চেতনাময় বিচার (মহাবিজ্ঞান)
দিব্যশ্রী জিজ্ঞাসু হয়ে বললেন, “মা, আমি একটি জিনিস লক্ষ্য করেছি। সামান্য চেতনার বিচার মানে কিছু ভাবা বা কিছুর ধারণা রাখা। তাদের বিচার মানে কিছু ধারণাকে বিশ্বাস করা, আর সেই বিশ্বাসের উপর আস্থা স্থাপন করে, সেই বিশ্বাসকেই ভক্তি করা। সাথে সাথে, আমি এও উপলব্ধি করেছি যে, এই ধারণাতে, বিশ্বাস বা আস্থার কনো স্থান নেই আধ্যাত্মে, কনো স্থান নেই এদের পরাচেতনার কাছে। পরাচেতনার কাছে যদি কিছু ভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়, তা হলো একমাত্র প্রেম। না তিনি ভক্তিতে মজেন, না কনো ধারণার উপর বিশ্বাসে।
তোমাকে প্রত্যক্ষ করেছি, আর প্রত্যক্ষ করে আরো একটি জিনিস বুঝেছি, আর তা এই যে এক প্রেমী কনো কিছু বিশ্বাস করার পূর্বে অত্যন্ত গভীর বিচার করেন, আর এই বিচার প্রক্রিয়া এতটাই বৃহৎ যে, সাধারণ মানুষ যদি এই বিচার করতে যায়, তাহলে এই বিচার করে উঠতেই রাতকাবার করে দেবে।
কিন্তু তোমাকে দেখেছি মা, সেই বিচার মুহূর্তের মধ্যে করো, আর তাই সেই বিচারের মীমাংসা শুনে আমরা চমকে উঠি, আচম্বিত হয়ে উঠি, কিন্তু সেই বিচার করতে গেলে, তার মাথামুণ্ডু কিছুই উপলব্ধি করতে পারিনা। মা, এই বিচারপ্রক্রিয়া চেতনার বিচারধারা নয়, এ হলো পরাচেতনার বিচারধারা, আর মা এই বিচারধারাকে আমি আমার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে স্থাপন করতে চাই।
আমি চাই যে, আমার সন্তানরা এই বিচার প্রক্রিয়ার অনুসরণ করে, গহন সত্যকে বিচার করতে শিখুক। একবার যদি তা সম্ভব হয়, তাহলে আর কনো অন্ধবিশ্বাসের প্রয়োজনই থাকবেনা। সুদৃঢ় বিচার থাকবে, আর সেই বিচারের শেষে মীমাংসা এমনই তীক্ষ্ণ হবে যে, এমন বিশ্বাস স্থাপন হবে, যেখানে কনো অবিশ্বাসের কনো স্থানই থাকবেনা। তাই মা, আমাকে কি সেই নিখুঁত বিচারের প্রক্রিয়া বলা যেতে পারে?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “সেই বিচারের ব্যাপারে গভীরে যাবার পূর্বে, প্রথমেই বলি পুত্রী, পরাপ্রকৃতি সম্বন্ধে কিছু ব্যাপার জেনে রাখা আবশ্যক। পুত্রী, যেমন পুরুষের তিনগুণ, সত্ত্ব, রজ ও তম, তেমনই পরাপ্রকৃতিরও তিন গুণ আর তারা হলো বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্য। যেখানে বৈরাগ্য হলো আসক্তি ও বিরক্তি উভয় থেকেই মুক্ত করে, বিচারকে নিঃশর্ত ও নিঃস্বার্থ করার প্রক্রিয়া, সম্পূর্ণ ভাবে নিরপেক্ষ করার প্রক্রিয়া, সেখানে বিবেক হলো বিনয় ও ধৈর্য ধারণের প্রক্রিয়া। অর্থাৎ বিবেক ধারণ করলে কি হয়? যতক্ষণ না মীমাংসা পর্যন্ত বিচার যাত্রা না করছে, বিবেক সেই প্রক্রিয়াকে কিছুতেই বন্ধ হতে দেয়না, আর কনো কারণে অসমাপ্ত মীমাংসা গ্রহণ করতে দেয়না।
পুত্রী, এই সমস্যা তুমি সর্বত্র দেখেছ, এমনকি তোমার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেও দেখে থাকবে। তারা মীমাংসা পর্যন্ত পৌঁছানোর ধৈর্য ধরেনা, তার পূর্বেই ধারণা নির্মাণ করে, সেই ধারণার জামা পরিধান করে নেয়। কিন্তু বিবেক জাগ্রত থাকলে, তা হতে দেয়না। যেকোনো বিচার যতক্ষণ না অন্তিম মীমাংসা পর্যন্ত পৌঁছচ্ছে, ততক্ষণ বিবেক সেই বিচারপ্রক্রিয়াকে জাগ্রত রেখে দেয়, এই হলো বিবেকের ভূমিকা।
অর্থাৎ পুত্রী, প্রথমেই নিরপেক্ষ, নিঃশর্ত ও নিঃস্বার্থ হতে হয়, আর এই তিন ভাবের সঞ্চার হয় বৈরাগ্যের থেকে। অতঃপরে বিচারপ্রক্রিয়াকে অন্তিম মীমাংসা পর্যন্ত উপস্থিত হতে দিতে হয়, বিবেকের সহায়তায়। এই দুই দ্বারা, চেতনা নিজের বিচারের মঞ্চ নির্মাণ করে, এবার নিজের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে।
পুত্রী, এই বিচারের উদ্দেশ্য কি? সমস্ত কিছু যা কিছু নিয়ে বিচার করা হচ্ছে, তার ভৌতিক কনো না কনো উপস্থিতি আছে, সেই উপস্থিতি স্পর্শকাতর হতে পারে, আবার অস্পৃশ্যও হতে পারে। তবে সেই উপস্থিতি বাস্তবে কি? একটি কল্পনা ব্যতীত তা তো কিছুই নয়, কারণ এক ব্রহ্মই সত্য বাকি সমস্তই কল্পনা। কিন্তু এই কল্পনার গঠন কি ভাবে হলো? একটি পলস্তা কল্পনাই কি সত্যকে স্থূলে রূপান্তরিত করে?
না পুত্রী, প্রথম পলস্তা কল্পনা সত্যকে কারণরূপে প্রকাশ করে; দ্বিতীয় পলস্তা কল্পনা সেই কারণকে সূক্ষ্মরূপে প্রকাশ করে, আর অন্তে তৃতীয় কল্পনা পলস্তা সেই সূক্ষ্মকে স্থূলরূপে প্রকাশ করে, যাকে আমরা নিজেদের ইন্দ্রিয় বা পঞ্চভুত দ্বারা দেখতে পাই। পুত্রী, এরপরেও একটি পলস্তা কল্পনা যুক্ত হয়, আর তা হলে, সেই স্থূল যন্ত্রে রূপান্তরিত হয়।
অর্থাৎ পুত্রী, আমরা আমাদের ইন্দ্রিয় ও এই ইন্দ্রিয়দের পশ্চাতে থাকা পঞ্চভূতের দৌলতে যা দেখি, তা কেবলই কল্পনা হয়, আর সেই কল্পনা যদি স্থূল হয়, তাহলে তাতে তিন পলস্তা কল্পনা থাকে, আর এই তিন পলস্তা কল্পনাকে অপসারিত করলে তবেই সত্যকে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হয়। আর এই কল্পনা যদি যন্ত্র হয়, তবে এতে চারটি পলস্তা কল্পনা উপস্থিত, তাই সেই ক্ষেত্রে চারটি স্তরের বিচারই সত্যে স্থাপিত করতে পারে আমাদেরকে।
এই হলো মঞ্চের কথা পুত্রী, এবার কথা এই যে স্থূল থেকে সূক্ষ্ম, সূক্ষ্ম থেকে কারণ ও কারণ থেকে সত্য, এই তিন বিচার করতে হবে আমাদের সত্য জানার জন্য। না স্থূল, না সূক্ষ্ম আর না কারণ হলো সত্য। কারণে একটি কল্পনার প্রলেপ থাকলে, সূক্ষ্মে তা দুটি হয়ে যায় আর স্থূলে তা তিনটি হয়ে যায়, আবার যন্ত্রে তা চারটি হয়ে যায়। আর আমাদের লক্ষ্য হলো সত্য জানা, অর্থাৎ এবার আমাদের বিচার করতে হবে। এতক্ষণ পর্যন্ত যা বলেছি, তা পরিষ্কার কি তোমার কাছে?”
দিব্যশ্রী বললেন, “হ্যাঁ মা, মঞ্চ সম্বন্ধে বুঝেছি। এই মঞ্চ আমাদেরকে আসক্তি ও বিরক্তির মধ্যে ডুবিয়ে দেয়, সহস্র আবেগের মধ্যে ডুবিয়ে দেয়। আর এই আবেগ বা আসক্তি-বিরক্তি থাকলে, আমরা কিছুতেই বিচার করতে সক্ষম হবো না। তাই প্রথম আমাদেরকে বৈরাগী হয়ে আসক্তি ও বিরক্তির থেকে মুক্ত হতে হয়। সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ না হলে, বিচারের মাধ্যমে সত্যে স্থাপিত হবার স্থানে আমরা এক নূতন কল্পনার রচনা করে ফেলবো।
তাই বৈরাগী হওয়া প্রাথমিক প্রয়োজন বিচার করার স্বার্থে। অতঃপরে, বিবেক জাগ্রত থাকা আবশ্যক। বিবেক আমাদের বিচারকে সম্পূর্ণতা প্রদান করে, অর্থাৎ যদি বিবেক জাগ্রত না থাকে, তাহলে বিচার অর্ধসম্পন্ন থাকার কালেই আমরা মীমাংসা নিশ্চয় করে নেব, আর তেমন করলে, আমরা অসত্যকেই সত্য বলে মেনে থাকবো, আর তাই করিয়ে চলেছে পরমাত্ম সম্পূর্ণ মানবযোনিকে।
তাই বৈরাগী হয়ে নিরপেক্ষ হবার শেষে বিবেকজাগ্রত থাকা আবশ্যক, যার জাগরণ তখনই হয় যখন আমরা বাস্তবে অবস্থান করি। যখন আমরা অতীত থেকে শিক্ষা লাভ করতে আগ্রহী হই, তখন বিবেক জাগরণের সম্ভাবনা প্রস্তুত হয়, কিন্তু যখন আমরা অতীতকে ঘিরে কল্পনা ও চিন্তার দ্বারস্থ হই, আর এমন ভাবি যে আমার সাথে কি খারাপটাই না হয়েছে, আমি কি ভুলটাই না করেছি, ইত্যাদি ইত্যাদি, তখন বিবেক জাগরণের সম্ভাবনার নাশ হয়।
উপরন্তু আমরা অতীতের দিকে তাকিয়ে যখন দেখি যে কি ভুল করেছিলাম, আর সেই ভুলকে চিহ্নিত করে, সেই ভুলকে বর্তমানে ও ভবিষ্যতে সংশোধনের প্রয়াস করি, তখনই বিবেকের জাগরণ সম্ভব হয়। অতীতের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, বর্তমানে সেই সংশোধিত তন্ত্রকে ব্যবহার করে, যখন বর্তমানের কর্মপ্রক্রিয়ার ভিত্তিতে ও সেই কর্মকে পারিপার্শ্বিক কি ভাবে প্রভাবিত করবে, তাকে মাথায় রেখে আমরা ভবিষ্যতের দর্শন করি, অর্থাৎ যখন ভবিষ্যতের অনুমান না করে, নিশ্চয়রূপে ভবিষ্যৎকে ধারণ, চয়ন ও গ্রহণ করি, তখনই বিবেকের জন্ম হয়।
আর একবার বিবেক জাগ্রত হয়ে গেলে, বিচারকে সে সম্পূর্ণ করিয়েই ক্ষান্ত হয়। অর্থাৎ যখন একটি ব্যক্তির বিবেক জাগ্রত থাকেনা, তখন সে অতিদ্রুত, অর্থাৎ বিচার না করেই মীমাংসাতে পৌঁছে যান, বা অর্ধেক বিচার করেই মীমাংসাতে পৌঁছে যান। কিন্তু বিবেক জাগ্রত থাকলে, তিনি তা করেন না, বিচারকে সুসম্পন্ন করান। আর এই বিবেক কখনোই জাগ্রত হয়না যখন আত্মকেন্দ্রিক হয়ে জীবনযাপন করি আমরা।
অবতারশ্রেষ্ঠ মার্কণ্ডও তেমনই দেখিয়েছেন, আর তেমন দেখানোর জন্যই তিনি দেখিয়েছেন যে, যখন শিব অর্থাৎ পরমাত্ম নিকটে নেই, তখনই বিনায়কের অর্থাৎ বিবেকের জন্ম হচ্ছে, আর তা একাকী পরাপ্রকৃতিরই সৃজন, যাতে পরমাত্মের কনো অংশগ্রহণও নেই। অর্থাৎ আত্মকেন্দ্রিক বা নিজের জীবন, নিজের চাওয়া-পাওয়া, নিজের লাভ-ক্ষতি, নিজের সুখদুঃখ নিয়ে চিন্তিত ব্যক্তির মধ্যে বিবেকের জন্ম অসম্ভব। বিবেকের জন্ম তখনই সম্ভব যখন আত্মমুখি হওয়া বন্ধ করে, সমস্ত চেতনাদের জীবনযাত্রাকে আমরা পরিদর্শন করি, অর্থাৎ প্রকৃতিকেন্দ্রিক হয়ে উঠলে, বাস্তবমুখি হয়ে উঠলে, আত্ম বা অহম চিন্তা থেকে মুক্ত হলে, তবেই বিবেকের জন্ম হয়।
আর তার জন্ম হবার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত বিচার কখনোই সম্পন্ন হয়না। হয় তা সত্যে যাত্রার পরিবর্তে নূতন কনো কল্পনার রচনা করে, নয় তা সম্পূর্ণ সত্য পর্যন্ত পৌঁছানোর পূর্বেই মীমাংসা ধারণ করে, চেতনাকে বিভ্রান্ত করে। তুমি যা বললে মা, তা যদি সঠিক করে অনুধাবন করে থাকি, এবার আমাকে কৃপা করে তিন স্তরের বিচার প্রক্রিয়া সম্বন্ধে বলো, যার মাধ্যমে আমরা স্থূল থেকে সত্যে উপনীত হতে পারি, আর পরমাত্মের বশ্যতা থেকে চিরতরে মুক্ত হতে পারি”।
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “অতিধ্রুব সত্য বললে তুমি পুত্রী। সত্য সত্যই, এই বিচারের সম্পূর্ণতা না হবার কারণেই চেতনা পরাচেতনার স্বরূপ ধারণ করতে ব্যর্থ, আর যতক্ষণ তা করতে ব্যর্থ সে, ততক্ষণই পরমাত্মের বশ্যতা মানতে সে বাধ্য। একবার বৈরাগ্য ধারণ করে, বিবেক জাগ্রত করে বিচার দ্বারা স্থূল থেকে সত্যে উপনীত হতে পারলে, পরমাত্ম আর কনো প্রকারে চেতনার উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করতে পারেনা।
পুত্রী, যত নিয়ন্ত্রণ শিবের, তা পার্বতীর উপর, মহাকালীর উপর কনো নিয়ন্ত্রণ নেই পরমাত্মের, চরণতলে পতিত হয়ে যায় মহাকালীর কাছে। যত নিয়ন্ত্রণ তা লক্ষ্মীর উপর, মহালক্ষ্মীর উপর কনো নিয়ন্ত্রণ নেই, তখন পরমাত্মের তমগুণ হলাহল পান করতে বাধ্য হয়, তো পরমাত্মের রজগুণ কচ্ছপ হয়ে মন্থনক্রিয়াকে সম্পন্ন করতে বাধ্য হয়। আর এই মহাকালী বা মহালক্ষ্মী অবস্থা পর্যন্ত উন্নত হতে গেলে, বিচারকে স্থূল থেকে যাত্রা শুরু করিয়ে সত্য পর্যন্ত নিয়ে যেতে হয়।
পুত্রী, স্থূল থেকে সূক্ষ্মে যাত্রা করতে হলে, স্থূল অবস্থাকে তিনটি নিরিখে বিভক্ত করা হলো বিচারধারার প্রথম সিদ্ধান্ত। কি সেই তিনটি নিরিখ? স্থান, কাল ও পাত্র। পুত্রী, যা কিছুকে স্থূল অবস্থায় প্রত্যক্ষ করছো, তা স্পর্শকাতর হোক বা অস্পৃশ্য হোক, সেই সমস্ত কিছু এই তিনটি ভেদকের ভিত্তিতে স্থিত। একটি জন্তুকে নিয়ে বিচার করে দেখো, তাহলে প্রত্যক্ষ করতে পারবে।
ধরে নাও একটি সারমেয় জীব। আমাদের গৃহের চারিপাশে যেই সারমেয় দেখতে পাও, আর পাহাড়ের সারমেয় কি একই প্রকার দেখতে? না তো! … কেন নয়? দুইজনেই তো সারমেয়, তাহলে ভিন্নতা কেন? কারণ স্থান। শীতপ্রধান দেশে স্থিত হবার কারণে, তাদের অঙ্গে পশম অধিক, আর গ্রীষ্মপ্রধান দেশে স্থিত হবার কারণে তাঁদের অঙ্গের পশম স্বল্প।
আবার দেখো, এখানের সমস্ত সারমেয় কি একরূপ দেখতে? না তো! কেন নয়? কারণ তারা একাক কালে প্রকাশিত হয়েছে শরীরে। কালের সাথে সাথে সারমেয়দের আকার আকৃতি এমনকি খাদ্যস্বভাব ও মানুষের বা অন্যজীবদের প্রতি আচরণও পালটেছে। কেমন? আজ থেকে ২০ বৎসর পূর্বের সারমেয়জীবরা বিড়াল দেখলেই ধেয়ে যেত, কিন্তু এখন আর তেমন নেই তাদের স্বভাব। কেন নেই? কারণ কালের সাথে সাথে তারা দেখেছে যে, মানুষের কাছে তারাও থাকে আর বিড়ালও থাকে, আর উভয়ই মানুষের কাছে প্রিয়। তাই ক্রমাগত তাঁদের স্বভাব থেকে বিড়াল বিদ্বেষ কমতে থেকেছে।
আবার দেখো, সমস্ত সারমেয়, যারা একই সময়ে জন্মগ্রহণ করেছে, তারাও কি এক? একটিই সারমেয়ের চারটি ছানা, তাদের স্বভাব কি এক? না, কেন নয়? প্রথমত এর কারণ এই যে, তারা ভিন্ন ভিন্ন সারমেয় জননীর সন্তান, আর দ্বিতীয়ত একটি জননীরই প্রতিবার সঙ্গমের কালে ভিন্ন ভিন্ন মানসিকতা ক্রিয়াশীল। দেখ, পাত্রের পরিবর্তনের সাথে সাথে, কেমন ভাবে শিশু সারমেয়র চারিত্রিক গুণাবলি পালটে গেল, তাই না!
মধ্যা কথা হলো এই যে, যেকোনো বস্তু বা অবস্তু, যাকে ভৌতিক অর্থাৎ স্থূল জগতে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব, তার উৎস হবার স্থান, তার উৎস হবার কাল ও তার উৎস হবার পাত্রের উপর নির্ভরশীল। এরপরেও, তার জীবনযাপনের স্থান, জীবনযাপনের কাল ও জীবনযাপনের কালে যেই যেই পাত্রের সাথে সে সম্মিলিত হয়েছে, তাদেরও প্রভাব তার মধ্যে বিস্তারিত ভাবে উপস্থিত। আর তাই যতক্ষণ এই সমস্ত কিছুকে ধারণ করা হবেনা, ততক্ষণ সেই বস্তু বা অবস্তুর সূক্ষ্মকেও ধারণা করা অসম্ভব”।
দিব্যশ্রী জিজ্ঞাসু হয়ে বললেন, “দুটি প্রশ্ন আছে মা এইক্ষেত্রে। প্রথমটিই আগে বলি। আমার প্রথম প্রশ্ন এই যে, বস্তুর ক্ষেত্রে এই প্রভাবকে অনুধাবন করতে পারলাম, এবার কেবলই এই প্রক্রিয়ার অভ্যাস করতে হবে, অভ্যাস করতে করতে এই বিচার সহজাত হয়ে যাবে। কিন্তু অবস্তুর ক্ষেত্রে, এই স্থান কাল ও পাত্রের প্রভাবকে অনুধাবন করতে সক্ষম হলাম না। অবস্তু যেমন ধর গঙ্গা, বা বাতাস, এরাও তো স্থূলে অবস্থান করছে! গঙ্গার জল বস্তু, কিন্তু গঙ্গা! সে তো অবস্তু, কিন্তু সেই অবস্তুর বিচার কি করে করা সম্ভব?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “ধরে নাও এই ক্ষণে আমাদের এই কক্ষে যেই বাতাস বইছে। বাতাসের নিজের তো কনো গন্ধ হয়না। কিন্তু এখানের বাতাসে তো গন্ধ রয়েছে, আর তারও প্রভাব কখনো বাড়ছে তো কখনো কমছে। তা কি করে?”
দিব্যশ্রী বললেন, “কারণ এখানে আতর ব্যবহৃত হয়েছে। সেই আতরের গন্ধকে বাতাস ধারণ করে নিয়ে চলছে। আর যেহেতু সেই আতরের অণুরা ক্রমাগত নিজেদেরকে ঘনীভূত করছে আর লঘু করছে, সেহেতু বাতাসে তার গন্ধের তারতম্য হতেই থাকছে”।
ব্রহ্মসনাতন পুনরায় বললেন, “বাইরের বাতাসকে দেখ। গ্রীষ্মের প্রখর রৌদ্রের কারণে সে রুক্ষ। কিন্তু এখানে দেখো, সেই একই বাতাস আমাদের জানালাতে বারিকণা স্থাপন করে রেখে দিয়েছে। এমন কেন?”
দিব্যশ্রী উত্তরে বললেন, “কারণ আমাদের এই কক্ষে বাতানুকূল যন্ত্র চলছে, সেই যন্ত্রই বায়ুর মধ্যে জলকণার সঞ্চার করছে”।
ব্রহ্মসনাতন আবার বললেন, “কিন্তু এই একই বাতাস এখানে এই দক্ষিণবঙ্গে উত্তপ্ত, আবার সেই বাতাসই উত্তরবঙ্গে শীতল কেন?”
দিব্যশ্রী এবার মৃদুহাস্যে বললেন, “বুঝে গেছি মা। স্থানের প্রভাবে বাতাস এখানে উত্তপ্ত আর উত্তরবঙ্গে তা শীতল। কালের প্রভাবে তা গন্ধযুক্ত আর সেই গন্ধের তারতম্য যুক্তও। আর পাত্রের প্রভাবে অর্থাৎ বাতানুকূলের প্রভাবে, তা এখানে জলকণার সঞ্চার করছে, কিন্তু গৃহের বাইরে তা রুক্ষ”।
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “এবার দ্বিতীয়প্রশ্ন করো পুত্রী”।
দিব্যশ্রী বললেন, “ধরো যেই সারমেয়জীবের কথা বললে, তাকেই ধারণা করলাম। আমি তো তাকে এই অবস্থায়, এই পাত্রে, এই কালে দেখছি। আমি তো জানিও না যে তার কোন কালে, কোন স্থানে, এবং কোন পাত্রের প্রভাবে তার জন্ম হয়েছে। তাহলে আমার পক্ষে তার সূক্ষ্মকে ধারণা করা সম্ভব কি ভাবে হবে?”
ব্রহ্মসনাতন মৃদুহাস্যে বললেন, “নিজের সত্ত্বার উপর নিয়ন্ত্রণ যদি থাকে, তাহলে যেকোনো জীবের, অজীবের, অবস্তুরও সত্ত্বাকে ধারণা করা সম্ভব হয়। সত্ত্বা মানে কি? স্বভাব যুক্ত আত্ম। অর্থাৎ নিজের সম্পূর্ণ স্বভাবকে যিনি জানেন, তিনি সেই সত্ত্বাকে সেই সারমেয়র অন্তরেও স্থাপন করতে সক্ষম। আর তা করতে পারলেই, সম্যক ভাবে সেই সারমেয়র আদি-অন্ত তাঁর জ্ঞাত হয়ে যাবে, ঠিক যেমন ভাবে সে নিজের আদিঅন্ত সম্ভন্ধে জ্ঞাত”।
দিব্যশ্রী গম্ভীর হয়ে বললেন, “এর অর্থ, এই সমস্ত কিছুর পূর্বে, নিজেকে নিরপেক্ষ অর্থাৎ বৈরাগ্য ধারণ করে, এবং বিবেক ধারণ করে বিচার করা আবশ্যক। কারণ, যদি নিজের সত্ত্বাকে না জানি আমরা, তাহলে কনো বস্তুর বা অবস্তুর সত্ত্বার স্থানে নিজেদের সত্ত্বাকে স্থাপিত করতে পারবো না আমরা। তাই প্রথম নিজের আত্মের আদিঅন্ত সমস্তকিছুকে নখদর্পণে করে নিতে হবে। তবেই অন্য বস্তু বা অবস্তুর আদিঅন্তকে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব”।
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “হ্যাঁ পুত্রী, পূর্বেও বলেছি, বিশ্বাস, আস্থা, ধারণা, তথ্য, তত্ত্ব, এইসমস্ত কিছুর কনো স্থান নেই আধ্যাত্মে। আধ্যাত্মে সেটিই মীমাংসা, যা প্রত্যক্ষ করা হয়েছে। আমার ধারণা অমুক, আমার বিশ্বাস অমুক, আমার কাছে অমুক তথ্য আছে, আমার কাছে এমন তত্ত্ব রয়েছে, এই সমস্ত আধ্যাত্মে প্রহসন মাত্র। যা কিছু প্রত্যক্ষ হয়নি, আধ্যাত্মের ভাষায় তা অসত্য। একমাত্র তাই সত্য, যাকে সম্পূর্ণ চেতনা প্রত্যক্ষ করেছে। তাই নিজসত্ত্বাকে নিজমুষ্টিতে আবদ্ধ করা অত্যন্ত আবশ্যক, কারণ তবেই যেই বস্তু বা অবস্তুর সত্যকে আমরা জানতে আগ্রহী, তার অন্তরে নিজের সত্ত্বাকে স্থাপন করা সম্ভব, আর তখনই তার সম্যক আদিঅন্তকে দেখা সম্ভব, যেই দেখা হলো প্রত্যক্ষ করা, অর্থাৎ তাতে কনো অনুমান নেই, কনো কল্পনা নেই”।
দিব্যশ্রী পুনরায় বললেন, “এই স্থান কাল ও পাত্রের প্রভাবকে প্রত্যক্ষ করে নিলেই কি সূক্ষ্মকে প্রত্যক্ষ করা হয়ে যায় মা?”
ব্রহ্মসনাতন উত্তরে ধৈর্যশীল হয়ে বললেন, “না পুত্রী, এই প্রতিটি ক্ষেত্র, অর্থাৎ স্থান একটি মীমাংসা দেবে, কাল একটি মীমাংসা দেবে, এবং পাত্র একটি মীমাংসা দেবে, যাদের মধ্যে যেমন উৎস স্থান, কাল ও পাত্র থাকবে, তেমনই জীবনযাপনের স্থান, কাল ও পাত্রের প্রভাবও থাকবে। কিন্তু এই সমস্ত প্রভাব কাকে প্রভাবিত করছে? যেমন সেই বস্তুর অন্তরের পুরুষ অর্থাৎ আত্ম বা অহমকেও প্রভাবিত করছে, তেমন তাঁর প্রকৃতি অর্থাৎ চেতনাকেও প্রভাবিত করছে।
আর তাই, বিচারের এই অবস্থায় আমাদেরকে স্থানের মীমাংসা, কালের মীমাংসা এবং পাত্রের মীমাংসা কি কি ভাবে সেই বস্তুর বা অবস্তুর পুরুষকে এবং প্রকৃতিকে প্রভাবিত করছে, তা প্রত্যক্ষ করতে হয়। পুরুষ মানে, সেই বস্তু বা অবস্তুকে যে চালনা করছে, আর প্রকৃতি মানে, সেই বস্তু যা যা ক্রিয়া করছে, সেই আত্মের প্রভাবে এসে। এই বিচারই সম্পন্ন করে সূক্ষ্ম অনুধাবনকে। আর এবার শুরু হয় কারণ বিচার।
কারণ বিচারে কি করতে হয়? পুরুষ অর্থাৎ আত্মের তিনগুণ, ত্রিগুণ সম্পন্ন তা। সত্ত্ব, রজ ও তম, অর্থাৎ সৃজনস্বভাব, রক্ষণস্বভাব ও লয়স্বভাব তার। এই তিন স্বভাবের প্রভাবই তাকে বিশিষ্ট স্থানে জন্ম দিয়েছে, বিশিষ্ট কালে জন্ম দিয়েছে, এবং বিশিষ্ট পাত্রের থেকে তাকে জন্ম দিয়েছে। তাই এবার তার জন্মের স্থান নির্ধারণে সত্ত্বের, রজের এবং তমের প্রভাবকে বিচার করতে হয়। একই ভাবে, তার জন্মের কাল নির্ধারণে ত্রিগুণের প্রভাবকে বিচার করতে হয়, এবং একই ভাবে তার জন্মদাতা পাত্রের ও জন্মলব্ধ পাত্রের নির্ধারণে ত্রিগুণের প্রভাবকে বিচার করতে হয়।
যখন এই বিচার সম্পন্ন হয়, তখন কারণরূপকে প্রত্যক্ষ করা সম্পন্ন হয়, অর্থাৎ কেন সে সেই বিশিষ্ট স্থানে, বিশিষ্ট কালে, এবং বিশিষ্ট পাত্রের সন্তান হয়ে এবং বিশিষ্ট পাত্র ধারণ করে জন্ম নিয়েছে, তা নিশ্চয় হয়ে যায়। কিন্তু বিচার তখনও সম্পন্ন হয়নি, কারণ সত্যে আমরা তখনও উপস্থিত হইনি।
সত্যে উপনীত হতে হলে, আমাদেরকে এবার পরাচেতনার প্রভাবকে ধারণ করতে হয়, তাঁর প্রভাবকে বিচার করতে হয়। কি নিরিখে সেই বিচার করবো? ব্রহ্মময়ীর নিরিখে। পুত্রী, চেতনা অবশ্যই আত্মের প্রভাবে স্থিত, আর আত্ম পরমাত্মের প্রভাবে। তাই, চেতনার আত্মের প্রভাব অমুসারে অবস্থানকে অনুধাবন করতে আত্মের বিচার করে, আমরা স্থান, কাল ও পাত্রের বিচার করেছি। আর চেতনার পরমাত্মের প্রভাব অনুসারে অবস্থানকে অনুধাবন করতে আমরা ত্রিগুণের প্রভাবকে নিরীক্ষণ করেছি।
কিন্তু পরমাত্ম কখনোই ব্রহ্মময়ীর উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করতে সক্ষম নন। অর্থাৎ সকল অবস্থাতেই পরমাত্ম ও আত্ম ব্রহ্মময়ীর নিয়ন্ত্রণে স্থিত। তাই এবার চেতনার উপর ব্রহ্মময়ীর নিয়ন্ত্রণকে অনুধাবন করতে হবে, তবেই আমরা সত্যে স্থাপিত হতে পারবো সেই বস্তুর বা অবস্তুর। কি করে এই বিচার করবো?
পুত্রী, ব্রহ্মময়ীর তিন প্রকাশ, নিয়তি, কালী ও প্রকৃতি। নিয়তি কি করেন? সমস্ত আত্মকে বিভিন্ন অবস্থায় ও অবস্থানে স্থিত করে পরিস্থিতির সঞ্চার করেন। কালী কি করেন? কালী সকল আত্মকে যেই সময় বেষ্টন করে রয়েছে, যেই কাল বেষ্টন করেছে, তাদেরকে একত্রিত এক রূপরেখা প্রদান করেন, যার কারণে সেই সময়ে উপস্থিত সকল আত্মের এমন ধারণা হয় যেন তারা একই সময়ে সকলে বেষ্টিত হয়ে রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে যে যার নিজের সময়ে বেষ্টিত হয়েই রয়েছেন। আর প্রকৃতি কি করেন? প্রকৃতি সেই পরিস্থিতিতে, সেই সময়ে, উপস্থিত সমস্ত আত্মকে এই বোধ করান যেন যেই কাল ও পরিস্থিতিতে তিনি রয়েছেন, তার উপর তাদের কনো নিয়ন্ত্রণ নেই, এবং এমন অনুধাবন করানোর কারণে, সমস্ত আত্ম পরিস্থিতি ও সময়কে নিজের অনুকূল অবস্থায় নিয়ে আসতে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ কি বুখলে পুত্রী? পরমাত্মের ত্রিগুণ চেতনাকে নির্দিষ্ট স্থান, কাল ও পাত্রে অবস্থান করায়, আর ব্রহ্মময়ী চেতনাকে নির্দিষ্ট স্থান, কাল ও পাত্রদের সাথে সদা আলাপে রত রাখেন, তাঁদেরকে চেতনা থেকে পরাচেতনাতে উন্নত করার উদ্দেশ্যে। আর তাই এই অন্তিম স্তরে এই বিচার করতে হয় যে, যেই বস্তু বা অবস্তুর সত্যকে আমরা অনুধাবন করতে চাইছি, তাকে ব্রহ্মময়ী কোন অবস্থাতে রেখেছেন, কোন কালের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত রেখেছেন, এবং কোন কোন পাত্রদের সাথে সাখ্যাত করাচ্ছেন।
উদ্দেশ্য তাঁর চেতনার বিকাশ, আর তাই এই সমস্ত সাখ্যাত, সমস্ত অবস্থান্তর এবং সমস্ত কালপ্রবাহের উদ্দেশ্য সেই চেতনার বিকাশ। তাই এবার নির্ধারণ করা যে কি ভাবে ব্রহ্মময়ী সেই চেতনার বিকাশ করাচ্ছেন, আর তা নিরীক্ষণ করে অনুধাবন করা যে কোন চেতনার স্তরে সেই চেতনা অবস্থান করছেন, কারণ যেই চেতনার যেমন অবস্থান, তাঁর সম্মুখে ব্রহ্মময়ী সেই অবস্থান্তর, সেই পাত্রসমূহ ও সেই কালপ্রবাহকেই স্থাপিত রাখবেন”।
দিব্যশ্রী এবার তৃপ্তির হাস্যহেসে বললেন, “বুঝেছি মা, সত্য হলো চেতনা, কারণ চেতনা হলেন স্বয়ং ব্রহ্ম। আর এই চেতনাকেই নিয়ন্ত্রণে রেখেছে আত্ম, এবং পরমাত্ম, এবং পরমাত্মকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে স্বয়ং ব্রহ্মময়ী। আর তাই সত্য অনুধাবন করতে হলো, প্রথমে আমাদের আত্মের চেতনার উপর প্রভাবকে অনুধাবন করতে হবে, যা সে স্থান, কাল ও পাত্রের মাধ্যমে করে। পরবর্তীতে আমাদেরকে পরমাত্মের প্রভাবকে অনুধাবন করতে হবে, যা সে ত্রিগুণের দ্বারা করে। আর অন্তে আমাদেরকে ব্রহ্মময়ীর প্রভাবকে অনুধাবন করতে হবে, যা তিনি নিয়তি বা পরিস্থিতি, কাল সংঘাত বা কালীর মাধ্যমে করেন, আর পাত্রসম্মেলন যা তিনি প্রকৃতিরূপে করেন, তাকে অনুধাবন করতে হবে।
একবার এই তিনস্তর বিচার সম্পন্ন হয়ে গেলে, কোন চেতনা কোন অবস্থায় রয়েছে, পরাচেতনার থেকে কতটা দূরে অবস্থান করছে, এই পূর্ণসত্যকে জানা সম্ভব। … সত্যই মা, আধ্যাত্মে আবেগের, ভক্তির, আস্থার কনো স্থান নেই। আর সত্য বলতে তথ্যেরও কনো স্থান নেই, কারণ যেই চেতনা যেই তথ্য প্রদান করবে আমাদেরকে, সেটি তাঁর ধারণা, আস্থা ও বিশ্বাস, আর এই বিশ্বাস গঠনের পিছনে রয়েছে পরমাত্মের তীক্ষ্ণ ষড়যন্ত্র। অর্থাৎ সে আমাদের যেই তথ্য প্রদান করবে, তা সমস্তই ভ্রান্তি বিস্তারক। সেই তথ্যের ভিত্তিতে আমরা বিচার করতে গেলে, আমরা সত্যে উপনীত হবো না, বরং এক নূতন কল্পনার রচনা করে ফেলবো। তাই প্রয়োজন সত্ত্বার উপর নিয়ন্ত্রণ, কারণ প্রকৃত তত্ত্ব আমাদের এই সত্ত্বাই প্রদান করতে সক্ষম।
আচ্ছা মা, একটি প্রশ্ন আমার জাগছে, যা এই বিচার সংক্রান্ত নয়। … কথাটা এই যে, তুমি সর্বক্ষণ এত বিস্তারিত ভাবে কেন ব্যখ্যা দাও? কেবল আদেশ দিলেই তো হয়ে যায় যে এমন করো। কিন্তু তুমি সকল ক্ষেত্রে কি করা উচিতের সাথে সাথে কেন তা করা উচিত কেন বলো? তোমার যুক্তি দেবার প্রয়োজন তো নেই, তাও কেন যুক্তি প্রদান করো?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, আমি যা প্রদান করি, তা কি যুক্তি? নাকি তা অন্তরের পদ্ধতি?”
দিব্যশ্রী হাস্যমুখে বললেন, “হ্যাঁ, পদ্ধতি, তন্ত্র। কিন্তু কেন এই তন্ত্র, কেন এই ব্যাখ্যা?”
ব্রহ্মসনাতন পুনরায় হাস্যমুখে বললেন, “পুত্রী, যখন তুমি কারুকে কনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সেই সিদ্ধান্তের পালন করতে আদেশ দিচ্ছ, সেখানে কনো পদ্ধতি, কনো তন্ত্রের ঘোষণা করার প্রয়োজন নেই, কিন্তু আমি তো সেই আদেশ দিই না। … সকল চেতনাকে স্বস্ব যাত্রা করতে হয়, নিজেকে নিজেকে পরাচেতনার সাথে সংযুক্ত করতে হয়। তাই যদি তাদের পদ্ধতি না জানা থাকে, তবে সেই যাত্রা তারা করবে কি করে? … তারা যাতে যাত্রা করতে সক্ষম হয়, তারা যাতে বিচার করতে সক্ষম হয়, তারা যাতে বৈরাগী হতে সক্ষম হয়, তারা যাতে স্বয়ংনির্ভর হয়, তার কারণেই বলা এই সমস্ত তন্ত্র ও পদ্ধতি”।
