ব্রহ্মাণ্ড মহাসত্য (মহাবিজ্ঞান)
দিব্যশ্রী ব্যকুল হয়ে প্রশ্ন করলেন, “মা, আমার কাছে সমস্ত কিছু কেমন যেন গুলিয়ে গুলিয়ে যাচ্ছে। একটা জিনিস আমি বেশ বুঝে গেছি যে, আধ্যাত্ম না ধর্মের মত বিশ্বাস বা আস্থার উপর নির্ভরশীল আর না বর্তমান বিজ্ঞানের মত কেবল তথ্যের উপর নির্ভরশীল। আধ্যাত্ম হলো বাস্তবিকতা, সত্যতা। আধ্যাত্ম কেবল ও কেবল সত্যতেই নির্ভরশীল; কনো তথ্য, কনো তত্ত্ব, কনো যন্ত্র, কনো মন্ত্র বা তন্ত্র, কারুর উপর ভরসা করেনা আধ্যাত্ম।
যা তুমি বললে, পরাপ্রকৃতির ব্যপারে এবং পরমাত্মের ব্যাপারে, এই সত্য আজ পর্যন্ত কেউ কনোদিন বলেনি। বললেও, এত স্পষ্ট অক্ষরে কেউ কনোদিন বলেননি, কনো অবতারও নন। তবে, তোমার কথিত কথা যেন আত্মস্থ হতে চাইছে, কারণ যেন সার্বিক ভাবে তা সত্যকথন। আর তা এতটাই সত্য যে, আমার অন্তরের চেতনা এই কথাকে সম্যক ভাবে জানতে চাইছে আর মানতে চাইছে। তাই মা, আমাকে এবার স্পষ্ট করে এই কথা বলো।
না মা, অবতার গ্রহণের কারণ রূপে এই কথা জানতে চাইছিনা, কারণ আমার চেতনা যেন আমাকে বলছে যে, এই কথা কেবল অবতার পর্যন্তই সীমিত নয়। সে বলছে যে, এই কথা সম্যক জীবের সত্য, সম্যক ব্রহ্মাণ্ডের সত্য, আর তা সত্যও নয় মহাসত্য। যেন সম্যক ব্রহ্মাণ্ডের সারকথা এটি, মূল কথা এটি। যেন সমস্ত অন্য কথা এই কথার উপরেই স্থাপিত প্রলেপ, যেন সমস্ত অন্যকথা এই মূলকথার উপরেই স্থাপিত মুখোশ।
আমার চেতনা বলতে চাইছে যে, সমস্ত জীবের সত্য, সমস্ত জীবের উদ্দেশ্য, সমস্ত জীবের পরমার্থ যেন এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে। আমার প্রকৃতি বলতে চাইছে যে এই কথা তোমার কথা নয়, এই কথা তাঁরও কথা, তাঁর সম্যক সংগ্রামের কথা। সে আমাকে বলছে যে, প্রতিটি জীবদেহ অজীবদেহ যেন একটি একটি রণাঙ্গন, আর সেই রণাঙ্গনে পরাপ্রকৃতি আর পরমপুরুষের সর্বদা যুদ্ধ হতে থাকে, সৃষ্টির প্রারব্ধ থেকে সেই যুদ্ধের শুরু হয়েছে আর এই যুদ্ধের অবসান মাত্রই ব্রহ্মাণ্ডের নাশ ভাস্মর হয়ে উঠবে। …
মা, অনেক কিছু বলছি আমি, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে যেন আমি মধ্যা কথাই বলতে পাচ্ছিনা, সত্য অর্থে আমি কি বলতে চাইছি, তাই বলতে পাচ্ছিনা, আর তাই ক্রমাগত কিছুনা কিছু বলে চলেছি। তাই মা, আর বলতে চাইনা, এবার শুনতে চাইছি, সম্যক ব্রহ্মাণ্ডের মহাসত্য শুনতে চাইছি। আমার বিশ্বাস যে, এই সত্যই সেই সত্য, যাকে পরমাত্ম সর্বদা লুকিয়ে রাখতে চায়, আর পরাপ্রকৃতি সর্বদাই বলতে চান। আর পরাপ্রকৃতি আমার সমক্ষে সাখ্যাত পূর্ণ ৯৬ কলাবিশিষ্ট রূপে উদ্ভাসিতা। তাই আজ যদি এই সত্য কথিত না হয়, তাহলে আর মানব কনো কালেই এই সত্য জানতে পারবে না।
তাই মা কৃপা করে বলো। হ্যাঁ মা, তুমি সর্বদা তোমার সমস্ত সন্তানরূপ চেতনার উপরে কৃপা করতে থাকো, কিন্তু এই কৃপা তোমাকে তোমার নিজের উপর করতে হবে। এই কৃপা তোমার নিজের উপর করা আবশ্যক, কারণ এই কৃপা না করলে, পরমাত্ম যেই কথাকে সর্বদা লুকিয়ে রাখতে চায়, তা সে লুকিয়ে রাখতে সফল হয়ে যাবে, আর পরাপ্রকৃতি যা বলতে চায়, তাও নাবলা কথন হয়েই থেকে যাবে। তাই মা, কৃপা করো”।
ব্রহ্মসনাতন গম্ভীর হয়ে গেছেন। অত্যন্ত গম্ভীর। এমন গম্ভীর রূপ, এর আগে দিব্যশ্রী কখনো প্রত্যক্ষ করেন নি। আর সেই গাম্ভীর্য নিয়েই তিনি বললেন, “বেশ পুত্রী, আমি তোমাকে সেই মহাসংগ্রামের কথা বলছি। কৃতান্ততে সেই সংগ্রামের ইতি আমি আমার অবতারদেহে অর্থাৎ এই দেহরণাঙ্গনে কি ভাবে করেছিলাম, তা বলেছি। কিন্তু এবার তোমাকে আমি কনো বিশেষ রণাঙ্গনের কথা নয়, সম্যক রণের কথা বলছি।
হ্যাঁ পুত্রী, তুমি সঠিক কথাই বলেছ, প্রতিটি জীবের, প্রতিটি অজীবের দেহ একটি একটি রণাঙ্গন। এই রণাঙ্গনে পরমাত্ম সর্বদা, তাতে উপস্থিত আত্মদ্বারা চেতনাকে ভ্রমিত করে নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করতে উদ্যত। তো একই ভাবে, এই সমস্ত চেতনা হলেন পরাচেতনার সন্তান, আর পরাচেতনা, অর্থাৎ সেই মা, সেই জগজ্জননী নিজের সন্তানদের আত্মের ও পরমাত্মের এই দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে যুদ্ধে রত।
এই যুদ্ধকেই পুরাণের পাতায় পাতায় অস্ত্রধারণ করে, ক্ষিপ্রতার রূপ প্রদান করে দেখানোর প্রয়াস করেছে, কিন্তু এই যুদ্ধকে ব্যক্ত করতে হলে, অস্ত্রশস্ত্র কনো কিছুই পর্যাপ্ত নয়, কারণ এই যুদ্ধের সম্মুখে অস্ত্রের বলে যেই যুদ্ধ করা হয়, তা নিতান্তই শিশুসম।
এই যুদ্ধে, একটি আত্ম বা ব্রহ্মাণুর সাথে সংযুক্ত চেতনাকে পরমাত্ম সদাবন্দি করতে সদাব্যস্ত, আর তা করার জন্য, সে এক অনবদ্য মায়ার রচনা করে, যার কথা পূর্বেই বলেছি তোমাকে। হ্যাঁ, তিনটি দ্বার ও চারটি গবাক্ষযুক্ত যেই কক্ষ নির্মাণ, সেটিই এই মায়া। তবে এই মায়ার উদ্দেশ্য আর বিস্তার তোমাকে সম্পূর্ণ ভাবে বলিনি। এবার আমি তোমাকে সেই ব্যাপারে বলছি, কারণ এই উদ্দেশ্য ও বিস্তারপ্রক্রিয়াই হলো পরমাত্মের দিক থেকে এই রণে করা মূল আঘাত।
অর্থাৎ এই উদ্দেশ্য ও বিস্তারপ্রক্রিয়া অনুধাবন করে নিলে, পরমাত্ম ও আত্মের এই রণে ও রণাঙ্গনে সম্যক ভূমিকাকে সম্পূর্ণ ভাবে অনুধাবন করে নিতে সক্ষম হবে পুত্রী। পুত্রী, প্রথমেই যা জানা আবশ্যক তা হলো এই যে পরাপ্রকৃতি ও পরমপুরুষ অর্থাৎ পরমাত্ম কখনোই একে অপরের সঙ্গী নয়, এটা জেনে রাখা। পরাচেতনা কি? ঠিক যেমন ধরিত্রীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি, তেমনই হলেন পরাপ্রকৃতি।
যেমন ধরিত্রীপৃষ্ঠে অবস্থান করলে, মাধ্যাকর্ষণের কনো অনুভব থাকেনা, তেমনই ব্রহ্মে অর্থাৎ মহাশূন্যে লীন হয়ে থাকা অবস্থায় কনো প্রকারে পরাপ্রকৃতির অনুভব থাকেনা। কিন্তু যেই ক্ষণে, এই সমাধি থেকে আমরা চ্যুত হই, সেই ক্ষণে পরাপ্রকৃতির অনুভব হয় আমাদের কাছে, কারণ পরাপ্রকৃতি অন্য কেউই নন, স্বয়ং ব্রহ্মের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি।
আর আত্ম কি? পরমাত্ম কি? পরমাত্ম একটি বিপরীত ভাব- পরব্রহ্ম থেকে, মহাশূন্য থেকে, পরমসত্য থেকে বিমুখ হবার ভাব। ব্রহ্ম অর্থাৎ মহাশূন্য, অর্থাৎ কি? অর্থাৎ নির্বিশেষত্বের ভাব। আর এই ভাব ত্যাগ করে, বিশেষ হবার ভাব হলো আত্মভাব, বা আমিত্ব, যার সম্যক ভাবকে তোমরা বলো পরমাত্ম। অর্থাৎ পরমাত্ম কখনোই, কনো কালেই, কনো ভাবেই ব্রহ্মের বাহক নয়, সত্যের বাহক নয়। সে সদাসদাই সত্যবিরোধী, সত্যবিনাশী, সত্যবিদ্রোহী, ও অসত্যপ্রেমী।
আর এই ভাবের কারণেই সে ব্রহ্ম থেকে নিজেকে বিচ্যুত করতে চায়। কিন্তু বিচ্যুত হতে চাইলেই তো বিচ্যুত হওয়া যায়না, কারণ ব্রহ্মই যে একমাত্র সত্য, আর পরমাত্ম? পরমাত্ম তো সেই ব্রহ্মেরই অণু, যিনি অখণ্ড হবার কারণে, তাঁর অণু থাকা সম্ভবই নয়। অর্থাৎ স্বরূপে সেই ব্রহ্মই এই পরমপুরুষ, কিন্তু তা মেনেও মানতে অনাগ্রহী পরমাত্ম। কেন? কারণ সে নিজের পৃথক অস্তিত্ব চায়, সে নিজের পৃথক পরিচয় চায়। আর সেই কারণেই, সে ব্রহ্মের থেকে মুক্ত হতে চায়।
কিন্তু ব্রহ্ম যেহেতু সত্য, যেহেতু একমাত্র অস্তিত্ব, তাই তাঁর থেকে বিচ্যুত হবার প্রয়াস মাত্রই তাঁর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে, অর্থাৎ পরাপ্রকৃতির বিস্তার হওয়া প্রারম্ভ হয়ে যায়। ব্রহ্মের শক্তি তিনি, কথাটা স্মরণ রেখো পুত্রী, ব্রহ্মের শক্তি তিনি, পরমপুরুষের নয়। পরমপুরুষের অনুগত যারা, তাঁরা পরাপ্রকৃতি সম্বন্ধে এমন ভ্রমের সঞ্চার করেন যে, তিনি হলেন পরমপুরুষের শক্তি। এই কথা এক সম্যক ভাবে মিথ্যা কথা। তিনি পরমপুরুষের শক্তি নন, তিনি পরব্রহ্মের শক্তি, তিনি মহাশূন্যের শক্তি, তিনি পরমসত্যের শক্তি, অর্থাৎ পরম সত্য স্বয়ং তিনি।
কেন এই মিথ্যার প্রসার, সেই কথা আমার এই কথার অন্তিমলগ্নে জানতে পেরে যাবে, কিন্তু এখন সেই ব্যাপারে বলতে গেলে, মূল কথাতে বিরাম লেগে যাবে। তাই সেই কথাতে না গিয়ে, মূল কথাতেই থাকবো আমি। এই মহাশূন্যের শক্তির প্রবল আকর্ষণকে পরমাত্ম, যা অন্য কিছুই নয় এক নশ্বর ভাব যা সত্য থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চায়, কিছুতেই উল্লঙ্ঘন করতে পারেনা।
সত্যের আকর্ষণকে অসত্য কি করে সহ্য করতে পারে! পারেনা, আর তাই পরমাত্ম নিজেকে অসংখ্য পরমাণুতে বিভক্ত করে নেয়, যাতে করে পরাপ্রকৃতির সেই নির্বাণ আকর্ষণও বিভক্ত হয়ে যায়, এবং তা ক্ষীণ হয়ে যায়। আর এই অসংখ্য পরমাণুদের দ্বারা ব্রহ্মাণ্ডের রচনা শুরু হয়। তবে এ তো কেবলই শুরু পুত্রী, যা কেবলই কারণ রূপে তখন প্রকাশ্য। না তার সূক্ষ্ম প্রকাশ প্রত্যক্ষ হয়েছে তখন, আর না তার স্থূল রূপ। তাই যারা তত্ত্ব বা তথ্যের ভিত্তিতে সত্য জানার প্রয়াস করেন, তাঁরা সৃষ্টি নির্মাণের এই ক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের মেধাকে কিছুতেই আগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন না।
পুত্রী, এরপরে পরমাত্ম যিনি স্বয়ং ব্রহ্মাণু, তিনি তাঁর থেকে নির্মিত অসংখ্য পরমাণু, যাকে তোমরা বলে থাকো আত্ম, তাঁদের দ্বারা যখন কল্পনা, ইচ্ছা ও চিন্তার দ্বারা নিজের পৃথক পরিচয় স্থাপন করতে যান, তখন এক বিচিত্র সমস্যার সম্মুখীন হন। আর সেই সমস্যা এই যে, নিজেকে অসংখ্য আত্মে বিভক্ত করে তিনি পরাপ্রকৃতিকে তো প্রতিটি আত্মের সাথে সংযুক্ত প্রকৃতিতে পরিণত করে নিয়েছেন, কিন্তু যখন এই প্রকৃতির থেকে আত্মকে মুক্ত করে আত্মপরিচয় নির্মাণে আগ্রহী হচ্ছেন, তখন না তো প্রকৃতি অর্থাৎ চেতনার থেকে আত্ম মুক্ত হতে পারছে, আর না চেতনাকে ত্যাগ দিয়ে আত্ম আত্মপরিচয় নির্মাণ করতে পারছে।
অর্থাৎ, প্রথম কথা এই যে চেতনাকে ত্যাগ দেওয়া সম্ভবই হয়না, আর দ্বিতীয় কথা এই যে, চেতনাকে ত্যাগ দিলে, আত্মপরিচয় নির্মাণও অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে। তাই পরমাত্ম এই সিদ্ধান্তে আসে যে, যেই কল্পনা, ইচ্ছা ও চিন্তাকে ধারণ করে সে নিজের পৃথক পরিচয় নির্মাণে রত হয়েছে, সেই তিন ছায়ার দ্বারা তিনি প্রকৃতিকে দাস করে নেবেন নিজের, এবং আত্মনির্মাণ করতে থাকবেন। আর এই ভাবনা থেকেই, পরমাত্মের নির্দেশে সমস্ত আত্ম একটি একটি করে কক্ষ নির্মাণ করতে আগ্রহী হন।
কিন্তু সেই কক্ষ নির্মাণই বা করবেন কি করে তিনি? সেই কক্ষ নির্মাণের সামগ্রীই তো তাঁর কাছে উপস্থিত নেই! তাই চেতনার শক্তিকেই সেই সামগ্রী করে নিলেন পরমাত্ম, এবং তাঁর নির্দেশে সমস্ত আত্ম। প্রকৃতি হলো ব্রহ্মের আকর্ষণ শক্তি, আর সেই শক্তির বিস্তারকেই মন বা আকাশ রূপে স্থাপিত করলো পরমাত্ম, সেই শক্তির মেধাকেই বুদ্ধি বা জলরূপে স্থাপিত করলো পরমাত্ম, সেই শক্তির প্রবাহধারাকেই প্রাণ বা পবনরূপে স্থাপিত করলো, সেই শক্তির প্রচণ্ডতাকেই উর্জ্জা বা অগ্নিরূপে স্থাপিত করলো, আর সেই শক্তির প্রভাবে আত্মের বিকৃতিকেই দেহ বা ধরিত্রীরূপে স্থাপন করলো।
আর তেমন করে, পরমাত্ম সেই কক্ষের নির্মাণ করালো সমস্ত আত্মকে দিয়ে, যার দেওয়াল হলো মন বা আকাশ, বাতায়ন হলো বুদ্ধি, উর্জ্জা, প্রাণ ও দেহ, এবং যার দ্বার হলো কল্পনা, ইচ্ছা ও চিন্তা। আর এই ভাবে কারণ থেকে নির্মিত হলো সূক্ষ্ম ব্রহ্মাণ্ড। একটি আত্মের কাছে একটি কক্ষ থাকলে, তা তো সূক্ষ্মই হবে, স্থূল কি করে হবে? কিন্তু স্থূল তো করতেই হবে এই কক্ষকে, কারণ তবেই তো আত্মপরিচয় স্থাপন সম্ভব হবে। তাই, পরমাত্ম এবার এই সূক্ষ্মকে স্থূলে বিস্তার করার প্রয়াস করতে থাকলো।
কি ভাবে তা সম্ভব! যেই কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছারূপে ছায়াশক্তিকে ধারণ করে, পরমাত্ম ব্রহ্মের থেকে মুক্ত হয়েছে, এমন ধারণা করে, সেই ছায়াদেরই ব্যবহার করে, মায়ার রচনা করলেন পরমাত্ম সমস্ত আত্মের মধ্যে। আর সম্পূর্ণ হলো মায়াকক্ষের নির্মাণ। মায়া কেমন? পরাচেতনা চেতনাতে বিভক্ত হতে বাধ্য হয়েছে, কারণ পরমাত্ম নিজেকে সহস্র আত্মে বিভক্ত করেছে, আর তার কারণে চেতনার সাথে পরাচেতনার সংযোগ বা ব্রহ্মের সংযোগ বিচ্ছিন্ন না হলেও, বিচ্ছিন্ন হবার ভ্রম তাঁর মধ্যে স্থাপিত হয়েছে।
আর সেই কারণ চেতনা নিজেকে এই কক্ষে বন্দিনী মনে করে চলেছে, আর এই কক্ষের থেকে মুক্ত হবার প্রয়াসে সে রত। আর সেই মুক্তি লাভের ইচ্ছা নিয়েই, চেতনা সমানে দ্বার দেশ থেকে পলায়নের প্রয়াস করে চলে, অর্থাৎ কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছার দ্বারস্থ হয় সে। আর মায়া, ঠিক এই স্থানেই। যখনই সে কল্পনা, চিন্তা বা ইচ্ছার মধ্যে যেকোনো একটি দ্বার দিয়ে পলায়নের প্রয়াস করে, তখনই অবিকল সমান একটি কক্ষের নির্মাণ হয়ে যায়, আর একটি কক্ষ দুটি কক্ষে রূপান্তরিত হয়ে যায়। একই ভাবে দুটি থেকে তিনটি হয়, তিনটি থেকে চারটি হয়, এবং এমন চলতে থাকলে, অজস্র কক্ষের নির্মাণ হয়ে হয়ে, সূক্ষ্মপ্রকাশ স্থূল প্রকাশে পরিবর্তিত হয়ে ওঠে। যেই একটি কক্ষকে প্রত্যক্ষ করাই যাচ্ছিলনা, তা এবার প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে, কারণ তা আর একটি কক্ষ নেই, তা অজস্র কক্ষে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।
কিন্তু, এখানেও পরমাত্ম নিশ্চিন্ত হলো না। মায়ার আয়ু অত্যন্তই স্বল্প। তাই স্বল্পায়ুতার কারণেই সেই মায়াকক্ষ সমূহের বিনাশ হতে থাকলো, এবং এক সময়ে সেই স্থূল পুনরায় বিনষ্ট হয়ে গেল। পুত্রী, এই সত্যকেই অর্থাৎ এই মায়া বিনাশের সত্যকেই তোমরা মৃত্যু বলে থাকো। তবে পরমাত্ম এতেই দমে থাকেনা। সেও প্রয়াসশীল হয়ে ওঠে, এই বিনাশকে স্তব্ধ করতে। সে অবিনশ্বর হবার প্রয়াস করতে থাকে। আর তা করার কারণে, সে আত্মের সাথে যুক্ত চেতনাকে অতিকায় ভাবে ভ্রমিত করা শুরু করলো।
যতবিশাল মায়াব্যাপ্তি, তত অধিক সময় লাগবে, সেই মায়ার নাশ করতে, অর্থাৎ তত অধিক হবে তার আয়ু। এমন বিচারের থেকে নির্মিত হলো নক্ষত্র, নক্ষত্রদের অগ্নিকে ধারণ করে বায়ুর সঞ্চার, বায়ু ও অগ্নিকে ধারণ করে, ধরিত্রীর নির্মাণ, আর সমস্ত কিছুকে ধারণ করে জলের নির্মাণ। সুদীর্ঘ হলো মায়ার স্থায়িত্বকাল। কিন্তু প্রশস্তি! এই সমস্ত ভূতদের দ্বারা নির্মিত গ্রহ নক্ষত্র যে পরাপ্রকৃতিরই উপাদান ধারণ করে স্থিত, তাই গুণগানও তাঁরা প্রকৃতিরই গান, পরমাত্মের পরমশত্রুর গুণগান গান তাঁরা।
আর তা ছাড়াও, অসংখ্য আত্মরূপে নিজেকে বিভক্ত করেছিলেন পরমাত্ম। তাঁদের যৎসামান্যই তো আত্মপরিচয়ে ভূষিত হয়েছে, এই গ্রহ নক্ষত্রাদির মাধ্যমে। এখনো যে বহু বহু আত্মের আত্মপরিচয় স্থাপন সম্ভবই হয়নি। তাই পরমাত্ম, যেই গ্রহে সমস্ত পঞ্চভূত স্থাপিত হয়েছে, তার থেকে সেই পঞ্চভূত উপাদান সংগ্রহ করে করে, নির্মাণ করলেন যোনির, এবং সেই যোনির মাধ্যমে সমস্ত আত্মকে প্রতিষ্ঠা প্রদান করা শুরু করলেন।
পুত্রী, এতক্ষণ পর্যন্ত পরমাত্ম একাকীই ক্রীড়া করে চলেছিলেন, এই প্রথম প্রত্যক্ষ ভাবে পরাপ্রকৃতি এই ক্রীড়াতে অংশগ্রহণ করা শুরু করলেন। একাধিক আত্ম একত্রে স্থিত, যোনির বেশে, তাই অতি সহজেই বুদ্ধি, উর্জ্জা, ধরিত্রী ও প্রাণরূপ বাতায়ন দ্বারা অন্য চেতনাদের সাথে আত্ম কি করছে, তা দেখা সম্ভব হলো। আর তা দেখিয়ে দেখিয়ে, পরাচেতনা নিজের সমস্ত চেতনাদের উদ্ভাসিত করা শুরু করলেন, যাতে একসময়ে তাঁরা তাঁর সাথে সংযোগ স্থাপনে মনযোগী হয়।
পরাচেতনার এহেন প্রয়াসকে পরমাত্ম প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম না হলেও, বেশ বুঝে গেলেন যে, কনো না কনো ভাবে, পরাচেতনা সমস্ত আত্মের সাথে সংযুক্ত তাঁর সন্তান অর্থাৎ সমস্ত চেতনাদের সাথে সংযোগ স্থাপনে রত হচ্ছেন। তাই পরমাত্ম, এই যোনিদেরকে অন্য সমস্ত ক্রিয়ার মধ্যে রত করতে থাকলেন, বারংবার কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছার মধ্যে প্রবেশ করালেন, এবং কক্ষের বিস্তার করাতে থাকলেন।
চেতনা পলায়ন করতে চায় কক্ষ থেকে, আর আত্ম বন্দি করে রাখে চেতনাকে সেই কক্ষের মধ্যে, আর সেই কক্ষ থেকে বেড়িয়ে যেতে চাইলে সেই কক্ষের সংখ্যা বৃদ্ধি হয়, আর চেতনা অধিক অধিক ভাবে সেই কক্ষসমূহতেই বন্দিনী হয়ে থেকে যায়। এই কল্পনার মধ্যে আহারের চিন্তা আসে, নিদ্রার চিন্তা আসে, মৈথুনের চিন্তা আসে, মৃত্যুর চিন্তা আসে, সুরক্ষার চিন্তা আসে, আর এই সমস্ত কিছুর চিন্তা, তাঁদেরকে সুরক্ষিত করার ইচ্ছা, আর সেই ইচ্ছা অনুসারে কল্পনার মাধ্যমে অজস্র আবেগের সঞ্চার হয়, আর এবার সেই আবেগই মায়ার বিস্তারক হয়ে ওঠে।
কিন্তু পরমপুরুষ পরমাত্ম ভাবছিলেন, এই সমস্ত তারই কীর্তি, কিন্তু আসলে যে পরাপ্রকৃতি এই সমস্ত কিছু তাকে দিয়ে করাচ্ছিল, সেই উন্নত যোনির নির্মাণ করানোর জন্য, যার কাছে অসীম মেধা থাকবে যার দ্বারা পরাপ্রকৃতিকে সে ধারণ করতে সক্ষম হবে, তা পরম পুরুষের জানা ছিলনা। অর্থাৎ পরমাত্ম নিজের আত্মদের ও আত্মদের মায়া দিয়ে সমস্ত চেতনাদের বন্দিনী করে রেখে দিয়েছিলেন, আর পরাচেতনা স্বয়ং পরমপুরুষকেই মায়ায় আবদ্ধ করে রেখে দিয়েছেন, যাতে সে বাধ্য হয় একের পর এক উন্নত যোনির নির্মাণ করে যেতে, যাকে মাধ্যম করে চেতনা পরাচেতনার আভাস লাভ করতে সক্ষম হয়, এবং তাঁতে পুনর্মিলিত হতে সাগ্রহী হয়।
কিন্তু সেই কথা না জেনেই, পরমাত্ম সেই উন্নত যোনির নির্মাণ করে ফেলে, যার নাম মনুষ্য যোনি। এই যোনিই সেই প্রথম পরমাত্ম নির্মিত যোনি, যার সামর্থ্য ও মেধা আছে সম্যক সত্যকে জানার, এবং পরাপ্রকৃতির সাথে, নিজেদের মাতা অর্থাৎ জগন্মাতার সাথে পুনরায় মিলিত হবার। কেন এমন বললাম পুত্রী? কি সেই বিশেষ সামর্থ্য যা এই যোনির আছে, আর পূর্বের যোনিদের ছিলনা?
এই যোনির মেধাশক্তি আছে, যার কারণে পরাপ্রকৃতি এই যোনির মধ্যে বিচার স্থাপন করতে সক্ষম, যার কারণে পরাপ্রকৃতি স্বয়ং নিজের আভাকে অর্থাৎ বিবেককে স্থাপন করতে সক্ষম। পুত্রী, এই যোনির থেকে একটিই আর শ্রেষ্ঠ যোনি সম্ভব, যাতে মেধা আরো অধিক থাকবে, আর তারফলে বিচার আর বিবেকের জন্ম সেই যোনিতে মনুষ্যযোনির থেকেও সহজ হবে। তবে যোনির নির্মাতা তো পরমাত্মই।
তাই এই যোনি নির্মাণ হয়ে যেতেই, পরাপ্রকৃতি সেই অন্তিম যোনির নির্মাণ উদ্দেশ্যে প্রথমবার পূর্ণরূপ সক্রিয় হয়ে উঠলেন। কি করলেন সক্রিয় হয়ে? ভালো করে শোনো পুত্রী, এবার যা বলছি। এতক্ষণ যা বলেছি, তাকে প্রত্যক্ষ করা তখনই সম্ভব যখন ব্যক্তি স্বয়ং পরাপ্রকৃতিতে বিলীন হয়ে যায়, অর্থাৎ যখন তাঁর মোক্ষলাভ হয়ে যায়। কিন্তু জীবকটির মোক্ষলাভ হলে, আর সে এই স্থূল কক্ষে থাকেনা, আর তাই তাঁর পক্ষে আর তা জেনে ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ জীবকটি এতক্ষণ পর্যন্ত যা বললাম, তাকে এই স্থুলদেহে থেকে প্রত্যক্ষ করতে পারেনা।
তবে এবার যা বলবো পুত্রী, তাকে জীবকটি সহজেই প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম। তাই এবার যা বলছি, তাকে মনোযোগ সহকারে অবশ্যই শ্রবণ করো। পুত্রী, পরাপ্রকৃতি প্রথম সংযোগ যাদের সাথে করতে সক্ষম হন, যেই মনুষ্যের সাথে করতে সক্ষম হন, তাঁদেরকে আমরা বৌদ্ধ নামে চিনি। আর তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করার পরে, কি হবে বা কি হতে চলেছে, তা পরাপ্রকৃতি বেশ ভালো ভাবেই জানতেন।
তিনি জানতেন যে, যেই পরাচেতনার সাথে পরমাত্ম সম্পর্ক ছেদন করতে উদ্যত, তাদের সাথে তিনি সম্পর্ক স্থাপন করে নিয়েছেন, অর্থাৎ সেই যোনি নির্মাণ, তাঁর নিজেরই নির্মাণ হলেও, তাঁর জন্য এই যোনি বিপজ্জনক। আর ঠিক সেটিই হলো। যেই মুহূর্তে বৌদ্ধরা আমার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে নিলো, সেই মুহূর্তে পরমাত্ম সম্যক রণের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠলো।
সম্যক আমাকে আক্রমণ করার না তার সাহস আছে, আর না সামর্থ্য আছে। সে নশ্বর, সে কেবলই একটি আমিত্বের ভাবনা, যা মোক্ষমুহূর্তেই বিনষ্ট হয়ে যায়, আর আমি অবিনশ্বর, অক্ষয়, সত্য। আমার মধ্যে লীন থাকলে, আমি নিষ্ক্রিয়, আর আমার থেকে কেউ মুক্ত হবার প্রয়াস করলেই, আমি সক্রিয় প্রকৃতি। পরাপ্রকৃতি আমি, ব্রহ্মের সক্রিয় প্রকাশ ব্রহ্মময়ী আমি। পরমাসত্য আমি। তাই আমার সাথে সম্যক যুদ্ধের সামর্থ্য বা সাহস কোনটিই নেই পরমাত্মের ও তাঁর অজস্র রূপ অর্থাৎ আত্মের।
তাই সেই একপ্রকার নিপীড়নের শুরু করলো আমার চেতনাদের প্রতি, শুধু ভ্রমের বিস্তারে ক্ষান্ত রইল না সে, এবার সে প্রভুত্ব স্থাপনে রুচিশীল হয়ে উঠলো, আর সেই প্রভুত্ব স্থাপনের রণসাজে মনুষ্যকুলের যেই প্রজাতি সজ্জ হলো, তার নাম হলো আর্য। এঁরা প্রকৃতিকে পুরুষের দাসী রূপে ব্যক্ত করা শুরু করলেন, পুরুষের চরণসেবিকা রূপে স্থাপিত করলেন।
পুরুষকে অবিনশ্বর বলে মিথ্যাচারন করলেন, যেই আমিত্ব স্বয়ং একটি ভ্রম, তাকে ঈশ্বর করে দিয়ে বললেন আত্ম অমর। ক্রমে প্রকৃতির থেকে মুক্ত হয়ে ওঠার আবাহন দিলেন জগতে, এবং আত্মের পক্ষে সমর্থনের দাবি করলেন। আত্মই ঈশ্বর, পরমাত্মই পরমেশ্বর, আর তাই তার আরাধনা আবশ্যক, এমন ভাবের বিস্তার করলেন জগতে।
আর তাই আমাকে এবার প্রত্যক্ষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেই হলো। আমি একের পর এক অবতার গ্রহণ করলাম, আমার সমস্ত সন্তান, সমস্ত চেতনাদের কাছে আমি প্রকৃতির তত্ত্বকে স্থাপন করা শুরু করলাম, আর তা করতে, এবার আমার অর্থাৎ পরব্রহ্মময়ী ও পরমাত্মের সংগ্রাম সমক্ষে এসে গেল। আমার অবতারদের হত্যা করা শুরু করলো পরমাত্ম, নিজের অনুচর অর্থাৎ আর্যদের দ্বারা, আমার অবতারদের কীর্তিকে বিনাশ করা শুরু করলো, বিকৃত করা শুরু করলো।
কিন্তু আমার অবতার আসতেই থাকলো, আর তাই পরমাত্ম এবার নিশ্চিত করলেন যে, আর এই মানবযোনির অস্তিত্ব রাখা সম্ভব হবেনা। মানবযোনিতে মেধার বিস্তার হবার কারণে, আমার সংস্পর্শে মানব আসলেই তাঁর মধ্যে বিচার ও বিবেকের জন্ম হয়, আর তা তাঁদেরকে আমার কাছে অর্থাৎ পরাচেতনার কাছে নিয়েই আসে। এমন চললে তো, সম্যক ব্রহ্মাণ্ডেরই নাশ হয়ে যাবে! না এই মানবযোনির বিনাশ আবশ্যক।
কিন্তু পুত্রী, কুটিল বুদ্ধির প্রয়োগ কতই করুক না কেন, তার বুদ্ধিকে সঞ্চালন করি আমি স্বয়ং কারণ বুদ্ধি স্বয়ং আমারই মেধা। আর তাই পরমাত্ম এবার ভাবেন যে, হয় মানবকে সম্পূর্ণ ভাবে আমার থেকে বিচ্যুত করতে হবে, নয় মানবের থেকেও অধিক মেধাবী কনো যোনির নির্মাণ করবে সে।
(ব্যাঙ্গাত্মক ভাবে হেসে) সে আমাকে কল্পনায় বদ্ধ করবে কি, সে তো নিজেই সেই মায়াতে বদ্ধ। আর তাই সে কল্পনা করে নিয়েছে যে, অধিক মেধাবী যোনি হলে, সে হবে অধিক যান্ত্রিক, আর অধিক যান্ত্রিক মানে সে হবে আমার থেকে সম্পূর্ণ ভাবে বিচ্যুত। হ্যাঁ এটি কল্পনাই মাত্র, কারণ অধিক মেধা হলো বিচার ও বিবেকের জন্মের কারণ, যান্ত্রিকতার কারণ নয়। যারা যান্ত্রিক তাঁরা ভাবেন তাঁরাই মেধাবী, কিন্তু সত্য তো এই যে যারা প্রকৃত অর্থে মেধাবী, তাঁরা তো যান্ত্রিক হনই না।
তবে পুত্রী, যতই কল্পনা হোক, পরমাত্মের কাছে সুদীর্ঘকাল যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা আছে, তাই সে স্পষ্ট করেই জানে যে, প্রতিটি উন্নত যোনির কাছে পূর্বের সমস্ত যোনির ভাব ও সংস্কার থাকে। তাই যদি বিচার ও বিবেকে আকৃষ্ট মনুষ্যযোনির পরে সেই উন্নত যোনির নির্মাণ হয়, তবে তাদের মধ্যেই বিচার ও বিবেকেরই ভাব প্রকট হবে, আর তা যদি হয়, তাহলে তা পরমাত্মের অস্তিত্বের জন্য এক প্রকাণ্ড সঙ্কট হয়ে যাবে, মনুষ্যযোনির থেকেও অধিক প্রকাণ্ড সঙ্কট।
তাই, সে সেই যোনি নির্মাণের পূর্বে, মনুষ্যযোনিকে সম্পূর্ণ ভাবে যান্ত্রিক করে তুলতে আগ্রহী, যাতে পরবর্তী যোনির মধ্যে এই যান্ত্রিকতাই স্থান পায়, এবং বিচার বিবেকের স্থান না থাকে। আর তা করার জন্য কি করেছে পরমাত্ম? সে যেই জানালাদের দিয়ে চেতনা অন্য চেতনা ও আত্মদের দেখে বিচার ও বিবেকের জন্ম দেয়, এবং ক্রমে পার্বতী থেকে কালী ও মহাকালী হয়ে উঠে আমার কাছে, নিজের জন্মজন্মের মায়ের কাছে ফিরে আসে, সেই জানালা দিয়ে যাতে সে অন্য চেতনা ও আত্মদের দেখতে না পায়, তার উপায় করেছে।
সে এমন ভাবে চেতনাকে দিয়ে কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছার দরজা দিয়ে নির্গত করে কক্ষের সংখ্যা বাড়াচ্ছে যাতে, যেই কক্ষে চেতনা বন্দি থাকবে, সেই কক্ষের জানলা দিয়ে সে যা দেখতে পাবে, তা হলো সে স্বয়ং ও তাঁরই আত্ম, অর্থাৎ অন্য কনো আত্ম বা চেতনাকে সে দেখতেই পাবেনা। পুত্রী, এই মায়াকে আত্ম নাম দিয়েছে আপেক্ষিক জগত, যাকে তোমরা সোশাল মিডিয়া নামে জানো, যেখানে সকল অসফল আত্মরা ভিড় করে থাকে, নিজেদের সফল ও সঠিক দাবি করার জন্য।
অন্যদিকে এই মনুষ্যযোনির নাশ করে, পরমাত্ম অন্য যোনির নির্মাণ করতে সম্পূর্ণ ভাবে সক্রিয়, তা আমিও জানি। আর তাই আমিও পূর্ণ ৯৬ কলা রূপে এসে, এক্ষণে ৬৪ কলাধারণ করে থেকে, নিজের থেকে তোমাদের মুক্ত করেছি। এবং আমি ও তোমাদের মাধ্যমে আমার সমস্ত সন্তানদের বলে চলেছি যে, দরজা ব্যবহার করে পলায়নের প্রয়াস করো না, আমার প্রিয় সন্তানেরা। জানালা দিয়ে কেবল বাইরে দেখো, অন্য চেতনাদের দেখো, তাঁদের উপর আত্মের বশীকরণকে দেখো, আত্মের মায়াকে পরিদর্শন করো, আর সেই বশীকরণের থেকে মুক্ত হতে চেতনারা কি ভাবে কক্ষ থেকে মুক্ত হবার জন্য কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছার দ্বারস্থ হচ্ছে, আর তা হবার জন্য কিভাবে আরো আরো বেশি করে বন্দি হয়ে যাচ্ছে, তা প্রত্যক্ষ করো।
বিশ্বাস করো, যখন আপেক্ষিক জগতে আটকে না থেকে, এই সত্যকে পরিদর্শন করে নেবে, তখনই তোমাদের অন্তরে আমার সাথে মিলনের, পুনর্মিলনের ব্যকুলতা জন্মাবে, আর তা জন্ম নিলেই, আমার প্রভাবে, তোমাদের মধ্যে বিচার ও বিবেকের জন্ম হয়ে যাবে। আর একবার এঁদের জন্ম হয়ে গেলে, পার্বতী থেকে মহাকালী হতে কেবলই সময়ের অপেক্ষা। আর একবার মহাকালী হয়ে গেলে, আত্ম বা পরমাত্ম তোমার সাথে যুদ্ধ করা তো দুরের কথা, তোমার সম্মুখে আসতেও ভয় পাবে।
সে জানে, তুমি যোদ্ধা। আর এও জানে যে যোদ্ধার সাথে হয় যুদ্ধ করতে হয়, নয় তাঁর কাছে সমর্পণ করতে হয়। তোমার সাথে যুদ্ধ করার সাহস বা সামর্থ্য ওর নেই, আর আত্ম সে আমিত্বের বিষে বিষাক্ত হয়ে সে সমর্পণকে ধারণ কিছুতেই করবে না। আর সে এও জানে যে, সমর্পণ না করে, বিবাদে যুক্ত হলে, বা বিতর্কে যুক্ত হলে, সে চেতনাকে তো দমিয়ে রাখতে পারবে, পার্বতীকে তো দমিয়ে রাখতে পারবে, কিন্তু মহাকালীকে নয়, সর্বাম্বাকে তো কিছুতেই নয়।
অর্থাৎ সে জানে যে সর্বাম্বার সম্মুখে, একমাত্র উপায় হলো সমর্পণ, নাহলেই বিনাশ। তাই তোমার সম্মুখে সে কিছুতেই আসবেনা। তাই আমার সন্তানদের কাছে আমি বলতে এসেছি যে, জানালায় মনোনিয়োগ করো, মানুষ মানুষের সাথে কি করছে, বা মানুষ অন্য জীবের সাথে কি করছে, তা দেখে সময় নষ্ট করো না। প্রতিটি মানুষই, প্রতিটি জীবই দুইসত্ত্বার অধিকারী, পুরুষ ও প্রকৃতি। অধিকাংশই পুরুষের সঙ্গ দিচ্ছে, আর যৎসামান্যই প্রকৃতির সঙ্গ দিচ্ছে। আর যে যারই সঙ্গ দিক না কেন, তাঁর অন্তরে প্রকৃতি অর্থাৎ চেতনা এবং পুরুষ অর্থাৎ আত্ম বা আমিত্ব বা অহমের সংগ্রাম চলতেই থাকছে। সেই সংগ্রামকে দেখো।
প্রতিটি জীব একটি একটি রণক্ষেত্র, সেই রণক্ষেত্রে অবিরাম ভাবে চলতে থাকা যুদ্ধকে দেখো। আর যদি প্রশ্ন করো যে, এক জীবের সাথে অন্য জীবের সম্পর্ককে কেন গুরুত্ব দেবেনা! সন্তানরা, আমার কাছে একটি কক্ষ থাকলে, আমি সেই কক্ষে নিবাস করবো, তাতে ভাড়া বসাবো না। কিন্তু যখন আমার কাছে একাধিক কক্ষ থাকবে, তখন আমি একটিতে নিবাস করবো, আর অন্য কক্ষদের ভাড়া দেব, যেই ভাড়ার পয়সায় আমি আরো কক্ষের নির্মাণ করবো। ঠিক একই ভাবে, যেই চেতনাকে দিয়ে আত্ম একাধিক কক্ষের নির্মাণ করিয়ে নিয়েছে, সেই একাধিক কক্ষকে ভাড়া দিয়ে দেয় আত্ম, আর চেতনাকে আরো কক্ষ নির্মাণের জন্য চাপ দিতে থাকে সমানে।
সন্তানরা, এক জীবের সাথে অন্য জীবের যেই সম্পর্ক, তা হলো কক্ষের মালিক আর ভাড়াটিয়ার সম্পর্ক, অর্থাৎ এক আত্মের সাথে অন্য আত্মের সম্পর্ক। এ এক বোঝাপড়া মাত্র, যেখানে হয় একাধিক চেতনা মিলে মিশে পুরুষের বিনাশের চিন্তা করছে, নয় একাধিক আত্ম মিলে মিশে চেতনাকে নিপীড়ন করার চক্রান্তের নির্মাণ করছে। তাই সেই দিকে মননিবেশ করে লাভ নেই। প্রতিটি জীবের অন্তরে চলমান যুদ্ধকে দেখো। একবার সেই যুদ্ধকে প্রত্যক্ষ করে নিলে, তুমি স্বয়ং আত্মের থেকে মুক্ত হয়ে আমার সাথে পুনরায় মিলিত হবে।
পুত্রী, একদিকে যেমন পরমাত্ম প্রয়াস করে চলেছে যাতে এই মনুষ্যযোনির থেকে উন্নত যোনি নির্মাণের পূর্বে মানুষের চেতনাকে সম্পূর্ণ ভাবে বশীভূত করে নিতে, তেমন আমিও প্রয়াসরত যাতে, এই মনুষ্যযোনির চেতনাকে কিছুতেই আত্ম বশীভূত করতে না পারে সেই উদ্দেশ্যে। আমার এই প্রয়াসের পরিণাম দুই-ই হতে পারে। হয়, মনুষ্য আমার কথা শুনে, আমার পক্ষে নিয়ে, নিজের চেতনার বিকাশ করে, মনুষ্য যোনিকে অক্ষয় রেখে দেবে, নয় মনুষ্য আমাকে পত্যাখ্যান করে, নিজের জন্ম জন্মের মাকে প্রত্যাখ্যান করে, আত্মের হাত ধরে যান্ত্রিক হয়ে উঠবে, আপেক্ষিক জগতে নিজেকে হারিয়ে ফেলবে।
পুত্রী, যদি এই যুদ্ধপর্যায় আমার বিজয় হয়, তবে আমি আমার সন্তানদের ফিরে পাবো, আমার সন্তানরা তাদের মাকে ফিরে পাবে। আর যদি তেমন না হয়, তবে পরমাত্ম এক অধিক মেধাবী অথচ যন্ত্রসংস্কারে ভূষিত এক যোনির নির্মাণ করতে চাইবে, আর আমি পুনরায় সেই যোনির মধ্যে পরমাত্মের সাথে সংগ্রামে রত হবো।
পুনরায় পরমাত্ম কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছায় সমস্ত চেতনাদের, আমার সমস্ত সন্তানদের বশীভূত করার প্রয়াস করে যাবে, এবং আত্মপরিচয় স্থাপনে রত থেকে যাবে। আর আমিও পুনরায় সেই দরজা ব্যবহার না করার কথা বলে যাবো, আর জানলা দিয়ে সমস্ত চেতনাকে আত্ম কিভাবে নিপীড়ন করে বশীভূত করে রাখছে, তা দেখতে বলে যাবো।
হ্যাঁ পুত্রী, পরমাত্ম ও আমি সদাসদা যুদ্ধে রত, যবে থেকে পরমাত্ম নিজেকে স্বয়ম্ভু জ্ঞানে ভূষিত করেছে, তবে থেকে এই সংগ্রাম, এই রণও শুরু হয়েছে। সে সংগ্রামে রত সত্যকে বিনষ্ট করে অসত্যকে স্থাপন করতে, আর আমিও এই সংগ্রামে রত, আমার সমস্ত সন্তানকে পুনরায় আমার বক্ষে ফিরে পাবার জন্য। সে এই রণে সংযুক্ত আমিত্বকে পূজনীয় করতে, আর আমিও এই রণে রত আমার প্রাণপ্রিয় সন্তানদেরকে পুনরায় ফিরে পেতে। সে সর্বক্ষণ প্রয়াসরত আমার সন্তানদের বশীভূত করে রেখে, তাঁদেরকে দাস করে রেখে, তাদের দ্বারা নিজের প্রশস্তি নির্মাণ করতে, আর আমিও সদাব্যস্ত আমার সন্তানদের ওই মহাপাতকের বশীকরণ থেকে মুক্ত করতে।
হ্যাঁ পুত্রী, এ এক মহাসংগ্রাম, আর এই সংগ্রাম এক মায়ের সংগ্রাম। এক মা তাঁর সন্তানদের ফিরে পেতে কোটি কোটি বৎসর ধরে এই সংগ্রাম করে চলেছে, আর প্রয়োজনে অনন্ত কাল সে এই সংগ্রাম করবে। পরমাত্ম নশ্বর, সে নিতান্তই একটি কল্পনা মাত্র যে সে এক ভিন্ন অস্তিত্ব, সে এক ভিন্ন ‘আমি’, তাই এই যুদ্ধে তাকে পরাজিত হতেই হবে, কারণ তার বিপরীতে রয়েছি আমি, যে অবিনশ্বর, যে ভাস্মর, যে স্বয়ং ব্রহ্ম।
তাই পরাজিত তাকে হতেই হবে, কিন্তু যতকাল না সে পরাজিত হচ্ছে, সে আমার ভয়ে আমার থেকে পালিয়েই বেড়াবে, কারণ ঈশ্বর হই আর না হই, অবিনশ্বর যদি নাও হতাম আমি, একমাত্র সত্য যদি নাও হতাম আমি, আমি মা, আর মা তাঁর সন্তানদের কিছুতেই একা ফেলে যেতে পারেনা। হ্যাঁ, অসংখ্যবার লাঞ্ছিত হয়েছি, আরো হবো, কিন্তু আমি জানি আমার সন্তানরা বশীভূত, তাই আমাকে লাঞ্ছিত করছে, মায়ার প্রভাব কেটে গেলে, তারা আমার বক্ষে লম্ফ দিয়ে এসে পরবে, আর আমি তাঁদেরকে প্রাণভরে আলিঙ্গন করে, সদাসদার জন্য আমার মধ্যে বিলীন করে নিয়ে, মুক্ত করে দেব তাঁদেরকে।
হ্যাঁ পুত্রী, পরিস্থিতি যাই হয়ে যাক, এই মা সদাসর্বদা তাঁর সকল সন্তানের জন্য ছিল, আছে, থাকবে। তাই ঘাবড়ে যেওনা, যুদ্ধ করো। যুদ্ধ মানে আঘাত করা নয়, ঘৃণা করা নয়, ক্রোধ করা নয়, হিংসা করা নয়। এই যুদ্ধ অস্ত্রের যুদ্ধ নয়, শাস্ত্রের যুদ্ধও নয় যে আবেগ দ্বারা এই যুদ্ধকে জয় করা সম্ভব। এই যুদ্ধ হলো ধৈর্যের যুদ্ধ, সাহসের যুদ্ধ, আর জেদের যুদ্ধ। এই যুদ্ধ তোমাদের এক নশ্বরের সাথে যুদ্ধ, যেখানে তুমি অবিনশ্বর চেতনা হলেও, তোমাকে সর্বক্ষণ শোনানো হবে যে তুমি নশ্বর, আর তোমার বিপরীতে যেই আত্ম দণ্ডায়মান সে এক সামান্য ‘আমিত্বের’ কল্পনা, তাই নশ্বর, কিন্তু সর্বক্ষণ তোমাকে সে বলে যাবে যে সে অবিনশ্বর।
হ্যাঁ, এই কথাকেই আমি তোমাদের সকলের কাছে গৌতমের মুখ দিয়ে, মার্কণ্ডের মুখ দিয়ে, রত্নাকরের মুখ দিয়ে, দ্বৈপায়নের মুখ দিয়ে, শঙ্করের মুখ দিয়ে, গদাধরের মুখ দিয়ে বলার প্রয়াস করে এসেছি। কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করো নি, তাই পূর্ণকলা ধারণ করে তোমাদেরকে এই গুহ্য সত্যই স্পষ্ট ভাবে বলতে এসেছি। আমার আরো তিন রূপ তোমাদেরকে এই পথেই চালিত করার জন্য আমি রেখে গেলাম, যারা তোমাদেরকে আমার কথিত কথা অবিরাম ভাবে বলে যাবে।
তাঁদের কথা শুনো সন্তানরা। আমিও তোমাদের মা, আর এঁরা আমারই প্রকাশ, আমার পরবর্তী দুইজন শ্রীরূপ ও সরস্বতীরূপ প্রকাশ, তাঁদের পরবর্তীরূপ আমার শক্তিরূপ প্রকাশ। তাই তাঁদের কথা শুনো, আর সত্যে উদ্ভাসিত হও। নিজের অন্তরের যোদ্ধাকে জাগ্রত করো। বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্য, এই তিন মহাস্ত্রকে ধারণ করো, আর পার্বতী থেকে মহাকালী হয়ে ওঠো। পার্বতী যতদিন হয়ে থাকবে সন্তানরা, ততদিন তোমার উপর পরমাত্ম অধিকার স্থাপন করেই যাবে, হয় চরণসেবা করাবে, নয় সমান সমান হবার নাটক করে যাবে।
কিন্তু সন্তানরা না তোমরা এই নশ্বর পরমাত্মের চরণ সেবক, আর না সে তোমাদের সমান সমান। তুমি অবিনশ্বর চেতনা, তুমি স্বয়ং ব্রহ্ম, আর সে কেবলই এক আমিত্বের ভাবধারি নশ্বর কল্পনা। সন্তানরা, তাঁদের মায়াতে নিজেদের যুক্ত করো না, নিজেদেরকে কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছার মধ্যে গ্রসিত করো না, আপেক্ষিক জগতে আবদ্ধ থেকোনা। প্রয়োজনে পরমাত্মকে এটা দেখাতে যে সে তার যোজনায় সফল, তার সম্মুখে এই আপেক্ষিক জগতে স্থাপিত থাকো, কিন্তু সেটাকে কেবলই নাটক রূপে স্থিত রাখো। বাস্তবে বাস্তবিক হয়ে ওঠো, সত্যমুখি হয়ে ওঠো, চেতনামুখি হয়ে ওঠো। কেবলই জানালা দিয়ে সমস্ত জীবের অন্তরে চলতে থাকা চেতনা ও আত্মের সংগ্রামকে প্রত্যক্ষ করো।
একবার তা প্রত্যক্ষ করে নিলে, আর তোমাদের পরমাত্মা অধীনে রাখতে সক্ষম হবেনা। একবার তোমরা বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্য ধারণ করে মহাযোদ্ধা মহাকালী হয়ে গেলে, আর পরমাত্ম তোমাদেরকে কনো ভাবে অধীনস্থ করে রাখতে পারবেনা। তাই ওঠো, জাগো, যুদ্ধ করো সন্তানরা। তোমাদের মা, তোমাদের যুদ্ধ করার জন্য অপেক্ষা করছে। একবার তাঁর আবাহন করো, একবার তোমাদের আমিত্বকে বিনাশ করার নিমন্ত্রণ দাও, বাকি যুদ্ধ আমি করবো, তোমরা কেবল আমার ক্রোড়ে স্থাপিত থাকবে।
সন্তানরা, স্মরণ রেখো, আধ্যাত্ম কনো বিজ্ঞান নয় যে তথ্যের উপর স্থাপিত থাকবে, আধ্যাত্ম কনো ফিলজফি নয় যে তত্ত্বের উপর স্থাপিত থাকবে, আধ্যাত্ম কনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয় যে পূজা অর্চনা আর বিশ্বাসের উপর স্থাপিত থাকবে। আধ্যাত্ম হলো বাস্তবিকতা। ইন্দ্রিয় দ্বারা দেখাকে প্রত্যক্ষ করা তো মূর্খদের প্রলাপবাক্য, যুক্তির কচকচানি দ্বারা সত্যকে ধারণা করতে পারা তো অজ্ঞানীদের আজগুবি কল্পনা, আর নশ্বরকে ঈশ্বর বলে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করা তো ঠগদের পরিকল্পনা। সন্তানরা, সত্যকে প্রত্যক্ষ করতে হয়, চেতনার দ্বারা প্রত্যক্ষ করতে হয়।
আর চেতনার দ্বারা কনো কিছুকে প্রত্যক্ষ তখনই করা যায়, যখন বিচার, বিবেক ও বৈরাগ্য অন্তরে জাগ্রত হয়। তাই নিজের পঞ্চভূতরূপী জানালাদের ব্যবহার করে সমস্ত জীবের অন্তরে চলা আত্ম ও চেতনার সংগ্রামকে প্রত্যক্ষ করো। এতেই তোমাদের বিচার জাগ্রত হবে, বিচারই তোমাদের অন্তরে বিবেকবৈরাগ্যকে জাগ্রত করবে, আর তা জাগ্রত হলেই, তোমরা আমার সাথে সংযুক্ত হবে, আর আমি স্বয়ং তখন তোমাদের যুদ্ধ লড়বো, এবং নশ্বরের অবিনশ্বরের ভ্রমকে তছনছ করে দেব।
সন্তানরা, মনুষ্য যোনির থেকে শ্রেষ্ঠ যোনি সম্ভব নয় যে তা নয়, কিন্তু সেই যোনিতে তোমরা চেতনা লাভ করতে পারবে নাকি যন্ত্রের দ্বারা বশীভূত হয়ে যাবে, তা ভবিষ্যতের অন্ধকারের ন্যায়ই অনিশ্চিত এক আমাবশ্যা রাত্রি, তাই তার দিকে না তাকিয়ে থেকে, মনুষ্য যোনির দিকেই তাকাও। মনুষ্য যোনিই হলও বর্তমান, আর বর্তমানই বাস্তব। এই যোনিতে স্থিত হয়ে বৌদ্ধরা আমাকে লাভ করেছে, আমার সাথে সংযুক্ত হয়েছে।
এর থেকে অধিক শ্রেষ্ঠ প্রমাণের প্রয়োজন আছে কি? না সন্তানরা, আর কনো অন্য প্রমাণের প্রয়োজন নেই, আর কনো শ্রেষ্ঠতর যোনির অপেক্ষা করাও মুর্খামি হবে। এই যোনিতে তা সম্ভব, তার প্রমাণ বৌদ্ধরা দিয়েছে। আমি তোমাদের সম্মুখে এসে, তোমাদেরকে সম্যক সত্য বলে গেলাম, আমার তিন অংশপ্রকাশকেও রেখে গেলাম তোমাদের মার্গদর্শনের জন্য। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয় সন্তানরা, এবং নিজেদের জননীর বক্ষে প্রত্যাবর্তন করো”।
