গন্তব্য ষ্টেশন | প্রেমের গল্প

বিচিত্রস্যারের সেই কথা শোনার পর প্রায় ৩ মাস হয়ে গেছে। এখন নিয়মিত ধ্যান হয়। সময়ের হুঁশ থাকেনা। … মন বিচলিত হয়না। … একটা আনন্দের ভাব খেলা করে মনে। হারিয়ে যাই যেন কোথায়, আর হারিয়ে গিয়ে, নিজের থেকে নিজে পালিয়ে গিয়ে বেশ আনন্দ লাগে। আমি পাল্টে যাচ্ছি। … এমন ভাবেই পাল্টে যাচ্ছি যেমনটা কোনদিনও ছিলাম না।

বিচিত্রস্যারের সাথেও এখন অনেক সময় কাটাই। আমরা নিউআলিপুর স্টেশনে বসে গল্প করি। … স্টেশনটা নিরিবিলি, তেমন একটা লোকসমাগম হয়না। … অনেক কিছু জানি উনার থেকে। … উনার কথা শুনতে খুব ভালো লাগে। উনার কথার মধ্যে থাকে বহু সাধারণ দেখতে লাগা উদাহরণ, আর সেই উদাহরণকে ভিত্তি করে প্রচুর গুহ্য জ্ঞান।

শুনি সেই কথা আর জীবনে ব্যবহার করার পদ্ধতি জেনে, তা ব্যবহার করি। … অনেক কিছুই জানছি। মনের, বুদ্ধির, পঞ্চভুতের কাজ করার ধরন জানছি। … ধ্যান করছি, জ্ঞান অর্জন করছি। আজকাল মা দুর্গার একটি মূর্তি ঘরে নিয়ে এসে রেখেছি। তাঁকে অনেক কিছু দিয়ে সাজাই। … তাঁর সাথে একটা নিবির সম্পর্ক অনুভব করি। … বিচিত্রস্যারের থেকে জেনেছি, তিনিই সমস্ত সময়ের গতি, জীবনের ধ্বনি। আর তিনি সেই ধ্বনি আর গতি দিয়ে আমাদের সমানে মার্গ দর্শন করেন। আমরা তাঁর সন্তান। অত্যন্ত প্রিয় সন্তান। … আর সেই সন্তান ভাব থেকেই, নিজের মা-কে কত ভাবে সাজাই। …

অনুভব করি তিনি অসীম, আর অসিমিত তাঁর প্রেম। আর সেই অনুভবের ফলে, তাঁর সেই সসীম মূর্তিকেই সাজিয়ে সাজিয়ে অসীম করে তোলার চেষ্টা করি। সমস্ত চেষ্টার পরে নিজের মুর্খামি দেখে নিজেই হাসি, আর বলি সসীম যতই সাজুক অসীমের মত সুন্দর সে হতেই পারেনা। অসীমের সৌন্দর্যও যে অসীম। … কিন্তু তারপরেও রোজ সাজাই। … ছেলেমানুষি একটা। জানি পুতুল কথা কয়না, তারপরেও রোজ পুতুলের বিয়ে দেওয়ার মত কাজ। … কিন্তু তাও করি, আনন্দ লাগে; সেই অসীমকে খুব করে যেন কাছে পাই, আরো কাছে পেতে চাই।

আর এই সমস্ত কিছুর সাথে আমার বিচিত্রস্যারের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। … উনার কথা সব অমৃত মনে হয়। … অদ্ভুত সমস্ত কথা শুনি তাঁর থেকে। একদিন তিনি বলছিলেন, এই মা আমাদের সময়ের গতির বেশে, জীবনের শব্দের বেশে রোজ আমাদেরকে বলেন, চিন্তা করে কি লাভ হলো, তাই কেন চিন্তা করিস। … তিনি রোজ আমাদেরকে বলেন, চেষ্টা করে কি শরীরকে সুস্থ রাখতে পারছিস! … চেষ্টা করে কি কষ্ট লাঘব করতে পারছিস! তাহলে কেন চেষ্টা করছিস?

কিন্তু আমরা সেই কথা রোজ শুনি, রোজ বুঝি আর রোজ ভুলে যাই। … কবে যে সেই কথা শোনার পরে তা বুঝবো, আর বোঝার পর তা উপলব্ধি করবো, আমরা নিজেরাও জানিনা। … তিনি বলছিলেন সেই প্রসঙ্গে। কখন যে পেরেকে হাতুড়ি পেটাতে পেটাতে সে দেওয়ালে গেঁথে যাবে, তা না তো হাতুড়ি জানে, না পেরেক জানে আর না দেওয়াল জানে। … কিন্তু তিনজনেরই এই বিশ্বাস থাকে যে, একবার না একবার দেওয়ালে পেরেক গাঁথবেই।

আবার এমনও হয় যে, হাতুড়ি মারার সময়ে মনঃসংযোগ সরে যায়, ভুল জায়গায় হাতুড়ি পরে আর পেরেকই বেঁকে যায়। … জীবনেও এমন হয়। জীবনের প্রতি, সময়ের প্রতি মনঃসংযোগ আমাদের নষ্ট হয়ে গেলে, আমরা ভুল জায়গায় আঘাত করি জীবনে, আর সঙ্গে সঙ্গে জীবন দুমরেমুছরে যায়। আর তখন দেওয়ালে পেরেক ঢোকেনা। … কিছুক্ষণ চেষ্টা করি, পেরেকের বাঁদিকে, ডানদিকে, উপরে, নিচে মেরে মেরে সোজা করার। অনেক সময়ে তাতে কাজ হয়, আবার অনেক সময়ে তাতে কাজ হয়না।…

তেমনই বেপথে চলে গেলে, উপর নিচে, বাঁয়ে ডায়ে একটু নড়িয়ে চড়িয়ে, জীবনকে ঠিক করার চেষ্টা করি। অনেক সময়ে কাজ দেয় ওই বাঁকানোচোরানোতে, আবার অনেক সময়ে, তেমন করতে গিয়ে পেরেকটাই ভেঙে যায়, মানে জীবনটাই নষ্ট হয়ে যায়। … তখন আবার একটা নতুন পেরেক নিই, আবার একটা নতুন শরীর নিই আমরা, আর আবার পেরেক ঠোকার চেষ্টা করি।

সমানে সময় আমাদেরকে বুঝিয়ে যায়, আমরা যাতে চিন্তা করা বন্ধ করে দিই, আর যা সামনে আসছে, তাই যেন নির্বিচারে গ্রহণ করি। … কিন্তু কবে যে সেই পেরেক দেওয়ালে বসবে, কেউ জানেনা। … যেদিন বসে গেল, ব্যাস নিশ্চিন্ত। এবার সেই পেরেকে ক্যালেন্ডার ঝোলাও, কাপর শুকনোর দড়ি বাঁধো, যা খুশী করো।

এমন অনেক কথা জানতুম মনের ব্যাপারে, বুদ্ধির বাপারে। … আর সেগুলোকে অভ্যাসও করতাম নিজের জীবনে। … চিন্তা করা বন্ধ করে দিয়ে, সামনে যা এসে উপস্থিত, তাই উঠিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা আমাকে একটি বছর পুরো করতে হয়, তবে গিয়ে সাকসেসফুল হই। কিন্তু সাকসেস পাবার পর, সে যে কি প্রশান্তি, সে কি বলবো। …

নির্বিঘ্ন জীবন, নিশ্চিন্ত ঘুম, ঘুমের মধ্যে কনো স্বপ্ন নেই। … নিজে থেকে ঘুম আসে, নিজে থেকে ঘুম ভাঙে, কনো এলারমের প্রয়োজন নেই। … শরীরে কনো রোগভোগ নেই। … মনে কনো আলস্য নেই।… কনো চাওয়া নেই, পাওয়া নেই। … এক ছাড়া পাখির মত যেন আকাশে উড়ছিলাম আমি।

তবে জীবনের একটি ব্যাপারকে আমি সেই আনন্দের মধ্যে ভুলে গেলেও, তা কিন্তু আমার মনের মধ্যে বাসা বেঁধেই পরেছিল। আর তা হলো, প্রতিভার বিকাশ। … বাণীর মধ্যে স্কুল থেকেই, রমার মধ্যে কলেজ থেকে, শিখার মধ্যে চাকরি থেকে, আর আমার মধ্যে কেন তা এলো না?

একদিন আমি আমার সেই ভুলে যাওয়া কথার পুনরায় সম্মুখীন হলাম। … বিচলিতও হলাম। মনটা দুঃখেও ভরে উঠলো। … তারপর মনে হলো, এমন বিচলিত হবার তো কনো কারণ নেই। বিচিত্রস্যারের কাছে এই ব্যাপার বললে, উনি নিশ্চয়ই এর সঙ্গে জুরে থাকা সত্যের সন্ধান দেবেন। তাই আমি তাঁকেই প্রশ্ন করলাম এই ব্যাপারে। আর সত্যিই তিনি আমাকে সেরা উত্তরই দিলেন এঁর।

তিনি বললেন – এনা, এই যে স্কুলে যাওয়া, কলেজে যাওয়া, চাকরি বা পেশাতে যুক্ত হওয়া, বা বিয়েথাওয়া, আবার সন্তানাদির পিতামাতা হওয়া, এগুলো কি জানো? … এগুলো হলো জীবনের একাকটা স্টেশন। সকলের তো একই স্টেশনে নাবার হয়না, তাই না! … একাকজন একাক স্টেশনে নেবে নিজের বাড়ি, অফিস, স্কুল ইত্যাদি যায়। … কি তাই তো!

উনি আরো বললেন – ঠিক তেমনই, আমাদের কারুর যা এই জীবনে পাবার আছে, তা একটা আধটা স্টেশন যাবার পরেই, মানে স্কুলেই পেয়ে যাই। তো কেউ তার পরের স্টেশনে নেমে নিজের গন্তব্যে যায়, মানে কলেজে। আবার কেউ তার পরের স্টেশনে, মানে চাকরিক্ষেত্রে গিয়ে নিজের গন্তব্য খুঁজে পায়। তো কেউ তারপরের স্টেশনে মানে বিয়েথাওয়া করে গন্তব্য খুঁজে পায়। আবার কেউ এতেও পায়না, সন্তানাদি হবার পরে, নিজের গন্তব্যে পৌছান।

এই দেখোনা; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়, উনি স্কুলে চরণ রাখার সাথে সাথেই নিজের গন্তব্যের আঁচ পেতে থাকেন। কিন্তু পাশাপাশি দেখো কবিগুরুকে। তিনি স্কুলে গিয়ে কিচ্ছু খুঁজে পেলেন না। স্কুলে উনার জমলই না। উনি পেশায় গিয়ে, নিজের গন্তব্য খুঁজে পেলেন। উনার মতই দেখো, স্বামী বিবেকানন্দ। স্কুলে গেছেন, কলেজে গেছেন, কিছুতেই কিছু হয়নি, উনি নিজের গন্তব্য পেলেন, নিজের জীবনের পেশায়।

সব রকম উদাহরণ আছে সময়ের গর্ভে। রানী রাশমণিকে দেখো, উনি বিবাহ করার পর নিজের গন্তব্য খুঁজে পেলেন। আবার সারদামাকে দেখো, সন্তানাদি হবার পর, তাঁদের মার্গদর্শন করতে গিয়েই তিনি নিজের গন্তব্য লাভ করেন। … অর্থাৎ, একাকজনকে একাক স্টেশনে নেমে, নিজের গন্তব্যে যেতে হয়। …

এবার আমার জীবনের সাথে মিলিয়ে স্যার বললেন, এই দেখো তোমার বন্ধু, বাণী। সে স্কুলেই নিজের গন্তব্য খুঁজে পেয়ে যায়, কিন্তু অন্য কেউ তা পায়নি। কেন পায়নি! কারণ তোমার বন্ধু শিখার গন্তব্য যে এড ডিজাইনিং। ওই শিশু বয়সে যে তাঁর এড ডিজাইনিং জিনিসের সাথে পরিচয়ই হয়নি। কি করে তিনি পাবেন সেটা! … তোমার বন্ধু, রমা, তাঁর গন্তব্য সেক্রেটারি হওয়া, কিন্তু শিশুকাল থেকে পড়াশুনার মধ্যে রেখে, উনাকে সায়েন্স স্ট্রিমে ছুটিয়ে যাওয়া হয়েছে। … স্কুলে থাকতে, আমরা আর্টস সাবজেক্টের সাথে ইতিহাস বা ভুগলের মাধ্যমে পরিচিত হই, কিন্তু কমার্সের সাথে তো পরিচয় নেই বললেই চলে। … তাই সেই এক্সপজিওরই তো সে পায়নি।

যখন নিজের গন্তব্যের সাথে সাখ্যাত হলো তাদের, তখন সেই স্টেশনেই তারা নেমে পরলো। ব্যাস গন্তব্য পেয়ে গেল। … এনা, তুমি তোমার গন্তব্যের সামনা সামনি এখনও হওনি, তাই তুমি এখনও ট্রেনে করে যাত্রা করেই যাচ্ছ। যেদিন পেয়ে যাবে, সেদিন ট্রেন থেকে নেমে পরবে। … জীবনের সত্য এটি। এটিই জীবনের ধারা। … সমস্ত দিকে দেখো। স্পষ্ট হয়ে যাবে।

আমি অবাক নয়নে তাকিয়ে বললাম – কিন্তু এই সত্য তো খুব কঠিন বোঝা, তা তো নয়। তবে আমি বুঝতে পারলাম না কেন এই সত্য!

স্যার – এইখানেই তো জীবনের রহস্য ভেদের কৌশল এনা। … ট্রেনে বসে যদি ভাবতে থাকো, সবাই নেমে যাচ্ছে। আমার স্টেশন আর আসছে না, আমিও আর নামতে পারছিনা। … তখন ট্রেন জার্নিটাই বোরিং হয়ে যাবে, বিরক্ত লাগবে, কতক্ষণে আমার স্টেশন আসবে, কতক্ষণে আমি নামবো ট্রেন থেকে, খালি মাথায় এই কথাই ঘুরপাক খাবে।

কিন্তু যদি, ট্রেনের উপর নজর দিতে থাকো, তবে দেখবে, এই যে বিভিন্ন স্টেশন থেকে কেউ উঠছে, আর কেউ নামছে। যারা উঠছে, তাঁরা ট্রেন ছারার আগে যাতে উঠতে পারে, তারজন্য যারা নামবে, তাদেরকে নামতে না দিয়েই গোত্তাগুত্তি করছে, এই সমস্ত কিছু দেখতে দেখতেই সময় কেটে যাবে। কখন নিজের নামার স্টেশন এসে যাবে জানতেও পারবেনা। … কিন্তু আমরা ওই নিজেকে নিয়ে উলমালা! … তাই আমাদেরকে বোর হতে হয়, সকলে নেমে যাচ্ছে, আমি আর নামতে পারছি না, তাই ট্রেনের উপরেই রাগ হয়।

জীবনেও আমাদের ঠিক এইরকমই হয়। … তোমার একটা একটা বন্ধু নেমে গেছে জীবন থেকে নিজেদের গন্তব্যে, আর তুমি নামতে পারোনি এখনও। তাই তোমার সমস্ত রাগ গিয়ে পরেছে ট্রেনের উপর মানে জীবনের উপর। কিন্তু এই নামা ওঠা, আর তাতে করে যাওয়া ঠেলাঠেলি দেখলে না তুমি। … দেখেছো সেটা!

খেয়াল করে দেখো এনা, তোমার বন্ধু বাণী যখন স্কুল নামক স্টেশনে নিজের গন্তব্য খুঁজে পায়, তাকে কত কষ্ট করতে হয়। … ট্রেন তখন সবে সবে ছেড়েছে। তাই ভিড় তেমন ছিলনা। তাই আরামসেই ট্রেন থেকে নেমে পরেছিল, কিন্তু গন্তব্যে পৌছাতে তার বিপুল সময় লেগে গেছে। স্কুল পাস করে, ডাক্তারি পরে, সেখানে স্ট্রাগেল করে, তারপর হাউজ সার্জেন হয়ে, শেষে প্র্যাকটিস করে, এখন সে নিজের বাড়িতে পৌঁছেছে। … স্বাভাবিক না!

শিয়ালদহ স্টেশনে ভিড় থাকে, কিন্তু ঠেলাঠেলি কম হয়, কারণ ট্রেন সেখান থেকে ছাড়ছে। … তেমনই ভিড় সব থেকে বেশি জন্মের কালে, কিন্তু ঠেলাঠেলি নেই সেখানে, কারণ ওখান থেকেই ট্রেন ছাড়ছে। … কিন্তু দেখো, পরপর দুটো স্টেশনকে – বিধাননগর আর দমদম। … উপচে পড়ছে ভিড়। ঠেলাঠেলির একশেষ। একটা স্টেশন পরেই নেমে যাবে যারা, তারা ট্রেন থেকে বহু কষ্টে নামলো, তারপর ভিড় ঠেলে স্টেশন থেকে বেড়িয়ে যেতে যেতে তাদের জান কয়লা হয়ে গেছে।

আমি বললাম – আচ্ছা, জন্ম থেকেই ট্রেন যাত্রা, এটাতো বুঝলাম। কিন্তু মাঝের স্টেশন থেকে লোক উঠছে, এর মানে কি?

স্যার হেসে – স্কুল একটা স্টেশন নয় এনা, ১২টি স্টেশন। ক্লাস ওয়ান থেকে ১২ ক্লাস, ১২টা স্টপেজ। … কেউ কেউ ক্লাস ওয়ান থেকেই পড়াশুনা করছে, যেমন বাণী। আবার কেউ কেউ, ক্লাস থ্রি তে মনে করলো, না এবার পড়াশুনা করতে হবে। তো আবার কেউ কেউ ক্লাস নাইনে গিয়ে মনে করলো, না এবার পড়াশুনাটা মন দিয়ে করতে হবে। তো কেউ কেউ ক্লাস ইলেভেনে গিয়ে। যখন যখন যে যে মনে করছে, না এবার পড়াশুনাটা করতে হবে, সেই সেই স্টেশনে সে ট্রেনে উঠছে। আর যখন যখন কেউ মনে করছে, না আর পড়াশুনা করে লাভ নেই, সে সেই সেই স্টেশনে নেমে যাচ্ছে।

কিন্তু মজার কথা দেখো এনা, কেউ ব্যারাকপুর লোকালে শিয়ালদহ থেকে উঠেছে, আর ব্যারাকপুরেই নামবে। সে ওঠেও হেলেদুলে, আর নামেও হেলেদুলে। কি তাই না! … দেখো, তার কনো তারা নেই। … কারণ তার কনো কম্পিটিশন নেই।

তুমি দেখো না, তোমার বন্ধু রমাকে, কত কম্পিটিশন করতে হয়েছে, সেক্রেটারি হতে। (হেসে) শেষের দিকের স্টেশনে, লোকে ওঠে কম, নামে বেশি। … নামার হিড়িক সেখানে খুব। তাই হুড়মুড় করে নামতে হয়েছে। … যেই স্টেশনে নামবে, সেই স্টেশনে যাতে নামতে পারে, তারজন্য আগের স্টেশন থেকে সিট ছেড়ে দাঁড়িয়ে পরতে হয়েছে। … আবার পাশাপাশি দেখো শিখাকে। … তাকে তো একটা স্টেশনে নেমে আবার ট্রেন পালটাতে হয়েছে। … নেমেছে বর্ধমানে, আর যাবে দুর্গাপুর, তাই আসানসোলের ট্রেন ধরতে হয়েছে ছুটে ছুটে। … কম ছুটেছে সে, দেখেছো নিশ্চয়ই তুমি!

আমি অবাক হয়ে বললাম – আপনি এসব কি করে জানলেন? আপনি তো এসব দেখেননি!

স্যার হেসে বললেন – দেখেছি আমি এনা। আমি ট্রেনের প্রতিটি গতিবিধি দেখেছি। জীবনকে দেখেছি, তাই জীবনের প্রতিটি মোড়ে কে কি করে, তা জানি। … একই দৌড়, তোমার বন্ধু রমাকেও লাগাতে হয়েছে। … কলেজ নামক স্টেশনে নেমে, এক মুহূর্তও সে দাঁড়াতে পারে নি। তাকে দৌড়াতে হয়েছে, সেক্রেটারিয়েটের পড়াশুনার ট্রেন ধরতে। … কিন্তু তোমাকে তো তা করতে হয়নি। … তুমি তো আরাম করে ট্রেনের জানলারধারের সিটে বসে ছিলে।…

কিন্তু এনা, যেই দৃশ্য জানলা দিয়ে দেখতে পেতে, সেই দিকে না তাকিয়ে, খালি এই ভাবছিলে কেন যে আমার স্টেশন কবে আসবে?

প্রতিটি স্টেশনের নিজের নিজের বৈচিত্র্য আছে এনা। … প্রতিটি স্টেশনের একটা নিজের গতিবিধি আছে। … ব্যারাকপুর, কল্যাণীতে সরকারি কর্মচারীদের আনাগোনা বেশি, তো নৈহাটি, রানাঘাটে ব্যবসায়ীদের আনাগোনা বেশি। … জীবনের ক্ষেত্রেও ঠিক এইরকম। প্রতিটি স্টেশনের নিজের নিজের গতিবিধি আছে। স্কুলে বা কলেজ নামক স্টেশনে যিনি নেমে যাচ্ছেন, তিনি চাকরীজীবী। আবার যিনি কর্মক্ষেত্র স্টেশনে নামছেন, তাঁরা ব্যবসায়ী। আবার যারা বিবাহ নামক স্টেশনে নামছেন, তিনি সমাজসেবী।

… যিনি সেই সমস্ত গতিবিধিকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে দেখেছেন, তার কাছে জীবন এক মজার পাঠশালা, আর যিনি নিজেকে নিয়েই ভেবে গেছেন, তিনিও সেই যাত্রাই করেছেন, কিন্তু যাত্রাপথের ব্যাপারে তাঁর কিচ্ছু জানা নেই।

দূরপাল্লার ট্রেনে চেপে একটা পরিবার যাচ্ছে ভ্রমণে। … এঁদেরই একজন পরস্পর কি কি স্টেশন আসছে যাচ্ছে, সব দেখছে। তাই সে বলছে, এবার চিল্কা হ্রদ আসবে, এবার মঘলসরাই আসবে। আর অন্য পরিবারের সদস্যরা ফিরে এসে বলছেন, ট্রেনে বড্ড ঝাঁকুনি হয়, একদম ঘুম আসেনা। … বুঝলে এনা! … যে নিজেকে নিয়েই নিজে উলমালা, সে জীবনকে দেখতে পায়না, সে কেবল ট্রেনের ঝাঁকুনিতে ঘুম হয়না, সেটাই মনে রাখে। … আর যে জীবনকে দেখেছে, সেই একই যাত্রা থেকে, সে সবটা জানে, কারপর কি হয়, কার সাথে কি হয় – তিনি একটা ট্রেনজার্নির এনসাইক্লোপিডিয়া হয়ে যান। (হেসে) সে একটা জীবনের এনসাইক্লোপিডিয়া হয়ে যান। … তাই আমি সবটাই দেখেছি, কারণ আমি জীবনকে দেখেছি, নিজের জীবনকে নয়।

এনা, নিজের জীবনের দিকে মনযোগী না হয়ে, জীবনকে দেখো। দেখবে, একজায়গায় বসে বসে, তুমি সমস্ত মানুষের সমস্ত স্বভাব জানো। এমনকি, সেই স্বভাবের অন্তর্নিহিত কারণও জানো। … কেন জানবে না এনা! … সকলেই তো একই কাগজে ছবি আঁকছেন, সকলেই তো একই তুলি দিয়ে ছবি আঁকছেন, সকলেই যে একই রং দিয়ে ছবিকে ফুটিয়ে তুলছেন। …

যিনি আঁকা শেখান, তিনি কি পৃথিবীর সমস্ত বস্তুকে কনো না কনোদিন এঁকেছেন! … না এনা, তিনি কাগজটিকে জানেন, যার উপর আঁকা হচ্ছে; তিনি তুলিটিকে জানেন, যা দিয়ে আঁকা হয়; আর তিনি রংগুলিকে জানেন, যার দ্বারা চিত্র নির্মাণ হয়। … আর তাই তিনি যা কনোদিনও আঁকেননি, তাও আঁকতে পারেন। … ঠিক তেমনই এনা, জীবনকে জানো; জীবনের গতিকে জানো, জীবনের রংকে চেনো।… দেখবে, এমন কনো জীবনের চিত্র নেই, যা তুমি আঁকতে পারবে না। তুমি জীবন নামক অঙ্কনের শিক্ষক হয়ে যাবে।

আমি বুঝে গেছিলাম, আমার ভুল ঠিক কোথায় হচ্ছিল। আর বুঝে গেলাম যে আমি আমার গন্তব্য পেয়ে গেছি। … রানী রাশমণি তো আমি নই, তবে তাও আমার গন্তব্য স্টেশনের নাম বিবাহ। … আমি বিচিত্র স্যারের প্রেমে পরেছি। … তাঁর সমস্ত কথা আমার কাছে অমৃত লাগে। … তিনি একজন পুরুষ, কিন্তু তাঁর নজরে সেই কামনা আমি একটি বারের জন্যও দেখিনি। … উনি আমার থেকে কিছুই চাননা, কেবল চান যেন আমি আমার গন্তব্য পেয়ে যাই, আর তা পেয়ে যেন জীবনকে চিনতে শিখি। ঈশ্বরকে চিনি, সত্যকে জানি। …

আমি সেদিন আমার মা দুর্গার সামনে খুব কেঁদেছিলাম। তবে সেটা বেদনার কান্না ছিলনা। … প্রচুর ক্ষমা চাওয়ার ছিল, আর প্রচুর ধন্যবাদ দেবার ছিল। … ক্ষমা এই জন্য চাওয়ার ছিল কারণ আমি নাম না করে তাঁকেই উদায়স্ত গালমন্দ করে গেছিলাম, আমাকে আমার গন্তব্য না দেবার কারণে। সেই গালমন্দের একটিও তাঁর পাওয়া উচিত ছিল না। … তিনি তাঁর প্রতিটি সন্তানের জন্য, তার যা প্রয়োজন, তাই দেন। … কিন্তু আমরাই নিজেদেরকে না তো তাঁর সন্তান বলে মানতে পারি, আর না নিজেদের জননীর উপর ভরসা রাখতে পারি। … খুব লজ্জা লাগছিল, মায়ের দিকে চোখ রাখতে সেদিনকে।

আর ধন্যবাদ কি জন্য! … তিনি তাঁর এই কন্যার জন্য সেই গন্তব্য বেছেরেখেছিলেন, যা অদ্বিতীয়ম। … এমন মানুষের সান্নিধ্য পেয়ে আমি ধন্য হয়ে গেছিলাম। … আমার মধ্যে তিনি সম্পূর্ণ ভাবে আধ্যাত্মিক চেতনা এনে দিয়েছেন। … তাঁর সান্নিধ্যে এসে জেনেছি যে, ঈশ্বরকে তিনিই শ্রেষ্ঠ ভাবে জানেন ও চেনেন, যিনি জীবনকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে জেনে ফেলেছেন ও চিনে ফেলেছেন। … যতই ঈশ্বরের নাম চিল্লে চিল্লে করো, যদি জীবনকে না জানলে, আর ঈশ্বর কি ভাবে জীবন নামক ট্রেনকে চালান, আর ম্যানেজ করেন, তা যদি না জানো, তবে ঈশ্বরের নাম তো করবে, তবে সেই নামের মহিমা তোমার ভিতরে কনোদিনও দানা বাঁধবে না। আর তাই নাম নিয়েছি, এই দম্ভই করতে থাকবে, আর সমানে ভুল জায়গায় হাতুড়ি মেরে, পেরেক ভেঙে নতুন পেরেক তুলে নিতে হবে।

আমি এবার খুব চঞ্চল হয়ে গেলাম। … খুব সাজলাম। … অনেক জেগেজেগে স্বপ্ন দেখলাম। … আমি বিয়ে করবো। বিচিত্রস্যারের স্ত্রী হবো। … তাঁর স্ত্রী হওয়াও ভাগ্যের ব্যাপার। … তাঁর স্ত্রী হওয়ার মানে, আজীবন তাঁর অমৃত পান করতে থাকা। … একটু স্বার্থপর লাগলো নিজেকে। কিন্তু হ্যাঁ আজ আমি স্বার্থপর। আমার গন্তব্য স্টেশন এসে গেছে। … আমাকে এবার আমার মনের কথা বলতে হবে। … কি করে বলবো! … কালই বলবো।

স্যার হয়তো এমন আচরণ আমার থেকে আশা করবেন না। … তিনি কনো কারণে আমাকে স্নেহ দেননি। তিনি আমার থেকে কিচ্ছু চাননা। … কিন্তু আমি দরকারে উনার পায়েও পরে যাবো। কাকুতিমিনতি করে বলবো, আপনিই আমার গন্তব্য।

সেই রাত্রে অনেকক্ষণ জেগে ছিলাম। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, কি ভাবে স্যারকে রাজি করবো, তার রিহার্সাল দিচ্ছিলাম। … কিন্তু শেষে মনে হলো, না ঘুমালে, চোখের তলায় কালি পরে যাবে। … স্যার আমার প্রেমপ্রস্তাবে উত্তর না দিয়ে, আমার চোখের তলার কালি নিয়েই মেতে উঠে, সেই কালিতে নিজের পায়রার পালক ডুবিয়ে লেখাঝোঁকা শুরু করে দেবেন। … তাই মনের আনন্দে ঘুমিয়ে পরলাম।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5