তৃতীয় পর্ব – সাধুর পরামর্শ
সুন্দর বলতে থাকলো – একটা একটা করে বলতে গেলে, কম করেও ১০০টা মানুষের জীবন বলতে একটি করে বছর তো লেগেই যাবে। অতোদিন তো তুমি বাঁচবে না। তাই আলাদা আলাদা করে না বলে, একের পর এক, যখন যখন যা জেনেছি, সেটাই বলছি শোনো।
এবার সে দীর্ঘ ভাবে বলতে শুরু করলো –
প্রথমেই যার কাছে সাধু মহারাজ আমাকে পাঠিয়েছিলেন, সে একটি স্ত্রী। অবিবাহিতা স্ত্রী, সবে যৌবনে পা দিয়েছেন তিনি। আমি তাঁর কাছে যাবার পর, বছর পাঁচেক মাত্র বেঁচেছিলেন তিনি। যখন গেলাম তাঁর কাছে, দেখলাম তিনি অনেক পুরুষের কামনা হয়ে বিরাজ করছেন। তিনি নদীতে নাইতে যান, বা কলসিতে জল ভরতে যান, পুরুষেরা তাঁকে দেখবে বলে অপেক্ষা করে থাকে। সকলের নজর তাঁর দিকে, উনি জানেন, তাই স্নান করার সময়ে, শুকনো কাপর নিয়ে যেতেন না। ভিজে কাপরই অঙ্গে জরিয়ে আসতেন, যাতে তাঁর স্তনদেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আর সেই দৃশ্য দেখার জন্য, পুরুষের ভিড় বারতেই থাকে। আর যতই সেই ভিড় বারে, ততই সেই কন্যার কামুকভাব বারতেই থাকে। পুরুষেরা কি করে নিজেদের দেহজ্বালা মেটাতেন জানিনা, তবে সেই কন্যা, নিজের যৌবনের জ্বালায় অস্থির হতে শুরু করে দেন। আর সেই অস্থিরতা এমনই বৃদ্ধি পায় একসময়ে যে, তিনি নিত্য আত্মরমণ করতেন। কিন্তু তারপরেও তাঁর সাধ মিটতো না। তাই একজন পুরুষের সন্ধান উনি সমানে করে চলেছিলেন।
কিন্তু সন্ধান করলেই কি আর তা পাওয়া যায়। … দীর্ঘ ৩ বছর সেই কন্যার কেবল অপেক্ষা আর নিত্য দ্বিপ্রহরে এবং রাত্রে আত্মরমণ করতে থাকলেন। আর স্নান থেকে ফেরার সময়ে সেই সিক্ত বস্ত্র, এমনকি কলসি করে দিনে চারবার জল আনতে যাবার কালে, বস্ত্রকে ইচ্ছা করে সিক্ত করে নিতেন, আর পুরুষদের লোলুপ দৃষ্টিকে আকর্ষণ করতেন।
৩ বছর যাবার পর, একটি উৎসবের সময়ে, একটি পুরুষের সাথে তাঁর সাখ্যাত হয়। সেই পুরুষটির সাধারণ পথচলাতেই, কন্যাটি আঘাত পেয়ে ভূমিতে ধরাশায়ী হয়ে যায়। পুরুষটি তাকে ভূমি থেকে উত্তোলন করলে, কন্যাটি পুরুষটির অঙ্গের গন্ধের ঘ্রাণ লাভ করেন, আর সেই থেকে কন্যার যৌনতা সপ্তম স্তরে উন্নীত হয়। … বিভিন্ন সময়ে, কেবল সেই পুরুষটিকে দেখার জন্যই সেই কন্যা বাড়ির বাইরে যেতেন।
যেমন করে তাঁকে সকল পুরুষেরা এতকাল দেখতো, এখন তিনি সেই পুরুষকে অনুরূপ ভাবে দেখেন। …এমন ভাবে একটি বছর চলে গেলে, যখন কন্যাটির যৌবনজ্বালা অতিশয় পীড়ার কারণ হয়ে যায় তার কাছে, তখন সে সেই পুরুষটির সাথে সাখ্যাত করতে ব্যকুল হয়ে ওঠে। … অনেক প্রয়াস করে, প্রায় ৬ মাস পরে যখন পুরুষের সাখ্যাত লাভ করেন, তখন পুরুষটির সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। … কন্যাটি আর সিক্ত বস্ত্র পরিধান করে অন্যপুরুষদের আকৃষ্ট করতেন না। বরং এই পুরুষই তাঁর কাছে সমস্ত কিছু হয়ে যায়।
পুরুষটির কথাই কন্যা দিবারাত্র ভাবতেন। যৌনতাও সেই পুরুষের প্রতিই আকৃষ্ট, আর মনপ্রাণ সমস্ত কিছুই। সেই পঞ্চম বছর যখন সমাপ্তির মুখে, তখন সেই কন্যাকে বিবাহ করতে পুরুষটি রাজি হয়ে যান। … কিন্তু যেইদিনই পুরুষটি সেই কথা বলেন, কন্যাটি অত্যন্ত কঠিন ভাবে রোগে জরাজীর্ণ হন। … বৈদ্য দেখে বললেন, দীর্ঘকাল দেহে সিক্ত বস্ত্র রাখার জন্য, কন্যার দেহে জল জমে গেছে। কন্যার আয়ু আর বেশিদিন নেই। … সত্যিই আর কন্যাটির আয়ু বেশিদিন ছিলনা। শয্যাশায়ী হবার সপ্তম দিনেই সে দেহ রাখে।
যেই পুরুষের সন্ধান করছিলেন, সেই পুরুষ তাঁর কাছে সঠিক সময়েই আসে, এবং সন্ধান না করতেই আসে। কিন্তু যেই সময়ে সেই পুরুষের সন্ধান করে বেরিয়েছে কন্যাটি, আর সেই সন্ধানের উদ্দেশ্যে নিজেকে সিক্ত বস্ত্রে জরিয়ে রেখে সমস্ত পুরুষদের আকৃষ্ট করে বেরিয়েছে, সেই কর্মের ফলস্বরূপ, যখন কন্যাটি সত্যসত্যই নিজের প্রাণের মানুষকে পেলেন, তখন আর সেই প্রাণের মানুষের সঙ্গ পেতে পারলেন না। সঙ্গ লাভের আগেই দেহ রেখে দিলেন। কি বুঝলে এর থেকে?
আমি – ইচ্ছা! ইচ্ছাই এই কন্যার সমস্ত সম্ভাবনাকে হত্যা করে দিলো। ইচ্ছা না রাখলে, পুরুষদের আকৃষ্টও করতো না সে, আর তাই রোগগ্রস্তও হতো না। প্রাণের মানুষকে তো যখন পাওয়ার কথা, তখন পেয়েই গেছিল। কিন্তু নিজের ইচ্ছার ফলে, সেই প্রাণের মানুষের সঙ্গলাভ আর তার হলো না। … তার সুখপ্রাপ্তির প্রচুর সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু তার ইচ্ছাই, তার সুখপ্রাপ্তির পথে কাঁটা হয়ে উঠলো।
সুন্দর পিশাচ এবার পরের কথা বলতে শুরু করলো –
দ্বিতীয়ক্ষেত্র যেখানে সাধু মহারাজ আমাকে পাঠিয়েছিলেন, সেখানে আমি আঠারো বছর ছিলাম। এখানে আমাকে দেখতে পাঠিয়েছিলেন একটু যুবা রাজপুত্রকে। সেই যুবা রাজপুত্রকে যেমন সুন্দর দেখতে, তেমনই সুন্দর তার স্বভাব। রাজ্য পরিভ্রমণ করতেন তিনি, আর যদি কনো অসহায়কে দেখতেন, অবশ্যই তাকে সাহায্য করতেন। এই দেখাদেখি, একটি কন্যা তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য যখনই যুবরাজ তাঁর সম্মুখে আসতেন, তখনই হয় শুকনো ডাঙ্গায় পরে যেতেন, নয় কর্দমা থাকলে, তাতে পরে যেতেন।
যুবরাজটি তাকে প্রতিবারই সাহায্য করেন। আর এই সাহায্য দ্বারা তৈরি হওয়া সম্পর্ক নিয়ে সেই কন্যার অত্যন্ত হরষ হয়। কন্যাটি এবার ক্রমশ যুবরাজের তনুর কাছাকাছি আস্তে আগ্রহী হয়ে, তাঁকে যৌনতার পাশে আবদ্ধ করার ইচ্ছা করলে, একদিন সে নিজেকে জলাশয়ে ফেলে দেয়। রাজকুমার তা দেখা মাত্রই নিজের ঘোটক থেকে উত্তীর্ণ হয়ে, জলাশয়ে ঝাঁপ দেন। … কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে, যেখানে তিনি ঝাঁপ দিয়েছিলেন, সেটি ছিল সেই জলাশয়ের একটি ঘূর্ণি। তাই রাজকুমারের সমস্ত সাঁতার কাটার প্রয়াস ব্যর্থ হতে থাকে।
অন্যদিকে সেই কন্যাটি জলাশয়ে পরেগিয়ে, ডুব সাঁতার কেটে জলাশয়ের মাঝখানে চলে যান, যাতে তাঁকে যুবরাজ নিয়ে আস্তে গেলে, সে নিজের তনুকে যুবরাজের তনুর নিকটে অনেকক্ষণ রাখতে পারে। … তাই তাঁর পক্ষে যুবরাজকে বাঁচানোর জন্য সাঁতরে এতদূরে, পারের কাছে আসাও সম্ভব হয়ে ওঠেনা। … অন্যদিকে, একটি জেলেকন্যা, যুবরাজকে সেই ঘূর্ণিতে পরতে দেখেন। সর্বক্ষণ জলের কাছেই থাকার কারণে, সেই স্থানে যে ঘূর্ণি আছে, সেই ব্যাপারে জেলের মেয়ে পূর্ব থেকেই জানতেন। …
তাই তাড়াহুড়ো করে, একটি বড় ধরনের ফাঁস বেঁধে সে যুবরাজের দিকে ছুড়ে দেয়। আর যুবরাজকে সেই ফাঁসে বেঁধে, সকল জেলেদের ডেকে নিয়ে এসে, যুবরাজকে ঘূর্ণি থেকে বাঁচান। তারপর সেই জেলেকন্যার সাথেই যুবরাজের ঘনিষ্ঠতা হয়, আর তাঁর সাথেই বিবাহ হয়।
আমি – অদ্ভুত কথা এটি। একজন যাচনা করে, অনেক কল্পনা করে, সেই কল্পনার সাথে মিলিয়ে যোজনা স্থির করলো। কিন্তু ফলপ্রাপ্তি হলো অন্য কারুর, যার মধ্যে না ছিল যাচনা, না যোজনা আর না কল্পনা।
সুন্দর পিশাচ – এতো গেল সেই সকল কথা যেখানে যাচনা, যোজনা, আর কল্পনা কাজ করলো না। এবার শোনো আরেক কথা, যেখানে এই সমস্ত কিছু কাজ করে যায়। তারপর কি হয় দেখো।
এই বলে সুন্দর আবার একটি কথা বলতে শুরু করলো –
এই ব্যক্তি একটি বৃত্তবান ব্যবসাদার ছিলেন। ইনি যা চাইতেন, তাই পেতেন। কিন্তু এই ভাবে বলা ভুল হবে, কারণ তিনি যা চাইতেন, তাই পেতেন না, তাই অর্জন করতেন। অন্তত এমনটাই তিনি দাবি করতেন। তিনি যাকে বিবাহ করতে চেয়েছিলেন, সেই কন্যার পিতাকে দরিদ্র করে দিয়েছিলেন, নিজের ধার দেওয়া ধনের সুদে। আর যখন আর তাঁর সুদ বা মূলধন, কিছুই দেবার সামর্থ্য রইলো না, তখন তিনি সেই দেনা থেকে মুক্ত করে দেবার মুক্তিপণ রূপে তাঁর কন্যাকে বিবাহ করেন।
একই ভাবে, তাঁর আরো একটি স্ত্রীর উপর নজর যায়, যিনি বিবাহিতা। … এই ক্ষেত্রেও, তিনি তাঁর স্বামী, যিনি রাজপ্রাসাদের পাহারাদার ছিলেন, তাকে বাণিজ্য করার মন্ত্রণা দেন, এবং সেই বাণিজ্য করার জন্য অগ্রিম কিছু ধন দেন। এরপর, সেই ধন নিয়ে সেই পুরুষ ভিনরাজ্যে বাণিজ্য করে ফেরার পথে, তাঁর নৌকাডুবি করিয়ে দিয়ে, সেই পুরুষসহ, তার সমস্ত উপার্জনকেও জলে মিশিয়ে দিলেন। যখন স্বামী ফিরলেন না, তখন সেই স্ত্রীর কাছে উপস্থিত হয়ে, তাঁর থেকে নিজের ধার দেওয়া ধন ফেরত চান। নিরুপায় স্ত্রী সেই দেনা থেকে মুক্তি চাইলে, মুক্তিপণ রূপে, সেই স্ত্রীকে নিজের স্ত্রী করে নেন ব্যবসায়ী।
এই ভাবে ৫টি স্ত্রী করেন সেই ব্যবসায়ী। আর এই ভাবে বহু অন্য ব্যবসায়ীর ব্যবসাও ছিনিয়ে নেন তিনি। মধ্যবয়সে এসে, তাঁর প্রতিপত্তি এতই হয় যে তিনি স্বয়ং রাজাকেও ধন ধার দিতেন। … তাঁর পাঁচ পত্নীর থেকে ১৫টি ছেলে ও একটি কন্যা। আর এই একটি কন্যা পিতার কাছে আবদার করেন যে, তাঁর রাজপুত্র লাগবে। একটিমাত্র কন্যার বিবাহ দেবার জন্য, এবার সেই ব্যবসায়ী, রাজার সাথেও শঠতা করে, রাজাকে দেউলিয়া করলেন। আর শেষে রাজপুত্রকে নিজের কন্যার স্বামী করলেন।
কিন্তু এই রাজার ছেলে, অর্থাৎ জামাই সাধারণ ভাবেই, তাঁর সমস্ত ১৫টি ছেলেকে নিয়ে ভ্রমণে যাবার কালে, মাঝনদীতে তুফানের কবলে পরে। … জামাই অর্থাৎ রাজপুত্র, কনো ভাবে বেঁচে ডাঙায় ওঠেন, কিন্তু ব্যবসায়ীর সকল ১৫টি ছেলে তুফানের কবলে পরে, নদীতেই ডুবে যান। যখন শ্যালকদের ছাড়া বাড়ি ফেরেন রাজপুত্র, তখন ব্যবসায়ী ক্ষিপ্ত হয়ে যান, এবং জামাতাকে অশ্রাব্য কথা বলেন।
আর উত্তেজনার বসে জামাতাকে অশ্রাব্য কথা বলার কালে, তিনি বলেন যে কি ভাবে তিনি রাজাকে দেউলিয়া করে, রাজপুত্রকে নিজের জামাতা করেছিলেন, আর প্রশ্ন করেন, তার প্রতিশোধ নিচ্ছেন রাজপুত্র! … যেই সত্য কেবল ব্যবসায়ীর স্ত্রী ও সন্তানরা জানতেন, অন্য কেউ জানতেন না, সেই সত্য ব্যবসায়ী নিজমুখেই বলে দেন। আর তারফলে রাজপুত্র এবার ব্যবসায়ীকে আজীবন কারাবাস দিলেন, এবং তাঁর স্ত্রী ও পুত্রবধূদের রাজপুরের দাসীবাঁদী করে রেখে দিলেন।
আমি – অদ্ভুত কথা আছে তো তোমার ঝোলায় সুন্দর! … সারাজীবন যাচনা, যোজনা আর কল্পনার মধ্যে স্থিত হয়ে যিনি সাফল্য পেলেন, তিনি শেষে গিয়ে নিজেই নিজেকে ধ্বংস করে দিলেন! … হ্যাঁ, এমনই হয়। আমি আমার জন্মদাত্রীর ক্ষেত্রেই এমন দেখেছি। … আমার বড়দাকে ডাক্তারি পড়িয়েছিলেন, আর আমাকে আর মেজদাকে পড়তেই দিতেন না। পড়তে বসলেই, এটা কর, সেটা কর করে উঠিয়ে দিতেন। আর সকলকে বলে বেড়াতেন যে আমাদের দ্বারা নাকি পড়াশুনা হবেনা।
শেষে, আমার বড়দা ডাক্তার হলেন এবং বিবাহ করলেন। আর বড়বৌদি আমার মেজদাকেও প্রতিষ্ঠিত করে দিলেন। শেষে মেজদার বিবাহও দিলেন। কিন্তু অবশেষে, যিনি যোজনা করে, একটি ছেলেকে পড়াশুনা শিখিয়ে রেখে দিয়েছিলেন এই যোজনা নিয়ে যে সে-ই তাঁকে শেষ বয়সে দেখবে, তাঁরই হাত ধরে বাড়ির বাইরে, বৃদ্ধাশ্রমে চলে যেতে হলো তাঁকে।
সুন্দর পিশাচ – হ্যাঁ, যোজনা, যাচনা এবং কল্পনা করে যারা ভাবেন যে তাঁর যোজনা অনুসারেই সমস্ত কিছু হচ্ছে, তিনি ঠিকই ভাবেন। তাঁর যোজনা অনুসারেই তিনি বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছেন। আমি এমন রাজাকেও দেখেছি, যিনি যোজনা করে, প্রজাকে যান্ত্রিক ও পুঁজিসর্বস্ব করে রেখেছিলেন, যাতে প্রজা তাঁরই জয়জয়কার করেন। … করেও ছিলেন জয়জয়কার প্রজা, কিন্তু মৃত্যুর পরে সেই রাজা যখন সামান্য ব্রাহ্মণের ঘরে জন্ম পাচ্ছিলেন, তিনি তা নিলেন না। আর শেষে, যখন তাঁর মানবদেহ ধারণ করার ক্ষমতাই চলে গেল, তখন তিনি সর্পযোনি নিতে বাধ্য হলেন।
অর্থাৎ যোজনা, যাচনা, আর কল্পনা অনুসারেই আমরা নিজেদেরকে পতিত করি। … বা অন্যভাবে বলতে গেলে, আমরা যতপ্রকার যোজনা করি, সমস্তই আমাদের বিনাশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার জন্যই করি। সেই নিরিখে একটি কথা শোনো।
এই বলে সুন্দর আবার বলতে শুরু করলো –
কথাটি একটি ব্রাহ্মণ বোকা ছেলের। ছেলেটি বোকা, অলস, কিন্তু সরল। আর তার সরল বুদ্ধি তাকে দেখায় যে, যারা যারা নিজেদের বুদ্ধির প্রয়োগ করছেন, তারা সকলে কিছু না কিছু করে নিচ্ছে, আর সে কিচ্ছু করতে পারছে না। সেই কথা ভেবে, সেই বোকা ছেলে, যার বুদ্ধি নেই, সে যাচনা করতে থাকলো, আর সেই যাচনাকে ঘিরে কল্পনা করতে থাকলো।
যাচনাও সে করে, কল্পনাও সে করে, এমনকি যোজনাও সে করে। কিন্তু অলস হবার কারণে, তার যোজনা সদাই এমন হতো যে, সে কিছু চাইবে ভপগবানের কাছে, আর সেই বস্তু তার কাছে এসে যাবে। … কিন্তু ওই কথায় আছে না, যে নিজেকে সাহায্য করেনা, তাকে ভগবানও সাহায্য করেনা। তেমনই হলো ছেলেটির সাথে। ছেলেটি একটির পর একটি যোজনা করে, কিন্তু সেই যোজনাতে সে কিছুতেই সফল হয়না, কারণ সেই যোজনাতে নিজের পরিশ্রম করার স্থানটিই রিক্ত রাখতো।
যোজনার পর যোজনা করার জন্য, ব্রাহ্মণ বালকের পিতামাতা ভাবেন ছেলের মধ্যে প্রচুর কিছুর সম্ভাবনা আছে। আর সেই ভাবার কারণে, তাঁরা ছেলেকে নিয়ে উচ্চ আশা করতে থাকেন। কিন্তু অন্যদিকে, ছেলে, বাপমায়ের যাচনাকে ধারণ করে কেবল কল্পনা করে গেছে আর যোজনা করে গেছে। অন্য কিচ্ছু সে করেনি। কিন্তু ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে, এমন বাবামা বিশ্বাস করেন, আর সেই বিশ্বাসের আগুনে, ছেলেও সমানে ঘি ঢালতে থাকেন।
নিজের যোজনার উপর এবং আলস্যের উপর সেই ছেলের প্রকাণ্ড ভরসা। আর সেই ভরসার জোরে, সে তার বাবামাকেও আশ্বাসবাণী শোনাতে থাকে যে, অমুকটা সে করে নেবে, তমুকটা সে করে নেবে। … সেই আশ্বাসবাণীর ভরসাতে বাবামা একসময়ে যখন দৈন্যদশায় পতিত হলেন, তখন ছেলেকে নিয়ে রাজার কাছে যান। এবং রাজাকে বলেন যে তাঁর ছেলে একটি রত্ন।
এক তো ব্রাহ্মণ, তার উপর পিতা বলেছেন ছেলে রত্ন। … তাই রাজা সেই ছেলেকে পণ্ডিতের চাকরিতে বহাল করেন। … কিন্তু ছেলে পড়াবে কি? ছেলে যে নিজেই কনোদিন পড়াশুনা করেনি। কেবলই যোজনা করে গেছে, আর আলসেমো করে গেছে, আর তার সাথে সাথে পিতামাতাকে আশ্বাসবাণী জুগিয়ে গেছেন। … না তো কিছু পড়াতে পারেন এই ব্রাহ্মণ যুবা, আর না সে পাঠশালায় প্রতিদিন যায়। …
সেই খবর রাজার কাছে আস্তে, রাজা নিজে সেই ব্যাপারে তদারকি করেন। আর যখন দেখেন যে ছেলের ব্যাপারে বাবা মিথ্যাচার করেছিলেন, তখন ছেলেকে নয়, বাবাকে মিথ্যা বলার জন্য শূলে চরিয়ে দেন। … ছেলে সেই সময়ে অনেক প্রয়াস করেন বাবাকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু কিছুতেই তার কথাকে কেউ শোনে না। যখন সে রাজার কাছে গিয়ে বলে যে সে নিজে রাজার কাছে দোষী, তার পিতা নয়, তখন রাজা তাকে গাধার পিঠে চরিয়ে রাজ্য থেকে বার করে দেন, আর তার পিতাকে তার নেত্রের সম্মুখে শূলে চরিয়ে দেন।
আমি – তার মানে কি যোজনার সাথে কর্মনিশ্চয় করা আবশ্যক, তবেই সেই যোজনা কার্যকর হয়।
সুন্দর পিশাচ – যোজনা তো আমরা আমাদের নিজেদের বিনাশেরই করি। তাই যোজনা করে আমরা সেই যোজনা অনুসারে কর্ম করলেও আমাদের বিনাশই ডেকে আনি, যা সামান্য দেড়িতে প্রত্যক্ষ হয় আমাদের সামনে। আবার যোজনা করে, আলস্য ধারণ করলে, সেই যোজনার ফল যে আমাদের বিনাশই হয়, তা তাড়াতাড়ি প্রত্যক্ষ করি। এই যা পার্থক্য। … বুঝলে না তো! তাহলে একটি ছেলের কথা শোনো, যে যোজনা করেও ছিল , আর সেই অনুসারে কর্মও করেছিল। তারপরেও তার কি হলো দেখো।
সুন্দর এবার তার পরের গল্প বলতে শুরু করলো –
এও আরো এক ব্রাহ্মণ ছেলের কথা। এই ব্রাহ্মণের পিতার তিন পুত্র ছিল। তারপরে এই কনিষ্ঠ সন্তানকে কন্যা রূপে পাওয়ার খুব সাধ ছিল তাঁর। কিন্তু তাঁর চতুর্থ সন্তানও পুত্রই হয়। … পিতামাতা যখন কনো সন্তানকে চান না, কিন্তু তাও তাঁদের সন্তানপ্রাপ্তি হয়, সেই সন্তান হয়ে সেই অশরীরীই জন্ম নেয় যে পূর্বজন্মে প্রচুর দ্বিচারিতা করেছে।
এক্ষেত্রেও সেইরকমই একটি অশরীরী, সেই ব্রাহ্মণের চতুর্থ সন্তান হয়ে জন্ম নেন। তাই দ্বিচারিতা করার কারণে, এই ব্রাহ্মণ পুত্র অত্যন্ত জেদি হন। এক তো পিতামাতা যেমন সন্তান চেয়েছিলেন, তেমন পাননি, অর্থাৎ তাঁদের যাচনা পূর্ণ হয়নি বলে, তাঁরা এমনিই বেদনাক্রান্ত। তার উপর, সেই সন্তান যদি জেদি হয়, অর্থাৎ পিতামাতার বাধ্য না হন, তখন তো যাচনাগ্রস্ত মানুষের স্বভাব অনুযায়ীই তাঁরা এই সন্তানের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠবেন।
এই ব্রাহ্মণপুত্রের ক্ষেত্রেও তেমনই ঘটে। সে অত্যন্ত জেদি স্বভাবের, আর সেই জেদের স্বভাব বশত, ক্রমশ সে পিতামাতার বিরোধী হয়ে উঠতে শুরু করে। পিতা যা করতে বলেন, তার ঠিক বিপরীতই তাঁর পছন্দের কর্ম। আর তা সে করবেই। এমন করতে করতে, যখন তার বিদ্যালাভের সময় আসে, তখন পিতা দেখেন যে এই পুত্রের মেধা অত্যন্ত ক্ষীণ। বিদ্যা এ অর্জন করতে সক্ষম, কিন্তু জ্ঞানাহরণ এর পক্ষে সম্ভব নয়।
তাই বিদ্যার অভ্যাস করাতে চেষ্টা করেন পুত্রকে। কিন্তু অন্য পুত্রদের জ্ঞান প্রদান করা হচ্ছে, অথচ তাকে সেই জ্ঞান প্রদান করা হচ্ছে না, তার সাথে দ্বিচারিতা হচ্ছে, এমন সে অনুভব করে। এবং যোজনা করতে থাকে এই দ্বিচারিতাকে পিতার দৃষ্টির সামনে রাখতে। কিন্তু যতই সে এমন করতে থাকে, ততই সে সকলের কাছে দুষ্ট সিদ্ধ হতে শুরু করে। এই দুষ্ট সিদ্ধ হয়ে যাবার কারণে, সেই বালক অত্যন্ত উগ্র হয়ে ওঠে, আর সাথে সাথে যোজনা করে জ্ঞান অর্জন করতে চেষ্টা করে।
যোজনা করে কি আর জ্ঞান অর্জন হয়। সে সামান্য কিছু বিদ্যাই লাভ করলো, আর সেই বিদ্যাকেই জ্ঞান বলে দাবি করতে থাকলো। এবার তার এই প্রিয়াস আর তাকে দুষ্ট বলে সিদ্ধ করলো না, তাকে মূর্খ এবং হাস্যস্কর করে দিলো সকলের সামনে।
তাতে সে অতিশয় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে, সকলের বিরোধী হতে শুরু করলো। নিজের মাতাপিতার বিরোধী তো সে ছিলই। এবার তার ভ্রাতাদের সাথেও শত্রুতা করতে থাকলো। … কিন্তু এই সমস্ত কিছুতে সেই ব্রাহ্মণ যুবার প্রতি তার ভ্রাতাদের হাস্য ও ব্যঙ্গ বিদ্রূপ কম হলো না, উল্টে তা বেড়ে গেল পূর্বের থেকে। এবার সে সেই নিয়ে অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে উঠতে শুরু করলো। আর এবার সে নিজের বিদ্যাকে ব্যবহার করে ধন উপার্জন করে সিদ্ধ করার চেষ্টা করলো যে সে জ্ঞানী।
আর যতই সে তেমন করে, সে সমানে পূর্বের থেকে অধিক হাস্যস্কর পাত্র হয়ে উঠতে থাকে। আর এমন চলতে চলতে, সে এতটাই উপার্জনের দিকে নজর দিলো, আর এতটাই নিজের ব্যঙ্গবিদ্রূপ নিয়ে ব্যথিত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলো, যে সে হাজারও রোগব্যাধি নিজের মধ্যে জন্মদিলো, আর সেই রোগব্যাধি তাকে এমন অবস্থায় পতিত করে দেয় যে, সে আর উপার্জন করার মত অবস্থাতেই রইল না। অবশেষে সে সকল জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাদের বোঝা হয়েই বাকি জীবনটা কাঁটালো।
সুন্দর পিশাচের কথা শুনতে শুনতে আমি বললাম – যতগুলি কথা তুমি আমায় বললে, সেই কথা উদ্ধার করতে তো তোমার প্রায় বছর ৫০-৬০ লেগে যায়। সাধু মহারাজ ততদিন বেঁচে ছিলেন?
সুন্দর পিশাচ আমাকে বলল – এই শেষ কথাটি যখন আমি জেনে ফিরি, ততক্ষণে সাধু মহারাজ দেহ রেখেছিলেন। আমি অনেক উপলব্ধি করেছিলাম এই সময়ে, তাঁর পরামর্শ মেনে। আমি স্পষ্ট ভাবে, উনি যেখানে যেখানে পাঠিয়েছিলেন সেইখান থেকে, আর তা ছাড়াও নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে বুঝে যাই যে, আমার জীবনেও এমন অনেক সুযোগ এসেছিল। কিন্তু আমি নিজের যাচনার সাগরে ডুবে থাকার কারণে, সেই সমস্ত সুযোগকে আমি অদেখা করে দিয়েছিলাম।
আসলে আমি তো আমার যাচনা করা জিনিসগুলোই খুঁজে চলেছিলাম, কিন্তু যা আমি যাচনা করিনি, তা আমার কাছে এসে উপস্থিত ছিল, আমি তাদের দিকে তাকাইও নি। আর সমানে ঈশ্বরীকে দোষারোপ করতে থেকেছি যে আমার সাথে অন্যায় হয়ে চলেছে। যদিও, এতো কিছু আমি তখন অনুভব করিনি। তবে হ্যাঁ, অনেক অনুভব যে আমার মধ্যে আসা বাকি, তা উপলব্ধি করি আমি, বিশেষ করে যখন ফিরে এসে দেখি যে সাধু মহারাজ আর দেহে নেই। আর তাই আমি এবার নিজের থেকেই বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে যেই অনুভবের সন্ধান আমি করছিলাম, তা চালয়ে যেতে থাকি।
