দ্বিতীয় পর্ব – তান্ত্রিকের খপ্পরে
এবার সুন্দর, অর্থাৎ সেই পিশাচ আমাকে তার তান্ত্রিকের খপ্পরে পরার কথা বলতে থাকলো। সে বলল –
সে কথা আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগের কথা। তখন আমি সবে সবে দেহ ছেড়েছি। মৃত্যু কি আমি জানতাম না। দেহে থাকতে, সেই দেহ শুধু কেন, সমস্ত কিছুর থেকেই বিরক্ত হয়ে, হতাশার জীবনযাপন করছিলাম। না এই কারণে নয় যে সমস্ত কিছু অনিত্য, আমার বিরক্তির কারণ এই ছিল যে, আমার ইচ্ছামত কিছুই হয়না।
আসলে এই কঠিন অথচ স্পষ্ট সত্যটি আমি তখনও বুঝিনি। এখনও যে বুঝেছি তা নয়, তবে হ্যাঁ মেনে নিয়েছি একরকম। তবে সেই সময়ে এটা কিছুতেই বুঝতেও পারতাম না, মানতেও পারতাম না যে জগত আমার ইচ্ছায় চলে না। হ্যাঁ, এরপর যখন পিশাচ হয়ে গেলাম, তখন অশরীরী হয়ে বহু জায়গায় গেছি। আর সেখানে গিয়ে গিয়ে দেখেছি যে আমার মতই সকলে ভাবেন যে তাঁদের ইচ্ছা অনুসারে জগত চলবে। … আমার মত সামান্য যারা, তাদের কিছু কিছু ইচ্ছা পুড়ন হচ্ছে, আবার কিছু কিছু হচ্ছেনা।
আমি বললাম – কিন্তু তোমার ক্ষেত্রে একটিও ইচ্ছা পুড়ন হলো না, আর তাঁদের ক্ষেত্রে হলো কেন?
সুন্দর বলতে থাকলো আমার উদ্দেশ্যে –
সেটা নির্ভর করছে সেই ইচ্ছাগুলো কতটা বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়ে তাঁরা করছেন, তার উপর। আমার ক্ষেত্রে, আমি সম্পূর্ণ ভাবেই অবাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে থাকে ইচ্ছা করতাম, তাই কনো ইচ্ছাই পুড়ন হতো না, তাই আমি অনন্ত হতাশার মধ্যে ডুবে গেছিলাম। নিজের সামর্থ্য না জেনেই, আমি ভেবে নিতাম এমনটা করে নিতে পারবো। কিন্তু যেই কাজের সামর্থ্যই আমার কাছে নেই, সেই কাজ আমি কি করে করতে পারতাম! পারিও নি। একটার পর একটা কাজ করার প্রয়াস, সমস্তই আমার নিজের সম্বন্ধে ভুল ধারণার উপর ভিত্তি করে, আর সমস্ততেই আমি ব্যর্থতার মুখ দেখি। আর সেই ব্যর্থতা দেখতে দেখতে ঈশ্বরীকেই দোষারোপ করতে থাকি।
আবার এমন কিছু কিছু ব্যক্তি দেখেছি, যাদের অনেক ইচ্ছাই পুড়ন হচ্ছে। আর তারফলে তারা একসময়ে এমন মনে করতে থাকেন যে তারাই জগতটা চালাচ্ছেন। এঁদের মধ্যে আগের সময়ে বহু রাজা আর ব্রাহ্মণ দেখেছি; আর ইদানীং কালে ব্যবসায়ী আর নেতামন্ত্রীদের দেখেছি।
আমি আবার বললাম – এঁদের ক্ষেত্রে কি হয়? আমি তো নেতা মন্ত্রী বা ব্যবসায়ীদেরও দেখেছি। এরা তো অবান্তর ইচ্ছা করেন, আর সেই ইচ্ছা পুড়ন করার জন্য একটা যাত্রাপথের নির্মাণ করে নেন। … তাহলে? এঁদের ইচ্ছাও তো বাস্তবিক নয়!
সুন্দর আবার বলল –
ঠিক বলেছ, এঁরা অবাস্তব ইচ্ছাই করেন। তবে এরা বাস্তবের থেকে আমার মত চরণ উঠিয়ে নেয়না। এরা জানে বাস্তবটা কি, আর এও জানে যে বাস্তবে তাঁদের ইচ্ছা পুড়ন হবেনা। তাই এরা সেই অবাস্তব ইচ্ছাকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য যোজনার রচনা করে, আর সেই যোজনা অনুসারে তারা চলতে থাকেন। আর ভেবো না যে সেই যোজনা অনুসারে তারা চলে নিজেদের ইচ্ছার পুড়ন করতে পারে। কিন্তু তারা সমানে নিজেদের যাচনাকে কল্পনার মাধ্যমে বাস্তবতার সাথে যুক্ত করে নিয়ে, যোজনা করে, আর নিজেরা নিজেদেরকেই মানাতে শুরু করেন যে তাদের ইচ্ছাপুড়ন হচ্ছে।
কিন্তু শুধু আমিই যদি মানি যে আমার ইচ্ছা পুড়ন হচ্ছে, তবে কি হবে? না হবেনা। তাই এরা আশেপাশের মানুষজনকেও বোঝানোর চেষ্টা করে যে তারা মহান, তাই তাদের যোজনা কাজ করছে। আর সেই বোঝাতে বোঝাতেই একসময়ে তাদের দেহ চলে যায়। দেহের পরেও তারা ভাবতে থাকে যে তাদের ইচ্ছা পূর্তি সম্ভব। আর সেই মানসিকতা নিয়েই একের পর এক দেহ নিয়ে, যাচনা করেন, কল্পনা করেন, আর নিজের যাচনার সাথে কল্পনাকে মেলাতে যোজনা করেন।
অনেক এমন দেহ নেবার শেষে, তাদের অবস্থা আমার মত হয়, মানে কল্পনা করতে করতে, এমন স্তরে পৌঁছে যান তারা যে, বাস্তবের সাথে তাদের যাচনা এতটাই দূরত্বে চলে যায়, যে কনো যোজনাই আর যাচনা আর কল্পনাকে মেলাতে পারেনা। … আর তখন তারাও আমার মতই হতাশার রুগী হয়ে যান।
আর শেষে আমার অবস্থায় এসে তারা বুঝতে পারে যে, আমাদের একটি ইচ্ছাও পুড়ন হয়নি, কারণ আমাদের একটি ইচ্ছাও বাস্তবের সাথে সংযুক্ত ছিল না। সমস্তই আমাদের কল্পনার মধ্যে হয়েছে। আমাদের ইচ্ছাপূর্তিও হয়েছে আমাদেরই কল্পনায়, আর আমাদের ইচ্ছাপূর্তি হয়নিও আমাদের কল্পনাতেই। যখন এই উপলব্ধি আসে, তখন আর কি! তখন আর আমাদের কাছে সেই পরিমাণ আকাশতত্ত্ব থাকেনা, যার দ্বারা আমরা কনো প্রাণী বা উদ্ভিদের যোনিও পেতে পারি। সরাসরি পাথরের যোনি লাভ করি। আর যখন যোনির পর যোনি ভেদ করে মানুষযোনিতে আসি, তখন আবার আমাদের যাচনা, যোজনা আর কল্পনা অর্থাৎ বুদ্ধির বিকারেরা জেগে যায়। আর আবার একই চক্কর কাটতে হয়।
আমি বললাম – এর থেকে মুক্তি কি ভাবে সম্ভব তাহলে?
সুন্দর বলল – মুক্তি আমাদেরই হাতে। প্রতিবার আমরা পিশাচ হই, প্রতিবার সংকল্প নিই যে এবার আর যাচনা রাখবো না। কিন্তু প্রতিবার সেই কথা ভুলে যাই, আর প্রতিবার পুনরায় পিশাচ যোনি লাভ করি, যখন আমাদের যাচনা বাস্তবের থেকে সম্পূর্ণ বিমুখ হয়ে যায়। … কিন্তু এর মুক্তির উপায় এবার আমি জেনেছি। আর জেনেছি এক সাধুবাবার জন্য। … সেই সাধুর কথা বলছি তোমায়। কিন্তু তার আগে, আমার প্রথম সময়ের কথা বলি, যখন আমি তান্ত্রিকের খপ্পরে পরলাম।
এই বলে সুন্দর আবার বলতে শুরু করলো নিজের কথা। সে বলল –
শরীরে থাকতে, নিজের জীবনে, জগতে, আর ঈশ্বরের বিচারে অত্যন্ত ব্যথিত ছিলাম, তাই যখন বুঝলাম যে শরীর ছেড়ে গেছে, আমার ভারি আনন্দ হয়। … হ্যাঁ প্রথম অবস্থায় বুঝতেই পারিনি যে আমার শরীর ছেড়ে গেছে। যেমন সকলকে আগে দেখতাম, তখনও দেখছি। তারপরে দেখি কি আমারই দেহকে ঘিরে লোকসমাগম হয়েছে। … তখন আমি বুঝতে পারলাম যে আমি শরীরের থেকে বেড়িয়ে এসেছি।
তখন আমার মধ্যে জলতত্ত্বও ভরপুর, আর আকাশতত্ত্বও, মানে বুদ্ধি আর মন আমার তখনও সতেজ। আমি তাই সেখান থেকে সরাসরি চলে গেলাম। এমনিই সেই জীবনের প্রতি বিরক্ত ছিলাম। ছাড়া পেয়েই ছুটি কাটাতে বেড়িয়ে পরি। বেশ কিছুদিন ভালোই কাটলো। তারপর একদিন কি মনে হলো, আমি যেখানে থাকতাম, সেখানের শবদেহগুলিকে যেই শ্মশানে দাহ করা হয়, সেখানে গেলাম এই চিন্তা করে যে আমার দাহ কেমন করে হচ্ছে, আমি দেখবো।
সেইদিনই যে আমার কাল হয়ে যাবে জীবনের কে জানতো। … রাত্রের অন্ধকারে গেলাম যখন, তখন অনেক দেহ দাহ হচ্ছিল। আমার সময়ের হুঁশ নেই। আমার মৃত্যু হয়ে গেছে প্রায় ৭-৮ দিন। সেই দেহ কি আর থাকে! তাকে তো দাহ করা হয়ে গেছে। আমি তবুও আমার দেহ খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। আর সেই খুঁজতে খুঁজতে, খানিক পরে দেখি, আমি কিছুতেই এগোতে পাচ্ছিনা। … অনেক চেষ্টা করলাম, তাও এগোতে পাচ্ছিনা। পিছানোর চেষ্টা করলাম, তাও পারছিনা। বাঁয়ে ঘুরতে পারিনা, ডায়ে ঘুরতে পারিনা।
অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও যখন পারলাম না, তখন আমি আমার অন্তরের দৃষ্টি দিয়ে দেখলাম। দেখি একটি তান্ত্রিক হাসছে। স্বর শোনার ক্ষমতা আমাদের থাকেনা। শুধুই অন্তর্দৃষ্টি থাকে, তাও বাহ্যমুখি হয়ে থাকে বলে দেখতে পাই। তাই তার আওয়াজ তো শুনতে পেলাম না। কিন্তু আমার দিকে তাকিয়ে যেই ভাবে মুখ খুলে শরীর কাঁপাচ্ছিল, তাই দেখে বুঝলাম, সে আমার এই ছটফটানি দেখে অট্টহাস্য করছে।
আমি বললাম – কিন্তু আমার কথা তো তুমি দিব্যি শুনতে পাচ্ছ!
সুন্দর – সে তো আমি তোমার ভিতরে রয়েছি বলেই সম্ভব হচ্ছে; আমি তো এখন তোমার শ্রবণশক্তি দিয়েই শুনছি। … কিন্তু তোমার বাইরে যখন থাকতাম, তখন শুধুই দেখতে পেতাম, অন্য ইন্দ্রিয়ের শক্তি কাজ করেনা। আর এখন তো ঠিক করে দেখতেও পাইনা। সমস্ত পঞ্চভুত ক্ষীণ হয়ে যাওয়ায়, সমস্ত ভৌতিক সামর্থ্যই চলে গেছে আমার। তান্ত্রিকের হাসি দেখে, আমি বুঝতে পারলাম যে আমি বন্দি হয়ে গেছি।
আমি – তো সেই তান্ত্রিক তোমায় বন্দি করলো কেন? তোমায় বন্দি করে ওর কি লাভ?
সুন্দর – তান্ত্রিকরা আমাদের মত এমন সদ্য অশরীরী হয়ে এদিক সেদিক অস্থির হয়ে ঘুরে বেরানোদেরই সন্ধান করে। আমাদের ধরে ওরা মন্ত্রপাশে। আর ধরার পর, আমাদেরকে সামান্য অগ্নিতত্ত্ব দিয়ে দেয়। অগ্নিতত্ত্ব আমাদেরকে প্রগতি দেয় সামান্য, আর দেয় প্রচুর ভ্রম। কিছুই খেতে পারা যায়না, কারণ শরীর নেই, তাই খিদেও নেই। কিন্তু অগ্নি আমাদেরকে এমন মনে করায় যে আমি প্রচুর আহার করবো। প্রচণ্ড খিদে লেগেছে, কতদিন খাইনি। আর সেই খিদের ভ্রমে, আমরা তান্ত্রিকের কথা শুনতে বাধ্য হয়ে যাই, এই ভেবে যে সে আমাকে খাবার দেবে।
সুন্দর বলতে থাকলো – সেই খিদের ভ্রমে, আমরা তান্ত্রিকের কথা শুনি। আর তান্ত্রিকরা আমাদেরকে কারুর না কারুর শরীরে পাঠিয়ে দেয়। আর আমরা তার শরীরে গিয়ে প্রচুর গাণ্ডেপিণ্ডে খাই। আর যাই শরীর পেয়ে যাই, তাই মনে করতে থাকি যে সেটা আমারই শরীর। আর সেই শরীরে আসলে যার, তার জীবনকে অতিষ্ঠ করে দিই।
আমি – কিন্তু এমন করে তান্ত্রিকের কি লাভ?
সুন্দর এবার খিল খিল করে হেসে উঠে বলল – যার কাছে সে পাঠালো, তার কাছে সে এবার নিজে গিয়ে আমাকে তার মধ্যে থেকে বেড়িয়ে আস্তে বলে। আমি বেড়িয়ে আসলেই, তান্ত্রিক পয়সা পায়। … আবার অনেক সময়ে, এক তান্ত্রিক আমাদেরকে কারুর কাছে পাঠায়, তো অন্য তান্ত্রিক আমাদেরকে সেই শরীর থেকে বার করে আনেন। আবার অন্য তান্ত্রিক আমার মত কারুকে কারুর শরীরে পাঠালো; সেই ভুতকে আমার তান্ত্রিক বার করে আনে। … এই ভাবেই এরা প্রচুর পয়সা করে। … এছাড়াও আমাদের মত কেউ কেউ অনেক দিন ধরে কনো তান্ত্রিকের কাছে থাকলে, তাকে দিয়েও অন্যের কাজ করে দেয়।
তুমি জানোনা হয়তো, আমার মত অনেকে আছে, যারা তোমাদের ওই হিসাব করা বড় যন্ত্রটা আছে না, তাদের মধ্যে থেকে অনেক অনেক কাজ করে। আর সেই কাজ করার জন্য, আমাদেরকে যেই তান্ত্রিক ধরেছিল, তারা প্রচুর অর্থ রোজগার করে।
আমি – তা তোমাকে দিয়ে কি কি করালো এই তান্ত্রিক?
সুন্দর – কিচ্ছু করাতে পারে নি। … আসলে আমি তো আর দেহই চাইছিলাম না। তাই আমাকে আগুন দিলে কি হবে! যে অলস, তাকে তো তাড়া দিয়েও তাড়ানো যায়না। … তাই আমাকে সেই অগ্নি দিয়েও খিদের ভ্রম দেখাতে পারে নি। … জানিনা অন্য কনো ভ্রম থেকে আমি আজ পর্যন্ত বেরিয়েছি কিনা, তবে হ্যাঁ, দেহে থাকতে একটিও ভ্রম থেকে না বেরোতে পারলেও, দেহ না থাকা অবস্থায় এই একটি ভ্রম থেকে আমি বেরোতে পারি। অনেক যায়গায় পাঠাতো আমাকে। কিন্তু আমি নড়তামই না। …
আমাকে খেতে দিতো না। অগ্নিতত্ত্ব দিয়েছিল, তাই খিদে লাগতো। কিন্তু মনের মধ্যে চলছে, পেটের জন্য একবার ছুটতে শুরু করলে, আজন্ম ছুটতে হবে। তাই অনাহারেই থেকে গেছি। … আর এমনই অনাহারে থাকতে থাকতে, আমার অগ্নিতত্ত্ব আমার থেকে সরতে শুরু করে। আর একদিন তা পুরোপুরি চলে যায়। আর যাই চলে যায়, তখনই আমি সেই তান্ত্রিকের থেকে ছাড়া পেয়ে যাই।
আমি – তা আবার তান্ত্রিকটা ধরলও না তোমায়?
সুন্দর – না আর ধরেনি কারণ তখন আমার জলতত্ত্ব অনেকটাই কমে গেছিল। … তখন আমাকে ধরলে, আমাকে সমানে জলতত্ত্ব প্রদান করতে হতো; তাতে খাজনার থেকে বাজনা বেশি হয়ে যেতো।
আমি – তো তখন কি করলে তুমি?
সুন্দর –আমি যেই ইচ্ছার কথা বললাম, যে ইচ্ছা কারুরই পুড়ন হয়না; সবাই নিজের ভ্রমেই মানতে থাকে আর তাই সকলকে মানানোর চেষ্টা করে যে, তার ইচ্ছাপুড়ন হয়েছে। এই ইচ্ছার সত্যতা আমি তখনও জানিনি। … তাই তখনও আমি এই মেনেই চলতাম যে, জগজ্জননী আমার কনো ইচ্ছা পুড়ন করেননি। তাঁর সংসারে আমি আর দেহই নেবনা। … সেই ভাবনা আমার গেল, এক সাধুর সামনা সামনি আস্তে। সেই সাধু আমাকে অনেক উপলব্ধি দিয়েছিলেন। আর তাঁর থেকেই আমি জীবনের সত্যতা জানি।
আমি – তা সেই সাধু তোমাকে কি বলেছিলেন?
সুন্দর – বলেন নি, আমাকে বিভিন্ন জায়গায় পাঠাতেন, আর সেখানে কি হচ্ছে দেখে আস্তে বলতেন। আর আমাকে ফিরে এসে, সেই কথার থেকে সার বলতে হতো উনাকে। হ্যাঁ আমি তাঁর খুব কাছে যেতে পারতাম না। সেই সাধুর সাধনার তেজ প্রচুর। … যেখানে শরীর থাকে, তার থেকে ১০ হাত দূর পর্যন্ত উনার সাধনার তেজ, উনাকে বেষ্টন করে থাকতো। … কিন্তু মজার কথা, উনি আমাকে ঠিক সেই ১০ হাত দূর থেকেই দেখতে পেতেন। আর আমাকে সমস্ত কথা বুঝিয়ে দিতেন, আমার ভিতরে কথার সঞ্চার করে।
আমি – তাহলে তো সে খুব বড় সাধু!
সুন্দর – তা হবে হয়তো। সাধুটির তিনটি শিষ্য ছিলেন। নর্মদা নদীর তীরেই বসে থাকতেন উনি। উনার শিষ্যরা এসে উনার আহার দিতেন, আর উনার কথা শুনতেন।
আমি – তা সেই সাধু তোমায় কোথায় কোথায় পাঠালে!
সুন্দর – সেই কথা আমি তোমায় কাল বলবো। … এখনই ভোরের আলো ফুটলো বলে। … আমার না দেহ নেই। তোমার তো আছে। একটু ঘুমিয়ে নাও। ঘুম থেকে উঠলে, সেই কথা বলতে শুরু করবো। সেই কথা বিস্তর কথা।
আমি – আচ্ছা, শুনেছি তোমরা দিনের আলো ফুটলে বাইরে বার হও না; তো সেই সময়ে থাকো কোথায়? আর দিনের আলোতে তোমরা বার হও না কেন?
সুন্দর – আমরা শুধুই তোমাদের তেজ বা উষ্মা দেখতে পাই, তোমাদেরকে দেখতে পাইনা। আর দিনের আলোতে শুধু তেজদিপ্ত সাধুদেরকেই দেখতে পাই, তোমাদেরকে তো দেখতেই পাইনা। … আর দেখতে না পেলে কি হয়, আমাদের যে জলতত্ত্ব বাষ্পের আকারে থাকে। সে তোমাদের দেহের মাটির সাথে ধাক্কা খায়। তোমাদের তো কিছু হয়না; কিছু বুঝতেই পারো না। … কিন্তু আমরা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাই। … তাই দিনের বেলায়, বড় গাছের ছাওয়ায় থাকি। … তবে এখন অসুবিধা নেই; এখন তো আমি তোমার মধ্যেই রয়েছি। … তুমি ঘুমিয়ে নাও। ঘুম থেকে ওঠার পর যখন আবার বসবে, খাওয়াদাওয়া করে, তখন সাধুর কথা বলবো তোমাকে।
সুন্দরের কথা মত ঘুমিয়ে পরলাম। ঘুম থেকে উঠে, মুখ হাতপা ধুয়ে, গরম গরম একটু চা খেয়ে, সুন্দরকে হাঁক পারতেই, সুন্দর সারা দিল। আমি সারাজীবনে এমন কনো বন্ধু পাইনি, যাকে হাঁক পারলেই সারা দেয়।
সুন্দরের সারা পেতেই, আমি বললাম, এবার বলো সাধু তোমাকে কি শেখালো। সুন্দর বলল – সে অনেক কথা। একের পর এক বিভিন্ন পরিবারে, বিভিন্ন পরিবারের সদস্যদের কাছে আমাকে পাঠাতে থাকলেন তিনি। আর আমাকে বলে দিতেন কার উপর নজর রাখতে হবে। একবার করে ফিরতাম যা দেখতে বলেছেন উনি, তা দেখে। আমার থেকে প্রশ্ন করতেন, কি শিখলাম আমি। তারপর আমাকে একবার করে বলতেন, এবার শরীর নেবে তুমি?
আমি তখনও না বললে, আবার তিনি কারুর পরিবারে, কারুর জীবনধারণ দেখতে পাঠাতেন। এই করতে করতে যখন আমার দেখা শেষ হয়ে গেল সমস্ত কিছু, তখন আর আমার মধ্যের আকাশতত্ত্বের সেই ক্ষমতা নেই যে সে আর একটি বড় বৃক্ষের যোনিও ধারণ করতে পারবে। … তাই আর দেহ ধরার দিকে মন দিই নি। শেষ বারে এসে আর সাধুটির দেখা পাইনি। তিনি বোধহয় দেহ রেখেছিলেন।
এরপর আমি নিজেই নিজেই বিভিন্ন মানুষদের দেখতে থাকতাম, আর দেখতে দেখতে যখন জীবনের সত্য বুঝি, তখন তোমার সাথে দেখা। নিজের উপলব্ধি তোমাকে বলে, এবার আমি পাথর যোনি নেব। জানি অনেকদিন সময় লাগবে, পাথর যোনি থেকে অন্যযোনিতে এসে পৌছাতে। তবে এবারে আমি নিশ্চিত। এবারে আর আমি বেপথে যাব না।
আমি – কিন্তু তুমি যে বললে, প্রতিবার মনে করে রাখো যে ইচ্ছা করবে না, কিন্তু সেই ইচ্ছা করে ফেলো।
সুন্দর – হ্যাঁ ঠিকই তো। আর সত্যিই তো, যদি সর্বক্ষণ মনের মধ্যে বলতে থাকি, ইচ্ছা করবো না, ইচ্ছা করবো না, তখন তো ইচ্ছা করবো না, সেটিই একটি ইচ্ছা হয়ে যায়। …
আমি – তাহলে এই চক্র থেকে বেরনোর উপায় কি?
সুন্দর – উপায় আছে। সাধু মহারাজ দেহ ধরে থাকা অবস্থায় প্রথমেই আমাকে উপায় বলেছিলেন। কিন্তু আমি সেই উপায়কে উপায় বলেই বুঝিনি। তাই আমাকে এত মানুষের জীবনধারণ দেখতে বললেন। আর সেই দেখতে দেখতে একসময়ে আমি সেই কথা বুঝে যাই। … আমিও যেমন সাধু মহারাজায়ের কথা শুনে বুঝিনি, সেই কথা, তুমিও তেমন বুঝবেনা। … তাই আমি আগে তোমাকে আমি বিভিন্ন মানুষের জীবনধারণ দেখে যা শিখেছি, তা বলি প্রথমে। তারপর তুমিও সাধু মহারাজের কথা বুঝতে পারবে।
আমি – বেশ তবে তাই বলো। তবে একটা কথা বলো, এই সমস্ত চলছে কবে থেকে?
সুন্দর – সময়ের ঠিক ঠিক হিসাব তো আমার নেই, তবে মানুষের সময়কাল অনুযায়ী, এই ধরে নাও, তান্ত্রিকের থেকে ছাড়া পেয়েছিলাম, প্রথম এক বছরের মধ্যেই। তারপর কতবছর পর সাধুর দেখা পেয়েছিলাম, তা বলতে পারবো না। তবে হ্যাঁ, প্রায় ১০০টা মানুষের এই বছর ২০-৩০ করে আমি দেখেছি, মানে যখন তার কাছে পৌঁছেছি, তখন থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত আমি তার কাছেই থাকতাম; তাঁর ভিতরে নয়, তার বাইরে। আর শেখান থেকেই সমস্ত কিছু জেনেছি। তাই হিসাব করে নাও।
আমি – সে তো ২৫০০ থেকে ৩০০০ হাজার বছর হবে। … কিন্তু তুমি সময়ের হিসাব রাখো নি কেন?
সুন্দর – সময় তো আমার কাছে প্রবাহিত হয়ই নি। কর্মের চিন্তা করে, সেই কর্মের ফল পেতে যেই অপেক্ষা, সেটাই তো সময়। আমি তো কনো চিন্তাই করিনি, এই সময়ে। তাই আমার কনো সময় প্রবাহিতই হয়নি। তাই আমি সময়ের হিসাবও জানিনা।
আমি এই কথার কিছুই বুঝতে পারলাম না। তাই আর কথা না বারিয়ে, সুন্দর পিশাচের থেকে, তার অভিজ্ঞতা শুনতে চাইলাম।
