অন্তিম নির্দেশ
দিব্যশ্রী এবার প্রশ্ন করলেন, “মা, আমার আর একটি বিষয় তোমার থেকে জানা আবশ্যক। … মা, সমস্ত যাত্রারই একটি অন্তিম গন্তব্যস্থল থাকে। আমাদের চেতনারও অন্তিম গন্তব্যস্থল হলো ব্রহ্মস্বরূপ। তেমনই যেই যাত্রার উপস্থাপনা তুমি করেছ, আমি ও আমার পরবর্তী পিঁড়ি সেই যাত্রাকে ক্রমবর্ধমান করে আগিয়ে নিয়ে যাব, তারও তো নিশ্চয়ই কনো সমাপ্তি থাকবে। তা সেই গন্তব্যস্থল কি?
আসলে গন্তব্যস্থল না জানা থাকলে, প্রায়শই বিভ্রান্তির রচনা হয়; আধ্যাত্মসেবা দেহসেবাতে পরিণত হয়ে যায়, আর তা পরিণত হয়ে গিয়েও মনে হয় যেন তা সঠিক পথেই চলমান। একই ভাবে আধ্যাত্মসেবা কীর্তনাদি ও তিলককাঞ্চন ধারণ হয়ে যায়, বা কিছু রীতিরেওয়াজ বা আচারবিচারেই আবদ্ধ থেকে যায়। তা যাতে না হয়, তার জন্য অন্তিম গন্তব্য স্থল জানা অত্যন্ত আবশ্যক। এই অন্তিম গন্তব্যস্থলই আমাদেরকে বলতে থাকবে যে আমরা সঠিক পথে যাত্রা করছি কিনা, বা আমাদের যাত্রা সমাপ্ত হতে ঠিক কতটা দেরি।
আচ্ছা মা, আমাদের অন্তিম গন্তব্য কি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ? কৃতান্তিকরা কি রাজ্যশাসন করবে? এটিই কি আমাদের অন্তিম গন্তব্য!”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “না পুত্রী, এক চেতনাজাগ্রত ব্যক্তি কখনোই প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করবে না। হ্যাঁ এমন হতে পারে যে, রাজনীতিতে যুক্ত কেউ, স্বয়ং রাজা বা প্রধান মন্ত্রী এক চেতনাজাগ্রত ব্যক্তির দ্বারা প্রভাবিত, যেমন বিম্বিসার গৌতম বুদ্ধের দ্বারা অনুপ্রেরিত ছিলেন, অনুরূপ ভাবে রাজা অশোকও বুদ্ধের দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন, যেমন রাণী রাসমণি ঠাকুর রামকৃষ্ণের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন, যেমন উৎকলের রাজা চৈতন্য মহাপ্রভুর দ্বারা অনুপ্রেরিত ছিলেন।
কিন্তু এক চেতনাজাগ্রত ব্যক্তি কখনই রাজকার্যে প্রত্যক্ষ ভাবে যুক্ত থাকবেন না। রাজার অনুরোধে তিনি শিক্ষাদান করতে পারেন, রাজ্যের জন্য কি ঠিক বা কি বেঠিক, সেই বিষয়েও পরামর্শ দিতে পারেন রাজাকে, কিন্তু রাজ্যশাসন কখনই নয়।
আসলে পুত্রী, রাজা বা শাসকের কাজ হলো একটি সীমারেখায় বদ্ধ থেকে, যাকে সাধারণত তোমরা দেশ বা রাজ্য বলে থাকো, সেই সীমারেখায় আবদ্ধ থেকে, সেই আবদ্ধ ভূমির সমস্ত জীবের ভৌতিক জীবনকে সুবন্দোবস্ত রাখা, এবং তাঁদেরকে ভৌতিক জীবনের ঊর্ধ্বে ওঠার স্থান, সময় ও সুবিধা প্রদান করা।
কিন্তু সেই উর্ধ্বে ওঠার সুযোগ বা সুবিধা লাভ করে কি হবে, যদি চেতনা উদ্দীপ্ত ব্যক্তি উপস্থিতই না থাকেন, সেই উর্ধ্বে উত্থানের জন্য! চেতনা উত্থানের জন্য এক চেতনা উদীপ্ত ব্যক্তি অপেক্ষা করবেন সেই স্থানে, যেখানে এক রাজা তাঁর প্রজাকে প্রেরণ করবেন উন্নতির জন্য। কিন্তু সেই চেতনা উদ্দীপ্ত ব্যক্তি কখনোই রাজকর্মে নিয়জিত থাকবেন না।
আর তুমি যেই অন্তিম গন্তব্যস্থলের কথা বললে, তা হলো সত্যচেতনাকে সমাজে একটি বিশিষ্ট স্থানে উপস্থিত করা, যেখানে স্থিত হলে, সমস্ত মানবজাতি, দেশ-জাতি-সম্প্রদায়-ভাষা-লিঙ্গ-বর্ণ নির্বিশেষে কৃতান্ত চেতনার অস্তিত্বের সন্ধান লাভ করতে পারেন, এবং ব্যকুলতা অনুসারে, সেই চেতনায় নিজেদের স্নান করানোর জন্য কৃতান্ত তীর্থে নিজেদের উপস্থিতও করতে পারেন।
অর্থাৎ, এমন এক উচ্চতায় কৃতান্ত চেতনাকে স্থিত করাই তোমার ও তোমার পরবর্তী পিঁড়ির লক্ষ্য, যেখানে কৃতান্ত চেতনা স্থিত হলে, সমস্ত বিশ্ববাসীর কাছে এই চেতনার অস্তিত্ব পরিচিত থাকবে, এবং সমস্ত বিশ্ববাসীর কাছে এটিও জানা থাকবে যে, তাঁরা কৃতান্ত তীর্থে উপস্থিত হয়ে, কৃতান্ত চেতনায় উদ্ভাসিত কৃতান্ত, কৃতান্তিকা তথা সমগ্র কৃতান্ত প্রজ্ঞার অধ্যায়ন করে, এই চেতনায় স্নান করতে সক্ষম।
তবে স্মরণ রেখো পুত্রী, যেই অনাথদের সকলে পরিত্যাগ করে দিয়েছেন, তাঁদেরকে কৃতান্ত তীর্থ ধারণ করে, তাঁদের জননী হয়ে অবস্থান করবে। এছাড়া কারুকে কৃতান্ত নিজের তীর্থে আগমনের জন্য নিমন্ত্রণও দেবেনা, আর কনো প্রকার জোর খাটাবে না। আর যিনিই এই তীর্থে অধ্যায়নের প্রয়াস করবেন, তাঁর বয়স যেন ৮ থেকে ২০র মধ্যে হয়। এর অধিক বয়সের কেউ কৃতান্ত তীর্থে তখনই উপস্থিত থাকবেন, যখন তিনি কৃতান্তিক ও কৃতান্তিকদের আচার্য।
হ্যাঁ, যাদের বয়স ২০র উর্ধ্বে, তাঁরা কৃতান্ততীর্থের আঙ্গনে সাপ্তাহিক প্রবচন সভায় এসে প্রবচন শ্রবণ করে নিজেদের উন্নত করার সুযোগ লাভ করবেন, কিন্তু কৃতান্ত তীর্থের শিষ্যের আগমনের বয়স ৮ থেকে ২০র উর্ধ্বে হবেনা। তবে সেই শিষ্যশিষ্যাদের মধ্যে কনো ভেদভাব থাকবেনা, অর্থাৎ যেকোনো জাতির, যেকোনো সম্প্রাদায়ের, যেকোনো ভাষার, যেকোনো বর্ণের, যেকোনো লিঙ্গের, ও যেকোনো দেশের হতে পারে সে, তবে হ্যাঁ, কৃতান্ত শিক্ষা প্রদান করা হবে বাংলা ভাষাতেই, অন্য কনো ভাষাতে নয়।
স্মরণ রাখবে পুত্রী, কৃতান্ত মুক্তির মন্ত্র। তাই কনো কারণে কারুর উপর জোর করে তা চাপিয়ে দেওয়া হবেনা। যিনি কৃতান্তশিক্ষা প্রদানের সমস্ত নিয়মাবলীর মধ্যে স্থিত হয়ে, স্বেচ্ছায় এই চেতনায় স্নান করতে আসবেন, তিনিই এই শিক্ষালাভ করবেন। অহেতুক হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ সদস্য নির্মাণের নেশায় নেমে কৃতান্তধারাকে কলুষিত করে দেবেনা। স্মরণ রাখবে, কৃতান্ত চেতনার অন্তিম অবস্থায় ব্যক্তিকে উন্নীত করার জন্যই স্থিত, তাই সদস্য গণনায় নয়, চেতনার উত্থানেই মনযোগী থেকো।
সংখ্যা কম হোক, ১ শত বৎসর পরেও সংখ্যা এক হাজার না অতিক্রম করুক, তাতে কনো ভ্রুক্ষেপ করবেনা, কিন্তু এই এক হাজারকে কৃতান্ত চেতনায় স্নাত করানোই লক্ষ হবে। স্বল্প থাকুক, কিন্তু নিখুঁত থাকুক। বাণিজ্য ক্ষেত্র নয় কৃতান্ততীর্থ, তাই বাণিজ্যিক ভাবনাকে কৃতান্ত তীর্থে কখনোই প্রবেশ করতে দেবেনা। সদা পবিত্র রাখবে কৃতান্তধারাকে, তবেই কৃতান্ত সক্রিয় থাকবে, এবং জগতে চেতনার বিকাশ ঘটাতে থাকবে অনুক্ষণ। যেই ক্ষণে, বাণিজ্যিকতা, প্রচার, প্রসার, উপার্জনের আধিক্য, ইত্যাদির প্রতি নজর দেবে, জানবে কৃতান্ত নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। সদাসর্বদা কৃতান্তের রক্ষণাবেক্ষণ পবিত্রসত্ত্বার হাতেই অর্পণ করবে।
কৃতান্ত তীর্থ হবে জগতের বুকে মোক্ষের দ্বার। এখানে ভিড়বৃদ্ধির প্রয়াসও করবেনা, এবং ভিড় হতেও দেবে না। তবেই এটি দীর্ঘমেয়াদি হবে, এবং জগতের বুকে মোক্ষদ্বার সদাসদার জন্য উপস্থিত থেকে যাবে। সকল বিশ্ববাসীর কাছে কৃতান্ততীর্থের অস্তিত্বকে স্পষ্ট করে, ৮ থেকে ২০ সকলের জন্য কৃতান্ত চেতনায় স্নানের সম্ভাবনাকে বিশ্বদরবারে রাখা হয়ে গেলে, কৃতান্ত নিজের অন্তিম গন্তব্যস্থলে উপস্থিত হয়ে যাবে। এর পরে, কেবলই রক্ষণাবেক্ষণ আবশ্যক, পবিত্রতার রক্ষণাবেক্ষণ, চেতনাস্নানের রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্বতঃপ্রণোদিত মোক্ষের রক্ষণাবেক্ষণ। স্মরণ রাখবে পুত্রী, কৃতান্ত কারুকে মোক্ষ প্রদান করেনা, কারুকে কৃপা করেনা, কারণ কৃতান্ত বলে, সকলে স্বয়ং নিজের মোক্ষকে নিশ্চয় করতে সক্ষম। অর্থাৎ কৃতান্ত কৃপাদান করে স্বতঃপ্রণোদিত মোক্ষের, মোক্ষ দান করে কৃতান্তিকদের দৈন্য করে রাখা না তো কর্তব্য আর না লক্ষ্য। কৃতান্তের লক্ষ্য সমস্ত দৈন্যতা থেকে মুক্তি প্রদান, আর যেন আজিবতকাল তাই থেকে যায়”।
