রবিমামা | কবিতায় ইতিহাস

খণ্ডযুদ্ধ করি বাবর, আগ্রাতে এলো সে; শান্তিতে থাকে হেথা, স্থাপত্য গড়ে সে। এদিক সেদিক দেখলো বাবর, নজরে এলো ঐক্যসাগর; ইচ্ছা ছিল, এক করতে, সময় না পেল তাতে। হুমায়ুন এলো তাঁর পরে, স্থাপত্য সেও গড়ে, একটু একটু আগে চলে, রাজ্যটাও বাড়তে থাকে। পিতার স্বপ্ন এই দেশেতে, ঐক্যধারার সঙ্গে থেকে, রাজ্যগুলি মুছে ফেলে, একটি আস্ত দেশটি গড়ে। সেই আশারই পথে নেমে, হুমায়নও যুদ্ধ করে; বাড়ে না রাজ্য তেমন ভাবে, তবু আগে এগিয়ে চলে।

স্বপ্নপুড়নের সময় এলো, যখন আকবর সম্রাট হলো। মধ্য খেলো, পূর্ব নিলো, দক্ষিণেরও অংশ খেলো। … বঙ্গে গৌড় কেন্দ্র করে, সিরাজ দুল্লার বীজটি পুঁতে, মুঘল ধারার মিশ্রজাতি, এখানেও পাতলো ঘাঁটি। বেশ বারালো রাজ্যটিকে, মধ্য উত্তর পূর্ব জুরে; তবে, বাঁধ সারলো পশ্চিমেতে, যেথায় রাজপুত ছিল মেতে। যুদ্ধ হলো অনেক শেষে, তবু রাজপুত ছারে না আশে; সংগ্রাম তারা করতে থাকে, আকবরের স্বপ্ন অর্ধই থাকে।

ঐক্যধারার বিচিত্র মেল, সমস্ত রাজ্যে দেখি খেল; মুঘল রাজার জাগে মনে, রাজ্যজুরে গড়বে দেশে। তবুও তা হলো না শেষে, আকবরও দেহ রাখলো মিছে। তবে আশা ছারেনি, পরের জন যদিও মাতেনি। সাজাহানের কলায় মন; রাজপুত হলো বন্ধুগন। রাগরাগিণী নৃত্যকলা, স্বর্ণ পাথর মিলে মালা; তাতেই মজলো সাজাহান, যুদ্ধেটুদ্ধে সন্দিহান। রাজারূপে অযোগ্য, শাসন যেন হোমের যজ্ঞ; দেশবীরেতে তাই যে টুনি, অরাজগতা খুনোখুনি।

ব্যবিচারে মাতে তান্ত্রিক, ইসলামেরাও বেগতিক; সবমিলিয়ে সব দিকেতে, এক আশ্চর্য বেরসিক। ন্যায়ের নামে অন্যায়; ধর্মের নামে অধর্ম; শাসনের নামে অপশাসন; আর ছুচিবায়ের আস্ফালন। এই ছিল তখন হাওয়া, ভেদভাবের পালকি বওয়া; সবাই বলে আমরা সেরা, বাকিদের করো ভিটে ছাড়া। পাশে পিষে, শীলে বেটে, সে কি কাণ্ড, সব লণ্ডভণ্ড। সমাজ যেন হলো উলঙ্গ, ঘৃণার নতুন তরঙ্গ; এই বুঝি গেল মুছে, বাঁচতে বানাও সুরঙ্গ।

মানবজাতির শেষদিন, নেইকো বুঝি দেরী আর; এ ওকে মারে, তো সে তাকে ধরে, সব মিলায়ে ব্যাবিচার। কি হয়, কি হয়, এমন ভাব; সমাধান কি, নেই কনো জবাব; সাজাহান তখন নবাব, তবে নেই তাঁর কনো প্রভাব। হিঁদু করে ছুঁচিবাই; ইসলাম বলে ধরে খাই; রাজা-সকলের ফুর্তি চাই; নবাবজাদার অভাব নাই। যখন সময় থমকে যায়, এমন ভাবেই নষ্ট হয়; তখন তখন বঙ্গভূমি, রত্ন ভরায় গর্ভখানি। হয়না তার ব্যতিক্রম, আসে এক নতুন বিক্রম; নিমাই নামে রাখে চরণ, দুখ সকলের করেন হরণ।

হরে কৃষ্ণ নাম করি, বঙ্গ দেশে জোরাজুরি, উৎকলেরও মাথা ধরি, নবজোয়ার উঠলো মুখ তুলি। ভাসলো তাতে হিঁদুর ছেলে, মেয়েরাও বাদ না পরে; ছুঁচিবাইএর বালা সেরে, জ্ঞানভক্তির ধ্বজা ওরে। বৈষ্ণব জাতি জন্ম নিলে, বঙ্গ তথা উৎকলে, উৎকৃষ্ট জ্ঞানের খোঁজে, নূতন তন্ত্র উঠলো জেগে। তবে আয়ু তার বড় কম, নিমাইয়ের পর মাত্র দুই জনম; তারপরের সেই সময়টায়, নোংরামি চরমে যায়।

বষ্টমের ব্যবিচার, মন্দিরকেও নেই ছার; চরম হলো নষ্টামি, মাথায় থাকে বষ্টমী। বনিতায় দেশ ভরে যায়, কৃষ্ণ নামের আঙ্গিনায়; মন্দিরসব কোটা হয়ে, হিঁদুর জাত কেরে নেয়। সাজাহানের সন্ধ্যা হলো, আলমগিরের উত্থান হলো, মহাজ্ঞানী আল্লাগামী, ভ্রু তাঁর কুঁচকে গেল। চালালো সে অভিযান, বনিতাঘেরা মন্দির ভাঙান; গড়েন সেথায় মসজিদ সকল, হিঁদুরা ঘরে দিলো শিকল।

রাজপুতদের অঞ্চল নিলো, পূর্বকেও আস্তো খেলো; উত্তর তো আগেই ছিলো, দক্ষিণেরও অন্ধ্র নিলো। ভারত নাম হলো দেশের, প্রথমবার দেশ হলো সে; বাবরের স্বপ্ন ছিল, তা অরংজেব পুরো করলো। ঐক্যতানের সব রাজ্য, মিলে মিশে হলো দেশ; নামটি তবে ভারত ধরেই, রাখলেন আলম ভারতদেশ। বনিতাদের বাড়বাড়ন্ত, বষ্টমদের কাম চূড়ান্ত; সেই কথাটি দিব্যি ভুলে, আলমকে শত্রু বলে। হিঁদুর শত্রু আলমগির, অরংজেব গড়ে নজির; নোংরামো ফেলে দিয়ে, গড়লো ভারত স্বপ্ন নিয়ে। 

শান্ত হলো হিঁদুর কাম; ভারতভূমির বড় নাম; সাগর চিরে আসতো তখন, দেশবিদেশের বনিকগন। পশ্চিমকুলে পর্তুগিজ, পরে ফেললো বঙ্গে বীজ; ডাচ আর ফরাসিরাও হেথায় এসে, হয়ে উঠলো পরসিজ। আমি বললাম, মামা আমায় একটি কথা বলো তো! মোঘল পাঠান এলো হেথায়, পেতে না শান্তির খোঁজ; কিন্তু এই গোরারা কেন এলেন, কিসের তাঁরা করছিলেন খোঁজ?

মামা বলেন, সে আরেক কথা, বলছি তোমায় শোনো, পশ্চিম দেশে রোমান হিব্রু মিলে জগত গড়লো। সেই দেশেতে অরংজেবের শাসন কালের সময়ে, দুর্যোগ এলো ভয়াবহ বরফঋতুর বেশে। টেমস দেনুব, রাইন সকল নদী শুকায়ে গেল; খরাতে নয়, বরফ হলো নদী সেখানের সকল। খাদ্য নেই, সে একরকম; মৃত্যু কোলে ঢলে; কিন্তু সেই সঙ্কট আজব টুনি, জলের অভাবে মরে। বছর হবে ত্রিশ বোধহয়, এমন ভাবে সবই শুকায়; কাটলে সঙ্কট, ভুলে না তায়; এবার যে সমাধান চায়।

বুঝতে পারে তারা সকল, তাঁদের উত্থান বড়ই নকল। নেইকো তাঁদের কনো আকর, তাই এবার লাগবে তাঁদের চাকর। অস্ত্র আছে তাদের প্রচুর, সেই দিয়ে দেশ করবে উসুল; কিন্তু কিছু দেশ লাগবে, যাতে সঙ্কটে বাঁচতে পারে। সেই আশাতেই, বরফ গললে, ভাসায় তারা তরি; সাগর চিরে পূর্বপশ্চিমে, দিল তাঁরা পারি। পূর্বে পেল ভারত চীনে, পশ্চিমে মায়ান দেশে; সাম্রাজ্য গড়তে সেথায় গেল তারা বনিক সেজে।

ভারতে যখন এলো তারা, পশ্চিমেই প্রথম দিল হানা। পর্তুগিজের ঘাঁটি সেটি, খেলো সেথা বড় তারা। তারা খেয়ে পূর্বে এসে, বাংলায় দিল হানা। ফরাসিরা আগেই ছিল, বাণিজ্যের স্বার্থে; চন্দন দেশ, আর দক্ষিণের রেশ, দুই ঘাঁটি পেতে। ব্রিটিশ দ্যাখে, এতো আজব দেশ, হেথায় আছে সকলে বেশ; আছে হেথায় সব আকরই, কিন্তু জানেনা তা দেশের মানুষই। বাণিজ্য কেউ বঝেনা বিশেষ; কেবল বোঝে বাংলা দেশ; তাই সেখানেই ঘাঁটি গেরে, থাকতে চাইলো বনিক সেজে।

অরংজেবের দিন ফুরালো, দিন ফুরালো মুঘলের; শাসন তাঁর দুর্বল হলো, দিন এলো তাই বনিকের। পর্তুগিজ আর ফরাসিদের সাহস ঠিক তেমন নেই, দিল্লি তাই দুর্বল হলেও, অধিকারের চারা নেই। ব্রিটিশ দ্যাখে, এই তো সুযোগ, হাতিয়ে নেব ভারতদেশ; তবে মাঝে রয়েছে বাঁধা, তাঁদের ঘাঁটি বঙ্গদেশ। সিরাজ দুলের, পিঠে ছুরি, মারলো করি, বিশ্বাস চুরি; বাংলা নিলো ব্রিটিশ এবার, উদ্দেশ্য ভারত নেবার।

বাণিজ্য যেমন করতে থাকে, জমিদারীও বাড়ে ঝাঁকে; বঙ্গভূমির তাবড়সকল, করলো সবাই ভূমি দখল। ব্রিটিশ রাজের অধীনে থেকে, সম্পত্তি বাড়তে থাকে; তারই সাথে আধুনিকতা, বাংলাকে দেয় জমকালোতা।

সেই দ্যেখে বাকি দেশে, লোভের ডঙ্কা উঠলো বেজে; আর যেমন লোভ বাড়তে থাকে, ব্রিটিশও নিলো ভারতটাকে। তারপরে কি! খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ করে, ব্রিটিশ সাম্রজ্য হলো ভারতে। কাশ্মীর থেকে সাগর নিচে, মরু থেকে অরুণদেশে, সব কিছুকে একসাথে, গড়লো তারা ভারতটিকে। বিস্তর সেই কথা খানি, বলছি তোমায় শোন টুনি, সে এক নতুন ঋতু এলো, ইঙ্গঋতু বলে জেনো।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6