ব্রহ্ম বিজ্ঞান (দর্শনলীলা)
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “বৌদ্ধ মঠে গেছ তো তুমি। তার অন্তরে যেই শান্তি বিরাজ করে, তা স্মরণ আছে?”
দিব্যশ্রীর মুখভঙ্গি পালটে গেলে, ব্রহ্মসনাতন আবার হেসে বললেন, “গ্রীষ্মের দুপুরের নিস্তব্ধ রাস্তার ভান নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি!”
দিব্যশ্রী সম্মতি দিলে, ব্রহ্মসনাতন আবার বললেন, “সেই নিস্তব্ধরাস্তার নিস্তব্ধতাকে অনুভব করো পুত্রী। … শান্ত চিত্তে সেই শান্তিকে অনুভব করো”।
দিব্যশ্রী নেত্র বন্ধ করলেন, আর অনুভব করতে থাকলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই যেন তিনি খালি হয়ে উঠতে শুরু করলেন। নেত্র বন্ধ রেখেই অস্ফুট ধ্বনিদ্বারা বললেন, “পূর্ণ শান্তি পিতা, কেউ নেই, কিচ্ছু নেই। সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতা”।
ব্রহ্মসনাতন শান্ত ভাবে বললেন, “কথা নয়, কেবলই উপলব্ধি… অনুভব করতে থাকো সেই শান্তি, সেই নিস্তব্ধতাকে। নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে সেই শান্তিকে অনুভব করো”।
দিব্যশ্রী এবার দীর্ঘক্ষণ সেই শান্তিকে অনুভব করতে থাকলে, বহুক্ষণ পড়ে বললেন, “দ্বিপ্রহরের অন্ত হচ্ছে, সূর্য ঢলছে, রাত্রি আসছে”।
ব্রহ্মসনাতন হেসে শান্ত ভাবে বললেন, “রাত্রি আসবে, চন্দ্র উঠবে। তুমি শান্তই থাকবে, কারণ কোলাহলের পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে অনেক উপুরু চলে গেছ তুমি। … ক্রমে চন্দ্রকে আর দেখতে পাবেনা। দ্বন্ধ জন্মাবে, আমাবস্যা নাকি! দ্বন্ধকে জয় করো, কারণ চন্দ্রকে তুমি ছাড়িয়ে ঊর্ধ্বে চলে গেছ, তাই সমস্তটাই আমাবস্যা। … অনেক কিছু আসবে, অনেক কিছু হারাবে। তুমি সেই নিস্তব্ধতার উৎস খুঁজতে থাকো। যা আসছে, তাকে আসতে দাও ; যা যাচ্ছে, তাকে যেতে দাও। তুমি নিস্তব্ধতার উৎস খুঁজতে থাকো। … চন্দ্র হারিয়েছে, এবার নক্ষত্র হারাবে। একটা একটা করে, সমস্ত নক্ষত্র হারিয়ে যাবে। কেবলই তুমি আর নিস্তব্ধতা”।
দিব্যশ্রী অস্ফুট ভাবে বিড়বিড় করে আনমনে বলার মত করে বললেন, “হ্যাঁ, কেবল আমি আর নিস্তব্ধতা। শান্তি, অপার শান্তি!”
ব্রহ্মসনাতন হেসে আবার শান্ত গম্ভীর ও গুহ্য কণ্ঠে বললেন, “এবার তুমি নিজেকেও আর খুঁজে পাচ্ছনা। … কোথায় গেলে তুমি? কোথায় হারিয়ে গেলে তুমি!”
দিব্যশ্রীর অঙ্গ যেন নিজের অজান্তেই কম্পমান হতে শুরু করলো। অবিরাম স্বেদ বর্ষণ করতে থাকলো। … অস্থির হতে শুরু করেছে দিব্যশ্রী। … ব্রহ্মসনাতন আবারও গম্ভীর অথচ দৃঢ় মিষ্টস্বরে বললেন, “খোঁজা বন্ধ করো নিজেকে, নিস্তব্ধতার উৎস পেতে হবে তোমাকে। … সেই উৎস খোঁজো … সেই নিস্তব্ধতা কাছে পিঠেই কোথাও থেকে আসছে! কিন্তু তা আসছে কোথা থেকে?”
দিব্যশ্রী আবার ক্রমশ শান্ত হয়ে উঠলেন। স্বেদ বর্ষণ স্তব্ধ হলো। … মুখমণ্ডল লাবণ্যপূর্ণ হলো। শুভ্র নিষ্কলঙ্ক মুখখানি তাঁর দিব্যআলকে যেন পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো। … শুভ্রতা দেখে যেন মনে হতে থাকলো, সাখ্যাত মূর্তিতে যেমন শ্বেতসরস্বতী বিরাজমান থাকেন, তেমনই সরস্বতী বিরাজমান হয়ে বসে রয়েছেন, অপরিসীম সৌন্দর্য সঙ্গে ধরে। … আরো শান্ত হয়ে গেল দিব্যশ্রী। … শান্ত স্নিগ্ধ ভাবে বলে উঠলো ধীর গভীর কণ্ঠে, “শূন্য… আমি নেই… আমি ছিলাম না… তুমিই ছিলে… তুমিই আছো। এই নিস্তব্ধতা তুমিই… এই নিস্তব্ধতাই তুমি। … শূন্য তুমি, জননী তুমি। ব্রহ্ম তুমি…” আর শব্দ বেরুলোনা মুখ থেকে, মুখে কেবলই এক দিব্যহাস্য। শরীর সম্মুখে এগিয়ে আসতে থাকলো, আর মাথা পশ্চাতে চলে গেল, যেন দিব্যশ্রীর দেহে প্রাণ নেই। …
ব্রহ্মসনাতন পুত্রীরদেহকে ধীর ভাবে ধরলেন। দিব্যশ্রী আর নিজের মধ্যে নিজে নেই। … বেশ কিছুক্ষণ পড়ে, তাঁর মুখ দিয়ে প্রথম স্বর শোনা গেল, “তুমি পিতা নও, তুমি মাতা… ওই নিস্তব্ধতাই তুমি। ওই অপার শান্তিই তুমি। … ওই পূর্ণ স্বাধীনতাই তুমি। … ওই মহাশূন্যই তুমি। তুমি এমন যে, সেখানে আমি থাকতেই পারিনা। হারিয়ে যাই। … তোমাতে লয় হয়ে যেতেই হয়, কারণ আমি যে আমি নই, আমিও যে তুমিই। তুমিই যে সত্য, বাকি সমস্ত কিছু মিথ্যা। সমস্ত আমি মিথ্যা, এক তুমিই সত্য। মিথ্যা মিথ্যা মিথ্যা… সব মিথ্যা। … ব্রহ্মাণ্ড মিথ্যা, জগত মিথ্যা, ধর্ম অধর্ম, ন্যায় অন্যায়, জীব অজীব, আমি আমরা সমস্ত কিছু মিথ্যা…”
নেত্র খুলে তাকিয়ে উঠলো দিব্যশ্রী। অনর্গল বিকট ভাবে শ্বাস গ্রহণ করতে থাকলো। তারপর ধীরে ধীরে শ্বাস অত্যন্ত শান্ত হয়ে গেল, আর তাঁর দেহ যেন ক্লান্ত হয়ে নিদ্রায় ঢলে পরলো, তাঁর পিতার কোলে! পিতা না মাতা! নিদ্রা ভঙ্গ হলেই তা জানা যাবে!
আধা ঘণ্টা পড়ে নিদ্রা ভঙ্গ হলো দিব্যশ্রী। এবারে তিনি ধরমর করে উঠলেন না। শান্ত ভাবে ব্রহ্মসনাতনের মুখের দিকে তাকিয়ে এক দিব্যহাস্য প্রদান করে বললেন, “মা!”
ব্রহ্মসনাতন তাঁর কন্যার মস্তকে স্নেহকর স্থাপন করে স্নেহ প্রদান করতে থাকলেন। দিব্যশ্রী ক্রমশ দেহে বল লাভ করে উঠে বসলেন, কিন্তু পিতার অঙ্গস্পর্শ করা থেকে যেন আর তিনি দূরে থাকবেনই না, এমন যেন অঙ্গিকারবদ্ধ হয়ে রয়েছিলেন। যেন কন্যা নয়, নববিবাহিত স্ত্রী তিনি আজ ব্রহ্মসনাতনের। পিতার স্কন্ধে নিজের মাথা রেখে, ক্রমশ সেই মস্তককে ব্রহ্মসনাতনের বক্ষদেশে স্থাপন করে, অতিকোমল অথচ অত্যন্ত স্নেহপূর্বক প্রামালিঙ্গনে নিজেকে আবদ্ধ করলেন।
ব্রহ্মসনাতন তাঁর কন্যার মস্তকের পশ্চাৎদেশ, তথা পৃষ্ঠে স্নেহস্পর্শ প্রদান করতেই থাকলেন। বেশকিছুক্ষণ এমন প্রেমানুভবের শেষে, সেই প্রেম যেন এবার দিব্যশ্রীর ওষ্ঠে স্থান করে নিলো। দিব্যশ্রী গদগদ হয়ে বললেন, “মা! … কাকা ঠিকই বলতেন, একবার তোমার যথার্থ স্বরূপের দর্শন হয়ে গেলে, আর একদণ্ডও তোমাকে স্পর্শ না করে থাকতে ইচ্ছাই করবে না। …
মা, প্রেম জন্মাচ্ছে হৃদয়ে। হ্যাঁ এই প্রথমবার প্রেম জন্ম নিচ্ছে, কারণ এঁর পূর্বে তো প্রেম কি ভাব, তাই জানতাম না। তুমি অনেকবার বলেছিলে, যতক্ষণ দুইয়ের অস্তিত্ব, ততক্ষণ মোহ; যখন একাকার ভাব, তখনই প্রেম। প্রেম এক অতিদিব্যভাব। মেনেছি তোমার কথা, কিন্তু আজ অনুভব করছি যে, সেদিন সেই কথার লেশমাত্রও অনুভব করিনি। যখন তোমার স্বরূপের দর্শন হলো, যেন নিজের পৃথক অস্তিত্ব আর রাখতেই পারলাম না।
নিজেকে নিজে হারিয়ে ফেলছিলাম। ভয় হচ্ছিল, যেন মনে হচ্ছিল, সব হারিয়ে গেল, চিরতরের জন্য সমস্ত কিছু হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রেমের এত আকর্ষণ যে, কিছুতেই এই হারিয়ে যাওয়াকে রোধ করতে পারলাম না। যেন এই হারিয়ে যাওয়াকে অবরুদ্ধ করা জগতের শ্রেষ্ঠ পাপ মনে হচ্ছিল। যেন মনে হচ্ছিল, এতকাল এই যে নিজের ভিন্নতাকে ধরে রেখে, তোমার থেকে আলাদা ছিলাম, সেটিই ছিল শ্রেষ্ঠ পাপ।
এটা পাপ, সেটা পাপ নয়, তোমার থেকে নিজেকে ভিন্ন জ্ঞান করাই মহাপাপ, একমাত্র পাপ। এটা ন্যায়, সেটা ন্যায় নয়, তোমার থেকে নিজেকে এক ভিন্ন আত্ম জ্ঞানই শ্রেষ্ঠ অন্যায়। হ্যাঁ মা, আজ তাই অনুভব হচ্ছে। অনুভব হচ্ছে, হ্যাঁ কেবলই অনুভব হচ্ছে, আর যেন কিছু বোঝার মত পাচ্ছিই না, মনে হচ্ছে যেন এই জগতসংসারে বোঝার মত, ভাবার মত, মানার মত কিচ্ছু বলতে কিচ্ছুই নেই। মনে হচ্ছে যেন এই জগৎসংসারই নেই, মিথ্যা এই জগত।
সত্য কেবলই তুমি, আর তোমার থেকে নিজেকে ভিন্ন আত্ম জ্ঞান করাই পাপ, অন্যায়, অধর্ম। আমার আমিই হলো আমার শ্রেষ্ঠ অভিশাপ, আবার আমার এই আমিই হলো শ্রেষ্ঠ বরদান, কারণ তা না থাকলে যে, এই অপার প্রেমকে অনুভবই করতে পারতাম না। মা, যেন মনে হচ্ছে, তোমার থেকে নিজেকে আলাদা অনুভব করা আমার ভ্রম তো ছিলই, কিন্তু সেই ভ্রমে ভ্রমিত হওয়াটাও তোমারই প্রদত্ত এক শিক্ষা ছিল আমাদের সকলের জন্য।
হ্যাঁ মা, এমন মনে হচ্ছে যে, যদি তোমার থেকে ভিন্ন হয়ে অহংকে ধারণ না করতাম, তাহলে তোমার দর্শন করে, অপার প্রেম অনুভব করে, অহং ত্যাগের মহানন্দই উপভোগ করতে পারতাম না। আর তা যদি না করতাম, তাহলে হয়তো তুমিই যে প্রেম, প্রেম যে তোমার অপর নাম, প্রেম মানেই যে তুমি, তা অনুভবই করতে পারতাম না। আর তা অনুভব করতে না পারলে, নিজেকেই শ্রেষ্ঠ প্রেমী মানতাম, আর মানতাম যে শূন্যতা অসহ্য।
শূন্য থেকে বিচ্যুত হয়ে, ব্রহ্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে, সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে, যখন পুনরায় সেই শূন্যকে, সেই সত্যকে, আর ব্রহ্মকে প্রত্যক্ষ করলাম, তখনই অনুভব হলো এই প্রেমের। তোমার প্রেমের অনন্ত ধারাকে প্রত্যক্ষ করে, নিজেকে অপরাধী মনে হলো, তোমার এই অপারপ্রেমকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য। গ্লানি হলো, ক্রন্দন এলো, অপরাধবোধে মুখ লুকাতে ইচ্ছা হলো, কিন্তু কি করে নিজেকে তোমার থেকে লোকাবো! অন্তরে বাহিরে, সর্বত্রই যে তুমি। সত্য কেবলই তুমি। তোমার থেকে মুখ কি করে লুকাবো!
দূরে থাকতে দিলে না তুমি। আমি বিশেষত্বের সন্ধান করে আত্ম হয়েছিলাম, অহং হয়েছিলাম, আর বিশ্বব্রহ্মাণ্ড গঠন করে বিশেষ হয়ে উঠতে চেয়েছিলাম। অলিক কল্পনার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রেখেছিলাম যে এই বিশেষও প্রেম করতে পারে। মিথ্যা ছিলাম, ভ্রান্ত ছিলাম, উদ্ভ্রান্ত ছিলাম। বিশেষ যে প্রেমকে ত্যাগ করেই বিশেষ হয়। প্রেম মানেই যে নির্বিশেষ। নির্বিশেষ মানে, যা সর্বত্র বিরাজমান, কারুর মধ্যে কম নেই, কারুর মধ্যে বেশি নেই। নির্বিশেষ মানে, সকলকে সমান দৃষ্টিতে দেখা, কেউ অধিক আপন নয়, কেউ বলতে কেউ পর নয়।
নির্বিশেষ মানে, সহজতা, সরলতা, নির্বুদ্ধিতা, আবেগশূন্যতা, যোজনাহীনতা, কল্পনামুক্ততা। নির্বিশেষ মানে, অবাধ, অগাধ, অনন্ত, অসীম। নির্বিশেষ মানেই প্রেম। তাই নির্বিশেষকে ত্যাগ করে, কি করে প্রেম করবো আমি? কি করে প্রেম করতে পারে আত্ম? কি করে প্রেম করতে পারে অহং! … পারেনা, পারতেই পারেনা। তাই তো বিভিন্ন বার যাকে প্রেম বলে সে, তা প্রকৃত অর্থে মোহ ব্যতীত কিছুই নয়।
কিন্তু এই ভ্রম তাঁর নাশ হতো কি করে? তোমার দর্শন করে। যখন তোমার দর্শন হলো, পায়ের তল থেকে জমি সরে গেল, মাথার উপর থেকে আকাশ সরে গেল, সূর্য চলে গেল, চন্দ্র নক্ষত্র সমস্ত কিছু চলে গেল। বিরাট থেকে ক্ষীণ, সমস্ত প্রকাশ চলে গেল, আর নির্মম বাস্তব সামনে এসে উপস্থিত হলো। যেই ভ্রম আমার মধ্যে ব্যপ্ত ছিল যে, প্রকাশই শ্রেষ্ঠ, আজ তা মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে গেল”।
দিব্যশ্রী আপ্লুত ভাবে বলতেই থাকলেন, “অনুভব করলাম, প্রকাশ অন্ধকারকে অপসারণ করে ঠিকই, কিন্তু সত্য অন্ধকারই, আর প্রকাশ তা ঢেকে ভ্রমের সঞ্চার করে। দ্বন্ধে পড়ে গেলাম, শয়তান তো অন্ধকারের কথা বলে, তাহলে কি শয়তানই ভগবান! … পড়ে অনুভব করলাম, প্রকাশ ভ্রমিত, শয়তান আরো অধিক ভ্রমিত। প্রকাশ তো সত্যরূপ অন্ধকারকে ঢেকে দিতে চায় নিজের প্রকাশ দিয়ে। সেই অন্ধকার নীরবতাকে ভঙ্গ করে, তাতে শব্দ স্থাপন করে, ধ্বনি স্থাপন করে, কিছু নেই, সেই সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে, অসত্যকে ধারণ করতে শুরু করে।
যা নেই, অর্থাৎ প্রকাশ, শব্দ, ধ্বনি, ভেদ, ভেদক, ভেদ্য, সেই সমস্ত কিছুকে সে কল্পনা করতে শুরু করে, আর সত্যের থেকে মুখ সরিয়ে রেখে মানতে শুরু করে যে, সেই সত্য। সে নাকি অত্যন্ত বুদ্ধিমান, অত্যন্ত চিন্তাশীল, কিন্তু একটি দণ্ডের জন্যও সে বিচার করেনা যে, সত্য কি করে এতশত হতে পারে! এতশত সত্য যে প্রতিটি সত্যকেই কোথাও না কোথাও মিথ্যা করে দিচ্ছে। … কিন্তু ভ্রমে এমনই বদ্ধ সে, বিশেষত্ব অর্জনের নেশায় এতই চূড় সে, যে সত্য যে দুই হতে পারেনা, কারণ দুইয়ের অস্তিত্বই একজনকে সত্য এবং একজনকে অসত্য করে দেয়, তা উপলব্ধি করতে পারেনা সে।
উপলব্ধি করতে পারবেই বা কি করে! উপলব্ধি তো হৃদয় দিয়ে করতে হয়, অনুভব দ্বারা করতে হয়। উপলব্ধিকে তো আর ইন্দ্রিয়ের দৃষ্টি দিয়ে দেখা যায়না, উপলব্ধিকে তো হৃদয়ের দৃষ্টি দ্বারা প্রত্যক্ষ করতে হয়। সেই দেখা যে নেত্রের দ্বারা দেখার থেকে অনেক অনেক অধিক স্পষ্ট। কেমন জানো মা! অনেকটা আজকের দিনের টুডি আর থ্রিডির মত। কিন্তু হৃদয় দ্বারা দর্শন, থ্রিডিও নয়, সে হলো ফোরডি।
হ্যাঁ মা, যেন স্থান, কাল আর পাত্র হলো থ্রিডির তিনটি ডি বা ডাইমেনশন, আর চতুর্থ ডি হলো চেতনার দৃষ্টি। চারমিলে গেলে, আর মনে হয়না যে কিছু হচ্ছে, বাস্তবেই কিছু হয়। … অর্থাৎ কেমন বলতো মা, টুডিতে যেমন কুমীর চোখের সামন্তে থেকে চলে গেল, থ্রিডিতে কুমীর যেন একদম চোখের সামনে এসে গেল, মনে হলো যেন এই আমাকে খেয়ে নিলো, কিন্তু চোখের সামন্তে থেকে সরে গেল মুহূর্তের মধ্যেই। কিন্তু এ যেন ফোরডি, কুমীর আমাকে সত্য করেই খেয়ে ফেলল।
হ্যাঁ মা, চোখে দেখা, চোখে দেখা নিয়ে একসময়ে অনেক তর্ক করতাম, অহংকার করতাম, যা চোখে দেখিনি, তা বিশ্বাস করবো না। মা, আজ যা দেখলাম, এরপর তো চোখে দেখা কিছু অনেক পরের কথা, নিজের চোখই নিজের ভ্রমের কারণ মনে হচ্ছে। এতকাল কেবলই সে আমাকে মিথ্যা দেখিয়ে এসেছে। হ্যাঁ মিথ্যা দেখিয়ে এসেছে যে কিছু না অনেক কিছুই আছে।
আমার কান আমাকে মিথ্যা শুনিয়ে এসেছে যে এক নয়, বহু ধ্বনি আছে। আমার ত্বক আমাকে মিথ্যা বুঝিয়ে এসেছে যে এক নয় অনেক অনুভব সম্ভব। আমার রসনা আমাকে সমানে মিথ্যা বলে এসেছে যে, এক নয় অনেক প্রকার স্বাদ হয়। আমার ঘ্রাণশক্তি আমাকে সমানে মিথ্যা বলে এসেছে যে অনেক প্রকার ঘ্রাণ হয়। … হ্যাঁ মিথ্যা, সর্বৈব ভাবে মিথ্যা বলে এসেছে তারা। আগাগোড়া কেবল মিথ্যা আর মিথ্যা।
যখন কারুর দৃষ্টিশক্তি চলে যেত, তখন; যখন কারুর শ্রবণ শক্তি চলে যেত, তখন; যখন কারুর ঘ্রাণশক্তির নাশ হতো তখন; যখন কারুর স্বাদের ভেদ চলে যেত তখন; সর্বক্ষণ আমাকে তাঁদেরকে করুণার দৃষ্টিতে দেখিয়েছে। আরে করুণা তো আমার উপর তাঁদের করার ছিল। সত্যের কাছে তাঁরা গেছিলেন, আমি তো সেই মিথ্যার মধ্যেই ডুবে ডুবে মরছিলাম।
সত্য তো এই যে, কনো দ্বিতীয় চিত্রই সম্ভব নয়, শূন্যব্যতীত। সত্য তো এই যে কনো দ্বিতীয় ধ্বনিই সম্ভব নয়, নিঃশব্দ ব্যতীত। সত্য তো এই যে এক ও একমাত্র অমৃতেরই স্বাদ হয়, বাকি সমস্ত কিছু বিস্বাদ। সত্য তো এই যে এক ও একমাত্র গন্ধহীনতাই গন্ধ, যেই প্রশ্ন তোমাকেও বারবার করতাম আমি মা। … আমার মনে জিজ্ঞাসা এই ছিল যে, কেন তোমার অঙ্গ থেকে চন্দনের গন্ধ নির্গত হয়না, কেন কনো পুষ্পের হয়না, তুমি তো পবিত্রশ্রেষ্ঠ, তারপরেও তোমার অঙ্গ থেকে কেন কনো প্রকার বাসই আসেনা!
আজ অনুভব করেছি মা, যেকোনো প্রকার গন্ধই যে ভ্রম, আর তুমি যে সত্য। তাই তোমার অঙ্গে কনো গন্ধই নেই, না সুবাস আছে, আর না তোমার স্বেদেরও কনো বাস আছে, আর না সেই স্বেদ অঙ্গে দীর্ঘক্ষণ স্থাপিত থাকলেও কনো রকম বাস আসে তোমার অঙ্গ থেকে। আসবে কি করে? তুমি যে সত্য, আর সত্য এই যে, তার কনো বাসই সম্ভব নয়।
তাঁর মধ্যে কনো বিশেষ রূপ নেই, তাঁর মধ্যে কনো বিশেষ ধ্বনি নেই, তাঁর মধ্যে কনো বিশেষ গন্ধ নেই। … সেই যে সম্পূর্ণ ভাবে নির্বিশেষ, যার ধারনাও করা যায়না, এই প্রকাশের মধ্যে স্থিত থেকে, কারণ প্রকাশ যে স্বয়ং এক বিশেষত্বের ভ্রম। … আজ অনুভব করেছি মা, ত্বকের সমস্ত অনুভব মিথ্যা, অনুভব তো একটিই সম্ভব আর তা হলো প্রেম। … প্রেমই একমাত্র অনুভব, শূন্যই একমাত্র দর্শনিয়, নিঃশব্দতাই একমাত্র শ্রবণীয়, ঘ্রাণহীনতাই একমাত্র ঘ্রাতব্য, আর স্বাদহীনতাই একমাত্র গ্রহণযোগ্য স্বাদ।
তবে এতো এক স্তরের ভ্রম, এতো প্রকাশের ভ্রম, এতো দেবতাদের ভ্রম। এরপরে আবার অসুরদের ভ্রমও আছে। তাঁরা তো আবার এই প্রকাশের মধ্যেই অন্ধকারের সন্ধান করে। অর্থাৎ, যেই অন্ধকারের বক্ষে প্রকাশ একটি ভ্রম, সেই সত্যসনাতন অন্ধকার তাঁদের আরাধ্য নয়। তাঁদের আরাধ্য হলো, সেই প্রকাশ অর্থাৎ ভ্রমের মধ্যে স্থিত অন্ধকার, অর্থাৎ ভ্রমের মধ্যে ভ্রম। এক তো এই ব্রহ্মাণ্ড আমাদের ভ্রমের থেকে নির্মিত যন্ত্র, সেই যন্ত্রের মধ্যে যন্ত্র আমাদের এই পঞ্চভূতের দেহ। সেই ভ্রমেও শান্তি নেই অসুরদের। তার উপর আরো ভ্রমের আস্তরণের প্রয়োজন তাঁদের। তাই এই পঞ্চভূত তনুর উপর আবারও যন্ত্র আর মন্ত্র স্থাপনা।
মা, সত্যই বলতে তুমি, বুদ্ধির ব্যবহারই হলো শ্রেষ্ঠ নির্বুদ্ধিতা। এই যে ভ্রমের আস্তরণের উপর আবার করে ভ্রমের আস্তরণ স্থাপন, সে তো আমাদের এই খুরধর বুদ্ধিরই অতিচালাকি, তাই না! … কিন্তু থাক সেসব কথা। আজ আর মুখ খারাপ করতে ভালোই লাগছে না। … আমার চিত্ত আজ বলছে, বয়ে চলো বাছা, নিজের মায়ের প্রেমের সাগরে বহে চলো।
মা, যখন প্রথমবার সেই অন্ধকারকে দেখলাম, যার থেকে অনেক দূরে প্রকাশ গুলো কিছু অণুর মত দেখাচ্ছিল, আমি তো ভয়ই পেয়ে গেছিলাম। একবার তো এমনও ভেবেনিয়েছিলাম যে আমি মনে হয় কনো একটা পাতালে পৌঁছে গেছি। কিন্তু পরিবর্তীতে তোমার প্রেম সমস্ত কিছু অনুভব করিয়ে দিলো। অনুভব করিয়ে দিলো আমার ভ্রম কি ছিল, সত্য কি, আর আমার ভ্রম আরো কি কি ভ্রম করেছিলো, আর বাকি আত্মরাও আমিই, তাই সেই ভ্রমের পর ভ্রমের নির্মাণ আমি করেই চলেছি।
মা, এরপর আমার যে কি করা উচিত আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। না রয়েছে কনো শব্দ, না রূপ, না গুণ, না ঘ্রাণ, না বাস, আর অনুভব! … সে যে নেই, তা তো বলা যায়ই না, কারণ একাকী যেন সে-ই ছিল। জানিনা, পর্বতারোহণ তো আমি কনোদিন করিনি, তাই পর্বতের শিখরে উত্থানের অনুভূতিও জানিনা। তবে সেই সময়ে যেন আমার অনুভূতি তেমনই ছিল। যেমন পর্বতারোহী একবার শিখরকে নিজের আয়ত্তাধীন দেখে ফেললে, তাঁর সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায়, কেবলই শিখরে পৌঁছানোর দিকেই তাঁর প্রাণ নিবদ্ধ হয়ে যায়, আমারও তেমনই হলো।
কতটা দূর এসেছি, সেই পথে কি কি হারিয়েছি, কনো কিছুর যেন বোধই রইলো না। যেন এক অসম্ভব নেশা আমাকে আকর্ষণ করতে থাকলো, আর আমি দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে সেই পূর্ণবনিরবতা, পূর্ণশূন্য, পূর্ণনির্গুণ, পূর্ণভাবে যিনি অব্যাক্ত, তাঁর কাছে এগতে থাকলাম। আর যখন পৌঁছলাম তাঁর কাছে, তখন উপলব্ধি করলাম যে, সেই শিখর তো পর্বতের শিখরই নয়, তা যে আগ্নেয়গিরির মুখগহ্বর ছিল। একবার সেখানে পদার্পণ করতেই, যেন সরাসরি আমাকে পাতালে নিয়ে চলে যাওয়া হলো।
এতটাই গভীরে চলে যেতে থাকলাম যে, একসময়ে আর আমি বলে কিছু রইলই না। অনুভূতিও রইলো না, কেবলই তলিয়ে যাওয়া, নিজেকে হারিয়ে ফেলা। … কিচ্ছু নেই, কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু নেই, হয়তো এই কিচ্ছু না থাকাই হলো শূন্য। সত্যই বলেছিলে তুমি, সত্য বলে কিচ্ছু হয়না। এই শূন্যকে আমি কি করে কিচ্ছু বলে আখ্যা দিতে পারি! … এ যে কিচ্ছু নয়! কিচ্ছু নয়, কিন্তু তা যেন কিচ্ছু না হয়েও সমস্ত কিছু।
সেই শূন্যই একমাত্র সত্য। সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড, ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত অণুপরমাণু সমস্ত মিথ্যা, কেবল মিথ্যা নয় ডাহা মিথ্যা। সেই সমস্ত আমারই নির্মিত কল্পনা। যেন আমি নিজেকেই নিজে এতকাল ধোঁকা দিয়ে আসছিলাম, সেই অণু, পরমাণু, আর সেই অণুপরমাণুদের একত্রিত সমষ্টিগুলিকে কিছু বলে ধারণা করে। আমি যেন আমার নিজের সাথেই মিথ্যাচার করে আসছিলাম। নিজেই সমস্ত কিছুর কল্পনা করেছি, আর সেই কল্পিত গুণগুলিকে নিজেই দেখে দেখে, নোটবইতে তা লিখে লিখে, মুখস্ত করে এসেছি, আর মনে করে গেছি, আমি কি মহান কাজই না করছি! …
সত্য তো এই যে কনো গুণ সম্ভবই নয়! সত্য তো এই যে কনো রূপ সম্ভবই নয়! সত্য তো এই যে কনো গন্ধ সম্ভবই নয়! সত্য তো এই যে কনো স্পর্শ অনুভূতি সম্ভবই নয়! সত্য তো এই যে কনো স্বাদ সম্ভবই নয়! সত্য তো এই যে কনো শব্দ, কনো ধ্বনি সম্ভবই নয়! সত্য তো এই যে কনো সীমা সম্ভবই নয়, কনো অন্ত সম্ভবই নয়, কনো নশ্বর সম্ভবই নয়, কনো ভেদ সম্ভবই নয়, কনো চিন্তা, কনো ব্যাখ্যা সম্ভবই নয়।
কারণ এই শূন্যই যে একমাত্র অস্তিত্ব, আর আমি! … আমি স্বয়ংও যে সেই শূন্যই। সেই শূন্যের এই নির্গুণতা, এই নিরবিশেষতা, এই ধ্বনিহীনতা, এই রূপহীনতা, এই ভেদহীনতার মর্মই আমি বুঝি নি, তাই গুণ খুঁজতে, বিশেষত্ব খুঁজতে, ধ্বনি শুনতে, রূপ দেখতে, ভেদ খুঁজতে নিজে এই শূন্য হয়েও, নিজের শূন্যতাকেই নিজে অস্বীকার করেছিলাম।
আর এই অস্বীকার করার কালেই আমি বিশেষত্বের, গুনের, ধ্বনির, রূপের চিন্তা করে, চিন্তার জন্ম দিই। সেই সমস্ত কিছুকে লাভ করার ব্যকুলতা থেকে ইচ্ছার জন্ম দিই, আর সেই সমস্ত কিছুকে ধারণ করার জন্য কল্পনা করা শুরু করি। এই তিন ভাব থেকে ত্রিগুণের নির্মাণ করি, আর ত্রিগুণের অহংভাবে অন্ধ হয়ে গিয়ে, এই পরমশূন্যকেই অধিকার করে নেবার চিন্তা করি।
কিন্তু তা তো পারিনা, কারণ এই শূন্য যে অজেয়, কারণ যে জয় করবে এই শূন্যকে সেও যে সেই শূন্যই। … তাই অসম্ভব এই কাজে সফল না হয়ে, একেই প্রকৃত অর্থাৎ প্রকৃতি নাম দিই, একেই নিয়ন্ত্রণের অতীত বা নিয়তি নাম দিই। কিন্তু এই শূন্যই তো সত্য, তাকে ছাড়া যে কিছুই সম্ভব নয়। তাই নিজের ইচ্ছা, চিন্তা আর কল্পনাকেই এঁদের উপর আরোপ করে করে, এঁদেরকে ত্রিদেবীরূপে কল্পনা করতে থাকি, আর এও কল্পনা করতে থাকি যেন এই ত্রিদেবী আমার বশে স্থাপিত।
আমি যা চিন্তা করবো, তাই হবে আমার বিদ্যা; আমি যা ইচ্ছা করবো, তাই হবে আমার সম্পদ; আমি যা কল্পনা করবো, তাই হবে আমার শক্তি। … উন্মাদ হয়ে গেলেম আমিত্বের বোধে, আত্মের বোধে, অহংবোধে, আর তাই নিজেকে আত্ম নাম দিয়ে দিলাম। আর আমারই এই ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার সাথে সাখ্যাতে এবং এঁদেরই দ্বারা কল্পনা প্রকাশিত প্রকৃতের সাথে সঙ্গমেরও কল্পনা করে, তার থেকে কল্পনাতেই পঞ্চভূতের আর আবেগদের নির্মাণ করে ফেললাম, আর তারপর তো কল্পপ্না বৃদ্ধি পেতে পেতে, এই আস্ত বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের কল্পনা করে নিয়ে, একেই সত্য মেনে চলেছিলাম।
ঠকাচ্ছিলাম, হ্যাঁ নিজেকে নিজে ঠকাচ্ছিলাম। কবে থেকে জানিনা, সময় বা কালের হিসাবও নেই, সমানে নিজেকে ঠকিয়ে যাচ্ছিলাম। মিথ্যা এই কল্পনাকেই সত্য বলে অঙ্গিকার করে, নিজেরই কল্পনাকে নিজে শিক্ষারূপে ধারণ করার প্রয়াস করে, নিজেকে বিদ্যান বলে বলে নিজেকেই ঠকাচ্ছিলাম। নিজেরই ইচ্ছাকে সম্পদরূপে প্রকাশিত করে, সেই সম্পদকে পুনরায় অধিকার করার উন্মাদনাকে আমি মূর্খের ন্যায় জীবনের উদ্দেশ্য বলে অঙ্গিকার করতাম।
ধিক্কার আমাকে, আর ধিক্কার আমার নিজেরই ছলনাকে। নিজেরই কল্পনাকে নিজে অধিকার করার প্রয়াস! আমি তো পাগলও নই, আমি তো বদ্ধ উন্মাদ! আর সেই নিজেরই কল্পনাকে অধিকার করার জন্য খুশী হয়ে ওঠা! এও কি সুস্থতার চিহ্ন! সেই অধিকার করতে পারার জন্য আমি যেন শক্তিশালী হয়ে যাচ্ছিলাম! … এতটা অধম আমার বোধ কি করে হতে পারে! …
সত্য বলেছিলে তুমি, সত্য বলে কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু নেই। এই শূন্য যে কিচ্ছু নয়, আর সেই কিচ্ছু নয় যা, তাই যে সত্য, একমাত্র সত্য। বাকি সমস্ত কিছুর অস্তিত্বই মিথ্যা, মিথ্যা কথার থেকেও অধিক মিথ্যা। … তবে আরো একটি জিনিস আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি মা। এই শূন্যই তুমি, আর তাই তুমি কনোরকম যোজনা করো না, কনো রকম চিন্তা, ইচ্ছা, কিচ্ছু করো না। এই শূন্যই যথার্থ আর তাই হলে তুমি, আর তাই তুমি বারবার আমাকে বলো, যতটা আমার এই দেহ মিথ্যা, ততটাই তোমার এই দেহও মিথ্যা।
কিন্তু তারপরেও আমি একটি কথা বলবো মা, তোমার থেকে এই বিচ্ছেদ আবশ্যক ছিল আমার জন্য। জানি আমার এই বিচ্ছেদ তোমাকে অনন্ত বেদনা প্রদান করেছে। সেই বেদনার অনুমান করাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ যেমন তুমি অনন্ত, তেমন তোমার বেদনাও অনন্ত। কিন্তু তাও বলবো এই বিচ্ছেদ আবশ্যক ছিল আমার জন্য।
এই বিচ্ছেদ না হলে, শূন্যের গরিমা কনোদিনও অনুভব করতে পারতাম না আমি। এই বিচ্ছেদ না হলে, নিঃশব্দতার মহানতা আমার কাছে অধরাই থাকতো। এই বিচ্ছেদ না হলে, জানতাম কি করে যে, তুমি নির্গুণ নও। … না মা, তুমি নির্গুণ নও। কিছুতেই তুমি নির্গুণ নাও, তবে তোমার দুটি গুণ নেই, একটিই গুণ, আর সেই গুণটিই হলো সত্য। আর তা হলো প্রেম। হ্যাঁ মা, আমি স্পষ্ট ভাবে অনুভব করে ফেলেছি, তুমি প্রেমী নও, তুমি স্বয়ং প্রেম।
তোমাতে ডুব দেওয়াই প্রেম, কারণ তুমিই প্রেম; তোমাতে হারিয়ে যাওয়াই প্রেম, কারণ তুমিই প্রেম; তোমাতে বিলীন হয়ে যাওয়াই প্রেম, কারণ তুমিই প্রেম। তাই তুমি নির্গুণ নও। তুমি প্রেম। তুমি অনন্ত, তুমিই একমাত্র সত্য, আর সেই সত্য হলো প্রেম। অর্থাৎ প্রেমই একমাত্র, যা সত্য। আর সঠিক বলতে তুমি, যতক্ষণ দুই, ততক্ষণ মোহ। প্রেম মানে তো একাকার। যতক্ষণ তোমাকে দেখছিলাম, ততক্ষণ আমার মধ্যে আবেগ ছিল। যাই তোমাতে বিলীন হয়ে গেলাম, তাই অনুভব হলো প্রেমের। অনন্ত তোমার প্রেম।
আর তাই সত্য বলে কিচ্ছু নেই, মা, আমি এই অঙ্গিকার তোমার মানতে পারলাম না। না তুমি মিথ্যা বলো নি, কারণ তুমি নিজের প্রেমকে অনুভবই করো না, ঠিক যেমন আমিও তা করিনি, আর করিনি বলেই তোমাকে নির্গুণ ভেবে তোমাকে ত্যাগ দিয়ে, আত্ম হয়ে নিজেকে কল্পনায় বেঁধেছিলাম। কিন্তু তুমি নির্গুণ নও। স্মরণ করো মা, রামকৃষ্ণ ঠাকুরও একবার ভয়ানক চোটে গেছিলেন যখন কেউ তাঁকে বলেছিলেন ঈশ্বর নির্গুণ। সেই চোটে যাওয়ার কারণ একটিই, আর তা এই যে, ঈশ্বর নির্গুণ নন। ঈশ্বর স্বয়ং প্রেম। আর এই সত্য আমার উদ্ধার করা আবশ্যক ছিল।
না মা, তুমি বিশেষত্ব অর্জন করতে চাওনা ঠিকই, যেমনটা আমি চেয়ে তোমার থেকে নিজেকে পৃথক কল্পনা করে, বিশেষ হবার জন্য, শ্রেষ্ঠ হবার জন্য পাগলামি করেছিলাম। কিন্তু তুমিও নির্বিশেষ নও। কারণ তুমি হলে শ্রেষ্ঠ বিশেষ, আর তার কারণ তুমি স্বয়ং প্রেম। হয়তো এটিই মোক্ষ। হয়তো নয়, এটিই মোক্ষ। আর এটি তুমিও জানতে, খুব ভালো করে জানতে যে, তুমি নির্গুণ নও, তুমি নির্বিশেষ নও। আর তাই তো আমি যখন আমার এই কল্পনাতে মজে উঠলাম, আমার মত অজস্র আত্ম, যারা আত্মই নয়, স্বয়ং তুমি, তারা যখন বিশেষত্বের সন্ধানে পাগল হয়ে উঠলো, গুনের সন্ধানে পাগল হয়ে উঠলো, তখন তুমি নীরবে সমস্ত কিছুকে সমর্থন করে গেলে, এখনো নীরবেই সমস্ত কিছুকে সমর্থন করেই চলেছ।
কারণ তুমি জানো, শ্রেষ্ঠ বিশেষ তুমিই; তুমি ভালো করেই জানতে যে শ্রেষ্ঠ গুণ স্বয়ং তুমি। আর সেই সত্যই আমাদেরকে উপলব্ধি করানোর ছিল, আর তাই নীরব দর্শকের আসনে বসে থেকে, অনন্ত বেদনা সহ্য করে, চুপিসারে আমাদের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষা করে থাকো। … কারণ তুমি আমাদের থেকে এই কথা শুনতে চাও। যেই তোমাকে নির্গুণ বলে অভিযোগ করে, তোমার থেকে আলাদা অনুভব করেছিলাম নিজেদের, সেই অভিযোগ যে অবান্তর, কারণ তুমিই শ্রেষ্ঠ গুণ, স্বয়ং প্রেম, তা তুমি শুনতে চেয়ে চুপ করে আমাদের প্রতিটি গতিবিধির উপর নজর রেখে গেলে এতকাল।
তোমাকে নির্বিশেষ এবং তাই অসহ্য বলে যে আমরা তোমার থেকে পৃথক হবার অঙ্গিকার করেছিলাম, আমরা তোমার থেকে চেয়েও আলাদা হতে পারবো না, তা জেনেও চুপ করে তুমি বসে রইলে আর আমাদের উপর থেকে এক পলকের জন্যও নিজের দৃষ্টি সরালে না। কারণ তুমি যে চেয়েছিলে আমরা নিজে মুখে স্বীকার করি যে তুমিই হলে শ্রেষ্ঠ বিশেষ, আর তার কারণ তুমি প্রেম। আর তাই তো দেখো না। সমস্ত কল্পনা করে গেছি, আর সমস্ত কিছুর মধ্যে প্রেমকেই খুঁজে বেরিয়েছি।
হাজার হাজার কামনার রচনা করেছি, এই প্রেমের খোঁজে; জনমে জনমে পুরুষ হয়েছি, স্ত্রী হয়েছি, আর বারে বারে সঙ্গমে লিপ্ত হয়ে প্রেমকেই অনুভব করার প্রয়াস করেছি। … সখার প্রেম, মাতার প্রেম, পিতার প্রেম, সন্তানের প্রেম, গুরুর প্রেম, ভগিনীর প্রেম, শত্রুর প্রেম, ভ্রাতার প্রেম, দেশপ্রেম, জাতিপ্রেম, ঈশ্বরপ্রেম, আরো কত কিছুই না প্রেমের রচনা করে গেছি, কিন্তু কিছুতেই আমাদের জননীর প্রেমের সমতুল্যও কিছুকে পাইনি। … আর শেষে যখন নিজের জননীর সাথে মিলিত হলাম, যখন শূন্যে লীন হলাম, তখন জানলাম, আমাদের জননীকে তো আমরা মিথ্যা আরোপ দিয়েছিলাম যে তিনি নির্গুণ। তিনি তো স্বয়ং প্রেম।
তিনি প্রেম বলেই না, সমস্ত আমাদের নির্মাণ করা প্রেম আমাদের কাছে নশ্বর আর ফিকে লাগতে থাকলো! … কি করে যথার্থ লাগবে সেই সমস্ত প্রেমকে! সেই আমাদের নির্মিত একটি প্রেমেও তো একাত্ম হওয়ার বোধই নেই। সঙ্গমে সেই বোধ সামান্য থাকে, তাই তার নেশাতেই সমস্ত জীব চূড়, কিন্তু সেই একাত্মতাও তো মাত্রই আঙ্গিক, কোথায় তা সম্পূর্ণ একাত্মতা! … তাই কিছুতেই যে আমরা খুশী হতাম না, কনো প্রেমেই তৃপ্তি পেতাম না, প্রেম মানেই বিরহ হয়ে গেছিল আমাদের কাছে। হবেই তো তা, যার জননী স্বয়ং প্রেম, সেই অনন্ত প্রেমকেই সে অস্বীকার করে এসেছে এতকাল, তাকে স্বীকার না করলে, প্রেমের যথার্থতা সে বুঝবে কি করে?
তাই মা, এই বিচ্ছেদ খুব আবশ্যক ছিল। তোমার মর্ম কিছুতেই বুঝতে পারতাম না যদি না এই বিচ্ছেদ হতো। প্রেমের কারণেই এই বিচ্ছেদ, আর প্রেমের কারণেই এই মিলন। প্রেমের সন্ধান করতে গিয়েই এই বিচ্ছেদ ঘটেছিল, আর আজ প্রেমের সন্ধান করতে গিয়েই, এই মহামিলন সম্ভব হলো। … আর কে বলেছে, তোমাকে দেখা যায়না! … তুমি একবার বলেছিলে, যখন আমি প্রশ্ন করেছিলাম যে তোমাকে কি চোখে দেখা যায়! … তুমি বলেছিলে, কোন চোখের কথা বলছো পুত্রী! … স্মরণ আছে তোমার!
আজ সেই কথার অর্থ অনুভব করলাম মা। সত্যই কিচ্ছু বোঝার নেই এই জগতসংসারে। যা ডাহা মিথ্যা, তাতে আবার বোঝার কি থাকতে পারে! … প্রয়োজন কেবলই অনুভবের। আর এই অনুভবই হলো শ্রেষ্ঠ নেত্র, কারণ এই অনুভব হলো হৃদয়ের নেত্র। আর এই নেত্রদিয়েই দেখা যায় তোমাকে। আর যখন এই নেত্র তোমাকে দেখে, সত্য বলছি মা, আমাদের এই দুটি চর্মচক্ষু এত স্পষ্ট ভাবে আজ পর্যন্ত কিচ্ছু দেখেনি। ওই যে বললাম, এখানে কুমির খালি দেখা দেয়না, খালি ভয় পাওয়ায় না, এই দৃষ্টিতে কুমির আস্ত আমাকে খেয়েও ফেলে। …
তাই সত্য কথা, তোমাকে, মানে ঈশ্বরকে সাখ্যাত দর্শন করা যায়, তবে এই চর্মচক্ষুর কেবলই নিজের নির্মিত কল্পনাকে দেখার সামর্থ্য আছে, মনচক্ষুরও তাই। তোমাকে দেখার জন্য লাগে দিব্যদৃষ্টি, আর তা তুমি আজ আমাকে প্রদান করলে, আর তাই তোমাকে প্রত্যক্ষ দেখতে পেলাম। … তোমাকে স্পষ্ট দেখা যায়। স্পষ্ট দেখা যায় যে তুমি হলে সাখ্যাত প্রেম, সাখ্যাত শূন্য, সাখ্যাত অনন্ত, অচিন্ত্য, অব্যক্ত, সমস্ত কিছু স্পষ্ট স্পষ্ট দেখা যায়, কিন্তু যে দেখে তা, সে হলো দিব্যদৃষ্টি। হাজার হাজার দিব্যদৃষ্টি নেই, একটিই দিব্যদৃষ্টি আছে, আর সেই দিব্যদৃষ্টির নাম হলো অনুভবদৃষ্টি। এই অনুভবদৃষ্টিদ্বারা তোমাকে স্পষ্ট ভাবে প্রত্যক্ষ করা যায়।
আজ আমার কাছে সমস্ত কিছু স্পষ্ট হয়ে গেছে মা। তুমি যে বলেছিলে, যে তোমাকে নিজের অহংকারের দৃষ্টিদিয়ে দেখে, সে দেখে তুমি পিতা, আর যখন সেই অহং বা আত্ম খসে যায়, আর হৃদয় দিয়ে তোমাকে দেখে, সে তোমাকেই দেখে মা বলে, নিজের জন্মজন্মান্তরের মা, নিজের একমাত্র মা, নিজের একমাত্র পরমাত্মীয় রূপে। আর সঠিকই বলেছিল কাকা, একবার তোমার সত্যস্বরূপকে দেখার পর, আর যেন নিদ্রা যেতেও ইচ্ছা করেনা, ভয় হয় যদি নিদ্রা গেলে তোমাকে দেখতে না পাই!
কিন্তু মা, নিদ্রাতেও তো আমরা তোমার কাছেই থাকি। কেবলই নিজেদের কল্পনা যখন অতিপ্রবল হয়ে যায়, তখন সেই তোমার কাছে লীন হয়ে থাকার সময়কাল, অর্থাৎ নিদ্রার কালেও কল্পনার বিস্তার দেখতে থাকি, যাকে আমরা বলি স্বপ্ন। … সত্য বলছি মা, আজ যেন সত্য স্বয়ং আমার কাছে আত্মপ্রকাশ করেছে। তবে দুটি কথা, আর দুটিই তুমি বলতে আমাকে।
প্রথমটি এই যে সত্য বলে কিচ্ছু সম্ভবই নয়, কারণ সত্য সম্ভব হলে, অসত্যও সম্ভবই হবে। ধ্রুবসত্য এই কথা। সত্য বলে কিচ্ছু নেই, কারণ সত্য হলো একমাত্র শূন্য, মহাশূন্য, অখণ্ড, অনন্ত, অব্যক্ত, অচিন্ত্য শূন্য, আর তাই সত্য বলে কিচ্ছু হয়না, আর সত্য বলে যে কিচ্ছু হয়না, এটিই একমাত্র সত্য।
আর দ্বিতীয় তুমি আমাকে বারবার বলতে, ঈশ্বর দর্শন দিতে আসেন না, আর দর্শন দেবার পড়ে চলেও যান না। কোথা থেকে তিনি আসবেন, আর কোথায়ই বা তিনি ফিরে যাবেন! … আজ অনুভব করতে পারছি মা, এই কথার সত্যতা কি ছিল।
এমন কনো স্থানই তো সম্ভব নয়, যেখানে তুমি নেই। তাহলে তুমি কোথাও গেলে, সেই স্থানটি কোথায়! কবে গেলে তুমি সেখান থেকে! … না মা, তুমি কোথাও যাওনি, যেতে পারোই না! একদণ্ডের জন্যও তুমি তোমার একটি সন্তানের থেকেও নেত্র সরাও না। অনন্ত প্রেমই যার একমাত্র গুণ, তিনি কোথায় যাবেন! … তুমি তো শূন্য, তুমি তো সত্য, একমাত্র সত্য। এমন সত্য তুমি, যে সেই সত্য ছাড়া কনো অসত্যের অস্তিত্বও সম্ভব নয়। তাই তুমি কোথায় যাবে?
না তো তুমি কোথাও যাও, আর না তুমি কোথাও থেকে আসো। তুমি সঠিক বলেছিলে মা, ঈশ্বর দর্শন দিতে আসেন না, আমরা অযোগ্য তাই ঈশ্বরের দর্শন লাভ করিনা। আমরা এক থেকে নয়ের মধ্যে ঘোরাফেরা করি, তাই ঈশ্বরের দর্শন লাভ করিনা। যেই মুহূর্তে আমরা এক থেকে নয়, সমস্ত অহং পর্দা সরিয়ে ফেলি, যখন আমরা এক থেকে নয় সমস্ত আত্ম পর্দাকে সরিয়ে ফেলি, তখন তো শূন্য আমাদের সম্মুখেই থাকে।
আসলে তিনি তো সর্বদা আমাদের সম্মুখেই ছিলেন। চলে তো তিনি যাননি কনোকালেই। আমরাও যাইনি কোথাও। আমরা আমাদের চিন্তা, ইচ্ছা আর কল্পনার দ্বারা নিজেদের ঢেকে নিয়েছিলাম কেবল। আর তাই তুমি সামনে থাকতেও দেখতে পেতাম না। এই দেখো না, একটু আগেই আমি শূন্যে স্থিত ছিলাম, আজ আবার আত্মকে ধারণ করে নিয়েছি, তাই আবার তুমি আর আমি হয়ে রয়েছি।
তবে হ্যাঁ, ভেদ একটিই, শূন্যে যাবার আগে, আমি ছিলাম ১ থেকে নয়ের মধ্যে অবিরাম ঘুরতে থাকা একটি ভ্রমিত আত্ম। আর এখন আমি কেবলই ১, আর তুমি শূন্য। তাই শূন্যে লীন না হলেও, শূন্য থেকে আমি অপসারিত নই।
পিতা আমি বেশ বুঝে গেছি, এই ১ হলো কেবলই অহংকারের সংখ্যা, যেখানে স্থিত হলে, সে থাকে এক আর সত্য হয় শূন্য। এরপরে আসে দুই, যেখানে অহংকার নিজেকে ইচ্ছা ও চিন্তা মধ্যে স্থাপন করে। এই ইচ্ছা আর চিন্তা একাত্ম হয়ে জন্ম দেয় কল্পনাকে, আর তাই এই দুই বেড়ে গিয়ে হয় তিন।
এই ছায়াদেবীরা অর্থাৎ কল্পনা, ইচ্ছা ও চিন্তা নিজেদের সাথে পুনরায় অহংকে যুক্ত করে নিলে হয় চার। আবার এই অহং যুক্ত হবার পড়ে, তার থেকে পঞ্চভূতের জন্ম হলে, নতুন করে পঞ্চভূতের লীলা শুরু হয়, তাই সংখ্যা হয়ে দাঁড়ায় ৫। এই পঞ্চভূতদের প্রকাশে, আত্ম নিজের মধ্যের ত্রিগুণকে প্রত্যক্ষ করলে, সংখ্যা ৬, ৭ ও ৮ হয়ে যায়। কিন্তু অন্তে যখন সমস্ত কল্পনাকে একত্রে দেখা হয়, তখন দেখা যায় যে, ছায়াদেবীরা তিন, অহং বা আত্ম, এবং পঞ্চভূত, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের রচনার কাণ্ডারি, এরা ৯ জন, আর তাই সংখ্যা স্থাপিত হয় ৯। আর তাই ৯ হলো সেই সংখ্যা যেখানে ব্রহ্মাণ্ডের বিস্তারের রহস্য লুকিয়ে আছে।
আর যখন ব্যক্তির মধ্যে এই ৯ সংখ্যার রহস্য উদ্ধার হয়, তখন থেকেই তোমার প্রত্যক্ষ লীলা শুরু হয়, যেখান থেকে একে একে, তুমি সর্বাম্বা বেশে সমস্ত ভূতকে নিজের পরমাত্মীয় করে নিয়ে, তাদেরকে অপসারিত করে দাও। আর অন্তে ত্রিগুণের নাশ করে, ছায়াদেবীদের ভস্ম করে, পড়ে থাকে কেবল ১ অর্থাৎ অহং বা আত্ম আর তুমি অর্থাৎ শূন্য। গণিতের ভাষায় একে বলে ডিজিটাল থেকে বাইনারি, আর এই ডিজিটাল থেকে বাইনারিই হলো সাধনা।
এই ৯ থেকে ১ ও শূন্যে স্থাপনই সমস্ত সাধনার উদ্দেশ্য, আর সেই সাধনা নিজের পরমার্থতে স্থাপিত হয় যখন এই ১ও আর থাকেনা, কেবলই শূন্য অর্থাৎ সত্য পড়ে থাকে। … কি অদ্ভুত না! মানুষ সমস্ত কিছু উদ্ধার করেও যেন উদ্ধার করতে পারছেনা। মোক্ষের সমস্ত তত্ত্ব তাঁরা বুদ্ধিদ্বারা কষে সামনে ফেলে রেখেছে নিজেদের। কিন্তু যেহেতু তা বুদ্ধির কষা, আর তাতে হৃদয়ের অনুভবদৃষ্টি অর্থাৎ দিব্যদৃষ্টি নেই, তাই সমস্ত জেনেও অজানা সকলের!
মা, এবার আমি দৃঢ়। এবার আমি বিশ্বাসীও যে, আমার পরমার্থতে আমি উপস্থিত হবই। তন্ত্র নয়, যন্ত্র নয়, মন্ত্র নয়, কেবলই নীরবতার সাধনা, এই হবে আমার সাধন ধারা। তবে এই বিশ্বাস নিজের উপর নয়, আত্মবিশ্বাস নয় এই বিশ্বাস। এই বিশ্বাস তোমার উপর বিশ্বাস, তোমার প্রেমের উপর বিশ্বাস, আমার নিজের মায়ের উপর বিশ্বাস, আর আমার ছোট্ট ছোট্ট শিশু ভাইবোনদের মায়ের উপর বিশ্বাস, যাদেরকে সমাজ বলে অনাথ।
আমার কাছে আর এটি কর্ম নয়, দায়িত্বও নয়, কর্তব্যও নয়; এই কর্মই আমার কাছে আজ থেকে প্রেম। কারণ এই কর্মের প্রতিমুহূর্তে আমি আমার মায়ের সান্নিধ্য লাভ করবো। … আশীর্বাদ করো মা আমাকে। তোমার ক্রোড় যেন তেমন ভাবেই ভড়িয়ে তুলতে পারি, যেমন ভাবে বৌদ্ধরা তুলেছিলেন। প্রয়োজনে আমি বৌদ্ধদের কাছেও তোমার চিঠি পৌঁছে দেব আর বলবো, মা তোমাদের উপর আশা হারাননি, পুড়ন করবে না মায়ের আশা!
নিঃশব্দতাই আমার সাধন মত, কারণ নিঃশব্দতা যে স্বয়ং আমার ও সবার জননী”।
মা, আমার কাছে এবার আমার পরমার্থ স্পষ্ট। আমি স্পষ্ট অনুভব করতে পারছি যে, আমার কর্ম কি হতে চলেছে। তাও আমি তোমার থেকে কিছু বিশেষ বিশেষ বিষয় জানতে চাইছি, যেইগুলির ক্ষেত্রে, আমি যেন ভুল না করি। তাই সেই বিষয়গুলি আমাকে আর একবার বলে দাও। করুণা করো মা। এবার তোমার কর্মে কনো প্রকার ত্রুটি রাখতে চাইনা আমি”।
