পৈশাচিক প্রেম | ভুতের গল্প

আমি বললাম – এবার কোথায় যাবে, সেটা বলল কে তোমাকে?

সুন্দর পিশাচ বলল – যিনি পথ দেখিয়ে এতকাল নিয়ে আসছিলেন, তিনি ছাড়া আর কে বলবেন? জীবিত থাকতে তন্ত্র সাধনা করে নিজের ইচ্ছা পুর্তি করার চিন্তা জেগেছিল। তাই তান্ত্রিকের কাছেও তিনি বন্দি করালেন, আর দেখালেন তান্ত্রিকগণ কি করেন। আর তারপর সাধুমহারাজের কাছে নিয়ে গিয়ে, তাঁর নির্দেশে পরস্পর বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে গিয়ে দেখালেন, আমার তথা সকলের সমস্ত বেদনার কারণই হলো তাদের যাচনা, তাদের যোজনা আর তাদের কল্পনা।

তুমি তোমাকেই দেখনা, যেই কারণে তুমি জীবনের থেকে বিরক্ত, সেটা কি, একটি কন্যাকে যাচনা করেছিলে। তারপর কি করেছ? তারপর তুমি তোমার বন্ধুদের দিয়ে যোজনা করেছিলে, যা তোমারই এক কল্পনা যে যেই ছেলের সাথে সেই কন্যা চলে যাচ্ছিল, তাকে ভয় দেখালেই কাজ হবে, তাই জন্য করেছিলে। আর আজ দেখ, তুমি তোমার যাচনা, যোজনা আর কল্পনার কি ফল লাভ করছো!

আমি – তারমানে, তুমি আমার সাথেও বহুদিন ধরে আছো?

সুন্দর পিশাচ – তোমার সাথেই তো আছি। তুমিই তো আমার শেষ দেখা মানুষ, যাকে দেখার পর এবার আমি পাথর যোনি নেব।

আমি – তাহলে আমাদের করনিয় কি? আর তুমি বললে না, কি করলে তুমি সাধু মহারাজ চলে যাবার পর।

সুন্দর পিশাচ – আমি আরো সাধুদের কাছে যেতে থাকলাম, আর তাদের আচরণ দেখতে থাকলাম। আর করনিয় কি? ওই যে বললাম, যিনি আমাদের সমানে প্রেম করে গেছেন, যাকে আমরা সমানে গাল পেরে গেছি, সমানে অভিযোগ করে গেছি, সেই ঈশ্বরী। তিনিই তো আমাদের সমানে পথ দেখিয়ে গেছেন, যাতে আমরা আমাদের কল্পনা, যোজনা, আর যাচনার থেকে মুক্ত হই। তিনি সমস্ত কিছু করে যাচ্ছেন জগতময়; যার যা প্রয়োজন নিজের যাচনার থেকে মুক্ত হবার জন্য, সেই সমস্ত তিনি করে যাচ্ছেন। কিন্তু আমরাই কেবল নিজেদের বিকারগ্রস্ত যাচনা নিয়ে সর্বক্ষণ মজে রয়েছি।

সে বলতে থাকলো – আর দেখ, সেই যাচনার ফলে আমরা কঠিন কর্মফল ভোগ করছি। কর্ম তিনি করছেন, তাও আমাদের হিতের জন্য। কিন্তু আমরা যাচনা করে করে, তার সমস্ত আমাদের হিতের জন্য করা কর্মকে অস্বীকার করে যাচ্ছি, আর ফল ভুগে যাচ্ছি। আর সমস্ত ভোগান্তির শেষে, সেই তাঁকেই দোষ দিচ্ছি। জানো আমি তাঁর সাধনা করার সুযোগও পেয়েছিলাম জীবনে। কিন্তু না আমার যে যাচনা ছিলো, আমি গৃহসুখ পাবো, আমি সন্তানসুখ পাবো, এই পাবো, সেই পাবো। …

সমস্তই পেয়েছি, কিন্তু যখন আমার যাচনা সমাপ্ত হলো তখন পেলাম। যখন পেলাম, তখন আর যাচনা নেই, তাই যা একসময় যাচনা করেছিলাম, তাতেই বিষণ্ণ আর বিরক্ত হতে থাকলাম। আমরা বলি ঈশ্বরী অদ্ভুত, কিন্তু আসলেই তা নয়। আসলে আমরাই অদ্ভুত। বিচিত্র আমাদের ভাবনা, বিচিত্র আমাদের বিকার। আর সেই বিকারগ্রস্ত বুদ্ধির বলে, আমরা সর্বক্ষণ তাঁর প্রেমকেই টিপ্পনী করে গেছি। আজ আমি পিশাচ। আমার আর সাধন করার সময় নেই, সুযোগ নেই। পাথর যোনি হয়ে জন্ম নেব, তারপর কবে মানুষ হবো, তারও কনো ঠিক নেই। …

আর আজ আমি তাঁর প্রেমকে অনুভব করতে পারছি। আমি দেখেছি কত কত সাধুকে, নিজের যাচনার জন্যই তাঁরা সাধনা করে যাচ্ছেন। কিন্তু একবারও তাকিয়ে দেখছেনও না, তাঁকে কি দিয়েছেন ভগবতী। আমি অন্যকে কি আর বলি ভায়া, আমি নিজেই তো তাই করে এসেছি। … তিনি আমাকে সমস্ত কিছু দিয়েছিলেন, যা একটা জীবন বাঁচার জন্য প্রয়োজন। সুন্দর স্বাস্থ্য দিয়েছিলেন, সুন্দর পরিবার দিয়েছিলেন। ব্রাহ্মণপরিবার দিয়েছিলেন। সাধনের সুযোগও দিয়েছিলেন।

যখন সেই সমস্ততে মন টিকলো না, তখন স্ত্রী, পরিবার, কি দেন নি! কিন্তু আমি সমস্ত কিছুকেই নস্যাৎ করে, নিজের বিকারের থেকে জন্ম নেওয়া যাচনায় মজে ছিলাম। ভায়া, তিনি অপার প্রেম করেন আমাদেরকে। কিনা করেন না আমাদের জন্য। সমস্ত কিছু ছেরেছুরে, নিজে সর্বেসর্বা হওয়া সত্ত্বেও, নিজকে নেপথ্যে রেখে, আমাদের একপ্রকার সেবা করে যান। কিন্তু আমরা তাঁরই সেবাকে প্রত্যাখ্যান করতে থাকি। আর তা করতে করতে, এক সময়ে, তিনি আমাদের সেবা করতে চেয়েও আমাদের সেবা করতে পারেন না।

এই আমাকেই দেখ ভায়া, কতবার সাধু মহারাজ বলেছেন, একটা দেহ নিয়ে নিতে। যখন প্রথমবার বলেছিলেন, তখন দেহ নিলে, একটি সারমেয় জীবের দেহ তো পেয়েই যেতাম। কিন্তু না, আমার তো নিজের ধারণা প্রিয়। কি থেকে জন্মেছে সেই ধারণা, নিজের যাচনা, যোজনা আর কল্পনা থেকে, বা এক কথায় বিকার থেকে। আর সেই ধারণার ফলে, আমি কি করেছি, একের পর এক সম্ভব্য দেহকে ছেড়ে, শেষে আমি পিশাচ হলাম। …

তিনি আমাকে পিশাচ হওয়ার থেকে কতবার আটকাবার চেষ্টা করেছেন। যেই সাধুদের সান্নিধ্য আমরা পেতেই পারিনা, তারও সান্নিধ্য দিয়ে, তাঁর মার্গদর্শন প্রদান করেছেন। আর কত কি করবেন তিনি! … কিন্তু না আমরা তো নিজেদের প্রেম নিয়ে নিজেরা উলমালা। সামান্য একটা মূর্তি ঘরে আনলে, নিজেকে ভক্ত বলে চিহ্নিত করতে ব্যস্ত হয়ে যাই। সামান্য দিনে একটি বার তাঁর নাম নিলে, মনে করে আমি তাঁকে প্রেম করি। অথচ আমাদের বিশ্বাস দেখ ভায়া! একটি যাচনা পূর্ণ হলো না তো বিষণ্ণ হয়ে যাই, জীবনের প্রতিই বিরক্ত হয়ে যাই।

নিজের জেদের কারণে, সহস্র রোগ বাধিয়েছি, কিন্তু সেই রোগ যখন আমাকে বিরক্ত করে, তখন দোষ আমরা তাঁকে দিই। … তাঁর আমাদের প্রতি বিশ্বাস দেখ! আমরা দিনের পর দিন, তাঁর প্রেমকে অস্বীকার করে গেছি, দিনের পর দিন, তাঁর স্নেহকে অদেখা করে গেছি; তাঁর বিধানকে অস্বীকার করে গেছি। তারপরেও তিনি আমাদেরকে পিশাচ হওয়ার থেকে আটকাতে ব্যস্ত। আর আমরা আমাদের সেই তুচ্ছ বিশ্বাসকে বিশ্বাস বলি, যেখানে বিশ্বাসের নামে আমরা নতুন অবিশ্বাসের জন্ম দিই।

আমরা বিশ্বাস করি যে আমাদের যাচনা পূর্ণ করবেন তিনি। আর তা না পুড়ন হলেই আমরা তাঁকে দোষারোপ করতে শুরু করি। কেন আমাদের যাচনা পূর্ণ করবেন উনি! … কি ভিত্তি আমাদের যাচনার! … ছেলে আবদার করে ওই খেলা দিতে হবে, সেই খেলা দিতে হবে। মা কি সমস্ত খেলা কিনে এনে দেবেন! কেন দেবেন! সেই খেলা কিনে দিলে যে ছেলে শিক্ষাদীক্ষা ছেড়ে, বিদ্যার্জন ধেরে, জ্ঞান অর্জন ছেড়ে, জীবনের দিকে তাকানো ছেড়ে, সেই খেলা নিয়েই মেতে উঠবে। তা জেনেও মা কেন ছেলেকে সেই খেলা দেবেন!

আমাদের জননীরা সেটা করলে, তার কাজকে তো আমরা একটু বড় হয়ে বুঝি। কিন্তু জগন্মাতা যখন একই ভাবে আমাদের বিকারগ্রস্ত বায়নাক্কা মেটাননা, তখন আমরা তাঁর প্রতি, জীবনের প্রতি, সমস্ত কিছুর প্রতি বিরক্ত হয়ে যাই। এ আমাদের কেমন ভাবনা, কেমন বিশ্বাস, কেমন ভক্তি, কেমন প্রেম বলতে পারো!

আমার সাধুমহারাজ ছিলেন। সর্বক্ষণ ঈশ্বরীর নামের জপ করতেন, আহার পেলেও তাঁর কৃপা, আহার না পেলেও তাঁর কৃপা দেখতেন। তাঁর ইচ্ছাতেই বাঁচতেন, নিজের ইচ্ছার তাঁর কাছে কনো দামই নেই। এই সমস্ত কিছুর পরেও দিনের শেষে বসে বসে কাঁদতেন আর বলতেন, তুই-ই ভক্তি হয়ে বসে তোর ভক্তি করতে দিলি। ভেবেছিলাম সাধু হয়ে তোর সেবা করবো, সারা জীবন তুইই সেবা করে গেলি আমার। আর আমি স্বার্থপরের মত সেই সেবা নিয়ে গেলাম।

কাঁদতে কাঁদতে বলতেন তিনি, এতো আহম্মক আমি যে একবার মুখ ফুটে বলতেও পারলাম না, অনেক তো সেবা করলি, এবার ক্ষান্ত হয়ে বস। … যা কিছু ব্যাথা পেলাম, সেই সমস্ত ব্যাথা আমার অন্তরে তুই বসে গ্রহণ করলি। এতোই নিচ আমি, একটিবারও বলতে পারলাম না, এবার তোর ব্যাথা একটু দেয়ে মা! আমি তোর ব্যাথা একটু ভোগ করি।

এই সাধু যদি এমন হয়ে, নিজেকে ভক্ত না বলতে পারেন, নিজেকে প্রেমী বলতে না পারেন, তবে আমরা আমাদের তুচ্ছ ভণ্ডামিকে কি করে ভক্তি বলতে পারি ভায়া, আমাকে একটু বলবে! … আমি সাধু মহারাজের পরে, অনেক সাধুর কাছে গেছি। তাঁদের মধ্যে অধিকই সাধুর পোশাক পরে অসাধু। তাঁদের বিচার করা মানে, নিজেকে মহান প্রতিপন্ন করা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর তাছাড়া যেকটা সাধু দেখেছি ভায়া, সকলেই আমার সাধু মহারাজের মতনই।

তাঁরা সকলেই একটিই কথা বলেন ভগবতীকে – তুই হৃদয়ে বসে ভক্তি করাতে শেখালি, আর আমি নিজেকে ভক্ত বলে নাম কিনে বেড়ালাম। তাঁদের সকলেরই একই বাক্য – সেবা তুই করলি, আর আমি বলে ফিরলাম ঈশ্বরের সেবা করি। সকলেরই একই কথা – প্রেম তুই করলি, আর আমি বলে ফিরলাম যে আমি ঈশ্বরপ্রেমী।

ভায়া, এই সমস্ত কিছু দেখার পর, আমি একটি কথা স্পষ্ট ভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি। হয়তো আমার বহু দেহে আমার পিতা ছিলেন না, বা মাতা ছিলেন না, বা উভয়েই ছিলেন না। সেই প্রতিটি জন্মে আমি ঈশ্বরীকে দোষ দিয়ে ফিরেছি, কারণ তিনি আমাকে অনাথ করে জন্ম দিলেন বলে। কিন্তু সেই কনো জন্মে আমি অনাথ ছিলাম না। ভায়া আমরা সকলেই ব্রাহ্মণ হয়েই জন্ম নিই। কেন জানো? কারণ আমরা সকলেই ভগবতীর সন্তান। উপনয়ন সংস্কারের পর আমরা ভিক্ষামা রূপে, আমাদের জননীর গর্ভে আসি।

আমরা সকলেই ব্রাহ্মণ হয়েই জন্ম নিই, কারণ আমাদের সকলের মধ্যেই ব্রহ্মজ্ঞান পূর্ব থেকেই সঞ্চিত রয়েছে, যাকে আমরা সদাসদা অস্বীকার করে আসি। আমরা সকলেই তাঁর প্রেমকেই আহার রূপে গ্রহণ করি। ভূমি থেকে যা কিছু গ্রহণ করি, সে তো তাঁরই সিঞ্চন, তাঁরই দান। কিন্তু আমরা সেই তাঁকেই সর্বক্ষণ গাল পেরে আসি। ভুলের পর ভুল করি, আর সমস্ত কিছুর পর, আমাদের শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাই আমরা তাঁর কাছে ক্ষমা চাই, কিন্তু সেই ক্ষমাও একটা লোকদেখানি ক্ষমা।

সত্যিই যদি আমরা তাঁর প্রেমকে অনুধাবন করতে পারতাম, সত্যিই যদি আমরা বুঝতে পারতাম যে, তিনি আমাদেরকে ভ্রমের জগত থেকে, আমাদের বিকারের জগত থেকে আমাদেরকে মুক্ত করার জন্য, কি না কি করে যাচ্ছেন; সত্যিই যদি বুঝতাম যে আমাদেরকে তিনি কি অপার প্রেম করেন; সত্যিই যদি বুঝতাম যে তাঁর ন্যায় প্রেম করার সামর্থ্যই আমাদের নেই; সত্যিই যদি বুঝতাম, আমরা আসলে তাঁরই সন্তান, অন্য সকলে আমাদের পালিতা পিতামাতা কেবল, তাহলে আর যাচনা করতে থাকতাম না।

তাহলে আর যাচনার থেকে কল্পনাও করতাম না, আর সেই কল্পনার সাথে যাচনাকে মেলাবার জন্য যোজনাও করতাম না। আমরা জেনেও জানতে পারিনা যে, আমাদের এই যাচনা, যোজনা, আর কল্পনার জন্য যেই যাতনা আমরা লাভ করি, তার কেবল মাত্র ধারণাই আমাদেরকে বিষণ্ণ আর বিরক্ত করে দেয়, আসলে তো সেই সমস্ত বেদনা আর যাতনা তিনি আমাদের অন্তরে বসে গ্রহণ করতে থাকেন।

তিনি আমাদের প্রেম দিয়ে যান, আর আমরা সমানে তাঁকে যাতনা দিয়ে যাই। … ভায়া এবার আমি জেনে গেছি। এবার আর যাচনা করলে পিশাচ হতে হয়, সেই স্মৃতি নিয়ে পাষাণ হবো না। এবারে আমি, তাঁর কৃপাতেই জেনে গেছি যে, যাচনা আমাকেই বিনষ্ট করেনা কেবল, যাচনা তাঁকে বেদনার পর বেদনা প্রদান করে। তাই এবার আর নিজের তুচ্ছ প্রেমের ব্যাখ্যান করবো না ভায়া; এবার আর আমার তুচ্ছ বিশ্বাসের গরিমা গাইবো না। এবারে আমি তাঁর গরিমা গাইবো। এবারে তাঁর প্রশস্তি করবো। তিনি কি ভাবে আমাদের সমস্ত অপমান সহ্য করেও, আমাদেরকে অপার স্নেহ করে যান।

কি ভাবে তিনি আমাদের সহস্র অভিযোগের সত্ত্বেও, আমাদেরকে নিজের বুকে আকরে ধরার জন্য পথ দেখাতে থাকেন, এবারে আমি সেই গরিমাই গাইবো। ভায়া এবারে আর আমার যাচনার চিন্তা নেই, কারণ আমি এবারে, তাঁরই কৃপায় জেনে গেছি যে, তাঁর ইচ্ছাতে জীবনের পথে চললে, তবেই তাঁর বুকে মাথা রাখতে পারবো। জেনে গেছি যে তিনি আমাদের নিজের জননী, সত্যকারের জননী, একমাত্র জননী। আর এও জেনে গেছি যে, আমরা তাঁর সন্তান হলেও, নিজের মায়ের কোল পর্যন্ত পৌঁছানর পথ আমরা ভুলে গেছি।

এবারে আমি জেনে গেছি যে, যদি নিজের যাচনার চিন্তা করি, তবে সেই কোলে পৌঁছানর পথ জীবনেও, সহস্র কোটি জন্মেও খুঁজে পাবো না। জেনেগেছি যে একমাত্র তাঁর ইচ্ছার অনুসরণ করলেই, তাঁর কোলে আবার যেতে পারবো, আমার নিজের মায়ের কোলে যেতে পাবো।

ভায়া আর আমার কনো যাচনা নেই। এবারে আমি জেনে গেছি যে, যা কিছু যাচনা করেছিলাম, কেবল মাত্র তাঁর কোলের সুখকে লাভ করার জন্যই সেই যাচনা করে গেছি। সুন্দরি স্ত্রীর কোল চেয়েছিও সেই কারণেই, সন্তানের স্পর্শ চেয়েছিও সেই কারণেই, উত্তরাধিকার চেয়েছিও সেই কারণেই, যুদ্ধে জয়লাভ চেয়েছিও সেই কারণেই, সুস্বাদু খাবার চেয়েছিও সেই কারণেই, নামযশ চেয়েছিও তাঁর কাছে পরিচিত হবার জন্যই। সমস্ত সুখের চিন্তা, তাঁর কাছে যাবার জন্যই করেছি এতাবৎকাল, আমি তা জেনে গেছি ভায়া।

তাই আজ আমার আর কনো যাচনাই নেই। … হ্যাঁ শুধু একটিই যাচনা রয়েগেছে, আর তা হলো আমার নিজের জননীর কোল পাবার যাচনা। … আমাকে এবার তিনি প্রতি জন্মে অনাথ করে জন্ম দিন, আমার আনন্দই আনন্দ, কারণ আমার কনো পালিত মাতাপিতা থাকবে না, যিনি আমার মাতা, তিনিই আমার পালন করবেন। আমাকে যেই প্রকার তিনি চাইবেন সেই প্রকার স্ত্রীস্বামী দিন, কারণ তিনি তো নিরাকার। তাই সুশ্রী হোক, আর বিশ্রী, সেই স্ত্রীর বেশে তিনিই তো প্রেম দিচ্ছেন। … সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে, কনো আপত্তি নেই। জেনে গেছি পুরুষও তিনিই, আর স্ত্রীও তিনিই, কারণ তাঁর তো কনো লিঙ্গই হয়না। তিনিই আমাদের মাতা, তিনিই আমাদের পিতা।

আর কনো যাচনা নেই। জেনে গেছি আমি যে আমি অনামা হলেও, তিনি আমাকে দেখতে পাচ্ছেন, কারণ তিনি তো আমার অন্তরে বসে আমাকে দেখছেন আর আমাকে কোলে নেবেন বলে অপেক্ষা করছেন আর আমাকে পথ বলে দিচ্ছেন, যেই পথে চললে তাঁর কোলে পৌছাতে পারবো। তাই আমার আর কনো নামযশের প্রয়োজন নেই। আমার আর আহারেরও চিন্তা নেই। যার মাতা স্বয়ং জগজ্জননী, যার মাতা স্বয়ং অন্নপূর্ণা, তার আবার আহারের অভাব হতে পারে নাকি!

আমার আর কনো কিছুর চিন্তা নেই, তাই আমার আর কনো ইচ্ছাও অবশিষ্ট নেই। তুমিও আর ইচ্ছা রেখো না ভায়া। তাঁর ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করো। জগতে সকলেই দাবি করবে যে সে তোমার বড় আপন। কিন্তু সত্য এই যে, তিনি ছাড়া কেউ আপন কনো কালেই ছিল না, আর কেউ হবেনও না। তাই ভায়া, এঁকে, ওকে, তাঁকে আপন মানতে যেও না। তোমার ঘরে তিনি মাতৃসুলভ তোমার বৌদি হয়ে অবস্থান করছেন। এরপর আর তাঁকে দশদিশায় না খুঁজে, নিজের অন্তরে দেখ। ভায়া, তোমাকে আমি আজ থেকে ১৫ বছর আগে থেকে দেখছি। তোমার জীবনের সমস্ত যাচনা, যোজনা আর কল্পনাকে আমি দেখেছি। আমি এবার পাষাণ হতে চললাম। কিন্তু যাতে তোমার পরিণতিও আমার মত না হয়, তাই আগে থেকে বলে গেলাম। সাবধানে থেকো।

সুন্দর পিশাচ চলে গেল। সত্যি সত্যিই কি সে এসেছিলো, নাকি সে আমার স্বপ্ন ছিল, ঠিক বলতে পারবো না, কারণ যখন সে চলে গেল বলে আমি সুন্দর বলে চেঁচিয়ে উঠলাম, তখন আশেপাশে কেউ নেই। আমি একাকী বৈঁচির শ্মশানে শুয়ে রয়েছি। রাত্রি কটা হবে জানিনা। দূরে দেখলাম একটা আগুন জ্বলছে, কারুর মরা পরাচ্ছে বোধ হয়। একবার ইচ্ছা করলো যাই দেখে আসি। কিন্তু পরের মুহূর্তে সুন্দরের কথা মনে পরলো, নিজের দেহ দেখতে গিয়ে সেই তান্ত্রিকের কাছে বশ হয়েছিল। তাই আর গেলাম না।

পরের দিন সকালে বাড়ি ফিরে গেলাম। এই ঘটনার পরে পরেই বড়বৌদি বড়দাকে বলে আমার জন্য একটা ঘর খালি করিয়ে, একটা পেপারে বিজ্ঞাপন দিয়ে দেন। আর তার এই একমাস পর থেকে আমি জ্যোতিষের কাজ করছি। প্রায় ৩৫ বছর হয়ে গেছে, আমি সেই জ্যোতিষের কাজই করছি। বড়বৌদি আমার বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিয়ে হয়নি। আমি বাঁধা দিই নি একবারও। এঁকে করবো, ওকে করবো না, এমনও বলিনি। রিজেক্ট আমাকে করেছে পাত্রীরা। হয়তো জগজ্জননীর আমার উপর কৃপা হয়েছে। হয়তো আমার জননী আমাকে কোলে নিতে চাইছেন, তাই সমস্ত ঝঞ্ঝাটের থেকে মুক্ত করে, আমাকে অন্তর্মুখী করছেন।

আমার বয়স আজ ৬২। এক সপ্তাহ আগে থেকে, সুন্দর পিশাচের কথা লিখতে বসেছিলাম। না তার কথা মনে পরছিল বলে নয়। সেদিন সকালে বাজারে গেছিলাম ভাইজি-জামাই বিয়ের পর প্রথম আসছে বাড়িতে, তার বাজার করতে। একজন যুবক আমার কাছে এসে, আমার চরণ ছুঁয়ে হঠাৎ প্রণাম করে বলল – আমায় চিন্তা পাচ্ছেন!

আমি বললাম – না তো বাবা, তোমায় তো চিনতে পাচ্ছিনা! … তুমি কি আমার থেকে তোমার ছেলের জন্মপত্রিকা করিয়েছিলে?

সে বলল – না জ্যাঠামশাই। আমার তো ভগবতী বিবাহ দেন নি। এবারে তিনি আমাকে কোলে নেবেনই। এমন পণ করেছেন।

আমি বললাম – তাহলে তো তোমাকে কনোভাবেই চিন্তা পাচ্ছিনা!

সে আমার কানের কাছে মুখটা নিয়ে এসে বলল – আমি সুন্দর, সুন্দর পিশাচ। মনে পরছে! … আপনাকে কথা সকল বলার পর, আপনি তো পরের দিন চলে গেলেন। আমি সেই শ্মশানেই তিন রাত্রি বসে বসে জগন্মাতার জন্য কেঁদেছিলাম। তাঁর এতো করুণা যে, তিনি আমাকে দেখা দিলেন উর্জ্জাবেশে, আর বললেন, মানব জন্ম নিয়ে তাঁর কোলে যেতে। … বাকি যা জলতত্ত্ব বা আকাশতত্ত্বের অভাব ছিল, তিনিই মিটিয়ে দিলেন আর কি!

আমি আর কনো কথা বলিনি। বেশ কিছুক্ষণ ভুত দেখার ভয়ে তটস্থ হয়েছিলাম। শেষে শান্ত হয়ে মনে করলাম সুন্দর পিশাচের কথা। তার মানে আমি স্বপ্ন দেখিনি। … সত্যিই সে এসেছিলো, আর সত্যিই সে ভগবতীর কৃপা লাভ করেছে!

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4