পৈশাচিক প্রেম | ভুতের গল্প

আমি সুহৃদ হাজরা। অব্রাহ্মণ পরিবারেই জন্ম, কিন্তু ঈশ্বরে অনুরাগ আছে, তাঁরই কৃপায়। তবে আমার এই মনোভাব এখনের। হ্যাঁ ঈশ্বরে অনুরাগ শিশুকাল থেকেই ছিল, কিন্তু সেই কাল জ্ঞাপন হবার পর থেকে, নিজেকে ভক্ত বলে অবিহিত করতে আমি ভালবাসতাম। ভক্ত বলে কেউ মানতেন না আমায়, অব্রাহ্মণ বলেই হয়তো। তাই তন্ত্রাচার শিখি কিছুদিন। জ্যোতিষ ইত্যাদি শিখে, ধূমাবতী আরাধনা, আর কমলা বগলা আরাধনা শিখেছিলাম। তবে তারপর আর সেই দিকে না এগোলেও, নিজেকে ভক্ত বলা একটা স্বভাব হয়ে গেছিল আমার।

তান্ত্রিকের লাল বস্ত্র ধারণ করতে শুরু করি আমার বাবার মৃত্যুর পর থেকে। আমার বাবামায়ের তিন ছেলের মধ্যে কনিষ্ঠ আমি। পড়াশুনাতে এমনিই মন টিকতো না, তাই কনোরকমে গ্রেজুয়েশনটা পাসকোর্সে করেছি। আমার এক দাদা সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার। উনি খুব মেধাবী ছিলেন। আর আমার দ্বিতীয় ভাইও আমারই মত। পড়ালেখায় মন ছিলনা।

বেশ কিছুদিন মেজদা এদিক সেদিক একটা চাল্রির জন্য ঘোরাঘুরি করেছিলেন। তারপর বড়দা একটা চেম্বার খোলেন হোমিওপ্যাথির, আর মেজদা তাতেই কম্পাউন্ডারি করেন। … হাসপাতালের মাইনে ছাড়াও, বড়দা নিজের চেম্বারে রোজ প্রায় ১০০ পেসেন্ট দেখেন। ফিজ ১০০ টাকা, আর তা ছাড়া ওষুধের দাম। সব নিয়ে, একাকটা পেসেন্টের বিল ২০০-২৫০ হতো। … এবার হিসেব করে নিন। ২৫ হাজার টাকা রোজ। মাসে ২০ দিন বসতেন, মানে ৫ লাখ টাকা উপার্জন। তারমধ্যে খরচ বেশি হলে এক লাখ। মানে ৪ লাখ টাকা উপার্জন।

বড়দা বিয়ে থাওয়া করার পরেই চেম্বারটা খোলেন। বৌদির বুদ্ধিতেই চেম্বারটা খোলেন, কারণ বউদি তাঁর দেওরদের চিন্তাও বেশ করতেন, যেটা আজকাল খুব একটা দেখা যায়না। … বউয়ের বুদ্ধিতে বড়দা চলেন, এমন অভিযোগের ফলে, মা বড়বউয়ের মুখ দেখা বন্ধ করে দিলেন।

কিন্তু বড়দা এই চেম্বার খলার পর, সরকারি হাসপাতাল থেকে বিদায় নিয়ে, এখন খালি চেম্বারই করেন। আর তাতে মেজদা কম্পাউন্ডারির কাজ করলে, বড়দা তিনলাখ নিজে রেখে, মেজদাকে ১ লাখ টাকা দেন। নিজের দাদার চেম্বার বলেই এতো টাকা, নাহলে এতো টাকা কনো কম্পাউন্ডারকে পেতে আমি কনোদিনও শুনিনি। মেজদা দাদারই এক পেসেন্টের মেয়েকে বিয়ে করেন। বাবার ওষুধ নিতে আসার জন্য মেয়েটি প্রায়ই আস্তো দাদার চেম্বারে। সেখান থেকেই আলাপ আর পরে বিয়ে।

এই মেজবউ আসার পর থেকে মায়ের মেজবউয়ের দিকে একটু ঝোলটানা শুরু হয়। কিন্তু মেজবৌদি দেখলেন, বড়বউয়ের বুদ্ধিতেই তাঁর স্বামী আজকে যথাযথ রোজগার করছেন। তাই বড়বৌদির ছায়া হয়ে উঠতে শুরু করলেন সমানে। … তাই মা এবার মেজবউয়েরও পিছনে লাগতে শুরু করলেন, শাশুড়িদের যা স্বভাব আর কি। … শেষমেশ, বড়দা আর মেজদা দুইজনেই মায়ের উপর খেপে গিয়ে, মাকে একটা ওল্ড-এজ হোমে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এখন মায়ের ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম।

ফালতু কথা বলে লাভ নেই। নিজের চোখে সবটা না দেখলে হয়তো অন্যরকম বলতাম। কিন্তু নিজের চোখে সমস্তটা দেখার পর, আমার মুখে একটাই কথা আসে মায়ের ক্ষেত্রে – কর্মের ফল। যাইহোক, হয়তো আমার এই ধরনের কথা বলার পিছনেও আমার নিজেরই স্বার্থ রয়েছে। … বড়বৌদি মেজদার কাজের একটা হিল্লে করে, এবার আমার কাজের দিকে হাত বাড়ালেন। … আমি বেকারই ছিলাম। বড়দার হাত তোলা। ৫০০ টাকা বড়দা দিতেন। শেষ হয়ে গেলে, আবার হাত পাততাম। … দাদা বকাবকি করতেন, তাই বৌদির কাছ থেকেই টাকা নিতাম। তাই মা যেই ভূমিকা আমার কেহত্রে কনোদিন পালন করেন নি, বড়বৌদি সেই ভূমিকাই পালন করে, আমার কাছে আমার একমাত্র অবিভাবক হয়ে গেছিলেন।

আমার খরচ খুব একটা ছিলনা। নেশা বলতে বিড়ি খাই দিনে এক প্যাকেট, ১০ টাকা লাগে তাতে। আর কি? প্রত্যন্ত কনো শ্মশান, যেখানে লোকজন কম যায়, সেখানে গিয়ে রাতজেগে ধ্যান করি। তাই সেই শ্মশান যাতায়াতের ভাড়া। এছাড়া আমার তেমন বন্ধুবান্ধবও নেই। তাই আড্ডা বা বন্ধুতোষামোদির জন্যও কনো খরচপাতি ছিলনা। আর মদ্যপান আমি করিনা। তাই সেই খরচও ছিল না। তাই মাস গেলে, হাতে প্রথম ৫০০ তাকার পরে দ্বিতীয় ৫০০ টাকার থেকে বেশি নোট লাগতো না। … তবে বড়দার তাতেও আপত্তি।

যাইহোক, এখন আমি একজন জ্যোতিষী। … সেটাও বড়বৌদির বুদ্ধিতেই। পাথরটাথর বা শেকড়বাকড় একদমই দিইনা। জন্মকুণ্ডলী তৈরি করি আর বিয়ের পাত্রপাত্রীর কুণ্ডলী মেলাই। … ফিজও বেশি নিই না। জন্মকুণ্ডলী করতে ৫০০ টাকা নিই। আর কুণ্ডলী মেলানোর জন্য ৫০০ টাকা নিই। এছাড়া কেউ যদি এসে প্রশ্ন করেন নিজের জন্মছক দেখিয়ে যে কি করা উচিত বা কি করা উচিত নয়, তবে ১০০ টাকা নিই।

খুব যে আয় মাসে, তা নয়। এই মেরেকেটে ১০-১২ হাজার রোজগার হয়। … তবে আমার এতে খেয়েপরে বেচে যায়। … বড়বৌদিকে প্রথম উপার্জন করে হাততুলে টাকা দিতে গেছিলাম। বৌদি মুখের উপর বলে দিলেন, ওটা তুমি নিজের জন্য জমাও। যদি কনোদিন টানাটানি পরে, তবে আমি চেয়ে নেব। … নামেই বৌদি উনি, স্বভাব মায়ের মত। … স্নেহ করি উনাকে খুবই, বিশেষত উনার স্নেহের কারণেই আমার স্নেহ।

বিয়ে থাওয়া আমি করিনি। করার ইচ্ছাও নেই। … বড়দার একটি ছেলে, আর মেজদার এক ছেলে, এক মেয়ে। এই ছোট ছোট ভাইপো-ভাইজিদের নিয়েই সময় কেটে যায়। বড়দা আর মেজদা নিজেদের চেম্বার নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকেন। তাই অতো সময় দিতে পারেন না। সেই কারণে, ভাইপো ভাইজিদের স্কুলে নিয়ে আসাযাওয়া, সাঁতারে নিয়ে যাওয়াআসা আর আঁকা, নাচের আর গানের স্কুলে নিয়ে যাওয়াআসা, এটা আমারই কাজ। আমি খুশীমনেই করি। আর সেটা করি বলে, আমার ভাইপোভাইজিরা আমার খুব নেওটা। আবদারও আমার কাছে করে। তবে তারা জানে আমার রোজগার কম, তাই ছোট আবদারগুলোই, মানে এই আলুকব্লি খাবে, ফুচকা খাবে, এই সব আমার কাছে আসে।

যাই হোক, এই সমস্ত তো আমার ব্যক্তিগত জীবনের কথা। কিন্তু যেই ঘটনার কথা বলতে চলেছি, সেসব তখনকার, যখন আমার জ্যোতিষের চেম্বার হয়নি। … বৈঁচির থেকে সামান্য ভিতরে, একটা শ্মশানের সন্ধান পেয়ে, সেখানে গিয়ে ধ্যানধারণা করতে চলে যাই। বৌদি মানে বড়বৌদি আমার হাতে ২ হাজার টাকা দেন। আসলে শ্মশানেই বেশ কিছুদিন থাকি আমি গেলে। তাই থাকার খরচ লাগেনা। কিন্তু হ্যাঁ খাওয়াখরচটা লাগে।

হ্যাঁ সেবারে আমি প্রায় ৭ দিন পরে ফিরেছিলাম। তবে ২০০০ টাকার অনেকটাই বেচে গেছিল, কারণ অর্ধেকদিন আমি খাবারই খাইনি। ৭ দিন লেগেছিল দেখে ভাববেন না, বিশাল ধ্যান জমেছিল আমার। ৭ দিন লাগার কারণ আমি একটা পিশাচের পাল্লায় পরেছিলাম।

এখানে আবার আমার নিজের সম্বন্ধে একটু কথা বলতে হয়। আমি ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়াশুনায় ভালো না হলেও, বেশ ঠেকিয়েঠুকিয়ে চালিয়ে দিতাম। কিন্তু নাইনে উঠতে একটা মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হই। ১১এ গিয়ে মেয়েটা আমাকে এক্সসেপ্ট করে। … তাই ৯-১০ আমার জলাঞ্জলি যায়। মাধ্যমিকে কনোভাবে সেকেন্ড ডিভিশন পাই।

১১ থেকে কলেজের প্রথম একটা বছর দারুণ কাটে। সপ্তাহে দুইতিনদিন ঘোরাঘুরি। গায়েগায়ে ঠোকাঠুকি, বেশ উত্তেজনা। আসলে আমাদের সময়ে এই ঠোকাঠুকিই বিশাল ব্যাপার ছিল। … কিন্তু মেয়েটি আর আমাই যখন সেকেন্ড ইয়ারে উঠি, তখন মেয়েটা বুঝে যায়, আমি সমাজে নিজেকে এস্টাব্লিশ করতে পারবো না। তাই আমাকে ডিচ করে, অন্য একজনের হাত ধরে নেয়। … আমার বন্ধুবান্ধব দিয়ে ছেলেটাকে বেশ হুলও দিয়েছিলাম। কিন্তু ছেলেটা মালদার ছিল। তাই আমার বন্ধুবান্ধবদের আমার থেকে সরিয়ে নেয়। আমি সেটা জানতাম না। আমি হুলে কাজ হচ্ছে না দেখে, একদিন বেশ কোরকে দেব বলে গেছিলাম। কিন্তু এতে যেটা হয়, সেটা হলো আমারই বন্ধুদের হাতে আমি মার খেয়ে এলাম।

আমার জীবনের টারনিং পয়েন্ট ছিল সেদিন। … ভয়ঙ্কর ক্ষোভ জন্ম নেয় আমার মধ্যে। … তারপর আর একটিও বন্ধু করিনি। কলেজে কেউ কেউ নিজের থেকে এসেছিল। আমি মুখের উপর বলে দিতাম, আমি বন্ধু পাতাই না। … আর ওই মেয়েটার উপর সব থেকে বেশি রাগ জন্মায়। এমন মনে খেয়াল আসে যে, আমি তন্ত্র শিখবো, তারপর মেয়েটাকে বশীকরণ করে নিয়ে এসে বিয়ে করবো। … সেই ধারণা মনে নিয়েই, গেছিলাম তন্ত্র শিখতে।

আমাদের শহর, মানে শিমলাগরের শ্মশানেই আমি একজনকে গুরু পাতিয়েছিলাম। গুরুর কাছে মিথ্যে কথা বলতে নেই। আমি বলিও নি। সব কথা বলেছিলাম। উনি রাজি হয়ে যান আমাকে বশীকরণ শেখাবেন বলে। প্রথমে জ্যোতিষ শেখান, পরে ধূমাবতীর সাধনা শেখান, কমলা আর বগলা মন্ত্র দান করেন। আমি শবসাধনাও করি। এরপরে তিনি বলেন এবার তিনি বশীকরণের প্রথম চরণ আমাকে শেখাবেন।

বশীকরণের অনেক চরণ আছে; আমি সেখানে গিয়েই জেনেছিলাম। প্রথমচরণকে আয়ত্ত করতে গেলে, শবসাধনা করে, ধূমাবতী, কমলা আর বগলা মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে, সাধনা করে উন্নীত হতে হয়। আর এরপরের স্তরগুলি হলো মাতঙ্গী সাধনার পর, ভৈরবী সাধনার পর, আর অন্তিমস্তর হলো তারাসাধনের পর। … কিন্তু বশীকরণের জন্য গেলেও, এতোদিনে আমার মতান্তর হয়ে যায়। ভবানীর কৃপা হয় আমার উপর। তাই হৃদয়ে এই বোধ জন্মায় যে আমি আমার ব্রহ্মাণ্ডেই বাঁচছি। যা সুখ পাচ্ছি, তাও আমার কল্পনা, আর যা দুঃখ পাচ্ছি, তাও। সেইখান থেকেই এই মীমাংসায় চলে আসি যে, না আমি ভক্তি করবো জগজ্জননীকে। বশীকরণ বা অন্য কিছু শিখবো না। …

তাই বশীকরণ তো শিখলাম না। কিন্তু একটা নতুন বিকার আমার মধ্যে এসে যায়। আমি মানতে শুরু করি যে যা কিছু হচ্ছে, তা তো জগজ্জননীর জন্যই হচ্ছে। তাহলে তিনি আমার সাথে এমন করলেন কেন? মেয়ে চলে গেল, ঠিক আছে মেনে নিলাম, আমি অকম্মা, তাই চলে গেছে। তাই বলে বন্ধুদের হাতে মার! … কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। … আর সত্যি বলতে আমি যে এই শ্মশানে শ্মশানে যেতাম ধ্যান করতে, তা নিজের মনকে এই বিশয় থেকে সরিয়ে নিয়ে আসার জন্যই যেতাম।

কেন জানিনা, কিন্তু মনে হতো, আমি ভুল করছি। আমি তো জগজ্জননীকে ভালোবাসি, তাহলে এমন করছি কেন। কিন্তু যখন যখন ওই কথাগলো আমার মনমস্তিষ্ককে পুরপুরি ঢেকেদিতো, তখন তখন আমি শ্মশানে গিয়ে ধ্যানে মন দিতাম। মনকে শান্ত করতাম, আর ফিরে আসতাম। … এইবারেও তেমনই প্রয়াসে বৈঁচির থেকে সামান্য দূরে একটা ভালো শ্মশানের সন্ধান পেয়ে, সেখানে চলে যাই।

প্রথম রাত্রে আমার ধ্যান কনোদিনই জমেনা। মনের মধ্যে খালি রাগ উঠে আসে ওই মেয়েটার উপর। তারপর আস্তে আস্তে সেই রাগের উপর বিচার চলতে চলতে, প্রথম বিন্ধুদের উপর আসে সেই রাগ। আর শেষে সেই রাগ উঠে আসে জগজ্জননীর উপর। সেই রাগ যখন প্রচণ্ড দুঃখ আর হতাশায় পরিপূরণ হয়ে যায়, তখন একটা সময়ে ধ্যান হয়ে যায়। … ৩-৪দিন লাগে সম্পূর্ণ পক্রিয়াতে। …

তাই প্রথমদিন রাত্রে একটু সবজি ভাত খেয়ে এসে বসে আছি। একটু দূরে, একটা মরা পরানো হচ্ছিল। কিছু মদ্যপদের হোল্লা শুনতে পাচ্ছিলাম, আর একটা লালচে হলুদ আলোর শিখা দেখতে পাচ্ছিলাম। দেখতে দেখতে ভাবছিলাম – এই তো জীবন। আজই হেঁটে চলে বেড়াচ্ছি। দুদিন পরেই, তন্দুরি চিকেনের মত আমাকেও ওই আগুনে দিয়ে দেওয়া হবে। সেই জীবনে কি পেলাম, আর কি হারালাম, এই হিসাব নিয়ে হবেটা কি! … দেহ গেলে, সব তো ভুলেই যাবো। … তাই দেহে থেকে ওসব নিয়ে মাথা খারাপ না করে… না করে! … না করে কি করবো!

কথাগুলো আমি যে প্রকাশ্যে বলছিলাম, আমি ভাবিনি। আমি ভেবেছিলাম মনে মনেই কথাগুলো বলছিলাম। কিন্তু যখন পাশ থেকে একটি কণ্ঠস্বর পেলাম তখন বুঝলাম, কথাগুলো আমি প্রকাশ্যেই বলছিলাম। পাস থেকে সেই যুবকের গলা এলো – ঠিকই বলেছ ভাই। ওসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে সময় নষ্ট না করে, জগজ্জননীর প্রেম দেখা আর বোঝা ঢের ভালো।

আমি বললাম – এই শ্মশানে! তান্ত্রিক নাকি?

উত্তর এলো – দেখে তাই মনে হচ্ছে?

আমি এবার তার দিকে তাকালাম। অন্ধকারে কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। তাই বললাম – ভাই তোমাকে তো দেখতেই পাচ্ছিনা! … দাঁড়াও পকেট থেকে দেশলাইতা জালাই।

উত্তর এলো – লাভ নেই, দেশলাই জেলেও আমাকে দেখতে পাবেনা। … আমি অশরীরী। শরীরে থাকলে তবে না দেখতে।

আমার গা ছমছম করে এলো। এতটাই ভয় পেয়েগেছিলাম যে আঁতকে উঠতেও পারিনি। সেই কণ্ঠস্বর আমার উদ্দেশ্যে আবার বলল – ভয় পাচ্ছ নাকি? ভয় নেই। না তো ভুত কারুর ক্ষতি করে, আর না করতে পারে।

আমি কথা বললাম, গলা ঠকঠক করে কাঁপছিল। বললাম – কে…কে…কে।

এর থেকে বেশি মুখ দিয়ে কথা বেরোলো না। তাই আবার উত্তর এলো – লাঠি দিয়ে মারবো যে! লাঠি ধরবো কেমনে! … আমি তো অশরীরী, লাঠি তো ধরতেই পারবো না!

একটু সাহস হলো। বললাম – টেবিল ছুড়ে মারে যে!

উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠে বলল সেই কণ্ঠস্বর – ওসব মানুষের খেয়ালখুশী ছাড়া কিচ্ছু নয়। … আমাকে যদি কেউ ধারণ করে নেয়, তবে আমি কিছু করতে পারি, তার হাতপা দিয়ে। যদি কনো শরীরে না থাকি, তবে কিচ্ছু করতে পারিনা।

আমি আবার একটু ভয় পেয়ে গেলাম। বললাম – আমার শরীর তুমি নে…নে…নেবে কি করে?

উত্তর এলো – এখন তো তোমার শরীরেই রয়েছি। নাহলে আমার কথা তুমি শুনতে পাচ্ছ কি করে? … আমার কি শরীর আছে নিজের যে তার গলা দিয়ে স্বর বেরোবে?

আমি এবার খুব ভয় পেয়ে গেছি। আমার মধ্যেই সে। তাহলে ভয় পেয়ে যদি পালাই, তো কি করে পালাবো? আমি যেখানে যাবো, সেও তো আমার সাথে সাথেই যাবে!

কথা মুখ দিয়ে বলতে হয়নি। উত্তর এসে গেল – ঠিক বলেছ, যতক্ষণ আমি তোমার থেকে সরে আসছি, ততক্ষণ তুমি আমার থেকে পালাতে পারবে না। …

আমি – তাহলে তো তুমি আমাকে দিয়ে যা খুশী তাই করিয়ে নিতে পারো?

উত্তর – হ্যাঁ তা পারি। … তবে তখনই তা পারি, যখন তুমি আমার কাছে আত্মসমর্পণ করবে। … এখন যেমন তুমি তুমিই আছো, আর আমি আমিই আছি। একই দেহে রয়েছি, কিন্তু দুজনেই একসাথে রয়েছি, তুমিও রয়েছ, আমিও রয়েছি।

আমি – তুমি ঢু…ঢু…ঢুকলে কি করে?

উত্তর – আমরা একমাত্র তার মধ্যেই ঢুকতে পারি, যে অসত্যে মন রাখে, মানে যে এই ভৌতিক জগতের চিন্তায় উলোমালা হয়ে আছে। মানে, যেই সত্যে মন রাখেনি, অর্থাৎ কি পেলাম, কি দিলাম, কে দিলো, কে নিলো, কি ভাবে নিজেকে স্থাপন করবো, অন্যকে মানাবো, বশ করবো, বশ হবো। … এই সমস্ত কিছুর মধ্যে যারা যারা থাকেন, তাঁদের মধ্যে আমরা অনায়সে ঢুকে যেতে পারি, তবে …

আমি – তবে কি?

উত্তর – মুখের ছিদ্র,কানের ছিদ্র আর নাকের ছিদ্র দিয়েই ঢুকি আমরা। … তবে তারাই ঢুকি আমরা, যাদের কিছু বলার থাকে। অর্থাৎ যাদের মধ্যে কনো বিশেষ ক্ষোভ আছে, বা কারুর মধ্যে কনো বিশেষ ইচ্ছা আছে। তাছাড়া আমাদের কারুর মধ্যে প্রবেশ করার ইচ্ছাই থাকেনা। আর সাধুদের কাছে আমরা ভিড়তে পারিনা। উনাদের সাধনার তেজ আমাদের ঝলসে দেয়।

আমি – তা আমাকে তোমার কি কাজ করে দিতে হবে?

উত্তর – আমার কনো কাজ নেই। কনো কাজ থাকলে তো আমি কবেই আবার একটা শরীর নিয়ে নিতাম। … কিন্তু আমার কনো কাজ নেই বলেই তো আমি একজন পিশাচ হয়ে গেছি। … তাই আমার কনো কাজ নেই। … শুধু কিছু বলার আছে। … মন অত্যন্ত ভারি হয়ে রয়েছে। … দেখলাম তোমার মধ্যে ভক্তি রয়েছে, কিন্তু তোমার মন ঈশ্বরের চরণ ভুলে নিজের ভৌতিক অবস্থার সুখ, দুঃখ, ক্ষোভ, বেদনা, অভিযোগ, এই সব নিয়ে মতে রয়েছ। তাই আমার কথা তোমারই শুনতে ভালো লাগবে। … তাই তোমার মধ্যে চলে এলাম।

আমি – কথা? কি কথা? … (মনে একটু সাহস এসে গেছিল, তাই এবার কিছু প্রশ্ন করলাম) আচ্ছা, কথা না তুমি পরে শোনাবে। … আগে বলো তো, তুমি পিশাচ কি করে হলে, আর কবে থেকে হয়ে আছো পিশাচ?

পিশাচ – আজ থেকে মানবীয় বছর অনুসারে প্রায় ৪৫০০ বছর আগে, আমি একজন কপিল মুনির শিষ্য ছিলাম। তখন আমার নাম ছিল সুন্দর। সেই জন্মের শেষেই আমি পিশাচ যোনি পাই। … আর কি করে পেলাম! … জীবনের প্রতি উদাসীনতার কারণে পেলাম।

আমি – জীবনে তো আমিও উদাস!

পিশাচ – সেই কারণেই তো তোমার সাথে সাখ্যাত করালেন জগজ্জননী। যাতে আমার মত পরিণতি তোমার না হয়। … আমাকেও অনেকবার এমন করে বুঝিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আমি বুঝিই নি। আর ফল দেখো, এই পিশাচ যোনির অভিশাপ। কবে এই অভিশাপ ঘুচবে, তাও জানিনা। … আর ঘুচলেই বা কি হবে? আমার মধ্যের জলতত্ত্ব, সম্পূর্ণ নিঃস্ব হতে বসেছে। শরীর পেলেও, আবার সেই পাথর থেকে যাত্রা শুরু করতে হবে।

আমি – এমনি ভুতের সাথে পিশাচের পার্থক্য কি?

সুন্দর – যেকেউ শরীর ছাড়লে, পরের শরীর নিতে সময় লাগে। সেই সময়টা সে ভুত হয়ে থাকে। মানে, শুধুই জলতত্ত্ব আর আকাশতত্ত্ব ধারণ করে থাকে। … যতক্ষণ জলতত্ত্ব থাকে, ততক্ষণ কারুর কারুর নজরে তিনি এসে যান। কিন্তু ক্রমে জলতত্ত্ব শেষ হতে থাকলে, আমাকে যেমন আর বাইরে থেকে দেখে সনাক্ত করা যায়না, তেমন তাকেও আর সনাক্ত করা যায়না। তারপর আবার সে শরীর নিয়ে নিলে, সেখানে আকাশ আর জল অন্য সমস্ত ভূত, মানে অগ্নি, পবন আর মাটিকে ধারণ করে নিয়ে যাত্রা করতে থাকে।… কিন্তু আমরা, মানে পিশাচরা হতাশার কারণে, জল সম্পূর্ণ নিস্বেশ করে ফেলি। আর তারফলে, আর কনো দেহ পাইনা।

আমি – তো জল শেষ হবার আগে দেহ নিয়ে নাওনা কেন?

সুন্দর – জল শেষ হবার আগে, কেউই শরীর পায়না। … জলতত্ত্ব কি জানো? জলতত্ত্ব হলো বুদ্ধি। আকাশতত্ত্ব হলো মন। পূর্বের বুদ্ধি সম্পূর্ণ বিনষ্ট না হলে, নতুন শরীর ধারণ করা যায়না। ঠিক যেমন জলের পিপেতে জল ভরতে হলে, আগের জল সম্পূর্ণ ফেলে দিতে হয়, তারপরেই টাটকা জল ধরতে হয়, এখানেও তেমন। … কিন্তু তার জন্যও তো একটু আশার কিরণ থাকতে হয় তাইনা।

সুন্দর বলতে থাকলো – মানে কেমন বলো তো ভাই, একটা পিপের প্রতি তুমি সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে গেছ, তাই ঠিক করে রেখেছো, এই বারে যেই জল ভরা আছে, তা শেষ হয়ে গেলে, আর জল ভরবো না, ফেলে দেব পিপে। … তাই খালি পিপের জল শেষ হবার অপেক্ষা। শেষ হলে, আর জলও ভরা হবে না, আর পিপেও ফেলে দেওয়া হবে। … আমরা যারা পিশাচ হই, তাঁদেরও মানসিকতা এমনই। … সম্পূর্ণ ভাবে উদাস হয়ে যাই আমরা জীবনের প্রতি। … তাই ঠিক করে নি, এবারের জীবনের পরে আর দেহ ধরবো না। … দেহ ধরার সুযোগ তো থাকে। কিন্তু সেই দিকে তাকাই না। … কিন্তু যখন দম আঁটকে আসে, তখন দেখি আমাদের আকাশতত্ত্বও ক্ষীণ হয়ে গেছে। তাই আর দেহ পাইনা।

দেহ তখনও পেতে চাইলে পাওয়া যায়। মানুষ হবার জন্য সব থেকে বেশি আকাশতত্ত্বের প্রয়োজন। ততটা শুধু তাঁদেরই থাকে, যারা সামান্য হলেও সত্যের চেতনা লাভ করেছেন। বাকিদের সেই পরিমাণ আকাশতত্ত্ব থাকেনা। তাই তাঁদেরকে নিম্নজনির দেহ ধারণ করতে হয়। যার কাছে যতটা আকাশতত্ত্ব, তার তেমন তেমন দেহ। কারুর গরুর, তো কারুর ভল্লুকের, আবার কারুর ক্ষেত্রে সেটা সর্প বা কচ্ছপের। …

তা ভুতেরা যেটা সামনে পায়, সেই যোনিতে মাথা গলিয়ে দেয়। কারণ তাঁদের দেহ পাবার তাগিদ থাকে না। … মাথা গলাবার সময়ে জানতেও পারেনা, কিসে মাথা গলালাম। কিন্তু মাথা গলাবার তাগিদ তো তাতেও দরকার না! … যাদের পরের দেহ নেবার ইচ্ছা থাকে, তারা একটা নয় অন্য একটা যোনিতে মাথা গলিয়েই দেয়। … মাঝের এই সময়ে আবার কেউ কেউ তান্ত্রিকদের লভের শিকারও হয়ে গিয়ে, তাঁদের কাছে ধরা পরে যায়। সেখানে আবার বেশ কিছু সময় অপচয় হয়।

কিন্তু আমরা পিশাচরা তো নাছোড়বান্দা, কিছুতেই দেহ নেবো না। যখন শেষে আকাশতত্ত্ব নেই বললেই চলে, এমন হয়ে যায়, তখন দেহ নিতে চাই, কিন্তু তখন পাথর যোনি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকেনা ধারণ করার মতন। … এই আমাদের বৃত্তান্ত।

আমি – আচ্ছা, এই যে তান্ত্রিকরা কারুকে আঁটকে রাখছেন, এর কারণে তো অনেকে মানুষযোনি পাবে না। এতো অন্যায় না!

সুন্দর – যখন আমি হতাশ হয়ে দেহে থাকতাম, তখন আমিও এমন আবোলতাবোল ভাবতাম ভাই। … জগন্মাতা কি করছেন! কেন তিনি এঁদের বিহিত করছেন না। এই জগত বাজে, এখানে স্বয়ং জগন্মাতাই অনাচার করছেন। এমন সমস্ত অবান্তর ভাবনা আমাকে ঘিরে থাকতো সবসময়ে। তার ফল দেখো, আজ আমি সেই হতাশার কারণে পিশাচ।

আমি – কিন্তু আমার কথাটা কি ভুল?

সুন্দর – হ্যাঁ, একদমই ভুল। … অনেকেই আছেন যারা অন্যের কথা মুখস্থ করে প্রমাণ করেন যে তাঁরা সাধক, বা সাধু, বা ভক্ত, বা সেই গোচের। … কিন্তু সেই কথা মানুষকে ধোঁকা দিতে পারে, নিজের পঞ্চভূতকে ধোঁকা দিতে পারে, কিন্তু জহন্মাতাকে নয়। … তাঁরাই এই তান্ত্রিকদের খপ্পরে পরেন, আর মানবযোনি লাভ করার যেই আকাশতত্ত্ব তাঁদের মধ্যে ছিল, তা হ্রাস পেতে ছাড়া পেয়ে নিম্নযোনি গ্রহণ করে।

আমি – আর যেই তান্ত্রিকরা সেগুলো করছেন? তাঁদের কর্ম কি সঠিক?

সুন্দর – তারাও অনুরূপ ফল পায় নিজেদের লোভের। … আমি তো অনেকবারই কনো তান্ত্রিকের খপ্পরে পরেছি এমন।  আমার উৎসাহ নেই, তাই তান্ত্রিকের থেকে ছাড়া পাবার ইচ্ছাও ছিল না। সেই কারণে তান্ত্রিকরা আমাকে বিরক্ত হয়ে ছেড়ে দিতেন, এর দ্বারা কিছু হবেনা। এ পিশাচ হবে, এই বলে।

আমি – তারমানে, মা একজন যেই কাজ করতে চায়, সেই কাজের মাধ্যমে অন্যজন যেই ফল পাবে, সেই ফল দিয়ে দেন। আর সেই প্রথমজন বিকারের বশে এসে যেই কাজ করলেন, তার ফল তিনি কুরিয়ে নেন। … অদ্ভুত প্রক্রিয়া তো!

সুন্দর – আজ বুঝি সেই প্রক্রিয়ার মহিমা। কিন্তু যদি দেহি অবস্থায় বুঝতাম ভাই, তাই এই পিশাচ হয়ে কালের পর কাল নিস্কম্মা হয়ে থাকতে হতো না।

আমি – ঠিকই বলেছ। যখন প্রথম সকলে বেকার বেকার বলতো আমায়, গায়ে মাখতাম না। আসলে বেশ মজাতেই থাকতাম তখন। এখন যেন নিজেকেই নিজের নিস্কম্মা নিস্কম্মা লাগে।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4