পঞ্চম পর্ব – সময়ের লীলা
এমন শান্তির ঘুম, এমন আনন্দের ঘুম, এমন তৃপ্তির ঘুম আমার এই জীবনে প্রথম। আমার মনে আনন্দের কনো সীমাই নেই। … আজ আমার জীবনের ঐতিহাসিক দিন। আজ আমার গন্তব্য লাভের দিন। … আজ আমার প্রেমপ্রাপ্তির দিন। … আজ আমার সমর্পণের দিন।
ঘুম ভেঙে গেছে, সূর্যি ওঠার আগেই। … স্নান করে, বিচিত্রস্যারের প্রিয় একটা বাসন্তী রঙের সালওয়ারকামিচ পরে, উনার যেমন পছন্দ, চুলের বেশ খানিকটা ছাড়া, তারপর শেষের দিকটা হাল্কা বাঁধনে বিনুনি, সেররম করলাম। … উনি প্রায়ই বলেন, কপালে টিপ নেই কেন। আজ তাই মনে করে উনার পছন্দের ছোট্ট বিন্দির মত টিপ পরলাম। … আয়নায় নিজেকে দেখে, নিজেরই লজ্জা লেগে গেল।
আজ অনেক সময় হাতে নিয়ে বেড়িয়েছিলাম। ফুরফুরে মেজাজ। কনো তাড়াহুড়ো করতে চাইনা। … একটা ট্রেন ছেড়ে দিয়ে, ব্যারাকপুর লোকাল ধরলাম, ওটা ফাঁকা থাকে। … দমদমে তাও সবার আগে এসে যাই। … পাসের দিকে যেখানে বাইক পারকিং-এর জায়গা, সেখানে আমাদের গাড়ি আসে। সেখানেই একটা ছোট্ট ঢিবির উপর বসেছিলাম। … প্রথমটা খুব ভালো লাগছিল। সকালের হাল্কা একটা হাওয়া গায়ে লাগছিল, বেশ আনন্দ লাগছিল। কিন্তু যত গাড়ি আসার সময় এগিয়ে আসছিল, ততই বুক ঢিপঢিপ করতে লাগলো।
একসময়ে তো এমন মনে হলো যেন, হৃদয়টা শরীরের খাঁচা ছেড়ে বেরিয়েই আসবে। … আমি লজ্জার হাসি নিজের উপরে হেসে বললাম, এখনও কি সেই স্কুলের মেয়েটা আছিস নাকি! … বয়ফ্রেন্ড না, স্বামী হবার জন্য বলতে চলেছি তাঁকে। … এতো লাফালাফি কিসের!
গাড়ি এলো। এতটাই বুক ঢিপঢিপ করছিল, যেন মনে হচ্ছিল উঠে দাঁড়ালেই হাই ব্লাডপ্রেশারে মাথা ঘুরে পরে যাবো। … যাই হোক, পরিনি। … গাড়ি আস্তে, পাল্লা খুলে, উঠে বসলাম। … গাড়ি ছেড়ে দিল। … বিচিত্র স্যার আজ আসেন নি। … আর গাড়িতে একজন অন্য মহিলাকে দেখলাম। … আমি ম্যাডামকে হাসিমুখে প্রশ্ন করলাম – আজ স্যার আসেননি!
সেই ভদ্রমহিলা আমার দিকে ঝুঁকে এসে বললেন – আমি স্যারের ছাত্রী। যখন উনি আশুতোষে পড়াতেন, আমি উনার পড়ানো প্রথম ব্যাচের ছাত্রী। … উনার জায়গায়, আজ থেকে আমি এই কাজ করবো। … আর হ্যাঁ, আপনিই কি এনা! …
আমি হ্যাঁ বলতে, সেই ভদ্রমহিলা আমার হাতে একটা কাগজের টুকরো ধরিয়ে দিয়ে বললেন, স্যার আমাকে কাল ম্যাডামের কাছে নিয়ে গেছিলেন, আলাপ করিয়ে দিতে। ফেরার সময়ে, আমার হাতে এই চিরকুটটা ধরিয়ে দিলেন, আর বললেন, এটা যেন আপনাকে দিয়ে দিই। … চিঠিটার মুখটা বন্ধ করা। বোধহয়, আপনি ছাড়া কেউ পরুক এই চিঠি, তা উনি চাননা। … এই নিন।
আমার মনের মধ্যে সেই সময়ে কিচ্ছু চলছিলনা। … হ্যাঁ সত্যি কথা, কিছুই ভাবতে পারছিলাম না। … কি ভাববো তাও বুঝতে পারছিলাম না। … আমি চিঠিটা নিয়ে, ভাঁজে আঙুল ঢুকিয়ে আঠাটা ছারালাম। তারপর একপাতা ধরে লেখা চিঠিটা গাড়িতে বসে বসেই পড়তে শুরু করলাম।
ওতে লেখা – প্রিয় এনা। আমি জানি তোমার মনের অবস্থা কি। … আমি জানি, তুমি খুব শীঘ্রই আমাকে তোমার প্রেমবার্তা দিতে চলেছ। … আর সত্যি বলতে, সেই কারণেই আমি এখান থেকে অনেকটা দূরে চলে গেলাম। …
এনা, তুমি হয়তো ভাবছো, আমিই তোমার সেই গন্তব্য স্টেশন। কিন্তু না এনা, তুমি ভুল। … মনের মানুষ খুঁজছিলে তুমি। তেমনটা পেয়ে গিয়ে, তুমি আবারও ট্রেনের দিকে না তাকিয়ে, জীবনের দিকে না তাকিয়ে, নিজের দিকে তাকালে। … তাই আবারও ভেবে নিলে যে, আমিই তোমার গন্তব্য স্টেশন। …
একবার জীবনের দিকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে তাকাও এনা। … একবার বুকে হাত রেখে নিজেকে প্রশ্ন করো, কেউ কি তিনটি মাসের মধ্যে ধ্যান করাকে আয়ত্ত করতে পারে? কেউ কি, একটি বচ্ছরের মধ্যে সম্পূর্ণ ভাবে নিষ্কাম হয়ে ঈশ্বরের ভক্তি করতে পারে? … এনা, নিজেকে চেন। নিজেকে জানো। … এমন ভাবার কনো কারণ নেই যে কারুর সাহায্যেই তুমি তোমার জীবন বাঁচতে সক্ষম। এমন ভাবার কোন কারণ নেই যে তুমি পরগাছা। …
এক ঈশ্বর আমাদের সকলের জনকজননী; তাঁকে ছাড়া আমাদের কারুরই আর কনো সাহারার প্রয়োজন কনোকালেই ছিল না। … তোমার ঈশ্বরকে চেন এনা। তাঁর সাথে তোমার সম্পর্ককে সঠিক করে উপলব্ধি করো। … তিনিই সার। তিনিই তোমার গন্তব্য। … আমি ছেড়ে যেতাম না তোমাকে, যদি তুমি আমাকেই নিজের গন্তব্য মনে না করতে। থেকে যেতাম তোমার বন্ধু হয়ে। কিন্তু তুমি আমার প্রতি আসক্ত হয়ে গেছো। … আমাকেই তোমার গন্তব্য মানতে শুরু করে দিয়েছ।
নিজের ভ্রম থেকে বেড়িয়ে এসো এনা। … হ্যাঁ এনা, তোমার গন্তব্য তোমার সামনে সব সময়েই ছিল। … আজও তা সামনেই আছে। … কিন্তু তুমিই একবার কৃতি ছাত্রী হওয়াকে নিজের গন্তব্য মনে করেছিলে; একবার ভালো চাকরী পাওয়াকে, তো একবার ভালো স্বামী পাওয়াকে। … এনা, তোমার গন্তব্য হল জীবনের অন্তিম গন্তব্য, ঈশ্বর। … যেদিন সেই গন্তব্যে পৌঁছে যাবে, আমি তোমার কাছে ফিরে আসবো। … তবে বন্ধু হয়েই।
হ্যাঁ আমরা একই পথের পথিক, কিন্তু কেউ কারুর গন্তব্য নই, বরং আমাদের দুইজনেরই গন্তব্য একই, সেই ঈশ্বর। … জানি এই চিঠিটা পরে, তোমার আশার আঁতুড়ঘর ভেঙে যাবে। তুমি সম্পূর্ণ ভেঙে পরবে, নিজের সমস্ত জুরে দেওয়া স্বপ্ন ভেঙে যাবে তোমার। … কিন্তু এনা, উঠে দাঁড়াও; আমি নিজেকে তোমার গন্তব্য করে সামনে রাখার জন্য তোমার সামনে আসিনি। আমার যা গন্তব্য, তোমারও সেইটিই গন্তব্য, এটা বলার জন্যই আমার তোমার সামনে আসা।
এত কথা জেনেও, তুমি ভেঙে পরবে, আমি সেটাও জানি। তাও আমি এই কথাগুলো বললাম, কারণ আমি জানি আমার এনাকে। … সে যতবারই ভেঙে পরুক, আবার সে উঠে দাঁড়াবে। … না এনা, তোমার উপর ভরসা থেকে এই কথা বললাম না। বললাম জগজ্জননীর উপর ভরাসার কারণে। … তিনিই তোমার গন্তব্য, তাই তিনি তোমাকে ভেঙে পড়তে কিছুতেই দেবেন না। …
আবার দেখা হবে। হয়তো একটু দেরি করে, কিন্তু হবেই দেখা। … আমি ফিরবো, তুমি যেদিন শুধুই জগজ্জননীর সন্তান হয়েই বিরাজ করবে, যেদিন এই একটিই পরিচয় অবশিষ্ট থাকবে তোমার হৃদয়ে, সেদিন আমি ফিরবো।
চিঠি শেষ, আমার হাত থেকে গাড়ির জানলা দিয়ে চিঠিটা আমারই চোখের সামনে দিয়ে উরে চলে গেল। … আমি দেখলাম, প্রতিক্রিয়া এলো না মনে। … মন যেন পাথর হয়ে গেছিল। … চোখে যেন সমস্ত কিছু ঝাপসা দেখছিলাম। … তারপর কখন গাড়ি দাঁড়িয়েছে, আর কখন আমি গাড়ি থেকে নেমেছি, আমি জানিনা। … যখন জ্ঞান ফিরলো, তখন আমি একটা নার্সিংহোমের বেডে। … গাড়ি থেকে নামার সময়ে, আমি অজ্ঞান হয়ে পরে যাই। … আমাকে ধরাধরি করে এই নার্সিংহোমে ভর্তি করা হয়েছে।
বাড়ির নম্বর নেই, তাই বাড়ির লোককে খবর দিতে পারে নি কেউ। ম্যাডামই দেখভাল করেন আমার। … তবে ম্যাডামের সূত্রে খবর পেয়ে যায়, আমার বন্ধুরা। … আসলে ম্যাডামের খবর তো ওরাই আমাকে দিয়েছিল। …
রমা, বাণী, শিখা, তিনজনেই এসেছিল। … আমাকে দেখে ওরা বলল – তোর কি হয়েছে? তুই আমাদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন কেন করে দিয়েছিলিস? কেন বল? … কেন, আমরা কি তোর পর!
আমি নার্সিংহোমের বেডে শুয়ে শুয়েই হেসে বললাম – আমরা সবাই এক, ভাবনার কারণেই আলাদা। … ভাবনা বন্ধ করে দিলেই, আমরা সবাই একেরই ভিন্ন ভিন্ন অবতার। … সেদিন আর কথা বলি নি। ডাক্তার ওদেরকে বারং করে আমায় উত্তেজিত করার জন্য।
তবে ওরা আমার সাথে নিত্য যোগাযোগ রাখতো। … নার্সিংহোম থেকে ফিরে এসে আমি আর নিজে ব্রসিওর ডিজাইনিং করতাম না। … বেশ কিছু ছেলেমেয়ে রেখেছিলাম, ভারচুয়াল, মানে ফ্রিল্যান্সার। … ওদেরকে শিখিয়ে পরিয়ে দিতে, ওরাই কাজ করতো। … প্রায় মাসে একলাখ টাকার মত আমার একাউন্টে ঢুকতো, আর ছেলেমেয়েদের পয়সা পত্তর দিয়ে, আমার হাতে এই ৪৫-৫০ মত থাকতো। … অন্য সমস্ত কাজ ছেড়ে দিয়েছিলাম। … শুধু আমার মা দুর্গার কাছে আমি বসে থাকতাম।
উনাকে জেনেছি, যতটুকু উনি জানিয়েছেন, তাই জেনেছি। … তবে যা জেনেছি, তা জেনে ধন্য হয়ে গেছি। … তিনি আমার নয়, সবার সব। … তাঁর কৃপা ছাড়া সেটা কেউ বুঝতে না পেরে, কেরিয়ার, স্বামী-স্ত্রী, জনক-জননী, প্রফেসান, ইত্যাদি নিয়ে ভাবতে থাকে। … তিনি আপনের থেকেও বেশি আপন। … আমার যে তাঁর কোলে পৌঁছানোর সময় হয়েছিল। তাই তিনি আমাকে না স্কুল-কলেজে, না কাজপত্তরে, না প্রেমজীবনে, কোথাওই আমাকে সন্তুষ্ট হতে দেন নি। … সন্তুষ্ট হয়ে গেলে যে তাঁর কাছে পৌছাতেই পারতাম না। … অশেষ কৃপা তাঁর।
দিনরাত সমস্ত, তাঁর ধারনা করতে করতেই যেত আমার। … অন্য কনো ভাবনা নেই, চিন্তা নেই। … টাকাকড়ি যা তিনি এনে দেন, তাই আসে; যা তিনি খরচ করান, তাই যায়। … কনো বিকারে আটকে থাকলে, কারুকে না কারুকে দিয়ে উনি গালি দিয়ে শুধরে দেন আমায়, আবার তাঁতে মজে থাকলে, যেন তিনিই আমাকে নিজের মধ্যে হারিয়ে দিয়ে সমাধিস্থ করে দিতেন।
রমা, বাণী বা শিখা, তিনজনেই অত্যন্ত ব্যাথিত নিজেদের জীবন নিয়ে। … তাঁদের স্বামীরা তাঁদের একটুও বোঝেন না, এই তাঁদের বক্তব্য। … আমাকে দিয়ে, জগজ্জননী ওদের উদ্দেশ্যে বলালেন – দ্যাখ, তোদের বিয়ে থাওয়া ব্যাপারটা একটা বোঝাপড়া ছিল। … কারুকে তোরা পেতে চেয়েছিলিস, তাই নিজেকে তাঁর মনের মত করে দেখিয়েছিস; আবার কেউ তোদেরকে পেতে চেয়েছিল, তাই তোর মনের মত করেই নিজেকে সে দেখিয়েছে। … কিন্তু এতদিন সংসার করার পর, তোরাও ওদের আসল মানুষটাকে জেনেগেছিস, আর তারাও তোদের আসল মানুষকে চিনে গেছে।
এবার নিজের মনের মত করে তোরা তাদেরকে পাচ্ছিস না বলে দুঃখ পাচ্ছিস। … ওসব ভাবনা ছেড়ে দেয়ে মন থেকে। … তোরা চেয়েছিস বলেই তোদের বিয়ে ওদের সঙ্গে হয়নি। তোদের বিয়ে ওদের সঙ্গে হবার ছিল বলেই তা হয়েছে। … আর যা পেয়েছিস, তা তোদেরই আর তাদেরই কর্মের ফল। … যা পেয়েছিস, সেখানে দাঁড়িয়েই জীবনকে উপলব্ধি করতে হবে। এটাই আমাদের কাজ এই জগতে দেহ ধরে এসে। … তাই নিজের জীবনে কি পেলি না পেলি, সেই হিসাব না করে, জীবনকে কতটা চিনলি, জানলি, সেই হিসাব কর। …
দেখবি, সেই হিসাব করে, তোরা একটা অন্য মানুষ হয়ে গেছিস। কোন কিছুই তখন আর তোদের গায়ে লাগবেনা, কারণ তোদের আর কনো চাওয়াপাওয়াই নেই। সবেতেই একটা শিক্ষালাভ আর শিক্ষালাভ মাত্রই আনন্দ। … আর সেই আনন্দ, তোদের সন্তানদের উপর দিয়ে দেয়ে। … তোদের হাত ধরে, তোরা যতটা জীবনকে চিনেছিস, ততটা সহজ ভাবেই তারা জেনে যেতে পারবে, আর তাই জীবনের পথে, তারা অনেকের থেকে অনেকটাই এগিয়ে যাবে।
জীবন মানে সুখভোগ নয়, জীবন মানে চাওয়াপাওয়ার অঙ্ক মেলানো নয়, জীবন নিজেই একটা অঙ্ক। আর সেই অঙ্ক তখনই মেলে, যখন এক্স ইজিকাল্টু জিরো, আর ওয়াই ইজিকাল্টু জিরো হয়, কারণ তখনই এক্স ইজিকাল্টু ওয়াই হয়, যেখানে এক্স মানে হলো চাওয়া, আর ওয়াই মানে পাওয়া। … যখন চাওয়া পাওয়া, দুটোই শূন্য হয়ে যায়, তখনই শূন্যপ্রাপ্তি হয়, ঈশ্বরপ্রাপ্তি হয়, আর তখনই অঙ্ক মেলে। …
ওরা আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে দেখল। … আমি এর আগে সত্যিই কারুকে কিছু বোঝানোর সময়ে, ভূগোল ছাড়া কনো অন্য বিশয়ের উল্লেখই করতাম না। … গণিতের ব্যবহার করে কিছু তো কনোদিনও বোঝাই নি, কারণ আমার অঙ্কে বিশাল ভয়। … তাই হয়তো, আমার দিকে ফ্যালফ্যালে দৃষ্টিতে দেখলো। …
আর শুধু সেদিনই নয়। এবার ওরা প্রায়শই আমার কাছে বিভিন্ন জীবনের সমস্যা নিয়ে আসতো, আর আমি ওদের মনকে শান্ত করে, জীবনে কি করনিয়, জীবনকে জানার জন্য প্রেরণা দেওয়া, এই সমস্তই করতাম। … ওরা আমাকে একরকম আঁকরে ধরতে থাকলো। … আমরা চার বন্ধু, খুবই কাছের। ভালো বাসি, আমরা একে অপরকে। খুব বিশ্বাসও করি, সকলে সকলকে। … কিন্তু এই প্রথমবার, আমার কাছে আমার তিনবন্ধু কিছু জানার জন্য, কিছু বোঝার জন্য, কিছু সমাধানসূত্র পাবার আশায় আসা আরম্ভ করলো।
আমরাও তো বাণীর কাছে যেতাম, অঙ্ক সায়েন্স বুঝতে; রমার কাছে যেতাম কমার্স-এর সাবজেক্ট বুঝতে, শিখার কাছে যেতাম ডিজিটাল মার্কেটিং সম্বন্ধে প্রশ্ন নিয়ে, কিন্তু আমার কাছে ওরা কেউ এর আগে কিছু জানতে আসে নি। … আমি বুঝলাম, বিচিত্র স্যার ঠিকই বলেছিলেন, আমার গন্তব্য তিনি নন, আমার গন্তব্য আমার মা দুর্গা। … আমি বুঝলাম, যে যখন গন্তব্য পেয়ে যায়, সে তখন অন্যের ভরসার জায়গা হয়ে যায়। … তারমানে আমি আমার গন্তব্য পেয়ে গেছি! …
তারমানে আমি শিয়ালদহ স্টেশন! … যে যেখানেই নামুক না কেন, হেড অফিসে যেতে গেলে, তাকে শিয়ালদহেই আস্তে হবে! … এই আমার গন্তব্য স্টেশন! আর এই গন্তব্য স্টেশন কিছুতেই আসছিলনা বলে, আমি হাপিত্যেশ করে বসে ছিলাম! … নিজের জীবনকেই নিজে দুষছিলাম! … নিজের প্রতি নিজেই হতাশ হয়ে গেছিলাম!
সেই সমস্ত উপলব্ধির দিন আজ অনেকদিন হয়ে গেছে পেরিয়ে এসেছি। … তখন আমার বয়স ছিল ৩২, আর আজ ৫০। … এখন আমি, আমার মাদুর্গার ইচ্ছায়, শিখা, রমা আর বাণীর ছেলেমেয়েদের একমাত্র সাহারা। … নিজেদের মাবাবাকেও তেমন বিশ্বাস করেনা, যতটা আমাকে। … ওরা ছাড়াও, আমার কাছে এখন আরো তিনচারটে জোয়ান ছেলেমেয়ে আসে। … না ভূগোল পড়তে নয়, জীবনকে জানতে আসে, জীবনকে জানার রাস্তা জানতে আসে।
এই কথা লেখার ইচ্ছা আমার অনেকদিনই ছিল, কিন্তু একটা অপেক্ষায় ছিলাম। … আজ সেটা লিখলাম, কারণ আমার অপেক্ষা শেষ। … আমার অপেক্ষা ছিল যে আমার বিচিত্র স্যার ফিরে আসবেন। … কাল, ১৯শে মার্চ, ২০২২এ, তিনি এসেছিলেন; আমার বাসায় এসেছিলেন। … আমি এখন আর সালওয়ার পরিনা, শাড়ী পরি। সামাজিক ভাবে বিবাহিত নই। তবে গিন্নিরা যেমন করে আচলকে পিঠের পিছন দিয়ে জরিয়ে শ্বশুর-ভাসুরকে প্রণাম করেন, আমিও বিচিত্রস্যারকে ঠিক একই ভাবে প্রণাম করলাম।
তিনি আমাকে কাঁধ ধরে উঠিয়ে বললেন, সমস্ত বিকারের নাশ হয়েছে, তাই এলাম। আমি আর প্রশ্ন করে নিজেকে লজ্জা দিই নি যে, বিকারটা কার, আমার না উনার। … শুধু হেসে বললাম, আমার অন্য সামাজিক ভাগ্য কেমন জানিনা, তবে আমার তিনটি ভাগ্য অত্যন্ত ভালো। মা-ভাগ্য, বন্ধু-ভাগ্য আর সন্তানভাগ্য। … স্বয়ং জগজ্জননী আমাকে সন্তান স্নেহে আগলে রেখেছেন, আমার তিন বন্ধু, আর আপনি যিনি আমার প্রাণের বন্ধু, তাঁকে দিয়েছেন, আর আমার এতোগুলো এখন ছেলেমেয়ে। … গুরুমা বলে ডাকে, নিঃস্বার্থ স্নেহ করে।
বিচিত্র স্যার হাত জোর করে বললেন, আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছ এনা!
আমি বললাম, দোষ করলে, তবে না ক্ষমা করার প্রশ্ন ওঠে স্যার। … আপনি আমাকে আমার গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছেন। … বন্ধু বললেও, আপনি আমার গুরু। … আর স্বামী গুরু হতে পারেন, কিন্তু গুরু কি করে স্বামী হতে পারেন! … স্যার, আমি অনেকের গুরুমা, কিন্তু আপনি আমার গুরু। … আপনার থেকে নিঃস্বার্থ স্নেহ কি, তা শিখেছি। … যেদিন আপনার সামনে ভোগের রাস্তা সম্পূর্ণ ভাবে আমি খুলে দিতে গেছিলাম, সেদিনই আপনি ত্যাগের মহিমা বর্ণনা করে, আমাকে ত্যাগের পথে চলতে শেখালেন। … আর কি স্যার! … আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
শুধু এটা বলার জন্য যে, আমি ভুল ছিলাম। আমার মনে আপনার জন্য যেই ভাব জন্মেছিল, তাকে আমিই ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছিলাম। সেটা যে একটা প্রাণের বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা জ্ঞাপন ছিল, কিন্তু আমি যে ট্রেনকে না দেখে, নিজেকে দেখছিলাম, তাই তাতেও কামনা মিশিয়ে দিয়েছিলাম। আপনার মার্গদর্শনে আর জগন্মাতার অসীম কৃপায়, এই ছোট্ট এনা আজ জীবন দেখতে শিখে গেছে। এখন সে অনেককে জীবন দেখতে শেখায়।
স্যার হেসে বললেন – তাহলে তো প্রায়ই আস্তে হয়, আমিও একটু শিখি, ছোট্ট এনার থেকে, জীবন কাকে বলে। …
আমি হেসে বললাম – আসুন না স্যার, আর আমার মনের মধ্যে কনো বিকার নেই। … আর আপনার ভয় নেই, আমি আর কনো কামনার মধ্যে আপনাকে জরাবোনা। … আপনি আসলে, একটু মায়ের কথা বলতে পারি, উনার কথা বলতে খুব ইচ্ছা করে, কিন্তু উনি সরলশ্রেষ্ঠা হলে কি হবে, উনার কথা তো জটিলশ্রেষ্ঠা, তাই কারুর সাথে বলতে শুনতে পারি না। … আসুন না স্যার।
স্যার – নিশ্চয়ই আসবো এনা। … নিশ্চয়ই আসবো।
স্যার আর তারপরে কনোদিনও এলেন না। … একটিমাস পরে, আমার কাছে একটি চিঠি আসে। … উত্তরাখণ্ডের ডাকটিকিট মারা। … খামটা খুললাম। তাতে লেখা –
এনা, আমি সন্দেশা। গুরুজি বিচিত্রের একমাত্র শিষ্যা। আমাকে তিনি আজ থেকে তিনমাস আগে, কলকাতা পাঠিয়েছিলেন, আপনার পোস্টাল এড্রেস নিয়ে আসার জন্য। চিঠিটা উনিই লিখতে চেয়েছিলেন। … কিন্তু পারলেন না। কারণ আমি আপনার এড্রেস নিয়ে ফেরার পরপরই উনি অসুস্থ হয়ে যান। …
আজ থেকে একমাস আগে, ১৯শে মার্চ ২০২২ এর সকাল পাঁচটায় উনি দেহরাখেন। … উনি শেষ একবার আপনার সাথে দেখা করতে চেয়েছিলেন, আর বলতে চেয়েছিলেন, আপনি উনার জীবনের সব থেকে কাছের বন্ধু। … আপনাকে অনেক আশীর্বাদ করতে চেয়েছিলেন, আর চেয়েছিলেন এটা বলতে, বন্ধুত্বের থেকে বড় প্রেম আর হয়না। … কিন্তু উনি সেটা বলতে পারলেন না। তাই আমিই এই পত্রখানা লিখলাম। আমার প্রণাম নেবেন মা, ক্ষমা করবেন, উনি আপনার সম্বন্ধে আমাকে এই পরিচয়ই দিয়েছিলেন, তাই আপনাকে আমি এনামা বলেই চিনি।
আমার হাত থেকে পত্রটা পরে গেল। তবে এবারে আমি আর পত্রখানাকে উড়ে যেতে দিইনি। … শুধু মনের মাঝে আর আমার মাদুর্গার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে একটিই কথা বললাম। … তিনি এসেছিলেন মা। … মৃত্যুর পরই তিনি এসেছিলেন আমার কাছে। … আমি বুঝতেও পারিনি যে তিনি অশরীরী।
