ষষ্ঠম পর্ব – নষ্টঋতু
মামার কথা শুনতে শুনতে, দিবারাত্রি পারিনা বুঝতে; যেন ইতিহাস নয়, রূপকথা, শুনবো এবার শেষের গাঁথা। বললেন মামা নিজের চালে, গল্প তবু কাব্যহালে, মজার কথা শোনো টুনি, দেশবিদেশে খুনোখুনি। না, শরীর খুন হয়না তখন, মনুষ্যত্বের চলে হনন; যন্ত্রবিদ্যা উঠলো মাথায়, মাতলো সকল হত্যালীলায়।
সে এক আজব সময় বটে, কেউ জানে না কি সব ঘটে; খবর সবাই সকল রাখে, আসল খবর কেউ না রাখে। মিথ্যা প্রচার সর্বত্র, সেটিই খবর অহোরাত্র; সব মিলিয়ে মিথ্যাতন্ত্র, তাতেই মজে দিবারাত্র। এমন করেই চলতো সে যুগ, যন্ত্র নামে শুধুই হুজুগ; ধরাতে ভরে মিথ্যাচারী, অন্যে বাঁচে কোরে বাটপারি।
মামা যেন বলতে না চান, যুগটি যেন তাঁর লবেজান; তাই আমি শুধালাম তাঁরে, বিস্তারে বলো আমারে, কি ছিল সেই যুগের ধারা, বলতে হোঁচট খাচ্ছ গাদা? মামা বলেন, বেশ শোনো তাই, এবার আমি বিস্তারে যাই, শোনো তখন কেমন করে, শয়তান সব মানুষ গেলে।
এলোপ্যাথির শুরুর কথা, বলেছিলাম আগেই সেটা; এখন সেই ধারা ধরে, রোগ ছড়াল সমাজ জুরে। একটি অসুখ সারে না তাতে, দশটি অসুখে রুগী মাতে; অজান্তে হলো, ভেবো না এমন, বাণিজ্যের স্বভাবই এমন। বহু গবেষণা করে, এমন ওষুধ বাজারে ছারে; যাতে আগের রোগ কমে যায়, হাজার অসুখ সঙ্গে থাকে। সেই অসুখের চিকিৎসাতে, আরো ওষুধ কিনতে থাকে, আর এই ভাবেই যে দ্বিতীয় ধারার, ব্যবসা পাতি হতে থাকে।
বললাম আমি, দ্বিতীয় ধারা! প্রথম ধারা, বললে কোথা? মামা হলেন বিরক্ত, ভাষা খানিক তিক্ত; বুঝলাম এই কথা অতি ঘৃণ্য, তাই মামার তা বলে লাগে জঘন্য। তাও তিনি বললেন মোরে, ওই যে আগে বললাম তোরে; অস্ত্র সকল বেচবে বলে, দেশ ভেঙে দেশ করলো সবে। বিশ্বযুদ্ধে অস্ত্রের শোভা দেখিয়ে করে মনোলোভা, আকাঙ্ক্ষা নয় শঙ্কা ভরা, তাই সব দেশ করলো ভারা। অর্থ ছিলনা না তাদের, তাই টাকাধার করলে সবে, ধার দিলো চড়া সুদের হারে, রাখলো সবে দাশ করে। সেটিই তো বাণিজ্যের প্রথম ধারা, দ্বিতীয়টিতে রইলো জ্বরা; তৃতীয়টি সুদের খেলা, আর সর্বশেষে যন্ত্রমেলা।
আমি বললাম, আচ্ছা বুঝি, কিন্তু বিস্তারে বলো শেষের দুটি। মামা তুললেন ভ্রুকুটি, যেন আমি করলাম কনো ত্রুটি; আসলে সেটা আমার নয় হুজ্জুতি, কথাগুলিতে মামার অতি বিরক্তি। বিরক্তি ভরেই মনে মধ্যে, মামা বললেন যেন অগত্যে, সুদের খেলা রইলনা কেবল দেশে দেশেই আবদ্ধ, সেই খেলা সব মানুষেই করলো নিজজালে বদ্ধ। বীমার নামে, সর্বস্ব লুটে ওঠালো ধনসম্পদ; সেই সম্পদে যন্ত্র গড়ে জগতে আনলো বিপদ। জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে যন্ত্র, আনতে থাকে সুবিধার তন্ত্র; আলস্যতার নতুন মন্ত্র, সত্যজ্ঞানের করতে অন্ত।
যন্ত্র যত বাড়তে থাকে, বোঝে তন্ত্রবাদী; এই যন্ত্রই সহায়ক হবে, জগতে করতে বাদী। তাই তো তারা যন্ত্র গড়ে, সবার জীবনে তাকে ভরে; যন্ত্রের সুবিধা পেয়ে, রহে মানুষ অগাধ ভ্রমে। ওঠায় যন্ত্র নিদ্রা থেকে, প্রাতঃআহারেও সে-ই থাকে; কর্ম সকল যন্ত্র দিয়েই, কথাবার্তাও তাতে। বিনোদনও যন্ত্র দিয়ে, কাজকর্মও তাতে; হিসাব মিকাশ তো দাওই ছেড়ে, জীবনই গেল যন্ত্র হয়ে। সুবিধা প্রচুর এসেছিল, কিন্তু অপ্রয়জনেও তা উঠিয়ে নিলো; তাই মানুষে গড়লেও সেই যন্ত্রসকল, যন্ত্রই হয় চালক নকল।
বনিকরা তাতে মজা পায়, মাটি খুরে সব খনি উঠায়; ভূমির সর্বস্ব লুটে, তাই দিয়ে বাণিজ্য বাড়ায়। কাজকর্মে সুবিধা, তাতেই সীমিত থাকে না; আকাশ চিরে, ভূমি ফুরে, সহজ যান তা গড়ে। ভেবো না টুনি, খারাপ এটি, করেনি এতে প্রকৃতি আপত্তি; কিন্তু এর পরের ক্রিয়া, তার কারণেই হলো জ্বালা। যন্ত্রের জয়জয়কারে, বনিক ওঠে ফুলেফেঁপে; লোভ জন্মায় তার এর ফলে, ভবাবহ ফলাফলটি আনে। সকল যন্ত্র চালায় তড়িৎ, তাই বাণিজ্যকে বাড়াতে চকিত, নতুন উপায় করলো তারা, বাতাস-কলে করলো খাঁরা।
সাগর তটে রাখলো তাদের, কিন্তু বাতাস তেমন আসেই না এতে! তা আনতে দ্রুতবেগে, সাগর তলে ঘূর্ণন আনে। পরস্পর ঘূর্ণি আনি, প্রকৃতির করলো হানি; সে কি কাণ্ড জগত জুরি, প্রকৃতি মানুষে করলো আরি। অন্যদিকে বনিকরা ভয় পেতো এক কারণে, সেই ভয়েতে তারা এক কীর্তি করলো জগতে। ভয়টি এই যে, কালকে মানুষ যন্ত্রে যদি দেয় ছেড়ে, বাণিজ্য তাদের সব লুটাবে, এমনটা হতে না দেওয়া যাবে। তাই তারা মিথ্যাছলে, বিমান ওঠায় আকাশফুরে, বলে তারা ভিনগ্রহে গিয়ে, মানুষছাড়া খুঁজছে অন্যেরে।
এমন ক্রিয়া শুরু হবার কিছুদিন পরে, বনিকরা সব বলতে থাকে, জীব আছে অন্যগ্রহে। জীব সকল সেই গ্রহের, উন্নত মানুষের চেয়ে; এমন বার্তা দেয় ছড়িয়ে, রাখে পিছনে আসল স্বার্থে। উন্নত তারা মানুষের চেয়ে, তা উন্নত সে কি ভাবে? মূল্যবোধ নয়, সত্যধারনা নয়; উন্নত তারা যন্ত্রব্যবহারে। এমন বার্তা জগতে বিলিয়ে, মানুষকে দিল বুঝিয়ে, যন্ত্রই হলো উর্বরতা, এতে শ্রেষ্ঠই জগতকর্তা।
মিথ্যাকথা সত্য বলে, জগতে স্থাপন করতে, ছায়া ফেললো কত মেঘেতে, বুঝাতে ভিনগ্রহ প্রাণীকে। সঙ্গে নাটক জাগলো চরম, মঙ্গল চন্দ্রে নাকি গেল খড়ম; বন্ধ অন্ধকার ঘরে, সেই নাটকের পর্দা নড়ে। সকল মিথ্যার মাত্রা ছেড়ে, মানবজাতি মিথ্যা বেঁচে, প্রকৃতির দিল বুক চিড়ে, লিখলো নিজের ধ্বংস-দিনে। ব্যবিচারের চরম সীমা, মানব সেদিন ভাংলো বীমা; হতে পারেনা এই মিথ্যার ক্ষমা, পেতেই হতো এই পাপের সাজা।
আমি বললাম, কেন মামা! এই মিথ্যার প্রয়োজন কিবা! মামার মুখে আজ নেই হাসি, ক্রোধে আগুন, গলায় কাশি। বললেন তিনি, শোন টুনি, ভয় থাকে তো চোরেরও মনে, তার কি কনো প্রয়োজন থাকে! যন্ত্র যদি মানুষের কাছে, শ্রেষ্ঠ হয়ে না থাকে; তবে মানুষ সহজ ভাবে, অন্তরমুখি হয়ে যাবে। আর একবার তা হয়ে গেলে, যন্ত্র ব্যবসা চুকে যাবে; কিছুতেই তা বনিকরা যে, পারবে না মেনে নিতে। তাই যে বড় যন্ত্রচালক, সে-ই হলো শ্রেষ্ঠ পালক; এমন কথায় ভরলো সমাজ, যাতে তাদের থাকে স্বরাজ। মানুষ তাই অহোরাত্র, অন্যকেই শ্রেষ্ঠ ভাবতো; ঈশ্বর নয়, যন্ত্র সে তো, তাই যন্ত্রকেই পুজো করতো।
অন্যদিকে প্রতি ঘূর্ণিতে প্রকৃতি ফুসলো, আর তাতেই মানবের অন্ত ঘনিয়ে আসলো। একদিকে মানুষ নিজের উদ্দেশ্য ভুললো, সত্যসন্ধান ছেড়ে যন্ত্রে মেতে উঠলো; আর অন্যদিকে ব্যবিচার তাদের প্রকৃতিকে রুষ্ট করলো। ১৫৬টি দেশের ভাগে, রইলো পাপ তিনটি করে; তাই যখন এলো সারা জগে, ৪৬৮টি ঘূর্ণি জেগে, তখনই নষ্টঋতুর ইতি, আকাশে বাতাসে ঘনালো উঠি।
সেবারেও জেগেছিল একটিমাত্র ঘূর্ণি, কিন্তু প্রকৃতির খেলা তা কে জানবে তক্ষনি! … একটি ঘূর্ণি মানুষ জাগালো, প্রকৃতি জাগালো শতেক; শত ঘূর্ণি আছড়ে পরলো, সভ্যতা ভাংলো যতেক। বিদেশের কি খবর জানিনা, যোগাযোগ ছিন্ন হলো; ভারত আর দেশ থাকলো না, আবার সে রাজ্যে ভাংলো। নর্মদাতে সাগর ঢুকলো, চিড়লো ভারত দেশে; ভূমিকম্পে সবাই কাঁপলো, মৃত্যুর অঙ্ক যায় না ধরা কোশে।
তবে যদি এটি কেবল ভারতেই হতো, অন্যদেশ দৌড়ে এসে, এঁর দখল নিতই। বিমান চড়ে, আকাশ ভরে, আসতো তারা দেশে, লুটেপুটে নিয়ে যেত, কোটি থলে ভরে। যখন তারা আসেনি, এতকালের পরেও, তখন নিশ্চয় অশনি, তাদের দেশও খেলো। যন্ত্র সকল গেছে ঘুচে, স্মৃতি থেকেও তা গেছে মুছে, তাই আজ আর সেসব নেই; আমরা আবার আগের ভারত, সত্যজ্ঞান বই।
আবার আমরা সেই ভারত, প্রেমের কথা কই; চেতনা সবার হৃদে একইসঙ্গে জয়ী। ভুলে র’ছি সেই সত্যে, তাই মুখে আত্মজ্ঞানের খই; সমাধিতে মুছে গেলে, পাবোনা তাঁর থই। না, আর যে ভারত নয় কো সে দেশ, রাজ্যে রাজ্যে ভরে উঠেছে বেশ। কিন্তু কনো নেই কো শাসক, তাই নেই কনো শোষক। তাই যে আমার চারটি মেয়ে, চারদিকেতে গেছে; প্রেমের কথা, চিতের কথা বলতে সবার কাছে। এতক্ষণ যেই ইতিহাস বললাম তোমাকে, সেই কথাই বলতে তারা দেশভ্রমণে গেছে।
যদি তারা সফল হয় নিজেদের কজে, আমার ভারত আবার তখন একই সঙ্গে বাঁচবে। সত্যজ্ঞানের কথা তখন দিকে দিকে রইবে, সমাধি আর কায়ামাত তখন একই সঙ্গে বইবে। বুঝলে টুনি, আমার মেয়েরা কেন গেছে দেশে দেশে! বাপকে দেখে হবেটাকি, এমন কাজের কাছে! … এই দেশ যে মা আমাদের, করবে তাঁর সেবা, তার থেকে যে অন্য কাজে উচ্চ হয়না গ্রীবা।
জানিনা কেন নয়ন আমার অশ্রু জলে ভাসি, বললাম আমি মামা তবে এখন আমি আসি। কাল প্রাতেতে আসবো আবার, তবে গল্প শুনতে নয়কো এবার। চিৎবিজ্ঞান শেখাবে তুমি, আজকের পরে; সেই বিজ্ঞান শিখে আমি, ভাসবো আমি প্রেমে। তোমার কন্যা চার থাকবে না, যুক্ত হবো আমি; প্রেমের কথা বলবো সবে, ভারত অগ্রগামী। মামা হেসে বললেন এবার, তবে বলি তোমায় টুনি; চার মেয়ে মোর, আমার শরীর থেকে জন্ম নেয়নি। যেমন তুমি আমার মেয়ে হয়ে যাবে কর্মে; তেমনই তাঁরা চারও, আজ পালন করছে ধর্মে। বেশ তবে, কালকে এসো, শেখাবো চিৎবিজ্ঞানে; প্রেমের কথা জানবে তুমি, জানবে ভগবানে।
