গুরু বিজ্ঞান (দর্শনলীলা)
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “বেশ তবে গুরুর ব্যাপারে তোমাকে বলছি শোনো। এক গুরুকে মা হয়ে উঠতে হয়। আর এক মায়ের সব থেকে প্রধান গুণ হলো তিনি হলেন শ্রেষ্ঠ পর্যবেক্ষক। পুত্রী, গুরু কখনোই ছাত্রছাত্রী বা শিষ্যশিষ্যার মধ্যে কনো গুণ স্থাপন করেন না, উপরন্তু তিনি শিষ্যের মধ্যে পূর্ব থেকে থাকা গুণসমূহকে প্রকাশিত করে তোলেন।
আর তার জন্য গুরুকে যা আবশ্যক ভাবে করতে হয়, তা হলো, তাঁকে অদূরে দাঁড়িয়ে থেকে তাঁর শিষ্যদের দেখতে হয়। ছাত্রছাত্রী যদি গুরুর উপস্থিতিকে নিরীক্ষণ করে নেন, তখন তাঁরা সংযত হয়ে ওঠে, আর এই সংযমের ফলে, তাঁদের অন্তরে স্থিত গুণ সুপ্ত হয়ে যায়, তা প্রকাশিত হতে পারেনা। তাই গুরুকে নেপথ্যে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের ছাত্রছাত্রীকে দেখতে হয়। সেখানে স্থিত থেকে যখন তিনি ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের মধ্যে মেলামেশা করতে দেখেন, তখন সেখান থেকে তাঁদের মধ্যে থাকা সুপ্তগুণসমূহদের দর্শন করতে সক্ষম হন। আর একবার তা দর্শন করে নিলে, গুরুর কর্তব্য হলো সেই সমস্ত সুপ্তগুণকে প্রকাশিত করে তোলা।
সেই গুণদের প্রকাশিত করার জন্য গুরু মায়ার আশ্রয় করতে পারেন, এবং প্রয়োজনে ছলেরও আশ্রয় নিতে পারেন। গুরু যখন শিষ্যের অন্তরে থাকা সুপ্ত গুনের প্রকাশের জন্য মায়ার রচনা করছেন বা ছলের রচনা করছেন, তাতে কনো দোষ নেই। গুরু হলেন মাতা, আর মাতা তাঁর সন্তানকে যেকোনো মূল্যে বিকশিত করবেন, এটিই মাতার গুণ এবং মাতার বৈশিষ্ট্য।
গুরু হবেন পবিত্র, অর্থাৎ কামনাবাসনা মুক্ত, ঠিক যেমন এক জননীকেও পবিত্র হতে হয়। যেই জননীর মধ্যে কামনা বাসনার প্রকাশ থাকে, তিনি কখনোই জননী হয়ে উঠতে পারেন না, কারণ সেই কামনা, যা একমুহূর্তে অন্যত্র স্থিত, তা অন্য সেই সন্তানের উপর প্রতিফলিত হয়ে ওঠে, আর তা সন্তানকে সম্পূর্ণ ভাবে অহংকারকেন্দ্রিক জীবনে স্থপিত করে দেয়। তাই এক মাতার আবশ্যক গুণ হলো, তিনি সম্পূর্ণ রূপে পবিত্র, অর্থাৎ সমস্ত কামনা বাসনার ঊর্ধ্বে তিনি স্থিতা।
আগেও বলেছি, মাতার কনো লিঙ্গ হয়না, বা কনো লিঙ্গ দেখে মাতা হন না। যিনি কেবলই দিতে চান, তিনিই মাতা, আর যিনি কিছু কামনা রেখে চলেন সর্বক্ষণ, তিনি অহংকারের ধারক বা পিতা হন। এক গুরুকে ঠিক একই ভাবে মাতা হতে হয়। তাঁর ধ্যানজ্ঞান হওয়া উচিত শিষ্যকে দিতে থাকা। তাঁকে উত্তম চরিত্র দিতে থাকা, তাঁকে হৃদয়ের সাথে পরিচিতি দিতে থাকা, তাঁকে প্রেমের যথার্থ পরিচয় দিতে থাকা, তাঁকে অহংকারের প্রকৃত পরিচয় প্রদান করতে থাকা, বা এক কথায় সমস্ত ভ্রমকে অপসারণ করে, সত্যপথকে শিষ্যের সম্মুখে উন্মোচন করাই এক গুরুর প্রকৃত পরিচয়।
গুরুর মুখনিঃসৃত প্রতিটি অক্ষর শিষ্যের কাছে ঈশ্বর-আদেশ। তাই গুরুর আদেশে প্রশ্ন করা শিষ্যশিষ্যার কাছে দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু এমন মুখ বুঝে আজ্ঞা পালন করার মত বিশ্বাস সকল শিষ্যের থাকবেনা, কারণ সকল শিষ্যের বিশ্বাস উচ্চস্তরের হবেনা। তাই গুরুর কর্তব্য হলো, যদি তিনি কনো আজ্ঞা প্রদান করেন, তবে সেই আজ্ঞাদানের যথার্থ কারণ, অন্তত শিষ্যকে যতটা বললে তিনি অবুভব করতে পারবেন সেই আদেশের মাহাত্ম কি, ততটা যেন অবশ্যই বলেন।
অর্থাৎ মধ্যা কথা, শিষ্যের মধ্যে যেন অন্ধত্ব কখনোই জন্ম না নেয়, তা গুরুরই দেখা কর্তব্য। আজ যদি শিষ্য সম্পূর্ণ ভাবে বিনাবিচারে গুরুর আদেশকে মান্যতা দেন, তবে তাঁর মধ্যেও এই অন্ধত্বই জন্ম নেবে, আর তাই পরবর্তীতে সেই শিষ্য প্রশ্ন করতে ভুলে যাবে, বিচার করতে ভুলে যাবে, আর রীতিরেওয়াজের মধ্যে, আচারবিচারের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে যাবে, যেমন করে ব্রাহ্মণ ও যন্ত্রবৈজ্ঞানিকদের প্রভাবে সংসারের হাল হয়েছে।
তা কখনোই কাম্য নয়, কারণ যথার্থ সংসার তখনই সম্ভব যখন সমস্ত জিনিসের, সমস্ত ব্যবস্থার, সমস্ত আয়োজনের সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা সকলের থাকা কাম্য। আর এই কাম্য ভাবের উদয় তখনই সম্ভব যখন এক ছাত্রের মধ্যে জিজ্ঞাসা স্থাপিত থাকবে। আর যতক্ষণ না সেই প্রশ্নকে উত্তর প্রদান করার প্রবণতা সমাজে প্রচলিত হবে, ততক্ষণ সেই প্রশ্নকরার মানসিকতার উদয় হবেনা সমাজে।
তাই এক গুরু যেন সর্বদা প্রশ্ন জাগ্রত করেন নিজের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে, আর সর্বদা সেই প্রশ্নের উত্তর প্রদান করেন। কনো কিছুর ক্ষেত্রেই যেন তিনি না বলেন যে, এটি আচার, এটি লোকাচার, এটি পুরাকাল থেকে চলে আসছে, তাই এমন করতেই হবে। যুক্তি ছাড়া যেই ব্যক্তি একটিও আচার আচরণ করেন, তা অন্ধবিশ্বাসের জন্ম দেয়, আর অন্ধবিশ্বাস জীবনকে এমন অবস্থায় নিয়ে চলে যায়, যেখান থেকে সত্যের পথে জীবন কখনোই উন্নীত হতে পারেনা, বরং সে ক্রমাগত পিশাচ স্তরের হয়ে যেতে থাকে, এবং অন্তে পিশাচই হয়ে যায়।
প্রয়োজন ও যুক্তি, এই দুই হলো সমস্ত আচরণের আধার। যিনি নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত কনো প্রকার আচরণ করেন না, কনো কর্মই করেন না, তিনিই নিজের প্রয়োজনকে সিদ্ধ করতে পারেন, অন্যরা ব্যর্থ হন নিজের প্রয়োজন সিদ্ধ করতে, এবং একসময়ে নিজের প্রয়োজন কি, কি প্রয়োজনে তিনি জীবিত রয়েছেন, তাই ভুলে গিয়ে, পিশাচ যোনির দিকে অগ্রসর হন।
তাই এক গুরুর প্রধান কর্ম হলো, ছাত্রছাত্রীদের দূর থেকে নিরীক্ষণ করে, তাঁদের গুণকে সুনির্দিষ্ট করা, এবং তা করার উপরান্তে তাঁদের গুণ অনুসারে তাঁদের মধ্যে প্রয়োজনের বোধ জাগ্রত করা, এবং সেই প্রয়োজনকে সিদ্ধ করার মার্গ তাঁর সম্মুখে প্রকাশিত করা। যদি এঁদের মধ্যে কারুর প্রয়োজন জগন্মাতাকে লাভ করা হয়, তবেই তাঁকে জীবনের মুখ্য জ্ঞান আস্বাদন করার দিকে প্রেরণ করতে হয়, অন্যদের সেই জ্ঞান প্রদান করতে নেই, কারণ সেই জ্ঞানকে ধারণ করার মত অবস্থায় জীবন তাঁদেরকে স্থপিত করে নি তখনও”।
দিব্যশ্রী বললেন, “এর অর্থ পিতা, আমি যদি ১০টি অনাথ শিশুকে নিয়ে আসি, এমন আবশ্যক নয় যে তাঁরা ১০ জনই সত্যের পথে পথচারী হবে? … হয়তো, তাঁদের মধ্যে ২-৩ জনই সেই পথে পথচারী হতে পারবে! বাকিদের নিয়ে কি করবো তখন?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “কেউ সমাজকে ধরে থাকেন কারণ তাঁরা সমাজের উদ্দেশ্য জানেন, আর জানেন বলে সমাজকে সেই উদ্দেশ্য থেকে অপসারিত হতে দেন না। কেউ কেউ সমাজের উদ্দেশ্য জানেন না, সম্মুখে যা কর্ম আসে, তাই করতে হয়, এমন মানেন, কিন্তু এটি তাঁরা অবশ্যই জানেন যে সেই পূর্বের ব্যক্তিত্বরাই সমাজকে ধারণ করে রয়েছেন, তাই তাঁদের স্থান শ্রেষ্ঠ। কেউ এত কিছুও জানেন না, কেবলই আজ্ঞা বাহন করতে জানেন, আর শ্রম করতে জানেন।
পুত্রী, গুরুর কাজ হলো নিজের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে এই তিনগুণকে প্রাথমিক ভাবে পর্যবেক্ষণ করা, আর তা করে, তাঁদেরকে সেই স্তরে উন্নীত করা, যেখানে প্রথম শ্রেণি অর্থাৎ সমাজের ধারককে শ্রেষ্ঠ মর্যাদা দেওয়া হবে, দ্বিতীয় শ্রেণি অর্থাৎ কর্মকাণ্ডকে সুচালিত করার ক্ষেত্রে দক্ষ ব্যক্তিত্বদের রাখা হবে, আর তাঁদের সম্মান থাকবে প্রথম শ্রেণির প্রতি। আর তৃতীয় অর্থাৎ শ্রমতৎপর ব্যক্তিত্বরা থাকবেন এই দ্বিতীয় শ্রেণির নেতৃত্বাধীন এবং মার্গদর্শনের আধিন।
পুত্রী, তেমনই ভাবে তোমার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তোমাকে প্রথমেই তাঁদের প্রকৃত জননীর সাথে আলাপ করাতে হবে। সেই আলাপ করার কালে, তিনরূপ মনোভাব দেখতে পাবে। একজনের ভাব হবে এই যে, সে তাঁর জননীকে সম্পূর্ণ ভাবে জানতে ব্যকুল, তাঁর কাছে সম্পূর্ণ ভাবে সমর্পণ করতে ব্যকুল। পুত্রী, এঁরা হলেন তোমার প্রথম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রী।
এরপরবর্তী একটি ছাত্রছাত্রী গোষ্ঠী পাবে, যারা তাঁদের জননীর চরণতলে উপনীত হয়ে একটি সুখী সুন্দর এবং কর্মব্যস্ত জীবনের কামনা রাখবে। পুত্রী এঁরা হলো তোমার দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রছাত্রী। এঁরাই তোমার নাট্যকর্ম করবে, এবং অভিনয়ও করবে। তবে এঁদের মধ্যে এই ভাবনা যেন প্রকট থাকে যে, তোমার প্রথমশ্রেণীর ছাত্রছাত্রীরাই সর্বোত্তম। এই ভাবের কারণে, তোমার এই সম্পূর্ণ আয়োজনের উদ্দেশ্য কখনোই নাট্য হবে না, বরং তা জগজ্জননীর কাছে সমর্পণ করাই হয়ে থাকবে।
আর তা করার জন্য, এমন নিয়মের স্থাপনই করবে যে, তোমার আয়োজনের অধ্যক্ষ এই প্রথমশ্রেণীর থেকেই হবে, কারণ তবেই ভবিষ্যতেও এই আয়োজন নিজের উদ্দেশ্যে অর্থাৎ জগজ্জননীর ক্রোড় ভরানোর উদ্দেশ্যেই ধাবিত থাকবে। তবে একই সঙ্গে, এই দ্বিতীয়শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের উন্নতির মুখকে বন্ধ করে দেবেনা কখনোই। অর্থাৎ, তাঁদের যেই বয়সে এই শ্রেণীবিভাগ করছো, হতেই পারে যে কারুর মধ্যে জননীর কাছে সমর্পণের ব্যকুলতা জন্ম নেয় নি, তবে পরবর্তীতে তা জাগতেই পারে।
তবে এর অর্থ এমনও নয় যে, এই দ্বার সর্বকালের জন্য উন্মোচিত থাকবে। বিবাহের পূর্বকাল পর্যন্তই এই দ্বার উন্মোচিত রাখা সম্ভব। পুত্রী, অঙ্গে কামনার গন্ধ লাগার পূর্বেই মাতার প্রতি প্রেম জন্ম নেওয়া সম্ভব। অঙ্গে কামনার গন্ধ লেগে গেলে, মাতার দিকে তাকালে, সেখানেও কামনার গন্ধই এসে যায়। তাই যেই ছাত্রছাত্রীর মধ্যে তাঁদের বিবাহের পূর্বে মাতার প্রতি প্রেম জন্ম নেবে, তাঁরাই এই প্রথম শ্রেণীতে প্রবেশের অধিকার লাভ করবে। কিন্তু একবার বিবাহ হয়ে গেলে, কামনার গন্ধ পঞ্চভূতে লেগে গেলে, আর সেই পঞ্চভূত তনু মাতার প্রেমকে অনুধাবনের সামর্থ্য রাখেনা, কারণ সেই প্রেমও তখন অপবিত্র হয়ে যায়।
তাই সকল ছাত্রছাত্রীর জন্য এই প্রথমশ্রেণীতে প্রবেশের দ্বার উন্মোচিত রাখবে, তাঁর বিবাহের পূর্বক্ষণ পর্যন্ত। হতেও পারে, কারুর মধ্যে তাঁর ২০ বছর বয়সে, মাতার প্রেমের প্রতি দৃষ্টি গেল, আর সে মাতার কাছে সমর্পণ করতে ব্যকুল হলো। তাই সেই পথ বন্ধ করবেনা”।
দিব্যশ্রী বললেন, “পিতা, তৃতীয় শ্রেণীতে যাবার পূর্বে, আমার এই জিজ্ঞাসা শান্ত করুন। বিবাহের সাথে সাথে কামনার গন্ধের কথা যা বললেন, তা বিস্তারে বলুন আমাকে”।
ব্রহ্মসনাতন বললেন, “পুত্রী, বিবাহ হল কামনার আঁতুড়ঘর। যেই ব্যক্তির হৃদয় বিবাহ পূর্বে জন্ম নেয়না, যার মধ্যে বিচার ও বিবেক বিবাহপূর্বে জন্ম নিতে পারেনা, বিবাহ তাঁকে কামনার মধ্যে টেনেই নেয়, আর একবার কামনার আঁচে দগ্ধ হয়ে গেলে, পঞ্চভূতের আঁটুনি এমনই পোক্ত হয়ে যায়, যে তাতে আর প্রেম জন্ম নিতে পারেনা, সে মোহগ্রস্ত হয়ে যায়।
হ্যাঁ, যার বিবাহের পূর্বেই সেই প্রেমবৃক্ষ জন্ম নিয়ে নিয়েছে, হৃদয় প্রকাশিত হয়েছে, এবং বিচার বিবেক তাতে মহীরুহ হয়ে গেছে, বিবাহ করলেও সে কামনার অধীনে স্থিত হয়না। কামনা তাঁর পঞ্চভূতকে ছুতেও পারেনা, আর তাই কামনা মুহূর্তের মধ্যেই লয় হয়ে যায় তাঁর মধ্যে। তাই বিবাহ পর্যন্ত সকল শ্রেণীর জন্যই এই প্রথমশ্রেণীর দ্বার উন্মোচিত রাখবে।
তবে দ্বার উন্মোচিত রাখার অর্থ এই কখনোই নয় যে, এটি মন্দিরের দ্বার হবে, অর্থাৎ যে খুশী সেখানে চলে যেতে পারবে, আবার যখন খুশী চলেও আস্তে পারবে। যিনি নিজের সমস্ত ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনা জগজ্জননীর কাছে অর্পণ করতে ব্যস্ত, যিনি জগজ্জননীকে সম্যক ভাবে জেনে, তাঁর কাছে সমর্পণ করতে ব্যস্ত, তাঁরই প্রবেশ অবাধ হবে এই শ্রেণীতে, তবেই এই শ্রেণী সুদ্ধ থাকবে, আর স্মরণ রাখবে, তোমার সম্যক আয়োজনে, যতক্ষণ এই শ্রেণী সুদ্ধ থাকবে, ততক্ষণই তোমার আয়োজন নিজের পরমার্থে অঢিক থাকবে। যেই ক্ষণে এই প্রথমশ্রেণীতে তেমন ব্যক্তি প্রবেশ করবেন যিনি কামনাজর্জরিত, বা যিনি জগজ্জননীকে ব্যকুলভাবে জানতে অনাগ্রহী, বা যিনি নিজের ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনাকে জগজ্জননীর কাছে অর্পণ করতে নারাজ, জানবে সেই দিনই হবে তোমার এই আয়োজনের মহাসমাপ্তি।
এবার তৃতীয় শ্রেণীর কথা বলি। এঁরা শ্রমজীবী। শ্রম না করতে পারলে, এঁরা জীবন অতিবাহিতই করছেন না, এমন মনে হয় এঁদের। তাই এঁরা কৃষিকর্ম করবে। বিবাহপূর্ব পর্যন্ত এঁদের জন্যও প্রথমশ্রেণীর দ্বার উন্মুক্ত রাখবে। আর এটি সর্বক্ষণ স্মরণ রাখবে যে, তোমার আয়োজনকে সুব্যবস্থিত রাখতে, এই তিনশ্রেণী যেন কখনোই অন্য শ্রেণীকে নিকৃষ্ট নজরে না দেখেন। প্রথমশ্রেণী তোমার আয়োজনকে কালজয়ী করবে, তো দ্বিতীয়শ্রেণী তোমার সম্পূর্ণ আয়োজনকে সমাজের বক্ষে স্থিত রাখবে, নিজের আয় এবং গুণ দ্বারা। আর তৃতীয়শ্রেণীর কারণেই, প্রথম দুই শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীরা আহার লাভ করবে। তাই উপকারিতা সকলেরই সমান এই সমস্ত আয়োজনে”।
দিব্যশ্রী বললেন, “আরো কিছু বলুন এই আয়োজনের ব্যাপারে। আরো অনেক কিছু আমার জানার আছে, কিন্তু আমার ধারণাও নেই যে কি জানার আছে। তাই আমি আপনাকে নির্দিষ্ট ভাবে প্রশ্ন করতে পারছিনা। কিন্তু আপনি যা কিছু বলছেন, সেই সমস্ত কিছু আমাকে আমার কর্ম করাতে সহায়তা করবে, আমি তা বেশ বুঝতে পারছি। তাই আরো কিছু বলুন পিতা এই আয়োজনের ব্যাপারে”।
ব্রহ্মসনাতন হাস্যমুখে বললেন, “পুত্রী, যেকোনো মৌলিক শিক্ষাই একটি শিশুকে দিয়ে শুরু করতে হয়। কারণ শিশু যখন বড় হয়ে ওঠে, তখন তাঁর একটি বিশিষ্ট মৌলিক গঠন নির্মিত হয়ে যায়, বা বলতে পারো একটি ছাঁচের নির্মাণ হয়ে যায়, তাই সেই ছাঁচকে পালটানো সম্ভব হয়না। সেই মৌলিক শিক্ষা অহংকার গঠনের শিক্ষাই হোক, সঙ্গীত সাধনার শিক্ষাই হোক, বা আধ্যাত্ম সাধনার শিক্ষাই হোক।
পুত্রী, যিনি শিশুকালে সঙ্গীত ধারণ করে ফেলেছেন, তাঁর হৃদয়ের মধ্যে সুর, তাল, লয় বাসা বেঁধে ফেলে, আর তাই সেই সঙ্গীতের অন্য রূপক তাঁকে তাঁর বড় বয়সেও প্রদান করা যেতে পারে। কিন্তু যার মধ্যে সুর, তাল বা লয় স্থাপিত হয়নি আর সে মৌলিক গঠন লাভ করে ফেলেছে, অর্থাৎ যৌবনে পদার্পণ করে ফেলেছে, তখন তাঁকে আধুনিক সঙ্গীত, বা কিছু পশ্চিমদেশের যন্ত্র সঙ্গীত প্রদান করা যেতে পারে, কিন্তু উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত বা উচ্চাঙ্গ কলা আর সে ধারণ করতে পারেনা।
তেমনই পুত্রী, যার অহংকারের গঠন হয়নি এবং যৌবনে পদার্পণ করে ফেলেছে সে, তাঁর আর কিছুতেই অহংকার গঠন সম্ভব হয়না। উদাহরণ স্বরূপ মানসিকভাবে বিকলঙ্গ ব্যক্তিদের দেখে নাও। তাঁদের পঞ্চভূত বিকলঙ্গ হবার কারণে, তাঁদের মধ্যে অহংকার বাসা বাঁধতে পারেনি। তা তুমি তাঁকে যতই যৌবনে বিবাহদান করো, তাঁর মধ্যে অহংকার বাসা বাঁধতে পারবেনা, আর সে তাই তখনও শিশুর মতই সরল ও সহজ থেকে যাবে।
ঠিক তেমনই ভাবে আধ্যাত্মসাধনা হলো অহংকারের থেকে মুক্তির মার্গ। অহংকার অর্থাৎ ‘আমি’ বোধ থেকে মুক্তির উপায় এই সাধনা, আর এই ‘আমি’ সমস্ত ভ্রমের কারণ। সেই ‘আমি’ই এই ভৌতিক ব্রহ্মাণ্ডের ভ্রম করে, লক্ষ লক্ষ ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনা করে করে, সহস্র আবেগ, সহস্র ভেদাভেদ নির্মাণ করে, তা দিয়েই নিজের মৌলিক গঠন নির্মাণ করা শুরু করে।
তাই পুত্রী, একবার যদি কারুর মৌলিক গঠন নির্মিত হয়ে যায়, অর্থাৎ একবার যদি কারুর ‘আমি’র ত্রিগুণ, পঞ্চভূত, আবেগ, মোহপাশ, ইন্দ্রিয়দের প্রতি বিশ্বাস, ইচ্ছা-চিন্তা-কল্পনা, এবং যন্ত্র-মন্ত্র নির্ভরতা তাঁর মধ্যে বাসা বেঁধে ফেলে, আর সেই ‘আমি’কে নাশ করা সম্ভব নয়। হ্যাঁ, তাঁর ‘আমি’কে বেঁধে দেওয়া সম্ভব যাতে তা অসংযত না হয়ে যেতে পারে, কিন্তু সেই ‘আমি’র নাশ অসম্ভব।
পুত্রী, এই মৌলিক গঠনের আঁট মজবুত হতে শুরু করে, যখন একটি মানব শিশুর বয়স ৮ থেকে ঊর্ধ্বসীমার দিকে যাত্রা করে। তাই তোমার শিক্ষাপদ্ধতি শিশুর ৮ বছর বয়সের মধ্যে শুরু হতে হবে। হ্যাঁ, এমন হতেই পারে যে তুমি কারুর সম্মুখে এলে যখন, তখন তাঁর বয়স ১২-১৩ বা অধিক, কিন্তু তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিক চেতনা প্রসার অর্থাৎ আমি’র থেকে মুক্ত হবার আশ পূর্বেই জন্মে গেছে। সেইক্ষেত্রে কনো অসুবিধা নেই। কিন্তু যদি কারুর বয়স ৮ হয়ে গেছে, অথচ তাঁর মধ্যে ‘আমি’র থেকে গুরুত্বপূর্ণ আর কিচ্ছু নেই, তখন তোমাকে কঠিন হতে হবে।
অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে তাঁর সাথে ব্যবহার না করলে, সম্ভব হবেনা তাঁর মধ্যে ‘আমি’র নেশা ত্যাগ। আর যদি সেই বয়সটা ৮ না হয়ে, ১২ হয়, আর তখনও তাঁর মধ্যে ‘আমি’ই সমস্ত কিছু হয়ে যায়, তাহলে তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিক চেতনা প্রদানের প্রয়াস অযথা সময়নষ্ট। হ্যাঁ, তাঁর ‘আমি’কে সংযত করা যেতে পারে, কিন্তু ‘আমি’র নাশ করে, সে কখনোই সত্যের সম্মুখীন হতে পারবেনা। কেন পারবেনা?
কারণ ১২ বছর বয়স হয়ে গেছে, অথচ ‘আমি’তে অর্থাৎ অহং নিয়ে উলমালা মানে, তাঁর মধ্যে ইচ্ছা, চিন্তা, কল্পনা নিজেদের শেকড় গজিয়ে বেশ গভীর পর্যন্ত চলে গেছে। একই ভাবে, মোহ, লোভ, ভয়, ঘৃণা, ইত্যাদি আবেগ সমূহ তাঁকে নিজেদের গ্রাস করে নিতে শুরু করে দিয়েছে। তাই আর কিছুই করা সম্ভব নয়। সেই কারণে পুত্রী, তোমাকে অনাথ শিশুদের কথা বললাম, কারণ তাঁরা অসহায়, দিশাহিন, এবং শিশু।
তাঁদেরকে সমাজ অহংকারের শিক্ষা প্রদান করতেও ইচ্ছা দেখায়নি, কারণ তাঁদের কনো অবিভাবক নেই। তাই যদি অহংকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার জন্য সেনানির্মাণ করতে চাও, তবে এই শিশুদের থেকে অধিক শ্রেয় সেনালাভ সম্ভবই নয়। এঁরা নিস্পাপ, নিষ্কলঙ্ক, অবিভাবকহীন স্বতন্ত্র তারা, এবং এঁরা সম্পূর্ণ ভাবে কামনা-বাসনা মুক্ত। তাই এঁদের থেকে শ্রেয় কারুকেই পাবেনা, যারা সমস্ত ভৌতিক বন্ধন থেকে মুক্ত, আর যারা সহজেই তাঁদের জন্মজন্মের জননীর সাখ্যাতকার করার জন্য উপযুক্ত”।
দিব্যশ্রী বললেন, “তাঁদের না নিয়ে এলাম, কিন্তু তাঁদেরকে শিক্ষিত কি ভাবে করবো পিতা? কি ভাবে তাঁদের যথার্থের সাথে পরিচিত করবো?”
ব্রহ্মসনাতন হাস্যমুখে বললেন, “যথার্থের কথা বলে। পুত্রী, তুমিই তাঁদের জননী। আর জননীর প্রতিটি উচ্চারণ সন্তানের কাছে ব্রহ্মবাক্য এমনিই হয়, তাঁদেরকে তা শিখিয়ে দিতে হয়না, তাঁরা এমনিই জননীর বাক্যকে ব্রহ্মবাক্য মানে। তাই, প্রথমে তাঁদের অক্ষরজ্ঞান প্রদান করবে। তারপর তাঁদেরকে সঙ্গীতের সাথে আলাপ করাবে। আর তারপরে, তাঁদেরকে কলাবিভাগের সমস্ত বিষয় সম্বন্ধে শেখাবে, আর সঙ্গে গণিতও।
আর এই সমস্ত কিছুর শিক্ষা দেবার কালে, মাঝখান থেকে শুরু করবেনা, অর্থাৎ ভূগোল পড়ানোর ক্ষেত্রে, পৃথিবী প্রথমে একটি অগ্নিপিণ্ড ছিল, সেখান থেকে শুরু করবেনা, শুরু করবে, যখন কিচ্ছু ছিল না, তখন শূন্য ছিল, সেখান থেকে। সেই শূন্যের থেকে আত্মরা নিজেদের রচনা করে স্বয়ম্ভু হলো, তারা ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার রচনা করে, ত্রিগুণ হলো, আর সেই ছায়াদেবীদের সাথে সঙ্গমে, তাঁরা পঞ্চভূত নির্মাণ করলো, এখান থেকে শুরু করবে।
সেই পঞ্চভূতের দ্বারা বিভিন্ন বস্তুর কল্পনা করা শুরু করলো নিজেদের বিশেষত্বকে স্থাপন করতে, আর সেই স্থাপনার মধ্যে অন্যতম স্থাপনা হলো পৃথিবী। পুত্রী, ভূগোলের, ইতিহাসের, গণিতের সমস্ত কিছুর প্রকৃত শুরু এই ভাবেই হয়, আর তাই করবে। তাহলেই দেখবে, তাঁদের কাছে উৎসের সন্ধান প্রথম থেকেই থাকবে। যেই শূন্যকে আত্মরা নিয়তি আখ্যা দেয়, আর সেই নিয়তিই হলো তাঁদের সকলের প্রকৃত জননী, সেই বোধ তাঁদেরকে তাঁদের জননীর প্রতি আকর্ষিত করবেই।
পুত্রী, আসল সত্য এই যে প্রতিটি মানুষেরই সামর্থ্য আছে সত্যকে জানার, এবং তাঁর কাছে সমর্পণ করার। কিন্তু তাঁদেরকে অহংকারের শিক্ষা প্রদান করা হয় বলেই তাঁরা অহংকার অর্থাৎ আমিত্বকে ধারণ করে, নিজেদের মৌলিক গঠনকেই আমিত্বদ্বারা ভূষিত করে নেয়। তাই সহজাত ভাবেই তাঁদেরকে আমিত্ব মুক্তির শিক্ষা প্রদান করলেই, তাঁরা সেই শূন্যের প্রতি, সেই যথার্থের প্রতি আকর্ষিত হবে।
আর যেমন যেমন সেই আকর্ষণ বৃদ্ধি পাবে, তেমন তেমন তাঁদের সেই আকর্ষণকে বৈরাগ্য ও প্রেম দ্বারা সুসজ্জিত করে দেবে, যাতে তা সহজ ভাবেই যথার্থমুখী হয়ে ওঠে, আর তাঁরা সাধক হয়ে ওঠে। পুত্রী, তন্ত্র সর্বাধিক কঠিন সাধনমত। কিন্তু যদি এক শিশুকে সাধনের পথে চালান হয়, তবে তন্ত্রের ন্যায় কঠিন ধারার আবশ্যকতাও থাকেনা। তাই সহজ ভাবে সাধক নির্মাণ করো, এবং তাঁদেরকে ক্রমশ সাধনার পাশাপাশি, এও বোঝাও যে তাঁরা কল্পনার মধ্যেই স্থিত, তাই তাঁদেরকে সেই কল্পনার থেকে মুক্ত হতেই হবে।
তবে তার থেকেও অধিক আবশ্যক এই যে, তাঁদের জননীর সন্তান কেবলমাত্র তাঁরা নন। জগতের প্রতিটি জীবই তাঁদের জননীর সন্তান, অর্থাৎ সকলেই তাঁদের ভ্রাতা ও ভগিনী। তাই তাঁদেরকেও তাঁদের জননীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া তাঁদের কর্ম ও কর্তব্য। পুত্রী, এবার তাঁদের সম্মুখে দুটি পথ স্থাপিত করো। হয় তাঁরা তাঁদের ভ্রাতা ও ভগিনীদের তাঁদের জননীর সাথে আলাপ করার জন্য বিবাহ করে, সংসার স্থাপন করে, তাঁদের বংশধরদের দ্বারা করতে পারে, নয় তাঁদের ন্যায়ই বহু অনাথ সন্তান রয়েছে জগতে। সেই সমস্ত অনাথদেরকে নিজেদের জননীর সন্তান, অর্থাৎ নিজেদের ভ্রাতাভগিনীজ্ঞানে পালন করে, ঠিক তুমি যেমন করে তাঁদেরকে পালন করেছ, তেমন করেই পালন করতে পারে।
আর সাথে সাথে, এও বোঝাও যে, তাঁরা যাই করুক, নিজেদের চরণ এই কাল্পনিক জগতেই স্থাপিত রাখতে হবে। তাই প্রয়োজন আহারের, আর প্রয়োজন ন্যুন্যতম ধনের। সেই ধন তাঁরা নাট্যদ্বারা, এবং খাদ্য তাঁরা কৃষি কর্মদ্বারা লাভ করতে পারে, এবং নিজেদের জননীর ক্রোড় পূর্ণ করার কর্মে নিযুক্ত থাকতে পারে। … এই তো শিক্ষাদান পুত্রী, এছাড়া আর অন্য কি করার আছে?
শূন্য থেকে ইতিহাস, শূন্য থেকে ভূগোল, শূন্য থেকে গণিত যেমন যেমন শিখবে তাঁরা, অতঃপরে, তাঁদের সমুখে আসবে কৃতান্ত, আর আসবে মনঃসংযোগ তথা ধ্যানের উপায়, আর এঁদেরই সাথে সাথ থাকবে, তাঁদের জননী, মাতা সর্বাম্বার উপস্থাপনা, যিনি হবেন তাঁদের পরমাত্মীয়া। … আর কিছু কি প্রয়োজন পুত্রী?”
দিব্যশ্রী হেসে বললেন, “বুঝে গেছি পিতা। একটি সময়ের জন্যও কল্পনাকে সত্য রূপে স্থাপন করা হবেনা তাঁদের সামনে। সত্যই স্থাপিত থাকবে, আর কল্পনা সেই সত্যকে খণ্ডন করতে সদাব্যস্ত, তাই সেই কল্পনাকে দূর করার উপায় সন্ধান করবে তাঁরা, আর সেই উপায় তাঁরা তাঁদের জননী, তাঁদের অধ্যক্ষের থেকে লাভ করে উর্বর হয়ে উঠবে। … বেশ অনুভব করেছি পিতা। আর কিছুকি আমার এই বিষয়ে জানা আবশ্যক। যদি তেমন কিছু থাকে, যা কর্ম করতে করতে নয়, কর্ম করার পূর্বে জানা আবশ্যক, তবে তা কৃপা করে ব্যক্ত করুন আমাকে, যাতে আমি আমার পরমার্থে স্থাপিত হত পারি”।
দিব্যশ্রী আবার থেমে গিয়ে বললেন, “কিন্তু পিতা, যদি সমাজে এই অহংকারের আরাধনাকেই প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো? যদি প্রতিবাদ স্থাপন করা যেত? যদি বিরোধিতা করা যেত এই অহংকারের প্রশিক্ষণকে? তাই না! মানে, আমার কথা এই যে, যদি একটি সুন্দর করে যোজনা করা যেত?”
ব্রহ্মসনাতন মিষ্ট হেসে বললেন, “এটা তুমি বলছো, না তোমার অহংকার?… না আসলে, অহংকারই এমন কথা বলে থাকে। তার তো নিজের উপর বিস্তর বিশ্বাস, তাই সে এমন ধারণা করে যে সে যোজনা না করলে, কর্ম কি করে সম্পন্ন হবে”।
দিব্যশ্রী বললেন, “আমি আপনাকে দেখেছি, আর কারুকে এমন দেখিনি যে তাঁর কনো প্রকার যোজনা থাকেনা। সকলের কিছু না কিছু যোজনা থাকে, আর সেই যোজনা অনুসারে কর্ম করে সে”।
ব্রহ্মসনাতন বক্র ওষ্ঠে হাস্য প্রদান করে বললেন, “আর সেই যোজনা কতটা সার্থক হয়?”
দিব্যশ্রী হিসাব করে বললেন, “প্রায়শই সফল হয়না। ব্যর্থই হয়, তখন আবার যোজনা করা হয়। কেউ কেউ আবার এমন ব্যর্থতা দেখে দেখে, বুদ্ধিমান হয়ে গেছেন, তাই তিনি একটি যোজনার মধ্যে অনেক যোজনা স্থাপন করে রেখে দেন। এটি না হলে ওটি, সেটি না হলে অন্য একটি, এই রকম। সাফল্যের হার তাঁরই বেশি হয়, তবে …”
ব্রহ্মসনাতন আবার একই প্রকার হাস্য প্রদান করে বললেন, “তবে, যেই উদ্দেশ্যে তিনি যোজনা করেন, আর যেই উদ্দেশ্য তিনি লাভ করেন, তা প্রায় কখনোই এক হয়না, ভিন্ন হয়ে যায়”।
ব্রহ্মসনাতন আবারও কেবল মুচকি হাসলে, দিব্যশ্রী বললেন, “কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে আমি একটি ব্যতিক্রমী ব্যাপার দেখেছি। আপনার কনো যোজনাই থাকেনা। আপনাকে দেখে আমার মনে হয় যেন, আপনি নিজে কনো যোজনা করেনই না! আপনি যেন অন্য কারুর যোজনা অনুসারে চলেন। আর তাই আপনি জানেনও না যে সেই যোজনা অনুসারে চললে কি ফল লাভ হবে। তবে আমি দেখি আপনাকে অত্যন্ত আনন্দিত হতে, যখন আপনি ফল লাভ করেন।
আমি তা দেখে অত্যন্ত বিস্মিতও হই। ভাবি যে, আপনি কনো যোজনা করলেন না, তাই কি ফল লাভ করবেন বা করতে চান, তাও আপনি জানেন না। কিন্তু এই সমস্ত কিছুর পরেও, আপনি তেমন ফল কি করে লাভ করেন, যা আনন্দদায়ক! … হিসাব মেলেনা!
হ্যাঁ পিতা, আমি দেখেছি আপনাকে। অত্যন্ত নিরপেক্ষ ভাবে দেখেছি, আর অবাক হয়েছি। একবার নয় বারবার দেখেছি। আপনি নিজের কর্মসূচি নিয়ে কনো যোজনা করেন না। আর অন্যদের ক্ষেত্রেও কনো যোজনা করে দেন না, যেন অন্যত্র থেকে সেই যোজনা দেখে বলে দেন আপনি, আর তা প্রতিটি ক্ষেত্রে অব্যর্থ হয়, আমি দেখেছি। আমাকেও আপনি বিনা যোজনা করে, একটি যোজনা বলে দিলেন, আমি জানি তা অব্যর্থ হবে, আর কেবল তাই নয়, আমি দেখেছি, তা যেন আপনাআপনি তাঁর সামনে হতে থাকে। তাঁকে কেবলই সেই সমস্ত ঘটমান চক্রে ভাগ নিতে হয়, বাকি সমস্ত কিছু এমনি এমনিই হয়।
যেই মুহূর্তে সে নিজের বুদ্ধি খাটায় বা নিজের কনো আবেগ জুরে দেয়, সঙ্গে সঙ্গে তা বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়, আর সে সম্পূর্ণ ভাবে খেই হারিয়ে ফেলে। এই সমস্ত কিছুর রহস্য কি? কেন এমন হয়? কেন আপনি আনন্দ পান ফলে, কেন সকলের ক্ষেত্রে সেই যোজনা সঠিক সঠিক লেগে যায়, আর কেন তা যোজনা না হয়েও যোজনা! … মানে আমার কথা এই যে, আলাদা করে কিচ্ছু করতে হয়না। কনো সমাবেশ করতে হয়না, কনো সমাবর্তন করতে হয়না, কনো কিচ্ছু করতে হয়না, কিন্তু তাও যেমন যেমন আপনি বলেছেন তাঁকে, ঠিক তেমন তেমন তাঁর সম্মুখে ঘটনা আপনাআপনি প্রস্তুত হতে থাকে! এটা কি করে হয়?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “তুমি কি অনাথ? নাকি আমি অনাথ? কে অনাথ এই জগতসংসারে যে তার আকাল পড়ে গেছে যে তাকে যোজনা করতে হবে নাহলে সে অথৈ সাগরে পড়ে যাবে! … পুত্রী, আমাদের সকলের জননী আছেন। আর আমাদের জন্য যোজনা তিনি আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছেন। আমাদের মা থাকতে আমরা কেন যোজনা করতে যাবো! কি প্রয়োজন আমাদের যোজনা করার!
আমি কনো যোজনা করিনা পুত্রী। ঠিকই বলেছ, আমি কেবলই আমার আরাধ্যা, আমার স্বরূপ, আমার জন্য যেই যোজনা করে রেখে দিয়েছেন, সেই পথে চলতে থাকি। শেষে কি ফল আমার জন্য রাখা আছে, জানিও না, জানতে চাইওনা। কেবল এটুকু জানি যে, তিনি আমার মা। আমার নিজের মা। আর তাই আমার জন্য তিনি যেই ফলই রাখবেন, তা আমার হিতকরই হবে। ব্যাস, আর কিছু জানার প্রয়োজনই নেই।
আর অন্যদের কি যোজনা বলি? যেই যোজনা তিনি তাঁর জন্য করে রেখেছেন, সেই যোজনাই বলি। আমার বুদ্ধি কোথায় পুত্রী যে আমি যোজনা করবো? আমার মায়ের নির্মিত যোজনাতে আমি চলি, আর তাঁরই যোজনা তোমাদের বলি। … তাই অহংকারের বলো বা আত্মের বলো, তাঁর নির্মাণ করা যোজনাকে আমি বিশ্বাস করিনা, কারণ যার অস্তিত্বই এক মায়া, তার যোজনাতে বিশ্বাস করবো কি করে? তাঁর যোজনাতে বিশ্বাস করে নিজের কর্তাভাবকে জাগ্রত করি আর কি!
পুত্রী, তাঁর যোজনাতে চলো, নিজের যোজনাতে নয়। … আর কি বলছিলে প্রতিবাদ! কার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ? কে সে, যার বিরুদ্ধে তুমি প্রতিবাদ করবে? আর কে তুমি যে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে? (মিষ্ট হেসে) যা সে, তাই তো তুমি! সে অহংকার, সেও আত্ম, আর তুমিও অহংকার, তুমিও আত্ম। সে না অজ্ঞানী, তাই ভেবে মরছে যে তুমি আত্ম আর সে আত্ম পৃথক। কিন্তু তুমি তো জ্ঞানী! তাই তুমি তো জানো যে সেও ব্রহ্ম আর তুমিও ব্রহ্ম, আর ব্রহ্মের কনো ভেদ সম্ভবই নয়। তাই তুমিও যা, সেও তাই।
তাহলে কার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে পুত্রী? নিজের বিরুদ্ধে নিজে প্রতিবাদ করবে! … মনে হচ্ছেনা, এ নেহাতই কালক্ষয়! নিজের বিরুদ্ধে নিজের প্রতিবাদ করে সময় নষ্ট করা কেন? সেই সময়ে তো যেই দাবি তুমি করছো, সেই দাবি তুমি না প্রকাশ করে, সেই দাবিকে বাস্তবে রূপান্তর করে দিতে পারো? … স্মরণ করো নেতাজি সুভাস বসু কি করেছিলেন? তাঁর আদর্শ কি ছিল? এই ছিল না যে, এই দেশ আমার দেশ, আমাদের দেশ। কেউ এতে অধিকার স্থাপন করে আছে, সেটা তার ভ্রম। এটা আমাদের দেশ। তাই এতে আমরাই শাসক। যদি কারুর আপত্তি থাকে তাতে, সে প্রতিবাদ করবে, আমরা করবো না। আমরা তো শাসন করবো। নিজেদের অঙ্গিকার স্থাপন করবো, আর শাসন করবো।
একই তো কথা পুত্রী। এই কল্পব্রহ্মাণ্ড তোমার। তাই এতে কি করবে, আর কি করবেনা, তার জন্য কারুর কাছে দাবি কেন করবে? সরাসরি তা স্থাপন করবে, আর তা স্থাপন করা তোমার অধিকার জেনেই তা করবে। … নিজের কাছে নিজেই দাবি করে কালক্ষয় কেন? সেই কালক্ষয়ের কালে, নিয়তি তোমার সম্মুখে যা দাবি রেখেছেন, তা পুড়ন করো। স্থাপন করো তোমার আয়োজন, আর শুরু করে দাও অহংকার নাশের মহাযজ্ঞ। কারুর অনুমতি কেন প্রয়োজন তোমার?
যিনি সত্য, যিনি সাখ্যাত নিয়তি, যিনি সমস্ত অহংকারের কাছে অজেয়, যিনি সমস্ত অহংকারের জননী, তিনি তোমাকে সেই মার্গ দেখিয়েছেন। তাই নতুন করে যোজনার প্রয়োজন কি পুত্রী! সরাসরি সেই যোজনাকে স্থাপন করো। কেন বৃথা যুদ্ধের কামনা করছো অহংকারের সাথে? কে অহংকার? একটি ভ্রম ব্যতীত কিছু কে সে? সে তো কেবলই একটি মহাভ্রম যে ব্রহ্মের অতিরিক্তও কিছু সম্ভব, আর তা সে। তাই যা একটি ভ্রম, যা যথার্থই নয়, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অর্থ কি?
সেই যুদ্ধ করতে চেয়ে, কি প্রমাণ করতে চাইছো? এই প্রমাণ করতে চাইছো যে আত্ম আসলে ভ্রম নয়, সত্য? হ্যাঁ সে সত্য, আর তখনই সত্য যখন সে নিজের ভ্রমকে নিজের পৃথক অস্তিত্বের আমিত্বকে ত্যাগ করে ব্রহ্মে লীন হয়ে যায়, তার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত সে ততটাই মিথ্যা, যতটা তার করা কল্পনাগুলি মিথ্যা। তাই মিথ্যার সাথে যুদ্ধ কেন পুত্রী? কেন মিথ্যার সাথে যুদ্ধ করার প্রয়াস করে, মিথ্যাকে গুরুত্বপ্রদান? পুত্রী, গুরুত্ব তো কেবলই সত্য পেতে পারে, মিথ্যা কি পেতে পারে?
যদি তা নাই পারে, তবে মিথ্যার সাথে যুদ্ধ করতে চেয়ে, তাকে গুরুত্ব প্রদান করছো কেন? সরাসরি তার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করো পুত্রী, কারণ সে যতই গলা ফাটিয়ে ফাটিয়ে দাবি করুক, সেই গলাফাটানোর কারণে সে সত্য হয়ে যাবেনা। সে মিথ্যা ছিল, সে মিথ্যা আছে, আর যতকাল নিজেকে আত্ম বলে ঘোষণা করবে, ততকাল মিথ্যাই থাকবে। যখন সে এই আত্ম হুংকার ত্যাগ করে, ব্রহ্মে, শূন্যে, যথার্থে লীন হয়ে যাবে, তখন সে ততটাই সত্য হয়ে যাবে, যতটা স্বয়ং শূন্য সত্য।
তাই সত্যের পথে চলো, মিথ্যার সাথে যুদ্ধ করার প্রয়াস করে, মিথ্যাকে আর প্রশ্রয় দিওনা, ইতিমধ্যেই অনেক প্রশ্রয় দিয়ে ফেলেছ তাকে। আর দিওনা। এবার কেবলই সত্যের স্থাপনা করো। আনো সেই অসহায় শিশুদের আর প্রমাণ করে দাও তাদের কাছে যে না তো তারা কনোকালে অসহায় ছিল, আর না কারুর পক্সে অসহায় হওয়া সম্ভব। প্রমাণ করে দাও তাদেরকে যে না তো জগতে কেউ অনাথ ছিল, আর না জগতে কেউ কনোকালে অনাথ হতে পারে, কারণ আমাদের সকলের মা রয়েছেন।
তিনি থাকতে আমরা কেউ কনোকালে অনাথ হতেই পারিনা। … পিতার বীর্য আমাদের এই দেহমূর্তির মৃত্তিকা, আর মাতার গর্ভ আমাদের এই দেহমূর্তি নির্মাণের নাটমন্দির। না তো ঈশ্বর মৃত্তিকাতে সীমাবদ্ধ, আর না নাটমন্দিরে। তিনি তো সর্বত্রস্থিতা, মূর্তি তো তাঁর কেবলই এক অনন্য প্রকাশ মাত্র। আমরা তো এই দেহে সীমাবদ্ধ কখনই নই, কভু ছিলাম না, আর কভু হওয়া সম্ভবই নয়। … তাই এই মূর্তি নির্মাণের মৃত্তিকা বা নাটমন্দির আমাদের এই মূর্তির জনকজননী, আমাদের জননী নন।
আমাদের জনক হলেন আমাদের অহংকার, যার জন্য আমাদের এই ভ্রমিত ভিন্নতাপূর্ণ রূপ। আর আমাদের জননী হলেন সাখ্যাত নিয়তি, যিনি স্বয়ং ব্রহ্ম, কেবলই আমাদের আত্মের সক্রিয়তার নিরিখেই ব্রহ্মময়ী, কারণ তিনিই যথার্থ, আর সেই যথার্থকে যথার্থ না মেনে, তাঁর থেকে পৃথক হবার ভ্রম করেই আমরা অস্তিত্বমান। তাই তিনিই আমাদের জননী, কারণ তাঁর থেকে পৃথক হয়েই আমরা এই আত্ম। আর তিনি থাকতে, আমরা অনাথ কি করে হতে পারি!
প্রমাণ করে দাও তাঁর অস্তিত্ব পুত্রী। শূন্যে স্থিত করে দাও সেই শিশুদের, আর আগামীদিনের সমস্ত অনাথ শিশুদের। এমন হিল্লোল তুলে দাও যাতে সামাজিক ভাবে অনাথ হয়ে থাকা একটি মহাসৌভাগ্য রূপে পরগনিত হওয়া শুরু হয়। আর যারা অবিভাবকদের লাভ করে মোহগ্রস্ত, তাঁরা যেন এই অবাদ স্বাধীনতার কেবলই নাম শুনে ক্ষান্ত হতে হচ্ছে বলে উদাসীন হয়ে ওঠে, আর তাঁরাও অহংকারের স্বাদ চাকা বন্ধ করে, জগজ্জননীর প্রেমের স্বাদ চাকতে ব্যকুল হয়ে ওঠে”।
দিব্যশ্রী নিজের নেত্রে অশ্রু ধরে রাখতে পারলেন না। জোরহস্তে পিতার কাছে সবিনয়ে বললেন, “পিতা, সমস্ত জ্ঞান আপনি আমাকে প্রদান করেছেন। আপনার এই মিথ্যা দেহের থেকে প্রেম তো লাভ করেছি আমি। হয়তো এই বিশাল প্রেমকে প্রত্যক্ষ করে, আমি ভ্রমিত হয়ে গিয়ে এই প্রেমকেই অনন্ত প্রেম বলে মনে করে নিয়েছি, আর তাই যথার্থ ভাবে যেই প্রেম অনন্ত, তার ধারণাও করার প্রয়াস করিনি কনোদিন। …
পিতা, সত্য বলতে তো, আমি আপনাকে সত্য অর্থে লাভই করিনি। কাকা বলেছেন আমাকে, কখনো তোমার পিতার সত্যরূপের সাখ্যাতকার করো। একবার করে ফেললে, আর নিজের পৃথক অস্তিত্ব রাখাই দায় হয়ে উঠবে, মনে হবে যেন সর্বক্ষণ সেই প্রেমে নিজেকে হারিয়ে ফেলি। … পিতা, আমাকে সেই সত্যের সাথে পরিচয় করে দিন না! … একটিবার আমাকে আপনার স্বরূপের সাথে সাখ্যাতকার করিয়ে দিন”।
