পঞ্চম পর্ব – ইঙ্গঋতু
কয়লা তারা তুলতে জানে, কিছু পরে জ্বালাতেও শেখে; সেই জ্বালানী দিয়ে তারা, গাড়ি ছোটায় স্টিমের দ্বারা। মাটির নিচের যত আকর, উঠায়ে তারা নেয় সরিয়ে; দেশের মানুষ শ্রমিক বড়, খাটায়ে নেয়, ঘার মুড়িয়ে। মস্ত বড় লোভী তারা, জমি সকল নেয় ইজারা; মাটির নিচের খনি নিয়ে, মাটিকে নিঃস্ব করবে ভাবে। কিন্তু এ দেশ আজব যে রে, যত খোঁড়ে, ততই মেলে; তবু যেন না হয় শেষ; ভাণ্ডার তাঁর সত্যই অশেষ।
লোভী ব্রিটিশ সর্বসেরা, তারা হলো সেরা লুটেরা; কিন্তু তাদের সেই কাজেতে, বাঁধা প্রচুর থাকে পেতে। প্রথম বাঁধা, তাদের ভাষা; এই দেশের যে কেউ বোঝে না। সেই বাঁধারে ঘুচাবে বলে, শিখায় ভাষায় দেশের লগে। যারা শেখে সেই ভাষারে, খনিতে নেমে কাজ না করে; তাই তাঁদের মাথায় রেখে, দেশের ভাষায় শ্রমিক পোষে। কয়লা, অভ্র, তামা, দস্তা, বিস্তর সে, নয় সস্তা; পরিমাণও এতো অধিক, সরাবে কেমনে, নাই কনো ঠিক।
রেল চালাবে কয়লা দিয়ে, তারই পথ গড়তে হবে, প্রচুর লোককে লাগাতে হবে, কিন্তু তারা কি করে করবে? এই দেশে যে শিক্ষা চলে, তা তো কেবল সত্যসন্ধানে; বিলাসিতার শিক্ষাদীক্ষা, এদেশ যে কিছু না জানে! … এতো ভেবে বানালো তারা, বিদ্যালয় সারি সারি, দেশের মানুষ গেল সেথা, যন্ত্রবিদ্যা নিতে খালি। জানতো না তারা তখন, একেই পরবর্তীকালে, শিক্ষা বলে জানবে সমাজ, সত্যশিক্ষা দিয়ে ফেলে। এই যন্ত্রশিক্ষারে মাধ্যম করি, শ্রমিক বানালো সহস্রখানি; কারুকে সেপাই করে, তো কারুকে যন্ত্রমিস্ত্রি গড়ে।
কবিরাজি ভুলে গেল, আয়ুর্বেদও লুপ্ত হলো; এলোপ্যাথির নজির এলো, বৈদ্য গিয়ে ডাক্তার হলো। মেধাবী যারা, তাদের নিয়ে, শিক্ষকও তৈরি হলো, আশ্রমপাঠ উঠে গেল, বিদ্যালয়ে সবাই চলো। বেদ, বেদান্ত, উপনিষদ গ্রন্থ, যা জীবনসত্য জানার উপপাদ্য; তাদের ছেড়ে, যন্ত্র জেনে, দেশের মানুষ বিদ্যান সাজে। হিল্লোল বড় উঠলো দেশে, যন্ত্রশিক্ষা জাগলো কোষে; এছাড়াও এক নতুন রসে, দেখলো মানুষ শিক্ষা শেষে।
শিক্ষাপাঠের অন্তে এসে, শিক্ষাবলে চাকরি মেলে; যেমন শিক্ষা তেমন চাকর, ভারতবর্ষে নতুন ফাঁপর। অধম যে শ্রমিক সাজে; মধ্যম হয় কেরানী; উত্তমরা হাবেভাবে, ডাক্তার, শিক্ষক, মিস্ত্রি। কেরানীগিরিরও অনেক ধরন, রেলের চালক বা অফিসে বরণ; তাদের মধ্যেই সেরার সেরা, কাছের চাকর হয় তারা।
এই নতুন ধারা বেশ জেগেছিল; ব্রিটিশ নিজেও তাতে মেতে, তাঁর চাকরও তাতেই মেতে। কিন্তু এই সকল মাঝে, সত্যসন্ধান হারাচ্ছে যে। যন্ত্রবিদ্যা অর্থ দিলেও, এই দেশের যে ভিত্তি তা নয়; আহার যেমনতেমন হলেও, মোক্ষসন্ধান ছাড়া কি হয়? ওটাই যে আমাদের বিশেষত্ব, ওটা যে আমরা ছাড়া আর কেউ না পারতো; আর ওটাই যে জীবনের মুলতত্ত্ব, ওটা ছাড়া জীবন বাঁচাই যে মূর্খত্ব!
তাই সেটা ভাবার সময় হলো, কিন্তু কে ভাববে? বাকি ভারতের বয়েই গেল। দুঃসময়ে যে অন্ধের জ্যোতি, এই বাংলাই, আর সবাই দেয় ফাঁকি। তাই বাংলাই হাল ধরলো শেষে, ব্রাহ্মসমাজ নামটি নিয়ে। সত্যশিক্ষার আবার হলো জাগরণ, কুপ্রথার শুরু হলো বিসর্জন। হ্যাঁ টুনি, এটাই সেই গুপ্ত বানী। যখন সত্যচর্চা দেবে তুমি বিসর্জন, তখন অন্ধবিশ্বাস করবে তোমার আবাহন। সেই কালেতেও তেমনই হলো, সত্য শিক্ষা ভুলে যখন যন্ত্রে সমাজ মজলো।
পুরানো যত আবর্জনা, তা দিয়ে হলো নতুন খেলনা; বিধবাদের দিল পুরিয়ে, সতী নামের আখ্যা দিয়ে। আরো কতক আচার বিচার, জেগে উঠলো সেই কালে; আর হবেই না বা কেন? সত্য শিক্ষার যে বালাই উঠে গেছিল। বটগাছ উপ্রে ফেললে, বনজঙ্গল গজাবে না সেখানে! … ব্রাহ্মসমাজ গঠনকালে, তাই উদ্দেশ্য আরেকও ছিলে। আর তা হলো, এই আবর্জনার নাশ, যাতে সুস্থ হয় সমাজ।
কুপ্রথার বিরোধ করা, ফিরিঙ্গি দিয়ে আইন গড়া, ব্রাহ্মসমাজ এতেই মেতে, দিবারাত্র থাকে ছুটতে। বেদান্ত কথা, বেদের প্রথা, সর্বক্ষণ তারই চর্চা। কিন্তু এসব করতে গিয়ে, ব্রাহ্ম দেয় সব গুলিয়ে। বাইরের এই প্রকৃতি তখন গুরু ছেড়ে করে নাচন; শিক্ষা নেবার বালা ছেড়ে, সৌন্দর্যের হয় যে গাজন। পুরুষতত্ত্ব সামনে এলো, যেমন আত্মার ধরন ছিল; চিৎতত্ত্বও সেই লুকালো, যেমনটা আগে হয়েছিল। অধ্যায়ন যখন আত্মার হয়, তাকেই আধ্যাত্ম কয়, তবে গাছের শিক্ষা মাটির হয়, সেটা সবাই ভুলে যায়।
মাটি না জানলে, গাছে কেমনে জানবে; সেই তত্ত্ব ভুলে গিয়ে, আধ্যাত্ম কথা হলেই, শেষ করে আত্মা বলেই। গাছ আত্মা, মাটি চিৎ; তাঁকে ছাড়া, সবই রীত। রীত দিয়ে কি সাধন হয়? তা তো কালের অপচয়। মাটির কাছে সমর্পণ, তবেই তৃণ আলাপন। ব্রাহ্মসমাজ বেদের ধারায়, সেই সত্য ভুলায় দায়। তাই যে আবার আসতে হলো, করতে এই জগত আলো। মার্কণ্ড বুদ্ধ হলো, বুদ্ধ হলো দ্বৈপায়ন; দ্বৈপায়ন নিমাই হলো, নিমাই খুলল আবার নয়ন।
চিৎবিজ্ঞান নতুনধারায়, বললেন তিনি রসে চুবায়ে; প্রকৃতিকে গুরু বানায়ে, দিলেন তাঁর নব পরিচয়। অবধুতের চব্বিশ গুরু, বইয়ে কেবল ছিল শুধু; প্রকৃতিকে বানায় গুরু, নতুন ধারার করলেন শুরু। হিন্দু-মুসলিম ভেদ ভাবহবে, জানতেন তিনি আগেভাগে; তাই যে তিনি সব মতেতে, সাধন করেন সাম্যভাবে। যাহা চিৎ, তাহা ব্রহ্ম, দেখাইলেন তিনি আদিঅন্ত; ভাঙলেন তিনি সব রীত, বুঝাইলেন আদ্যপান্ত। কালের আগেই জানতেন তিনি, কি দিন আসছে ঘনি; তাই তো তিনি প্রকৃতি ধরি, শেখালেন চিনিতে অরি।
ভেল্কিবাজি করবে পাজি, গুরু সাজবে জগতের; আগেই জেনে তাই কাজি, জগতগুরু চেনালেন। বললেন সবে, কারে খোঁজো! কোথায় খোঁজো গুরুরে! প্রকৃতি স্বয়ং সবার গুরু, শেখান তিনি সব্বারে। পুরুষতত্ত্ব আধ্যাত্ম, এমন জানলে অন্ধত্ব; তাই যে তিনি বলেন গুণী, পুরুষ হলেন মদমত্ত। এক গণ্ডূষ জল খেয়ে, চিৎশক্তির চরণ ধুয়ে, শিব পরেন লুটায়ে, শব সেজে ধুলায়ে। তোমার আত্মা, আমার আত্মা, ভিন্ন ভিন্ন কত আত্মা; এই আত্মা ঈশ্বর হলে, কেমনে তিনি অসীম হলে! আত্মা যার চরণ ধরে, যিনি সবার অন্তরে; চিৎশক্তি তাঁরে বলে, ঈশ্বর বলে যেন তাঁরে।
ভ্রমের বশে আছে বলে, জীব নিজেরে জীব বলে; আসলে সে জীব নয় যে, জীবের ভ্রমে শিব যে সে। পঞ্চভূতের মায়া ছেড়ে, জীবরে তোমরা বলো গিয়ে, শিব হয়েও কেন নিজেরে, পরিচয় দাও জীব বলে? মন-বুদ্ধি আকাশ-বরুণ; উর্জ্জা-প্রাণ অনল-মারুত; সঙ্গে শরীর মৃত্তিকা যে, ফেললে এঁদের ভ্রম ঘুচবে। শিষ্যদের বললেন তাই, সেই ভ্রম দাও ঘুচায়; জীবের খোলস দিয়ে মুছায়, শিব হয়ে মাতো চিৎ ধারনায়।
তাঁরই চরণ ধরে, তিন বিপ্লব বঙ্গে জাগে; প্রথমটি ভাষা ধরে, দ্বিতীয় মশাল ছেলে ধরে। ইংরাজি ভাষার কাছে, নিজের ভাষা মিলিয়ে গেছে; সেই ধারনা জাগলো সবে, বাংলা ভাষা উঠলো জেগে। বিদ্যাসাগর বঙ্কিম আদি, জ্বালালো মশাল অতি; রবিঠাকুর ব্রাহ্ম ছেড়ে, ধরলেন মশাল শক্ত হাতে। অন্যদিকে তাঁরই ছেলে, গেলেন তিনি দেশটি ছেড়ে; আমেরিকার বুকটি চিঁরে, সনাতনে রাখলো আগে।
সঙ্গে আনেন নিবেদিতা, শিক্ষা দেন সংঘমাতা; শিক্ষা পেয়ে গড়লেন প্রথা, বললেন চাই স্বাধীনতা। বাকি ভারত ছিল ঘুমায়ে, বঙ্গ তখন বুক চিতায়ে, বললেন গোরা যাও পালায়ে, আমাদের দেশ দাও ছাড়ায়ে। মেনে নাও মোদের কথা, বন্ধ করো লুণ্ঠন প্রথা; ভেবো না আমরা নীরব শ্রোতা, ভোতা মুখ তোমা করবো থোতা। শান্তিপ্রিয় আমরা বলে, আমাদের তুমি লুটবে ছলে! মাটির খনি নেবে বলে, আমাদেরকে রাখবে বেঁধে! ভেবো না আমরা শান্ত রব, প্রয়োজনে প্রাণও দেব; তবে তোমাদের যেতে হবে, এই দেশ আমাদেরই রবে।
বিনয় দীনেশ, চিত্তরঞ্জন, বাদল, ক্ষুদি অসামান্য; অরবিন্দ, বাঘা জতিন মিলে, বিপ্লবকে দেয় প্রাধান্য। ভাষা বিপ্লব সঙ্গে নিয়ে, ধর্ম বিপ্লব উঠলো জেগে; এঁদেরকে সঙ্গে রেখে, স্বাধীনতার স্বপ্ন দ্যাখে। ধীরে ধীরে বঙ্গের আগুন, ধুয়া হয়ে ছড়ায় ফাগুণ; সম্পূর্ণ ভারত তখন, সেই ফাগুনে করে ধারণ। বিপ্লব জাগে সর্বত্র, বঙ্গের আগুনে ভারত উন্মত্ত; ব্রিটিশ বলে এযে দেবদত্ত, বাংলা যে জ্বালাচ্ছে মম পিত্ত। বাংলা এমন জানলে পরে, থাকতাম কি মোরা হেথায় ঘাঁটি গেড়ে! প্রতিভা একটি হলে, মারতাম ঘাড় মুরিয়ে; কিন্তু এতো প্রতিভাকে কি করে? এরা তো আমাদেরই দেবে উড়িয়ে!
এক বাংলায় রক্ষে নেই, ভারত জাগলো তার সাথেই। দক্ষিণেও বিপ্লব জাগে, তেমন জাগে পাঞ্জাবে। সঙ্গেতে আফ্রিকা ফিরত, যোগ হলো গান্ধীজী; ছাড়ো ভারত, স্লোগান দিয়ে বিপ্লবে মাতলেন তিনি। সাধক তিনি, তাই বেজায় কঠিন, ব্রিটিশ হলো নাজেহাল; সঙ্গে যুক্ত হলেন যিনি, ইনি জানেন ইন্দ্রজাল। গুজরাটেতে বাপু নেতা, বঙ্গে সুভাষ হলেন ত্রাতা; ব্রিটিশের মুখ হলো ভোতা, এক নয়, দুই দুই নেতা!
রোমান আর ইহুদিদের সারা বিশ্বে দাপাদাপি, বঙ্গ ধরে বিশ্ব তখন শুরু করলেন হাঁপাহাঁপি। ইহুদিদের বড় অংশ, ব্রিটিশ আর আমেরিকা; অন্যদিকে রাশিয়া আর জার্মানি বড় একা। সুভাষ তাই দিলো পারি, জার্মানি আর জাপানে; বলল ভারত আছে পাশে, ইহুদি মারো অভিযানে। হিটলার নামে ইহুদি-অরি, জাগলেন করি তড়িঘড়ি। ইহুদি মারি সারি সারি, আমেরিকা আর ব্রিটিশ অরি; ভাবেন ফিরিঙ্গিরা অতি, এতো বিপদ বড্ড ভারি।
বিশ্বযুদ্ধ লেগে গেল, ইহুদি বনাম বাকিদের; পূর্ব হলো বিরোধী আর, রাশিয়া হলো ফকিরের। যন্ত্রবিদ্যায় ইহুদি শ্রেষ্ঠ, ইউরোপে আর আমেরিকায় গরিষ্ঠ; রাশিয়া জার্মানি সচেষ্ট; যতই বিরোধী হোক বলিষ্ঠ। যুদ্ধ জিতলো ইহুদি, হারলো ফকিরের দল; তবুও তারা করলেন যুক্তি, হয়েছেন তাঁরা বেশ দুর্বল। তাই সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁরা, শাসন হবে অন্য ধারা; প্রত্যক্ষ হবে না রাজা, কিন্তু তাও সকলেই হবে তাঁরই প্রজা।
এমন ভেবে নতুন ছক, করতে লাগলেন আহাম্মক; করতে লাগলেন স্বাধীন সবে, হলেন সেরা প্রবঞ্চক। স্বাধীনতা সামনে রেখে, ভেঙে দিলেন দেশগুলিকে; স্বার্থ তাদের বুঝবে কে যে, পেয়েছে তাদের শয়তানেতে। বিশ্বযুদ্ধের নামটি করে, অস্ত্র বিক্রি চরমে এনে, বুঝিয়ে দিলেন সব দেশকে, অস্ত্র ছাড়া দুর্বল সে যে। সেই সঙ্গে দেশ ভেঙে, দিলেন তাঁদের স্বাধীন করে; হবে তাদের অস্ত্র কিনতে, সুরক্ষা সঠিক করতে। শত বৎসর পরাধীন দেশ, অর্থ কোথায়, সবই তো শেষ! তাই তাদের দিলেন অর্থধার, করলেন ধারে অকৃতদার। ধারের বোঝায় টলমল, রাশ রাখলেন করে ছল। নামে স্বাধীন সব দেশ যে, ধারের বোঝায় পরাধীনই সে। আর এমন করেই সব দেশকে, ইহুদিরা রাখলো তলে; শয়তানির অসীম ছলে, রাখলো বিশ্ব মুষ্টিবলে।
এরপরে আর কি বলি, সে এন নতুন ঋতু, বুঝলে টুনি! আজ যে এই হাল দেখছো, পিছনে সেই ঋতুই ছিলো। তাই সেই যুগকে কি নামে ডাকবে? নষ্টঋতু, এই নামই থাকবে।
