দ্বিতীয় পর্ব – বছর ঘুরতে
একবছর ঘুরতে, আমাদের চারজনের মধ্যেই চার রকম বিকারের দেখা দিল। প্রথম যেই বিকার শাখাপ্রশাখা ছরালো, তার গ্রাস হলো বাণী। বাণী সেকেন্ড সেমিস্টারে একটা পেপারে ব্যাক খেলো। বাড়ি থেকে তুলোধোনা করা শুরু হলো ওকে। … স্কুলের র্যাঙ্ক করা মেয়ে, মাধ্যমিকে শহরের সেরা নম্বর পাওয়া স্টুডেন্ট; উচ্চমাধ্যমিকে বোর্ডে র্যাঙ্ক করা মেয়ে। সে ব্যাক খেয়েছে। … বাড়ির লোক ওকে সামনে পাচ্ছিলনা তাই গালি দিচ্ছিল কেবল; সামনে পেলে তো ওঁর পিট অবধি কাটা আর স্ট্রেটনিং করা চুল একটাও থাকতো না; টেনে টেনেই ছিঁড়ে দিতো।
যাইহোক, বাণী এবার কম্পাউন্ডারির কাজ ছাড়া, হস্টেলের বাইরে বেরনোই বন্ধ করে দিল। আমাদের মেশেও আসতো না, পার্লারও যেতনা। কেবল আমাদের চারজনের জন্মদিনেই ও আমাদের সাথে ছিল। কিন্তু এত কিছুর পরেও, বাণী পরের সেমিস্টারে আরো দুটো সাবজেক্টে ব্যাক পেলো। … এবার ও যেন অত্যধিক সিরিয়াস হয়ে গেল।
অন্যদিকে শিখা, যে আমার সবসময়ের সাথী ছিল, তার অবস্থাও একই রকম। কনোরকমে, সাজেশন টাজেশন নিয়ে, মাইক্রো জেরক্স মেরে, ঠেলেঠুলে থার্ড-ডিভিশন পেল, অনার্স ছেড়ে দিলো। … কিন্তু এদিকে ঠেকিয়ে দিলেও, ও এবার ওঁর কাজের জায়গায় এক্সেল করতে থাকলো। এড ডিজাইনিং-এর পুরো কনসেপ্ট ও ধরে ফেলেছে। … ওঁর কোম্পানি ওকে ফুলটাইমার করে পেতে মরিয়া। … শুধুই স্টুডেন্ট বলে সেই জোরটা খাটাতে পারছেনা। …
কিন্তু শিখা সেই না পারাকে কেন্দ্র করে, এক বড় ধরনের ব্যাবসা ফেঁদে বসে পরেছে। … সেই এখন চারটে কোম্পানির হয়ে এড ডিজাইনিং-এর ফ্রিল্যান্স করছে। … সব জায়গায় বলেছে, ওর পড়াশুনায় এফেক্ট পরে, ও থার্ড ডিভিশন পেয়েছে, তাই ও কোম্পানিতে গিয়ে কাজ করতে পারবেনা। … কিন্তু সেই কথা বলে, ও চারটে কোম্পানির সমস্ত এড ডিজাইনিং-এর কাজ, মেশে বসে ল্যাপটপে মুখ গুঁজে করতে থাকে। …
খাওয়া ঘুম সমস্ত কিছু লাটে উঠেছে ওঁর। … দিনরাত খালি ল্যাপটপে মুখ গুঁজে কিনা কি করে যাচ্ছে। … কোলের উপর ল্যাপটপ রেখে কাজ করছে, মাঝে মধ্যে চার্জ শেষ হয়ে যাচ্ছে। তখন ল্যাপটপ চার্জে গুঁজে, স্কুলে যেমন করে নিলডাউন হতাম, তেমন করে বসে, কাজ করে চলেছে। … রাত্রে আমরা শুয়ে পরছি, তখনও ও কাজ করে চলেছে।
তিন চারমাস এমন করার পরে, ও একাকটা কোম্পানিতে ২০ থেকে ২৫ হাজারের ইনভয়েস করতে লাগলো, মানে মাসে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা কামাতে শুরু করলো। আর এককথায় বলতে গেলে, পুরো কেরিয়ারিস্টিক হতে শুরু করে দিল।
রমাকেও আমি সঙ্গে পেলাম না। … সে তার পড়াশুনা আর চাকরি, দুটোতেই খুব সিরিয়াস। কিন্তু তার এখন আরো একটা নতুন সিরিয়াসনেস জন্মেছে। সে আবার একটা বয়ফ্রেন্ড জুটিয়েছে। তার সাথে সারাদিন ঘোরাঘুরি, আর রাতে ফোনে কথা।
একদিকে শিখার ল্যাপটপের আলো জ্বলছে, আর অন্যদিকে রমার ফিসফিস কথা। মাঝে মাঝে আবার রমা হেসে ওঠে। হাসির কনো শব্দ পাওয়া যায়না, কিন্তু বিছানাটা ভূমিকম্পের মত কাঁপতে থাকে। … আর সেই কম্পনকে আমি ট্রেনের ঝাঁকুনি ভেবে নিয়ে ঘুমিয়ে পরলেও, যখন এরকম টানটান হতে থাকে, তখন শিখার আওয়াজ শুনতে পেতাম – উমম্ ।
তারপরেই দেখতাম ভূমিকম্পটা খানিকক্ষণের জন্য থেমে যেত, তারপর আবার মাঝেমাঝেই আফটারসক আসতো যদিও। কিন্তু যাই হোক, এই ভূমিকম্পে কার ভূমি কাঁপছিল, কার বাড়িঘরে ফাটল ধরছিল জানিনা, আমার বাড়িঘর ধসে পরে যাবার উপক্রম হয়।
তিনজনেই যে যার মত ব্যস্ত হয়ে গেল, আর আমি মাঝে একা পরে গেলাম। আর বাকি কলেজের লাইফটা এইরকমই একা একা কাটাতে হলো। … বাণী ফর্থ সেমিস্টার থেকে নিজেকে সামলে নিল, আর সেটা সামলে নেয় ও একজন যুবক পুরুষডাক্তারের সাহায্যে। ক্রমশ ওঁর আর ওই হাউজ সার্জেনের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে থাকলো, আর তার ফলে, ওঁরও রমার মত অবস্থা হলো, যদিও ও হস্টেলে থাকতো বলে, আমরা ওঁর গুঞ্জন আর হাসির আওয়াজ পেতাম না।
অন্যদিকে, শিখা আমাদের তিন বছরের বেচিলর কোর্সের শেষের দিকে পুরোপুরি ভাবে কেরিয়ারিস্টিক হয়ে গেছে। ও এখন একটা ফার্ম খুলে নিয়েছে। ট্রেডলাইসেন্স বানিয়ে, টালিগঞ্জ মেট্রোর কাছে একটা ঘরভাড়া নিয়ে, সেখানেই সান্টিং হয়ে গেছে। … সমস্ত কোম্পানিই এখন ওঁর কাছে ডিজাইনিং-এর আইডিয়া নিতে আসে, আর ও এখন কন্সাল্টেশন ফিজ নেয় খালি। … আর সেই থেকে ওঁর ইনকাম এখন লক্ষাধিক হয়ে গেছে।
রমা শি-এস পড়ছে, কোম্পানি সেক্রেটারিয়েট। রোমান্স তো ওঁর রোমে রোমে ছড়িয়ে গেছে। … অন্যদিকে শিখার প্রেমেও কনো এক কোম্পানির মালিক হাবুডুবু খাচ্ছে।
না, আমার এইসমস্ত চক্কর ছিলনা। তবে থাকলেই ভালো হতো। সময় কাটতো না। যেযার মত ব্যস্ত, বয়ফ্রেন্ড আর কাজ নিয়ে, আর আমি খালি একটু পড়াশুনা করতাম, আর ব্রসিওর মেকিং-এর কাজ করতাম।
না এবার আমার ঘর থেকে কিচ্ছু বলেনি, কনো কম্পিটিশন নেই, কিচ্ছু নেই। … কিন্তু আমি ক্রমশ মনে মনেই একটা হতাশায় ডুবে গেলাম। পড়াশুনাতে আমি শেষের দিকে ছিলাম, আমার সাথে শিখাও ছিল। … কাজবাজেও আমি রইলাম ওই তথৈবচ হয়ে; আর এই প্রেমপীরিতের চক্করেও, সেই লাস্ট হয়ে রইলাম আমি!
না আমাকে এই কথা বা খোঁটা কেউ দেয়নি। কিন্তু এই খোঁটা আমারই বুদ্ধি, আমার মনকে দিচ্ছিল। … অনবরত সে বলতে থাকছিল, সবেতেই ফেল তুই। পড়াশোনাও তথৈবচ, চাকরিবাকরিও সেইরকমই, আর একটা মনের মানুষও জোটাতে পারলিনা।
বাড়ির লোকের খোঁটাকে একসময়ে খুব ভয়পেতাম। কিন্তু এখন যেন মনে হচ্ছে, সেই খোঁটা অনেক ভালো ছিল। ঘুমিয়ে পরলে অন্তত শুনতে পেতাম না খোঁটাগুলো। এই বুদ্ধির খোঁটাতো ঘুমিয়ে পরলেও স্বপ্ন দেখিয়ে ঘুমভাঙিয়ে দেয়! … দিনরাত খালি এক পরাজিত সৈন্যের মত এদিক সেদিক একা একা ঘুরে বেড়াতাম। …
শেষে আমারও একটা ব্যামো হলো। ছেলে দেখে বেরানোর ব্যামো। … একটা বয়ফ্রেন্ড লাগবে আমার। কার সাথে সময় কাটাবো? কি করে সময় কাটাবো! … সকলের থেকে আমি যেন ছন্নছাড়া হয়ে গেছি। পেলাম না, একটিও বয়ফ্রেন্ড জোটাতে পারলাম না। … যতগুলোর কাছাকাছি যাবার চেষ্টাও করলাম, সকলের নজর শরীরে। বিরক্ত অনুভব করতে থাকলাম। … আর শেষে মেশের ঘরথেকে বেরনোই বন্ধ করে দিলাম।
না একটাও সম্পর্কে জরাই নি। … প্রথম দিকে একটু ভালো লাগতো। … কিছু কিছু ছেলে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতো, আমাকে দেখবে বলে। … সেই দেখে, একটু কেমন কেমন লাগতো। … একটু লজ্জালজ্জাও লাগতো, আবার কেমন একটা আকর্ষণও থাকতো। মনে হতো একবার ঘুরে দেখিই না, এখনও দেখছে কিনা আমায়। … কিন্তু না রোমান্স-এক্সপার্ট, রমা আমাকে বলে দিয়েছিল, এমন যেন না করি। এমন করলে নাকি ছেলেরা ভাবে, আমি তার চাউনিতে পটে গেছি।
আসলে রমার এইসব ব্যাপারে, বিপুল অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। … এই দুই বছরে তিন তিনবার বয়ফ্রেন্ড পালটেছে ও। … মাঝে মাঝে সেই পুরুষের সাথে কাছেপিটে কোথাও ঘুরতে গিয়েও দিনরাত কাটিয়ে এসেছে। … বাণীর পার্লারে যাওয়া কমেছে, আর রমার পার্লারে যাওয়া বেড়েছে, যদিও পয়সা বয়ফ্রেন্ডই দেয়। বেশভূষাও ওঁর পাল্টে গেছে। আর আমাদের মত সালওয়ার পরে না। এখন কেমন যেন একটা সিনেমা আর্টিস্ট, সিনেমা আর্টিস্ট পোশাক পরে।
যাই হোক, ঘুরে তো দেখতাম না, যদিও মনে খুব ইচ্ছা হত ঘুরে দেখতে। … কিন্তু একদিন না ঘুরে, সরাসরিই একটি ছেলের চোখে চোখ রাখি। তাকাতে দেখি, সে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে নেই, আমার কোমর, আর স্তনের দিকে সরাসরি নজর লাগিয়ে রেখেছে। … দেখে প্রচণ্ড রাগ হলো। মনে হলো একটা টেনে থাপ্পড় মারি।
তারপর নিজেকে শান্ত করে নিলাম। মনকে বললাম, রাগ হচ্ছে কেন? রাগ হচ্ছে কারণ, তুই আশা করেছিলিস যে তোকে পছন্দ করবে, তোর শরীরকে পছন্দ করবে এটা ভাবিস নি। … তাই যাই দেখলি, তোকে না, তোর শরীরে ওঁর নজর, অমনি রাগ এসে গেল। … ভালো করে দেখ, সকলেই ওই ছেলের মত।
আমার বিশ্বাস হলো না, আমার মনের এই কথার উপর। তাই এবার অনেকগুলো পুরুষ, যারা আমার উপর নিয়মিত নজর রাখতো, তাদের দিকে তাকালাম, আর প্রমাণ পেলাম যে মন আমার ঠিকই বলছিল। রাগ হলো না এবার, কেমন একটা গা ঘিনঘিন করে এলো। … এদের মধ্যেই কিছু কিছু পুরুষকে দেখলাম, একটা অন্যরকম দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে। … তবে সেটা প্রেমের দৃষ্টি নয়। … খতিয়ে দেখলাম, কিছু বুঝতে পারলাম না। তাই আমাদের লাভ-গুরু, মানে রমাকে প্রশ্নটা করলাম।
রমা বলল, ওরা চায়, আমাকে সর্বক্ষণের জন্য নিজের অধীনে স্থাপন করতে। এঁরা একটু উঁচুদরের কামুক। এঁরা দেহকামে লালায়িত থাকেনা। এরা জানে যে দেহকাম দুইদিনের। একসময়ে তো তা নষ্টই হয়ে যাবে। তাই এঁরা সম্পূর্ণ ভাবেই তোকে কামনা করে, যার মধ্যে তোর থেকে দেহকামসুখও পাবে, আবার তুই তার হয়ে, তার পরিবারকে টানতেও পারবি। রমা আরো বলল, এঁদের সাথেই নাকি সম্পর্ক জুড়তে হয়। সে এরকমই কারুকে খুঁজছে, কিন্তু পাচ্ছে না। আমি নাকি খুব লাকি এই ব্যাপারে।
এই কথার মাঝে, ফুট কাটল শিখা। ও বলল, এখন ট্রেন্ড উলটো রমা। এখন আর পুরুষের তালে স্ত্রীর তাল মেলাবার সময় চলে গেছে। এখন পুরুষরা সেই মেয়ে খুঁজছে, যার তালে তারা তাল মেলাতে পারবে, আর স্ত্রীরাও সেরকমই পুরুষ খুঁজছে যারা তাদের সাথে তাল মিলিয়ে সংসার করতে পারবে।
রমা সেই কথাতে বলল, শিখা, জানি এরকম ট্রেন্ডই এখন মার্কেটে চলছে, কিন্তু আমরা না এতটাও আলট্রা মডার্ন হতে পারিনি, বুঝেছিস!
উত্তরে শিখা বলল – বা রে! … চাকরি করছিস, শি-এস পরছিস, মানে আরো ভালো চাকরি করবি। তারপর কি (একটি গালাগাল দিয়ে) বরের সেবা করবি! … বরের সেবা, শাশুড়িমায়ের সেবা, শ্বশুরের সেবা, দেওর ননদ থাকলে তো কথাই নেই। এঁদের সেবা করার জন্য এত পড়াশুনা করলি ছোট থেকে! … যদি ওরকমই পড়াশুনা করার ছিল তো, আমার আর এনার মত আর্টস নিয়ে জেনারেল কোর্সেই পড়তিস, এতো ফালতু পড়াশুনা করে, বাবা-মায়ের পয়সা নষ্টই বা কেন করলি, আর নিজেরই মাথাটা নষ্টই বা কেন করলি।
রমা সেই কথাতে একটা রিয়েক্সান দেবার চেষ্টা করে বলল – মানে! … পড়াশুনার সাথে এর কি সম্পর্ক?
শিখা – যেই পড়াশুনা করা হয় পয়সা রোজগারের জন্য, সেটাই তো তুই করেছিস! হ্যাঁ কি না! … যদি বিয়ে করার কয়ালিটি ঠিক করার জন্য পড়াশুনা করতিস, যেমন এনা করেছে, তাহলে দ্যাখ, এনা কেমন আনন্দে দিন কাটাচ্ছে। বিয়ে করার আগে পর্যন্ত রোজগার করছে। বিয়ে হয়ে গেলে, বরের পয়সাতে খাবে। মিটে গেল। … তুই এতো ব্যবসাহিক পড়াশুনা করে, চাকরিও করবি, আবার বরের তোষামোদিও করবি, তাহলে এত কিছুর প্রয়োজন কি!
আমি মাঝে মুখ ফাঁক করে বলে ফেলেছি খালি, আরে পড়াশুনা থাকলে পণ চাইতে পারবে না, শ্বশুরঘরের লোকেরা, অমনি শিখা আমাকে তুলোধোনা করে দিল। … বলল – আজকালকার মেয়ে হয়ে, এমন ব্যাকডেটেড চিন্তা রাখিস কি করে তুই! … এখনকার মেয়েদের দ্যাখ, বর ওকে পটাচ্ছে, আর ও বিয়ের আগেভাগেই গিয়ে শাশুড়িকে পটাচ্ছে। জানে, পণটন যা কিছু নেবে, সব শাশুড়ির জন্যই নেবে। তাই আগে থেকেই শাশুড়িকে পটিয়ে নেয়, ব্যাস কাজ শেষ। তারজন্য আবার পড়াশুনা করতে হয়নাকি।
রমা এবার একটু বিদ্রোহী সুরে বলল – তাহলে এত মেয়েরা যে পড়াশুনা করছে, কি জন্য করছে, ভালো ঘরে বিয়ে করার জন্য!
একটা ব্যাঙ্গের হাসি হেসে কাজ করতে করতে, নিজের ঘুরুন্তি চেয়ারটা ঘুরিয়ে নিয়ে শিখা বলল – বরাবরই তিনটে কারণে মেয়েরা পড়াশুনা করেছে। প্রথম কাজ পাবার জন্য, দ্বিতীয় ভালো ঘরে বিয়েসাদির জন্য, আর তৃতীয় ক্যাটাগরিতে কিছু রেয়ার এলিমেন্ট থাকে, তারা জ্ঞান অর্জন করার জন্য। পুরুষের মধ্যে এই তিননম্বরটা তাও একশ কোটিতে একটা আধটা পাওয়া যায়, মেয়েদের মধ্যে তো পাওয়াই যায়না। তুই কি জন্যে পরেছিস! চাকরীর জন্যই তো! … বাণী কি জন্যে পরেছে! ভালো প্রফেসানের জন্যই তো। আর আমাকে আর এনাকে দ্যাখ।
এনা তো তাও চালিয়ে চুলিয়ে নিয়ে গেছে, আমি তো আর ফাইনাল ইয়ার দিতেই পারলাম না। … ধুর, ৩ লাখ টাকা মাসে কামাই এখন, আরো বাড়বো। অসব ফেলে এই (গালাগাল দিয়ে) পড়াশুনা করব নাকি! … তাহলে কি দাঁড়ালো! … তোরা ভালো কাজের জন্য পড়েছিস আর এনা পড়েছে ভালো ঘরে বিয়ের জন্য। আমি পড়াশুনা ততদিন করেছি, যতদিন বাড়ি থেকে ঘেতিয়েছে। এখন মোটাটাকা রোজগার করি, তাই ঘুণাক্ষরেও পড়াশুনার কথা বাড়িতে তোলেনা। আমিও পড়াশুনা করিনা। জ্ঞান অর্জনের জন্য আমাদের মধ্যে কে পড়াশুনা করেছে, বল দেখি একবার!
রমা দেখলাম চুপ করে গেল। তাই ব্যাগ গুছিয়ে ওঁর টালিগঞ্জের বাড়িতে যাবার জন্য তজ্জরি করতে করতে শিখা আবার বলল – তাই, কে তোকে নিজের জীবনে জুড়তে চাইছে, তার চিন্তা না করে, কাকে তুই জীবনে জুরে রাখলে, তোর জীবন বাঁচতে সুবিধা হবে, সেটা ভাব। কল্পনার মধ্যে থাকিস না, লাইফ হেল হয়ে যাবে।
এবার আমি বললাম – কিন্তু দুটোই কি ঠিক! … মানে সে দেখবে, আমি তার জীবনে গেলে, তার কামনাবাসনা পূর্তিতে আমি সহকারী হবো, বা আমি দেখবো, আমার জীবনে সে এলে, আমার কামনাবাসনার জয়যাত্রা অব্যহত থাকবে। এই দুটোর মধ্যে একটাও কি ঠিক!
রমা কিছু বলতে গেলে, শিখা বলল – দ্যাখ এনা, তোর কাছে না এই ঠিক-ভুল নিয়ে চিন্তা করার অফুরন্ত সময় আছে। … পড়াশুনাও তোর শেষের দিকে, কাজবাজ তো তোর তিন ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। পুরোদিন পরে থাকে তোর কাছে, এই সমস্ত ঠিক-ভুল ভাবার। আমাদের কাছে না একদম সময় নেই। … ১২ ঘণ্টার উপর শুধু প্রফেসানেই সময় চলে যায়। তারপর আর ঠিক-ভুল বোঝার সময় থাকেনা। তবে হ্যাঁ, যেটা প্রয়োজন সেটা হলো, আমার সাথে তাল মেলাতে পারবে, এমন কারুর। ব্যাস, সেটা সামনে এলে, তুলে নাও। … খোঁজাখুঁজি করেও সময় নষ্ট করো না, ছেলেদের কাছে এইসমস্ত খোঁজাখুঁজি করার প্রচুর সময়। ওরা খুঁজুক। খুঁজতে খুঁজতে আমার সামনে এসে গেলে, বাগান থেকে ফোঁটা ফুল তুলে নিয়ে নিজের কাছে রেখে দেব।
শিখা একটা স্কুটি কিনেছে, নিজের পয়সায়। সেই স্কুটিতেই নিজের টালিগঞ্জের অফিসে রোজ যাতায়াত করে। শি-এস পড়তে রমাও যায় চেতলায়। শিখা রোজ ওকে স্কুটিতে নিয়ে যায়, আর ফেরার সময়ে ওকে নিয়ে আসে। … তাই শিখার স্কুটির পিছনে বসে, মাথায় হেলমেট চাপিয়ে রমা আমাকে টাটা বলে চলে গেল। এখন বাজে সকাল ১০টা। আর ওরা ফিরবে রাত্রি ১০টায়। … আমি খালি রুটিতা করি। প্রায়ই ওরা কিছু কিনে নিয়ে আসে, রুটির সাথে খাবার। কোনকোন দিন বিরিয়ানি বা রুমালি রুটিও কিনে আনে, সেদিন আমাকে ফোন করে বলে দেয়, রুটি না করতে। …
কিন্তু এই ১২ ঘণ্টা আমার সময় কাটে কি করে সেটা আমিই জানি। … কলেজের পড়াশুনা ৩ ঘণ্টা, আর ব্রসিওরের কাজ ৩ ঘণ্টা; বাকি ৬ ঘণ্টা শুধুই বোর হওয়া, আর ওই যে শিখা বলল, আমার অনেক সময় ঠিক-ভুল বিচার করার। তাই ওই বিচার করি আর নিজেরই মাথাটা খারাপ করি।
মাঝে একটা বয়ফ্রেন্ড জোটানর ইচ্ছা হয়েছিল। তারপর যা বিশ্রী সব চাউনি দেখলাম, কেউ শরীর চায়, তো কেউ শরীরের সাথে সাথে মাথার ঘিলুটাও চিবিয়ে চিবিয়ে খেতে যায়। … তাই ওসবও আর ভালো লাগেনা। … তাই আবার সেই বসে বসে নিজেকে এক পরাজিত সৈন্য মনে করা ছাড়া আমার কনো কাজ নেই।
মাঝে মাঝে বসেবসে ভাবি, সত্যিই তো কেন এত মন দিয়ে পড়াশুনা করার চেষ্টা করলাম! … যেই কাজ করছি, সেই কাজ তো এই পড়াশুনা করার জন্য পাইনি। তবে? তাহলে কি শিখাই ঠিক বলল, ভালো ঘরের বিয়ে হবার জন্য, বরের তোষামোদি করার জন্যই এই মনোযোগ দিয়ে পড়াশুনা! … আচ্ছা, বরের তোষামোদি করা কি খারাপ! … না খারাপ নয়, যদি বরের জীবনে একটা কনো উদ্দেশ্য থাকে। যদি ওই নিজের কামনা বাসনা পূর্তি, মানে নিয়মিত দেহসুখের পূজা করা, বেশি বেশি ব্যাঙ্কব্যালেন্স করা, সম্পত্তি করা, আর প্রতিষ্ঠার পিছনে ছোটা হয়, তাহলে তোষামোদি মানে নিজেকেও সেই একই ফাঁদে ফেলে দেওয়া। নিজের কামনা না থাকলেও, তার কামনার সহায়ক; তাঁর কাম্য বস্তুর ভোগ তো আমিও করবো, তাহলে সেটা তো আমারও কামনাপূর্তিরই যজ্ঞ হলো, তাই না!
এত সমস্ত ভাবাভাবির মধ্যে আমি ডুবতে ডুবতে, ক্রমশ আমি যে ভাবনা নামক রোগে অসুস্থ হয়ে উঠছি, তা বুঝতেই পারিনি। … বুঝতে, রমা আর শিখাও পারেনি। ওদের বোঝার সময়ও নেই। … বুঝল বাণী, যখন আমরা চারবন্ধু একসাথে হয়েছিলাম রমার জন্মদিনে। … বাণী আমার দিকে তাকিয়ে বলল – হ্যাঁ রে এনা, তুই কি খুব চিন্তা করছিস! … তোর চোখের তলাটা এমন কালো হয়ে আসছে কেন? … দেখি তোর নাড়ি দেখি। তোর কি কনো রোগভোগ হলো নাকি?
আমার নাড়ি টিপে দেখে বলল, খুব টেনশন করছিস? কিন্তু কেন? কাজবাজ তো ভালোই করছিস। পড়াশুনাও ঠিকথাকই করছিস! … কারুর প্রেমে পরেছিস, যে তোকে পাত্তা দিচ্ছে না! … না এমন তো হতে পারেনা। … আমাদের চারজনের মধ্যে তোকে দেখতে সব থেকে সুন্দরী। গায়ের রং ফরসা, দেখতে সুন্দর, ফিগারও তো তোর বেশ সুন্দর। … আর পড়াশুনায় তো তুই খারাপ নয়। রোজগারও যে একদাম করিস না, তাও নয়। মাসে ১২-১৩ কামাস, তা খারাপ কি?
আমি বললাম – না না, ওসব কিছু নয়। … একা একা থাকি তো, তাই একটু খেয়ালের মাঝে হারিয়ে যাই, এর বাইরে কিছু নয়।
রমা – তুই ৩ ঘণ্টার জায়গায় ৬ ঘণ্টা কাজ কর না। … তোকে তো তোর কোম্পানি বলে বেশি কাজ করতে। তা করছিস না কেন? রোজগারটাও বেশি হবে, আর সময়টাও কাটবে।
শিখা – আমি বলি কি, তুই তো পড়াশুনায় বেশ ভালো। … আমার একটা ক্লায়েন্টের স্ত্রী জেলের কয়েদিরা, যারা মাধ্যমিক দেবে, তাদের পরান। … ওখানে এসএসশি লাগেনা। … উনি একজন ভালো ভুগলের টিচার খুঁজছেন। … আমি তোর কথা বলেছি, উনি ইন্টারেস্ট দেখিয়েছেন। … দিনে ৪ ঘণ্টা লাগবে, আর একঘণ্টা ধরেনে না যাতায়াতের জন্য। করবি ওখানে কাজ।
বাণী – হ্যাঁ ভালো বলেছে শিখা। যেই কাজটা করিস, সেটাও তো বাড়িতে বসে বসেই করিস। … বাইরে তো বেরোসি না তুই। … এই কাজে কনো হেডেকও থাকবে না, আবার একটা আউটিংও হয়ে যাবে। (শিখার উদ্দেশ্যে) কত দেবে বলেছে।
শিখা – দমদম জেলের সমস্ত পড়ুয়া। একজন বিজ্ঞান, আর সায়েন্স সাবজেক্ট পড়ায়, একজন ইংরাজি বাংলা হিন্দি, একজন মনস্তত্ব বিশেষক আছে, কারণ কয়েদিদেরকে পড়াশুনার মনযোগী করা খুব ডিফিকাল্ট কাজ। আর একজনকে খুঁজছে যে ইতিহাস আর ভূগোল পরাবে। … এখন প্রায় ১০০ জন অনাদের কাছে পড়ছে, আর সকলে মাসে একশো করে টাকা দেয়, যা জেলের ভেতরে থেকে কামায়, তার থেকে আর কি। …
আর জেলার এই কয়েদিরা ভালো হয়ে যাচ্ছে দেখে, সরকারের থেকে অনুমোদন করে নিয়ে এসে, মাসে ৪০ হাজার ব্যবস্থা করেছে, সরকারি অনুমোদন হিসাবে। … বোধহয় ওটা ৫০, তারপর কিছু খাওয়াখুইর গল্পও তো থাকে, তাই হয়তো ৪০। … চারটে টিচারকে মাসে এই ৫-৬ হাজার করে দেন। বাকি উনার নিজের।… তবে হ্যাঁ, দমদম স্টেশনের বাইরে, উনার গাড়ি থাকে। সেই গাড়িতেই সকলকে যেতে আস্তে হয়, অন্য গাড়িকে জেলের ভিতরে ঢুকতে দেয়না।
রমা আর বাণী একসঙ্গেই বলল – টাকা তো এখানে ভালোই কামায়। ওঁর তো টাকার বেশি প্রয়োজন নেই। … কিন্তু একটা জায়গায় ফিসিকালি এঙ্গেজড্ হবে, ভালো লাগবে ওঁর। … কিছু কিছু নতুন মানুষের মুখ দেখলে, খারাপ লাগবে না, সত্যি বলছি এনা।
সকলে বলছে দেখে, আমিও রাজি হয়ে গেলাম। … কিন্তু মনের মধ্যে সেই একই ভাব উকি মারতে লাগলো। আমি সম্পূর্ণ ভাবেই দৈন্য হয়ে গেছি। সকলে আমার উপর কৃপা বর্ষণ করছে। … আমার বন্ধুরা খুবই ভালো, সেই বিশয়ে কনো সন্দেহ নেই। … কিন্তু খারাপটা বোধহয় আমিই। … হয়তো, আমার মনে ওদেরকে নিয়ে যেই কম্পেরিজনটা চলছে, সেটা ওদের মনে কনোদিনও চলেনি। …
কিন্তু আমি যে কম্পেরিজনটা না করে থাকতে পারছিনা। … ছোটবেলার পড়াশুনাতে বাণী এগিয়ে; বড়বেলার পড়াশুনাতে রমা এগিয়ে গেল; অর্থ রোজগারে, সবার থেকে পিছিয়ে থাকা শিখা সবাইকে টোপকে এগিয়ে গেল। আর আমি! … আমি সব সময়েই পিছিয়েই রইলাম। … আগে আর যেতে পারলাম না। … স্কুলেও ছিলাম এভারেজ গার্ল, কলেজেও তাই, চাকরিতেও তাই। … আর প্রেমে! … ডাহা ফেল। … ওখানে তো আমার তিনবন্ধুই আমাকে টাটা করে উধাও হয়ে গেছে। … আর আমি যেই তিমিরে সেই তিমিরেই পরে রইলাম।
