তৃতীয় পর্ব – বুদ্ধঋতু
মামা বলেন, মজার ছলে; আমার আগ্রহ বারে; নেত্রসামনে আমার যেন, ইতিহাস খেলা করে। মামা চললেন বলে, যেন নেশায় রয়েছেন ডুবে; বললেন তিনি, মার্কণ্ডের ধারা ধরে, সিদ্ধার্থ উঠলো জেগে। চিৎবিদ্যা জাগলো মনে, বোধিতে লয় হলো সবে; বশিষ্ঠ সঙ্গে আসি, লোয়ে গেলেন সেই ধারাকে। চৌষট্টি কলা লোহি, নূতন ভাবে গড়লেন ঘাঁটি; তন্ত্র নামে সেই ধারাটি, ছড়িয়ে গেল জগৎব্যাপী।
বঙ্গ থেকে তন্ত্র নিয়ে, বশিষ্ঠ পশ্চিমে গিয়ে, নূতন করে জ্যোতিষ ধরে, মাতালেন রাজধারাকে। ভবানী নামে হলেন স্থাপন, ভাবীকালের রাজপুতেতে; রাজার ধাম রাজস্থানে, তন্ত্র ধারা জাগলো অনেক। ক্রমশ সেই তন্ত্রধারা, ভুলায় দিলো বেদের ধারা, পুরুষতত্ত্বে দিলো পারা, করতে লাগলো নাগরছাড়া। বেদের ঋষি পুলস্ত, করিলেন যজ্ঞ মস্ত; বাল্মীকিরে জাগাইলেন, রামকাণ্ড তাঁরে লিখাইলেন।
আশা অনেক ছিল তাঁর, তবু পেলেন বশিষ্ঠের মার, বাল্মীকির প্রতিভার ভার, পুলস্তের কাছে মহাঝাড়। বাইরে রাখলেন রামের কথা, ঠুসলেন মধ্যে চিৎকথা, নাম রামায়ণ হলেই বা, কেন্দ্রে রাখলেন শুধুই সীতা। পুরুষতত্ত্বে স্থাপিবে বলে, পুলস্ত যজ্ঞস্থলে, জাগায়েছিল বাল্মীকিরে, মেটাবে চিৎধারারে। কিন্তু বশিষ্ঠের কৃপা, বাল্মীকি পেলেন চিৎপ্রজ্ঞা; মলাটে রাখলেন রামকথা; ভিতরে রইলেন মাতা সীতা।
পুলস্ত হার মানবে না, করলেন তিনি আরেক চিন্তা; জাগাবেন কারুকে না, জন্মদেবেন এবার ত্রাতা। দ্বৈপায়ন নাম তাঁর, রূপেগুণে অবতার; চিৎকে করবেন চিৎপাত, আশায় রইলেন পুলস্তনাথ। নির্জনে রাখলেন পুলস্ত, করলেন দ্বৈপায়নে বেদগ্রস্ত, উদ্দেশ্য বৌদ্ধতন্ত্রে দেবেন অস্ত, চিৎ বিজ্ঞানের করবেন অন্ত। কিন্তু মার্কণ্ডের ধারা ধরি, দ্বৈপায়নও চিৎবিজ্ঞান মানি, রাখলেন মনে সেই কথাটি, পুলস্তরে দিলেন ফাঁকি।
পুলস্তের অন্ধত্ব অতি, বোঝেনা বুদ্ধের গতি; চিনলেন না তাঁরে অবতার বলে, তাই বিরোধিতা থাকলেন করতে। সেই বিরোধ দ্বৈপায়নও ধরি, তবে সেটিকে মুখোশ করি, চিৎবিজ্ঞান মধ্যে ধরি, করিলেন বেদে খণ্ড অতি। বাল্মীকি যেমন করে, সীতারে অন্তরে ধরে, রামকে সম্মুখে এনে, গড়েছিলেন কথা রামের। ঠিক তেমনই দ্বৈপায়নও কৃষ্ণারে আঁধারে রাখি, পুরুষতত্ত্ব সামনে ধরি, চিৎ কথা বললেন মহা, নাম দিলেন তাঁর জয়া।
পুলস্ত ছাড়লেন আশা, বারে বারে আসে হতাশা; বাল্মীকি না সামান্য আভা, দ্বৈপায়ন যে স্বয়ং প্রভা। সেও যখন চিৎধারাকেই, প্রকাশ করে আত্ম’পরে, তবে নিশ্চয়ই পুরুষধারা, চিতের অতি তুচ্ছশাখা। এই মেনে লুকিয়ে গেলেন, পুলস্ত হার মানলেন; অন্যদিকে জয়া তখন, ভারত নামে জেগে উঠলেন। ভারত হলো মহাভারত, যুদ্ধকথার আস্ত আড়ত; রিপুপাশের হত্যা কথা, তাতেই ভরা ভারত গাঁথা। কিন্তু বুঝলো না যে সেই কথা, জেগে উঠলো ক্ষত্রিয় প্রথা; পুনরায় জ্ঞান ছেড়ে, যুদ্ধে সবাই উঠলো মেতে। যুদ্ধেরই আঁতুড় ঘরে, কূটনীতি বাসা বাধে, চাণক্য নামটি ধরে, মৌর্যরে জাগালো সে। মৌর্যধারা উঠলো জেগে, নতুন নতুন রণসাজে; পশ্চিমের যবনধরে, নীতিশাস্ত্র উঠলো মেতে। বিন্দুসারের ধামা ধরে, আবার ভারত রণসাজে; অত্যাচারের কর্মফলে, পুত্রবেশে অশোক জাগে।
যবনদের আনাগোনা, বেশ জেগেছিল সেই সময়ে; আলেগজান্দার নামের রাজা, ধরা পরলো রাজস্থানে। পুরু রাজার হাত ধরি, পশ্চিমে রণডঙ্কা; রাজপুতেরা উঠলো জাগি, নাই কনো ভয়শঙ্কা। যুদ্ধে অনড়, ভবানী নাগর, রাজপুতদের কলাতে নজর। সঙ্গীত বলো, নৃত্য বলো, কারুকার্যেও তাঁরা অনড়। রাগরাগিণী এলো সকল, কত্থকনৃত্যের হলো স্থাপন; ইমারতির নতুন লীলা, পাথর এনে ছেলেখেলা। সুখে ছিল সেই রাজ্য, কলাবিদ্যায় যা অনিবার্য; একটুখানি জায়গা জুরে, থাকতো তারা সদা সুখে।
অন্যদিকে মগধমাঝে, অশোক রাজা উঠলো জেগে। যুদ্ধে অশোক শিরোমণি, অস্ত্রহাতে জল্লাদ উনি; পিতাভ্রাতা হত্যা করি, সিংহাসনে বসলো চরি। উত্তর ভারত জিতলো অশোক, তির্গতদের হলেন শাসক; মধ্যপূর্ব ভারত জুরে, অশোক নাম উঠলো ভরে। দক্ষিণকেও আনতে বাগে, কলিঙ্গে মাতলো রণে; মাতলো সেথায় তাণ্ডবে, রক্তনদী সেথায় বহে। দেখি সেই রক্তলীলা, অশোক মনে পেলেন ব্যাথা; স্মরণ এলো বোধিকথা, ভাঙলেন তিনি যুদ্ধপ্রথা।
বোধিধারার ছোঁয়া পেয়ে, ক্ষাত্রধর্ম নবসাজে, মেতে উঠলো দিকেদিকে, দক্ষিণ ও বঙ্গমাঝে। বঙ্গে এলো পাল সেন, দক্ষিণে চেরি চোলা; তার সাথে রাজপুত হাওয়া, দিকে দিকে জাগলো কলা। সঙ্গীতের রাগরাগিণী, নৃত্যকলায় প্রসাধনী, অট্টালিকার অঙ্গধ্বনি, সব মিলায়ে মধুরবানী। পলসেনদের টেরাকোটা, চোলাদের অকাট্য রেখা; নাট্যগীতের সুবর্ণশাখা, ভরিয়ে দিলো ভারতকথা।
বুদ্ধধারার শ্রেষ্ঠশাখা, উঠলো জেগে সেই কালেতেই; হর্ষবর্ধন নাম নিয়ে সে, শশাঙ্ককালে করলো শাসন। দক্ষিণে চোলা, পূর্বে গৌড়কনৌজের ঝোলা, উত্তরে হর্ষের খেলা, আর পশ্চিমে রাজপুতের কলা। সব মিলিয়ে, ভারত তখন দেশ না হয়েও, একসূত্রে বাঁধা পরে, পুষ্প হতে মালা গাঁথে। কলাশিল্প চারিদিকে; যুদ্ধ জানে, তবু শান্তি নিয়ে; সে এক আশ্চর্য ঐক্যধরে, মাতলো ভারত ঐক্যতানে।
তবে জানো টুনি, সপ্তসুরের একটি সুর যে, তখনো পরেনি ধরা! … হ্যাঁ, হর্ষবর্ধন প্রথম সুরে, তো রাজপুতানা দ্বিতীয়সুরে; চোলারা যদি তৃতীয় সুরে, বঙ্গ তখন চারের সুরে। মগধ ছিল পঞ্চম সুরে, আর কনৌজ ষষ্ঠসুরে; কিন্তু তবুও যে, নাহি দেখা মেলে, সপ্তম সুর চোখ নাহি ম্যালে। আর দেরী না; ঐক্যতান যখন জেগেছে হেথা, তখন কি হতে পারে, সরগম বৃথা! … তাই যে গান্ধারকোণের কুলে, মুঘলপাঠান জাগে তেড়েফুঁড়ে। … শান্তির স্থান এই দেশেতে, ধন আছে অগাধ, তা লুঠতে, প্রথম এলো পাঠান হেথা, বার্তায় গেল অন্য কথা। তাই যে তারা আসলো হেথা, এবার আর নয়কো একা; দলবেঁধে শান্তির খোঁজে, পাঠান এলো এবার হেথা। সিন্ধুনদীর নামটি ধরে, যবন বলে হিঁদুর ছেলে। হিঁদুরই আঁতুড়ঘরে, বুদ্ধ এলেন আলো করে। কিন্তু আদিকালে আর্য ভেঙে, আরবি হয়ে যারা ছিল, ভূমির টান কোথায় যাবে, তাই আবার তারা ফিরে এলো।
হিঁদু হলো, বুদ্ধ হলো, টাও হলো হুয়েনসাঙের হাতটি ধরে; কিন্তু তখনও যে সপ্তসুরের সপ্তম সুর, সুরটি ফেলে দূরে ছিল। তাই এবার এলো পাঠান ধরে, ইসলামের ধারা; পূর্ণ হলো ভারতভূমির সপ্তসুরের মালা। পাঠান থেকে খবর পেয়ে, শান্তির এই দেশের, পরপরই মুঘল এলো, আমাদের এই দেশে। বুদ্ধঋতুর সময়কাল এতখানিই ছিল, এবার টুনি মুঘলঋতুর কীর্তিকলাপ শোন।
