কৃতান্তিকা

দিব্যশ্রী প্রশ্ন করলেন কিছুটা বিচলিত হয়েই, “আচ্ছা মা, একটা বিষয়ে আমি কনো মীমাংসা খুঁজে পাচ্ছিনা। আচ্ছা, মানুষের ঈশ্বর নিয়ে, জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তা যেমন আমাকে অত্যন্ত বিচলিত করলো, তা সকলকে করছে না কেন? কেন আমাকে তা করলো, আর কেন অন্যকে তা করছে না! মা, এই বিচলিত ভাবই আমাকে জ্ঞান অর্জনের জন্য ব্যকুল করে তুলল, অনাথ শিশুদের ধারণ করে, তাদের জীবন নিয়ে, ঈশ্বর নিয়ে, সমাজ নিয়ে দুশ্চিন্তা হনন করে, সমাজে দুশ্চিন্তা হননের বার্তা প্রদান করার ব্যকুলতা জন্ম নিলো।

কিন্তু মা, সকলের ক্ষেত্রে এমন হচ্ছেনা, তাই ব্যকুলতাও জন্ম নিচ্ছেনা, আর দুশ্চিন্তা হননের উপায়ের সন্ধানও করছে না, আর উপায় লাভও করছে না। কিন্তু কেন এমন মা? এই ব্যকুল হওয়া আর না হওয়ার মধ্যে ভেদ কিসের? এই ভেদের রহস্য কি মা?”

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “অনুভব পুত্রী। একমাত্র অনুভবই এই পার্থক্যের নির্মাতা। যিনি অন্যকে অনুভব করতে সক্ষম, তিনিই অন্যের জন্য ব্যকুল হন, বাকিরা কেবলই নিজের কারণে ব্যকুল হন। নিজের দেহের ব্যাথা, রোগে ব্যথিত হন, নিজের দুশ্চিন্তায় ব্যথিত হন, নিজের প্রতিষ্ঠাহানিতে ব্যথিত হন। পুত্রী, যিনি অন্যের ব্যাথাকে অনুভব করেন, অন্যের দুশ্চিন্তাকে অনুভব করেন, তিনিই অন্যের কারণে ব্যকুল হন, আর তিনিই সকলের ব্যাথার উপশম সন্ধান করতে উন্মত্ত হয়ে ওঠেন, যেমন গৌতম বুদ্ধ হয়েছিলেন।

পুত্রী, যিনি নিজ ব্যতীত কিছু অনুভবই করতে পারেন না, তিনি কি করে অন্যের কল্যাণ সাধন করবেন? তিনি তো কল্যাণের নাম করে, কেবলই লুণ্ঠন করে থাকেন। পুত্রী, অনুভবই তো শ্রেষ্ঠ জ্ঞান। যদি সেই পিতাকে অনুভবই না করতে পারো, যিনি সকালে যখন কর্মক্ষেত্রে যান, তখন তাঁর সন্তানকে ঘুমাতে দেখেন, আর রাত্রে যখন কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরেন, তখনও তাঁর সন্তানকে ঘুমাতে দেখেন, আর এই ভাবে নিজের সন্তানের কণ্ঠস্বরটাও ভুলে যান, তাহলে কর্মজীবনের অভিশাপ কি করে সেই মানুষের প্রকৃত সেবা করতে পারবে?

মূল্যবৃদ্ধির জন্য যেই দরিদ্র মা, নিজেকে অনাহারে রেখে নিজের সন্তানদের আহার করাচ্ছেন, তাও সন্তানকে যথাযথ পুষ্টি দিতে পারছেন না, যদি ইনার মাতৃত্বকে অনুভবই না করতে পারো, তাহলে মূল্যবৃদ্ধি যে কতবড় অভিশাপ, তা অনুভব করবে কি করে?

আর পুত্রী, যদি অনুভবই না করতে পারো, তাহলে, মূল্যবৃদ্ধি কম করতে, চাকুরীর বাতাবরণকে সঠিক রাখতে ব্যকুল হবে কি করে! … কেবল দরিদ্রই অভাগা, তেমন নয় পুত্রী। অভাগা তো সকলেই। যিনি ধনবান, তিনিও অন্য ভাবে অভাগা। তিনি এই পুরুষকে অনুভব করছেন, যিনি তাঁর সন্তানের কণ্ঠস্বরও শুনতে পাচ্ছেন না, আর তা অনুভব করেও, কেবলই নিজের প্রতিদ্বন্ধির থেকে নিজের বাণিজ্যকে সুরক্ষিত রাখতে, এমন বহু স্ত্রীপুরুষের উপর চাপ বাড়িয়েই যাচ্ছেন।

কি মনে হয় পুত্রী, তিনি এই সমস্ত কিছু অনুভব করছেন না! তিনিও অনুভব করছেন আর নিজেকে নিজে অভিশাপ দিয়ে যাচ্ছেন অনবরত। তাকে অনুভব না করলে, উপায় সন্ধান কি করে করবে পুত্রী? একই ব্যাপার ভণ্ড ও ভক্তেরও। উপার্জন করা অত্যন্ত কঠিন, অধিক উপার্জন আরো কঠিন। সেই স্থানে দাড়িয়ে সব থেকে সহজ উপায় উপার্জনের হলো ভণ্ডামি। ভণ্ডের ভণ্ডামি তো দেখতে পাচ্ছ, কিন্তু সেই ভণ্ডামি করতে নামার আগে, ভণ্ড যেই ভাবে নিজেকে উপার্জন করতে ব্যর্থ অনুভব করছেন, তা যদি অনুভব না করো, তাহলে সমাজসেবা কি করে সম্ভব পুত্রী!

অনুরূপ ভাবে ভক্তকেও দেখো। প্রকৃত ভক্ত আমার থেকে কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু চান না, কিন্তু সেই তাঁকেই দিবারাত্র সকলে খোটা দিয়ে চলেছেন যে, কেমন ভক্ত তুই যে তোর ঈশ্বর তোকে এমন দৈন্যদশায় রেখে দিয়েছে। নিজের উপর লাগা লাঞ্ছন তো সহ্য করে নেয় ভক্ত, কিন্তু আমার উপর, তাঁর প্রেমের উপর যেই লাঞ্ছন লাগে, তা যে তাঁর কাছে কি পরিমাণ অসহনীয় হয়ে গেলে, তবেই সে আমার থেকে কিছু চেয়ে বসে, যদি তা অনুভব না করো, তবে ভক্তের সেবা করবে কি করে পুত্রী!

পুত্রী, সকল সময়ে আমরা অন্যের দোষত্রুটিই বিচার করে চলি, কিন্তু সে সেই দোষত্রুটি করার জন্য কি ভাবে নিজেকে দেওয়ালে ঠেশে যাওয়া অবস্থায় অনুভব করে সেই দোষত্রুটিতে নিজেকে লিপ্ত করেন, তা অনুভব না করলে, কি করে তাঁকে স্নেহ করবে পুত্রী! একজন আতঙ্ক বিস্তার করছে, তা তুমি দেখছ, কিন্তু কি পরিমান ভাবে দেওয়ালে পিঠ থেকে গেলে, তবেই সে আতঙ্কের প্রসার করছে, তা যদি অনুভব না করো, তবে দেশের মানুষের কি সেবা করবে? সেবা নয়, তা সেবার নামে মহাত্মাকাঙ্ক্ষার বিস্তার ব্যতীত কিছুই নয়।

শিশু বিছনায় প্রস্রাব করে ফেললে, তোষক রোদে দিতে হয়। আর সেই কাজ করতে গেলে, পিতা নিজের অফিসে যেতে দেরি করে ফেলে, তাই শিশুকে পিতা বকাবকি করেন। তাই মাতা কি করেন, মাতা কাজের ফাঁকে এসে  দেখে যান, শিশু প্রস্রাব করে ফেলেছেন কিনা। যদি দেখেন প্রস্রাব করে ফেলেছে শিশু বিছানায়, মাতা শিশুকে নিদ্রা থেকে তুলে, তোষক রোদে দিয়ে দেন।

পিতা তখনও বকাবকি করতে এলে, তখন মাতা প্রতিবাদী হয়ে উঠে বলেন, তোমার কাজে যেতে দেরি হয়ে যায়, আমি তাই তোষক রোদে দিয়ে দিয়েছি তো! তারপরও আমার সন্তানকে বকাবকি করছ কেন? সে শিশুমানুষ, তার অতো বোধবুদ্ধি হয়ে গেলে কি আর সে শিশু থাকতো। স্বামী আর কনো কথা বলতে না পেরে চলে যান। পুত্রী, যদি সন্তানের শিশু হওয়ার কারণে নির্বোধ হওয়াকে মাতা অনুভবই না করেন, তাহলে তিনি কেমন করে মাতা হবেন? স্বামীর অফিসে দেরি হয়ে যাবার জন্য স্বামী রাগারাগি করেন, যদি অনুভবই করতে না পারেন তিনি, তাহলে কেমন করে স্ত্রী হলেন?

পুত্রী, অনুভব। অনুভবই হলো সেই মহাস্ত্র যার দ্বারা পূর্ণতা লাভ হয়, যার দ্বারা সমৃদ্ধি লাভ হয়। সেই স্ত্রী অনুভব করে থাকেন, হাজার অভিযোগ থাকলেও, তাঁর স্বামী তাঁকে স্নেহ করেন, কারণ তাঁর স্বামী তাঁকে অনুভব করেন। কেউ যদি কানভাঙাতে চলে যান তাঁর স্ত্রীর নামে, তখন তিনি গর্জন করে বলে ওঠেন, ও আছে বলেই সংসারটা টিকে আছে। আমি করিটা কি? সংসার চালানর জন্য উপার্জনটা খালি করে আনি। বাকি, যদি ও না থাকতো, তাহলে তো সংসারটা বাণের জলে ভেসে যেত। শ্রোতা সেই কথা শুনে বুঝে যান, ভুল জায়গায় হাত দিয়েছেন তিনি। কেন? কারণ এই সংসারে স্বামী স্ত্রীকে, এবং স্ত্রী স্বামীকে অনুভব করেন।

অর্থাৎ পুত্রী, এই অনুভবই সমস্ত সম্পর্কের আধার; সমস্ত সম্পর্কের ভিত্তি ও শক্তি। এই অনুভবের অভাবেই হাজার হাজার সংসার ভেঙে যাচ্ছে; এই অনুভবের অভাবেই হাজার হাজার ভাই একে অপরকে ঠকাচ্ছে; এই অনুভবের অভাবেই লক্ষ লক্ষ সন্তান মাদকে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে; এই অনুভবের অভাবেই দরিদ্র ও দুর্বল অত্যাচারিত হচ্ছে; এই অনুভবের অভাবেই একজন অন্যজনকে লুণ্ঠন করছে, একজন অন্যজনকে পথে বসাচ্ছে, একজন অন্যজনকে বিনষ্ট করে দিতে সচেষ্ট হচ্ছে; এই অনুভবের অভাবেই মূল্যবৃদ্ধি বেড়েই চলেছে, কৃষক দরিদ্র হয়েই চলেছে, শ্রমিকের অপুষ্টি বেড়েই চলেছে; এই অনুভবের কারণেই ভণ্ডের সংখ্যাও বেড়ে চলেছে, আর ভক্তও ভণ্ড হয়েই চলেছে।

পুত্রী, যার কাছে এই অনুভব নেই, সে সমাজের সেবা করতে সচেষ্ট হয়না, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট হন। নিজের প্রতিষ্ঠার কারণে তিনি সেবা নামক অস্ত্রকে হাতে তুলে নেন, আর তাই হিসাব করে করে সেবা করেন, যাতে সেবা সম্মান্য হয়, আর খ্যাতি প্রসিদ্ধি আর ধনের বর্ষা হয়। … পুত্রী, যিনি অনুভবী, তিনি দরিদ্রের দারিদ্রতা দেখে, দরিদ্র মায়ের নিজের সন্তানকে পুষ্টি প্রদানের ব্যর্থ প্রয়াস দেখে, পিতা তাঁর সন্তানের কণ্ঠস্বর শুনতে পারছেন না দেখে, নির্বাচনে সাধারণ মানুষের সমর্থন লাভের জন্য তাঁদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া দেখে, ভক্ত সর্বক্ষণ ভগবানকে ইচ্ছাপূর্তি করার যন্ত্র করে তোলা দেখে, ক্রন্দনে ফেটে পরে।

খেতে, বসতে, শুতে, হাঁটতে, সর্বক্ষণ এই সমস্ত অনুভব তাঁকে ব্যকুল করে রেখে দেয়। দিবারাত্র এই সমস্ত বেদনা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজে চলেন তিনি, আর দিনের শেষে কনো উপায় সন্ধান করতে না পেরে, আমার কাছে এসে কেঁদে কেঁদে বলে, এতো বেদনা কি তুমি দেখতে পাচ্ছ না! দেখতে পেলেও, এই বেদনার উপশমের উপায় কেন দিচ্ছ না! …

আমি শুনি তার কথা, কিন্তু কিচ্ছু বলিনা, কারণ উপায়ের সন্ধান তো তাকেই করতে হবে। এই উপায়ের সন্ধান করে, সেই উপায়কে বাস্তবায়িত করাই যে তার যাত্রা। পুত্রী, এই বেদনাকে সেই অনুভবী বারংবার আমার লটবহর বলে দাবি করতে থাকে। আর এই বলতে থাকে যে, এই লটবহর বহন করার উপায় ও অনুমতি প্রদান করতে তাকে। কিন্তু পুত্রী, যিনি নিজের লটবহর বহন করেন, তাকে বলা হয় যাত্রী, আর যিনি অন্যের লটবহর বহন করেন, তাকে বলা হয় মুটে।

আমি মা হয়ে, আমার সন্তানকে মুটে করে কি ভাবে রাখতে পারি! আমার সন্তান যে যাত্রা করবে, সে যে যাত্রী হবে, তবেই তো সে মহাজ্ঞান অর্জন করবে, সত্য কি তা জানবে, অসত্য কি তা জানবে, আর সত্যে অর্থাৎ নিজের গৃহে এই ব্রহ্মাণ্ড বিদেশভুঁই থেকে প্রত্যাবর্তন করবে। তাই আমি তার সমস্ত আর্জি শুনি, কিন্তু নিরব হয়ে বসে থাকি।

ক্রমশ তার ব্যকুলতা বাড়তে থাকে, আর সে হয়ে ওঠে উচাটন। হ্যাঁ আমাকে গালিও দেয় সে পাষাণী বলে, কিন্তু সন্তানের কল্যাণের জন্য সমস্ত গাল সহ্য করেও নীরব থাকি। অবশেষে সে নিজেই নিজের সহায়তা করতে শুরু করে। সে স্বয়ংই এই বেদনার উপশম খুঁজতে শুরু করে, আর শেষে সেই বেদনার প্রকৃত কারণ, আর প্রকৃত উপশম উদ্ধার করে সিদ্ধার্থ থেকে গৌতম বুদ্ধ হয়ে ওঠে।

তুমি বলবে কি ভাবে করে? পুত্রী, কনো প্রক্রিয়ার প্রয়োজনই হয়না। তাঁর ব্যকুলতাই তাঁর উপায়ের নির্মাণ করে। তাই পুত্রী, নিজের আত্মকে ত্যাগ করে, সমস্ত জীবকে অনুভব করতে হয়। যিনি তা করতে পারেন, তিনি আর বলেন না যে মাংস খাওয়া বন্ধ করো কারণ জীবটি পীড়া পাচ্ছেন, কারণ তিনি অনুভব করেন যে সেই একই পীড়া উদ্ভিদটিও পাচ্ছে, যখন তাকে আহার করা হচ্ছে। সে অনুভব করে যে, এই শরীরের প্রতি আমাদের আসক্তির নাশ করার প্রক্রিয়া হলো এই খাদ্য ও খাদকের সম্পর্ক।

এই হলো সেই ভেদ, এই হলো সেই রহস্য, যা তোমার প্রশ্ন ছিল। পুস্তক পাঠ করে, বিদ্যালয়ে গিয়ে এই উপায় সন্ধান করা যায়না, কারণ এই উপায় যে তোমার অন্তরে স্থিত। বিদ্যালয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়, কিন্তু জানো কি, কিসের শিক্ষা দেওয়া হয়? শিক্ষা লাভ করার প্রক্রিয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়। কি ভাবে শিক্ষা লাভ করতে হয়, তার শিক্ষা দেওয়া হয় বিদ্যালয়ে। পুস্তকে এই উপায় থাকেনা, এই উপায় থাকে তোমার ব্যকুলতায়। আর ব্যকুলতার রহস্য থাকে তোমার অনুভবী শক্তিতে।

তাই যত অধিক অনুভব, তত অধিক ব্যকুলতা, তত অধিক সত্য জ্ঞান লাভ, আর ততই অধিক সত্য মার্গ লাভ জগতের উদ্ধারের। গ্রন্থ পাঠ নয়, অনুভব লাভই জগতকল্যাণের একমাত্র উপায় পুত্রী। সমস্ত ব্যর্থতার, বেদনার কারণ থাকে সূক্ষ্মতে। কিন্তু গ্রন্থ তো আমাদের কেবলই স্থূল ভৌতিক জগতের কথা বলতে সক্ষম। তাই গ্রন্থ পাঠে কেবলই যান্ত্রিক হতে থাকবো আমরা, না লাভ করবো অনুভব, আর না লাভ হবে প্রকৃত কল্যাণের মার্গ।

অনুভবের তো এতোই সামর্থ্য যে স্বয়ং আমারও বেদনা, দুশ্চিন্তার ভান করে নেওয়া যায়। তাই একবার বিচার করো, যা আমার দুশ্চিন্তার ভান করে, আমাকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করার মার্গ রচনা করতে সক্ষম, তা জগতের দুশ্চিন্তাকে ধারণ করতে কতক্ষণ সময়ই বা নেয়!

তাই পুত্রী অনুভব করাও তোমার ছাত্রছাত্রীদের। যত তারা অনুভব করবে, ততই তাঁরা ব্যকুল হবে, ততই তাঁরা বেদনার নিরাময় করার জন্য ব্যকুল হবে, আর ততই বেদনার নিরাময় করার উপায় লাভ করলে, সেই মার্গে নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দেবে। অনুভব করাও, সমস্ত মায়েদের, সমস্ত পিতাদের, সমস্ত সন্তানদের, সমস্ত দরিদ্রদের, সমস্ত ধনবানদের, ভণ্ডদের, ভক্তদের, প্রেমীদের, অসহায়দের, রাজাদের। অনুভবই উদ্ধারের একমাত্র মার্গ পুত্রী, একমাত্র মার্গ”।

দিব্যশ্রী প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা মা, তুমি রাজনীতি, সাহিত্যচর্চার কথাও সমানে বলতে থাকো, ঈশ্বরসাধনার পাশাপাশি। কিন্তু কেন? একজন মহাবতার, ঈশ্বরের কথা ছাড়া অন্য কথা কেন বলবেন?”

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, জ্ঞান অর্জন তো গ্রন্থ থেকে লাভ হয়না, তা লাভ হয় জীবন থেকে। হ্যাঁ পুত্রী, বিনা পারিশ্রমিকে কনো কিছুই লব্ধ হয়না। কড়ি দিয়ে সমস্ত কিছু লাভ করা গেলেও, জ্ঞান অর্জন করা যায়না। জানো কি, কিসের বিনিময়ে জ্ঞান অর্জন সম্ভব হয়? (হেসে) জীবনের বিনিময়ে। যদি তুমি তোমার জীবনকে কনো কিছুতে উৎসর্গ করে দাও, তা তোমাকে জ্ঞান প্রদান করবে।

কিন্তু পুত্রী, জীবনকে কার কাছে উৎসর্গ করবে? ধনাদি অর্থের কাছে? সম্ভব কি? না সম্ভব নয়। কেন সম্ভব নয় বললাম? কারণ যিনি ধনাদির কাছে নিজের জীবনকে উৎসর্গই করে দিয়েছেন, তিনি তো ভালো গাড়ি, কামুকী স্ত্রী, বা প্রাসাদতুল্য বাড়ির দিকে নজরও দিতে পারবেন না। কি করে দেবেন? তিনি তো অর্থের কাছে নিজের জীবনকে বিসর্জন দিয়ে দিয়েছেন! অর্থাৎ পুত্রী, ধনের কাছে, উপার্জনের কর্মের কাছে, স্বামী বা স্ত্রীর কাছে নিজের জীবন সঁপে দেওয়া যায়ইনা। যদি স্বামীর কাছেই জীবন সঁপে দেওয়া সম্ভব হতো, তাহলে সন্তান লাভের ইচ্ছাই থাকতো না সেই স্ত্রীর, বা স্বামীর।

পুত্রী, প্রথম যেই জিনিসের কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে সঁপে দেওয়া যায়, তা হলো রাজনীতি, যেখানে রাজ্যের ও রাজ্যবাসির উত্থানের কাছে নিজের জীবনকে সম্পূর্ণ ভাবে সঁপে দেওয়া যায়। আর তাই, রাজনীতি হলো জ্ঞানলাভের প্রথম পদক্ষেপ। হাজার হাজার আত্মের, হাজার হাজার আত্মের কাছে বন্দি চেতনাদের সাখ্যাত লাভ করে, তিনি শিক্ষা লাভ করে চলেছেন সর্বক্ষণ।

এর পরবর্তী জ্ঞান লাভের পদক্ষেপ হলো সাহিত্যিক, যিনি কেবলই নিজের অনুভব দ্বারা সম্পূর্ণ জীবসমাজকে অনুভব করতেই থাকেন। এর পরবর্তী পদক্ষেপ হলো কলার সাধক, যিনিও নিজের কলার মাধ্যমে সমস্ত জীবজাতির অন্তরের চেতনাকে অনুভব করে করে জ্ঞান অর্জন করতে থাকেন। পরবর্তী পদক্ষেপ হলো ঈশ্বর সাধক, অতঃপরে বৈরাগী ও অন্তে প্রেমী।

আর এই কারণেই আমি অবিরাম রাজনীতির কথা বলতে থাকি, যেখানে অজস্র চেতনার থেকে শিক্ষা লাভ করা সম্ভব হয় এক ব্যক্তির পক্ষে। তবে আমার কথনেই ইতি নয়, ভবিষ্যতে কৃতান্তিকগন রাজনীতির উদ্দেশ্যে নতুন ভাবে মার্গের নির্মাণও করবে”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43