গুপ্ত হস্তান্তর (মহাবিজ্ঞান)
দিব্যশ্রী বললেন, “একটি বিষয় আমাকে খুব চঞ্চল করে দিচ্ছে মা। আচ্ছা মা, এমন ব্যাপার কি যে, সমস্ত অবতাররা গুপ্ত ভাবে তোমাকে সমস্ত বার্তা প্রদান করে গেছেন? আমার এমন প্রশ্ন করার কারণ এই যে, সকলের চোখের সামনে সমস্ত কীর্তি সাজানো থাকলো, আর কেউ তা দেখতে পেলেন না। কেবলই তুমি তা দেখতে পেলে। তাই আমার প্রশ্ন এই যে, তাঁদের সমস্ত বার্তা কি অত্যন্ত গুপ্ত ভাবেই তাঁরা তাঁদের কথনে বলে গেছিলেন?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “উচিত বলেছ পুত্রী, তবে কি জানো তো, তাঁরা তেমন কিছু করেন নি সমস্ত কথাকে গুপ্ত করতে। কেবল একটিই কাজ করেছেন তাঁরা, আর তা হলো তাঁরা জানেন যে পরমাত্মর দাস বা সেবক যারা, তাদের মেধার দৌড় ঠিক কতখানি। আর তা জেনে, তাঁরা ঠিক সেই মেধার অতীতের কথারূপে নিজেদের বার্তা লিখে গেছেন। ফলস্বরূপ, সকলের চোখের সম্মুখেই সমস্ত কিছু ছিল, কিন্তু উদ্ধার পরমাত্মের কনো সেবকই করতে পারলেন না।
এই যেমন ধরো বাইবেলের ডুমস ডে, বা কোরানের কেয়ামতের দিন- পরমাত্মের সেবকরা যে সম্পূর্ণ ভাবে স্থূল ভৌতিক জগতে নিবাস করেন, আর তাঁদের মেধা নিম্নগামী, অর্থাৎ তারা কখনোই স্থূল থেকে সূক্ষ্ম, সূক্ষ্ম থেকে কারণ বা কারণ থেকে সত্যে নিজেদের মেধাকে যাত্রা করায় না, তারা সর্বক্ষণ নিম্নগামী হয়ে, নিজেদের মেধাকে স্থূল থেকে অতিস্থুল অর্থাৎ যান্ত্রিক বা কাল্পনিক জগতে প্রেরণ করেন। ফলস্বরূপ, তারা এটা কখনোই অনুমান করতে পারলেন না যে, কেয়ামত বা ডুমস ডে আসলে কি।
যদি তাদের মেধা ঊর্ধ্বমুখি হতো, ওটি সহজেই তারা অনুধাবন করে নিতেন যে, যাকে গৌতম নির্বাণ বলেছেন, যাকে প্রাচীন বৌদ্ধরা সমাধি বলেছেন, কেয়ামত বা ডুমস ডে আসলেই তাই। কেন পারলেন না তারা অনুধাবন করতে? সহজ অঙ্ক পুত্রী। পরমাত্ম বহির্মুখী, অর্থাৎ সে সর্বক্ষণ ব্রহ্ম বা সত্যের থেকে বিমুখে চালিত, অর্থাৎ মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে কাজ করাই তার স্বভাব। আর তাই তার সমস্ত সেবকও তেমনই।
আর তেমন হবার কারণে, তারা কখনোই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়নি যে, এই ব্রহ্মাণ্ড আসলে পরমাত্মের কল্পনা। যদি তা অনুধাবন করতে পারতো, তাহলে নিজের পঞ্চভূত শরীরের বাইরে ব্রহ্মাণ্ডের বিস্তার খুঁজতো না, নিজের অন্তরেই তা খুঁজতো, কারণ কল্পনার স্বভাবই তো অনেকটা তোমাদের প্রজেক্টারের মতন, যেখানে কম্পিউটারের ভিতরের জিনিসকে বাইরে দেখানো হয়।
কল্পনাও ঠিক একই ভাবে, আমাদের অন্তরে যেই ব্রহ্মাণ্ডকে সে কল্পনা করে রেখেছে, তাকেই বাইরে প্রজেক্টরের মতন করে প্রকাশ করে। কিন্তু তাদের মেধা যে বিপরীত দিশায় চালিত, তাই তারা নিজেরাই এই প্রজেক্টর নির্মাণ করে, নিজেরাই নিজেদের কল্পনাকে ভুলে গেছেন। আর তাই ব্রহ্মাণ্ডকে অন্তরে না খুঁজে বাইরে খুঁজে চলেন। যদি অন্তরে খুঁজতেন, তাহলে অতিসহজেই অনুভব করে নিতেন যে, যেই সৃষ্টির নাশের কথা বাইবেল বা কোরান বলেছেন, তা অন্তরের ব্রহ্মাণ্ড ব্যতীত কিছুই নয়।
আর অন্তরের ব্রহ্মাণ্ডের নাশ তখনই হয়, যখন সমাধি বা নির্বাণ হয়। তুমি তা প্রত্যক্ষও করেছ পুত্রী, তাই না! তুমি স্বয়ং প্রত্যক্ষ করেছ যে, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড বিনষ্ট হয়ে গিয়ে কেবলই অখণ্ড, অব্যাক্ত, অচিন্ত্য, অকল্পনীয় মহাশূন্য বিরাজ করলো। পুত্রী, যেদিন এই মহাশূন্যে অবস্থানের দিন, সেদিনটিকেই বাইবেল ডুমসডে বলেছে, আর কোরান কেয়ামতের দিন। কিন্তু দেখো পুরুষের সেবকদের নিম্নগামী মেধার কারণে, তারা সমস্ত কিছুকে বাইরেই খুঁজতে থাকলো।
মহম্মদও জানতেন, আর ঈশাও যে, পরাপ্রকৃতি যখন পূর্ণ অবতারে আসবেন, তাঁর মেধা হবে ঊর্ধ্বমুখী, আর তাই তাঁরা সহজ ও স্পষ্ট কথাই লিখে গেছেন, কিন্তু ব্রহ্মাণ্ডের নাম করে, যাতে আমি বাদে সকলে সেই কথাকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য করতেই ব্যস্ত থাকে, আর সত্য তাদের কাছে অধরাই হয়ে থাকে।
কেন এমন করলেন? কারণ একবার যদি পুরুষ বা পুরুষের সেবকরা জানতে পারতেন যে এই সমস্ত কিছু সত্য আমার আবির্ভাব ও আমাকে বাস্তবিক রূপ পর্যন্ত পৌঁছে দেবার ষড়যন্ত্র, তাহলে তারা মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত কিছুর নাশ করে দিতেন। আর তাই, সহজ বুদ্ধি খাটিয়েছেন সকল অবতাররা। তাঁরা সমস্ত কিছুকে সহজ ভাবেই লিখেছেন, কিন্তু এমন করে লিখেছেন যেন তা বহির্বিশ্বের কথা। আর তাই পুরুষ, পরমপুরুষ বা তাঁর সেবকদের সন্দেহও জাগলো না যে এই সব আমাকে জাগ্রত করার জন্যই লেখা, তাদের কালকে নিশ্চয় করার জন্যই লেখা।
একই ভাবে, বাল্মীকি, ব্যাস, মার্কণ্ড, সকলেই কাহিনী লিখে গেছেন। মূর্খ পরমাত্ম আর তার সেবকরা সেই সমস্ত কথাকে ইতিহাস মেনে নিয়ে, ভূমি খুঁড়ে খুঁড়ে খুঁজতে থাকলো, কিন্তু সেই সমস্ত কথা যে চেতনাকে জাগরণের পদ্ধতি, যা ধারণ করে করে, আমি আমার পূর্ণ পরাচেতনা অবস্থাতে উন্নীত হবো, আর তার বিনাশের শয্যা রচনা করবো, তা মূর্খ পরমাত্ম অনুমানও করতে পারেনি।
পুত্রী, মার্কণ্ডের কথিত চেতনার যাত্রাকথা তো তোমাকে বলেইছি, ব্যাসেরও। কিন্তু বাল্মীকি আর ব্যাস একটি আরো গুপ্ত কথা বলে গেছেন, তা যে কেউ ভাবতেও পারেন নি! … যিনিই ভক্ত রাবণ, তিনিই রাক্ষসরাজ রাবণ, আর সেই রাবণের বিনাশক রামও সেই রাবণই, কারণ এই সমস্ত কিছুই তো আন্তরিক ব্রহ্মাণ্ডের কথন, তা বাহ্য কথন থোরাই! …
ভক্ত রাবণ হলো মনুষ্যস্বভাব, রাক্ষস রাবণ হলেন শয়তান স্বভাব, আর রাম হলেন চেতনা অর্থাৎ সীতা চালিত ভগবান স্বভাব। আর বাল্মীকি এই বার্তা দিয়ে গেলেন আমার জন্য যে, জগত বলবে রাক্ষস বদ, আর ভগবান সাধু। কিন্তু সত্য এই যে, পার্বতী থেকে মহাকালী তুমি তখনই হয়ে উঠতে পারবে, যখন একই সঙ্গে, ভক্ত রাবণ, রাক্ষস রাবণ আর সীতা চালিত রামকে ধারণ করবে।
তিনি আমার উদ্দেশ্যে এই বার্তা দিয়ে গেলেন যে, পরাচেতনা কনো ভগবান নন, তিনি ঈশ্বর, আর ঈশ্বর হলেন ভক্ত, শয়তান ও ভগবান, তিনেরই জননী, অর্থাৎ এই তিনই তাঁর মধ্যে বিরাজ করে। কিন্তু দেখো, জগতের সম্মুখেই সেই কথা রইলো, কিন্তু তা অনুভব করতে পারলো না কেউই। সত্য বলতে এই বার্তা আমার উদ্দেশ্যে ছিল, আর তাই বাল্মীকি এমন ভাবেই তা লিখে গেছিলেন যাতে কেবল আমিই তা অনুভব করতে সক্ষম হই, আর কেউ নন।
ব্যাস একই কথাকে আরো পরিষ্কার করে বলে গেলেন যাতে আমার অনুভব করতে সহজ হয়। তিনি বলে গেলেন, ভক্ত মানে যুধিষ্ঠির, রাক্ষস মানে ভীম আর ভগবান মানে অর্জুন, এঁদেরকে বিবেকের অধীনে রেখে অর্থাৎ কৃষ্ণের অধীনে রেখে, চেতনার সাথে যুক্ত করো, অর্থাৎ দ্রৌপদীর সাথে যুক্ত করো, তবেই চেতনা পরাচেতনা হয়ে উঠতে পারবে।
তিনি আরো গুহ্য কথাও বলে গেলেন। খেয়াল করে দেখো, তিনি কেমন কায়দা করে ভগবৎ গীতাতে প্রকৃতিতত্ত্বের মধ্যে বলেছেন ত্রিগুণের কথা। সকল পুরুষের সেবকরা সেই কথা পাঠ করে ভাবলেন, প্রকৃতির তিনগুণ বলেছেন, বিভ্রান্তি ভালোই ছড়াবে। কিন্তু মূর্খরা একটু খতিয়ে দেখলো না। যদি দেখতো, তাহলেই দেখতে পেতো যে, ব্যাস গীতার প্রকৃতিতত্ত্বে বলেছেন ত্রিগুণের সাম্যতার কথা, ত্রিগুণকে সাম্য অবস্থায় নিয়ে আসতে হয়, তবেই প্রকৃতির জাগরণ হয়।
বুঝলো না, কারণ ওদের জন্য তো সেই কথা লেখেনই নি ব্যাস। সেই কথা তো আমাকে জানানোর জন্য লিখেছেন। স্পষ্ট ভাবে বলে গেলেন আমাকে যে, ত্রিগুণই অহংকারের তিন অবস্থা, এঁদেরকে ভারসাম্যে স্থিত না করলে, এঁরা তোমাকে আক্রমণ করতেই থাকবে। এঁদেরকে একে অপরের সাথে যুদ্ধে রত করে দাও, আর যখন এঁরা যুদ্ধে রত থাকবেন, তখন এঁদের চোখের সামনে দিয়ে বেড়িয়ে চলে যাও।
এই কথা অত্যন্তই গুপ্ত। তাই নিশ্চিন্ত হননি ঠাকুর রামকৃষ্ণ। সেই কারণে আবার আমার জন্য বলে গেলেন, সত্ত্ব, রজ, তম তিনজনেই ডাকাত, কেবলই নির্মমতার তারতম্য সকলের মধ্যে। বাকি সব এক।
তাই তোমার যেই কথন ছিল যে, সমস্ত কথা কি গুপ্ত করে রেখে গেছিলেন, তা সঠিকও আবার বেঠিকও। তাঁরা কেবলই পরমাত্মের মেধাকে প্রত্যক্ষ করেছেন, আর তাঁর মেধার থেকে সমস্ত কথাকে গুপ্ত করে গেছেন, অর্থাৎ কথাকে গুপ্ত করে যাননি। পরমাত্ম বাহ্যমুখী, আর ইনারা অন্তর্মুখী কথা লিখে গেছেন, কিন্তু এমন করে লিখে গেছেন যে, কল্পনাপ্রিয় পরমাত্ম সেই কথাকে পাঠ করে বাহ্যমুখী হবার রসদই মনে করতে থাকবে।
সন্দেহ হয়েছিল শঙ্করের যে, আমি কি এই গুপ্ত রহস্য অনুধাবন করতে পারবো! তাই সে অদ্বৈত বেদান্ত রচনা করে গেল, উপনিষদের কথাকে পুনরায় বলে গেল, যাতে আমি কিছুতেই বহির্মুখী না হই, সব ক্ষেত্রে যেন অন্তর্মুখী হই। আসল কথা এই যে, এঁরা সকলেই মহাযোদ্ধা। পুত্রী যোদ্ধার কনো নিজস্বতা থাকেনা, এটিই যোদ্ধার বৈশিষ্ট্য।
হ্যাঁ পুত্রী, সেই কারণেই যোদ্ধা শত্রুর রণকৌশলকেই শত্রুর সামনে রাখেন, এক ধাপ আগিয়ে, ঠিক যেমন করে গোয়েন্দা গল্প পরার কালে গোয়েন্দাকে একধাপ এগিয়ে থাকতে দেখো, আর দেখো যে তাঁর কনো নিজস্বতা নেই, সে ক্রিমিনালের মনস্তত্ত্বকে ধারণ করে নেয় আর এই ভাবে, ক্রিমিনাল কি ভাবছে, কি ভাবে ভাবছে, কতটা কি ভাবছে, সমস্ত কিছুকে সহজ ভাবে প্রত্যক্ষ করেন, এও ঠিক তেমনই পুত্রী।
যোদ্ধার কনো নিজস্বতা থাকেনা, শত্রুর চালই তার চাল, আর তাই প্রকৃত যোদ্ধা শত্রুকে শত্রুর চালেই দমন করেন। এঁরাও একাকজন মহাযোদ্ধা, আর তাই শত্রুকে শত্রুর চালেই কুপোকাত করে গেছেন। আমারই রূপ তারা, তাই সকল জীবের প্রতি প্রেম তো তাদের এমনিই আছে। সেই প্রেমকেই সামনে রেখেছেন, আর সমানে যুদ্ধ করে গেছেন। পুত্রী, তোমাকেও এই রণবেশ ধারণ করতে হবে। সম্যক যুদ্ধ করতে যাবেনা। পরাজয়ের জন্য যাবেনা, তা নয়, তোমাকে পরাজিত করতে সক্ষম এমন কেউ নেই।
কিন্তু বিচার করে দেখ, পরমাত্ম কাকে নিজের বর্ম করে রেখে দিয়েছে! চেতনাকেই, অর্থাৎ তোমার সন্তান, তোমার ভ্রাতাভগিনীকেই। অর্থাৎ যদি সম্যক যুদ্ধে যাও, তবে তুমি পরমাত্মকে আক্রমণ করলে, কাকে আঘাত করবে? নিজের সন্তানদেরকেই। তাই সম্যক যুদ্ধ নয় পুত্রী, সকলের অন্তরের পরমাত্মকে অনন্ত বিনাশের মুখে ঠেলে দাও।
অনাথকে অবহেলা সে করেছে, অনাথকে নিয়ে সন্তানহীন পিতামাতার সাথে বাণিজ্য সে শুরু করেছে। অনাথ হয়েও তাঁরা পরাধীন পরমাত্ম শাসিত সমাজের কাছে, আর দত্তক নেবার পরে তো অধিক পরাধীন, কারণ পিতামাতারা পরমাত্মেরই দাস। পরমাত্মের দুর্বলতার সুযোগ নাও, আর নিজের বাহিনী নির্মাণ করো।
চেতনা জাগরণের যেই সত্যকে সমস্ত নবমহাবিদ্যা গুপ্ত রেখেছিলেন, এই দশমমহাবিদ্যা তা তোমাদের নবদুর্গার কাছে উন্মুক্ত করে গেল। সেই সত্য দ্বারা, তোমার বাহিনীর মধ্যে অনন্ত চেতনার বিকাশ ঘটাও, আর সেই বিকাশ দ্বারা সমাজে এমন হিল্লোল তুলে দাও যে, অনাথ হওয়াকেই ভাগ্যবান হওয়া মনে করতে থাকে সমাজ, আর চেতনার এমন জাগরণের উত্থান করো যে, পরমাত্ম দিশাহিন হয়ে যায়।
পুত্রী, কল্পতরু হয়ে ঠাকুর রামকৃষ্ণ যেই অভয়বাণী দিয়েছিলেন যে তোমাদের চৈতন্য হোক, সেই চৈতন্য তোমার বাহিনীর মধ্যে বিলিয়ে দাও, আর সেই বেলানোকে এক অনন্ত ধারা করে দিয়ে, সম্যক মনুষ্য সমাজকে পরমাত্মের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দাও, পবিত্র করে দাও সকলকে, স্বতন্ত্র করে দাও সকলকে, মোক্ষের মেলা বসিয়ে দাও”।
