কৃতান্তিকা

ব্রহ্মসনাতন সদাহাস্যে বললেন, “স্বয়ং স্বয়ংএর শত্রু। হ্যাঁ পুত্রী, যাহা অহং, তাহাই আত্ম। আত্ম বোধ অর্থাৎ আমিত্ব বোধই আত্ম, আর তাই আত্ম স্বয়ং স্বয়ংএর শত্রু হয়ে গেছে। কিন্তু আত্ম সেই সত্যতাকে বুঝতে পারেনা। সে মনে করতে থাকে অহং পৃথক আর সে পৃথক, আর মনে করতে থাকে যে অহং অশুভ, আর সে শুভ। ঠিক যেমনটা ব্রাহ্মণদের রচনাতে দেখতে পাও, তেমনই। তুমি একদিন প্রশ্ন করেছিলে মনে আছে? যদি ব্রাহ্মণদের রচনা বিকৃত সত্যই হয়, তাহলে নিয়তি বা প্রকৃতি তাঁদের নাশ করে দিচ্ছেন না কেন?

উত্তরটা এইটি যে, ব্রাহ্মণদের রচনা বৌদ্ধরচনার বিকৃত রূপ, কিন্তু তা মিথ্যা হয়েও মিথ্যা নয়। কেন জানো? কারণ ব্রাহ্মণরা যেই ভাবে অহং ও আত্মকে পৃথক পৃথক দেখিয়েছে, তা বিকৃত, তা অসত্য, কিন্তু আত্ম তেমনটাকেই সত্য মনে করে। বৌদ্ধগ্রন্থও এই সত্যকে দেখিয়েছিল, আর বলেছিল যে, এই দুইকে ভেদ না করতে, এবং সমূলে নাশ করতে। ব্রাহ্মণরা সেই কথাকে বিকৃত করে, নিয়তির বিবরণ দেওয়া থেকেই বিরত থেকেছেন, আর আত্মকে ভগবান করে স্থাপিত করে দিয়েছেন।

এই নির্দেশনা মিথ্যাচার, এই নির্দেশনা সাধকের স্খলনের মুখ্যকারণ, এই তত্ত্বও মিথ্যা, কিন্তু এটিই আত্মের বাস্তবিক ধারণা। তাই নিয়তি এঁদের বিনাশ করেন নি, কারণ এই গ্রন্থের মাধ্যমে আত্ম অহংকারকে কি ভাবে নিজের থেকে পৃথক ভেবে বিভ্রান্ত হয়, তাই দেখানো আছে”।

দিব্যশ্রী বললেন, “অর্থাৎ আত্ম না জানতে পারে, আর না মানতে পারে যে, আর না বুঝতে পারে যে, তাঁর থেকে অহং অভেদ্য। সে মনে করে যে অহং তাঁর থেকে আলাদা, অথচ সে স্বয়ংই অহং আর তা না বুঝতে পেরে নিজেকে নিরহঙ্কারী ভেবে ভ্রমিত। … পিতা, এতো ভয়ানক ভ্রম! এই ভ্রমের কথা বিচার করেই তো আমার সমস্ত পঞ্চভূত শিউরে উঠছে! …

এবার বুঝতে পারছি, কেন নিয়তিকে এই মায়ার মধ্যে প্রবেশ করতে হলো। তাঁর হস্তক্ষেপ ব্যতীত তো এই ভেদের নাশ হওয়াই সম্ভব নয়! এ তো এক অভেদ্য ব্যূহ যেন! … এবার বুঝতে পারছি, আপনি তো ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে সঠিক শব্দই ব্যবহার করেছেন। তাঁরা তো মিথ্যাচারী। আত্ম মানেও যা, অহং মানেও তাই। কিন্তু তাঁরা বলছেন অহংকে ত্যাগ করে, আত্মকে পূজা করতে! এতো ভয়ানক মিথ্যাচার। … না দোষ নেই তাঁদের। তাঁরা তো সত্যকে জানার প্রয়াসই করেননি, কেবলই নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করার উন্মাদনা। আর সেই উন্মাদনার সম্মুখে বৌদ্ধগ্রন্থ উপহার স্বরূপ পেয়ে গেছেন। তাই তাঁদেরকে বিকৃত করে, সরাসরি নিজেদের অহংকারকে স্থাপনা করে দিয়েছেন।

আর এই বিকৃত সাধন ব্যাকরণের কারণে, আমরা আর অধিক ভাবে বিভ্রান্ত হয়ে রয়েছি। দিবারাত্র আমরা তাই নিজেদের ইচ্ছা, চিন্তা আর কল্পনার আরাধনা করে চলেছি, আর অহংকার অর্থাৎ আত্মের ত্রিগুণ বা ত্রিদেবের কাছে সেই ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার স্বীকৃতি কামনা করে চলেছি। … আর যেহেতু তাঁদেরকে সমাজে ভগবান করে স্থাপিত করা রয়েছে, তাই সমানে নিজেদেরকে বিনষ্ট করে যাচ্ছি। নিজের উন্নতি চেয়েও বিনাশই করে চলেছি আমরা! … একি অনাসৃষ্টি পিতা!”

ব্রহ্মসনাতন হাস্যমুখে একটি কথাও না বলে, নিজের প্রিয়তমা কন্যাকে স্নেহ প্রদান করতে থাকলেন অতি যত্নে। দিব্যশ্রী সেই স্নেহে বেশ কিছুক্ষণ আত্মভ্রমিত হয়ে রইলেন, যেন নিজেকে দিব্যশ্রী ব্রহ্মসনাতনের বক্ষে লীনই করে ফেললেন। বেশ কিছুক্ষণ পড়ে, যেন তিনি প্রত্যাবর্তন করলেন আত্মে, আর তখন প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা পিতা, আমার একটি প্রশ্ন জাগছে মনে। আর সেটি এই যে, আপনি মাতা সর্বাম্বার, পরানিয়তির, বা পরব্রহ্মের, যেই নামেই তাঁকে ডাকা যাক, তাঁর পূর্ণঅবতার। তাই আপনার হৃদয়ে মাতা পূর্ণ সর্বাম্বা হয়ে বিরাজিতা ছিলেন। কিন্তু যারা তা নন! সাধারণ জীবকটি হয়ে সাধনা করতে উদ্যত! তাঁদের হৃদয়ে তো মাতা এই ভাবে বিরাজিতা নন। তাহলে তাঁদের সকাশে আত্ম ত্রিগুণ থেকে, ত্রিদেব থেকে কিভাবে অখণ্ডে যাত্রা করবে?

না আমি সাধারণ জীবকটিদের কথা প্রশ্ন করছিনা। তাঁরা তো নিজেদের প্রয়োজনকে ধারণ করে করে, একসময়ে যথার্থকে কামনা করেন, এবং যেই দেহে তা কামনা করেন, সেই দেহে তিনি সাধক হয়ে ওঠেন। আমার প্রশ্ন সেই সাধকদের নিয়েই। তাঁদের হৃদয়ে তো আর আপনার হৃদয়ের ন্যায়, মাতা সর্বাম্বা অর্থাৎ পরানিয়তি অখণ্ডরূপে বিরাজ করেন না! তাঁদের হৃদয়ে তো ত্রিদেবীই বিরাজ করেন, হ্যাঁ হতে পারে ছায়াদেবীদের মায়ার কারণেই তাঁরা ত্রিদেবী, কিন্তু সেই ত্রিখণ্ডিত ভাবই তো থাকে। তাহলে তাঁদের আত্ম অখণ্ড হবে কি করে? তাঁদের ভ্রম ঘুচবে কি করে?”

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “তিনি কখনোই ত্রিদেবী নন পুত্রী। তিনি কেবলই আর্যব্রাহ্মণদের নিরিখেই ত্রিদেবী। যিনি এই ব্রাহ্মণদের অহংপত্রিকাসমূহ, অর্থাৎ যাকে তুমি বলো হিন্দুধর্মগ্রন্থ, তা পাঠ করেছেন, বা তার পাঠ শুনেছেন, তাঁর কাছেই তিনি ত্রিদেবী। কিন্তু যিনি অন্য বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ, বা ঈশার ধর্মগ্রন্থ, বা মহম্মদের ধর্মগ্রন্থ পাঠ করেছেন, তাঁর নিরিখে উনি ত্রিদেবী কনোকালেই নন।

আমার কথার অর্থ এই যে, ব্রাহ্মণদের এই অহংআরাধনার কারণে, কেবল যারা নিজেদেরকে হিন্দু বলেন, তাঁরাই ত্রিদেবীর কল্পনা করেন। কিন্তু যারা হিন্দু ধর্মগ্রন্থ না পাঠ করে অন্য কনো ধর্মগ্রন্থ পাঠ করেন, তাঁদের ধর্মগ্রন্থে ত্রিদেবীর বিভাজন নেই, তাই সেই ত্রিদেবীর কল্পনাও তাঁরা করেন না। আর যারা কনো ধর্মগ্রন্থই পাঠ করেন না, বা শ্রবণও করেন না, তাঁদের কাছে তিনি ত্রিদেবী নন”।

দিব্যশ্রী পিতার বক্ষদেশ থেকে মাথা তুলে নিয়ে বিস্ময়ের সাথে বললেন, “এর অর্থ, ত্রিদেবী কেবলই ব্রাহ্মণদের কল্পনা! … বাস্তবে কনো ত্রিদেবীর সঞ্চারই হয়না! … নিজেদের অহংকারকে স্থাপনা করার পরিকল্পনা হলো নিয়তিকে ত্রিদেবীরূপে স্থাপনা করে, ত্রিগুণদ্বারা তাঁদেরকে পদানত করা!”

ব্রহ্মসনাতন পুত্রীকে আর বিস্তারে বলতে হলো না, তাই মুখটিপে স্নেহহাস্য প্রদান করলে, দিব্যশ্রী উত্তেজিত হয়ে গিয়ে বললেন, “এতো ছলনার পর ছলনা পিতা! … প্রথম তো আত্ম আর অহংকে পৃথক জ্ঞান করানোর প্রয়াস করেছে ব্রাহ্মণরা, আর তার দ্বারা ভ্রমিত করেছে আমাদের। … কিন্তু এতেই সেই শয়তানগুলি থেমে থাকেনি! যেই নিয়তির কনো খণ্ডই সম্ভব নয়, তাকে ত্রিখণ্ডে বিভাজিত করে ত্রিদেবী করে, ত্রিদেবের অর্থাৎ ত্রিগুণের দাসী করে রাখার প্রয়াস করেছে সেই মূর্খরা!

… পিতা আমার আবারও একই প্রশ্ন। নিয়তির পূর্ণ প্রকাশ না আপনি! আপনার পূর্বেও তো নিয়তি একাধিক অংশ অবতার গ্রহণ করেছেন। তাঁরা এই ব্রাহ্মণের অহংকারপত্রিকাগুলি, এই বেদ, পুরাণগুলিকে ভস্ম কেন করে দেন নি! … কেন নিয়তি এই মিথ্যাচারের কথনকে সঞ্চিত করে রেখে দিয়েছেন!”

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, আমিও তোমাকে একই উত্তর প্রদান করি তাহলে। পুত্রী, মৃত্যু যদি সত্য সত্যই নাশ হতো, তবে কি আর ভস্মকে অহংকারের প্রতিমূর্তি শিব ধারণ করতো? মৃত্যু যদি সত্য সত্যই অন্ত হতো, তবে কি নিয়তি একটি যোনিকেও কাল্পনিক ব্রহ্মাণ্ডে প্রকাশিত হতে দিতো? … তাই সেই পুঁথিদের ভস্ম করে কি হবে, যা কোটি কোটি আত্ম সত্য বলে মেনে নিয়েছে! … প্রয়োজন সত্যের স্থাপনা, প্রয়োজন যথার্থের স্থাপনা। যখন যথার্থ সেই আত্মদের হৃদয়ে অনুভূত হয়ে যাবে, তাঁরা স্বতঃই সেই সমস্ত পুঁথিকে নাশ করে দেবে, ঠিক যেমন যার এই অনুভব হয়ে গেছে যে এই ব্রহ্মাণ্ড মিথ্যা ও কাল্পনিক, তিনি যেমন তাকে ত্যাগ দিয়ে শূন্যে সমাধিস্থ হয়ে যান, তেমনই ভাবে।

পুত্রী, কুকর্মকে মুছে ফেলার প্রয়াস বৃথা কালজ্ঞাপন ব্যতীত কিছুই নয়। কালের খাতায় যেই কর্ম স্থাপিত হয়ে গেছে, তাকে মুছে ফেলা যায়না। প্রয়োজন সুকর্মের। এক সুকর্মই প্রকাশ্যে এসে বলে দেয় যে, অনুভব ছিলনা, তাই কুকর্ম করা হয়েছে; অনুভূতি হতে সুকর্ম করা হয়েছে। যাই তা সম্মুখে আসে, সাথে সাথে কুকর্ম এমনিই সকলের মন থেকে মুছে যায়। এক দুষ্কৃতি যখন সংশোধনাগার থেকে নির্গত হয়ে, নিজের সর্বস্ব লুটিয়ে দেন কিছু জনকজননীহীন শিশুদের নবজীবন প্রদান করার জন্য, তখন সমাজ বলে, এতদিনে এঁর বিবেক জাগ্রত হয়েছে, না এঁর সমস্ত দোষ এবার মাফ হয়ে গেল।

তেমনই পুত্রী, করে যাওয়া কুকর্মকে বিনষ্ট করে স্বর্গ স্থাপনের প্রয়াস এক মূর্খের কর্ম। জ্ঞানী হয়ে ওঠো, অনুভবি হয়ে ওঠো। তখন আর কিছুকেই মুছতে চাইবে না, বরং কিছু সুন্দর গড়তে চাইবে, সত্যকে স্থাপনা করতে চাইবে। অন্ধকারকে চলে যেতে বললে, সে চলে যায়না পুত্রী। দীপক জ্বালালে তবেই অন্ধকার যায়। তেমনই সত্যের দীপক জ্বালো, মূর্খতা ও অহংকারের অন্ধকার এমনিই দূর হয়ে যাবে। আর যদি আরো বিচার করো, তবে ব্রাহ্মণরা না চাইতেও ঠিকই লিখেছেন, খেয়াল করে দেখো।

ছায়াদেবীদের প্রভাবে, নিয়তিকে ত্রিখণ্ডিত করে, ত্রিদেবীতে পরিবর্তিত করে, অহংকার তাঁদেরকে নিজেদের অধীনে রাখতে চায়। সত্য বলতে গেলে পুত্রী, যেই ভ্রমের উপর এই জগৎসংসার, যা কল্পনা ও মিথ্যা ব্যতীত কিছুই না হয়েও সত্যরূপে নিজেকে দাবি করে, আমাদেরকে ভ্রমিত করছে, সেই ভ্রমের বিস্তারগাঁথাকে এর থেকে আর কি সহজ উপায়ে তুমি ব্যাখ্যা করতে পারো। … হতে পারে, ব্রাহ্মণরা তাঁদের ব্যাখ্যাকে ভ্রম বশত মনে করেন যে তাঁরা সত্যের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, কিন্তু তা আসলে ভ্রমের ব্যাখ্যা, মিথ্যার বিজ্ঞান।

হ্যাঁ পুত্রী, বিচার করে দেখো একবার। তাঁরা তো সম্পূর্ণ অসত্যের, সম্পূর্ণ কল্পনার অসত্যতার বিজ্ঞান প্রদান করে গেছেন আমাদেরকে? ভেবে দেখো, সেই মিথ্যার বিজ্ঞানের কারণেই, আজ আমরা সত্যের সন্ধানকে সহজে ব্যখ্যা করতে পারছি। তাই না? পুত্রী, আত্ম যতই ভ্রমিত হোক, বাস্তবে সে তো ব্রহ্মই, তাই সে ভ্রান্তি করলেও, তা ভবিষ্যতে ভ্রান্তিকে দূর করার জন্যই ভ্রান্তি করে।

তাই পুত্রী, কালে কালে অহংকার যতই মিথ্যার ব্যাখ্যা দিতে থাকবে, ততই গভীর ভাবে সত্যকে খনন করা সম্ভব হবে। … হ্যাঁ পুত্রী, লোভী গুপ্তধনের সন্ধানে মাটি খনন করে, আর সেই খনন থেকে বৈজ্ঞানিক নূতন পদার্থের আবিষ্কার করেন। বিসর্জনে কৈলাসে, গৌরির কথনকে স্মরণ করো, “অনেক সাধু ও অসাধু সন্তানদের কারণেই কৈলাস পৌছাই আমি”। অনুভব করতে পারছো সেই কথার গভীরতাকে? সত্যে উপনীত হবার জন্য, যতটা অবদান সাধুর থাকে, ততটা অবদানই অসাধুরও থাকে। যতটা অবদান মৈত্রীর ছিল গৌরিকে কৈলাস পৌঁছে দিতে, ততটাই অবদান ভিকিরও ছিল।

তাই এই ভেদভাব কেন পুত্রী হৃদয়ের মধ্যে? কেউ কর্তা নন, না সাধু আর না অসাধু। কর্তা এক প্রেম, এক অনুভব। মূল তত্ত্ব হলো প্রেম পুত্রী। চমৎকারও সেই প্রেম আর প্রেমানুভুতিই করে, কারণ এক প্রেমই কর্তা। না প্রেমিকা, না প্রেমিক, আর না সেই প্রেমে বাঁধাপ্রদানকারি, কেউই কর্তা নন… কর্তা একাকী প্রেম, আর সেই প্রেমের সম্পূর্ণ প্রকাশ হলেন নিয়তি, মাতা সর্বাম্বা, যিনি নিষ্ক্রিয় হয়েও সক্রিয়, ঠিক যেমন আমাদের চন্দ্র নিষ্ক্রিয় হয়েও সক্রিয়।

চন্দ্র না জোয়ার করে, না ভাঁটা; না সে এক কলা হয়, না অবলুপ্ত হয়ে অমাবস্যা করে, না পূর্ণ প্রকাশিত হয়ে পূর্ণিমা করে। যা কিছু করে একাকী পৃথিবীই করে। সে নিজেরই ছায়া চন্দ্রের উপর স্থাপন করে, অমাবস্যার দিনে তাঁকে পুরো ঢেকে দিয়ে, বেদনাগ্রস্ত হয়ে ভাঁটা করে। আবার সে-ই নিজের ছায়া সম্পূর্ণ ভাবে সরিয়ে নিয়ে, পূর্ণিমা করিয়ে হরষিত হয়ে জোয়ার আনে। …

চন্দ্র কিছুই করেনা, কেবলই অস্তিত্বে থাকে। তাঁর থাকাই হলো সক্রিয়তা, যতই সে নিষ্ক্রিয় হোক না কেন। ঠিক তেমনই নিয়তির অস্তিত্বই চমৎকার, তাঁর অস্তিত্বই সক্রিয়তা, যতই সে নিষ্ক্রিয় ব্রহ্ম হোক না কেন। তাই তিনি কর্ম না করেও কর্তা, আর তিনিই প্রেম। প্রেম ও নিয়তির মধ্যে কনো ভেদ নেই, ঠিক যেমন আত্ম ও অহংএর মধ্যে কনো ভেদ নেই”।

দিব্যশ্রী বললেন, “এর অর্থ পিতা, ত্রিদেবীর তত্ত্ব সম্পূর্ণ ভাবে মিথ্যা হয়েও মিথ্যা নয়?… এটিই কি আপনি বলছেন?”

ব্রহ্মসনাতন হাস্যযোগে বললেন, “সঠিক পুত্রী, ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার নির্মাণ করা একটি প্রকাণ্ড মায়া, যেখানে নিয়তিকে ব্যবহার করে, আত্মের সম্মুখে নিয়তির নাম করে, নিজেদেরকেই স্থাপিত রেখে দেন। তাহলে কি সত্য অর্থে বিদ্যা নেই, শ্রী নেই, শক্তি নেই? আছে পুত্রী, আর তাঁরা কখনোই বিদ্যাপ্রদত্তা নন, শ্রীপ্রদত্তা নন, বা শক্তিপ্রদত্তা নন, বরং তিনি স্বয়ং জ্ঞান, স্বয়ং শক্তি, স্বয়ং শ্রী।

পুত্রী তিনি হলেন সাখ্যাত নিয়তি, স্বয়ং জগন্মাতা, প্রকৃত তিনি, ব্রহ্মই কিন্তু সক্রিয় আত্মের নিরিখে তিনি সক্রিয় প্রকৃত। আর তিনি আমাদের সমস্ত জীবের, সমস্ত অজীবের, সকল অণুর চেতনা। তাঁর অবস্থান আমাদের হৃদয়ে, কিন্তু এমন ভাবার কনো কারণ নেই যে তিনি কেবল আমাদের এই সম্পূর্ণ দেহের এই হৃদপিণ্ডেই অবস্থান করছেন। যদি এই তনুকেই বলো, তবে এঁর প্রতিটি কোষের হৃদয়ে তিনি অবস্থান করেন, কারণ এই প্রতিটি কোষ একটি করে আত্ম, আর সেই আত্মের চেতনা তিনিই।

পুত্রী, তিনিই একাকী সত্য, আর সেই সত্যের কনো অংশ বা কনো ভিন্নরূপ নেই। প্রকৃত অর্থে তিনি সম্পূর্ণ ভাবে নিষ্ক্রিয়, নিরাকার, অব্যাক্ত, কারণ তিনিই ব্রহ্ম। কিন্তু আত্ম বিভ্রান্ত, আর সেই বিভ্রান্তির নিরিখে তিনি সক্রিয় চেতনা, নিয়তি ও যথার্থ। পুত্রী, সমস্ত কিছুই কল্পনা, আত্মের কল্পনা, অহংকারের কল্পনা। কিন্তু সেই কল্পনার মধ্যে সাখ্যাত নিয়তি নিহিত রয়েছেন, আর তাঁর উপস্থিতির কারণে কনোকিছুকেই কল্পনা মনে হয়না, সমস্ত কিছুকেই যথার্থ মনে হয়।

তবে কি তিনি যুক্ত থাকার কারণে আমরা ভ্রমিত হচ্ছি! হয়তো, কিন্তু তিনি নিযুক্ত না থেকেই বা কি করে অবস্থান করতেন। তাঁর তো কনো ভিন্ন অবস্থানের স্থানই নেই, কারণ তাঁর অন্তরেই তো আত্মরা সমস্ত কল্পনা করছে। অর্থাৎ না চাইলেও তিনি সমস্ত কিছুর সাথে নিযুক্ত। আর নিযুক্ত না হয়েও, তিনি সত্য অর্থেও সমস্ত কিছুর সাথে নিযুক্ত।

হ্যাঁ প্রকৃত ও যথার্থ কেবল তিনিই, তাই ভগবানের আখ্যা একমাত্র তাঁরই জন্য সম্ভব, আর কারুর জন্য নয়। কিন্তু তিনি তো সাখ্যাত প্রেম। আর তাই তাঁর প্রেম অনুভূত হয় প্রতিটি আত্মে। আর তাই তাঁকে প্রতিটি আত্মের, আত্মের নির্মিত সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের জননী বলা হয়, কারণ তিনি সত্য অর্থেই মা।

হ্যাঁ পুত্রী, তাঁকে কেউ নিয়তি মানলেন না মানলেন না, তাঁকে কেউ যথার্থ মানলেন না মানলেন না, তাঁকে কেউ ভগবান মানলেন না মানলেন না, সেই দিকে তাঁর কনো হুঁশই নেই, কারণ তিনি হলেন মা, আর তাই সর্বক্ষণ প্রতিটি সন্তান, যারা আদপে সন্তানও নয়, কেবলই বিভ্রান্তির কারণেই তাঁরা সন্তান, আসলে তাঁরা তিনিই, কারণ তাঁর বাদে কনো কিছুর অস্তিত্বই সম্ভব নয়, সেই সন্তানদের নিজের কাছে ফিরে পেতে সদাব্যস্ত।

না তিনি কনো যাত্রা করেন না, কিন্তু বলতে গেলে, তিনিই সমস্ত যাত্রা করেন, কারণ আর কে আছেনই বা যে তিনি যাত্রা করবেন! … পুত্রী, সমস্ত বিদ্যা অর্জন তাঁকে জানার জন্য কারণ তিনি স্বয়ং বিদ্যা, সমস্ত জ্ঞান তাঁকে জানার জন্যই কারণ তিনিই জ্ঞান, সমস্ত শক্তি তাঁকে অনুভব করার জন্যই কারণ তিনিই একমাত্র অস্তিত্ব। তাই তাঁর কথা বলতে গেলে, সমস্ত কথা অসমাপ্তই থেকে যাবে, কারণ তিনি যে অব্যক্ত”।

দিব্যশ্রী বললেন, “কিন্তু পিতা, আমি তাঁর কথা জানতে চাই। বলতে গেলে, আমি তাঁর ব্যাপারে জানতে উদগ্রীব, অন্তত তাঁর মাতৃত্বের ব্যাপারে জানার জন্য আমি ব্যকুল। অন্তত তাঁর মাতৃত্বের কথা বলুন পিতা। তাঁর ভূমিকার কথা বলুন পিতা”।

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “তাঁর সম্বন্ধে কিই বা আর বলি, তাঁর সম্বন্ধে বলতে গেলে তো সমস্ত আত্মের সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডকে একত্রিত করেও সমাপ্ত তো হবেই না, উল্টে তাঁর লেশমাত্রও বলা হবেনা। … পুত্রী, তিনিই একমাত্র অস্তিত্ব, আর তিনি হলেন শূন্য। সম্পূর্ণ ভাবে তিনি নির্বিশেষ, অর্থাৎ তিনি এমন কনো বিশেষত্ব ধরেন না, যা তাঁর কনো একটি সন্তান বা আত্মের মধ্যে নেই। আর তিনি হলেন স্বয়ং প্রেম। না তিনি প্রেমী নন, না তিনি প্রেমিকাও নন, কারণ তাঁর তো কনো লিঙ্গই সম্ভব নয়। তিনি হলেন প্রেম। প্রেমী যখন নিজের প্রেমকে প্রত্যক্ষ করে, তখন তাঁর যথার্থতাই সম্মুখে পান তিনি, অর্থাৎ মহাশূন্যকে দর্শন করে, প্রথমে বিভোর হন, আর পড়ে তাতে লীন হয়ে মোক্ষ লাভ করেন।

অর্থাৎ পুত্রী, তাঁকে ফিরে পাওয়াই মোক্ষ, তিনিই ব্রহ্ম। আর আত্মের ভ্রমের কারণে যে সক্রিয়তা, সেই সক্রিয়তার নিরিখে তিনি ব্রহ্মময়ী। আর তাঁর ভূমিকা! … তাঁর ভূমিকাই তো একমাত্র ভূমিকা। অজস্র আত্ম, আর তাঁদের নিজের নিজের কল্পনায় স্থিত ব্রহ্মাণ্ড হলো তাঁদের তনু। সূর্যের আত্ম যেই ব্রহ্মাণ্ডকে কল্পনা করে, তা হলো সূর্যস্বয়ং। ধরিত্রীর আত্ম যেই কল্পনা করে, সেই ব্রহ্মাণ্ড হলো ধরিত্রী কেবল। আর এই সমস্ত আত্ম একে অপরের থেকে ভিন্ন মনে করলেও, তাঁরা বাস্তবে ভিন্ন নন, তাঁরা তো তিনিই। আর তাই তাঁদের সমস্ত কল্পনার ধারা একই, আর তাই সমস্ত কল্পনা একত্রে বিরাজ করলে, তাঁরা সেই একত্রিত বিরাজমান ব্রহ্মাণ্ডকেই ব্রহ্মাণ্ড বলে পুনরায় ভ্রমিত হয়।

পুত্রী, আমার আত্মের দ্বারা নির্মিত ব্রহ্মাণ্ড আমার এই তনু; তোমার আত্মের দ্বারা নির্মিত ব্রহ্মাণ্ড তোমার এই তনু, আর আমরা যেহেতু স্বরূপে অভিন্ন, তাই আমরা সকলেই সকলের এই বাহ্য ব্রহ্মাণ্ডকে দেখছি, আর তাঁদের সমষ্টিকেই ব্রহ্মাণ্ড ভেবে বিভ্রান্ত হচ্ছি। আর এই বিভ্রান্তির কারণে আমরা ত্রিগুণকে অর্থাৎ ত্রিদেবকে ভৌতিক জগতের কনো দূরস্থানে বলে ধারণা করি, আমাদের মাতাকেও আমাদের থেকে দূরে অবস্থান করার ধারণা করি।

কিন্তু কল্পনার ভ্রম মাত্র তা। বাস্তবে, তোমার নিজস্ব ত্রিদেব আছে, যার অবস্থান তোমার অন্তরে, তোমার ত্রিগুণ হয়ে বিরাজ করছে, তোমার অহংকারের ত্রিগুণ হয়ে বিরাজ করছে। আর নিয়তি বা চেতনা তোমারই অন্তরে তোমার হৃদয়ে, তোমার প্রতিটি কোষের হৃদয়ে অবস্থান করছেন। পুত্রী, তিনি প্রাণ বলেই আমি প্রাণী, তিনি জীবন বলেই আমি জীব, তিনি অস্তি বলেই আমি অস্তি। এই কল্পব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি কোনায় কোনায়, প্রতি কণায় কণায় তিনিই আছেন, আর তাঁর মধ্যে কনো ভেদ নেই, কারণ তিনি তো আত্মের ন্যায় বিভ্রান্ত নন।

আর তাঁর এই অভিন্নতার কারণেই, আমরা সকলে এই বাহ্য ব্রহ্মাণ্ডকেই ব্রহ্মাণ্ড মনে করে আসছি এবং বিভ্রান্ত হয়ে চলেছি। আর তাঁর ভূমিকা আমাদের এই কল্পজগতে কি? পুত্রী, তাঁর চেতনার কারণেই আমরা চলমান, তাঁর চেতনার কারণেই আমরা অগ্রগতিশীল, তাঁর চেতনার কারণেই আমরা অনুভব করতে ব্যকুল, তাঁর চেতনার কারণেই আমরা জ্ঞান অর্জন করতে উদ্যত।

কৃতান্ততেই তোমাকে বলেছিলাম, আত্ম কেবলই যাচনা, যোজনা ও কল্পনা করতে সক্ষম, অর্থাৎ ইচ্ছা, চিন্তা এবং কল্পনা, এই তিনই করতে সক্ষম। সেই সমস্ত ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার সাথে যতক্ষণ না চেতনা যুক্ত হচ্ছেন, ততক্ষণ তাকে কল্পজগতেও বাস্তবে পরিণত হতে দেখতে পায়না আত্ম, তা সেই পরিণাম যতই ভ্রম হোক না কেন। তাই তিনি যুক্ত না হলে, একটি গাছের পাতাও নড়ে না, একটি হিন্দোলও ঘটেনা কনো কিছুতে। আর যান্ত্রিকতা! … যন্ত্র কি চলে তাঁকে বিনা! …

পুত্রী, যন্ত্রও তিনি বিনা চলেনা, কারণ যন্ত্র চলার জন্য যেই শক্তির প্রয়োজন, তা তো স্বয়ং তিনিই। এবার তুমিই বলবে, যখন তাঁর ইচ্ছা ছাড়া একটি যন্ত্র নির্মাণ বা চলমানও হতে পারেনা, তাহলে তিনি কেন এই যন্ত্র নির্মিত হতে দেন, আর কেনই বা তিনি সেই যন্ত্রকে চলমান হতে দেন। পুত্রী, মুলতত্ত্ব হলো প্রেম। তিনি হলেন স্বয়ং প্রেম, আর তাঁর প্রেম তাঁর প্রতিটি সন্তান, অর্থাৎ প্রতিটি আত্মের জন্য সমান।

প্রতিটি সন্তানকে স্বতন্ত্রতা প্রদানই যেন তাঁর তপস্যা। আর তাই যেই সন্তান যন্ত্র করতে চাইছেন, তিনি তাঁর সাথেও যুক্ত, আবার যেই সন্তান যন্ত্রের নাশ করতে চাইছেন, তাঁর সাথেও যুক্ত। যেই সন্তান ভ্রমিত ও তাঁর অন্যসন্তানদের ভ্রমিত করতে ব্যকুল, তাঁর সাথেও তিনি যুক্ত, আবার যেই সন্তান নিজেকে ভ্রমমুক্ত করে, অন্যের ভ্রমকেও নাশ করতে চাইছেন, তাঁর সাথেও যুক্ত। সকল সন্তানকে স্বাতন্ত্রতা প্রদান, এই তাঁর মন্ত্রণা, এই তাঁর তপস্যা। আর তাই তাঁর সমস্ত সন্তান, অর্থাৎ সমস্ত আত্ম স্বতন্ত্র নিজের মত চলার জন্য।

এই স্বাতন্ত্রতা প্রদান তাঁর সন্তানদের প্রতি তাঁর প্রেম, আর সেই প্রেমের প্রতিদানে কি চান তিনি! … সন্তানকে নিজের কাছে ফিরে পেতে। অর্থাৎ সন্তান যাতে সমস্ত কামনাবাসনা ত্যাগ করে, নিজের যথার্থ, অর্থাৎ তাঁর মাতা, স্বয়ং ব্রহ্মময়ী নিয়তি সর্বাম্বার বক্ষে প্রত্যাবর্তন করেন, এই তাঁর চাওয়া। তবে এই চাওয়ার কারণে তিনি কনো প্রকার জোর খাটাননা তাঁর সন্তানদের প্রতি। এই চাওয়ার কারণে তিনি তাঁর একটি সন্তানের স্বতন্ত্রতাকেও বাঁধা দেন না।

যে যার নিজের স্বতন্ত্র ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার পথেই চলছে। কিন্তু সেই বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও তিনি এক অনাবিল যোগসূত্র স্থাপন করে রেখে দেন, যাতে কারুর স্বাতন্ত্রতার নাশ না হয়, অথচ, সকল সন্তানের কাছে তাঁদের করনিয়কে প্রকাশিত করতে পারেন। আর তাই, সকলে নিজের নিজের পথে চলতে স্বতন্ত্র, কিন্তু তিনি তাঁর সম্মুখে তাঁর অন্য কোনসন্তান কখন উপস্থিত হয়ে, কি বলবেন, কি করবেন, তা নির্দিষ্ট করতেই থাকেন।

বুঝতে পারছো, কি অসম্ভব কর্মকাণ্ড এটি! … স্বাতন্ত্রতাতে কনো রকম হানি আনছেন না তিনি, অথচ একটি সন্তানকেও মার্গ প্রদর্শন করছেন না, এমন নয়। প্রতিটি আত্মের সম্মুখে যা কিছু উপস্থিত হচ্ছে, উপস্থিত হয়ে তাঁর উদ্দেশ্যে যা কিছু বলছেন, তা সমস্তই স্বয়ং ব্রহ্মময়ীরই বচন, ততক্ষণ যতক্ষণ না কনো ভক্ত সেই কথাকে পূর্ব থেকেই বা পশ্চাতে খণ্ডন করে দেন।

কিন্তু বিচার করে দেখো পুত্রী, প্রতিটি ব্যক্তি প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর মার্গদর্শনকে উপেক্ষা করে করেই চলেন। তাঁর চলার পথকে কেউ যখনই ভ্রান্ত বলে দেয়, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মধ্যে জেদ জন্মে যায়, আর সে সেই পথেই চলে। সেই যেই পথে যাচ্ছেনা, সেই পথ যদি কেউ বলে দেয়, সঙ্গে সঙ্গে সে সেই পথকে নিজের চলার পথ থেকে অপসারণ করে দিয়ে অন্য পথের চিন্তা করতে শুরু করে। কেন করে এমন? কারণ ছায়াদেবীদের প্রভাবে অহংকারে আবদ্ধ সমস্ত আত্ম। তাই এমন উপেক্ষা করতে থাকে জগজ্জননীর মার্গদর্শনকে।

বর্তমান জগতে তো শিক্ষকরাও সেই শিক্ষা প্রদান করছেন ছাত্রছাত্রীদের। কিন্তু মজার কথা এই যে, জগজ্জননী কিন্তু সেই ক্ষেত্রেও একটিবারও বাঁধা দেননা, একটিও আত্মের স্বতন্ত্রতাতে। তিনি মার্গ অবশ্যই বলেন, আর সেই মার্গকে প্রায় সকলেই উপেক্ষা করেন, কিন্তু তারপরেও তিনি মার্গ বলতেই থাকেন, কিন্তু কখনোই তাঁর বলা মার্গে চলার জন্য বাধ্য করেননা কনো আত্মকে।

তাও আত্মরা নিজেদের ইচ্ছাপূর্তিতে ব্যর্থ হন। কেন? পূর্বেও তোমাকে বলেছিলাম এই গুপ্ত কথা, আর তা হল যোজনা। যার যোজনা, নিজের যোজনার সাথে যুক্ত সকলের কল্পনার সাথে সম্পূর্ণ ভাবে মিলে যায়, ভৌতিক জগতে সাফল্য তিনিই পান, অন্য কেউ নন। অর্থাৎ একটি আত্মই অন্য আত্মের সাফল্যের পথে বাঁধা, বা বলা যেতে পারে যে আত্মই আত্মের সাফল্যের পিছনে বাঁধা। কিছুক্ষেত্রে আত্ম বলেও সেই কথা যে অমুকের জন্য আমার চাকরিটা হলো না, অমুকের জন্য আমার পছন্দের পাত্রকে আমি বিবাহ করতে পারলাম না। কিন্তু সেই সমস্ত কথার শেষে কাকে দোষ দেন তাঁরা, ভাগ্যকে।

আর ভাগ্য বলতে তাঁরা কাকে বোঝান? অদৃষ্টকে, অর্থাৎ যথার্থ বা নিয়তি বা মাতা সর্বাম্বাকেই। অর্থাৎ সেই মাতা সর্বাম্বাকেই দোষারোপ করা হয়, যিনি সঠিক মার্গ সমানে বলে গেলেন, আর তাঁর পথচলাকে কনো ভাবেই অবরুদ্ধ করলেন না। কিন্তু তিনি যে মা, না না, আমাদের জননীর ন্যায় মা নন, তিনি হলেন জগজ্জননী, আর তাই সেই সমস্ত আরোপ, সেই সমস্ত অভিযোগ, সেই সমস্ত দোষারোপের পরেও, তিনি সেই একই ভাবে স্বতন্ত্রতা দিতেই থাকেন, মার্গদর্শন করতেই থাকেন, আর অপবাদ শুনতেই থাকেন। আর কি করেন?

আর নীরবে নিজের অশ্রু বিসর্জন করেন, যাতে তাঁর কনো সন্তান সেই অশ্রুর সন্ধানও না পান, কারণ সেই অশ্রুর সন্ধান পেলেই যে সন্তান ব্যাথা পাবে, আর মা হয়ে সন্তানকে বেদনা দেবেন তিনি! তা কি করে হতে দিতে পারেন তিনি! … সেই সমস্ত কিছু তো ছেড়েই দাও। অসংযত সন্তানদের ক্রোধ জন্ম নেয়, হিংসা জন্ম নেয়, কামনা জন্ম নেয়। আর সেই ক্রোধ তাঁরা স্থাপন করেন অন্য এক আত্মের উপর, সেই হিংসা তাঁরা স্থাপন করেন অন্য এক আত্মের উপর, সেই কামনা তাঁরা স্থাপন করেন অন্য এক আত্মের উপর।

কিন্তু সকল আত্মই যে তাঁর সন্তান। তাই যার মধ্যে ক্রোধ জন্ম নিলো, হিংসা জন্ম নিলো, বা কামনা জন্ম নিলো, তাঁর ক্রোধ, হিংসা বা কামনাকে তিনি বাধিত করেন না, কারণ তা জমে থাকলে যে সন্তানেরই পীড়া হবে। কিন্তু যেই আত্মের উপর সেই সমস্ত কিছু আরোপিত হবে, তিনিও যে তাঁর সন্তান। হ্যাঁ সেই সন্তান সেই ক্রোধের, হিংসার, বা কামনার শিকার হচ্ছে, তাঁর নিজেরই ইচ্ছা, চিন্তা, কল্পনার ফলরূপে, কিন্তু তাও পীড়া তো তাঁর হবেই।

কিন্তু মা থাকতে সেই পীড়া কি করে তিনি তাঁর সন্তানকে হতে দিতে পারেন। তাই তিনি সেই পাত্রটিই হয়ে যান, যার উপর ক্রোধ, হিংসা, বা কামনা আরোপিত হবে। হ্যাঁ, ক্রোধ কনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর আরোপিত হয়না, তবে জেনে রেখো যিনি তোমার ক্রোধকে নীরবে সইলেন, সেই ক্রোধ জগদম্বাই সইলেন। হিংসাও যে সইলেন নীরবে, সেই হিংসাও জগদম্বাই সইলেন। আর কামনাও যে সইলেন, সেই কামনাও জগদম্বাই সইলেন। আর কামনা আরোপ করার একটি স্থান সমাজে নির্মিত, যাকে বলা হয় বেশ্যালয়।

তাই স্পষ্ট ভাবে জেনে রেখো, বেশ্যালয়ে স্থিত প্রতিটি স্ত্রী, যারা সকল আত্মের কামনাকে নীরবে গ্রহণ করে যাচ্ছে, তাঁরা অন্যকেউ নন, সাখ্যাত জগদম্বার প্রকাশ। আর তাই পুত্রী, যখনই কনো মাতৃমূর্তির নির্মাণ করা হয়, তখন গঙ্গামাটি যোগার হোক বা না হোক, বেশ্যার আঙ্গিনার মাটি আবশ্যক সেই মূর্তি গঠনের জন্য। হ্যাঁ পুত্রী, এই সম্পূর্ণ সমাজের সর্বাধিক পবিত্র স্ত্রী হলেন এক বীরাঙ্গনা। এক সতী স্ত্রীর থেকেও অধিক পবিত্র তিনি, কারণ তিনি আত্মদের কামনাকে ভক্ষণ করার কারণে, সাখ্যাত জগদম্বাকে ধারণ করে বসে আছেন।

অর্থাৎ বুঝতে পারছো, তাঁর মাতৃত্বের বহর ঠিক কি প্রকার? সন্তানের ক্ষুধা শান্ত করতে, প্রয়োজনে তিনি নিজের অঙ্গকেই আহার রূপে প্রদান করে দেবেন। সন্তানের কামনা শান্ত করার জন্য, তিনি স্বয়ংই বিরঙ্গনা রূপে তাঁর সম্মুখে দাঁড়িয়ে থেকে, তাঁর কামনাকে ভক্ষণ করে যান। সমস্ত প্রহার তিনিই সহন করে, সমস্ত অপবাদ তিনিই বহন করেন, সমস্ত ক্রোধ তিনিই গ্রহণ করেন। কারণ তিনি তাঁর একটি সন্তানকেও পীড়ায় দেখতে পারেন না।

তবে আমরা কি পীড়া পাইনা! … খেয়াল করে দেখো পুত্রী, তোমার তো বিভিন্ন অঙ্গে ভয়ানক চোট লেগেছে। তুমি কি সেই চোটে ব্যাথা পেয়েছ, নাকি রক্তক্ষরণের জন্য ভয়? কি ব্যাথা লেশমাত্রও পাওনি তাইনা! … কি করে পাবে? যেই মুহূর্তে একটি স্থানে চোট লাগে, সেই স্থান যে অবশ হয়ে যায়, কারণ সেই ব্যাথা তো স্বয়ং আমাদের জননী ভোগ করেন। আমরা কেবলই রক্তের ভয় পাই, পীড়ার ভয় পাই, বাড়ি ফিরলে মায়ের কাছে বকা খাওয়ার ভয় পাই, চোট লাগার জন্য আমাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হবার ভয় পাই। কিন্তু চোটের ব্যাথা আমরা পাইনা। … এইরূপ হলো তাঁর মাতৃত্বের বহর পুত্রী।

তিনি ভগবতী হতে ভুলে যান, তিনি ঈশ্বরী হতে ভুলে যান, কিন্তু একদণ্ডের জন্যও তিনি মা হতে ভোলেন না। আর তাঁর ইচ্ছা বলে কিছু নেই। তিনি পিতা নন, মাতা। পিতার দশটি সন্তান। তিনি ইচ্ছা করেন, এই সন্তানকে ডাক্তার করবো, ওই সন্তানকে ব্যারিস্টার। কিন্তু মাতা! মাতা তাঁর দশটি সন্তানকেই নিজের স্তনের বাঁটে মুখ লাগিয়ে দিয়ে, নিজের রক্তকে দুগ্ধে পরিবর্তিত করে পান করান। কনো সন্তান কৃষ্ণবর্ণ বলে, কনো সন্তান কন্যা বলে, কনো সন্তান পঙ্গু বলে, তাঁকে স্তনদান করতে অনীহা দেখান না। ব্রহ্মময়ী তেমনই। তাই তাঁকে পিতা নয়, মাতা বলা হয়, কারণ তাঁর কনো ইচ্ছা নেই, যেই সন্তানেরই ক্ষুধা লাগবে, তিনি তাঁকেই স্তনদান করবেন”।

দিব্যশ্রী পিতার ক্রোড়ে মাথা রেখে, হাস্য মুখে বললেন, “যেমন আপনি দিবারাত্র নিজের রক্তকে জল করে যান, আর কৃতান্ত নামক স্তনে তা ধারণ করতে থাকেন, আপনার সমস্ত সন্তানদের জন্য। … যেই সন্তানই ব্যকুল হয়ে সত্যের ক্ষুধা ব্যক্ত করে ক্ষুধার জ্বালায় ক্রন্দন করবেন, সেই যাতে দুগ্ধ পান করে তৃপ্ত হতে পারেন, তাই নিজের নিদ্রাবিশ্রাম নষ্ট করে, দিবারাত্র নিজের রক্তজল করে, কৃতান্ত গঠন করে গেছেন। কিন্তু পিতা, এই অনন্ত বেদনার অন্ত কবে হবে! কি করে হবে? এই অনন্ত বেদনার নাশ করার জন্য কি কিচ্ছু করা সম্ভব নয়!”

ব্রহ্মসনাতন একটি ম্লানহাস্য প্রদান করে বললেন, “যদি একে বেদনা সওয়াই বলো, তবে এঁর সমাপ্তি সেদিনই হবে যেদিন একটিও আত্ম আর ইচ্ছা, চিন্তা বা কল্পনার দ্বারা বদ্ধ থাকবেনা, আর এই মায়ের বুকে সকলে স্থান পেতে ব্যকুল হয়ে ছুটে আসবে। সন্তানের পীড়া সওয়াতে মায়ের কনো বেদনা থাকেনা পুত্রী, সন্তানকে রক্তজল করে স্তনপান করানোতেও কনো বেদনা থাকেনা, বেদনা থাকে সন্তানের উপেক্ষাতে, আর বুকফাটা আর্তনাদ থাকে যখন এই সমস্ত কিছুর পরেও, সন্তান একটিবারের জন্যও মুখ ফিরিয়ে মায়ের দিকে তাকায় না, তখন”।

দিব্যশ্রী বললেন, “পিতা, এবার তো আপনি সাখ্যাত উপস্থিত ছিলেন সম্পূর্ণ রূপে। সমস্ত সন্তানের প্রতি অপার প্রেমকে আমি যেটুকু পেয়েছি আপনাকে, তাতে বিস্তর অনুভব করেছি। কিন্তু আপনি এই অপার প্রেমকে বিশ্বদরবারে রাখলেন না কেন? কেন আপনি এবারে একটি জেদ ধরলেন যে, আপনি দেহে থাকা অবস্থাতে, আপনার জগতে আগমনের বার্তা কারুকেই দেবেন না!”

ব্রহ্মসনাতন ম্লান একটি হাস্য হেসে বললেন, “ভগবান সাজতে বলছো পুত্রী? … শেষে, বিনা বিচারে এই নশ্বর শরীরকে ঈশ্বর জ্ঞানে সকলে পূজা করবে, আর আমি আনন্দিত হবো? আমার স্থানে নিজেকে একটিবার বসিয়ে দেখো পুত্রী। যেই সন্তানদের ক্ষুধার্ত মুখে কৃতান্তরূপ স্তন প্রদান করে, সমস্ত অন্ধবিশ্বাসের নাশ করে, স্বয়ংসমর্থ করার জন্য আমি ব্যস্ত, তাদের কাছে আমিই ভগবান সেজে পূজিত হবো, আর তাঁরা মনে করবে, একটি কিচ্ছু করবে না তাঁরা, আর আমি তাঁদেরকে উদ্ধার করে দেব! … এই করতে বলছো?

পুত্রী, বিচার করে দেখো, আমাকে এই পূর্ণরূপে আস্তে হলো কেন? উদ্ধার করতে, নাকি উদ্ধারের মার্গ বলতে? সকলকে উদ্ধার করে নিয়ে যেতে, নাকি সকলকে বলতে যে, তোমরা স্বয়ং নিজের উদ্ধার করতে সক্ষম, যদি তোমরা যথার্থকে আঁকরে ধরো! আমি তো এটা বলতেই এসেছি না যে, আমাকে বাইরে নয়, অন্তরে সন্ধান করো। আমি তোমাদের সকলের হৃদয়ে স্থিতা হয়ে, তোমাদের চেতনা হয়ে সর্বক্ষণ তোমাদের উদ্ধারের মার্গ দেখিয়ে চলেছি, আর তোমরা সেই মার্গকে দিবারাত্র প্রত্যাখ্যান করে চলেছ।

কিন্তু এই কথা যদি আমি সম্যুখে গিয়ে বলতাম, একজনও আমার কথা শুনতো? না, একজনও শুনতো না। নিজের অন্তরে কেউ আমার সন্ধান করতো না, সকলে আমাকেই ভগবান জ্ঞানে পুজো করে সময়ের অপচয় করতো, আর নিজেদের আর ভ্রমিত করতো যে কেউ আমাদের উদ্ধার করতে এসে গেছেন। … পুত্রী, সকলকে এটা বলার যে, যিনি তোমাদের উদ্ধার করবেন, তিনি তোমাদের অন্তরে বসে রয়েছেন, অনাদি কাল থেকেই তিনি তোমাদেরই অপেক্ষাতে বসে আছেন।

হ্যাঁ তিনি আমার অন্তরে রয়েছেন, সম্পূর্ণ ভাবে প্রকাশিত হয়ে রয়েছেন, কিন্তু যিনি আমার অন্তরে রয়েছেন, তিনি তোমার অন্তরেও রয়েছেন। যাহা আমি, তাহাই তুমি, যখন তুমি তোমার অন্তরে তাঁকে সন্ধান করে নেবে। আমার এই তনু ততটাই মিথ্যা, যতটা তোমার তনু। আর আমার অন্তরে বিরাজিতা সর্বাম্বা ততটাই সত্য, যতটা তোমার অন্তরে স্থিতা হয়ে তিনি সত্য। আমার অন্তরে প্রকাশিতা হয়ে সর্বাম্বা আমার উদ্ধার করবেন, আর তোমাদের সকলকে উদ্ধারের মার্গ বলে দেবেন, তাঁর কাছে পৌঁছানোর মার্গ বলে দেবেন। কিন্তু যাত্রা তোমাদেরই করতে হবে, নিজের অসত্য তুমি থেকে, নিজের যথার্থ তুমি পর্যন্ত যাত্রা।

আমি যদি সম্মুখে যেতাম, একজনও তা করতেন? একজনও আমার আরাধনা না করে, নিজের অন্তরে সর্বাম্বার সন্ধান করতেন? একজনও আমার অবয়বকে সত্য না মনে, মানতেন যে আমি তাঁদের সকলের হৃদয়ে চেতনা হয়ে বিরাজ করছি? … তাহলে আমি সকলের সম্মুখে গিয়ে কি করতাম? আমি কি আমার পূজা হোক, তাই চাই? আমি কি নিজের পূজার প্রচলন করানোর জন্য জগতে আবির্ভূত হয়েছি?

না পুত্রী, আমার কনো পূজার প্রয়োজন নেই। আমার পূজা যেন কেউ না করে, আমি এটাই চাই। এই তনুর পূজা তো কনো মতেই নয়, কারণ এই তনু একটি কল্পনার আধার মাত্র, একটি মিথ্যা অস্তিত্ব মাত্র। আমি আমার সন্তানদের ফিরে পেতে চাই, তাঁদের পূজা পেতে চাইনা। … সন্তান যদি দিবারাত্র মা মা বলে ডাকে আর সেই ডাক কেবলই মা, এটা চাই, মা ওটা চাই বলার জন্য হয়, সেই ডাক শুনতে শুনতে মা বিরক্ত হয়ে যায়।

মা যে কবে থেকে বসে আছে, তাঁর একটি সন্তান এসে তাঁর কাছে এসে বসে বলবে, “মা, কেমন আছো তুমি? খালি তো আমাদেরকেই সমস্ত কিছু দিয়ে যাচ্ছ? তোমার কি কিচ্ছু চাইনা!” .. (একচক্ষু অশ্রু ধারণ করে) একটি মায়ের আর কিচ্ছুর প্রয়োজন নেই পুত্রী। … আর কনো কিচ্ছুর নয়। এঁর থেকে বড় আরাধনা আর একটি মায়ের কখনোই হতে পারেনা। এর থেকে বড় পাওনা, একটি মায়ের আর কিচ্ছু থাকতে পারেনা। …

পুত্রী, আমি হতে পারি ব্রহ্ম, তাই একমাত্র অস্তিত্ব, কিন্তু আমি সমস্ত কিছুর আগে একজন মা। আমি তাঁদের মা, যারা আমিই, কেবলই ভ্রম বশত তাঁরা সন্তান আর আমি মা। আর তাই এই মায়ের একটিই কামনা, তাঁর সন্তানদের তাঁর বক্ষে প্রত্যাবর্তন। যেই জ্ঞান, যেই প্রেম, যেই বৈরাগ্য, যেই সুর, যেই সঙ্গীত, যেই নৃত্য, যেই কলার সাহায্যে সেই প্রত্যাবর্তন সম্ভব, তাই এই মায়ের আরাধনা। … আর কনো আরাধনার প্রয়োজন নেই পুত্রী।

যদি সহস্র আরাধনার পশ্চাতে, মায়ের বক্ষ সন্তানহারা হয়েই থেকে যায়, সেই আরাধনার কিই বা অর্থ পুত্রী! সেই আরাধনা পাবার জন্য সবার সমক্ষে গিয়ে নিজের ঢাক নিজে পেটাবো! এতটা নির্লজ্জ হয়ে যাবো? তাহলে অহংকার আর আমার মধ্যে ভেদ কি রয়ে গেল পুত্রী? সত্যকে যদি সকলের কাছে গিয়ে গিয়ে বলে আস্তে হয় যে, “এই শুনছো, আমি সত্য গো!” তাহলে তা আর সত্য কি ভাবে থাকে?

যদি মাকে সন্তানকে ডেকে ডেকে বলতে হয়, “এই শুনছো, আমি তোমার মা, তুমি আমার সন্তান, এসো আমার কাছে এসো!” পুত্রী, এতো মাতৃত্বের ব্যর্থতা! … বেশ মেনে নিলাম আমি একজন ব্যর্থ হতভাগ্য মা, কিন্তু এতো সন্তানের সন্তান হবার ব্যর্থতা! … না পুত্রী, এক মা সমস্ত কিছু সইতে পারে, কিন্তু নিজের সন্তানকে কনো অবস্থাতে বলতে পারেনা যে সে ব্যর্থ। যেই মা, নিজের সন্তানকে গিয়ে বলেন যে সে সন্তান রূপে ব্যর্থ, সেই মা কনো ভাবে মা হবার যোগ্য নন।

পুত্রী, আমি আরাধনা চাইনা, না আমি ভগবানের ভূমিকায় স্থাপিত হতে চাই। যদি অহংকারকেই ভগবানের আসন দিয়ে আমার সন্তানরা খুশী থাকে, তবে তাই থাকুক, আমার তাতে কনো আপত্তি নেই, আমার সন্তানের খুশীতেই আমি খুশী। কিন্তু আমার সন্তান আমাকে উপেক্ষা করুক, তাতেও আমার কনো বেদনা নেই। আমি তাঁদের মা, তাদের পুরো অধিকার আছে, তাঁদের মাকে উপেক্ষা করার। তাঁদের পুরো অধিকার আছে, তাঁদের মাকে পীড়া দেবার, পুরো অধিকার আছে তাঁদের মাকে যথেচ্ছা ব্যবহার করে, অপরাধ দিয়ে, দোষী সাব্যস্ত করার। তাই সমস্ত কিছু করুক তারা।

একটিই প্রার্থনা আমার সন্তানদের কাছে, আমার সন্তানরা নিজেদের মিথ্যাচারণ করে ভ্রমে আবদ্ধ করে দিও না। নিজেদের সত্যতাকে স্বীকার করো। তোমরা স্বয়ং ব্রহ্ম, তোমরা শূন্য। না তোমাদের কনো প্রকার ব্যাথা সম্ভব, না বেদনা, না জন্ম সম্ভব আর না মৃত্যু। তোমরা দেহের বন্ধন থেকে, মনের বন্ধন থেকে, বুদ্ধির বন্ধন থেকে, প্রাণের বন্ধন থেকে, উর্জার বন্ধন থেকে চিরকাল মুক্ত ছিলে, আর চিরকালই থাকবে। তোমরা কখনোই তোমাদের ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার পাশে বন্দি নও। মুক্ত করো নিজেকে। যত ইচ্ছা অপবাদ দাও, তোমাদের মাতাকে। তোমাদের মাতাকে রাক্ষসী বলে আখ্যা দাও, কনো অসুবিধা নেই, কিন্তু নিজেদের স্বতন্ত্র করো।

আর তোমাদের এই ভাবে বন্দিদশায় দেখতে পারছিনা। … এক ইচ্ছা, চিন্তা, কল্পনার দ্বারা বন্দি ছিলে; তারপর ত্রিগুণের দ্বারা, অহং দ্বারা বন্দি ছিলে; তাছাড়া পঞ্চভূত অর্থাৎ মন, বুদ্ধি, দেহ, উর্জা, প্রাণের কাছে বন্দি ছিলে; এরা ছাড়াও ইন্দ্রিয়দের কাছে বন্দি ছিলে। সেই বন্দিদশাতেই সন্তানদের দেখে ব্যকুল থাকতাম। এখন তো আবার তার সাথে যন্ত্রদের দাস করে দিয়েছ নিজেদেরকে, ধনের দাস করে দিয়েছ নিজেদের। আর কত ভাবে নিজেদের দাস করবে? যত অধিক নিজেদের পরাধীন করো তোমরা, তত অধিক এই মায়ের হৃদয় ছিন্নবচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

কনো প্রয়োজন নেই আমাকে মা বলে ডাকার, যদি তোমাদের আপত্তি থাকে। কনো প্রয়োজন নেই আমার স্তনের অমৃত পানে তোমাদের আপত্তি থাকলে। মার্কণ্ড মহাপুরাণরূপে পূর্বেও স্তনদান করেছিলাম, তোমরা তা ত্যাগ করেছিলে, এবারও তা ত্যাগ করো। তাতেও এই মায়ের কনো বেদনা নেই। ব্যাস, নিজেদের মুক্ত করো, আর কিচ্ছু চাইনা এই মায়ের। না চাই কনো সম্মান, না চাই কনো পূজা অর্চনা, না চাই মা ডাকটিও। সমস্ত কিছু বিসর্জন দিতে আমি প্রস্তুত, কেবল স্বতন্ত্র হয়ে যাও”।

দিব্যশ্রী ব্রহ্মসনাতনের ক্রোড়কে আঁকড়ে ধরে বললেন, “মায়ের স্বভাব হলো ত্যাগ, আর তাই করে গেলেন সমস্ত জীবন পিতা। … সমস্ত কিছু ত্যাগ করেই গেলেন, আর যা করেন নি ত্যাগ, তাও ত্যাগ করার অঙ্গিকার করে দিলেন, ব্যাস সন্তানের মুক্তি চাইলেন। … বোধহয়, একেই ঈশ্বরীয় প্রেম বলে। জ্ঞান যেমন স্বয়ং ঈশ্বরী, প্রেম যেমন স্বয়ং ঈশ্বরী, ত্যাগও তেমন স্বয়ং ঈশ্বরী। … প্রশ্ন আছে মনে, তবে আর প্রশ্ন করতে পারছিনা।

আজ আর কিছু ভাবতে ইচ্ছা করছে না, আজ আর ইচ্ছা করছে না মনকে সামান্যও গুরুত্ব দিতেও; আজ আর কিছু বুঝতে ইচ্ছাও করছে না, ইচ্ছা করছে না বুদ্ধির অস্তিত্বকে স্বীকার করতেও। আজ কেবলই অনুভব করতে ইচ্ছা করছে, তোমাকে অনুভব করতে ইচ্ছা হচ্ছে, তোমাতে হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করছে। জানিনা, তোমার থেকেই শুনেছি নিজেকে হারিয়ে ফেলাই, প্রকৃত অর্থে নিজেকে পাওয়া। কিন্তু সত্যি বলছি পিতা, আজ নিজেকে পেতেও ইচ্ছা করছেনা, কেবলই হারাতে ইচ্ছা করছে”।

দিব্যশ্রী এমন ভাবেই বেশ কিছুক্ষণ প্রেমপ্রলাপ করতে থাকলে, ব্রহ্মসনাতনের ক্রোড়েই নিদ্রা গেলেন। পিতা পুত্রীর ইচ্ছার মান রাখলেন, কাছ ছাড়া করলেন না পুত্রীকে, বরং তিনি পুত্রীকে নিজের ক্রোড়ে ধারণ করে, বসে থাকা অবস্থাতেই কিছুক্ষণ নিদ্রা দেলেন।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43