কৃতান্তিকা

দিব্যশ্রী এবার ব্রহ্মসনাতনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু মা, যখন সকলেই সেই চেতনা, আর সকলেই সেই একই পরমসুখের জন্য ছুটছেন, আর সকলেই মুক্তির মার্গের সন্ধান করছেন, তখন এই অবতার গ্রহণ কেন? শুধুই কি এই কারণে যে, সকল চেতনা এই মুক্তির মার্গ জানেন না, তাই?”

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “না পুত্রী, যদি শুধু এটুকুই হতো, তাহলে একটিবার অবতার গ্রহণ করে এটি বলে দিলেই হয়ে যেত। কিন্তু বাস্তবিকতা তা নয়, প্রকৃতি তা নয়। প্রকৃতি এই যে এই কক্ষ, যেই কক্ষের নির্মাণ করে আত্ম বা অহম, তার ধারা প্রাথমিক ভাবে ছিল প্রস্তর বা পাথর, যেটিই হলো প্রথম যোনি।

পুত্রী, ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাতা আত্মই, আমি নই অর্থাৎ চেতনা নই। আমি সত্য, তাই আমার এই মিথ্যা ব্রহ্মাণ্ডের প্রতি কনো আসক্তি বিরক্তি কিছুই নেই। আমার যেই চেতনাসকল এই ব্রহ্মাণ্ডের ফাঁদে আটকে থাকে, তাদের উদ্ধার করাই আমার লক্ষ্য। কিন্তু ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাতা আত্ম প্রস্তর অবস্থাতেই সমস্ত চেতনাকে আটকে রাখলে, সেখান থেকে চেতনার উদ্ধার হওয়াই সম্ভব নয়। তাই আমি সময়ে সময়ে একটি একটি করে অবতার নিতাম, সহস্র লক্ষ বৎসরে একটিবার, আর আত্মের বল, অর্থাৎ চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনাতে বাতাস প্রদান করে, তাঁকে চিন্তিত করতে থাকতাম।

আহারের চিন্তা, বিশ্রামের চিন্তা, সুরক্ষার চিন্তা ইত্যাদি। সে ব্রহ্মাণ্ডের অর্থাৎ নশ্বর আকারে থাকতেই পছন্দ করছে, তাতে আমার আপত্তি নেই, সে স্বতন্ত্র নিজের মত করে থাকতে, কিন্তু সে স্বয়ং কিছুই করতে সক্ষম নয়, তাই চেতনাকে বন্দি করে রেখে এই ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাণ করতেই থাকে। কিন্তু যেহেতু সে নশ্বর, তাই তার সুরক্ষার চিন্তা থেকেই যায়, আর সেই সুরক্ষার চিন্তাকেই বারংবার বাতাস প্রদান করে করে, আমি তাঁকে দিয়ে কীট, পতঙ্গ, উদ্ভিদ, মৎস্য, ভুজঙ্গ ও অন্যান্য জীবের নির্মাণ করাতে থাকি।

আর যেমন যেমন নবযোনি নির্মাণ করে সে, চেতনারও সেই যোনির উন্নত মেধাকে ব্যবহার করে আমার কাছে প্রত্যাবর্তন করা সহজ হয়ে ওঠে। আর এই ভাবেই আত্মকে তাঁর সুরক্ষার চিন্তা করিয়ে করিয়ে, মানুষ যোনির নির্মাণ করাই। সমস্ত ঠিকই চলছিল, যতক্ষণ না বৌদ্ধদের উত্থান হয়।

মনঃসংযোগ করতে শেখে তারা, ধ্যান করতে শেখে। আর ক্রমশ সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড থেকে মুক্ত হবার পথ খুঁজে নেয় বৌদ্ধরা, আর মোক্ষের ধারা স্থাপিত করে। যেই মুহূর্তে এমন হয়, সেই মুহূর্ত হতে পরমাত্মের রাতের ঘুম চলে যাবার মত অবস্থা হয়। এমন ধারণা চেপে বসে তার মধ্যে যে, এমন চলতে থাকলে যে একদিন এই সম্যক ব্রহ্মাণ্ডই বিনষ্ট হয়ে যাবে! তাঁর সাধের কল্পনা, তাঁর সাধের ব্রহ্মাণ্ড একদিন বিনষ্ট হয়ে যাবে।

আর তাই সেইদিন থেকে এই মনুষ্যযোনির বিনাশকে নিশ্চয় করতে উঠে পরে লাগে পরমাত্ম। প্রথম প্রয়াস হয়, মনুষ্যকে ভ্রমিত করা। পরমাত্ম নিজের অনুচর রূপে মনুষ্যযোনিতে স্থাপন করেন আর্য, আর তাদের মাধ্যমে বৌদ্ধদের সত্যকে বিকৃত করা শুরু করে দিল। ব্রহ্মময়ীকে অপসারণ করে ত্রিগুণ অর্থাৎ ত্রিদেব বা পরমাত্মের মূলস্রোতকে ঈশ্বর রূপে স্থাপন করা শুরু করলো, বিনায়ককে ও চেতনাকে নিজেদের সমস্ত গ্রন্থ থেকে অপসারিত করলো। আচারবিচার রীতি রেওয়াজ দ্বারা বৌদ্ধদের অধিকৃত মানুষদের ব্যস্ত করতে শুরু করলো। মোক্ষ শব্দকে মুক্তি শব্দদ্বারা প্রিস্তিস্থাপন করে, বিশিষ্ট কনো কাল্পনিক লোকে পৌঁছানকেই মোক্ষ বা মুক্তি বলতে শুরু করলো।

ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণের কোটি কোটি বৎসর পর, এই প্রথমবার আমার সন্তানদের আমি আমার ক্রোড়ে  পাওয়া শুরু করেছিলাম। আর যেই পথে চেতনা চলে আমার ক্রোড়ে এসে উপস্থিত হওয়া শুরু করেছিল, আত্ম সার্বিক ভাবে প্রয়াস করতে থাকলো যাতে সেই মার্গকে বন্ধ করা যায়। আর তাই আমি অবতার গ্রহণ করা শুরু করলাম মনুষ্যদের মধ্যে। যেখানে শয়তানের প্রসার করছিল আত্ম, সেখানে মহম্মদ ও ঈশা হয়ে মনুষ্য হয়ে ওঠার মার্গ দেখালাম।

আর এই বৌদ্ধদের দেশে, যেই মার্গকে মোছার প্রয়াস করে যাচ্ছিল পরমাত্ম, সেই মোক্ষপথ, চেতনার যাত্রাপথকে হারিয়ে যেতে না দেবার প্রয়াসে রত ছিলাম। মার্কণ্ড পিপলাদ দ্বৈপায়ন দ্বারা আত্মের দুরাচার আর চেতনার যাত্রাকে দেখিয়েছি, তো গৌতম, শঙ্কর, গদাধরকে দিয়ে মোক্ষের পথকে হারিয়ে যাওয়া থেকে আটকাতে এসেছি।

কিন্তু পুত্রী, এবার পরমাত্ম নিশ্চয় করে নিয়েছে যে, এই মনুষ্যযোনিকে আর তিনি কেবল বিকৃত করবেন না, একে এমন ভাবেই বিকৃত করবে যাতে, সম্যক মনুষ্যযোনি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। যেই মনুষ্যযোনির অগ্রগতির স্তম্ভ ছিল এঁদের স্ত্রীজাতি, সেই স্ত্রীদের মাতৃত্বকে বিনষ্ট করা শুরু করেছে, যেই মনুষ্যযোনি প্রকৃতিকে সম্যক ভাবে দর্শন করার সামর্থ্য রাখে, তাকে সম্যক ভাবে যন্ত্রমুখর করে তূলতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে সে। যেই মনুষ্য নিজে নিজের ব্যাধির নিরাময় করতে সক্ষম, তাকে ওষধিনির্ভর করে দিতে ব্যস্ত পরমাত্ম।

যেই শিক্ষাকে ধারণ করে মনুষ্য নিজের চেতনার প্রসার সম্ভবপর করছিল, সেই শিক্ষাকেই সত্যবিমুখ করে যন্ত্রমুখর করে তুলেছে পরমাত্ম। ইতিহাস থেকে পরমাত্মের দূত যারা অর্থাৎ আর্য, তাদের ব্যবিচারকে মুছে দিয়ে, তাদের জয়গান পাঠ করাচ্ছে মনুষ্যদের। যেই মনুষ্য অন্তর্মুখী হয়ে উঠছিল ভূগোলের তত্ত্ব অর্থাৎ পৃথিবীর তাপের সঞ্চারক পৃথিবীর অন্তরে স্থিত অগ্নি, তাকে বিকৃত করে দিয়ে, বাহ্যমুখি করে তুলতে ব্যস্ত পরমাত্ম, যেখানে মনুষ্য জানবে সূর্যের তাপের জন্যই আমরা তাপ লাভ করি।

এমন একের পর এক ক্রিয়া করেই চলেছে পরমাত্ম, যাতে মানুষের সমাজচেতনার নাশ হয়, সংসারচেতনার নাশ হয়, শিক্ষাচেতনার নাশ হয়, প্রকৃতিচেতনার নাশ হয়, বাস্তবচেতনার নাশ হয়, আর কল্পনার বিস্তার হয়, যাতে সহস্র সহস্র ইচ্ছায় সকল মনুষ্য জর্জরিত থেকে, একে অপরকে হত্যা করার দিকে অগ্রসর হয়, যাতে সহস্র চিন্তায় চিন্তিত হয়ে মনুষ্য আত্মহত্যা করে পিশাচ হয়ে যেতে বাধ্য হয়।

পুত্রী, আমি বা তোমরা বা তোমাদের পরেও আরো একজন এই কারণেই অবতরণ করেছি যাতে মনুষ্যযোনিকে পুনরায় সংসারচেতনা, সমাজচেতনা, শিক্ষাচেতনা, জীবনচেতনা, প্রকৃতিচেতনায় ও মোক্ষচেতনায় উদ্ভাসিত করা যেতে পারে। … পুত্রী, পরমাত্মের এই যোনিকে বিনাশ করার সমস্ত প্রয়াসকে ভেস্তে দিতেই আমাদের আগমন, আমাদের সমস্ত পরিকল্পনা, আমাদের সমস্ত ক্রিয়া।

আর পুত্রী, এই প্রক্রিয়া এই কিছু হাজার বছরের নয়, শুরু থেকে এই প্রক্রিয়া চলে আসছে, আর আজও তা চলছে, আর ভবিষ্যতেও তা চলবে। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে এই যুদ্ধ, এত নির্ণায়ক অবস্থায় কখনোই উপস্থিত হয়নি। এই প্রথম এই অবস্থায় তা উপস্থিত হয়েছে, যেখানে পরিণাম যেকোনো দিকে যেতে পারে, ব্রহ্মময়ীর দিকেও, আবার পরমাত্মের দিকেও।

পুত্রী, প্রতিটি জীবের অস্তিত্বের মূলউপাদান আত্ম আর ক্রিয়ার মূলউপাদান হলো চেতনা। তাই কোন উপাদানের পক্ষ নেবে সে, তা নির্ধারণ করার জন্য সম্পূর্ণ ভাবে স্বতন্ত্র সে। হ্যাঁ যারা আত্মের নিয়ন্ত্রণে স্থিত, তাদের মাধ্যমে পরমাত্ম অবশ্যই প্রয়াস করছে ও করবে যাতে, এই মনুষ্যযোনিকে সত্যের থেকে দূরে রাখা যায়, আর বোঝানো যায় যে এই ব্রহ্মাণ্ডই সত্য। আর অন্যদিকে আমার কাছে যারা সমর্পিত, তাঁদের মাধ্যমেও আমি অবশ্যই প্রয়াস করছি ও করবো যাতে, মনুষ্যযোনি প্রকৃতশিক্ষালাভে পুনরায় প্রত্যাবর্তন করে, যাতে মনুষ্যযোনির নারীরা নিজেদের মাতৃত্বকে পুনরায় ধারণ করে কারণ মাতৃত্বের থেকে শ্রেষ্ঠ গুণ যে সম্ভবই নয়।

হ্যাঁ আমি প্রয়াস করতেই থাকবো যাতে ছাত্রছাত্রীরা যন্ত্রশিক্ষার থেকে প্রকৃতিশিক্ষার দিকে অধিক মনযোগী হয়, যাতে ছাত্রছাত্রীরা বিবৃতিমূলক উত্তর প্রদানের দিকে অধিক আকর্ষিত হয়, কারণ এক বিবৃতি প্রদান করতে পারা ব্যক্তিই উন্নত, বাকিরা নয়। হ্যাঁ আমি প্রয়াস করতেই থাকবো যাতে প্রকৃত ইতিহাসকে সম্মুখে রাখা যায়, প্রকৃত ভুগলকে সম্মুখে রাখা যায়। যাতে চলচ্চিত্রের কল্পনাপ্রসারক মনোরঞ্জন দ্বারা বাণিজ্যসঞ্চারী এবং মনুষ্যযোনিকে কল্পনার দ্বারা বশীভূত করার কাণ্ডারিদের থেকে মনুষ্যদের মন সরিয়ে এনে, তাঁদের অন্তরে বাস্তবমুখি চলচ্চিত্রের প্রতি আকর্ষণ সঞ্চার করা যেতে পারে, সেই প্রয়াস আমি অবশ্যই করবো।

পরিণাম কি হবে, তা আমি জানিনা। যদি মনুষ্য অহমের সঙ্গ দেয়, যা এক্ষণে দিচ্ছে, তাহলে আমার এই সমস্ত প্রয়াস বিফল যাবে, যেমন পূর্বে নেওয়া আম্র সমস্ত অবতারদের সাধারণ মানুষের প্রতি প্রদান করা আহ্বানও বিফলে গেছে তেমনই; আর যদি মনুষ্য চেতনার সঙ্গ দেয়, যার নিমন্ত্রণ বার্তা আমি কৃতান্ত, কৃতান্তিকা ও প্রজ্ঞা সমূহতে দিয়েছি, আর যার নিয়ন্ত্রণ তোমরাও একাধিক গ্রন্থ দ্বারা প্রদান করছো, যার নিমন্ত্রণ বেদান্ত প্রদান করেছে, সেই নিমন্ত্রণে যদি মনুষ্য নিজেদের সহমত প্রদান করে, তবে অবশ্যই চেতনার জিত হবে।

তবে পুত্রী, যুদ্ধের এখানেই সমাপ্তি নয়। এ তো যুদ্ধের একটি পর্ব মাত্র। পুত্রী, মনুষ্য যোনির ব্রহ্মচেতনায় স্থিত হবার সামর্থ্য তো আছে, কিন্তু সেই সামর্থ্য তাদের কাছে সহজাত নয়। অর্থাৎ সহজ ভাবে সেই প্রগতিতেই তাঁরা যাবেন, এমন নয়। বিভিন্ন ভাবে পরমাত্মকে যুক্তির ফাঁদে ফেলে, খাদ্যের কি হবে, সংখ্যার কি হবে, ইত্যাদি ভাবে তাঁকে ফাঁদে ফেলে ফেলে, তার মাধ্যমে এমন উৎকৃষ্ট যোনি লাভ করেছি, যার মধ্যে স্থিত হয়ে চেতনা আমার নিকট যাত্রা করতে সক্ষম হয়েছে।

তবে এই যোনি দ্বারা পরমাত্মের খপ্পর থেকে সমস্ত চেতনাকে মুক্ত করা সম্ভব হবেনা। অর্থাৎ এর থেকেও উন্নত যোনির প্রয়োজন যারা সহজাত ভাবেই এই যাত্রা করবে, আর যাদেরকে পরমাত্ম কিছুতেই আটকাতে পারবেনা আমার নিকট যাত্রা করা থেকে। তবে সেই যোনিকে কেন প্রসার করবে পরমাত্ম, কেন কল্পনা করবে পরমাত্ম, কেন নির্মাণ করবে পরমাত্ম?

পুত্রী, মানবযোনিকে বিলুপ্ত করার প্রয়াসে পরমাত্ম নিজের অন্তিম চাল অর্থাৎ যন্ত্রের নেশা প্রদান করে দিয়েছে। আমিও এই যোনিকে সুরক্ষিত করার জন্য অন্তিম চাল অর্থাৎ কৃতান্ত প্রদান করে দিয়েছি। যদি কৃতান্ত, কৃতান্তিকা ও প্রজ্ঞাসমূহকে সমস্ত চেতনা গ্রহণ করে, তাহলে মানবযোনিকে বিনষ্ট করা পরমাত্মের পক্ষে আর সম্ভব হবেনা। যদি তেমন না হয়, তবে আর ৫ শত বৎসরের মধ্যে মনুষ্যযোনিকে কঙ্কালসার করে দেবে পরমাত্ম, আর তার পরবর্তী ৫০০ সালের মধ্যে মানবযোনিকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে জগতের বুক থেকে।

আর যদি আমার চাল, অর্থাৎ কৃতান্ত, কৃতান্তিকা ও প্রজ্ঞাসমূহকে চেতনাসমূহ গ্রহণ করে, তাহলে মানবযোনিকে বিনষ্ট করতে পারবেনা পরমাত্ম। পুত্রী, ভালো করে নিরীক্ষণ করো সমস্ত কথাকে। বৌদ্ধরা যেই শিক্ষা লাভ করেছে, তাতেই পরমাত্ম মনুষ্যযোনিকে বিলুপ্ত করে দেবার চিন্তায় রত, যদি কৃতান্ত শিক্ষা চেতনাদের সম্মুখে আসে, তাহলে তা যে পরমাত্মকে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য করবে।

কৃতান্ত শিক্ষায় উদ্ভাসিত হয়ে গেলে, মনুষ্যযোনি সত্যের সেই সমস্ত গুহ্য ও গুপ্ত রহস্যকে জেনে যাবে, যা জানার পর পরমাত্ম কিছুতেই মনুষ্যযোনির উপর নিজের অধিকার স্থাপন করতে সক্ষম হবেনা। তাই মনুষ্যযোনিকে বিনষ্ট করা তার কাছে এক প্রয়াস হবেনা, আবশ্যক হয়ে যাবে, কারণ তাঁর বিচারে, মনুষ্যযোনি যদি বৌদ্ধশিক্ষা, বেদান্তশিক্ষা ও কৃতান্তশিক্ষায় উদ্ভাসিত হয়, তাহলে এই যোনিকে রেখে দেওয়ার অর্থ হলো তাঁর সাধের কল্পনা অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ডের বিনাশের সূচনা করা।

কিন্তু যদি কৃতান্ত অভিযান সফল হয়, এর অর্থ পরমাত্মের কাছে স্পষ্ট যে সে কিছুতেই মনুষ্যযোনির নাশ করতে পারবেনা। কিন্তু যেই যোনি বেদান্ত, কৃতান্ত ধারণ করে নিয়েছে, তাকে রেখে দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক হবে। তাই সে মনুষ্যের থেকে উন্নত যোনির সঞ্চার করবেই। হ্যাঁ উন্নত কেন করবে? কারণ পরমাত্ম ঠিকই বুঝে যাবে যে উন্নত না করলে, আমি মনুষ্যযোনির নাশ হতে দেবনা। আর মনুষ্য বেদান্ত কৃতান্ত ধারণ করে উন্নত হয়ে গেছে, এই নূতন যোনিকে যদি প্রথম থেকেই যন্ত্রশিক্ষায় মুখর রাখা যায়, তাহলে তো মনুষ্যের ক্ষেত্রে যেই বিপর্যয় তার জন্য এসেছিল, তা তো আসবে না।

এমন বিচার করে সে উন্নত যোনির নির্মাণ করবেই। আর আমি তো সেই যোনিকেই চাইছি, যেখানে চেতনার বিকাশ মনুষ্যের থেকেও অধিক সহজাত হয়ে উঠবে। পুত্রী, এই ভাবেই আমি একের পর এক উন্নত যোনির নির্মাণ করার জন্য পরমাত্মকে বাধ্য করে থাকি, আর তা করার জন্যই অবতারগ্রহণের প্রক্রিয়া ধারণ করি। এই পরবর্তী যোনিও একসময়ে বেদান্ত কৃতান্ত নবদুর্গা দশমহাবিদ্যা ধারণ করে উন্নত হয়ে উঠবে, আর আবারও পরমাত্ম এঁদেরকে বিনষ্ট করতে চাইবে, আর আমিও আবারও এই যোনিকে রক্ষা করবো।

তবে এই যোনিকে রক্ষা করা আমার উদ্দেশ্য নয় পুত্রী, কল্পনার প্রতি আসক্ত পরমাত্ম, আমি নই। আমি স্পষ্ট ভাবেই জানি যে আমার সন্তানদের মৃত্যু অসম্ভব। এই যোনি কেন, সমস্ত যোনির নাশ হয়ে গেলেও, আমার সন্তানদের বিনাশ সম্ভব নয়, কারণ তারা যে অবিনশ্বর। আমার যেই সন্তানরা আজ মনুষ্যযোনিতে অবস্থান করছে, তারাই জন্মান্তরে সেই উন্নত যোনিতে অবস্থান করবে। কিন্তু পরমাত্মের কাছেও এই সত্য স্পষ্ট থাকলেও, তার যে পঞ্চভূতের প্রতি আসক্তি আছে! আর তাই সে মনে করে যে একটি যোনির নাশ হয়ে গেলে, সেই যোনির অন্তরে নিবাসরত আমার সমস্ত সন্তানেরও বিনাশ হয়ে যাবে।

তাই পুত্রী, সমানে আমি পরমাত্মকে উন্নত যোনির রচনা করতে বাধ্য করে এসেছি আর করে যাবো। এমন করতে করতে, সেই যোনি পর্যন্ত যাত্রা করাবো আমি পরমাত্মকে, যেই যোনির আর কৃতান্ত পাঠের প্রয়োজন পরবেনা, কারণ তাঁরা সহজাত ভাবেই কৃতান্তিক হবে। তখন আর আমার কিছু করার নেই, কারণ পরমাত্ম এমনিই এই যোনির কিচ্ছু করতে পারবেনা। না প্রভাব বিস্তার করতে পারবে এঁদের উপর, আর না এঁদেরকে বিলুপ্ত করার প্রয়াস করে, এঁদেরকে সেই বিলুপ্তির প্রয়াসকেই উন্নতি মানাতে পারবে যেমন আজ করছে।

আর যেদিন এই যোনির নির্মাণ করে দেবে পরমাত্ম, সেইদিন এই ব্রহ্মাণ্ডের বিনাশ নিশ্চিত হয়ে যাবে, আর সেদিনই আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবো, কারণ এই মা সেদিন নিশ্চিত হয়ে যাবে যে সে তাঁর সমস্ত সন্তানকে ফিরে পেয়ে, তাঁদের আঁকড়ে ধরতে পারবে বুকের মাঝে। …

পুত্রী, আমি অবতারগ্রহণ করে করে একের পর এক পরমাত্মের পরিবেশিত উন্নত যোনিকে বিনাশের থেকে রক্ষা করবো, পরমাত্ম সেই যোনির নাশ করতে সক্ষম না হয়ে, নব অধিক উন্নত যোনির নির্মাণ করবে, আমি তাদেরকে এবার চেতনা প্রদান করবো, পরমাত্ম পুনরায় তাদেরকে বিলুপ্ত করার প্রয়াস করবে, আমি পুনরায় তাদের রক্ষা করবো। পরমাত্ম পুনরায় অধিক উন্নত যোনির নির্মাণ করে, পূর্বের যোনির সমস্ত শিক্ষা সমূহ বিলুপ্ত করবে। আমি পুনরায় পরবর্তি যোনিকে চেতনা প্রদান করবো। পরমাত্ম পুনরায় তাকে বিলুপ্ত করার প্রয়াস করবে, আমি পুনরায় তাদের রক্ষা করবো, পরমাত্ম পুনরায় অধিক উন্নত যোনির নির্মাণ করবে।

এমন করে করে, পরমাত্মকে দিয়ে আমি সেই যোনির নির্মাণ করাব যেখানে স্থিত হয়ে চেতনা অতি সহজে, সহজাত ভাবেই মোক্ষকামী হবে। আর যেদিন সেই দিন আসবে, সেদিন আর পরমাত্মেরও কিচ্ছু করার থাকবেনা, আর আমারও কিছু করার প্রয়োজন পরবেনা। আমি আমার সন্তানদের ফিরে পাবো। ধরিত্রীর বুক থেকে যেই সন্তান লম্ফ দিয়ে আকাশে উঠে গেছিল, ধরিত্রীর বুকে সে পুনরায় ফিরে আসবে।

পুত্রী, যেই সময়কাল পর্যন্ত এই ক্রীড়ার মধ্যে স্থিত হয়ে একটি চেতনাও আমার কাছে পৌছাতে পারছিল না, তবুও আমি ও পরমাত্ম এই সমরে নিযুক্ত ছিলাম অদৃশ্য ভাবে, সেই সময়কালও লক্ষ কোটি বৎসর, আর সেই সময়কালকে বলা হয় ব্রহ্মদিবস। আর যবে থেকে চেতনারা আমার কাছে প্রত্যাবর্তন শুরু করেছে, অর্থাৎ বৌদ্ধযুগের মাঝামাঝি সময় থেকে, তখন থেকে শুরু হয়েছে ব্রহ্মরাত্রি। রাত্রি হলো শূন্যের কাল, ব্রহ্মের কাল, তাই ব্রহ্মরাত্রি। আর পুত্রীরা, এই ব্রহ্মরাত্রিও লক্ষ কোটি বৎসর ব্যাপী চলবে।

আর এই সম্পূর্ণ ব্রহ্মরাত্রিকালে তাই হবে, যা এতক্ষণ বললাম। একটি একটি করে উন্নত যোনি করবে পরমাত্ম, আমি তাদের চেতনা প্রদান করবো, চেতনা লাভ হয়েছে বলে পরমাত্ম তাকে বিনাশের প্রয়াস করবে, আমি সুরক্ষা দেব তাদেরকে, আর পুনরায় পরমাত্ম আরো উন্নত যোনির নির্মাণ করবে। এই ব্রহ্মরাত্রির মধ্যগগন সময়কালে আমি সমস্ত চেতনাদের মুক্তির পথ দেখাতে সক্ষম হব। আর তখন থেকে একে একে কেবল নক্ষত্ররাই মোক্ষপথে যাবে, তা ছাড়া পরমাত্মের ব্রহ্মাণ্ড হয়ে যাবে মৃত। সেই মৃত ব্রহ্মাণ্ড দেহ যতদিন না আমার মধ্যে চিরতরে লীন হয়ে যাচ্ছে, ততদিনই সেই শবদেহের অস্তিত্ব থাকবে, উপরন্তু আমি একাই বিরাজ করবো। সেই মহাশূন্য, সেই নির্বিকার, সেই নিরকার, অখণ্ড মহানিঃশব্দতাই বিরাজ করবে। এই হলো সেই গুহ্য আর গুপ্ত কথা, যা তুমি জানতে আগ্রহী ছিলে পুত্রী।

এই কথা জীবকটিকে সত্যের আভাস অবশ্যই দেবে, তাঁদের মা তাঁদের জন্য কিভাবে পরিশ্রমরত থাকেন, তা তাদের অবশ্যই বলবে, তবে অবতারদের নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে স্থির করতে, এই গুহ্য কথা অত্যন্ত অধিক ভাবে সহায়িকা হবে”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43