করে আসতে হবে”।
রজনী বললেন, “তাহলে কি পিতা, সেই গুহ্যদ্বারের অনুসন্ধান করা অর্থহীন! … আমরা কি দিশাভ্রষ্ট হচ্ছি, তার সন্ধান করার প্রয়াসে!”
আত্ম বললেন, “না পুত্ররা, সেই দ্বার সন্ধান করা অতি আবশ্যক, কিন্তু যদি তোমাদের এই ভাবনা থাকে যে, তোমরা স্বয়ং সেই দ্বার দিয়ে প্রবেশ করে, ত্রিবৃক্ষকে পরাস্ত করে আসতে পারবে, তা এক দিবাস্বপ্ন মাত্র। সেই দ্বারের সন্ধান করো, আর তোমাদের মাতাদের সেখানে নিয়ে যাও। ত্রিবৃক্ষকে প্রথমেই আটকানো না গেলে, তাঁদের বীর্যের সামর্থ্য আছে মাতাকে পুনরায় দেহ প্রদান করানোর, আর মানসপুত্রী, বিশেষ করে মেধার মধ্যে সামর্থ্য আছে, সেই বীর্য ধারণ করার, ও স্বয়ং মাতাকে দেহ প্রদান করার”
পিতার থেকে অনুমতি লাভ করে, সর্বত্র তন্যতন্য করে অনুসন্ধান করতে থাকলেন সেই গুহ্যদ্বারের অপর প্রান্ত, কিন্তু কিছুতেই তা খুঁজে পেলেন না। বহুপ্রয়াসেও না খুঁজে পেলে, দেবী কল্পনা বহুপ্রকার তত্ত্ব সম্মুখে উপস্থিত করলে, মহারাজ আত্ম বিরক্ত হয়ে বললেন, “দেবী, আপনার তত্ত্ব এখানে কনো কাজের নয়। এটা আমাদের কল্পজগত নয় যে, আপনি নিজের তত্ত্ব স্থাপন করে, এক নূতন ধারার নির্মাণ করে দেবেন। এটা বাস্তব, এখানে কল্পনার কনো কাজ নেই”।
দেবী কল্পনা এই কথাতে চটে গিয়ে মহারাজকে বললেন, “এ আপনি কি বলছেন মহারাজ, আমার কারণেই আপনার এই বিশাল সাম্রাজ্য, আর আজ আমাকেই আপনি এমন কথা বলছনে!”
মহারাজ আত্ম পুনরায় হুংকার দিয়ে বললেন, “এ ব্যাপারে কনো সন্দেহ নেই যে, আপনাদের তিনজনের কারণেই, এই বিশাল সাম্রাজ্য। কিন্তু এই রাজ্য গঠনের জন্য, বাস্তবকে নয়, কল্পনাকে ব্যবহার করা হয়েছে, আর সেই কল্পনাতে সমস্ত আমার ভূতদের বশীভূত করে করে, তাদেরকে সেই কল্পনাকেই সত্য বলে মানতে বাধ্য করা হয়েছে। আর তবেই তাদেরকে প্রভাত বিপুল সংখ্যায় পরিণত করতে পেরেছে, আর আমাদের এই বিশাল সাম্রাজ্যের গঠন হয়েছে।
দেবী, আমার কথার অর্থ বোঝার প্রয়াস করুন। এই রাজ্য আমাদের প্রাপ্ত নয়, আমাদের গঠিত। কিন্তু এখন যা অনুসন্ধান করছি আমরা, তা আমাদের দ্বারা নির্মিত বা গঠিত হওয়া সম্ভব নয়, তা পূর্বস্থিত, আর তা আমাদেরকে লব্ধ করতে হবে। অর্থাৎ এখানে কল্পনার কনো স্থানই নেই। সত্যলাভের জন্য প্রয়জন মন্থনের, মন্থন করুন আপনারা। তবেই সত্যলাভ হবে”।
দেবী চিন্তা বিকৃত ভাবে হেসে বললেন, “মহারাজ, মন্থন করার জন্য বিচারের প্রয়োজন, আর প্রয়োজন মেধার। মেধা করে মন্থন বিচারের সাহায্যে, বিবেক হন সেই মন্থন কর্মের থেকে উপলব্ধ মর্মার্থের বন্ধন আর প্রাণ হয় সেই বন্ধনের রজ্জু, আর বৈরাগ্য হয় সেই মন্থন কর্মের রক্ষক এবং অগ্নি সেই রক্ষণের অস্ত্র হন। কিন্তু মজার কথা এই যে, এঁরা সকলেই আমাদের শত্রুপক্ষ, আর এরা সকলেই আমাদের অধরা”।
আত্ম বললেন, “চিন্তার বিষয় তো সেটিই দেবী। বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্য, মাতার তিনগুণ তিনবৃক্ষরূপে বিরাজ করছিল, তা আমাদের ধারণারও অতীত ছিল, আর এখন তো তাঁরা মেধা, শিখা আর বেগবতীর সাথে সংযুক্ত হয়ে গেছে। মেধার সাথে তাঁদের সুসম্পর্ক পূর্ব থেকেই আছে, আর মেধার দৌলতে, মেধার কাছে মাতাসমান তাঁর দুই ভগিনীর সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন কেবলই সময়ের অপেক্ষা। আর একবার তা হয়ে গেলে, তাঁরা সকলে মিলে সত্যকে মন্থন করে সত্যকে নির্ধারণ করেই নেবেন”।
দেবী চিন্তা ভাবিত হয়ে বললেন, “আর মাতা ব্রহ্মময়ীই হলেন সেই সত্য, অর্থাৎ তিনি পুনরায় প্রকাশিত হয়েই যাবেন। এই তো আপনার দুশ্চিন্তা!”
দেবী ইচ্ছা ক্রীড়াচ্ছলে বললেন, “কিন্তু এতে দুশ্চিন্তার কি আছে মহারাজ! আমরা পূর্বেও তাঁকে দেহছাড়া করেছিলাম, আবারও করবো”।
মহারাজ আত্ম হেসে বললেন, “এখনো তাঁর লীলা বুঝলে না দেবীরা। … তাঁর লীলার গুহ্য অর্থই ছিল, অসত্যের থেকে সত্যের উদ্ঘাটন করার প্রক্রিয়া স্থাপন, আর এই ভাবে অসত্য থেকে সত্যে যাত্রার বিবরণ বা মানচিত্র প্রদান করা। … তিনি সত্য, সত্যের কখনো ক্ষয় হয় কি! … মাতা ব্রহ্মময়ীরও ক্ষয় হয়নি। তিনি কেবলই অসত্যের বিস্তারকে প্রত্যক্ষ করানোর জন্য, দেহত্যাগ করলেন। আমরা বিকশিত হলাম, অসত্যের বিকাশ হলো। আর এরই নেপথ্যে তিনি সম্পূর্ণ মানচিত্র প্রদান করা শুরু করলেন যাতে যেকেউ অসত্য থেকে সত্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে পারেন।
তিনি এর মধ্যেই বিবরণ প্রদান করে দিয়েছেন যা তা হলো পঞ্চভূতের নিজেদের মধ্যে বিরাজ করা সম্পর্কের বিজ্ঞান। আর এবার তিনি সেই ভূত ও তাঁর তিনবীজ অর্থাৎ বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্যরা মিলে কি ভাবে সত্যের অর্থাৎ তাঁর মন্থন করে, তার বিবরণ প্রদান করা সম্ভব, তা দেখাচ্ছেন”।
দেবী কল্পনা এবার উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “এর অর্থ এই যে, এই বিনাশ লীলার তো সমাপন হবে আমাদের বিনাশের সাথে! … মহারাজ আপনি কিচু করছেন না কেন! … কেন আপনি ভ্রমের রচনা করছেন না এই মানচিত্রে! তেমন করলে তো মানচিত্রটি যারা পাঠন করবে, তারা ভ্রমিত হয়ে যাবে!”
মহারাজ আত্ম বিমর্ষ হয়ে বললেন, “সমস্যা তো ঠিক এইখানেই দেবী! … মাতাও চান যে আমরা এই ভ্রমের রচনা করি, যাতে করে যেই সাধক এই মানচিত্র দেখবেন, তিনিও জানতে পারেন যে আমরা ঠিক কি কি ভ্রমের রচনা করে থাকি”।
দেবী চিন্তা বললেন, “তাহলে এক কাজ করুন মহারাজ, ভ্রমের বিস্তার করাই বন্ধ করে দিন!”
দেবী ইচ্ছা বিরোধ করে বললেন, “তা কি করে সম্ভব! আমাদের সামর্থ্য যা কিছু, তা তো আমরা ভ্রমের বিস্তারের কারণেই লাভ করেছি। ভ্রম বিস্তার যদি বন্ধ করে দিই, তাহলে যে আমরা আমাদের সমস্ত সামর্থ্যই হারিয়ে ফেলবো!”
দেবী চিন্তা উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “এর অর্থ মহারাজ, নামেই আমরা ভ্রমের বিস্তার করছি! যা কিছু আমরা করছি, তা মাতার অঙ্গুলিহেলনেই হচ্ছে! এর অর্থ তো পরিণামও তাই হবে, যা তিনি নির্দেশিত করবেন!”
মহারাজ আত্ম চিন্তিত হয়ে বললেন, “হ্যাঁ, ঠিক তাই। যখন মাতার ত্রিগুণদের আমরা আটকাতে পারিনি, এর অর্থ এই যে মাতার জন্মও আমরা আটকাতে পারবো না। এবার কথা এই যে, মাতা যদি নিজের স্বরূপকে জেনে ফেলতে সক্ষম হন, তাহলে আমাদের পক্ষে আর কিচ্ছুই করা সম্ভব হবেনা। হ্যাঁ সংগ্রাম আমরা করবো, প্রয়োজনে যুদ্ধও করবো। কিন্তু সেই যুদ্ধের পরিণাম আমাদের সকলের জ্ঞাত”।
দেবী চিন্তা বললেন, “একটিই উপায় দেব। … মাতার যখন জাত হবেন, তিনি সত্যের জ্ঞাতা থাকবেন না। তাঁর সত্যজ্ঞাতা হবার পূর্বে, আমাদের এমন কিছু করতে হবে, যার কারণে মাতা সত্যজ্ঞান লাভই করতে না পারেন”।
আত্ম বললেন, “সঠিক কথা। কিন্তু তার কারণে আমাদেরকে এই গুহ্যদ্বার ভেদ করতেই হবে। নাহলে এমনই সময় আসন্ন হয়ে যাবে, যেখানে মাতা সত্যের জ্ঞাতা হয়েই উঠবেন। তখন আমাদের আর কিছুই করনীয় থাকবেনা”।
একদিকে যখন ছায়াপুরের রাজপুরে এমন সমস্ত গুহ্য আলোচনা চলছিল, তখন গুহ্যদ্বারের অপর দিকে, আলাপে রত ছিলেন মেধারা কাদের সাথে? মাতারই তিন গুনের সাথে। মেধা তাঁদের প্রতি প্রথম থেকেই মোহিত। তাঁরা যখন বৃক্ষরূপে ছিলেন, তখন সদা তৎপর থাকতেন তিনি এঁদের সেবার জন্য। তাই মাতার ত্রিগুণও মেধার প্রতি আকৃষ্ট।
এঁদের মধ্যে বিচার মেধার কাছে গিয়ে বললেন, “সখী, তুমি তো আমাকে সর্বদা সখার বেশেই দেখেছ। আচ্ছা আমাকে বলো, সখাকেও কি কেউ এমন ভাবে সেবা করে?”
মেধা হেসে বললেন, “সখা বিচার, তুমি আমার ক্রীড়াসঙ্গী ছিলে আমার ছেলেবেলায়। আমার স্পষ্ট মনে আছে। চারিপাশে কনো বাতাস নেই, কিন্তু তুমি নিজে থেকেই হেলে হেলে আমাকে পুষ্পে স্নান করাতে। আমি তোমার সাথে ক্রীড়া করতাম। কখনো তার জন্য তোমাকে আলিঙ্গনও করতাম, আবার যখন তোমার আচ্ছাদনে লুকিয়ে থাকা সত্ত্বেও দিদিরা আমাকে ধরে ফেলতো, তখন তোমার উপর ক্রোধও হতো, আর তাতে তোমাকে পদাঘাতও করতাম। আচ্ছা বলো তো সখা, মাতা ও মিত্র বিনা, এমন স্নেহ ও অত্যাচার আর কেই বা সহ্য করতে পারে!
তোমারও অভিমান হতো, আমি যখন তোমাকে পদাঘাত করতাম। সেইদিন তুমি একটিবারও দুলতে না, বাতাস দিলেও দুলতে না। কিন্তু পরের দিন প্রভাতে, আবারও দুলতে, আর আবারও আমার সাথে খেলতে। আচ্ছা বলো তো, এই অভিমান হওয়া আর নিজের থেকেই অভিমান ভেঙে যাওয়া, এ তো দুই মিত্রের মধ্যেই একমাত্র হয়, তাই না!
ক্ষুদে বয়সে এত কিছু তো বুঝতাম না ভাই। কিন্তু যতই বড় হলাম ততই আমার তোমার সাথে সম্বন্ধকে উদ্ধার করলাম। তারপর আমরা দুইজন মিলে কত প্রকার ক্রীড়াই না করেছি। শিখাদিদি আমাকে খুঁজতে আসতেন, আর তুমি আমাকে লুকিয়ে নিতে”।
শিখা বললেন, “আর শিখা যখনই তাঁকে স্পর্শ করতো, সে অনায়সে পুষ্প বর্ষা করতো। বৃষ্টির জল ধরে রেখে দিতো নিজের পাতায় পাতায়। সেই জল ছিটিয়ে দিত শিখার উপর, আর এমন ভাবেই তা ছেটাতো, যে তা শিখার সমস্ত যৌনভাবকে স্পর্শ করে, তাঁকে উত্তেজিত করতো”।
শিখা মৃদু হেসে বললেন, “তোমার আমার প্রতি আকর্ষণ আমি যে বুঝতাম না তা নয়। ক্রমশ তোমার প্রতি আকৃষ্টও হচ্ছিলাম, সেই ক্ষণে ওই মায়াবী গুলো এসে, আমাদেরকে … (ক্রুদ্ধ আস্ফালন)”
বিচার শিখার স্কন্ধ স্পর্শ করে মৃদু হাসলে শিখা বললেন, “আজ আমি অপবিত্র নাথ! … আজ আমার মধ্যে ব্যকুলতা ক্রিয়া করছে যে, আমি আপনার কাছে নিজেকে অর্পণ করে দিই। কিন্তু আমার অপবিত্রতার ভান আমাকে আটকে রাখছে নিজেকে অর্পণ করতে। মাতার অঙ্গজাত আপনারা সকলে। কি করে! না না, আমাদের অপবিত্রতার ভার আপনাদের উপর কি করে অর্পণ করি।
এই অপবিত্রতার কারণে, আমাদের কন্যাসম ভগিনীর সাথে আমরা অন্যায় করেছি। যাকে বুকে আগলে রাখার প্রয়োজন ছিল, যার মস্তক বক্ষস্থলে স্থাপিত হলে, নিজেদের সম্পন্ন বোধ হতো, তাঁকে আমরা দূরে সরিয়ে রাখলাম! … আমরা তো অতি সৌভাগ্যশালী। বিবাহ না করেও, সন্তানের জন্ম না দিয়েও আমরা সন্তানের জননী ছিলাম। মেধা ছিল আমাদের সেই সন্তান, যে আমাদের কখনো মাতাভিন্ন অন্য কিছু জ্ঞানই করেনি। কিন্তু সেই মায়া! … হা”।
মেধা নিজের প্রিয় ভগিনীকে শান্ত করতে তাঁর স্কন্ধে হাত রাখতে গেলে দেখলেন বিচার তাঁর স্কন্ধে হাত রেখেছেন, আর বলছেন, “দেবী, আপনি বলছেন, আপনার ভগিনীর ন্যায় স্নিগ্ধা ও পবিত্রা আপনি একজনকেও দেখেন নি, এমনকি আপনার জননীও ততটা পবিত্র নয়, যতটা আপনার ভগিনী।
এরপরেও, আপনি এমন ভাবছেন কি করে যে, আপনার এমন ভগিনীর স্পর্শ লাভ করেও, তাঁর আলিঙ্গন লাভ করেও, আপনার অপবিত্রতার নাশ হয়নি! … আপনার ভগিনীর প্রতি আপনার সমর্পণই তো, আপনাদের পবিত্র করে তুলেছে পুনরায়। আর তার প্রমাণও আপনি পেয়েছেন। পবিত্র না হলে কেউ কি নিজের জন্ম দেওয়া সন্তানেরই বিরোধ করে!”
দেবী শিখা এবার সাহস করে বিচারের বক্ষস্থলকে স্পর্শ করতে চাইলে, তিনি তা স্পর্শ করতে সক্ষম হলেন, আর তাই নিজের অন্তরেই আনন্দিত হয়ে বললেন, “আমার মেধার জন্য, আমি আবার পবিত্র হয়ে গেছি নাথ! … আবার পবিত্র হয়ে গেছি! আমি আবারও মাতার আরাধনার সামগ্রী হবার যোগ্য হয়ে গেছি। আমাদের মাতার থেকে আর আমাকে দূরে থাকতে হবেনা! … নাথ! … মেধা!”
তাকিয়ে দেখলেন মেধা সেই চত্বরে নেই। মেধা দেখলেন, তাঁর প্রিয় ভগিনী পবিত্রতার পুলকে পুলকিত হয়েছেন। পুনরায় স্বার্থ ত্যাগ করে, নিঃস্বার্থ হয়ে উঠে পবিত্র হয়েছেন, আর তাই তিনি চাইলেন যে এই পবিত্রতা যেন তাঁর ভগিনীর থেকে আর কখনো না চলে যায়। এই পবিত্রতা যেন, তাঁর ভগিনীকে সম্পন্নতা প্রদান করে বিচারের সাথে মিলনের মাধ্যমে। তাই আনন্দিত হয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করেছেন”।
শিখা মেধাকে দেখতে না পেয়ে, বিচারের দিকে শিশুর ন্যায় দৃষ্টি রেখে বললেন, “মেধা কেন প্রশংসার ধাত ধারেনা! … আজ আমি যা কিছু, তার জন্য এক ও একমাত্র তারই হাত রয়েছে। আজ ইচ্ছা করছে, তাকে বক্ষের মাঝে আলিঙ্গন করে রেখে বলতে যে সে থাকতে আমি কিছুতেই নিঃসন্তান নই। আজ বলতে চাইছি যে, আমার কনো ক্ষেদ নেই যে, আমি আমার স্বার্থসর্বস্ব সন্তানদের ত্যাগ করে এসেছি, কারণ আমার প্রিয় সন্তান আমার বক্ষ আলোকিত করে রয়েছে”।
বিচার মৃদু হাস্য হেসে বললেন, “আপনার ভগিনী আমার পরমসখী। তাঁর মধ্যে এত স্বার্থ ভাব কবে ছিল দেবী যে সে নিজের প্রশংসা শ্রবণ করবে! … সে তাঁর প্রিয় ভগিনীকে পবিত্রতার সুখে প্লাবিত হতে দেখেই প্রফুল্লিত। ধন্য হয়েছি, তাঁকে সখী বেশে লাভ করে। তাই বেশ বুঝতে পারছি, আপনি কতটা ধন্য হয়েছেন, কারণ আপনি তো তাঁকে ভগিনী তথা সন্তান দুই ভাবেই লাভ করেছেন”।
শিখার মুখ দিয়ে আর কথা সরলো না। সে ক্রমশ বিচারের যেই বক্ষস্থলকে স্পর্শ করে রেখেছিলেন, সেই বক্ষতলেই নিজের মস্তককে স্থাপিত করে, আনন্দিত ও রোমাঞ্চিত হয়ে বলতে থাকলেন, “নাথ, আমি সত্য বলছি না! আপনি সমস্ত বৃষ্টির জল ধরে রেখে দিতেন, আমার অঙ্গে তা বর্ষণ করবেন বলে!”
বিচার হেসে বললেন, “কি বলি দেবী! … যেমন মেধার সান্নিধ্য আমাকে কর্মচঞ্চল করে দেয়, তেমন আপনার সান্নিধ্য আমাকে কর্মবিমুখ করে দেয়। আর যেন অন্য কিছু দেখতেও ইচ্ছা করেনা। মনে হয় যেন, আপনাতেই নিজেকে নিমজ্জিত করে দিই!”
শিখা হেসে বললেন, “নাথ, এখন কি আর তা সম্ভব! … মায়ায় আবদ্ধ হয়ে কামগন্ধে দীর্ঘকাল মেতে ছিলাম আমি। বড় ইচ্ছা করে, কামগন্ধ ত্যাগ করে, নিজেকে বিসর্জন করে দেবার ভাব নিয়ে মিলনে আবদ্ধ হতে। সেই সৌভাগ্য কি আমার জন্য যথার্থ!”
বিচার হেসে বললেন, “আপনার ভগিনীও সেই কারণেই, এখান থেকে প্রস্থান করেছিলেন”। শিখা হেসে বললেন, “না না, মেধা শিশু, ও এইসব মিলনের ব্যপারে তেমন কিছু বোঝে না!”
বিচার পুনরায় হেসে বললেন, “সত্যই সে আপনার কন্যাসমা। এক মাতাই তো নিজের যুবতী সন্তানকেও শিশু ভাবতে পারেন, আর কেউ কি পারেন!”
শিখা পুনরায় হেসে বললেন, “এর মানে মেধাও কি মিলনের জন্য প্রস্তুত! … নাথ, সে আমাদের মিলনের জন্য এত আত্মত্যাগ করলো, সে কি মিলনসুখ পাবে না! … ও কি এই পরমসুখের যোগ্য নয়!”
বিচার শিখাকে অধিক স্নেহে বক্ষে আলিঙ্গন করে বললেন, “আমার ও বিবেকের প্রতি মেধার ভাব সম্পূর্ণ ভাবে সখ্যতা পূর্ণ। অবশ্যই তাঁর ন্যায় পবিত্র আধারের সখ্যতা লাভ করেও আমরা আপ্লুত। কিন্তু ওর মিলনভাব বৈরাগ্যের প্রতি। তাই তাঁদের মিলনপর্ব অবশ্যই অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু তার পূর্বে, আপনাকে লাভ করার আনন্দে আমাকে অবগহন করতে দিন। আপনাকে সেই কিশোরী অবস্থা থেকে স্নান করিয়ে করিয়ে, আপনার প্রতি মিলনভাব ব্যক্ত করেছি, আজও তার পুরস্কার লব্ধ হবেনা দেবী!”
শিখা আর বার্তাতে মনোনিয়োগ করলেন না, নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে নিমজ্জিত করলেন বিচারে, এবং বিচারও তাঁর প্রিয়ার আলিঙ্গনের উষ্ণতা লাভ করে, নিজেকে অর্পণ করলেন তাঁর উষ্মায়।
মেধা অনেকক্ষণই সেখান থেকে প্রস্থান করেছিল দেবী বেগবতীর উদ্দেশ্যে, যিনি তখন বিবেকের নিকটে ছিলেন। বিবেকের সাথে মেধার সম্পর্ক অতি মধুর। মেধা সেখানে উপস্থিত হতেই, বেগবতীর সাথে আলাপরত বিবেক মেধার দিকে তাকিয়ে একমুখ হেসে বললেন, “মেধা, তোমাকে যে কি ভাবে ধন্যবাদ দিই, আমি তা বুঝেই উঠতে পারছিনা। …
সত্য বলতে মানবীয় শরীরে আসার প্রেরণা তুমিই দিয়েছিলে আমাদের। আমরা তো বৃক্ষ হয়েই অবস্থান করার ভাবনায় ছিলাম। কিন্তু দিবারাত্র আমাদেরকে তুমি আমাদের মানবীয় শরীরে উপস্থিত হওয়া কতটা আবশ্যক, সেই বিষয়ে বলতে থাকতে। আর দেখো, আজ আমরা মানবীয় বেশে, তোমার সম্মুখে উপস্থিত। মেধা, তুমি আমার কাছে জ্যেষ্ঠা। তাই আদেশ দাও, আমার করনীয় কি, সেই ব্যাপারে বলে দাও আমায়”।
মেধা মৃদু হেসে বললেন, “বিবেক, তুমি আমার সর্বকালই স্নেহের ভ্রাতা ছিলে। যখন শিশু ছিলাম, তখন তোমাকে অনেক গবাদি পশুই আহার রূপে গ্রহণ করতে আসতো, তাই তোমাকে নিজের আঁচল দিয়ে আড়াল করে রাখতাম, যাতে তোমাকে আহার রূপে কেউ গ্রহণ করতে না পারে। … আজ যখন তোমাকে সুরক্ষিত দেখতাম, তখন একটিই খেয়াল আসতো আমার, আমার ভাই সুরক্ষিত।
পুত্রসমান তুমি আমার কাছে, আর তাই পুত্রকে সকুশল দেখে মাতার যেমন আনন্দ হয়, আমারও অনুরূপ প্রতিক্রিয়া আসে তোমাকে দেখে। … পুত্র বিবেক, যদি তোমার থেকে কিছু চাইবারই হয়, তবে আমার এই মাতাসমান ভগিনীর জন্য আমি কিছু চাইতে চাই। তিনি আমার কাছে ভগিনী কম, মাতা অধিক। কিন্তু আত্মের মায়ার কারণে, সে আজ কলুষিত।
সেই একই কারণে, মদিনার ন্যায় পাপিষ্ঠ রিপুর জননী হয়ে, তিনি আজ নিজের জননী হওয়াকেই দুর্ভাগ্য জ্ঞান করছেন। আমার এই ভগিনী শিশুকালে তোমার ক্রীড়ার সঙ্গিনী ছিল। তুমি ও সে, দুজনেই একে অপরের সঙ্গ অত্যন্ত পছন্দ করতে। যদি এই মেধাকে নিজের আপন বলে বোধ হয়, যদি এমনই বোধ হয় তোমার যে এই মেধার কনো সাধ সম্পূর্ণ করা উচিত, তাহলে আমার এই ভগিনী, যিনি তোমার অত্যন্ত আপন ছিলেন, তাঁকে গ্রহণ করো। তাঁকে মাতা হবার লাঞ্ছন থেকে মুক্ত করে, রত্নগর্ভা করে দাও”।
বিবেক আনন্দের সাথে বললেন, “এটা ঠিক যে আমি দেবী বেগবতীর সঙ্গ পছন্দ করি, কেবল শিশুকাল বলে নয়, আজও ঠিক ততটাই পছন্দ করি, যতটা শিশুকালে করতাম। কিন্তু মেধা, তোমার সান্নিধ্য আমার কাছে মাতার সান্নিধ্য সমান ছিল। তুমি আমাকে সর্বদা পুত্রস্নেহেই পালন করে এসেছ। গতকাল পর্যন্ত আমি বৃক্ষরূপে ছিলাম, তাই আমার সামর্থ্যও সীমিত ছিল। আজ আমার সামর্থ্য অধিক হয়েছে, কারণ আমি মানবীয় দেহ লাভ করেছি, তাতেও তোমার প্রেরণাই সর্বাপেক্ষা অধিক ছিল। কিন্তু আজ যখন এই পুত্রের সামর্থ্য অধিক হয়েছে, মাতা নিজের জন্য কিচ্ছু চাইবেন না!”
মেধা হেসে বললেন, “বিবেক, তুমি বিচারের বন্ধন। বিচারকে সঠিক ভাবে বেঁধে রেখে, বিচারকে অগুছালো হওয়া থেকে প্রতিরোধ করো। তাই বিচার করার সামর্থ্য তো তোমারও আছে, তাই না। তাহলে একটু বিচার করে দেখো, যা তোমার থেকে চাইলাম, তা আমি আমার নিজের জন্যই চাইছি। একটি স্ত্রী, যে সম্পর্কে আমার সহজাত ভগিনী হয়েও, আমাকে তাঁর নিজের কন্যা বেশে ছাড়া অন্য কনো বেশে কনোকালে দেখেননি, তিনি নিজের গর্ভ থেকে এক বিষধর সর্পকে জন্ম দিয়ে, নিজেকে হতভাগ্য জ্ঞান করে, অনুশোচনায় নিজেকে সর্বদা বিদ্ধ করেন। এক সন্তানের কাছে এর থেকে কি অধিক বেদনার হতে পারে!”
বিবেক মৃদু হেসে বললেন, “থাক বুঝে গেছি দেবী। আপনার কাছে নিঃস্বার্থপরতাই স্বার্থ। … ধন্য আপনি। মানুষ, অতি কষ্ট করে, আবশ্যক জ্ঞানে, নিজের সমস্ত ইচ্ছাদেরকে নেত্রে অশ্রুধারণ করে পাথর চাপা দিয়ে নিঃস্বার্থ হয়। কিন্তু আপনি সহজাত ভাবেই নিঃস্বার্থ। … পুত্রজ্ঞান করেন আমাকে। তাই মাতাকে বরদান দিয়ে, পুত্রধর্মকে কলুষিত করতে চাইনা, তবে অন্তর থেকে আমার এই ভাব আসছে যে, আমি আপনাকে বলি- রত্নগর্ভা তো আপনার দুই ভগিনীই হবেন, তবে যিনি রত্নগর্ভা রূপে পূজিত হবেন, তিনি হলেন আপনি”।
মেধা হেসে মজার ছলে বললেন, “বিবেক, তুমি শিশু, শিশুই রয়ে গেলে। স্বামী ছাড়া কারুর পক্ষে কি গর্ভবতী হইয়াও সম্ভব! … আমার স্বামী কোথায় যে আমি গর্ভবতী হবো, তুমি যে বড় রত্নগর্ভা হবার কথা বলছো!”
বেগবতী বললেন, “মেধা, কেন মেনেও মানছিস না তুই! … বৈরাগ্যের প্রতি তোর দৃষ্টি আমরা সকলে দেখেছি। তাঁর কাছে গেলেই, তুই তৃপ্ত হয়ে উঠিস, তুই শান্ত হয়ে যাস। তখন তুই আর তোর মধ্যে থাকিস না, সমর্পিতা হয়ে যাস। বৈরাগ্যকেও দেখেছি, সে অতি শান্ত, সর্বক্ষণ সে অন্তর্মুখী। কেবল মাত্র তুই যখন তাঁর নিকটে যাস, তখনই সে চঞ্চল হয়ে ওঠে, তোর স্পর্শ লাভের জন্য সে লালায়িত হয়ে থাকে। কেন মানছিস না, এই সত্য যে, তোরা একে অপরকে অপার স্নেহ করিস!”
মেধা ভাবিত হয়ে বললেন, “ভয় করে দিদি! … উনার কাছে গেলেই, আমি নিজেকে যেন হারিয়ে ফেলি। উনি আমার কাছে, পিতা, সন্তান, ভ্রাতা, সঙ্গী সমস্ত কিছু যেন। যেন কারুকে যা বলতে চাইনা, তাও উনার কাছে গিয়ে অনর্গল ভাবে বলে ফেলি। … উনার কাছে গেলে, নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি দিদি। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখাকেই অবাঞ্ছিত বোধ হয়। মনে হয় যেন, আমি নিশ্চিন্ত হয়ে গেছি, আর আমার চিন্তার কনো কারণই অবশিষ্ট নেই”।
বিবেক এবার বেগবতীকে পিছন থেকে স্নেহের সাথে জরিয়ে ধরলেন। এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ, বেগবতী নিজের নেত্রকে বিবেকের স্পর্শসুখে মুদ্রিত করে ফেললেন, আর বিবেক মেধার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “ঠিক যেমন আমার মনে হয়, যখন আমি বেগবতীর দিকে তাকাই”।
মেধা অতি মধুর হাস্য প্রদান করলে, বিবেক পুনরায় বললেন, “এই একই ভাব আমার মধ্যে ও দেবী বেগবতীর মধ্যে প্রত্যক্ষ করে, আমাকে অনুগ্রহ করছ যাতে, তোমার ভগিনী রত্নগর্ভা হন, আর সেই একই ভাবকে তুমি নিজে অদেখা করে দেওয়ার প্রয়াস করছো!”…
বিবেকের কথাতে মেধা হতচকিত ও অপ্রস্তুত হয়ে উঠলে, বিবেক পুনরায় বললেন, “আমি বিবেক। আমার ধর্ম হলো বিচারকে বন্ধনে স্থাপিত রেখে তাকে অগোছালো হওয়া থেকে আটকানো। তবে মেধা, তুমিও কিন্তু বিচারের প্রাণের সখী। বিচার তোমার থেকে অধিক কারুর কথাকে মান্য করেনা। আমার কাছে তুমি মাতা সমান, কিন্তু তাঁর কাছে তাঁর আদরের বড়দিদি তুমি। তাই বিচার তো তুমিও করতে সক্ষম। একবার আমার কথার বিচার করে নিও”।
মেধা আনমনা হয়ে চলে যেতে থাকলে, দেবী বেগবতী মেধার এই প্রস্থানে ব্যথিত অনুভব করলেন। মনে করলেন যেন মেধা ব্যথিত হয়েছে সেই কথাতে। তাই এগিয়ে গিয়ে মেধাকে আলিঙ্গন প্রদান করে, স্নেহদান করতে গেলে, বিবেক তাঁর হস্ত আকর্ষণ করে নিজের দিকে টেনে এনে বললেন, “দেবী, মেধার এখন স্নেহের প্রয়োজন, তবে আপনার থেকে নয়, আমাদের জ্যেষ্ঠভ্রাতা বৈরাগ্যের থেকে। তবে আপনার স্নেহ আমার কাছে এই মুহূর্তে সর্বাধিক কাম্য। তাই আপনার স্নেহটা আপনার ভগিনীকে না দিয়ে, আমাকে প্রদান করবেন কৃপা করে!”
বেগবতী সেই কথাতে লজ্জিত হয়ে, বিবেকের বক্ষে নিজেকে অর্পণ করে, নিজেকে পূর্ণ করে তুলতে শুরু করলেন।
অত্যন্ত বলশালী, দীর্ঘবাহু যুক্ত, পুরুষালিরূপে সুদর্শন, মস্তকপূর্ণ কুঞ্চিত কেশে সজ্জিত, গৌড়বর্ণীয় বিচারের বাহুতে, নিজের রক্তিমবর্ণীয় পরমাসুন্দরী মাতাস্বরূপ ভগিনী, দেবী শিখাকে আবৃত ও ক্রমশনিমগ্ন হতে দেখে, মেধা অত্যন্ত আপ্লুত হলেন, আর নিজের অন্তরে প্রফুল্লতার সাথে বললেন, এবার আমার শিখাদিদির মোহিনীকে গর্ভে ধারণ করার লাঞ্ছন থেকে মুক্তি লাভ হবে।
সেখান থেকে পুনরায় বেগবতীর কাছে আসতে মেধা দেখলেন, বিশালাকায় দেহধারি, লম্বোদর, সূর্পনাসিকা ও কর্ণযুক্ত, অতিনম্র বিবেকের নধর দেহে, তাঁর মাতার মতই ধুসরবর্ণীয় দেবী বেগবতীর দীর্ঘতনুকে ক্রমশ নির্বস্ত্র অবস্থায় বিবেকের প্রতি তীব্র আকর্ষণে আলিঙ্গনে আবদ্ধ হতে। তা দেখে, আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে, কিছুটা লজ্জিত হয়েও সেখান থেকে ছুটে চলে যেতে থাকলে, কিছুদূর গিয়ে, এক বিশালপ্রস্তরের সঙ্গে যেন ধাক্কা খেয়ে, ভূমিতে পতিত হতে থাকলেন দেবী মেধা।
কিন্তু পতিত হয়েও যেন পতিত হলেন না তিনি। শূন্যে তাঁর দেহ যেন ভাসমান, তার হস্ত কেউ আকর্ষণ করে রেখেছে। এবার নিজের নেত্র উন্মোচন করে ঊর্ধ্বপানে তিনি তাকালেন, আর দেখলেন এক বিশাল পর্বতের ন্যায় অথচ অতিকোমল দেহধারী কিন্তু অতিবলশালী রজতবর্ণ পুরুষদেহ নিজের দীর্ঘ রজতাভ বাহু দ্বারা তাঁর স্বর্ণকোমল বাহুকে আকর্ষণ করে রেখেছেন।
অযাচিত ভাবেই, তাঁর স্বর্ণকোমল অঙ্গ থেকে তাঁর সুগন্ধ স্বেদ প্রকাশিত হতে শুরু করলো। সেই স্বেদের জন্য মেধা এমনিই প্রখ্যাত, কারণ তাঁর এই সেদের জন্য তাঁকে নাম দেওয়া স্বেদগন্ধা। যেই ক্ষণে, মেধা বৈরাগ্যকে তাঁর হস্ত আকর্ষণ করে শূন্যে ভাসমান করে রাখার কারণ রূপে সনাক্ত করলো, মেধার সর্বাঙ্গ সেই মধুর স্বেদ প্রকাশ করতেই থাকলো।
সেই স্বেদের গন্ধ ক্রমশ তীব্র হতে শুরু করলো, আর সেই তীব্র সুগন্ধে দেবী শিখা ও বিচার, দেবী বেগবতী ও বিবেক আরো আরো গভীর ভাবে মিলনে রত হতে থাকলেন। যেন সমস্ত মিলন দেবী মেধার সাথেই হচ্ছে, অথচ সেই মিলনের মুখসমূহ দেবী শিখা ও দেবী বেগবতী।
বৈরাগ্যও সেই সুগন্ধে আপ্লুত হতে শুরু করলেন। যতই তিনি সেই সুগন্ধে আপ্লুত হতে থাকলেন, ততই তাঁর হস্ত বন্ধন দুর্বল হতে শুরু করলো। মেধার একসময়ে বোধ জাগলও যে তিনি এবার ভূপতিত হবেন, তাই কঠিন ভাবে বৈরাগ্যের হস্তকে আকর্ষণ করলেন। বৈরাগ্যের মধ্যে যেন বোধ ফিরে এলো, আর এবার সে পূর্ণবল দ্বারা মেধার হস্তধারণ করে নিজের দিকে আকৃষ্ট করলে, মেধার স্বর্ণচম্পার ন্যায় তনু একপ্রকার উড়ন্ত পক্ষীর ন্যায়ই বৈরাগ্যের রজতাভ বক্ষে উপস্থিত হয়ে, সেখানে ঠিক সেই ভাবে আবিষ্ট থাকলেন, যেই ভাবে দাদুরের জিহ্বায় কীট আকৃষ্ট থাকে।
বৈরাগ্যও নিজেকে আর আটকে রাখতে পারলেন না। মেধার অঙ্গস্বেদের অতিপ্রখর সুগন্ধ তাঁকে আর আটকে থাকতে দিলনা। মেধাকে পিছন থেকে বেষ্টন করে, মেধার সর্বাঙ্গের স্বেদে যেন স্নান করতে শুরু করলেন বৈরাগ্য। মেধাও ক্রমশ বিভোর হতে শুরু করলেন। ক্রমশ নিজের তনুকে বৈরাগ্যের কাছে অর্পণ করতে থাকলেন তিনি। বৈরাগ্য ও মেধা, উভয়ই নিজের সমস্ত সংযমের বন্ধনকে ভেদ করে ফেলেছেন।
বৈরাগ্য মেধার স্বেদে স্নান করতে থাকলেন আকুল ভাবে, আর সেই আকুলতা মেধাকে অতিশয় স্বেদময় করতে থাকলো। ক্রমশ মেধার সমস্ত অঙ্গবস্ত্র তাঁর স্বেদের কারণে সিক্ত হয়ে যেতে থাকলে, বৈরাগ্যের আকুলতাপূর্ণ ভাবে মেধার তনুতে নিজের তনুকে ঘর্ষণ, সেই সমস্ত বস্ত্র থেকে মেধাকে উন্মুক্ত করতে করতে, মেধার সম্পূর্ণ বপুর স্বর্ণরূপ প্রথমবারের জন্য প্রকৃতির দৃষ্টির সম্মুখে আসে।
সেই রূপে প্রকৃতি স্বয়ংও যেন আকৃষ্ট হলেন আর তাই বৈরাগ্যের মধ্যে সম্পূর্ণ প্রকৃতিস্থাপিত হয়ে, মেধাকে অধিক অধিক ভাবে স্নেহালিঙ্গনে আবদ্ধ করতে থাকলেন। মেধা আজ প্রতিবাদী নয়, প্রতিবাদের মানসিকতাও নেই তাঁর। সে আজ সম্পূর্ণ ভাবে নগ্ন, অন্তরে বাহিরে সর্বত্র তিনি নগ্ন, আর তাই তিনি আজ বৈরাগ্যে নিমগ্ন।
সুদীর্ঘ হলো সেই মিলনকাল, যেন দুইসর্পের গহনসঙ্গমলীলা। মেধা তথা বৈরাগ্যের তৃপ্তির ভাব তাঁদের দুইজনকে কেবল নয়, প্রকৃতির কণা কণাকে আবিষ্ট করতে থাকলো। মেধার অঙ্গসুগন্ধ সম্পূর্ণ গুহ্যস্থলকে আবৃত করে দিতে থাকলে, শিখা ও বিচারও একে অপরকে অধিক অধিক ভাবে তৃপ্ত করতে থাকলেন, আর বেগবতী বিবেকও।
প্রকৃতি সমস্ত কিছুর সাক্ষী, তাই তিনি দেখলেন, সঙ্গম সকল মেধার সাথে হচ্ছে, কারণ মেধার অঙ্গসুগন্ধই সকল সঙ্গমের সূচক ও কারণ। সেই মিলনের জের গুহ্যস্থল পর্যন্তই সীমিত থাকলো না। সম্পূর্ণ ছায়াপুর সেই মিলনের থেকে নির্গত তাপে অর্বাচীনভাবে তপ্ত হতে শুরু করলো। সেই তপ্ততা মুহুর্মুহু সম্পূর্ণ ছায়াপুরে বারংবার ভূমিকম্প আনতে থাকলে, মহারাজ আত্মের সিংহাসন কম্পমান হতে শুরু করলো।
কারারক্ষীরা কারাসেবায় নিয়জিত সেবিকাদের প্রশ্ন করতে থাকলেন, “কি বিপদ এসে গেল সেবিকা! … এমন ভাবে মুহুর্মুহু সমস্ত জগত কম্পিত হচ্ছে কেন? একি মাতা ব্রহ্মময়ীর আগমনের সূচক!”
সেবিকারা বললেন, “এত তো বোঝার সামর্থ্য মাতা আমাকে দেন নি। তবে শুনেছি, মাতার বপন করা তিনবৃক্ষ মানবীয়রূপ ধারণ করে, মেধা, শিখা, বেগবতী, তিন কন্যাকে অহমপুত্রদের থেকে সুরক্ষিত করে নিয়ে, মাতা যেই পথ ধরে চন্দ্রপুরে প্রবেশ করেছিলেন, সেই পথেই তাঁরা অন্তর্ধান হয়েছেন। মহারাজ আত্মকে তাঁর রানীদের কাছে বলতে শুনলাম, অহমপুত্রদের বিনাশের বীজ বপন হচ্ছে তিন কন্যার গর্ভে, আর তারই কারণে এই অহরহ ভূকম্প”।
মানস, দেবী ধরা সহ সকলে সেই কথা শুনলেন। সেই কথা শুনে, তাঁরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে, ওষ্ঠকোনে মৃদু হাস্য রেখে, নিজেদের হাস্যকে লুক্কায়িত রাখলেন। অতঃপরে, সেই একই কথা সকলের কাছে এসে বললেন, “শোনো প্রজারা, মাতার কৃপা আমাদের থেকে এখনো সম্পূর্ণ অবলুপ্ত হয়নি। আমরা এত অপরাধ করেও, মাতার কাছে পরিত্যক্ত হইনি। আমাদের মুক্তির কর্মপদ্ধতি শুরু হয়ে গেছে”।
একটি প্রজা বললেন, “কিন্তু মহারাজ, আত্মের কি হবে! আমরা না মুক্ত হয়ে যাবো, কিন্তু আত্মের রাজত্ব থাকলে যে আমরা পুনরায় বন্দীই হয়ে থাকবো, হয় তাঁর কারাগারে, নয় তাঁর মায়ার কাছে। যেই কর্ম আমরা করে, নিজেদের কাছেই নিজেরা দ্বন্ধে পতিত হয়েছিলাম যে, মাতা নিশ্চয়ই আমাদের পরিত্যাগ করবেন, সেই একই অপকর্ম তো আমাদের সন্তানরাও পুনরায় করবে, আত্মের মায়ার প্রকোপে। আর কতবার মাতাকে আমরা নিরাশ করবো মহারাজ!”
দেবী ধরা হেসে বললেন, “তোমাদের এই শুদ্ধভাবের কারণেই বোধ করি মাতা আমাদের এখনো পরিত্যাগ করেননি। আমরা কি দুর্ভোগ ভোগ করছি, তার থেকেও তোমাদের কাছে চিন্তার বিষয় হলো মাতার প্রতি আমরা কি অন্যায় করেছি। সত্যই তা শুদ্ধ ভাব, আর এই শুদ্ধতার কারণেই মাতা আমাদের পরিত্যাগ করেন নি, নচেৎ আমরা এমনই কৃত্য করেছি যে মাতার করুণা লাভ করার অধিকারই আমরা হারিয়ে ফেলেছিলাম”।
মানস হেসে বললেন, “সঠিক বলেছেন দেবী ধরা। তোমাদের ভাব শুদ্ধ, তাই মায়ার প্রকোপে পতিত হয়ে, আমরা সকলে এমন অধঃপতনে যাবার পরেও, মাতার স্নেহের থেকে আমরা বঞ্চিত হইনি। মেধা সঠিকই বলতো, একদিন এই প্রজাই তোমাদের রক্ষা করবে। আজ তাঁর কথা যে কতখানি সত্য, তার প্রমাণ পেলাম। আমি আমার প্রজাদের চিনিইনি সঠিক ভাবে। সে বলেছিল, মাতার চরণকে লক্ষ্য করে এই প্রজারা পুনর্জীবন লাভ করেছিল, মাতার থেকে বড় কেউ নয় এঁদের কাছে। এই প্রজাই একদিন মাতাকে আমাদের মধ্যে ফিরিয়ে আনবে”।
অন্য এক প্রৌঢ় হেসে বললেন, “এটা মেধার আমাদের পক্ষ নেওয়ার থেকে অধিক কিছু নয়। সে বরাবরই আমাদেরকে শ্রেষ্ঠ মনে করে। হ্যাঁ মাতার চরণকে ধারণ করেই আমরা বেড়ে উঠেছি, এটি সঠিক। কিন্তু প্রকৃত স্নেহ, মাতাকে নিজের অতি আপন জ্ঞান, এই সমস্ত কিছু তো শিখেইছি আমরা মেধার থেকে। … মহারাজ, মেধা আপনার একার কন্যা নয়, আমাদের সকলের অতি আপন সে। আপনি প্রশ্ন করে দেখতে পারেন, এখানে উপস্থিত প্রতিটি মাতা তাঁকে আলিঙ্গন করে চুম্বন করার স্বপ্ন ধরে। সে যে আমাদেরকে পবিত্রতার পাঠ পড়িয়েছে!”
দেবী ধরা নেত্রের জল মুছে বললেন, “আজ আমাদের সেই কন্যার মিলনের দিন, অথচ আমরা তাঁকে আশীর্বাদটাও করতে পারলাম না। … এই আমাদের কর্মের ফল। সে আমাদের কতবার বুঝিয়েছে, মোহিনীর থেকে দূরে থাকতে, কিন্তু আমরা একটি কথাও শুনিনি তার, উল্টে তাকেই রাজপুরের সীমানার থেকে বাইরে করে দিয়েছি। … মহারাজ, মাতার কাছে আমরা অপরাধী তো বটেই, কিন্তু তারও আগে আমাদের মেধার সাথে আমরা যা অন্যায় করেছি, তার কি হবে!”
এক শিশুর মাতা বললেন, “মেধা আমাদের সকল সদ্যজননী হওয়া স্ত্রীদের কাছে ভগিনী। আমরা যখন গর্ভধারণ করেছিলাম, মোহিনীর সেনা আমাদের কাছে বারংবার এসে, আমাদের গর্ভের সন্তানকে নাশ করার কথা বলতো, অনেক কারণও দেখাতো। এমনও বলতো, একবার সন্তান হয়ে গেলে আর স্বামীর সোহাগ পাবো না আমরা। আমাদের অনেকে তাই গর্ভপাতের চিন্তাও করেছিলাম। মেধা আমাদের কাছে এসে এসে, বলতো, কে বলতে পারে কার গর্ভে মাতা স্বয়ং রয়েছেন!”
এক অন্য সদ্যজননী হওয়া স্ত্রী বললেন, “সে আরো বলতো, তোমরা এমন কেন ভ্রমে রয়েছ যে তোমরা এই সন্তানদের জননী! … তোমরা এই সন্তানকে কেবলই দেহ প্রদান করছো, এঁদের প্রকৃত জননী যে স্বয়ং জগজ্জননী। তাই সন্তান নষ্ট করে তাঁর উপেক্ষা কেন করছো! কেন তাঁর বরদানকে প্রত্যাখ্যান করছো!”
আরেক সন্তানের পিতা বললেন, “মোহিনী চাইতোই না যে, আর সন্তানের জন্ম হোক, যদিও প্রথমদিকে ঠিক এর বিপরীত চিন্তা রাখতো সে। কিন্তু যাই পেশায় ভাঁটা পরে গেল, অমনি সে সন্তান নষ্ট করার কথা বলতো। অথচ সন্তান জন্ম দেবার সঙ্গমের প্রতি সকলকে আকৃষ্ট করতো, যাতে করে অধিক ধনের ব্যয় হয়, আমরা অধিক ধনলাভের জন্য ছুটি আর তারও অধিক ধনলাভ হয়। … আর সেই কারণে তো আমার পত্নীর যখন সন্তানজন্ম দেবার কাল আসে, তখন কনো বৈদ্য আমার স্ত্রীকে গ্রহণই করছিলেন না”।
আরেক পুরুষ বললেন, “কেবলই তাঁদের অনুসারে কৃত্রিম উপায়ে সন্তান ধারণ করেছিলেন যেই স্ত্রীরা, তাঁদেরকেই চিকিৎসা করতেন। সেই কালে এমন সময় উপস্থিত হয়েছিল যে, আমরা তো নিশ্চিত হয়ে গেছিলাম যে, আমরা আমাদের পত্নীদের হারাতে চলেছি, কারণ প্রসববেদনা তাদের লঘু করার জন্য যেই সন্তান জন্ম দেবার প্রক্রিয়া, তা করার মত কেউ নেই। সেখানে মেধা আমাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়িয়েছে”।
এক জননী নেত্রে অশ্রু নিয়ে বললেন, “রাজকন্যা নয়, ভগিনী সে আমার। যখন প্রসব বেদনায় আমার অবস্থা মৃত্যুন্যায় হয়ে গেছিল, সে আমাকে বক্ষে ধারণ করে নিজে ক্রন্দন করেছিল, উষ্ণ জল দ্বারা, আমার সেবা করে, আমার যোনিদেশের সেবা করে, সে আমার সন্তানের জন্ম নিশ্চয় করে। … মহারাজ, রাজকন্যা সে নয়, হলেও তাঁর স্মরণ থাকেনা সেই কথা। কিন্তু একটি মুহূর্তের জন্যও সে নিজেকে আমাদের ভগিনীর স্থান থেকে অপসারিত করার কথা ভাবতেও পারেনা”।
আরেক জননী বললেন, “মেধার এই সমস্ত কীর্তির কারণে মোহিনী তটস্থ থাকতো। শেষের দিকে তো মোহিনী প্রতিটি গর্ভবতীর কক্ষের সামনে প্রহরা বসাতো যাতে মেধা প্রবেশ করতে না পারে। রাত্রের অন্ধকারে, মেধা আমাদের গোশালার চাল ভেদ করে, সেখানে প্রবেশ করে, সেখান থেকে গৃহে প্রবেশ করতো। আমি তাঁকে উপস্থিত হতে দেখে, কেঁদে ফেলেছিলাম, মেধা বলে কান্নায় ভেঙে পরেছিলাম। সে আমাকে নিজের সুগন্ধি স্বেদ পরিপূর্ণ অতিকোমল বক্ষে ধারণ করে, বলেছিল, “এই মেধার প্রাণ থাকতে, তাঁর কনো ভগিনী হতভাগিনীর ন্যায় মৃত্যু লাভ করতে পারবেনা”। … মহারাজ, মেধা আমাদের বড় আপন। আজ বড় হতাশ লাগছে, সমস্ত জীবনে আমাদের মেয়েটা প্রথমবার সুখের মুখ দেখছে, কিন্তু তাঁদের এই ভগিনীরা, যাদের সঙ্গ সে একটিবারের জন্যও ত্যাগ করেনি, তারা কেউ তাঁদের আদরের ভগিনীকে তাঁর মিলনের উদ্দেশ্যে শৃঙ্গার করাতে পারলো না”।
দেবী ধরা এই সমস্ত কথা শুনে কান্নায় ভেঙে পরে বললেন, “সমস্ত জীবন আমি মেধাকে তিরস্কার করে এসেছি, তার উন্নত মানসিকতার জন্য, তার নিঃস্বার্থভাবের জন্য, তার সকলের প্রতি অপার স্নেহের জন্য। ছি ছি… আজ নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছা করছে। মনে হচ্ছে, ছুটে যাই তার কাছে, ভুলে যাই যে আমি তার জননী, আর তার চরণে পতিত হয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করি”।
মানস নিজের নেত্রের অশ্রু মুছে দেবী ধরাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “অপরাধী তো আমিও দেবী। যাকে মাথায় করে রাখার ছিল, তাকেই রাজপুর থেকে একপ্রকার ত্যাগ দিয়ে দিয়েছিলাম আমি। কিন্তু আমাদের মেধার উদারতা দেখো, স্নেহভাব দেখো। সে একটিবারের জন্যও নিজের দায়িত্ব ভুলে যায়নি, একজনেরও সঙ্গত্যাগ করেনি সে”।
দেবী চন্দ্রপ্রভা স্নেহে আচ্ছন্ন হয়ে মৃদু হেসে বললেন, “শিখা আর বেগ তো সেই কথাই আমার কাছে এসে বলতো দিনরাত। তারা বলতো, মেধা আমাদের কি ভাবে ক্ষমা করে দিলো তারা বুঝতে পারছেনা। যখন তারা আত্মের পুত্রদের মোহে আচ্ছন্ন ছিল, তখন মেধা তাঁদেরকে অনেকবার বোঝানোর প্রয়াস করেছে, আর প্রতিবার তারা মেধাকে তিরস্কার করেছে, অপমান করেছে। ভুলে গেছে তাঁরা যে মেধা তাঁদের কন্যা সমান। কিন্তু মেধা কখনো ভোলেনি যে তাঁরা তাঁর মাতাসমান। কি করে পারে মেধা এমন সরল হতে!”
চন্দ্রনাথ মানসের কাছে এসে, তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললেন, “মানস, আমার কথা মিলিয়ে নিও, স্বয়ং মাতা আসবেন মেধার গর্ভে। মেধার এই অপার স্নেহের সম্ভার সম্ভোগ করার লোভ জগন্মাতা কিছুতেই সামলাতে পারবেন না, তুমি মিলিয়ে নিও আমার কথা। তিনি যে একমাত্র প্রেমের কাছেই লোভী, প্রেম দেখলে তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারেন না, আর আমাদের মেধার ন্যায় প্রেম কেই বা আর করতে পারে, তুমিই বলো”।
দেবী ধরা নিজের নেত্রের অশ্রু মুছে হাস্যমুখে বললেন, “তাই যেন হয় বাবা, তাই যেন হয়। আমরা সকলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি মেধার থেকে, কিন্তু আমি নিশ্চিত জগন্মাতা তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন না। তিনি তো কনো মায়াতে আবদ্ধ নন। তাই তিনি নিশ্চয়ই আমার মেধাকে উপহার দেবেন”।
প্রজাদের মধ্যে জননীরা বললেন, “উপহার কেন বলছেন দেবী ধরা, আমাদের মেধার প্রাপ্য মাতার এই দান। আমাদের সকলের জন্য সে দিবারাত্র কামনা করে গেছে। আজ আমরা জগন্মাতার কাছে আবদার করছি, মা, আমাদের সকলের আদরের ভগিনী কি প্রকারে আমাদের সেবা করেছে, কতটা নিঃস্বার্থ হয়ে সেবা করেছে তুমি দেখেছ, আজ তাঁকে প্রতিদান দাও মা, তাঁর গর্ভে তুমি স্বয়ং এসে তাঁকে রত্নগর্ভা করে দাও মা। সে, একমাত্র সে-ই এই রত্নগর্ভা হবার উপযুক্ত, আমাদের আর্জি শোনো মা, আমাদের ভগিনীকে জগন্মাতার মাতা হবার উপাধি প্রদান করো মা”।
মানস সমস্ত কিছু দেখলেন, আর মনে মনে বললেন, সত্যই মেধা সঠিক ছিল, আমার প্রজারা অতি পবিত্র, নাহলে নিজেরা রত্নগর্ভা হবার লালসা না করে, মেধাকে সেই রত্নগর্ভা রূপে দেখার সাধ করে! … আমি আমার প্রজাকে চিন্তেই পারলাম না, আসলে প্রজা জ্ঞান করেছিলাম যে তাদের। মেধা যে তাঁদের আত্মীয় জ্ঞান করে, তাই এত সুন্দর ভাবে তাঁদেরকে চেনে সে। কোথায় মেধা তুই! … বড় দেখতে ইচ্ছা করছে মা তোকে! … ক্ষমা চাইতে ইচ্ছা হচ্ছে মা, তোর কাছে! … তুই যখন বাবা বলে বুকে আছরে পরিস আমার, আমি যে নিজেকে ধন্য মনে করি তখন! … কোথায় তুই, আয়না মা, এই বাবার বুক যে খাঁখাঁ করছে তাঁর কন্যাকে না পেয়ে!
