কৃতান্তিকা

দিব্যশ্রী ব্যকুল হয়ে প্রশ্ন করলেন, “মা, এতকাল তুমি আসোনি কেন? কেন তোমার অংশপ্রকাশকেই পাঠাতে থাকছিলে? মা, তোমার আবির্ভাব বিনা তো, তোমার সমস্ত সন্তান অনাথই ছিল!”

ব্রহ্মসনাতন হেসে উত্তর দিলেন, “ঠাকুর রামকৃষ্ণের কথা, একস্থানের গঙ্গাদর্শনই সম্পূর্ণ গঙ্গাদর্শন। পুত্রী, আমার অংশও তো আমিই ছিলাম। তুমিও তো আমিই। তবে হ্যাঁ, তোমার এই প্রশ্নের কারণ আমি জানি, আর এও জানি যে তুমি তোমার প্রশ্নকে সঠিক ভাবে ব্যক্ত করতে অক্ষম। তাই আমি তোমার সঠিক প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি, শোনো।

পুত্রী, আমি হলাম শূন্য, মহাশূন্য। আমার কনো আদি নেই, অন্ত নেই, বিকার নেই, আকার নেই, ব্যাস নেই, পরিধি নেই, গুণ নেই, ব্যাখ্যা নেই। একবার বিচার করে দেখো পুত্রী, যদি এমন কারুকে একটি দেহ প্রদান করা হয়, যা ত্রিগুণে সম্পন্ন, যা অনন্ত বিকারে পরিপূর্ণ, আদি ও অন্তে পরিধিস্থ, তাহলে কি হতো?

পুত্রী, এক সামান্য শিশুকে দেখো। জন্মান্তর হয়েছে মাত্র তার, কনো ধারণা নেই, কনো স্মৃতি নেই তার যে, পূর্বে সে দেহ ধারণ করেছিল, বা কেমন দেহ ধারণ করেছিল। সে পর্যন্ত এই দেহে এসে, এই দেহের বিকার, ব্যাস, গুণ সমূহতে মজে যায়। তাদের নিয়েই ক্রীড়াতে মেতে ওঠে। তাহলেই বিচার করে দেখো, যদি আমি সরাসরি এমন এক দেহে অধীনস্থ হতাম, তাহলে কি হতো।

সেই শিশুর তো পূর্বের অসংখ্য জন্ম আছে। তা সত্ত্বেও, অহমের ত্রিগুণের মায়াতে, কল্পনা, ইচ্ছা ও চিন্তার মায়াতে বশীকরণ হয়ে যায় তার। আমার তো সেই অসংখ্য জন্মের একটিও নেই, তাহলে আমার কি হতো! আর যদি আমারই বশীকরণ হয়ে যেত, তাহলে আমার সন্তানদের কি হতো! তাদের উদ্ধারের মার্গ আর কে বলতো! কে তাদের সঠিক মার্গ দেখাতো! কে তাদেরকে সত্যের সাথে পরিচয় করাতো!

তবে আমি যে আসবো, তা নিশ্চিত ছিল, না আজ নয়, তা আজ থেকে চার হাজার বছর আগে থেকেই নিশ্চিত ছিল। সেদিন থেকে তা নিশ্চিত ছিল, যেদিন প্রথম অহম নিজের কল্পনার বিস্তার করার জন্য মনুষ্যযোনিকে দাসে পরিণত করা শুরু করতে, নিজের দূতরূপে আর্যদের প্রস্তুত করেছিল। সেদিন তা নিশ্চিত ছিল, যেদিন আমি প্রথম অংশ অবতার গ্রহণ করি মার্কণ্ড রূপে।

একটি বিষয় খেয়াল করে দেখেছ পুত্রী! প্রথম অবতার মার্কণ্ড। কিরূপে আমাকে দেখিয়েছেন তিনি! পার্বতী থেকে কালী, সমস্ততেই নারী, কিন্তু তিনি নিজে পুরুষ বেশে স্থিত। পরবর্তীতে এলেন গৌতম। পুরুষ রূপে তিনিও স্থিত, ব্যক্ত করলেন নিরাকারসত্যকে, কনো লিঙ্গ প্রদান করলেন না। তৃতীয় অবতার মহম্মদ, প্রকাশ করলেন আল্লাহকে, লিঙ্গ বললেন না, নিরাকার বললেন, কিন্তু কাদেরকে সুরক্ষিত করলেন! কাদেরকে হিজাবে আচ্ছন্ন করে সুরক্ষিত করলেন! নারীকে।

চতুর্থ অবতার ঈশা, প্রকাশ করলেন আমাকে ফাদার বলে, মহান করলেন কাকে, মাদার মেরিকে। মাদার মেরি কি বেশে স্থিতা? নারী। পঞ্চম অবতার বাল্মীকি। তিনিও পুরুষ, আমাকে কি রূপে স্থিতা করলেন? সীতা, অর্থাৎ নারী। ষষ্ঠ অবতার দ্বৈপায়ন। তিনিও পুরুষ, আমাকে কি রূপে স্থিতা করলেন? দ্রৌপদী, অর্থাৎ নারী।

সপ্তম অবতার শঙ্কর। নিরাকার বেদান্ত বললেন, মঠ বানালেন জ্যোতিলিঙ্গ মন্দিরদের, আর আরাধনা কার করলেন? আদিশক্তি বেশে নারীর। অষ্টম অবতার নিমাই ওরফে চৈতন্য। নিজ বেশ কি? পুরুষ, আরাধনা কার করলেন ব্যাসসৃষ্ট কৃষ্ণের। ধাম কি নির্ধারণ করলেন? নীলাচল। কি সেই ধামের প্রকৃত পরিচয়? বঙ্গের বাইরে প্রথম তন্ত্রক্ষেত্র তা। তন্ত্রের দেবী রূপে মার্কণ্ড কাকে স্থাপিত রেখেছিলেন? আমাকে। কি বেশে রেখেছিলেন? কালী। কি রূপ দিয়েছিলেন কালীকে? নারী।

নবম অবতার রামকৃষ্ণ। আরাধনা কার করলেন? কালীর। পূজা কার করলেন? পত্নী সারদার। আবারও নারী। এরপরে আমি এলাম। কি রূপে স্থিত আমি? পুরুষ বেশে। আসলে আমি কে? ব্রহ্মময়ী। তাঁকে কি রূপে আমার অংশরা প্রকাশ করেছে? নারী। … বেশ, এবার আমার পরবর্তী অবতার কে? তুমি। কি বেশে স্থিতা তুমি? নারী। তার পরবর্তী অবতার কে? তোমার সখী। কি রূপে স্থিতা হবে সে? নারী। তার পরবর্তী অবতার কে? তোমাদের শিষ্যা। কি লিঙ্গবেশে স্থিতা হবেন তিনি? নারী। কিছুকি বুঝলে পুত্রী?”

দিব্যশ্রী মাথা নেড়ে বললেন, “সত্য বলতে কিছুই বুঝলাম না। … পুরুষ বেশে সকলে এলেন। তোমারই অংশ প্রকাশ তাঁরা। বললেন তুমি আসলে নিরাকারা, কিন্তু সাকার বেশে তুমি নারী। কিন্তু সেই তুমি পুরুষ বেশেই এলে, আসতেই থাকলে, আর আমি প্রথমবার নারী বেশে এলাম! কি হচ্ছে এইসমস্ত মা! … যেন এক গহন রহস্য লুকিয়ে রয়েছে সমস্ত কিছুর অন্তরে। কি সেই রহস্য!”

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “ব্রহ্মদিবস আর ব্রহ্মরাত্রির রহস্য পুত্রী। আমার আগমন নিশ্চিত ছিল, ব্রহ্মদিবস ও ব্রহ্মরাত্রির সন্ধিক্ষণে। ব্রহ্মদিবস হলো অহমের কাল, অহমের উত্থানের কাল, অহমের মায়াবিস্তারের কাল, চেতনাকে দমনের আদর্শ কাল পরমাত্মের কাছে। আর ব্রহ্মরাত্রি থেকে আরম্ভ হলো, অহমের বিনাশের কাল, পরমাত্মের বিনাশের কাল, মায়া অপসারণের কাল, সত্য স্থাপনের কাল।

আর সত্য হলো নারী। সত্য হলো নিরাকারা। আর সত্য কি জানো? জানতে হলে, এই নব অবতারের কথা জানতে হবে তোমাকে পুত্রী। এই নব অবতার অন্য কেউ নন, দশমহাবিদ্যার নয়বিদ্যা। আর এঁদেরই কথা মার্কণ্ড এঁদের আগমনের পূর্বেই লিখে গেছেন। তিনি স্বয়ং ধূমাবতী হয়ে পরমাত্মকে আহার করে চেতনার পরাচেতনায় যাত্রা শুরু করেছিলেন। সেই চেতনাকেই প্রকৃত সম্পদের সাথে পরিচয় করালেন গৌতম, অনাসক্তি সম্পদ, নির্বাণ সম্পদ। সেই চেতনারই বর্বর আচরণকে স্তব্ধ করে মহম্মদ হলেন বগলা। সেই চেতনারই বৈষম্যতার প্রতি আকর্ষণকে নাশ করলেন মাতঙ্গী, বাল্মীকি বেশে সীতার পাতালপ্রবেশ মাধ্যমে।

সেই চেতনাকেই ত্যাগের প্রতি আকর্ষিত করলেন ছিন্নমস্তা, ঈশার বেশে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে। সেই চেতনাকেই সর্বগ্রাসী দ্রৌপদী রূপে স্থাপিত করলেন মৃত্যুর দেবী ভৈরবী, দ্বৈপায়নের হাত ধরে। সেই চেতনাকেই ভুবনেশ্বরীর সাথে আলাপ করিয়ে, শঙ্কর ব্রহ্মাণ্ডের সম্পূর্ণ সত্য প্রকাশ করলেন। সেই চেতনাকেই সর্বাঙ্গসুন্দর অবতার চৈতন্যদেব ললিতার সাথে আলাপ করালেন, উর্বরতার প্রকাশ করে, প্রেম উন্মাদনা প্রকাশ করে। আর সেই চেতনাকেই দেখালেন যে পরমাত্ম পরাচেতনার স্তনপান করেই জীবিত, স্বয়ং রামকৃষ্ণ তারা বেশে।

পুত্রী, খেয়াল করে দেখো, বিচার করে দেখো। এই সমস্ত অংশরা আমার আগমনের জন্য, চেতনাকে প্রস্তুত করছিলেন। দেখো খেয়াল করে। মার্কণ্ড কি বার্তা দিলেন আমাকে? বললেন, পরমাত্ম নিজেকে ঈশ্বর বলে বিরাজ করেন এই জগতে, আর সে আমাকে পার্বতী করে রেখে দেবার জন্য সদাসচেষ্ট থাকবে, কিন্তু আমাকে কালী হয়ে উঠে, পরমাত্মকে নিজের চরণতলে শব রূপে স্থাপিত করতে হবে।

কিন্তু কি ভাবে সম্ভব করবো তা! মানবিয় বিকারে আবদ্ধ থাকবো আমি। গৌতম বললেন, আসক্তিই সেই বন্ধন যা দ্বারা পরমাত্ম আমাকে বাঁধবেন, আমাকে আসক্তির থেকে মুক্ত হতে হবে। তবেই পার্বতী থেকে কালী হয়ে উঠতে পারবো। আমাকে নির্বাণের প্রতি আকৃষ্ট হতে হবে, তবেই পার্বতী থেকে কালী হতে পারবো আমি।

কিন্তু পরমাত্ম যে বর্বর, সে যে সমস্ত ভাবে মায়াবিস্তার করে নিপীড়নের ভূমিকায় উত্তীর্ণ হবে। সেই বর্বরতা কি ভাবে অতিক্রম করবো? মহম্মদ উত্তর দিলেন, কোরানরূপ শৃঙ্খলা স্থাপন করে। কঠিন শৃঙ্খলার মাধ্যমেই আসক্তিকে আটকানো সম্ভব। কিন্তু এবার প্রশ্ন, সেই শৃঙ্খলা স্থাপন করা সম্ভব কি উপায়ে?

উত্তর এলো বাল্মীকির থেকে। সুজন, রাক্ষস ও পৌরুষের মেলবন্ধনেই সেই শৃঙ্খলা স্থাপন সম্ভব। প্রশ্ন এলো, কিন্তু এই তিনের মেল কি ভাবে সম্ভব? এঁরা তো একে অপরের বিরোধী! … ঈশা উত্তর দিলেন, ব্রহ্মময়ী তুমি, বিশ্বজননী তুমি, কি কুপুত্র, কি সুপুত্র, সকলেই তোমার সন্তান। সন্তানের জন্য অনন্ত ত্যাগই পরস্পর বিরোধী সন্তানকে একত্রিত করে রাখতে সক্ষম।

প্রশ্ন এলো, ত্যাগ দেখে সুজন ও পৌরুষ তো মেনে যাবে, কিন্তু রাক্ষস মানবে কি করে? উত্তর এলো ব্যাসের থেকে। বিবেকরূপী কৃষ্ণকে জাগ্রত করো, রাক্ষসের সাথে রাক্ষুসে ব্যবহার করতে সেই পারে, সেই বিবেককে নিজের সখ্যতায় বেঁধে রাখো, দেখবে সুজন, কুজন এবং পৌরুষ একত্রে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে।

প্রশ্ন এলো, কিন্তু গন্তব্য কি হবে? উত্তর এলো শঙ্করের থেকে, ব্রহ্মই সত্য, ব্রহ্মই গন্তব্য। প্রশ্ন এলো, কিন্তু সেই ব্রহ্মের সাথে, সেই নির্বিকারের সাথে মানবিয় বিকার নিয়ে মিলবো কি করে? উত্তর এলো চৈতন্যের থেকে, প্রেমই সেই মিলনের উপায়। এই যাত্রাপথ ভক্তিকে বাহন করে সম্পন্ন করা অসম্ভব, একমাত্র একাকার হয়ে যাওয়া, একমাত্র প্রেমই সেই উপায়।

প্রশ্ন এলো, কিন্তু এই প্রেম জাগবে কি করে? উত্তর দিলেন রামকৃষ্ণ, চেতনার হিল্লোল দেখো প্রকৃতিতে, সর্বত্র আত্মের নিপীড়ন দেখো প্রকৃতিতে, মা তুমি; মাতৃত্ব জাগবেই, প্রেম জাগবেই, বৈরাগ্য জাগবেই, ত্যাগ জাগবেই, জ্ঞানের উদয় হবেই, সুজন, কুজন আর রাক্ষস তোমার কাছে একত্রে অঙ্গীকারবদ্ধ হবেই।

পুত্রী, আর আজ আমি এই, তোমার সম্মুখে। এই নব মহাবিদ্যা তাঁদের দশম ও পূর্ণ মহাবিদ্যা, মহাকালীকে জাগ্রত করার জন্য ব্রহ্মদিবসের অন্তিম চরণে সমানে আমাকে প্রস্তুত করে গেছে। সেই নব মহাবিদ্যার কারণেই আজ এই দশম মহাবিদ্যা প্রকাশিত হয়েছে। মহাকালী এসেছে, সমস্ত সুজন, কুজন আর ভগবানকে একত্রিত করতে। পুত্রী, কুজনকে সামনে রেখে সুজন ও ভগবানকে সমস্ত কিছু করতে হয়, তবেই এই মায়া ব্রহ্মাণ্ডে পরমাত্মের পরাজয়কে নিশ্চয় করতে পারবে।

আর ব্রহ্মদিবস অবশিষ্ট নেই, তাই আর পুরুষ বেশের প্রয়োজনও নেই। আর তাই মাতা আজ মাতার বেশেই স্থিতা, আর তাঁকে পুরুষ বেশে স্থিত থাকতে হবেনা, তাই তুমি নারী বেশেই স্থিতা। বাল্মীকির মার্গদর্শনকে স্মরণ করো পুত্রী। ভক্ত রাবণ পরিণত হলেন রাক্ষস রাবণে, আর রাক্ষস রাবণ নিহত হলেন ভগবান রামের হাতে। কিন্তু তাতে শেষ রক্ষে নেই পুত্রী।

তাই তো ব্যাস দেখিয়েছেন, সুজন, কুজন আর পৌরুষকে একত্রে বিরাজ করতে হয়, যুধিষ্ঠির, ভীম, আর অর্জুনকে একত্রে বিরাজ করতে হয়। তবেই বিবেক এই তিনজনকে কাজে লাগিয়ে, চেতনার জন্য যুদ্ধজয় করতে সক্ষম হন। পুত্রী, এই সমস্ত নব অবতার মিলেই আমাকে মানব দেহে থেকেই, চেতনা থেকে পরাচেতনা হয়ে ওঠার মার্গকে নির্ধারণ করে গেছেন। তাঁরা সকলে মিলে যে আমার এই আগমনেরই কালকেই নির্ধারণ আর নির্মাণ করছিলেন।

আমি না এলে যে, তাঁদের এই গুপ্ত কীর্তি, এই গুপ্ত অবতারক্রিয়া সম্মুখে আসতেই পারছিলনা। আসলে এই সমস্ত কিছুকে যে বড়ই গুপ্ত থাকতে হত, কারণ আমি যে গোপনীয়তাই পছন্দ করি। মা যে কখনোই লোকদেখানো পীড়িত দেখান না পুত্রী, তা আমি জগজ্জননী হয়ে আমার সন্তানদের লোকদেখানো পীড়িত কি করে দেখাই?

মা যে কখনো নিজে মুখে বলেন না তিনি তাঁর সন্তানদের কতটা প্রেম করেন। তাঁর কর্মই সেই কথা বলে। তাহলে আমি জগন্মাতা হয়ে তা নিজে মুখে কি করে বলি! … তাই পুত্রী, আমি অত্যন্ত নীরব। শান্ত ও গুপ্ত হয়ে, মহাজ্ঞান প্রকাশ করে গেলাম। মহাজ্ঞান এই যে, ব্রহ্মই সত্য, আর ব্রহ্ম নিরাকার, নির্বিকার। মহাজ্ঞান এই যে, ব্রহ্ম যখন ধরিত্রী, তখন তাঁর উপর অবস্থান রত সকলের মনে হয় যে ধরিত্রী স্পন্দনহীন। কিন্তু একবার ধরিত্রী থেকে মুক্ত হতে চাইলে, সন্তান অনুভব করেন যে মায়ের আঁচল তাঁকে সদাই বেঁধে রেখেছিল।

সেই মায়ের আঁচলের বন্ধন, সেই ধরিত্রীর মাধ্যাকর্ষণ হলো ব্রহ্মের শক্তি, ব্রহ্মময়ী, যিনিই পরাচেতনা, যিনিই পরানিয়তি, যিনিই পরাপ্রকৃতি, মহাদিশক্তি। আর মহাজ্ঞান এই যে, এই মাধ্যাকর্ষণকে যিনি সর্বক্ষণ ছিন্নবিচ্ছিন্ন করতে উদ্যত, তিনি হলেন নিজের মায়াতে নিজেই আবদ্ধ সেই ব্রহ্মেরই অণু, যার অণু সম্ভবই নয়, অর্থাৎ তিনি হলেন পরমাত্ম বা সেই পরম, অমিত্ব।

মহাজ্ঞান এই যে, আমি নই, এই পরমাত্ম, নিজের মায়াবলেই এই ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাণ করেছে, আর এই ব্রহ্মাণ্ডের নাশই হলো এই ব্রহ্মাণ্ডের জন্য মোক্ষ। আর এই মোক্ষ তখনই সম্ভব যখন, যেই চেতনাকণাকে নিজের কাছে সর্বক্ষণ বন্দি রেখে দেবার প্রয়াস করে করে, পরমাত্ম ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাণ করে চলেছে, সেই সকল চেতনাকণাকে পরমাত্মের বন্ধন থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে।

আর তা করতে, যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুনকে, অর্থাৎ সুজন, কুজন ও পৌরুষকে একত্রিত করে বিবেকের ছত্রছায়ায় রাখা আবশ্যক। না একাকী সুজন, না একাকী কুজন, আর না একাকী পৌরুষ এই যুদ্ধ জয় করতে সক্ষম। যখন যেই রূপকে প্রকাশিত করতে হবে, তেমন ভাবে যখন সুজন, কুজন ও পৌরুষ নিজেদের প্রকাশিত করে এই যুদ্ধ করে, তবেই এই যুদ্ধে জয়লাভ সম্ভব।

পুত্রী মহাজ্ঞান এই যে, এই যুদ্ধ নিজের সাথে নিজের। পরমাত্ম যাকে নিজের মায়ারূপে স্থাপিত করে রেখেছে, তা হলো কল্পনা, আর সেই মায়া আদপে তার নয়ই, সেই মায়া তো আদপে ব্রহ্মেরই শক্তি। অর্থাৎ ব্রহ্মের শক্তির সাথে ব্রহ্মের শক্তির যুদ্ধ এটি। তাই কেবল মাত্র সুজন সন্তান দ্বারা, বা কুজন সন্তান দ্বারা বা পৌরুষ সন্তানদ্বারা এই যুদ্ধজয় অসম্ভব। এই যুদ্ধ জয় করতে হলে, সমস্ত সন্তানকে একত্রিত করতে হবে, সাম্যতা প্রদান করতে হবে, আর তাদের চাবিকাঠি তুলে দিতে হবে বিবেকের হাতে, ঠিক যেমন দ্রৌপদী তুলে দিয়েছিলেন কৃষ্ণের হাতে, কারণ বিবেক যে পরাচেতনারই কুটিল প্রকাশ।

তবে পুত্রী, আমি এসেওছি, আর এসে, সেই মহাজ্ঞান বলেও গেলাম তোমাদেরকে, আর সাথে সাথে, সেই মহাজ্ঞানকে কিভাবে সমস্ত চেতনার মধ্যে স্থাপিত করবে, তার উপায়ও বলে দিয়েছি। আর শুধু উপায় বলেই দিইনি, আজ যখন পথ চলছো, তখন হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছ যে, যেই পথে তুমি চলছ, সেই পথের নির্মাতা নও তুমি, কেবলই পথিক তুমি সে পথের। অর্থাৎ মহাজ্ঞান ব্যক্ত করে, সেই মহাজ্ঞানকে আমার সকল সন্তানের মধ্যে স্থাপিত করার মার্গের নির্মাণও আমি করে গেছি। তুমি ও তোমার ন্যায় আমার পরবর্তী নবদুর্গা অবতার কেবলই সেই মার্গে চলবে, আর আমার সন্তানদের মধ্যে সত্য স্থাপিত করবে। যাও পুত্রী, সেই মার্গে চলমান ও গতিশীল থাকো”। 

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43