আধ্যাত্মিক মাফিয়া (মহাবিজ্ঞান)
দিব্যশ্রীর নেত্রে অশ্রুবারি। সংযত হয়ে তিনি বললেন, “মা, যা তুমি বললে, তা জগজ্জননীর চিঠি নয়, তা জগজ্জননীর তাঁর সমস্ত সন্তানের উদ্দেশ্যে বার্তা। … তোমার অংশপ্রকাশ আমি, আমার সখী শ্রীমতী, আর আমাদের পরবর্তী প্রজন্মে তোমার প্রকাশের সম্মুখীন আমরা এখনো হইনি, নিশ্চয় হবো। আমরা তিনজনে মিলে প্রাণপণে প্রয়াস তো করবোই, আমাদের সন্তানদের আমাদের বক্ষে ফিরে পেতে। কিন্তু মা, তার জন্য আমার কিছু জানার আছে।
মা, উপায় তো তুমি বলেছ আমাকে, অনাথদের নিয়ে, তাঁদের নিয়ে কর্মযজ্ঞ করার, কিন্তু সেই মার্গের মধ্যেও যেন অনেক না বলা কথা আছে। সেই না বলা কথাগুলিকে বলো মা। কি রূপে আত্মদের উপর চেতনার আগ্রাসনকে স্থাপন করা যায়, সেই কথা আমাকে বলো মা”।
ব্রহ্মসনাতন স্থিরদৃষ্টি রেখে বললেন, “মাফিয়া সম্বন্ধে কি জানো পুত্রী, সেটা আমাকে একটু ব্যক্ত করো প্রথমে। এই প্রশ্ন করার কারণ তুমি শীঘ্রই বুঝতে পারবে। তাই দ্বন্ধ না রেখে, আমার প্রশ্নের উত্তর দাও পুত্রী”।
দিব্যশ্রী একটু বিড়ম্বনা করেই উত্তর দিলেন, “মাফিয়া! মাফিয়া মানে সেই ব্যক্তি যে, অবৈধ পাচার কর্ম করে, অর্থাৎ নারী বা শিশু বা মানুষ পাচার করে, মাদক পাচার করে, আর অস্ত্র পাচার করে”।
ব্রহ্মসনাতন মৃদু হেসে বললেন, “এতো তাই বললে, যা খালি চোখে দেখা যায়। যা খালি চোখে দেখা যায়না, সেই কথা বলো এবার পুত্রী”।
দিব্যশ্রী আবারও কুণ্ঠিত ভাবে বললেন, “আসলে এই পাচার হলো সেই সুতো, যার উপর মুক্ত গেঁথে, মুক্তের মালা নির্মাণ হয়। মানে, বাইরে থেকে দেখে মনে হয় যেন প্রচুর মুক্তকে একত্রে সাজিয়ে রেখে মালা গাথা হয়েছে, কিন্তু এঁদের সকলের ভিতর দিয়ে একটি সুতো গেছে, যেই সুতোই এই মুক্তের মালা গঠনের মূল তত্ত্ব।
কিন্তু বাস্তবিক জগত হলো দর্পণচিত্র, আর তাই সমস্ত কিছুই উলটো দেখায় এখানে। আর তাই, এখানে মুক্ত থাকে অন্তরে, আর সুতো থাকে বাইরে। পাচার কর্ম হলো সুতো, আর মুক্ত হলো রাজনেতা ও ধনাঢ্য। মাফিয়ার আসল বাণিজ্য এই রাজনেতাদের ও ধনাঢ্যদের নিয়ে। ইনার মূল কাজ হলো, কনো ধনাঢ্যকে উপরে নিয়ে আসা আর কনো ধনাঢ্যকে নিচে নামিয়ে দেওয়া; কনো রাজনেতাকে সম্রাট করে দেওয়া, আর কনো রাজনেতাকে ভিক্ষুক করে দেওয়া।
আর তা সম্ভব এই পাচারের মাধ্যমেই। অর্থাৎ, একটি ধনাঢ্য বা রাজনেতা কার ভরসায় ওঠে বা নামে? তাঁদের অন্ধভক্তদের ভরসাতেই। আর এই অন্ধভক্ত কেন অন্ধভক্ত? মাদকের জন্য আর দেহসম্ভোগের নেশার জন্য, কারণ এই দুই নেশার অনুমতি সমাজ দেয়না। মাফিয়ার দৌলতে এই দুই নেশার জোগান পেতেই থাকে ধনাঢ্য এবং রাজনেতা, যা তাঁরা বিপুল সম্পদ ব্যয় করে ক্রয় করেন মাফিয়ার থেকে, যেখানে স্ত্রী হন সেই সম্ভোগের নেশা করার উপাদান, আর শিশু হন পরবর্তী অন্ধভক্ত নির্মাণের উপাদান।
আর এরপর, যখন অন্ধভক্ত হয়ে যায় তারা, তখন স্ত্রীর জোগান দ্বারা ও মাদকের জোগান দ্বারা তাঁদেরকে বশীভূত রাখা হয়, এবং পাচার করা অস্ত্র দ্বারা এঁদেরকে সশস্ত্র করা হয়। আর এই অন্ধভক্তের কারণেই রাজনেতা সম্রাট হয়ে ওঠে, আর ধনাঢ্য রাজ্যের শ্রেষ্ঠ ধনবান হয়ে উঠে ক্ষমতা ধারণ করে থাকে। অর্থাৎ মাফিয়াই হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি রাজ্যের ভাগ্য স্থির ও নির্ধারণ করেন, আর এটিই তাঁর পেশা”।
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “যথাযথ ব্যাখ্যা পুত্রী। … এবার আমাকে একটি কথা বলো, এমন কনো ব্যক্তির নাম স্মরণ আসছে, এমন একটি চরিত্রের নাম স্মরণ আসছে, যিনি কনো ভৌতিক ব্যক্তি নন, অথচ সেই চরিত্রের রচয়িতা তাঁকে সেই সমস্ত গুণবিশিষ্ট দেখিয়েছেন, যা এক মাফিয়ার থাকে?”
দিব্যশ্রী এবার হতবাক হয়ে ব্রহ্মসনাতনের দিকে তাকিয়ে, ভ্রুকুঞ্চিত করে বললেন, “বিচিত্র প্রশ্ন, অর্থাৎ বিচিত্র ভাবে বিচার আবশ্যক। … একটু সময় দাও মা। এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলে, তা অত্যন্ত সহজ, আর না দিতে পারা পর্যন্ত অত্যন্ত কঠিন”।
বেশ কিছুক্ষণ বিচার করে এসে, দিব্যশ্রী পুনরায় ব্রহ্মসনাতনের সম্মুখে সেই একই ভ্রুকুঞ্চিত ভাবেই বললেন, “উত্তরটি কি দেবকীনন্দন কৃষ্ণ? … ভুল উত্তর হলে, ক্ষমা করে দিও মা, কিন্তু আর কারুর সাথে এই সমস্ত মাফিয়ার গুণ মিলছেই না। … বড়ই কুণ্ঠা হচ্ছে এই নাম উচ্চারণ করতে। … কিন্তু এই একটিই ব্যক্তিকে পাচ্ছি, এমন গুণসম্পন্ন”।
ব্রহ্মসনাতন নাট্যভাবে গম্ভীর হয়ে ভ্রুকুঞ্চিত করে বললেন, “যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে বলো পুত্রী। কৃষ্ণ কর্মকে মাফিয়া কর্মের সাথে কোথায় মেলাতে পাচ্ছ তুমি!”
দিব্যশ্রী পুনরায় কুণ্ঠিত হলে, ব্রহ্মসনাতন পুনরায় বললেন, “কুণ্ঠিত না হয়ে, যুক্তিগুলি বলো পুত্রী। এখানে শ্রোতা কেবল আমি। তাই যদি ভুল কিছু বলেও থাকো, তার সংশোধন এখানেই হয়ে যাবে। সেহেতু কুণ্ঠিত না হয়ে, স্পষ্ট ভাবে যুক্তি দিয়ে বলো, কৃষ্ণকে কেন মাফিয়ার সাথে মেলাচ্ছ?”
দিব্যশ্রী সেই একিভাবে কুণ্ঠিত হয়েই বললেন, “মা, আসলে … উনার অঙ্গুলিহেলনেই সমস্ত কিছু চলেছে, এমনই ব্যাস দেখিয়েছেন। উনার সাথে যারা যারা বিরোধ করেছেন, তারা তারা প্রাণে গেছেন, যেমন জরাসন্ধ, রুক্মি, শিশুপাল, নরকাসুর, পুণ্ড্রক, এমনকি পরবর্তীতে দুর্যোধন ও শকুনিও।
একই সঙ্গে, যদি একে পাচার করা বলা হয়, তবে নারায়ণী সেনা বিক্রয় করেছিলেন তিনি দুর্যোধনের কাছে, আবার যখন পাণ্ডবরা ইন্দ্রপ্রস্থ স্থাপন করেছিলেন, তখন মহাভারতের পাতা বলছে, কৃষ্ণ বিপুল সংখ্যক অস্ত্র, ঘোড়া, হস্তি, সেবক, সেবিকা, এমনকি মাদকও প্রদান করেছিলেন পাণ্ডবদের। এমনকি যুধিষ্ঠিরকে রাজসূয় যজ্ঞ করিয়ে সম্রাট করে দিয়েছিলেন তিনিই।
জরাসন্ধকে হত্যা না করলে, রুক্মিকে দমন না করলে, আর শিশুপালের হত্যা না করলে, যুধিষ্ঠির কিছুতেই সম্রাট হতে পারতেন না। আর তা ছাড়াও, সম্রাট হতে গেলে যেই বিপুল সেনা, অস্ত্র, হস্তি, ঘোড়া লাগে, এবং এঁদের সকলকে নিজের সাথে যুক্ত রাখার জন্য যেই পরিমাণ মাদক, স্ত্রী সেবিকা ইত্যাদির প্রয়োজন হয়, সেই সমস্তই কৃষ্ণ প্রদান করেছিল পাণ্ডবদের। আর… দ্বিতীয় একটিও চরিত্র এমন নেই, যিনি অঙ্গুলিহেলনে কারুকে সম্রাটের পদ থেকে টেনে নিচে নামিয়েছেন আবার কারুকে সম্রাট করেছেন।
তবে…, তবে কমবেশি সমস্ত ব্যক্তি যারা আধ্যাত্মিক প্রচার করেছেন, তাঁরা রাজাদের অধিকারে রেখেইছেন। চৈতন্যদেবও যেমন উৎকলাদি রাজ্যের রাজাকে রেখেছিলেন নিজের কাছে, তেমন শঙ্করও, আবার তেমন স্বামী বিবেকানন্দও বহু রাজার সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে মিত্রতা করেছিলেন। কিন্তু কৃষ্ণ চরিত্রকে মাফিয়ার ব্যাখ্যার সাথে সম্পূর্ণ ভাবে মেলানো সম্ভব হচ্ছে মা”।
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “বুঝতে পারলে পুত্রী, যেই পদ্ধতির অনুসরণ করলে, পরমাত্মের বিরুদ্ধে পরাচেতনার আধিপত্যকে বিশ্বব্যাপী স্থাপন করা সম্ভব, তার নকশা কত কৌশলের সাথে আর্যদের সম্মুখে বসে, অর্থাৎ পরমাত্মের পূজারিদের সামনে বসে থেকে, ব্যাস প্রস্তুত করে গেছেন! … এই হলো সেই পদ্ধতি পুত্রী, যা স্থাপন করতে পারলে, পরাচেতনাকে পরমাত্মের উপর সম্যক বিশ্বে বিজয় প্রদান করা সম্ভব।
হ্যাঁ, আকস্মিক যা গজিয়ে ওঠে, আকস্মিক ভাবে তার নাশও হয়ে যায়। তাই রাতারাতি এমন কিছু করার চিন্তা বা প্রবণতা রাখাও সঠিক নয়। তবে হ্যাঁ, এই সেই উপায়, আর সেই উপায়ের রচয়িতা স্বয়ং ব্যাস। পরবর্তী অবতারদের জন্য এই নকশা, এই আধ্যাত্ম স্থাপনের বীজমন্ত্র উপহাররূপে প্রদান করে গেছেন দ্বৈপায়ন।
পুত্রী, এই হলো সেই নকশা, যা যখন ধারণ করা যাবে, তখনই আধ্যাত্মিক সমাজের স্থাপনা সম্ভব হবে, অর্থাৎ অহমিকাই যার মূলধন, সেই পরমাত্মের জগতব্যাপি পরাজয় নিশ্চিত হবে। কিন্তু পুত্রী, আবারও বলছি, রাতারাতি এতবড় কীর্তি স্থাপিত করতে হলে চমৎকার প্রদর্শন করতে হয়, আর এক অবতার যদি চমৎকার প্রদর্শন করে, তাহলে আপামর জনতার পরগাছা হয়ে ওঠা কেবলই সময়ের অপেক্ষা।
পুত্রী, এক অবতার হলেন মার্গদর্শক। ঠিক যেমন করে এক শিক্ষক কি বললেন, সেটিই মার্গদর্শন নয় এক ছাত্র বা এক ছাত্রীর জন্য, তাঁর আচার আচরণ, জীবনযাপন সমস্ত কিছুই ছাত্রছাত্রীর কাছে মার্গদর্শন হয়, তেমনই এক অবতারের কেবল কথনই মার্গদর্শন হয়না, তাঁর আচার আচরণ, মান্যতা, বেশভূষা ইত্যাদিক সমস্ত চারিত্রিক গুণাবলিই আপামর জনতার জন্য মার্গদর্শন হয়।
তাই যদি এক অবতার রাজকীয়তা ধারণ করেন, তাহলে আপামর জনতার কাছেও রাজকীয়তা ধারণই আদর্শ হয়ে যাবে। তাই অবতার হবেন ত্যাগী, অবতার হবেন সরল, অবতার হবেন অত্যন্ত সাধারণ। তাঁর আচরণের মধ্যে থাকবেনা কনো প্রকার ভেদভাব, না মানুষের প্রতি, না আহারের প্রতি, না অন্য কনো কিছুর প্রতি। তাঁর প্রতিটি আচরণের পশ্চাতে থাকবে সমাজকল্যাণের দর্শন, তবেই তো আপামর জনতা ভেদভাবের উর্ধ্বে উঠতে পারবে। তবেই তো তাঁরা আচার আচরণ, বেশভূষাতে ভেদাভেদ না করে, বিচারকে পরিপক্ক করতে উদ্যত হবে।
তাই এক অবতারের সর্বক্ষণ প্রয়াস থাকে চমৎকার না করা, তবে তাও কিছু চমৎকার হয়েই যায়, কারণ অবতার মানে স্বয়ং নিয়তি, স্বয়ং প্রকৃতি, স্বয়ং কালী, তাই তাঁর বচনকে মান্যতা দিয়ে প্রকৃতি নিজের মধ্যে পরিবর্তন আনবেই, সময় তাঁর গতি পরিবর্তন করবেই। তবে এক অবতারও সেই কথা জানেন, তাই তিনি সেই বিষয়েও সতর্ক থাকেন।
তাই পুত্রী, কনো চমৎকার নয়, অত্যন্ত সাবলীল ভাবে এই যুদ্ধ করতে হয়। এমন ভাবেই এই যুদ্ধ করতে হয় যা দেখে তাকে যুদ্ধ বলে মনেই না হয়। এমন ভাবে প্রচার করতে হয়, যা দেখে প্রচার বলে মনেই না হয়। পুত্রী, যখনই প্রচার রূপে তোমার কীর্তিকে গণ্য করা হবে, তা যদি পরমাত্মের স্বার্থকে খণ্ডন করে, তবে নিশ্চিত ভাবে জেনে রাখো প্রতিরোধ আসবেই। কিন্তু পুত্রী, সেই যোদ্ধা কেমন যোদ্ধা, যে প্রতিরোধকে আমন্ত্রণ করে!
প্রকৃত যোদ্ধা তো তিনি, যিনি প্রতিরোধকারীদের বুঝতেও দেননা যে তাঁদের প্রতিরোধ করার প্রয়োজন আছে। অতর্কিত আক্রমণ হলো যোদ্ধার অন্তিম প্রহার, আর সাবলীল আক্রমণ হলো যোদ্ধার স্বাভাবিক গুণ। এক যোদ্ধা সর্বক্ষণ একটু একটু করে আক্রমণ করতে থাকে, ঠিক যেমন উইপোকা একটু একটু করে ঘরের দেওয়ালকে ভিতর থেকে ফোপরা করে দেয়, তেমন।
পুত্রী, উইপোকার এমন কীর্তির কারণে, তার আক্রমণের কনো ধারণাই থাকেনা আমাদের কাছে। ঠিক তেমনই এক যোদ্ধা সমাজের মধ্যে থেকে, পরমাত্মের অর্থাৎ অহংকারের সমস্ত বীজকে নষ্ট করতে থাকবে। উপায় তোমাকে পূর্বেই বলেছি এমন কি করে করবে, সেই ব্যাপারে। সমাজের সেই শ্রেণীকে নিয়ে কাজ করো, যারা সমাজে অবহেলিত, যাদের দায়িত্ব নেওয়াকে, যাদের ভবিষ্যতের দায়িত্ব নেওয়াকে সমাজ অস্বীকার করে।
পুত্রী, তাদের খাতা সম্পূর্ণ খালি, তাই তাতে যা লিখবে, তাই হবে তার জ্ঞান। তাই তাদেরকে ধারণ করো। তাদের ধারণ করে, তাদের দিব্যপ্রেম প্রদান করো, সেই প্রেম যেই প্রেম, যাদের অবিভাবক আছেন, সেই অবিভাবকের থেকেও লাভ করেন না। নিঃশর্ত, নিঃস্বার্থ, অবাঞ্ছিত প্রেম প্রদান করো। স্বার্থের নয়, হৃদয়ের সম্পর্ক নির্মাণ করো। একবার তা করা হয়ে গেলে, পরবর্তী কাজের শুরু হয় পুত্রী।
পুত্রী, একটি সত্য জানো কি মনুষ্যচরিত্রের? মনুষ্য যখন স্বেচ্ছায় কারুর দাস হতে চায়, কিন্তু যার দাস হতে চায় সে, সেই ব্যক্তি তাকে দাস না করে আপনজন রূপে রেখে দেন, এটিই হলো প্রকৃত অর্থে বশীকরণ। তাই পুত্রী, যখন তোমার থেকে নিঃশর্ত, নিঃস্বার্থ ও অবাঞ্ছিত প্রেম লাভ করবে সেই সমাজপরিত্যক্তরা, তখন তারা তোমার দাস হয়ে থাকতে চাইবে স্বাভাবিক ভাবেই। কিন্তু ভুলেও তাদের দাস করবে না, স্মরণ রাখবে, স্বরূপে সকলেই ব্রহ্ম, তাই দাস কিছুতেই করবেনা। সন্তান করবে।
সেই সন্তান তোমার কাছে বশ হয়ে থাকবে। হ্যাঁ থাকবে, তুমি না করে রাখতে চাইলেও বশ হয়েই থাকবে। কিন্তু তুমি পুরুষ নও, তুমি অহম নও, তুমি আত্ম নও। তাই বশ হয়ে থাকতে চাইলে, তাকে পরাধীন করবেনা, বরং তাকে যথার্থ অর্থে স্বতন্ত্র করবে। তাকে সত্যজ্ঞান প্রদান করবে, তাকে মোক্ষমার্গ প্রদান করবে, আর তার জীবনকে সার্থক করবে।
অর্থাৎ পুত্রী, এককথায় বলতে গেলে, তাই তাই করবে, যা যা পরমাত্ম করে থাকে চেতনাদের বশ করার জন্য। কেবল পরমাত্ম চেতনাকে বশ করে নিজের স্বার্থসিদ্ধ করে, অর্থাৎ নিজের প্রতিষ্ঠা স্থাপন করে, নিজের আরাধনা করায়, কিন্তু তুমি তাঁদেরকে মুক্ত করবে, তাদেরকে সত্যের আরাধনা করাবে, তাদের নিজজীবনকে উন্মুক্ত করবে, তাঁদেরকে প্রতিষ্ঠিত করবে।
পুত্রী, এই ভাবে এক নয়, দশ নয়, শতকও নয়, সহস্র সহস্র কৃতান্তিক নির্মাণ করবে, আর তারপর একত্রে তাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করবে। পুত্রী, খেয়াল করে দেখো, একটি কৃতান্তিক চৈতন্যকে নিয়ে জেরবার হয়ে গিয়ে তার হত্যার চিন্তা করেছে পরমাত্ম; একটি মার্কণ্ডকে হত্যা করার প্রয়াস করেছে পরমাত্ম; একটি ঈশাকে নাশ করার, একটি মহম্মদকে হত্যা করার, একটি গৌতম বুদ্ধকে হত্যা করার প্রয়াস করেছে।
বুঝতে পারছ পুত্রী, যদি এমন ১০ সহস্র কৃতান্তিক একত্রে প্রকাশিত হয়, তখন কি হতে চলেছে! কাকে হত্যা করবে তখন! একজনকে হত্যা করতেই এঁদের অবস্থা বিকৃত হয়ে যায়, ১০ সহস্র অনুরূপকে কি ভাবে নিজেদের বাগে আনবে তারা! … পুত্রী, এখানেই থেমে থেকো না। কৃষ্ণ চরিত্রের অঙ্কনই করেছেন ব্যাস, সেই দিনের জন্য।
তাই কৃষ্ণের ন্যায়ই আধ্যাত্মিক মাফিয়া হয়ে যাও। সমস্ত রাজনীতিকে অধিকার করে নাও। যেই রাজনীতিকে অধিকারে আনার কথা বারংবার অবতাররা বলে গেছেন নিজেদের কর্মধারা দিয়ে, তা করার সময় আসন্ন এবার, তবে গতি মন্থর রাখবে এবং নিশ্চিত করবে যাতে তুমি নও, তমার সমস্ত উত্তরসুরীরা একত্রিত হয়ে ধীরে ধীরে, এই অসম্ভবকে সম্ভব করে এক সহস্র বৎসর ধরে। তাহলে দেখবে না প্রতিরোধ আসছে আর না প্রতিবাদ, আর যখন তারা প্রতিবাদের প্রয়োজন অনুভব করবে, তখন কৃতান্তিকের সংখ্যা ১০ সহস্র অর্থাৎ অপ্রতিরোধ্য হয়ে গেছে তাঁরা।
অধিকার করে নাও সমস্ত রাজনীতিকে, এবং যেই রাজা সম্রাট হলে, আধ্যাত্মিক সমাজের স্থাপন হবে, আত্মবোধের নয়, পরাচেতনার স্থাপন হবে, তাকে রাজাসনে স্থিত করে, জগতকে, মানবযোনিকে, সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডকে উপহার দাও সেই আধ্যাত্মিক মহাযুগের, যার হিল্লোল জগতে সহস্র লক্ষ বৎসর দশদিশা শোনাতে থাকবে। যেই হিল্লোলের ফলে, আমার প্রিয়সন্তানেরা পুনরায় তাঁদের মায়ের বুকে ফিরে আসবে, আর জগন্মাতা পুনরায় আনন্দের অশ্রুতে জগতবাসীকে আঁকড়ে ধরবেন”।
