রবিমামা | কবিতায় ইতিহাস

রবিমামা সবার মামা; আমারও মামা, মায়েরও মামা। না, এই রবিমামা দেন না হামা; ইনি পড়ান জামা। ইতিহাসের পাতায়, বর্তমানের খাতায় – উনি পড়ান সুন্দর সুন্দর জামা, আর তাই তো আমরা সবাই ধরি উনার ধামা। সত্যকারের ইতিহাস, জানো তোমরা সবাই? না জানলে চলে এসো, ধর রবিমামার ধামা। ভুত সত্য, কাল্পনিক বর্তমান। সব মিলিয়ে, এ যেন এক ইতিহাসের ঝুলি, আর কল্পনার বুলি। না শুধুই যে আছে বুলি তাই নয়, আছে অদ্ভুত কিছু কারিগুরিও। জানতে হলে, এসো তোমরা আমার সাথে রবিমামার কাছে।

আমি টুনি, পুরো নাম টুনটুনি; বয়স হলো কুড়ি। গাঁয়ের নাম ঝুরঝুরি, সেথায় আমি সদাই ঘুরি; চঞ্চল বড়, তাই হয়তো নাম দিয়েছে টুনি। আমার জন্মের দশ বছর আগে, নাকি কনো ভয়াবহ দুর্যোগ এসেছিল সবার ভাগে। দেশ গেছে, রাজ্য গেছে, রাজাও উধাও হয়েছে। শুনেছি, তার আগে, নাকি সারা বিশ্ব ছিল একই সাথে। কে জানে? বড়রা বলে, শুনে তো গল্প গল্পই লাগে।

শোনো তবে, কি বলে, বড়রা এই ব্যাপারে। তাঁরা বলে, নাকি প্রচুর গাঁ মিলে, ছিল এক রাজ্য। নাম ছিল তার বঙ্গ; পূর্বে থেকেও নাকি পশ্চিম বঙ্গ। আরো বলে, ২৮ রাজ্য মিলে, ছিল না কি দেশ; তাঁর নাম ছিল ভারত মহাদেশ। বিশ্বে নাকি এমন দেশ ছিল একশো ছাপ্পান্ন; সবাই নাকি সবার সাথে একই সঙ্গে থাকতো। এরা যেত অন্য দেশে, সেখান থেকে তাঁরা আসে। মাঝে নাকি ভিসা বলে, ছাড়পত্রও চলতো দেশে। কই সে রাজ্য! কই সে দেশ! সেই দুর্যোগে কি সব হলো শেষ!

অনেকের অনেক কথা; সব মেলালে গুলায় মাথা। তাই ভাবনার মাঝে দিল উঁকি, রবিমামার ঘরে ঢুকি। উনি আমাদের সবার মামা, কিন্তু কার যে তিনি সত্যি মামা, তা আমাদের কারুর নেই জানা। বয়স উনার সবার বেশি, এখন উনি উনআশি। আমার মা পঞ্চাশ, আমার থেকে ত্রিশ বড়ো; রবিমামা আরো ত্রিশ, তবু কেন নয় খুরো? কেন মাও বলেন তাঁরে মামা! বাবার মামা, মায়ের মামা, আমারও তিনিই হন মামাই। ছোটোবেলায় ভাবতাম এমনই, এখন বুঝি। তিনি হলেন সবার মামা, আমাদের সবার প্রিয় রবিমামা।

ভাণ্ডার তাঁর অফুরন্ত। ইতিহাস যেন তাঁর আদ্যোপান্ত। আমারও খুব জানতে ইচ্ছা করতো; সেই দুর্যোগের আগে, ঠিক কি চলতো! তাই গেলাম মামার কাছে; বলেন না উনি তেমন কারুরই কাছে। যদি ভাগ্নির আবদার ফেলে না দেন পাছে; সেই আশাতেই গেলাম উনার কাছে।

রবিমামা তখন বসে একা, ঘরটা তামাকের গন্ধে ভরা। চারিদিকে ধুয়াধুয়া, রবিমামা বসে আধশোয়া। বলিনি আমি কনো কথা, তবু কি করে জানি, আভাস পেয়ে গেলেন মামা। বললেন, কে টুনি নাকি, ইতিহাসে দিবি টুকি?

কাছে গিয়ে বসলাম আমি, বললাম, মনের কথা কি করে জানলে শুনি? আমিতো তোমাকে কিছুই বলিনি, তবু কি করে জানলে তুমি! কি করে জানলে যে, ইতিহাসের কথাই জানতে, এসেছি আমি তোমার কাছে?

মামা বললেন, জানি জানি, সবই বুঝি। না বুঝলে, দুর্যোগের সেই রাত্রিটাতে, বাঁচলাম কি করে আগেভাগে?

বললাম আমি, আচ্ছা মামা এই কথাটি বলো খালি, হয়েছিল কি সেই রাতে? আর আমরা বাদে, বাকিরা কেউ কি বেঁচে আছে?

মামা বলেন, আছে আছে, অনেকেই বেঁচে আছে। হ্যাঁ, অনেকেরই পরাণ গেছে, কারুর দুর্যোগে, কারুর শুধুই ভয়েতে। তবুও অনেকেই আছে বেঁচে। ভিন দেশের কথা জানিনা বাপু; জানবো কি করে! আর যে বাজে না ভেঁপু। তবে হ্যাঁ, এই দেশের অনেকেই আছে, তবে এলোমেলো খুব হয়ে গেছে। 

আমি বলি, ভেঁপু মানে! ভেঁপু দিয়ে কে খবর দেয় বাপু?

মামা বলেন, ভেঁপুই তো ছিল, দেশবিদেশের খবর বিলোতো। মিশ্রধাতুর বাক্স সেটা, তড়িৎ ছুলেই বাজতো বেটা। তারই এক ছোট্ট ধারা, কেউ করতো না তারে সঙ্গছাড়া। তাতেই জানো দিদিভাই, আসতো দেশবিদেশের কথা; টিং টং, চিচিং ফং, শব্দ করে বাজতো সেটা। চোখ দিলেই ভাসতো খবর, আজবকথা তাবড় তাবড়। সেই খবরেই হানাহানি; সেই খবরেই টানাটানি। চলতো যেমন কানাকানি, তেমনই হতো জানাজানি। এ ওর খবর নিতো, সব কিছু তো তাতেই হতো। কিন্তু জানো, কি হলো তাতে! দুর্যোগ সব আসলো মেতে।

আসলে কি জানো টুনি, এই খবরের টোকাটুকি, করতে গিয়ে চিরতো মাটি। সাগরের তলা দিয়ে, ভূমিরও নিচে দিয়ে, সর্বত্র চিরে চিরে, ধাতু যেত সাপের বেগে। সেই ধাতুরই পিঠে চেপে, সব খবর আসতো দ্রুত বেগে। কিন্তু মাটির চেরাচিরি, সাগরের বুকে ছেঁড়াছিঁড়ি, ব্যাপার পুরো কেলেঙ্কারি। বিগরে গেল ধরিত্রী মা, বারে বারে দেয় ঝঞ্ঝা। তাও যেন নড়ে না টনক, তাই দিলো শেষে জব্বর চটক।

ছিটকে দিল সবাইকে, চিরে দিল ভারতকেও। বাকি দেশের নাইকো খবর, তবে যদি থাকতো আগের মত, তবে ঠিকই চলে আসতো। জলপথ না বিগড়ে গেছে, আকাশ মার্গ তো খোলা আছে। আসেনি সেই পথে, মানে …তাদেরও খবর আছে।

আমি বললাম, ভারত বুঝি দেশ ছিল, তবে আজকে সে কোথায় গেল?

মামা বলেন, আছে আছে, সবই আছে; গেছে খালি নামটা মুছে। আসলে কি জানো, এই নাম কিছুদিনেরই, আগে তো ছিল এমনই। আলাদা আলাদা রাজ্য ছিল; বন্ধু ছিল, শত্রুও ছিল। তবে দেশ বলে … না, কিছু না ছিল। সে তো বিস্তর কথা, সব রাজ্য মিলে, দেশ হলো শেষে। … রাজ্য সকল আজও আছে, শুনেছি খালি দক্ষিণ ভেঙে গেছে। নর্মদা নদী আছে, দুর্যোগ কালে, তা সাগর জলে ভরে গেছে। সেই জল দক্ষিণটাকে, ভেঙে দিয়েছে ভারত থেকে।

জীব মানুষ, প্রচুর গেছে, তাও অনেকেই আছে; তবে যা ছিল তার সামান্যই রয়েছে। তবে দেশ নামটা আর নেই। রয়েছে কেবল স্মৃতি টুকুই। এক করতে সেই দেশেরে, গেছে জানোতো আমার চার মেয়ে! ভালোবাসার কথা বলে, সকলকে যদি দেয় মিলিয়ে; চেষ্টা করে দেখুক তারা, পায় যদি মানুষের সারা।

বললাম আমি, রবিমামা, তোমার এই চারমেয়ে, বড় ইয়ে, কি করে তারা বয়সকালে, যায় তোমাকে একা ছেঁড়ে! এখন তো তাদের তোমার কাছে, ছিলো না উচিত সদা থাকে! কি না দেশ গড়তে, গেছে তারা দেশবিদেশে!

মামা বলেন, ও কি কথা বলো তুমি, সেই কাজ কি যেমন তেমন! এই দেশ যে ধরার সেরা, দেশ গড়তে হয় দিব্যখেলা। সেই কথা যদি শোনো তুমি, বুঝবে, কি কর্ম আমার মেয়েরা করতে গেছে। জীবন স্রোতের আখরা এ যে, জ্ঞানভক্তির তীর্থ যে সে; তাই তো এ দেশ গড়ার কালে, মোঘল সাহেব জমাট বাঁধে। সেরার সেরা দেবদূতেরা, এই দেশেতে মিলতো সদা; প্রেমের দেশ ছিল সে যে, আবার হবে এক করলে। ভূমির যত রূপের বহর, সবই ছিল এই দেশের জহর। সব জাতিরই ভাব মিশে, ঈশ্বরেরই নিবাস এতে। সেই দেশেরে এক করতে, আমার মেয়েরা পারি দিয়েছে। আমার আর আয়ু কত? দুইদিন পরে হব গত। কিন্তু ফিরেও যে আমায় আসতে হবে? আসবো কোথায়, এই দেশ না হলে?

আমি বলি, মানলাম তোমার কথাটা বেশ, তবে কেন চিরলো সাগর এ দেশ! এতো মানুষ এই দেশে, মরলো কেন দুর্যোগেতে!

মামা হেসে বলেন আমায়, টুনি বুড়ি, কর্মের জ্বালা, কর্মফলেই যে হবে তা সারা। যেই ধরণী প্রেম করে তোমারে, তারেই তুমি দিলে চিরে! দিলে দিলে, কাজ তো চালাও, অল্প চিরে! … তা না করে, লোভে পরে, দিতে থাকলে আরো আরো চিরে। সেই কর্ম কোথায় যাবে? একদিন না একদিন তো আসবেই সামনে। ঝঞ্ঝা প্রচুর দিয়েছিল, সাবধানও করেছিল। তাও যেন বেপরোয়া, তাই দিল শেষে ঘার মুড়িয়া।

আজব কথা বলে মামা, বুঝলাম তাঁর সব আছে জানা। তাই করলাম আবদার তাঁর কাছে, শোনাবে আমারে, সেই ইতিহাসে? এই দেশ কবে হলো, কি তার আগে ছিল? কেমন করে দেশ সে হলো? আর দেশ হবার পরে কি কি হলো?

মামা বেজায় খুশী হলেন, কথা সকল বললেন শোনাবেন। তাই আমি নিত্য আসি, মামার কাছে গল্প শুনি। সেই কথাই এবার বলি, শোনো তোমরা শান্ত থাকি; রবি মামার কথার ঝুলি, ভারতদেশের ইতিহাস বুলি।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6