কৃতান্তিকা

দিব্যশ্রী ব্যকুল হয়ে প্রশ্ন করলেন, “মা, তোমার এত কথন, স্মৃতিশক্তির তো এত কথা ধারণ করে রাখার সামর্থ্যই নেই। তাহলে এত কথাকে অন্তরে কেউ রাখবে কি করে?”

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, একটা কথা বলো, একটা ডাক্তার দেহের সমস্ত কিছু প্রক্রিয়াকে নিজের স্মৃতিতে রাখেন? এক মিস্ত্রি কি সমস্ত গঠন কৌশলী নিজের স্মৃতিতে রাখেন? সম্ভব কি এতো কিছু জিনিসকে স্মৃতিতে রাখা?”

পুনরায় হেসে বললেন, “না পুত্রী, স্মৃতি কেবল শব্দ ধারণ করে রাখে, কেবল চিত্র ধারণ করে রাখে। একটা জিনিস খেয়াল করে দেখো পুত্রী, একটি কম্পিউটারে, তুমি কিছু ছবি রাখো আর তাদের নামকরণ করে রাখো; তুমি কিছু ডকুমেন্ট রাখো, নামকরণ করে রাখো; আর কিছু ভিডিও ও অডিও নামকরণ করে রাখো। বেশ কিছু বছর রেখে দাও তাদেরকে। তারপর একদিন সেগুলোকে আবার খোলার প্রয়াস করো।

কি দেখবে? ডকুমেন্ট, ছবি যেমন রেখেছিলে, তেমনই আছে, কিন্তু অডিও আর ভিডিওর অনেকগুলিই করাপ্ট হয়ে গেছে। তাই তো? কেন হয় জানো এমন? কারণ স্মৃতিশক্তি একআধটা ঘটনা ধরে রাখতে পারে, কিন্তু সুদীর্ঘ ঘটনাকে সে ধরে রাখতেই পারেনা নিজের মধ্যে।

পুত্রী, ডাক্তারি কনো তথ্য নয়, দেহবিজ্ঞান; মিস্ত্রি কনো তথ্য রাখেন না নিজের কাছে, গঠনশৈলী একটি বিজ্ঞান। আর বিজ্ঞান মানে হলো একটি প্রক্রিয়া, আর প্রক্রিয়াকে স্মৃতিতে নয়, হৃদয়ে ধারণ করতে হয়, যাতে সর্বক্ষণ তা সম্মুখে থাকে, আলমারিতে তা না থাকে।

পুত্রী, যা কিছু আলমারিতে রাখা হয়, তাকে চাবি দিয়ে আলমারি খুলে, হাতড়ে তারপর তা পাওয়া যায়,  কিন্তু বিজ্ঞান আলমারিতে রাখার জিনিসই নয়, বিজ্ঞান হলো রোজকার ধারণ করার কাপর, বিজ্ঞান হলো রোজের রোজ ব্যবহার করার মাথার চিরুনি, চোখের চশমা, পায়ের জুতো, খাবার জল। এগুলিকে তুমি কি আলমারিতে রাখবে পুত্রী! না তো! … এগুলিকে জীবনে ধারণ করতে হয়, হৃদয়ে ধারণ করে রাখতে হয়।

তেমনই সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বগুহ্য বিজ্ঞান হলো আধ্যাত্ম, অর্থাৎ আত্মের অধ্যায়ন, কারণ তা একটি প্রক্রিয়া, তা কনো তথ্য নয়। তাই একে যখন প্রক্রিয়া করেই অন্তরে ধারণ করবে, তখনই তা উপযোগী হয়ে কারুকে মোক্ষদ্বারে উপস্থিত করবে। ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলতেন, সিদ্ধি সিদ্ধি বলে চেঁচালে নেশা হয়ে যায়না, সিদ্ধি বেটে খেতে হয়, তবে নেশা হয়। তেমনই পুত্রী, আধ্যাত্ম হলো এমন এক সিদ্ধি, একে বেটে খেতে হয়, ঘরের কুলঙ্গিতে জমিয়ে রেখে দিলে, নেশা হবেনা।

সম্ভব নয়, তবু কল্পনা করে নাও তুমি আমার সমস্ত কথিত শব্দকে স্মৃতিতে রেখে দিলে। কি হবে তাতে? কনো উন্নতি হবেনা তোমার, কারণ পুত্রী, বাড়িতে ফ্রিজে পুষ্টিকর খাদ্য থাকলে পুষ্টি লাভ হয়না, তাকে খেতে হয়, তবেই তা পুষ্টি প্রদান করে আমাদেরকে। তেমনই আধ্যাত্ম হলো সেই পুষ্টিবর্ধক। জমিয়ে রাখো ফ্রিজে মানে স্মৃতিতে রাখো, কিন্তু যতক্ষণ না একে বেটে খাবে, ততক্ষণ পুষ্টিলাভ সম্ভবই নয়।

যখন একে বেটে খেয়ে নেবে, তখন দেখবে, ব্রহ্ম থেকে ব্রহ্মাণু গঠন থেকে শুরু করে, ব্রহ্মাণুর ব্রহ্মে লীন হয়ে যাওয়ার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকে তুমি ধারণ করে নিয়েছ। আর তখন বই খুলে তোমাকে দেখতে হবে না যে রুগীর কি উপশম হয়েছে, আর সেই উপশম কি রোগের ইঙ্গিত করে, কারণ তুমি তো সম্পূর্ণ পদ্ধতিকেই, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকেই ধারণ করে ফেলেছ। সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডকেই ধারণ করে ফেলেছ। তাহলে তোমার থেকে যেকেউ যা কিছু প্রশ্ন করুক এই ব্রহ্মাণ্ডের যেকোনো প্রক্রিয়ার ব্যাপারে, বিজ্ঞানের ব্যাপারে, তোমার অজানা কি, আর কিছু থাকবে! তাই পুত্রী, তোমার ছাত্রছাত্রীদের তথ্য দিও না, প্রক্রিয়া বলো, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া বলো”।

দিব্যশ্রী ব্যকুল হয়ে বললেন, “কিন্তু কি ভাবে মা! ব্রহ্ম, ব্রহ্মাণু, কি ভাবে উদাহরণ দিয়ে বোঝাই সকলকে?”

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, সেই একটিই তো ঘটনা, সেই ঘটনাই তো সর্বত্র প্রচারিত, সর্বত্র এই ঘটনাই ঘটমান। অন্য কিছু আর ঘটছে কোথায়? সমস্ত কিছু যা ঘটছে, তা তো সেই ঘটনারই পুনপ্রচার মাত্র। বিশ্বাস হচ্ছেনা, তাই তো! বেশ আমি তোমাকে ধরিয়ে দিচ্ছি, দেখো তো ধরতে পারো কিনা? দেখো তো উপলব্ধি করতে পারো কিনা যে, সর্বত্র সেই একই ঘটনা ঘটছে, তাই সমস্ত কিছু সেই ঘটনারই উপমা ও উদাহরণ।

এই মহাবিজ্ঞানের শুরু হয় কোথা থেকে? ব্রহ্মের থেকে ব্রহ্মাণুদের নির্মাণ হতে। ব্রহ্ম, যার কনো অণু সম্ভবই নয়, কারণ সে সম্যক ভাবে শূন্য, সম্যক ভাবে সমসত্ত্ব, তাঁর থেকে অণুগঠন সম্ভব কি করে তাহলে? নিজের পৃথক অস্তিত্ব না থাকার চিন্তার কারণে, নিজের পৃথক অস্তিত্ব লাভের ইচ্ছার কারণে আর নিজেকে পৃথক জ্ঞান করার কল্পনার কারণে তা সম্ভব হয়। অর্থাৎ ব্রহ্মের থেকে ব্রহ্মাণুর গঠন হলো কি করে? বাস্তবে তা হয়ইনি, কারণ তা হওয়া সম্ভবই নয়। কেবল মাত্র চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনাতেই তা ব্রহ্মাণুর কাছে ভ্রমবশত মনে হচ্ছে যে, তা হয়েছে, আর সে আলাদা হয়ে গেছে।

এবার দেখো পুত্রী, কেন ব্রহ্মাণু পৃথক হলো? আমিত্ব বা আত্মবোধের কারণে। তাই তার নাম কি হলো পরম আত্ম বা পরামাত্ম। কিন্তু এই পরমাত্ম ব্রহ্মের থেকে পৃথক তো বাস্তবে হতে পারেনি, কারণ তা সম্ভবই নয়। তাহলে সে যুক্ত কি ভাবে? কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছার সহায়তায়। এবার বিচার করে দেখো পুত্রী। একটি টিভি, তাতে রয়েছে তিনটি জ্যাক, তাহলে বলো সেই টিভির সাথে যদি একটি ভিসিডি যন্ত্রকে যুক্ত করতে হয়, তাহলে সেই ভিসিডিতে কটি জ্যাক থাকতে হবে? তিনটি তো? তাই দেখো, পরমাত্মের তিন গুণপ্রকাশ নির্মিত হলো, সত্ত্ব, রজ ও তম। আর এই তিনটি ভিসিডির জ্যাক আর তিনটি টিভির জ্যাককে যেই তার যুক্ত রাখবে, তা কটি হবে? হবে একটিই, কিন্তু তার মধ্যে তিনটি মুখ থাকবে, পজিটিভ, নেগেটিভ, আর নিউট্রাল। তাই দেখো, ত্রিদেবীর উদ্ভব হলো।

এবার কথা হলো, এই ত্রিদেবীর উদ্ভব হলো কেন? এর উত্তর আমি তোমাকে পূর্বেও দিয়েছি, আর তা হলো ধরিত্রী ও তাঁর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। যতক্ষণ তুমি ধরিত্রীপৃষ্ঠে স্থিত, ততক্ষণ তুমি মাধ্যাকর্ষণের বল অনুভবই করো না, কিন্তু যেই ক্ষণে সামান্যও চ্যুতি হয় এখানে, অর্থাৎ সামান্য ভাবেও ধরিত্রীর পৃষ্ঠ থেকে লম্ফ দেবার প্রয়াস করো, পরিণাম কি হয়? মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ক্রিয়া করে।

একই ভাবে ব্রহ্মমধ্যে শূন্য হয়ে স্থিত থাকা কালীন, কনো মাধ্যাকর্ষণ নেই, কিন্তু যেই ক্ষণে আমিত্ব বা আত্মের চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনায় গ্রসিত হয়ে ব্রহ্ম থেকে চ্যুত হতে প্রয়াসশীল হলে, অমনি সেই মাধ্যাকর্ষণকে অনুভব করলে। আর যেহেতু ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার প্রভাবে ত্রিগুণে বিভক্ত হয়েছে পরমাত্ম, তাই এই মাধ্যাকর্ষণকেও ত্রিগুণ পৃথক পৃথক ভাবে অনুভব করলেন, যাকে সে নামকরণ করে আদিশক্তি, শ্রী ও সরস্বতী নামে।

কিন্তু বাস্তব কি? পরম সত্য এই যে, পরমাত্মের গঠন সম্ভবই নয়, কারণ ব্রহ্ম অখণ্ড। অর্থাৎ না পরমাত্ম সত্য, না মাধ্যাকর্ষণ সত্য আর না কল্পনা, চিন্তা বা ইচ্ছা অর্থাৎ ছায়ার অস্তিত্ব সম্ভব। আমিত্ব বোধের কারণে পরমাত্ম নিজেকে কল্পনা করলেন, আর যেই মুহূর্তে সেই কল্পনায় নিজেকে আবদ্ধ করলেন তিনি, অমনি ব্রহ্মকে তিনি তাঁরই মাধ্যাকর্ষণ অর্থাৎ নিয়তি, বা চেতনাবেশে ধারণা করতে বাধ্য হলেন।

তাই পুত্রী, যখনই আমাকে শান্ত অবস্থায় দেখো তুমি, তুমি কি বলো? আমি শূন্য হয়ে স্থিত। সঠিক বলো, কারণ এই শূন্যই তো আমার প্রকৃত রূপ। আমি তো পরাচেতনা নই, পরমাত্মের প্রভাবে আমি পরাচেতনা রূপে তাঁর কাছে পতিত হই, বাস্তবে আমি তো শুধুই শূন্য, সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়, সম্পূর্ণ নির্বিকার। তাই তুমি আমাকে শূন্যস্বরূপ অবস্থায় দেখো। কিন্তু যেই মুহূর্তে পরমাত্ম আমার সংস্পর্শে আসে, সেই মুহূর্তে তুমিই আমাকে আবার পরাচেতনা বেশে প্রত্যক্ষ করো। কিন্তু কেন দেখো তা? কারণ পরমাত্মর দৃষ্টি দিয়ে আমাকে দেখছ বলেই তোমার এমন লাগছে। একবার যদি সত্যদৃষ্টি দ্বারা দেখো, তাহলে দেখবে পরমাত্মও নেই, আর আমিও পরাচেতনা নই, আমি কেবলই শূন্য, কেবলই নির্বিকার, নিষ্ক্রিয় শূন্য, ব্রহ্ম।

এতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত বিজ্ঞান আশা করি তোমার কাছে আত্মপ্রকাশ করেছে। এবার প্রশ্ন কি আসে? এত জীব কেন? এত আত্ম কেন? কেন একা পরমাত্ম নন! তাই তো? একটু নজর ঘোরাও পুত্রী। নদীকে দেখ, আর নদীর উপর বাঁধ রচনাকারী ইঞ্জিনিয়ারকে দেখ। কি করেন ইঞ্জিনিয়ার? বাঁধে যদি একটিই লকগেট থাকে, তবে সেই লকগেটকে অনায়সে নদী নিজের প্রকাণ্ড গতিদ্বারা ভেঙে গুড়িয়ে দেবে। তাই তারা কি করেন? তারা বাঁধে একাধিক লকগেট করেন। তাই না?

কি হয় এমন একাধিক লকগেট করে? নদী একটি লকগেটে যেই বল প্রয়োগ করতো, তাকেই একাধিক লকগেটে বিভক্ত করে দেয় ইঞ্জিনিয়ার, আর এর ফলে কি হয়? নদী বাধ্য হয় একাধিক লকগেটে নিজের বলকে ভাগ করে দিতে, আর তা করা মাত্রই, ইঞ্জিনয়ার নদীর গতিকে রোধ করতে সক্ষম হয়।

পুত্রী, এটি ইঞ্জিনিয়ারের মানসিকতা নয়, বরং এটাই পরমাত্মের মানসিকতা। আর এই মানসিকতার কারণেই পরমাত্ম নিজেকে সহস্র আত্মতে বিভক্ত করে দেয়, যাতে পরাচেতনার ভয়ানক বলকে সহস্র আত্মের মধ্যে বিভক্ত করে দিয়ে, দুর্বল করে দেওয়া যায়। আর তাই পুত্রী, এত সহস্র জীব অজীব দেখো তুমি, যারা একাকজন একাকটি আত্মকে ধারণ করে অবস্থান করে।

কিন্তু নদী কি প্রতিটি লকগেটে আলাদা হয়ে গেল? না তো? নদী তো নদীই রইল, অর্থাৎ পরাচেতনা পরাচেতনাই রইলেন। কিন্তু আত্মদের সাথে যুক্ত সকল চেতনা, ভ্রমে থাকতে শুরু করলো যে তারা আলাদা আলাদা নদী, আর তারা কিছুতেই লকগেট খুলতে পারছেনা। পুত্রী, তাই পরাচেতনা সমানে তাঁর সন্তান অর্থাৎ, প্রতিটি জীব ও অজীবের অন্তরের চেতনাকে এই উপলব্ধি করাতে ব্যস্ত যে, তাঁরা কেউ একাকী নয়, লকগেট থেকে মুক্ত হবার যুদ্ধ তার একার নয়, সেই যুদ্ধ সম্পূর্ণ নদীর, অর্থাৎ স্বয়ং পরাচেতনার।

অন্যদিকে, ইঞ্জিনিয়ার মানে পরমাত্ম কি করতে থাকে? সে একের পর এক বাঁধ নির্মাণ করতেই থাকে, যাতে কনো লকগেট থেকে নদীর জলধারা অর্থাৎ চেতনা যদি মুক্ত হয়েও যায়, পরবর্তী লকগেটে গিয়ে যেন আটকে যায়। আর এই মায়ার কথাই তোমাকে বলেছিলাম স্মরণ করো পুত্রী। চার জানালা ও তিন দরজা দেওয়া একটি মায়াকক্ষ, যেই কক্ষ থেকে নির্গত হলে সমরূপ আরেক কক্ষে সে প্রবেশ করে যায়, আর সেই একই ভাবে বন্দিই হয়ে থাকে, যেমন পূর্বে ছিল।

আর অন্যদিকে পরাচেতনা অর্থাৎ নদী কি করেন? নদী সমানে একটি একটি করে বাঁধ থেকে সমস্ত সন্তানকে অর্থাৎ সমস্ত জলধারাকে মুক্ত করতেই থাকেন, যাতে পরমাত্ম বাধ্য হয়, নদীর উপর বাঁধ দিতে দিতে সাগরের নিকটে গিয়ে সেই বাঁধ দেয়। এতে লাভ কি হয়? এতে নদীর জলধারা বৃদ্ধি পেতেই থাকে, আর এর ফলে, লকগেট ভাঙা নদীর পক্ষে সহজ হয়ে যায়।

জীবনের ক্ষেত্রে, এই ক্রিয়া হলো, পরাচেতনার প্রভাবে নদীর বাঁধ ভাঙা, আর পরবর্তী বাঁধ হলো, পরবর্তী উন্নত যোনি। একের পর এক যোনি নির্মাণ করে পরমাত্ম, অর্থাৎ বাঁধ নির্মাণ করে, আর পরাচেতনা নিজের সন্তানদের অর্থাৎ নদী নিজের জলধারাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যায় সাগরের দিকে, এবং পূর্বের থেকে অধিক ঘাতক আঘাত করেন লকগেট অর্থাৎ পরমাত্মের সৃষ্ট মায়ার উপর।

পুত্রী, এই ভাবেই পরাচেতনা ও পরমাত্মের খণ্ড যুদ্ধ এসে উপস্থিত হয়েছে আজকের দিনে, যেখানে সমুদ্রের একদাম নিকটে বাঁধ দিয়েছে পরমাত্ম, মনুষ্যযোনি নির্মাণ করে। আর পরাচেতনা সর্বক্ষণ এই বাঁধের পিছনে থাকা জলধারা অর্থাৎ মনুষ্যদের চেতনা প্রদান করে চলেছেন, এই মায়ার নাশ করতে, এই কল্পনার নাশ করতে, আর সাগরে এসে উপস্থিত হতে, অর্থাৎ তাঁতে এসে উপস্থিত হতে, বা চেতনা থেকে পরাচেতনা হয়ে উঠতে।

পরমাত্মের যত বাঁধ সমস্তই নদীতে, সাগরে সে বাঁধ দেবার সামর্থ্যও ধরেনা, আর সাহসও করেনা। তাই একবার যদি চেতনাসমূহ অর্থাৎ নদীসমূহ সাগরে এসে উপস্থিত হয়, তাহলে আর পরমাত্মের পক্ষে এই ভ্রমজগতকে সত্য রূপে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হবেনা চেতনার সম্মুখে। আর চেতনাকে চেতনা হয়ে বিরাজ করতে হবেনা, সে ব্রহ্ম হয়ে উঠবে, কারণ তাঁর ব্রহ্মাণু ব্রহ্মে বিলীন হয়ে যাবে, আর তার আমিত্বের বোধ থাকবেনা।

পুত্রী, এই তো সহজ সত্য, এই তো বিজ্ঞান। স্মৃতির কম্য নয়, একে ধারণ করা। এই বিজ্ঞানকে তাই ফ্রিজে না রেখে, সরাসরি আহার করে নাও, আর সরাসরি তার থেকে আবশ্যক পুষ্টি গ্রহণ করে নাও। ফ্রিজে রাখো আর যেখানেই রাখো, তাকে পচিয়ে বিনষ্ট করার প্রয়াস অবশ্যই করবে পরমাত্ম। যদি তাকে সরাসরি আহার করে নাও, যদি নিজেকে এই বিজ্ঞানের মধ্যে ডুবিয়ে দাও, তাহলে আর অহম না তোমাকে আর না তোমার এই বিজ্ঞানকে, কারুকেই স্পর্শ করতে পারবেনা। আর তাই পুত্রী, তোমার ছাত্রছাত্রীদের সেই ভাবে এই বিজ্ঞান ব্যক্ত করো, যাতে করে তারা বিজ্ঞানকে ধারণ করে, স্মৃতিতে রাখার প্রয়াসও না করে। স্মৃতিতে রাখলে, তা অহম অর্থাৎ আত্ম যেকোনো সময়েই বিনষ্ট করে দেবে, সর্বক্ষণ তাকে নোংরা করে দেবার প্রয়াস করবে, বিষিয়ে দেবার প্রয়াস করবে, এবং নির্দিষ্ট কিছু প্রয়াসের পর, সেই কর্মে সে সফলও হবে। কিন্তু বিজ্ঞানের মত করে তাকে আহার করে হজম করে নিলে, তা সমস্ত শিরায় উপশিরায় চলে যাবে পুষ্টি হয়ে। আর যেই আহার থেকে পুষ্টি গ্রহণ করা হয়ে গেছে, তাকে পচিয়ে দেবে, সেই সামর্থ্য কার আছে?”

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43