গন্তব্য ষ্টেশন | প্রেমের গল্প

আমি এনা। আজ আমার বয়স ৫০। তবে যেই কথা আমি বলছি, তা প্রায় আমার পুরো জীবনেরই কথা। সেই শিশুকালের বন্ধু ছিলাম আমরা চারজন, অর্থাৎ আমি, বীণা, রমা আর শিখা। … অসম বয়সের বন্ধুর কথা শুনেছেন আপনারা। কিন্তু আমরা ছিলাম অসম প্রতিভার বন্ধু। আমাদের চার বন্ধুর মধ্যে কারুর সাথে কারুর প্রতিভার কনোপ্রকার মিল খুঁজে পাওয়া এক দুষ্কর ব্যাপার। তবুও আমরা বন্ধু ছিলাম।

যার প্রতিভা যেই দিকে, তার দিক থেকে উঠে আসতো প্রতিযোগিতার হাতছানি, আর সেই প্রতিযোগিতায়, বাকিরা সকলেই হতো ধরাশায়ী। এই ভাবেই চলতো আমাদের বন্ধুত্ব। … তবে এখানে একটি কথা বলা রাখা অত্যন্ত আবশ্যক। সেটা হলো যে, আমরা যখন স্কুলে একসঙ্গে পরতাম, তখন প্রতিযোগিতার আবাহন কেবলই বীণার থেকে আসতো, কারণ তখন তো ওঁর একার মধ্যেই কিছু প্রতিভা দেখা যেত, বাকিরা তো কেবলই ফক্করবাজির প্রতিভা রাখতো। …

কলেজে যেতে, প্রতিভা দেখা গেল রমার মধ্যে। … এবার আমাদের প্রতিযোগিতা আরো বেশি প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠলো। এক বীণাতে রক্ষা নেই, সঙ্গে আমার রমা। … সেই প্রতিভার জের, আরো বেরে গেল, যখন আমরা সকলে চাকরি করতে ঢুকলাম। এবার প্রতিভার প্রকাশ পেল শিখার মধ্যে। … আর আমি হয়ে গেলাম কোণঠাসা, কারণ আমার মধ্যে যে কোন প্রতিভাই নেই। …

হ্যাঁ আমার প্রতিভার প্রকাশ পেল, তবে তা পেল যখন, তখন আমার বয়স ৩৩। আর আমার যখন প্রতিভা প্রকাশ পেল, তখন আর প্রতিযোগিতা নেই। … কারুর সঙ্গে কারুর প্রতিযোগিতা নেই। … সমস্ত কিছু মেলালে, জীবন একটা অদ্ভুত ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমার সামনে, বিশেষ করে তখন যখন আমি সকলের প্রতিযোগিতা আর প্রতিভার থেকে ছিটকে সরে যাই, সেই সময়ে। আর এই ধাঁধার উত্তরও পাই, ঠিক তার পরপরই।

ব্যাপারটা জমিয়ে না বললে, ঠিক বোঝানো যাবেনা। মানে বোঝাণ যাবে না, ধাঁধাটা কোথায়, আর এটাও বোঝানো যাবেনা, ধাঁধার উত্তরটাই বা কি। … তাই প্রথম থেকেই সমস্ত কিছু বলতে শুরু করি আপনাদের। জীবনের যেমন অদ্ভুত বৈচিত্র্য রয়েছে এখানে, তেমনই প্রকাশ পেয়েছে এক বিচিত্র ধাঁধার। সত্যি বলতে কি, এই কথা লেখার ইচ্ছা আমার বহুদিনেরই ছিল, কিন্তু ঠিক গুছিয়ে উঠতে পারছিলাম না। … যাই হোক, আমার প্রতিভা বরাবরই লেটে জাগে। আর তার এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। … কিন্তু লেটে হলেও, এবার তার বিবরণ যখন দিতে বসেছি, তখন পুরোটাই বলবো।

আমার কথাতে আপনারা পাবেন, সাধারণ জীবনের কথা, পাবেন সাধারণ জীবনে সাফল্যের আসাযাওয়ার কথা, পাবেন সাফল্য লাভের উত্তেজনার কথা, আবার পাবেন সাফল্য লাভ না করার হতাশার কথা, আর সাথে সাথে পাবেন প্রেমের উদয় ও অস্ত যাবার কথা। … সব মিলিয়ে, আপনারা আপনাদের জীবনকেও এর মধ্যে দেখতে পেয়ে যেতে পারেন। তাই প্রথম থেকেই বলতে শুরু করা যাক।

আমার, রমার, বাণীর আর শিখার বন্ধুত্ব সেই ক্লাস থ্রি থেকে। হ্যাঁ, আমরা সকলেই সারদামনি বিদ্যাপীঠের ছাত্রী সেই ক্লাস ওয়ান থেকেই। কিন্তু আমাদের বন্ধুত্ব বেড়ে ওঠে, যখন আমরা থ্রিতে পরি। বাচ্চাদের বন্ধুত্ব করার কনো কারণ থাকেনা। তাই আমাদেরও বন্ধুত্ব করার কনো কারণ ছিলনা। যদি কারণ দেখেই বন্ধুত্ব করা হতো, তবে আমি বা শিখা তো কিছুতেই রমা বা বাণীর বন্ধু হতে পারতাম না।

বাণী ক্লাসের র‍্যাঙ্ক করা মেয়ে। হ্যাঁ ফাস্ট কোনদিনই হয়নি। তবে প্রতিবারই এক থেকে পাঁচের মধ্যে থাকতো। আর রমা ক্লাস এইটে আর নাইনের হাফিয়ারলিতে র‍্যাঙ্ক করেছিল। এমনি পড়াশোনাতে আমাদের থেকে তো ঢের ভালো ছিল। আমি ছিলাম একদাম যাকে বলে মিডিওকার, মানে সব সময়ে এই সিক্সটি পারসেন্ট মার্ক্স পেতাম, কিন্তু তার বেশি-কম কনোদিনও পাইনি। আর শিখা ছিল কনো রকমে পাস করার দলে, কিন্তু হ্যাঁ, আমরা দুজনেই ফেল কনোদিন করিনি।

তবে, এই অসম প্রতিভার বন্ধু হবার কারণে, বাড়িতে আমাদের দুইজনের অবস্থা খুবই খারাপ থাকতো, বিশেষ করে, পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর দিন তো বাড়িতে টিকে থাকা দায় হতো আমাদের। সেদিন অবশ্য আমরা চারবন্ধু থাকতাম না, দুই বন্ধু হয়ে যেতাম – আমি আর শিখা। বাকি দুইজন তো বিশাল আয়োজনে ভেসে যেত। বাণীর বাড়িতে তো উৎসবের মেজাজ থাকতো। আর রমারও সেরকমই একটা।

আর আমার বাড়িতে তো, উঠতে বসতে, খেতে শুতে, মায়ের মুখ দিয়েই জুতোপেটা চলতো। উনার কথাগুলো কিছু এইরকম হতো – উমম্‌ বন্ধু বানিয়েছে! বন্ধু বানিয়ে কি হয়েছে! … সব সময়ে উঠিস বসিস তার সাথে, একবারও ইচ্ছাও করেনা, ওঁর মত ক্লাসে র‍্যাঙ্ক করি। …

আরে এদেরকে কে বোঝাবে! র‍্যাঙ্ক কি এমনি এমনি করা যায় নাকি! … ও ব্রিলিয়ান্ট। ওঁর পড়াশোনা করতে ভালো লাগে। দিনরাত পড়াশোনা করে। আমার তো এক ঘণ্টার থেকে দুই ঘণ্টা বই নিয়ে বসলেই, প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যায়। ইন্টারেস্টই পাইনা। …

এতো গেল আমার বাড়ির কথা, শিখার বাড়িতে তো রীতিমত মারধর চলতো। ক্লাস নাইন অব্ধি চলেছে। ক্লাস টেনেও মা মারতে এসেছিলেন, কিন্তু ওঁর বাবা বলেন, মেয়ে বড় হচ্ছে, এখন আর গায়ে হাত তুলো না। এটা বলে যেন বেশি খারাপ করে দিয়েছিল পরিস্থিতিটা, অন্তত শিখার এমনই মত। ও বলতো, মার খেতাম, একদিন দুইদিন গায়ে ব্যাথা থাকতো, মিটে যেত। এখন তো এমন গায়ে লাগার মত কথা বলে যে, উড়ি বাপরে, টেকা দায়।

আমাদের কথা না বোঝা গেল। আমি ওই সিক্সটি পারসেন্ট, আর শিখা ঠেলেঠুলে পাস। কিন্তু রমা! … রমা বলে নাকি, ওঁর বাড়ির কন্ডিশন আরো বাজে। … ও বলে, মারক্সিট দেখে, মায়ের প্রশ্ন – বাণী এবার কি হয়েছে? আমি বললাম, থার্ড। মা আর একটাও কথা বললেন না। … একটা কথাও বললেন না। … তারপর যখন আমি প্রথম কথা বলবো, তখনই শুরু হবে – লজ্জা লাগে না, প্রতি বছর নিজের থেকে ভালো রেজাল্ট করেছে বাণী, এটা বলতে।

নাইনের হাফইয়ারলি তে, বাণী সেকেন্ড হয়েছিল, আর রমা নাইনথ্‌ হয়েছিল। তারপরেও এমন কথা শুনে, রমা রীতিমত তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিল। নাইনের এনুয়াল পরীক্ষায় তো ও পড়াশোনাই করবে না। বলে একবার ফেল মারবো, তবে ওরা বুঝবে। … আমি আর শিখাও ওকে বোঝাতে পারিনা। … শেষে বোঝালো বাণী। ও বলল, উনারা কি বললেন, তার জন্য তো তোর কেরিয়ার দাঁড়িয়ে থাকবে না। … তোকে তোর কেরিয়ার ঠিক করতে হবে। … তাই উনাদের কথা না শুনে, একটু সেলফিস হয়ে যা।

রমা রেগে উঠে বলল – তুই কি বুঝবি, এসবের কথা। সারা বছর গাধার মত পরতে হয় আমাকে। মাথায় হিস্ট্রি জিওগ্রাফি কিচ্ছু ঢোকে না। গাঁতিয়ে গাঁতিয়ে মুখস্ত করতে হয়, তারপরেও এই সব কথা। মনে হয়না, বিষ খেয়ে মরি।

ওমা, বাণী কি বলে এরপর। বলে – কথা তো আমাকেও শুনতে হয়। বাবা বলেন, কনোদিন ফাস্ট হওয়ার গর্ব অনুভব করেছ? করতেও পারবে না। সেই টেনাসিটিই নেই তোমার মধ্যে।

আমরা সেই কথাতে অবাক হয়ে গেলাম। আমি, শিখা আর রমাও। আমরা একই সাথে বলে উঠলাম – তোকেও!

বাণী বলল – আমাকে! শুধু আমাকে কেন, এবারে কি হয়েছে জানিস! অণু, মানে আমাদের ফার্স্ট গার্ল, অনুপমা, ও এবার সেকেন্ড হয়েছে বলে, ওঁর বাড়ির লোকেরা সিমলা ট্রিপ এরেঞ্জ করেছে, ওকে ট্রিপে নেয়ই নি।

আমি বলে উঠলাম – আমরা ভালো আছি বাবা। … একটু আধটু পড়াশুনা করি; দুটি কটুকথা হজম হয়ে যায়। অতো পড়াশুনা করার পরেও যদি এমন কথা শুনতে হতো, গলায় দড়ি দিতাম আমি।

যাই হোক, এই সমস্ত কথার পর, রমাকে বাণী কনভিন্স করলো, পড়াশোনা করতে, যাতে নিজের কেরিয়ারটা ঠিক করতে পারে। কেরিয়ার ঠিক না হলে, কেউ কিচ্ছু বলবেনা, কিন্তু কনো স্বাধীনতা থাকবে না। বিয়ে হবে কারুর সাথে। সে কোথাও নিয়ে গেলে যেতে পারবো, না নিয়ে গেলে, একপাও নড়ার যো নেই।

বাণী শুধু পড়াশুনাতেই ভালো না। ও কিন্তু খুব পড়াশুনা করে তা নয়, মানে ও খুব ব্রিলিয়ান্ট। একবার কিছু পরলেই, ওঁর পড়ামুখস্ত হয়ে যায়। … তবে যা বুঝলাম, ও খুব প্রাক্টিকাল। … ঠিকই তো বলেছে। … কিন্তু সেটা জেনেও আমার খুব একটা লাভ হয়নি। … আমি পড়াশুনা বেশিক্ষণ করতেই পারিনা। ইন্টারেস্টই পাইনা। ভূগোল একটু ভালো লাগে। তাই ওটাই একটু পরি। তবে ওটাও বেশি পরতে পারিনা। বেশি পরলেই, ব্যাস, ওতে হাইয়েস্ট মার্ক্স পেতে হবে। … কি চক্কর কে জানে! … সবাই হায়েস্ট নম্বর পাবে! … আমার হাইয়েস্ট নম্বর পেতেই ভালো লাগেনা। … কি সুন্দর, কেউ আমার থেকে কিচ্ছু চাওয়াপাওয়া রাখেনা, আমি এভারেজ স্টুডেন্ট বলে। কত শান্তিতে থাকি, কারুর সহ্য হয়না।

যাইহোক, বাণী আমাদের সকলকে বোঝাল, মাধ্যমিকটা সকলকেই ভালো দিতে হবে। কে কি বলল, সেই জন্য নয়। মাধ্যমিকে ভালো নম্বর না পেলে, কোন ভালো স্কুলে চান্সই পাবো না। … তাই একটু চেপে বসে পড়াশুনা করলাম। … নম্বরও ভালো হয়েছিল, স্টার মার্ক্স পেয়েছিলাম। … রমা আমাদের ব্যাচের মধ্যে ফোর্থ হয়েছিল। শিখাও এই প্রথম ফার্স্ট ডিভিশন নম্বর পেল। আর বাণী পেল স্কুলের নয় শুধু, আমাদের পুরো শহরের সেরা নম্বরটা।

আমাদের সকলের বিশাল আনন্দ হয়েছিল বাণীকে নিয়ে। গর্বে বুক ফুলে উঠেছিল। … আমাদের বন্ধু সেরা হয়েছে, ব্যাপারই আলাদা। সমস্ত ছেলেদের স্কুলেও সারা পরে গেছিল বাণীর নাম। … সাধারণত ছেলেদের স্কুল থেকেই ওই হাইয়েস্ট মার্ক্সটা কেউ পায়। এবার প্রথম কনো মেয়ে হাইয়েস্ট পেয়েছে। … এবার নিশ্চয়ই, বাণীর বাড়ির লোকেরা ওই সব কথা বলবে না, ফার্স্ট হবার আনন্দ কি, সেটা তুমি জানবেই না, কারণ তোমার সেই টেনাসিটিই নেই।

যাইহোক, এবার আমাদের নতুন স্কুলে এডমিশনের সময়। … আমি আর শিখা আর্টস স্ট্রিম নিলাম। হিস্ট্রি, জিয়গ্রাফি, সোশিয়লজি। দুজনেই একই স্কুলে চান্স পেলাম, বিনোদিনী বিদ্যাপীঠ। … আর রমা চান্স পেলো আমাদের শহরের সেরা স্কুলটায়, উমাভবানী বিদ্যাপীঠে। … বাণী চান্স পেলো কলকাতার স্কটিশে। … যাতায়াত করে পড়তো। রমা আর বাণী সায়েন্স স্ট্রিমে ভর্তি হলো। …

এবার আমাদের বাড়ির লোকদের রেষারেষিটা একটু কমে গেল। আসলে স্ট্রিম আর কলেজ পাল্টে গেছে তো, তাই। … আর আমরাও একটু বড় হয়ে গেছিলাম। বুঝতে শিখে গেছিলাম। অন্তত এটা বুঝতে শিখে গেছিলাম, সব কথা বলতেই নেই। … আমরা যে এখনও একই রকম বন্ধু আছি, সেটাই জানতো না বাড়ির লোকেরা। … পুজোর সময়ে একসঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরলাম যখন, তখনই জানলো।

ক্লাস ইলেভেন ভালোই কাটলো। উচ্চমাধ্যমিকের বছরে, খুব টেনশন গেছে। … খুব পড়াশুনা করেছিলাম। … না বাণী ঠিকই বলেছে। কিচ্ছু না করলে, জলে পরে যাবো। … ক্রিকেট বলের মত তখন আমাকে নিয়ে সকলে ক্যাচ-লোপালুপি করবে। … অনেক পড়াশুনা করে, আমি আর শিখা, দুইজনেই ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছি। আর্টস স্ট্রিমে, আমাদের সময়ে ফার্স্টডিভিশন পাওয়া মানে ভালো ছাত্রী। তাই বাড়িতে প্রশংসা না পেলেও, তিরস্কার লাভ হয়নি। …

তবে, রমা এবার কোনরকমে স্টারমার্ক্সটা পায়, আর বাণী এবারে বোর্ডে র‍্যাঙ্ক করে। … পুরো পশ্চিমবঙ্গে ও এবার পঞ্চম হয়েছে। … বাড়িতে সেই কথা জানাবার সাহস হলো না। কে জানে, সেই সব শুনে আবার হয়তো মা খিচিয়ে উঠবেন – তোর খালি বন্ধুর গুণগান করতেই ভালো লাগে। … তাই বেমালুম চেপে গেছিলুম, আর নতুন কলেজে এডমিশনের জন্য ব্যস্ত হয়ে পরি।

বাণী মেডিকালেও চান্স পেয়েছে। এনারএসে ওঁর মেডিকাল স্কলারশিপ, মানে এমবিবিএসে ভর্তি হবার আগের দিনে আমাদের বলল – তোরা কি কলকাতারই কনো কলেজ নিবি! … তাহলে খুব ভালো হয়। … হস্টেলে থাকবো, তবে বাইরে বেরোনো যায়। … বেশ মজা হবে।

রমা বলল – হ্যাঁ, আমি ভাবছি সায়েন্সস্ট্রিম ছেড়ে দেব। … কমার্স স্ট্রিম নেব ভাবছি। … জেভিয়ারসএ বিকমএ ভর্তি হবো। … কমার্স আমার মাথায় ভালো ঢুকছিল, স্কুলের দুতিনটে বন্ধুর থেকে দেখেছিলাম। বেশ ভালো লাগছিল।

রমা শেষে জেভিয়ারসএই এডমিশন নেয় বিকমে। … আর আমি আর শিখা এবারও একই কলেজে  রয়ে গেলাম। … বিদ্যাসাগর কলেজে আমি নিলাম জিউয়গ্রাফি অনার্স, আর শিখা নিলো হিস্ট্রি অনার্স, যদিও ও পরে অনার্স রাখতে পারেনি। … বাণীকে হস্টেলে থাকতেই হবে। … তাই আমি, রমা আর শিখা একসাথে একটা মেশভারা নিই, হাতিবাগানের কাছে।

পোরোবাড়ি, কিন্তু বেশ বাড়িটা। কোন ঢোকাবেরোনোর বাঁধাটাধা নেই। … আমরা তিনজনেই রাঁধতে পারি। তাই রান্নাবান্নাও বেশ করে নিতাম তাড়াতাড়ি, অবশ্যই যদি চারমাথা একসাথে হয়ে হোটেলে না খেতাম তবেই।

প্রথম একটা বছর আমাদের খুব ভালোই কাটে। এতদিন শহরে, বাবামায়ের ঘেরাটোপে থাকতাম; এককথায় সম্পূর্ণ ভাবে পরাধীনতার জীবন ছিল। এবার কলকাতায় বাবামায়ের ছত্রছায়া থেকে মুক্ত হয়ে, বেশ আনন্দতেই ছিলাম। আমাদের মধ্যে বাণী কলকাতাতে থেকেই উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছে। তাই আমাদের থেকে কলকাতার রাস্তাঘাট ও বেশি চেনে। তাই, ওই আমাদের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যেত।

আর আমরা কলকাতায় এসে, টুকিটাকি সকলেই কিছু না কিছু কাজকারবারও শুরু করি। … আমি চারজনের মধ্যে একটু বেশি কম্পিউটার নিয়ে ঘাটাঘাটি করি। কম্পিউটারের আইডিয়াটা আমার বেশি। তাই আমি একটা বিদেশী কোম্পানির ব্রসিওর ডিজাইনিং-এর কাজ জোটাই। মেশের রুমে বসে বসেই করতাম। দিনে তিনচার ঘণ্টা কাজ করতাম, তাতে প্রতিদিনে ৪-৫ ডলার কামাতাম, মানে ওই ভারতীয় টাকায়, প্রায় ৪০০ টাকা প্রতিদিন। সব মেশের ভাড়া, খাবারের টাকা মিটিয়ে, প্রায় ৯-১০ হাজার টাকা হাতে থাকতো।

রমা ইংরাজিতে খুব ভালো। ও ফ্রিল্যান্সে কন্টেন্ট লিখতো। তাতে প্রায় ১৪-১৫ হাজার কামিয়ে নিত মাসে। তাই ওঁরও আমারই মত, মাসের শেষে হাতে ৯-১০ থাকতো। বাণী সময় খুব একটা পেতো না, ওদের পড়াশুনার চাপ বেশি। তবে তারই মাঝে, ও একটা হোমিওপ্যাথি চেম্বারে কম্পাউন্ডারের কাজ ধরে। কাজটা ও ১২ক্লাস-এ পড়ার সময় থেকেই করে। প্রথম তিনমাস শুধুই কাজ শিখেছিল। হাতে মাসের শেষে ৩ হাজার টাকা দিতো। … কিন্তু তারপর ও এখন ফুলটাইম কম্পাউন্ডার। … সপ্তাহে তিনদিন যায়, সন্ধ্যাবেলা করে। আর প্রতিদিন ২ হাজার করে ওঁর কামাই। মাসে ১২ দিন মত যায়, আর ২৪ হাজার করে ওঁর কামাই।

ওঁর হাতে, একটু বেশি থাকতো। হস্টেলের ফিজ তো বাড়ির লোকই দিতো। তাই থাকা-খাওয়ার খরচ নেই। তাই পুরো ২৪ হাজারই ওঁর থেকে যেত। তবে ওঁর আবার পার্লারে যাওয়ার খুব সখ। তাই সেখানে মাসগেলে ৪-৫ হাজার টাকা খসিয়ে আসতো।

পার্লারে আমরাও যেতাম, তবে এই মাসে একবার, খুব বেশি হলে। এই অয়েক্সিং জাতিও কাজের জন্য। তাই আমাদের এক হাজারের মধ্যে পার্লারের খরচ হয়ে যেত। … অন্যদিকে, শিখা একটা জায়গায় চাকরিতে ঢুকেছিল এড ডিজাইনিং-এর জন্য। … কিন্তু এখন ও একটা বিচ্ছিরি রকমের ইন্টারেস্ট পেয়ে গেছে কাজে। তবে প্রথম যেই একটি বছর আমরা এখানে থাকি, সেই বছরের প্রথম ৩-৪ মাস আমাদের এই সমস্ত কাজ জোটাতে সময় দিতে হলেও, তারপর থেকে হাতে যা থাকতো, মানে বাণীর ১৭-১৮ হাজার, আমার আর রমার ৮-৯ হাজার আর শিখার মাইনে কম হবার জন্য, ওঁর হাতের ২-৩ হাজার, সেই নিয়ে খুব মজা করেছি।

কলকাতার বেরানোর জায়গা প্রায় সবই দেখে নিয়েছি। চিরিয়াখানা, ভিক্টোরিয়া, ইকো পার্ক, নিকো পার্ক, সায়েন্স সিটি, আরো কত কি ঘুরলাম। … সঙ্গে সঙ্গে, এদিকে দক্ষিণেশ্বর, ওদিকে কালীঘাট, এমনকি ইডেনে গিয়ে একটা ক্রিকেট ম্যাচ, আর যুবভারতীতে গিয়ে একটা ফুটবল ম্যাচও দেখে এসেছি। বাণীর চেনাশুনা অনেক হয়ে গেছে, কলকাতায় দুইবছর ধরে থাকার জন্যই হয়তো। তাই ও আমাদের লেদার এম্পরিয়ামে, আবার মহেশতলার অনেক রঙের কারখানাতেও নিয়ে গেছিল।

বেশ কিছু মিউজিয়াম, আর সবথেকে উল্লেখযোগ্য ভাবে, কলকাতা জাদুঘরেও ঘুরে এসেছি আমরা। … সাথে সাথে, আইনক্স, সিনেপ্লেক্স, মিরাজে গিয়ে প্রচুর সিনেমাও দেখেছিলাম আমরা। … আর এরই সাথে, একটা নতুন অভ্যাসও আমাদের হয়ে যায়, তাও বাণীর দৌলতে। মানে অন্তত মাসে একটি দিন আমরা পার্কস্ট্রিটের কনো একটি বারে বসে, একটু স্বাদে বিষ, কিন্তু গুণে অমৃত, অর্থাৎ একটু বিদেশী পচা-ফলের রসের স্বাদ নিতাম।

কিন্তু শেষের দিকে আমরা সেই অভ্যাস ছেড়ে দিই, কারণ বাণী সমানে এডিক্টেড হয়ে যাচ্ছিল। তবুও, আমাদের চারজনের জন্মদিন পালন কিন্তু ওটার সঙ্গেই হতো। বাট উইথ লিমিটেড সাপ্লাই।

যাই হোক, প্রথম একটা বছর যা কাটিয়েছিলাম আমরা, সেটা জীবনের তখনও পর্যন্ত কাটানো সময়ের মধ্যে সেরা সময়, সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। কনো কম্পিটিশন নেই, কোন গালিগালাজ শুনতে হচ্ছে না। আনন্দ রয়েছে, হাতে টাকাকড়িও রয়েছে। ভালো খাচ্ছি, নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছি, ঘুরছি বেড়াচ্ছি, হাসি আর আড্ডা দিচ্ছি, সিনেমা দেখছি। সব মিলিয়ে আমি নিশ্চিত, শুধু আমার নয়, আমাদের চারজনেরই মনে, ওই একটি বছর জীবনের বাঁচা সেরা সময় ছিল। তবে মহাকালের বোধহয় আমাদের সুখে অসুখ করে গেছিল। তাই, আমাদের সুখের হাটে বেচাকেনা পুরো বন্ধ করে দিলেন তিনি।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5