কৃতান্তিকা

দিব্যশ্রী জিজ্ঞাসু হয়ে প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা মা, তুমি সর্বক্ষণ বলো মাথা না চালাতে, অথচ তুমি যে সমস্ত যোজনার কথা বলেছ, তা যে শুধু মাথা খাটিয়েই, মানে বুদ্ধি খাটিয়েই লাভ হয়না, অত্যন্ত গভীর ভাবে বুদ্ধিকে প্রয়োগ করলে, তবেই তা লব্ধ হয়। অর্থাৎ এই বুদ্ধি চালানোর ব্যাপারে কিছু একটা গভীর রহস্য আছে, যা আমার বোধগম্য হচ্ছেনা। কৃপা করে, তা ব্যক্ত করো মা”।

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, গভীর নয়, অত্যন্ত লঘু এই রহস্য। হ্যাঁ, যতক্ষণ বোধগম্য হচ্ছে না, ততক্ষণ একে গভীর আর গুহ্য মনে হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক, তবে একবার তা বোধগম্য হয়ে গেলে দেখবে, অত্যন্ত সহজ আর সরল এই রহস্য।

পুত্রী, বুদ্ধি হলো জলতত্ত্ব। জলের স্বভাবই হলো বইতে থাকা। শরীরে থাকতে, অর্থাৎ এই বুদ্ধিকে সঙ্গে রেখে, তাকে তার নিজধর্ম থেকে কিভাবে চ্যুত করা সম্ভব পুত্রী!

একই ভাবে দেহ হলো ধরিত্রীতত্ত্ব। ধরিত্রীর স্বভাবই হলো অনুভব করা। শরীরে থাকতে, ইন্দ্রিয়রা থাকবে, তারপরেও অনুভব করা কি করে স্তব্ধ হতে পারে? তাঁর ধর্ম থেকে তাঁকে বিচ্যুত করবে কি উপায়ে?

পুত্রী, এঁদেরকে ধর্মচ্যুত করা উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু জীবের কাছে দুটি পথ খোলা থাকে, একটি হলো আত্মের পথ, আর অন্যটি চেতনার পথ।

আত্মের পথ হলো ভ্রমের পথ, আমিত্বের পথ, অহমের পথ, অহংকারের পথ, কল্পনার পথ, ব্রহ্মাণ্ড বিস্তারের পথ। আর চেতনার পথ হলো ভ্রমমুক্তির পথ, মাতৃত্বের পথ, আমিত্ব থেকে মুক্তির পথ, ব্রহ্মাণ্ড সঙ্কুচনের পথ।

আত্মের পথে, কর্তাভাবই সম্বল। আমার ইচ্ছা, আমার চিন্তা, আমার কল্পনা। সেখানেও জীব ক্রন্দন করে, কিন্তু সেই ক্রন্দন হয় আত্মের অর্থাৎ অহমের প্রতিষ্ঠালাভে ব্যর্থতার ক্রন্দন। সেখানেও জীব পীড়িত হয়, কিন্তু তা হলো আত্মের অর্থাৎ অহমের সম্মানহানির পীড়া। সেখানেও জীব আহত হয়, কিন্তু তা হলো আত্ম বা অহমের কল্পনাভঙ্গের অর্থাৎ স্বপ্নভঙ্গের আঘাত।

চেতনার পথেও ক্রন্দন থাকে, পীড়া থাকে, আঘাত থাকে। কিন্তু তা হলো সন্তানের বন্ধনের পীড়া, সেই বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে অনন্ত সামর্থ্যশালী সন্তানের নিজেকে হতভাগ্য ধারণা করার বেদনা, আর সেই সন্তানদের মুক্ত করতে না পারার ক্রন্দন।

অর্থাৎ পুত্রী, সেখানে থাকে সন্তানের পীড়া, আর তাই আমিত্বের বা অহমের বা আত্মের পীড়াকে চোখেও পরে না। বুদ্ধি তখনও চলে, শরীর তখনও অনুভব করে। কিন্তু অনুভূত হয় সন্তানের পীড়া, বুদ্ধি চলে সন্তানকে সেই বন্ধনের থেকে মুক্ত করার জন্য। আর তা করার জন্য কর্তা হতে হয়না, কারণ মাতৃত্ব স্বয়ং তখন বুদ্ধিকে চালিত করে সন্তানের মুক্তির মার্গ সন্ধান করার জন্য, শরীর ও তার ইন্দ্রিয়রা স্বতঃই তখন অনুভব করতে থাকে সন্তানের বন্ধনকে।

অর্থাৎ সন্তানের বন্ধনকে অনুভব করাই তখন ইন্দ্রিয়াদির মুখ্য কর্ম হয়, আর সন্তানকে বন্ধনমুক্ত করার যোজনা নির্মাণই তখন বুদ্ধির প্রধান কর্ম হয়ে ওঠে। কিন্তু পুত্রী, তখন আর কর্তা থাকেনা, অর্থাৎ মাতৃত্ব বা চেতনা স্বয়ং বুদ্ধিকে চালনা করেন, মাতৃত্ব বা চেতনা স্বয়ং অনুভবী শক্তির প্রসার করেন। এবার তোমার প্রশ্ন এই যে, আত্মের পক্ষ না নিয়ে চেতনার পক্ষ কি ভাবে গ্রহণ করবে, তাই তো!

পুত্রী, যখন কেউ মাতার কথা শোনেন, তাঁর মধ্যে দুই প্রকার প্রতিক্রিয়া হয়। একটি হলো মাতা হলেন সেই অসম্ভবভেদ্য কবচ, সেই কবচের অধীনে স্থিত থাকার ভাবের সঞ্চার হয়। আর দ্বিতীয় হলো মাতা হবার ভাব সঞ্চার হয়। পুত্রী, যখন মাতা নামক অভেদ্য কবচের আড়ালে লুকিয়ে থাকার ভাব সঞ্চারিত হয়, তখন অহমিকার উত্থান হয়, আত্মের উত্থান হয়, আমিত্বেরই আরাধনা হয়। অর্থাৎ আমি সুরক্ষিত থাকবো, আমি প্রতিষ্ঠা লাভ করবো, আমি সুখে থাকবো, আমার ইচ্ছা পুড়ন হবে মাতার ছত্রছায়ায় থেকে, আমার কল্পনা বা স্বপ্ন পুড়ন হবে মাতার কৃপায়, আমার চিন্তা দূর হবে মাতার কারণে, এই ভাবেরই সঞ্চার হয়।

আর অন্যদিকে যখন কারুর মধ্যে মাতা হবার ভাবের সঞ্চার হয়, তখন তিনি নিজের সুরক্ষার চিন্তা করেন না, নিজের চিন্তামুক্তির চিন্তা করেন না, নিজের ইচ্ছাপূর্তির চিন্তা করেন না, নিজের জন্য স্বপ্নও দেখতে পারেন না। কারণ তিনি যে মাতা, তিনি যে সন্তানের জন্যই বাঁচেন। তাই তাঁর একমাত্র চিন্তাই থাকে সন্তানের সুরক্ষা, একমাত্র ইচ্ছাই থাকে সন্তানের বন্ধনমুক্তি, কল্পনা করেন না তিনি, বাস্তবে থাকেন আর বাস্তবে সন্তানদের মুক্ত করতে ব্যকুল থাকেন।

অর্থাৎ যিনি মাতার অভেদ্য কবচের সন্ধানে থাকার প্রয়াস করেন, তিনি দায়িত্ব এড়িয়ে কেবল সুখ ভোগের জন্যই বাঁচেন, অহমের বিস্তার আর অহমের সন্তুষ্টিই তার কাছে সমস্ত কিছু। অন্যদিকে, যিনি মাতা হতে আগ্রহী, তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করতে সক্রিয়, আমিত্বের সুখনিদ্রা নয়, তাঁর কাম্য হয় তাঁর সন্তানদের সুখচিন্তা, মুক্তিচিন্তা, আর এইটিই হলো মোক্ষলাভের গুপ্ত দ্বার, এবং একমাত্র দ্বার। অর্থাৎ যিনি মাতার অভেদ্য কবচের নিচে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে চিন্তিত না হয়ে, মাতা হয়ে অভেদ্য কবচ উপহার দিতে আগ্রহী হন, তিনিই মোক্ষের অধিকারী, অন্য কেউ নন, কনো ভাবে নন, কনো অজুহাতে নন, এবং কনো কারণে নন।

এতো গেল, মাতা হলে কি হবে, সেই কথা। কিন্তু তার জন্য তো মাতার সঞ্চার হতে হবে। তাই না! … পুত্রী, তার জন্যই গ্রন্থের আবশ্যকতা। পুত্রী, এতাবৎ কাল ছিল ব্রহ্মদিবস, যেখানে আত্মের অর্থাৎ পরমাত্মের বা অহমের প্রসারই ছিল কালনিয়ত সত্য। আর তাই সমস্ত গ্রন্থ মাতার অভেদ্যকবচে সুরক্ষিত হয়ে ওঠার কথাই বলে গেছে।

আর যেই গ্রন্থরা তা বলেনি, তা কেবল এই কথাই বলে গেছে যে, মাতাকে ধারণ না করলে, কেউ তাদের সুরক্ষিত করতে পারবেনা। কে বলেছে এমন কথা? মহাভারত বলেছে, যিনি মাতা অর্থাৎ দ্রৌপদীর মানের চিন্তা করেন না, তাঁর বিনাশ আবস্বাম্ভিক; রামায়ণ বলেছে, যিনি মাতা সীতার সম্মান নিয়ে টানাটানি করবে, তিনি রাম হলেও, তাঁকে লক্ষ্মীছাড়াই হতে হবে, অর্থাৎ তাঁর থেকে লক্ষ্মী বিদায়ই নেবেন।

আর সেই সমস্ত কথা এতটাই সুপ্ত যে, সাধারণ পাঠকের পক্ষে সেই সত্য উদ্ধার করাই অসম্ভবপ্রায়। আর সেটিও খুব স্বাভাবিক, কারণ কালটি ব্রহ্মদিবস, আর ব্রহ্মদিবস ভ্রমের বিস্তারের কাল। ভ্রমের বিস্তারকে জানার কাল, আর ভ্রমের বিস্তারকে বিনষ্ট করার যোজনা নির্মাণের কাল। তাই সেখানে স্পষ্ট ভাবে চেতনার বিকাশের কথা বললেই, তার নাশ করা হবে, যেমন মার্কণ্ড মহাপুরাণের নাশ করা হয়েছে, আর যাকে বাছিয়ে রাখার এক প্রয়াস করেছিলেন বেদব্যাস মার্কণ্ড মহাপুরাণের স্থানে মার্কণ্ড পুরাণ নির্মাণ করে।

পুত্রী, এই কালে সমস্ত গ্রন্থ অহংকারের বিস্তারের কথাই বলেছে। সমস্ত বেদও, সমস্ত পুরাণও। কিন্তু এমন চললে, ব্রহ্মদিবসের অন্তের কালে আমি যখন আসবো, তখনও কনো মার্গ ধারণ করতে পারবো না। তাই আমার নবঅবতার বিভিন্ন উপায়ে চেতনার জাগরণের মার্গ বলে গেছেন, যাকে ধারণ করে আমি সম্পূর্ণ ভাবে জাগ্রত হতে পারি, কারণ আমি সম্পূর্ণ ভাবে জাগ্রত হওয়া মাত্রই ব্রহ্মদিবসের অন্ত হবে, আর ব্রহ্মরাত্রির আরম্ভ হবে।

তাই পূর্বের নব অবতারদের সমস্ত কীর্তি সত্য কথনের জন্য ছিলই না, তা ছিল আমাকে জাগরণের জন্য, কারণ সত্যকথনের ভার তো আমার। আর তাই আমি সত্য বলা শুরু করলাম, কৃতান্ত দ্বারা। বেদ, ত্রিপিটক, উপনিষদ, বেদান্ত, যা যা প্রশ্ন করেছিল আমাকে, আমি সমস্ত কিছুর উত্তর প্রদান করে গেলাম পুত্রী।

আর এবার থেকে আরম্ভ হলো, মাতৃত্বের যুগ, কারণ এবারের গ্রন্থসমূহ মাতার আশ্রয়ে নিজেদের সুরক্ষিত হবার কথা বলবে না, বলবে মাতা হয়ে ওঠার কথা, বলবে মাতা হয়ে সন্তানকে বন্ধনমুক্তির কথা। মুক্তির কথা আর বলবেনা কনো গ্রন্থ, এবার বলবে মোক্ষের কথা। আর কনো ধামে গিয়ে গচ্ছিত হয়ে যাবার কথা বলবে না, না কৈলাসে, না বৈকুণ্ঠে। সমস্ত লোক থেকে মুক্ত হবার কথা বলবে।

শুরু করে গেলাম আমি, আর এই কথা ধারণ করে করে, এবার থেকে চেতনার বিস্তারের কথাই কেবল চলবে, আর আত্মের বিস্তারের কথা চলবে না, কারণ ব্রহ্মরজনীর শুরু করে গেলাম আমি। কৃতান্ত, কৃতান্তিকা, অর প্রজ্ঞাসমূহ, এই মূলধারা আগামী যুগে দশক দশক বিজ্ঞানের রচনা করবে, যার শুরু হবে তোমার হাত ধরে, যা চলবে তোমার সখী শ্রীমতীর হাত ধরে আর যা বিস্তার লাভ করবে তোমাদের উত্তরসূরি মীনাক্ষী ও তাঁর তিনকন্যার হাত ধরে।

পুত্রী, আবারও বলছি, এই ব্রহ্মরজনীকে বাস্তবায়িত করার জন্য নবঅবতার এসেছিলেন, আর এ বাস্তবায়ন সম্ভব হতো না, যদি না আমি আসতাম। আমার আগমনকে মসৃণ করার উদ্দেশ্যে পূর্বের নবমহাবিদ্যার আগমন, ঠিক যেমন মার্কণ্ডও বলে গেছিলেন যে নবমহাবিদ্যার আবির্ভাবই হয়, মহাকালীকে জাগ্রত করার জন্য। আর এবার সেই রজনী উপস্থিত, আর তাই আত্মবিস্তারক কনো গ্রন্থকেই মানবচেতনা স্বীকার করবে না, না পূর্বস্থিত গ্রন্থদের আর না পরবর্তীতে আত্মবিস্তারক গ্রন্থ লিখলে, তা।

পুত্রী, আগামী হাজার বৎসরের মধ্যে মানব সমাজ কৃতান্তপূর্ব সমস্ত ধর্মগ্রন্থকে পত্যাখ্যান করবে, আর তাই তোমাদের উত্তরসূরি, মীনাক্ষী উপনিষদকে ও মহাভারতকে নবপত্রিকা দান করে, নূতন করে লিপিবদ্ধ করবে, যাতে তাদের মধ্যে গুপ্ত চেতনার বিকাশের কথাকে ব্রহ্মরাত্রিতেও রেখে দেওয়া যায়। বাকি কৃতান্ত পূর্বের একটিই ধর্মগ্রন্থ অবশিষ্ট থাকবে, আর তা হলো রামকৃষ্ণ কথামৃত।

তুমি বলবে সমস্ত কিছু বাংলা ভাষায় কেন? পুত্রী, এটিই আমার উপহার এই বঙ্গভূমির মানুষদের প্রতি। যেখানে সম্যক মানবকুল অহমিকার আরাধনায় উন্মত্ত ছিল ব্রহ্মদিবসে, সেখানে এই বঙ্গভূমি ও বঙ্গভূমির সন্তানরা চেতনার, প্রকৃতির, আদিশক্তির আরাধনা করে গেছেন, না বরদান প্রদত্তা জ্ঞানে নয়, মাতৃজ্ঞানে। আমাকে তারা মা জ্ঞানে, সমানে আরাধনা করে গেছে।

পুত্রী, যখন সকলে একটিই কর্ম করছেন, তখন সকলেই পুরস্কার লাভের পাত্র হন, তবে সেই পুরস্কারের মান কম হয়ে যায়, কারণ যিনি পুরস্কার স্বরূপ কিছু দিচ্ছিলেন, তিনি সেই একই পুরস্কারকে সহস্র ভাগে বিভক্ত করে দেন। কিন্তু যখন সকলের মধ্যে একজন মাত্র পুরস্কার প্রাপ্তির কর্ম করেন, তখন সমস্ত পুরস্কার সেই একজনকেই দেওয়া হয়ে থাকে।

আর তাই, সম্যক বঙ্গবাসীদেরকে আমি পুরস্কার স্বরূপ, একমাত্র সত্যবচন গ্রন্থধারা প্রদান করে গেলাম। এই বঙ্গভাষাতেই থাকবে কথামৃত, এই বঙ্গ ভাষাতেই থাকবে কৃতান্ত, কৃতান্তিকা, ও প্রজ্ঞাসমূহ আর এই ভাষাতেই থাকবে সমস্ত প্রজ্ঞাবিজ্ঞান। অর্থাৎ এই ভাষাই হবে, আগামী দিনের দিব্য নয়, ঐশ্বরিক ভাষা। শ্রেষ্ঠ ভাষা রূপে চিহ্নিত হবে তা, আর একদিন এই ভাষাই তাঁদেরকে জগতের পালকের আসনে স্থিত করে দেবে। এই হলো আমার সেই সন্তানদের প্রতি পুরস্কার, যারা ভ্রমের দিনেও, সত্যকে আঁকড়ে ধরেছিলেন।

পুত্রী, এই জাতি হলো মানবযোনির শ্রেষ্ঠসম্ভব মেধাবী জাতি, আর এই জাতি হলো মানবের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন জাতি। এই জাতি হলো মানবযোনির মধ্যে সর্বাধিক ভেদাভেদমুক্ত জাতি, আর এই জাতিই হলো একমাত্র জাতি যা ব্রহ্মসিবসে পুরুষের জয়জয়কারের কালেও প্রকৃতির আরাধক জাতি।

হ্যাঁ, এই জাতি তাদের অকৃত্তিম এবং অসমতুল্য মেধার জন্য সকলের কাছে অবহেলিত হয়েছে, তিরস্কৃত হয়েছে। পুরুষের আরাধনা না করে প্রকৃতির আরাধনা করেন এঁরা, তাই সম্পূর্ণ ভারতের আর্যজাতি এঁদের তিরস্কার করেছে, এঁদেরকে ভারতে রেখে, এঁদের থেকে সমস্ত খাদ্যদ্রব্য সম্ভোগ করেও, এঁদেরকে দাস করে রেখে দিয়েছে। এঁদের মেধাকে ভয় পেয়ে, এঁদেরকে দেশের উচ্চতম পদে স্থাপিত হতেও দেয়নি। ভেদভাবে বিমুখ বলে, এদেরকে পদেপদে হেনস্থা করেছে, মানুষের প্রকৃতি অনুসারে এঁরা উভোভজী বলে, এঁদেরকে নিকৃষ্ট জাতি বলেও চিহ্নিত করতে ছাড়ে নি।

না, আমি কারুকে দণ্ড দেবনা তাদের এই অভব্য আচরণের জন্য, কারণ সকলেই আমার সন্তান। কিন্তু হ্যাঁ, আমি সমস্ত বঙ্গবাসীর হাতে জগতের একমাত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ এবং সম্যক প্রজ্ঞা অর্পণ করে, তাদেরকে ভাবিকালের জগতের শাসক হবার মার্গ প্রদান করে দিয়ে গেলাম। এবার তাঁরা নিজেরা স্থির করবে, তাঁদেরকে এতকাল যারা পদদলিত করে এসেছে, তাদেরকে ক্ষমা করবে নাকি পদদলিত করবে।

পুত্রী, প্রতিটি চয়ন নিজের সাথে একটি করে পরিণাম নিয়ে আসে। তাদের চয়নই তাদেরকে পরিণাম প্রদান করবে, ঠিক যেমন তাদের এতাবৎকালের চয়ন তাদেরকে আজকে পরিণাম স্বরূপে সমস্ত কৃতান্ত, কথামৃত এবং প্রজ্ঞা উপহার দিল, তেমনই। কিন্তু মধ্যা কথা এই যে, মা হও। সমস্ত কৃতান্তধারার সারকথাই হলো মা হও। সম্যক কৃতান্ততীর্থ ও কৃতান্তক্ষেত্রের মধ্যাধ্বনিই হলো মা হও।

কৃতান্ত মায়ের আরাধনা করার কথা বলেনা, মা হবার কথা বলে। মায়ের কনো লিঙ্গ হয়না, সম্ভবই না। যিনিই নিজের প্রতিষ্ঠা চিন্তা ত্যাগ করে, কেবল ও কেবল নিজের সন্তানের বন্ধনমুক্তির জন্য চিন্তিত, তিনিই মা। যদি কনো স্ত্রী এমন করেন, তাহলে সেই স্ত্রীই হলেন মা। আর যদি কনো পুরুষ এমন করেন, তাহলে সেই পুরুষও হলেন মা।

আর স্ত্রী বা পুরুষ যেই বেশেই স্থিতা থাক না যে কেউ, তিনি যখন নিজের প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তা করছেন, বা সন্তানের মাধ্যমে নিজের প্রতিষ্ঠাকে লাভ করার প্রয়াস করছেন, তিনি কিছুতেই, কখনোই মা নন। যিনি সন্তানকে নিজের কল্পনা, নিজের স্বপ্নের মধ্যে বন্দি করে, সন্তানকে অভেদ্য বন্ধনে বন্দি করে দিতে আগ্রহী, তিনি আর যাই হন, মা হতে সক্ষম নন।

যিনি সন্তানের মেধাকে, প্রতিভাকে অনুসরণ না করে, নিজের কল্পনাতে সন্তানকে বন্দি করতে আগ্রহী, তিনি আর যাই হন মা হতে পারেন না। মা তিনি, যিনি সন্তানের প্রতিভাকে, মেধাকে পরমার্থের সাথে যুক্ত করে, তাঁকে সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্তি প্রদান করার জন্যই বাঁচেন। মা তিনি যিনি নিজের প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা করতেও ভুলে যান, যিনি নিজের সম্মানের চিন্তা করতেও ভুলে যান, যিনি নিজের কল্পনাকে দেখতেও ভুলে যান। তাই পুত্রী, মা হয়ে ওঠো। যখন মা হয়ে উঠবে, তখন কর্তা সেজে বুদ্ধিকে চালিত করতে হবেনা, তখন বুদ্ধি আপনাআপনিই চলবে, আর যখন তা চলবে, তখনই বুদ্ধির প্রকৃত সামর্থ্যকে প্রত্যক্ষ করতে পারবে, আর তখনই উপলব্ধি করতে পারবে, কেন মার্কণ্ড বলেছেন, ইয়া দেবী সর্বভূতেষু বুদ্ধিরূপেন্‌ সংস্থিতা”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43