মহাবিজ্ঞান
ব্রহ্মসনাতন সম্মতি প্রদান করলে, দিব্যশ্রী প্রশ্ন করলেন, “মা, আমার মনের মধ্যে একাধিক প্রশ্ন দানা বেঁধেছে, আর সেই প্রতিটি প্রশ্ন আমাকে বিব্রত করছে, আমার ছাত্রছাত্রীদের পাঠ প্রদান করার সময়ে। তাই মা, আমি সেই প্রশ্ন সমূহের স্পষ্ট উত্তর লাভের আশায় তোমার কাছে এসেছি। আমার প্রথম প্রশ্ন এই যে, আচ্ছা মা, চেতনা স্বয়ং ব্রহ্মময়ী হলেও কেন আত্ম তাঁকে বশীকরণ করতে সক্ষম হয়?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, আমি তো মা, আমি তো পূজা লাভের অভিলাষী নই, সন্তানলাভে অভিলাষী। যেই ব্রহ্মের অণুই সম্ভব নয়, কল্পনার বলে, নিজেদের সেই অণু মনে করে, কিছু ব্রহ্মাণু নিজেদের স্বয়ম্ভু রূপে স্থাপিত করেছে। তাতে আমার কনো কথা বলার নেই। আমি যে সত্য, তাই আমার থেকে বিচ্যুত তো এঁরা হয়নি, তাই আমার বেদনার কনো কারণই নেই এই ব্যাপারে। কিন্তু যেহেতু এঁরা আমার থেকে পৃথক হয়নি, আর তা হতেও পারবেনা, কারণ আমিই একমাত্র অস্তিত্ব, তাই আমার চেতনাকেই তাঁরা ধারণ করে বসে রয়েছে।
পুত্রী, যেহেতু তাঁরা নিজেরা কল্পনার মধ্যে আবদ্ধ, সেহেতু তাঁদের সাথে যুক্ত থাকার কালে আমার চেতনাও বিভ্রান্ত, আর এই বিভ্রান্ত চেতনারা নিজেদের স্বরূপ অর্থাৎ আমাকে ভুলে বসে রয়েছে। তাই এঁদের থেকে আমার সমস্ত চেতনাকে মুক্ত করাই আমার লক্ষ্য, আর তা না করতে পারাই আমার বেদনা”।
ব্রহ্মসনাতন পুনরায় হেসে বললেন, “পুত্রী, তুমি এই জানতে চাইছ তো যে, স্বয়ং ব্রহ্মময়ীকে অর্থাৎ চেতনা ভ্রমিত হচ্ছে আত্মের অর্থাৎ অহমের কল্পনার বলে, এতো মেনে নেওয়া গেল, কিন্তু চেতনা সেই ভ্রমকে কাটিয়ে কেন উঠতে পারছেনা! আর যদি তাকে সেই বন্ধন কাটিয়ে উঠতে হয়, সেই উপায় কি হবে। এই তো?”
দিব্যশ্রী সহমত পোষণ করলে, ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “শোনো তবে, কি উপায়ে আত্ম বা অহম চেতনার নিজের স্বরূপে যাত্রা করার পথে অবরোধ সৃষ্টি করে। পুত্রী, আত্ম বা অহম একটি কক্ষের নির্মাণ করে, তাতে চেতনাকে বন্দি করে রেখে দেয়। এই কক্ষের দেওয়াল হলো মন। তাতে চারটি গবাক্ষ, উর্জ্জা, বুদ্ধি, প্রাণ ও শরীর, এবং তিনটি দরজা, কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছা।
পুত্রী, এই কক্ষ একটি মহা মায়া, কারণ এই কক্ষ থেকে বাইরে যাওয়ার কনো উপায় নেই। যেকোনো একটি দরজা ব্যবহার করে নির্গত হবার প্রয়াস করলে, এই কক্ষের অনুরূপ আরো একটি কক্ষের নির্মাণ হয়ে যায়, আর এই ভাবে অজস্র এমন কক্ষ নির্মিত হয়ে হয়ে, ব্রহ্মাণ্ড নির্মিত হয়ে যায়, আর তাই চেতনা নিজের বন্দিদশা থেকে কিছুতেই নির্গত হতে পারেনা।
আবার এ মায়া কেমন দেখো, এই যে গবাক্ষ গুলি রয়েছে, যদি চেতনা এমন ভাবে যে এই গবাক্ষগুলিকে বন্ধ করে দিলে, আত্ম আর কিছু দেখতে পাবেনা, তাই মায়াও করতে পারবেনা। তাও সম্ভব নয়। কেন? কারণ এই গবাক্ষদের পাল্লা বাইরের দিকে খোলা। অর্থাৎ এই গবাক্ষকে বন্ধ করতে এলে, সেই কক্ষের বাইরেই আসতে হবে, অর্থাৎ নূতন কক্ষের নির্মাণ হয়ে যাবে। আর তাই চেতনা নিজেকে কিছুতেই এই বন্দিদশা থেকে মুক্ত হতে পারেনা”।
দিব্যশ্রী উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “কিন্তু মা, চেতনা যে স্বয়ং ঈশ্বরী, স্বয়ং তুমি। তোমাকে আটকে রাখে, এই সামর্থ্য কার আছে?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “সঠিক কথা পুত্রী, কারুর নেই এই সামর্থ্য। কিন্তু তার জন্য যে চেতনাকে পুনরায় আবিষ্কার করতে হবে যে সে আমিই। তা কি করে করবে? যদি একবার তা আবিষ্কার করে ফেলে, তাহলে আর সে পার্বতী হয়ে থাকবে না, কালী হয়ে উঠবে; লক্ষ্মী হয়ে নারায়ণের পদসেবা করবে না, মহালক্ষ্মী হয়ে নারায়ণকে কচ্ছপরূপ ধারণ করতে বাধ্য করবে; তখন আর সে অগ্নিপরীক্ষা দেবেনা, পাতালে প্রবেশ করবে। কিন্তু এই সত্যকে আবিষ্কার তো করতে হবে। সেই আবিষ্কারই তো সে করেনি, তাই নিজের স্বরূপও জানেনা, আর তাই মুক্তও হতে পারেনা আত্মের বন্ধন থেকে”।
দিব্যশ্রী বললেন, “কি করে এই আবিষ্কার করবে মা? এই আবিষ্কার করার উপায় কি?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “গবাক্ষ বন্ধ করার প্রয়াস না করে, কক্ষের দরজা দিয়ে পলায়নের প্রয়াস না করে, চুপিসারে গবাক্ষ দিয়ে বাইরে দেখতে হয়। যখন বাইরে দেখবে, তখনই সে বুঝতে পারবে কারণ সে সচক্ষে যে দেখতে পাবে। কি দেখতে পাবে? দেখবে যে, যাকে নিজের স্বামী মনে করে তাঁর অনুগামী হয়ে রয়েছে সে, সে যা আসলে তাঁকে ও সকল চেতনাদের এমনই মায়াকক্ষে বন্দি করে রেখেছে।
আসলে পুত্রী, চেতনা মুক্ত হতে পারছিলনা কক্ষ থেকে এই কারণে নয় যে, তাঁর সামর্থ্য নেই। বরং এই কারণে মুক্ত হতে পারছিলনা কারণ, যিনি তাঁকে বন্দি রেখেছেন, অর্থাৎ তাঁর পতি, তাঁর স্বামী, তাঁর প্রতি আসক্ত থেকে তাঁর প্রতিই অনুগত হয়েছিল সে। তাই সে কিছুতেই মুক্ত হতে সচেষ্টই হচ্ছিল না। একবার সেই সত্য জেনে গেলে, আসক্তিও চলে যাবে, আর সে মুক্তও হয়ে যাবে”।
দিব্যশ্রী বললেন, “এর অর্থ, প্রকৃতিকে দেখতে হবে। কনো কল্পনা না রেখে, কনো চিন্তা না রেখে, কনো ইচ্ছা না রেখে, কেবলই প্রকৃতিকে দেখতে হবে। প্রকৃতি মানে তো পাহাড়, নদী, জীব, উদ্ভিদ ইত্যাদি। এঁদের দেখতে থাকলেই কি চেতনার আসক্তি দূর হবে মা?”
ব্রহ্মসনাতন মাথা নেড়ে বললেন, “না পুত্রী, পাহাড়, নদী, জীব, অজীব, উদ্ভিদ ইত্যাদি কনোটিই প্রকৃতি নয়, এঁরা সকলেই পুরুষ, এঁরা সকলেই একটি একটি আত্ম। প্রকৃতি হলো এঁদের ক্রিয়া। নদীর প্রবাহধারা হলো প্রকৃতি, পাহাড়ের ধৈর্য হলো প্রকৃতি, সাপের তির্যক গতি হলো প্রকৃতি, অগ্নির দাহিকা শক্তি হলো প্রকৃতি, বায়ুর গন্ধহীনতা হলো প্রকৃতি, গরুর জাবড় কাটা হলো প্রকৃতি। প্রকৃতি তো কখনোই স্পর্শনীয় নয় পুত্রী।
পুত্রী, এই সমস্ত কিছু দেখতে দেখতে, বিনা চিন্তা ইচ্ছা ও কল্পনাকে এঁদের মধ্যে যুক্ত করে, এঁদের দেখতে থাকলে, তবেই উপলব্ধি হয়, আত্মের এই ব্যবিচার, আত্মের প্রয়োগ করা মায়া, আর চেতনার আসক্তির কারণে পরাধীনতা। আর তা দেখে দেখে, একবার যখন অন্তরে কালী, মহালক্ষ্মী জন্ম নিয়ে নেয়, তখন আর পুরুষের পক্ষে এঁদেরকে ধরে রাখা সম্ভব হয়না। তখন সে সমস্ত আত্মের সাথে যুক্ত চেতনাকেই নিজের সন্তানজ্ঞান করে, এবং চেতনা থেকে পরাচেতনা হয়ে ওঠে”।
দিব্যশ্রী বললেন, “যেমন তুমি হয়েছ, আর আমাকেও হতে হবে”।
পরমসুখ ও সন্তানবোধ (মহাবিজ্ঞান)
দিব্যশ্রী জিজ্ঞাসু হয়ে বললেন, “কিন্তু মা, একটি দ্বন্ধ আছে। দ্বন্ধ এই যে, সমস্ত আত্মের সাথে যুক্ত চেতনাকেই সন্তানজ্ঞান করতে হয়। হ্যাঁ খাতায়কলমে দেখলে তা তো সঠিক, কিন্তু বাস্তবে সকলকে সন্তানজ্ঞান করার জন্য সকলের মধ্যে কিছু না কিছু তো মিল থাকা আবশ্যক, তাই না! সেই মিলটি কোথায় মা?”
ব্রহ্মসনাতন মৃদু হেসে বললেন, “একটু গভীর দৃষ্টি দিয়ে দেখো পুত্রী। গভীরে প্রবেশ করে দেখলে দেখবে, সকলে একটিই কামনা করে চলেছে, আর তা হলো পরমসুখের কামনা।
যদি সেই পরমসুখের সন্ধান নাই করে, তাহলে সর্বক্ষণ মানুষ, সমস্ত জীব নিজেদের বেদনার বাখান করে ফিরে হতাশ থাকে কেন? সর্বক্ষণ তাঁরা সুখের চিন্তা করে যাচ্ছে দেখ, সেই সুখের চিন্তা, যার কনো সমাপ্তি নেই, আদি নেই, অন্ত নেই।
সেই সুখের সন্ধানেই তো সকলে সকল কিছু করছে। একটু গভীর ভাবে দেখো, সেই সুখকে পত্নীও, পতিও, বেশ্যাও, আর বেশ্যার নিত্যশয্যাসঙ্গীও সর্বক্ষণ খুঁজে চলেছে। সেই একই সুখের সন্ধান বিছানাতেও করছে, আবার বাহ্যে যাবার কালেও করছে। সেই একই সুখের সন্ধান প্রস্রাব করে হাল্কা হবার কালেও করছে, আবার বমন করে হাল্কা হবার কালেও করছে।
বিচার করে দেখো পুত্রী, কখনো জীব ভাবছে, সেই সুখ নামযশে লাভ হবে, তাই হন্যে হয়ে সেই নামযশের পিছনে ধাবমান; আবার কখনো ভাবছে একাকীত্বে সম্ভব, তাই নিজেকে একাকী করে দিতে, নিঃসঙ্গ করে দিতে চাইছে। অন্যত্রও দেখো, সেই একই পরমসুখ কেউ ভাবছে একটি স্ত্রী বা একটি পুরুষের থেকে লাভ করা সম্ভব, তাই তাঁর কাছেই পরে রয়েছে; আবার কেউ ভাবছে একাধিক পুরুষ বা একাধিক স্ত্রী লাভেই সেই পরমসুখ প্রাপ্তি সম্ভব, তাই একের পর এক পুরুষ বা স্ত্রীর পরিবর্তন করে চলেছে।
কেউ ভাবছে আমিষ আহারেই সেই সুখ পাওয়া যাবে, আবার কেউ ভাবছে নিরামিষেই তা পাওয়া যাবে, আবার কেউ ভাবছে উভয়কেই একত্রে গ্রহণ করে তা পাওয়া যাবে। কেউ ভাবছে বুদ্ধিহীন হয়ে সেই প্রাপ্তি সম্ভব, তো কেউ ভাবছে বুদ্ধিমান হয়ে তা প্রাপ্তির সম্ভব। কেউ ভাবছে অন্যের পরিকল্পনা অনুসারে চলে সেই সুখ প্রাপ্তি সম্ভব, আবার অন্যজন ভাবছেন নিজের পরিকল্পনা অনুসারে চললেই সেই পরমসুখের সন্ধান পাওয়া যাবে।
কেউ ভাবছে আমার এলাকায় আমি জনপ্রিয় হলেই সেই পরমসুখ পাবো, তো কেউ ভাবছে, না সমস্ত বিশ্বে আমাকে জনপ্রিয় হতে হবে, তবেই আমি পরমসুখ পাবো। কেউ ভাবছে কলার মাধ্যমে সেই পরমসুখ পাবো, তো কেউ ভাবছে সেই কলার থেকে নামযশ ধনাদি পেলে তবেই পরমসুখ পাবো, তো কেউ ভাবছে এই কলাবিদ্যা সমূহতে ডুবে গেলে তবেই পরমসুখ পাবো।
আবার অন্যত্র দেখো, কেউ ভাবছে পতিকে সুখী করতে পারলেই পরম সুখ, কেউ ভাবছে সন্তানকে নিজের মত চালাতে পারলেই পরমসুখ, কেউ ভাবছে পতি সন্তানকে নিজের অধীনে স্থাপিত করতে পারলেই পরম সুখ, আবার একই ভাবনা পুরুষ ভাবছেন পত্নীকে নিয়ে। কেউ ভাবছেন নিজের স্থানে থাকলেই পরমসুখ, আবার কেউ ভাবছেন এদিক সেদিক না ঘুরে বেড়ালে কনো সুখই নেই।
পোশাকআশাক, বিছানা আসবাব, আহার নিদ্রা, নাম যশ, ধন, প্রতিষ্ঠা, সাহিত্য, কলা, এমনকি ধর্মসমুদয়ের সাথে যুক্ত হওয়া, এবং নির্দিষ্ট সাম্প্রদায়িক আচার অনুষ্ঠানকে মান্যতা দেওয়া বা না দেওয়া, উভয়তেই থাকে একটিই ভাবনা- পরম সুখের প্রাপ্তি।
সঙ্গীতে হোক, রাজনীতিতে হোক, কুটনীতিতে হোক, সাম্প্রদায়িক যুক্তকরণেই হোক, ক্রীড়াতেই হোক বা সংসারেই হোক, বা বাহ্যে, প্রস্রাব, বমন বা যৌনতাতেই হোক, সমস্ত কিছুতেই সকলে যুক্ত থাকেন সেই পরম সুখের কামনার জন্যই।
হ্যাঁ, একমুহূর্তে কেউ সংসার করাতেই পরমসুখ ধারণা রাখছেন, তো কেউ সংসার না করাতেই পরমসুখ মনে করছেন। সেই একমুহূর্তেই কেউ রাজনীতিতে যুক্ত থাকাকে পরমসুখ মনে করছেন, আবার কেউ রাজনীতিতে যুক্ত না থাকাকেই পরমসুখ মনে করছেন। সেই সময়তেই কেউ যৌনসুখই শ্রেষ্ঠ সুখ মনে করছেন, আবার কেউ যৌনসুখ সর্বনাশা নেশা জেনে, তার থেকে দূরে থাকছেন। সেই সময়তেই কেউ মাদক সেবনেই পরম সুখ মনে করছেন, তো অন্য একজন মাদক সর্বনাশা মনে করে তার থেকে দূরে থাকাকেই পরম সুখ মনে করছেন।
সেই একই মুহূর্তে, কেউ ধন উপার্জনেই, নাম উপার্জনেই, যশ প্রতিপত্তি উপার্জনেই পরমসুখ জ্ঞান করে, হন্যে হয়ে ধনের পিছনে ছুটছেন, তো কেউ বলছেন কামিনী কাঞ্চনই জীবনকে বিনষ্ট করে দেয়, এদের থেকে দূরে থাকাতেই পরমসুখ, এমন ধারণা রাখছেন। তাহলে পুত্রী, বিভিন্নতা কোথায়? বিভিন্নতা তো কেবলই বাহ্যিক, লোকদেখানি! বাস্তবে তো কনো ভিন্নতাই নেই।
ধনসর্বস্বও যা করছেন, দরিদ্রও যা করছেন, পুরুষও যা করছেন, স্ত্রীও যা করছেন, দেহবাণিজ্যিকও যা করছেন, সাধকও যা করছেন, ক্ষমতালোভী রাজনেতাও যা করছেন, আর ক্ষমতাবিদ্বেষী কবিও যা করছেন, যৌনসুখে আসক্তও যা করছেন, যৌনসুখ থেকে পলাতকও যা করছেন, মাদকে আসক্তও যা করছেন, মাদকত্যাগীও যা করছেন, শিশুও যা করছেন, বৃদ্ধও যা করছেন- বলো আমায় পুত্রী, কার মানসিকতা কার থেকে ভিন্ন! কে এমন আছে, যে পরমসুখ ব্যতীত অন্যকিছু চাইছেন!
মনুষ্য ছাড়ো, অন্য সমস্ত জীবদের দেখ, তারাও তো যা কিছু করছে, সমস্ত সেই পরমসুখের জন্যই করছে! গরু হরিণ হাতি জিরাফ জেব্রা সেই পরমসুখের কারণেই তৃণ খাচ্ছে, নিদ্রা যাচ্ছে, সংগ্রাম করে যৌনক্রিয়াতে লিপ্ত হচ্ছে। সেই একই পরমসুখের চিন্তা তো শিকারি জীবও করছে। সেই একই সুখের কামনা করছে মৎস্য, ছোট বড় সকল মৎস্য, সকল জলচর, সকল উদ্ভিদ, সকল খেচর, সকল কিট, পতঙ্গ, ভুজঙ্গ। তাহলে ভেদ কোথায় পুত্রী! এ তো প্রত্যক্ষ প্রমাণ যে সকলেই পরাচেতনার থেকে পরমসুখ লাভ করেছে আর সেই পরমসুখকেই আবারও খুঁজছে।
ছেড়ে দাও জীবদের কথা, জীবদের অন্তরের পঞ্চভূত, দেহ, মন, বুদ্ধি, প্রাণ ও উর্জ্জা, তারাও তো সেই পরমসুখেরই সন্ধান করে চলেছে! আর সকলের আত্ম, সকলের আমিত্ব, সকলের অহম! সেই একই পরমসুখের চিন্তনই তো সে সর্বক্ষণ করে চলেছে। … তাহলে ভেদ কোথায় পুত্রী!
হ্যাঁ, আমরা একাকজন একাক ভাবে সেই পরমসুখ খুঁজছি, কিন্তু সেটাই তো আমাদের স্বভাব, তাই না! পুলিশের রেড হলে কি তারা সকলে মিলে একজায়গাতেই তল্লাসি করে, নাকি ঘরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পরে, তারা আলাদা আলাদা স্থানে সন্ধান অনুসন্ধান চালায়! হ্যাঁ, আমরা সংসারে খুঁজি সেই পরমসুখ। যখন খুঁজে পাইনা, তখন খেলার মাঠে চলে যাই। জন্মের পর জন্ম সেখানে খুঁজে না পেলে, চলে যাই যুদ্ধ অঙ্গনে। জন্মের পর জন্ম সেখানেও পরমসুখের সন্ধান করি। না পেলে চলে যাই কলাশিল্পে। সেখানেও জন্মের পর জন্ম অনুসন্ধান করি। সেখানেও যখন তা পাইনা, তখন চলে যাই রাজনীতিতে। সেখানেও জন্মের পর জন্ম খুঁজে না পেলে, চলে যাই সাহিত্যে। সেখানেও না পেলে, চলে যাই তত্ত্বকথাতে। সেখানেও পরমসুখ খুঁজে পাইনা, তাই চলে যাই সাধনায়। এই তো ভেদ পুত্রী। এই তো প্রমাণ যে আমরা সকলেই ভ্রাতা ও ভগিনী, আর তাই তো সকলে সেই একই পরমসুখের সন্ধান করে চলেছি।
হ্যাঁ, যিনি যেখানে সেই পরমসুখের সন্ধান করছেন, যতক্ষণ তিনি সেখানে সেই সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন, ততক্ষণ তিনি এমনই মনে করছেন যেন তিনি পরমসুখের সন্ধান পেয়ে যাবেন সেখানে। কিন্তু শেষমেশ তো সেই পরমসুখ প্রাপ্তি হলো না। তাই সে ভাবে, তাহলে সেই পরম সুখ প্রাপ্তির উপায় কি?”
