কৃতান্তিকলীলা
ব্রহ্মসনাতন হাস্যবদনে বললেন, “বেশ পুত্রী, আমি তোমাকে এবার বিশেষ বিশেষ কিছু বিষয়ে বলছি, যা তোমাকে তোমার কর্মজীবনে সহায়তা করবে। পুত্রী, তোমার কর্ম হলো কৃতান্তিক নির্মাণ, অর্থাৎ তোমার নিজেরই মত অনেক কৃতান্তিকের নির্মাণ করা, যারা শতশত বৎসরব্যাপী মোক্ষের যেই পথের নির্মাণ করে দিলাম তোমাকে, তাকে জগতসংসারে প্রবাহিত রাখতে পারে, আর সমানে আমার ক্রোড়কে পূর্ণ রাখতে পারে।
এই বিষয়ে, আমি তোমাকে চার ধারার আচরণের কথা বলবো। এঁদের প্রথম হলো, নির্বাচন, অর্থাৎ কাদেরকে এই পথে অগ্রসর করবে, সেই কথা। দ্বিতীয় চরণে বলবো, সেই শিক্ষার্থীদের কর্ষণ করার কথা, অর্থাৎ তাঁদেরকে যথার্থকে ধারণ করার উপযোগী করে তোলার ক্ষেত্রে যা অবশ্যই স্মরণ রাখবে, সেই কথা।
তৃতীয় চরণে বলবো, তাঁদেরকে যখন সত্যের আলোকে স্নান করাবে, সেই সময়ে যা স্মরণে অবশ্যই রাখবে, সেই কথা। আর চতুর্থ ও অন্তিম চরণে বলবো, তাঁদেরকে যখন আর কৃতান্তিক উৎপাদন করার প্রশিক্ষণ দেবে, সেই সময়ে যা স্মরণে রাখবে, সেই কথা”।
নির্বাচন (কৃতান্তিকলীলা)
ব্রহ্মসনাতন বললেন, “পুত্রী, এই বিষয়ে আগেও বলেছি, আবারও বলছি, আর বেশ সতর্কতা প্রদান করেই বলছি, ভুলেও কখনো সেই ব্যক্তির কর্তা ভাবের নাশ করার প্রয়াস করতে যাবেনা, যিনি নিজের কর্তাভাবকে সক্রিয় রেখে, বিবাহ করে নিয়েছেন। সংসার কামনার আঁতুড়ঘর পুত্রী, আর বিবাহ আঁতুড়ঘরের সেই অবস্থা যেখানে মা আর সদ্যজাত সন্তান একত্রে নিবাস করে, একে অপরকে মোহজালে আবদ্ধ করে নেয়।
তাই যার কর্তাভাব জাগ্রত অবস্থায় সে বিবাহ করে, সেই আঁতুড়ঘরে নিজের মোহপাশকে শক্তিশালী করে নিয়েছে, তাঁর কর্তাভাবের নাশ করতে যাওয়ার অর্থ, নিজের সময়ের অপচয়, এবং সেই ব্যক্তিকে অহেতুক হতাশার মুখে স্থিত করে দেওয়া। পুত্রী, যার হৃদয় নিদ্রিত হয়নি, তাঁরই কর্তাভাব বিনাশযোগ্য, অর্থাৎ কর্তাভাব তাঁরই নাশ হওয়া সম্ভব।
কিন্তু এক বিবাহিত স্ত্রী বা পুরুষ, যদি নিজের কর্তাভাবকে জাগ্রত রেখে বিবাহ করে, কামনার অষ্টপাশে নিজেদের আবদ্ধ করেন, তাঁর মধ্যে হৃদয়ের জাগরণ আর সম্ভব হয়না। স্ত্রী হলে, তিনি যখন জননী হন, আর যতক্ষণ না তাঁর সন্তান ৬-৮ বৎসরের হচ্ছেন, ততক্ষণ তাঁর মধ্যে হৃদয় নিদ্রাথেকে জাগ্রত হয়, তবে তা সাময়িক, এবং তা কেবলই নিজের সন্তানের জন্য, অন্যদের ক্ষেত্রে নয়।
তাই সেই স্ত্রীর হৃদয়কে নিদ্রিত না দেখে, এমন ভেবে নিওনা যে, তিনি কর্তাভাবকে অতিক্রম করতে সক্ষম। তাঁর সন্তান যখনই ৬-৮ বৎসরের হয়ে গিয়ে, সে নিজের কর্তাভাবকে জাগরিত করার দিকে অগ্রসর হবে, সেই মুহূর্ত থেকে সেই সন্তানের জননীর হৃদয়ও পুনরায় নিদ্রিত হয়ে যাবে, আর যেটুকু কর্তাভাব তাঁর থেকে দূরে ছিল সেই কয় বৎসর, তা পুনরায় অতিকায় শক্তিসঞ্চয় করে সেই স্ত্রীর কাছে প্রত্যাবর্তন করবে।
তাই সতর্ক করেই বলছি তোমাকে, যদি তোমার শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে কনো বিবাহিত স্ত্রী বা পুরুষ আসেন, অবশ্যই পরোখ করে নেবে যে, তাঁর কর্তাভাবের অবস্থা কিরূপ। যদি দেখো যে সেই কর্তাভাব দৃঢ় হতে পারেনি, সেই ব্যক্তি নিজের আচরণ, নিজের চরিত্র, নিজের বুদ্ধি, নিজের আবেগ, বা সম্যক নিজেকে নিয়ে বড়ই চিন্তিত, বা নিজেকে নিয়ে সে অখুশি, এবং নিজের সামর্থ্য নিয়ে হতাশ, তাহলেই জানবে যে তাঁর কর্তাভাব তখনও পাথর হয়নি, আর তাই তাঁরমধ্যে তখনো কৃতান্তিক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে।
আর যদি দেখো যে, সেই ব্যক্তি নিজের আচরণ নিয়ে, নিজের বিদ্যা নিয়ে, নিজের বুদ্ধি নিয়ে, নিজের আবেগ নিয়ে, এবং সম্যকভাবে নিজেকে নিয়ে অখুশি নন, বরং নিজের ভাগ্যকে সর্বদা দোষারোপ করে ফিরছেন; যদি দেখো তিনি নিজের সামর্থ্য নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তিত নন, বরং তাঁর ভাগ্য তাঁকে প্রবঞ্চনা করছে, এমন তাঁর দাবি রয়েছে, তাহলে সেইমুহূর্তে সিদ্ধান্ত নাও যে ইনি কৃতান্তিক হয়ে ওঠার জন্য অযোগ্য।
কেন অযোগ্য? কারণ ইনার কামনা, ইনার অহংকারকে পর্বতের মত কঠিন করে দিয়েছে, আর ইনার অহংকার ইনার কর্তাভাবকে অভেদ্য করে দিয়েছে। তাই ইনাকে নিজের শিষ্য বা শিষ্যার তালিকা থেকে তৎক্ষণাৎ মুক্ত করো। … অর্থাৎ আমার কথার অর্থ বুঝতে পেরেছ! বিবাহিত না বিবাহিত নন, এটি বিচার্য বিষয় অবশ্যই। কিন্তু বিবাহিত হলেই যে তিনি কৃতান্ত শিক্ষালাভের অযোগ্য, তেমনও নয়।
তবে হ্যাঁ, যদি তাঁর একটি সন্তানও হয়ে থাকে, তবে আর দ্বিতীয়বার বিচারেরও প্রয়োজন নেই, তিনি আধ্যাত্ম বিদ্যা হয়তো গ্রহণ করতেও পারবেন, কিন্তু কৃতান্তিক হয়ে উঠতে পারবেন না, অর্থাৎ তাঁর কর্তাভাব তাঁর সেই দেহে ঘুচবেনা। হ্যাঁ, যদি তাঁর অকালে পতিবিয়োগ বা পত্নিবিয়োগ বা সন্তানবিয়োগ হয়, তবে তাঁর মধ্যে হতাশা স্থান নিতে পারে, এবং তাঁর কর্তাভাব ভূমিকম্পে ভিটেমাটিছাড়া হয়ে যেতে পারে। সেই ক্ষেত্রে, তিনি আধ্যাত্মিক বিদ্যা লাভ করে নেবেন, কিন্তু তাও কৃতান্তিক হতে পারবেন না।
পুত্রী, যদি এই জগতসংসারের কনো কিছুর প্রতি গভীর কামনা থাকে কারুর মধ্যে, তাহলেই তাঁর সেই বস্তু, যাকে নিয়ে তাঁর কামনা, সেই নিয়ে একটি ধারণার নির্মাণ করে ফেলে। আর সেই ধারণা সত্য না মিথ্যা, তার পরোখ তিনি কি ভাবে করেন? সাফল্যের নিরিখে। অর্থাৎ কে বা কতজন সেই ধারণা রেখে সফল হয়েছেন, তার হিসাব থেকে নিজের ধারণাকে সত্য বা মিথ্যা আখ্যা দেন।
আর সেই ধারণাই তাঁর মধ্যে আমিত্বের জন্ম দেয়, যা তাঁর আত্ম বা অহংকারকে অতিকায় শক্তিশালী করে তোলে। তাই যদি এমন কনো কেউ তোমার সান্নিধ্যে এসে তোমার শিষ্য হতে চান, তাহলে প্রথম তাঁর সেই ধারণাগুলিকে সমস্ত দিশাথেকে ভেঙে গুড়িয়ে দিতে হবে। প্রয়োজনে পদে পদে অপমান করে করে, প্রয়োজনে সর্বক্ষণ কটুকথা শুনিয়ে শুনিয়ে, প্রয়োজনে কনো ভাবেই সে যোগ্য নয় তা প্রমাণ করার জন্য সমস্ত দিক থেকে সে ব্যর্থ প্রমাণ করে করে, যেই ভাবেই হোক, তাঁর সেই সমস্ত পূর্ব ধারণাকে বিনষ্ট করে ফেলতে হবে।
পুত্রী, এমন করার কালে, অধিকাংশই তোমার এই বিশ্রী আচরণের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে, তোমার সান্নিধ্য থেকে মুক্ত হতে চেষ্টা করবেন। তাতে বিচলিত হবার কনো কারণ নেই। যিনি এই সমস্ত অপমান, এই সমস্ত কটুকথা, এই সমস্ত ব্যর্থতার থেকে এটি অনুভব করবেন নে, তিনি অলিক কল্পনাকেই সত্য মেনে চলেছেন, আর তেমন চললে, তিনি মার্গ থেকে বিচ্ছিন্নই ছিলেন, আর বিচ্ছিন্নই থাকবেন, তিনিই কৃতান্তিক হবার জন্য অগ্রসর হতে পারেন।
তাই অন্যরা ত্যাগ দিয়ে চলে গেলে, বিব্রত হয়েও না, ব্যথিতও হয়েও না। তবে এমনও ভেবো না যে, ১০ জনের মধ্যে একজন এমন ব্যক্তি তোমার সান্নিধ্যে থেকে গেলেন, এবং তোমার করা সমস্ত অপমান, কটুকথাকে হজম করে নিলেন, আর তাই তিনি কৃতান্তিক হয়ে যাবেন। পুত্রী, আবারও বলি, কামনার প্রতি আসক্তি জন্ম নিয়ে নিলে, হৃদয় জাগ্রত হতেই পারেনা। আর হৃদয় জাগ্রত না হলে, কর্তাভাবের নাশ হবেনা, কারণ হৃদয়ই হলেন সেই কর্তা, যা অন্য সমস্ত কর্তাকে বিনষ্ট করে দেন।
আর এই ব্যক্তির মধ্যে ইতিমধ্যেই কামনা জন্ম নিয়ে নিয়েছিল। তাই তিনি তোমার সান্নিধ্যে থেকে গেলেন মানে, এমন ধারণা করে নেবেনা ভুলেও যে তিনি কৃতান্তিক হয়ে যাবেন। ইনি তোমার চরণতলে স্থিত হয়ে, সত্যজ্ঞান অবশ্যই লাভ করবেন, কিন্তু কৃতান্তিক হবেন কি হবেন না, তা নির্ভর করবে, তাঁর কঠিন বৈরাগ্য অভ্যাস।
যদি সেই ব্যক্তি অবিরাম, অনবরত, এমনকি নিজের নিদ্রার মধ্যেও বৈরাগ্যের অনুশীলন করেন, তবেই তাঁর পক্ষে তাঁর সমস্ত কামনার নাশ করা সম্ভব হবে, এবং কৃতান্তিক হয়ে ওঠা সম্ভব হবে। অর্থাৎ পুত্রী, যতই তুমি তাঁর গুরু হও, তাঁকে কৃতান্তিক গড়ে তোলা তোমার হাতে নেই, একমাত্র তাঁর নিজের হাতে আছে। একমাত্র যদি সে নিজে নিজেকে সহায়তা করে, তবেই তাঁর পক্ষে কৃতান্তিক হয়ে ওঠা সম্ভব, অন্যথা নয়।
আর সেই সম্ভাবনা তখনই প্রকট হবে, যখন তিনি ভৌতিক জীবন থেকে সমস্ত আসক্তি বিরক্তি, উভয় থেকেই মুক্ত হয়ে যাবেন, অর্থাৎ তাঁর সম্মুখে যা আসবে, তা তাঁকে সুফল দেবে না কুফল দেবে, লেশ মাত্রও সেই বিচার না করে, যখন তিনি নির্বিচারে তা গ্রহণ করবেন, আর যা তাঁর সম্মুখে আসে নি, সেই বিষয়ে কল্পনা করা তো দূরে থাক, সেই বিষয়ে চিন্তা পর্যন্ত তিনি করবেন না, যদি এমন করতে সক্ষম হন তিনি দীর্ঘ ১২ বৎসর, তবেই তিনি নিজের অন্তরে যে কামনার বৃক্ষরোপণ করেছিলেন, তার সমূলে নাশ করে, কৃতান্তিক হয়ে ওঠার যোগ্য হয়ে উঠবেন, অন্যথা নয়।
অর্থাৎ, যদি তুমি নির্বাচনের কথাই বলো, তবে পূর্বেও যা বলেছিলাম, সেই অনুসারেই ৬ বৎসরের নিচে বয়স যেই বালক বা বালিকা, তাঁকে নির্বাচন করো। পুত্রী, ভাগ্য বলে কিচ্ছু হয়না। ভাগ্য হলো নিজের কল্পনার ব্যর্থতার ভান মাত্র। কল্পনা যে বাস্তব নয়, সত্য নয়, তাই সে যে নিষ্ফলা হয়ে সম্মুখে এসে হতাশা প্রদান করে, তাই ভাগ্য। যার অহংকার যত কঠিন হয়ে আছে, সে সেই নিষ্ফল কল্পনাকে দেখে পুনরায় কল্পনা করবেন।
যার অহংকার দুর্বল, তিনি কল্পনাকে নিষ্ফলা হতে দেখে, হতাশ হয়ে যাবেন; আর যার অহংকার পর্বত সমান হয়ে গেছে, তিনি সেই নিষ্ফল কল্পনাকে দেখে, পুনরায় কল্পনা করবেন। আর এই দুই পরিণামকেই মানুষ ভাগ্য বলে। কল্পনা কখনোই সত্য হয়না, তাই কখনই কল্পনা ফল প্রদান করেনা।
যেমন ধরে নাও একজন বিজ্ঞানী দুটি অনেক দূরে থাকা মানুষকে কাছাকাছি আনতে চান, তাই তিনি কল্পনা করেন, আর সেই কল্পনা অনুসারে তিনি দুজনের বার্তালাপ করাতে টেলিফোনের আবিষ্কার করেন। তাঁর কল্পনা কি ফলপ্রসূ হলো? না পুত্রী, হলো না। আর হলো না বলেই, আর তাঁর অহংকার সত্ত্বমে স্থিত বলেই, সে আবার প্রয়াস করলো, আর এবার সে ভিডিওকল করার ব্যবস্থা করলো, যাতে একে অপরকে সাখ্যাতে দেখতে পায়।
তাও কি তাঁর কল্পনা ফলপ্রসূ হলো? না হলো না, আর হলো না বলেই, সে এবার প্রয়াস করে যাতে এই ভিডিওকল টুডি থেকে থ্রিডি হয়ে উঠুক, আর দুজন দুজনকে অনুভব করুক। কিন্তু তা হলেও কি কল্পনা ফলপ্রসূ হবে? না হবেনা, তখন সে চেষ্টা করবে যাতে, একে অপরকে স্পর্শ করার অনুভবও পায়। অর্থাৎ বুঝতে পারলে, কল্পনা কখনোই ফলপ্রসূ হয়না। কিন্তু কল্পনা ফলপ্রসূ না হবার পরে, যার অহংকার দুর্বল, সে হতাশ হয়ে যায়, আর এই হতাশাকে সে বলে দুর্ভাগ্য।
আর যার অহংকার পর্বতসমান, সে আবার প্রয়াস করে, আবার কল্পনা করে, আর সেই পুনপ্রয়াসের মাঝে যেই নিষ্ফল কল্পনার প্রকাশ হয়েছিল, তাকেই সে সাফল্য বা সৌভাগ্য বলে আখ্যা দেয়। তাই ভাগ্য সম্পূর্ণ ভাবে একটি অলিক কল্পনা মাত্র। তাই এমন ভাবার কনো কারণ নেই যে, যেই ৬ বৎসরের কম বয়সী বালক বা বালিকাকে তুমি শিক্ষা প্রদান করবে, তার ভাগ্য যদি থাকে তবেই সে কৃতান্তিক হতে পারবে।
হ্যাঁ, সে যেই কল্পনাকে পূর্বে অর্থাৎ পূর্বের দেহে ধারণা করে রেখেছিল, তা তাঁর সম্মুখে নিষ্ফল হয়ে প্রকাশিত হবে, এবং তাঁর অহংকারকে খর্ব করে যদি রাখতে পারো, তাহলে সেই ক্ষেত্রে সে হতাশই হবে, আর সেই হতাশাকে তুমি মা সর্বাম্বার প্রেমের মাধ্যমে অনায়সেই অতিক্রম করিয়ে দিতে পারবে। …
অর্থাৎ আমার কথা এই পুত্রী যে, প্রতিটি মানুষের সামর্থ্য আছে কৃতান্তিক হয়ে ওঠার এবং মোক্ষলাভ করার। আর সেই মোক্ষলাভের জন্য এমন কনো ব্যাপার নেই যে, কারুর বহু জন্ম বাকি বা কারুর অল্প জন্ম বাকি। যিনিই নিজের অহংকারকে লয় করে দিয়ে, নিজের অন্তরে হৃদয়কে জাগ্রত হতে দেবেন, তিনি সেই জন্মেই মোক্ষলাভ করবেন।
তাই, যেকোনো ৬ বৎসরের বালক বা বালিকাকে তুমি শিক্ষার্থীরূপে গ্রহণ ও নির্বাচন করতে পারো। হ্যাঁ, তাঁর পূর্বের দেহে করা কল্পনা তাঁর সম্মুখে নিষ্ফলা রূপে স্থপিত হবে, আর তোমার কর্তব্য হবে, সেই নিষ্ফলা কল্পনার প্রতি প্রথমে তাঁর হতাশাকে জন্ম দেবার। আর তারপরে, সেই হতাশাকে জগন্মাতার প্রেম দ্বারা চিকিৎসা করে, তাঁকে পূর্ণত্বয় ভাবে জগন্মাতার সন্তান করে তুলবে, এবং একমাত্র জগন্মাতাই কর্তা, আর সে তাঁর অনুগত সন্তান, এই বোধ তাঁর মধ্যে জাগ্রত করে, তাঁর হৃদয়কে জাগরিত করে দেবে।
একবার তা করে নিলে, এবার তাঁকে সত্যশিক্ষা অর্থাৎ শূন্য থেকে সুরু করে ইতিহাস ও ভূগোল ও গণিত প্রদান করবে, সঙ্গীতের মাধ্যমে তাঁর হৃদয়কে উদ্বেলিত করবে, ক্রীড়ায় রত করে, তাঁর মধ্যে তাঁরই ন্যায় অন্যদেরকে নিজের ভ্রাতাভগিনী জ্ঞান করাবে। আর যখন সেই সমস্ত কিছু হয়ে যাবে, তখন তাঁর মধ্যে কৃতান্ত স্থাপন করবে, এবং তাঁকে দিয়ে নিঃশব্দতার ধ্যান করিয়ে, তাঁকে জগন্মাতার সম্মুখীন স্থিত করে, তাঁকে পূর্ণভাবে কৃতান্তিক করে তুলবে”।
দিব্যশ্রী বললেন, “এর অর্থ এই যে, এমন কনো ব্যাপার নেই যে, এই সময়ের আগে মোক্ষ লাভ হবেনা! যদি কেউ প্রথম মনুষ্যজন্মেও নিজের অহংকারকে বিনষ্ট করে দিতে পারে, তাহলেই তাঁর পক্ষে মোক্ষলাভ সম্ভবপর হয়ে যাবে! … কিন্তু মা, এই ব্রহ্মাণ্ডের জ্ঞান! … সেই একটি জন্মতে কি সেই জ্ঞান সে অর্জন করতে পারবে?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, তুমি কত গ্রন্থ পড়েছ, আজকের আগে? … বহু? (দিব্যশ্রীর সম্মতি) … বেশ, কত স্থানে ভ্রমণ করেছ, আজকের আগে? বহু? (দিব্যশ্রীর সম্মতি) … বেশ, কত কত মানুষের সাথে আলাপ করেছ, তাঁদের জানার চেষ্টা করেছ? বহু? (দিব্যশ্রীর সম্মতি)… তা বলো তো এবার, আজ যখন সত্যের দর্শন করলে, সেই সময়ের একদণ্ড আগেও কি, তোমার কাছে ব্রহ্মাণ্ডের জ্ঞান ছিল? আর তারপর কি ব্রহ্মাণ্ড জ্ঞান লাভ হয়েছে?”
দিব্যশ্রী বললেন, “না … এর আগে, তুমিও তো কতবার আমাকে বলেছ, ব্রহ্মাণ্ড কল্পনা মাত্র। আমি তোমার কথা শুনেছি, মেনেওছি, কিন্তু কিচ্ছুই যে বুঝিনি, তা আজ যখন তোমার স্বরূপ, আমার স্বরূপকে দেখলাম, তখন বুঝতে পারলাম। … তুমি অনেকবার আমাকে বলেছ, স্বরূপে আমিও যা তুমিও তাই, কিন্তু কিচ্ছু বুঝিনি। … অনেক বার তুমি আমাকে বলেছ, তুমি তাই যা নেই, যা নেই তাই তুমি, আর যা নেই তাই সত্য, আর তাই তুমিই সত্য। … শুনেছি, মেনেছি, কিন্তু আজ যখন তা প্রত্যক্ষ হলো, তখন বুঝলাম, আমি কেবলই শুনেছিলাম, মেনেছিলাম, ধারণ করিনি সেই কথাগুলিকে”।
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “তাহলে ব্রহ্মাণ্ড জ্ঞান কি ভাবে লাভ করা যায় পুত্রী?”
দিব্যশ্রী হেসে বললেন, “তোমাকে প্রত্যক্ষ করে, নিজেকে প্রত্যক্ষ করে। নিজের আমি’কে, নিজের আত্মকে সম্পূর্ণ ভাবে নিজের থেকে খসে যেতে দেখে, তোমাকে সাখ্যাত প্রেম বলে চিহ্নিত করা থেকে। … বুঝে গেছি মা।
তোমাকে যিনি প্রত্যক্ষ করে নেবেন, তোমাকে প্রত্যক্ষ করে যিনি তোমাতে লীন হয়ে নিজের অহংকে, নিজের আত্মকে, নিজের আমি’কে চিরকালের জন্য বিদায় জানিয়ে, তোমাকেই একমাত্র ও অবিচ্ছিন্ন সত্য বলে ধারণ করবেন, সেই মুহূর্তে তাঁর মোক্ষলাভ। ঠাকুর রামকৃষ্ণের এই কথাটা তুমি বারবার বলতে, আজ তার অর্থ বুঝতে পারছি। … নুনের পুতুল, সাগরের গভীরতা মাপতে গেল, কে আর ফিরলো, কে আর বললো, সাগর কতটা গভীর।
একবার তোমাতে নিমজ্জিত হলে, সমস্ত বন্ধন মুহূর্তের মধ্যে শেষ। আর জন্ম নেই, আর মৃত্যু নেই, আর কল্পনা নেই তাই আর ভাগ্যও নেই, আর আমিত্ব নেই, তাই আর সুখ-দুঃখ, ব্যাথাবেদনা কিচ্ছুই নেই, আর আমি নেই, তাই কনো ইচ্ছা বা চিন্তাও নেই। … চিরতরে মুক্তি। অর্থাৎ, বয়সকাল নয়, যখন শিশু কামনামুক্ত, যখন সে ৬ বৎসরের নিচে, তাই তার অহংকার দুর্বল, তখনই তার অহংকারকে চিরতরে বিনাশ করে দাও। ব্যাস, মুক্তি, চিরতরে মুক্তি”।
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “তবে আর একটি ব্যাপার স্মরণ রাখবে, সেই বালক বা বালিকার কাছে তুমিই যেন সর্বস্ব কিছু হও। … যদি তাঁর অবিভাবক থাকেন, তাঁরা যদি তাঁকে তোমার কাছে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রতা দেন নিজের সন্তানকে লালনপালনের, তবেই তাঁদেরকে নির্বাচন করবে, এই কাজে। কারণ এমন না হলে, সেই শিশু দুর্বিপাকে পরে যাবে। একদিকে তুমি বলবে অহংকার মুক্ত হবার কথা, আর অন্যদিকে তাঁর অবিভাবক তাঁকে বলবে, অহংকার ধারণ করতে, এই দুইয়ের মধ্যে পিষে গিয়ে, সেই শিশুটির নাভিশ্বাস উঠে যাবে।
তাঁর কষ্ট দেখে তুমি বিষণ্ণ হয়ে যাবে পুত্রী। তাঁর পিতামাতা তো অহংকারে বদ্ধ, তাই তাঁদের কাছে তাঁদের জেদই প্রাধান্য পাবে, আর সেই কারণে, সন্তানের জীবন ওষ্ঠাগত হচ্ছে কিনা, সেই বিচারও করবে না তাঁরা, কেবলই সন্তানকে নিজের অধিকারমুক্ত হতে দেবেন না, তাই তার উপর জোর খাটাতে থাকবে। কিন্তু তুমি? তোমার তো হৃদয় জাগ্রত! … হৃদয়ে সাখ্যাত মাতা সর্বাম্বা বিরাজমান। তিনি তাঁর সন্তানের বেদনায় অস্থির হয়ে যাবেন। তাই যদি অবিভাবক তোমাকে পূর্ণ অধিকার না দেন, তাহলে তাঁদের সন্তানকে শিক্ষার্থী রূপে নির্বাচন করবেনা”।
দিব্যশ্রী হেসে বললেন, “আর সেই কারণে তুমি অনাথ সন্তানদের কথা বললে আমাকে। … মাতাপিতা হারা সেই শিশুরা, তাঁদেরকে স্নেহের স্পর্শ দিয়ে, তাঁদের মুখে আনন্দের হাসি ফোটানোও যাবে, আবার অবিভাবকহীন শিশু তাঁরা। শিশু বলে তাঁদের অহংকার দুর্বল, আর অবিভাবকহীন, তাই অন্য কারুর অহংকারের বাহকও নয় তাঁরা। তাই তাঁদেরকে সত্যে স্থাপন করে, মানবজাতিকে পুনরায় মোক্ষের স্বাদ প্রদান করা হবে। …
তুমি অদ্ভুত জানো মা! … এত সহজ ভাবে এত জটিল সমস্যার নিদান দাও কি করে তুমি? … হয়তো এটাই প্রেমের মাহাত্ম। … যখন প্রেমের স্থানে মোহ মানে কামনা থাকে, তখন তো কেবলই এই চিন্তা যে আমি কি করে ভালো থাকবো, কি হলে আমার শান্তি, আমার স্বস্তি, আমার সুখ, আমার নিশ্চিন্তি। প্রেমে যে নিজের অস্তিত্বই নেই, তাই নিজের সুখ, নিজের শান্তি, স্বস্তি, নিশ্চিন্ততা, এসবের প্রশ্নই ওঠেনা। … তাই বোধ হয়, এমন যোজনামুক্ত হয়ে সদাপ্রফুল্লতার মধ্যে বিরাজ করা সম্ভব হয় তোমার পক্ষে। … তা মা, এবার সেই শিশুদের শিক্ষা দেবার সময়ে কি কি খেয়াল রাখবো, তা বলে দাও এবার”।
