সাধন সত্য (অনুশাসন)
দিব্যশ্রী গদগদ হয়ে বললেন, “অন্তিম একটি প্রশ্ন মা। আমি সাধনের ভেদ জানতে চাই। কেন সেই সাধকদের কিচ্ছু হয়না, যারা ৩০ বৎসর, ৫০ বৎসর ধরে গুহাবাসী হয়ে তপস্যায় রত! কি করা আবশ্যক, আর কি ভাবে সাধনা হয় মা? আমি তা জানতে চাই? আমার মনে হয়ে, এর গুহ্য রহস্য আমার কাছে এখনো পরিষ্কার নয়। তাই এই ব্যপারে আমার ধারণাকে প্রশস্ত করো মা”।
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, আমাদের আত্মের তিনটি অবস্থা হয়, একটি আসক্তি, একটি বিরক্তি এবং একটি বৈরাগ্য। সাধারণ সংসারী মানুষ আসক্তিময় জীবনে রত থাকেন, তাই তাঁদের দ্বারা সাধন হয়না। গুহাবাসীরা বিরক্তির মধ্যে নিজেদের স্থাপিত রাখেন, তাই তাঁদেরও সাধন হয়না। আর যারা বৈরাগী, তারাই সদাশিক্ষার্থী, আর সাধন তাদের দ্বারাই সম্ভব হয়।
পুত্রী, প্রথম অবস্থায় আমরা কি করি? যা কিছু আমাদের আমিত্বের সাথে সংযুক্ত, তাই দেখি আমরা, তাই শুনি, আর তাই স্মরণ রাখি। যেমন দেখো, একটি অনুষ্ঠান বাড়িতে তুমি গেলে। সেখানে অনেক কিছুই দর্শনিয় ছিল, অনেক কিছুই শ্রবণীয় ছিল, কিন্তু তুমি কি কি শুনলে? কি কি দেখলে? যা যা, তোমাকে সম্মান করার জন্য বলা হলো, তোমাকে তিরস্কার করার জন্য বলা হলো, তোমার পছন্দের মানুষের সম্মানে বা অসম্মানে বলা হলো, তোমার অপছন্দের মানুষের সম্মানে বা অসাম্মানে বলা হলো, তাই তুমি দেখলে আর শুনলে।
যা তোমার কামনাকে, মদকে, অহমকে আকর্ষণ করার জন্য সম্মুখে দর্শনিয় বা শ্রবণীয় হলো, তুমি তাই তাই দেখলে, শুনলে, এবং স্মরণ রাখলে। আর অন্য সমস্ত কিছু, অর্থাৎ যা কিছুর সাথে তোমার অহমের কনো সম্পর্কই নেই, তোমার সম্মুখে হয়ে চলা সেই সমস্ত কিছুকে না দেখলে, না শুনলে আর না স্মরণ রাখলে।
এর ফলে কি হলো? তুমি তোমার অহমকে নিয়েই ব্যস্ত রইলে। সম্মান এলে মদাচ্ছন হলে, কটু সত্য সম্মুখে এলে লজ্জান্বিত হলে, অসত্য শ্রবণে ক্রোধান্বিত হলে, অসম্মানিত হলে দ্বেষ ও শঙ্কায় আচ্ছন্ন হলে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এই হলো সাধারণ মানুষের ভাব পুত্রী। আর এই ভাবের কারণ হলো অহমচিন্তা। অহম অর্থাৎ আত্ম অর্থাৎ আমি’র চিন্তা। আমার সুখ, আমার দুঃখ, আমার বেদনা, আমার আহ্লাদ, আমার সখ, আমার অপছন্দ, আমার অপমান, আমার নিন্দা, আমার প্রশংসা, ইত্যাদি ইত্যাদি।
অহম, অর্থাৎ আমিত্ব, অর্থাৎ আমি একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, যার সুখদুঃখই তা, যা প্রভাবিত করে আমাকে, এই বোধই হলো সাধারণ মানুষের বোধ। আর এই বোধের কারণে সর্বক্ষণ সাধারণ মানুষ নিজের অহমের অর্থাৎ আত্মের প্রতিষ্ঠার চিন্তা করে ফেরে। আর সেই কারণেই অপমানকর কথাতে বা দৃশ্যতে, কি বলে মানুষ? আমার আত্মায় লেগেছে কথাটা! যতবড় মুখ না ততবড় কথা!
আর কি বলে? আত্মদংশনে মরে যাচ্ছি, অর্থাৎ? সেই দৃশ্য বা কথা, আমাদের আত্ম অর্থাৎ আমিত্বকে দংশন করছে, আঘাত করছে, অর্থাৎ? অর্থাৎ আমাদের প্রতিষ্ঠা চোট প্রাপ্ত হয়েছে। আর কি বলি আমরা? আমাদের আত্মা চেয়েছে, অর্থাৎ? অর্থাৎ সেই চাওয়া আমাদের আত্মার প্রতিষ্ঠাকে সম্মানিত করবে, আর তাই তার কামনা রেখেছে আমাদের আত্ম বা আত্মা।
এই হলো আসক্তির পর্ব পুত্রী, যেখানে আমরা যা কিছু করি, তাতে সর্বক্ষণ আত্মের প্রতিষ্ঠার প্রতি আমরা আসক্ত থাকি, আমার আত্ম যাতে সন্তুষ্ট হয়, প্রতিষ্ঠিত থাকে, সম্মানিত থাকে, লোকপ্রিয় থাকে, ইত্যাদি ইত্যাদি। যখন যখন এই প্রতিষ্ঠার বৃদ্ধি হয়, তখন তখন আমাদের মধ্যে মোহ, মদ, কুল, শিলের জন্ম হয়। আবার যখন যখন এই প্রতিষ্ঠা লাভের সম্ভাবনা আমাদের সম্মুখে এসে যায়, তখন লোভ আসে, আর যেই যেই অন্য আত্মরা একই দিশায় চালিত, তাঁদের পতি আসে ক্রোধ, ঈর্ষা, দ্বেষ, শঙ্কা আর চরম অবস্থায় হিংসা। আবার যখন প্রতিষ্ঠা লাভ অসম্ভব হয়ে যায়, তখন আসে হতাশা।
পুত্রী, এঁদের মধ্যেও তারতম্য থাকে। কেমন? যেমন একাক আত্মের প্রতিষ্ঠার ছেত্র একাক রকম হয়। অনেকের হয়, কেবল স্বয়ংকে নিয়ে, অর্থাৎ কেবলই রক্তমাংসের এ আমিকে নিয়েই তাঁর চিন্তা। আবার অন্য কারুর হয়, নিজের পরিবারকে নিয়ে চিন্তা, অর্থাৎ এঁর আমিত্ব কেবল নিজের রক্তমাংসের দেহ নয়, এঁর পরিবারও এঁর আমির মধ্যে এসে যায়। এখানেও ভেদ থাকে। পরিবারের মধ্যে কিছু কিছু ব্যক্তি থাকেন, যারা তাঁর আত্মের প্রতিষ্ঠাকে নিজেদের আত্মেরই প্রতিষ্ঠা জ্ঞান করেন। এঁরাই হন তাঁর পরিবার।
অর্থাৎ যদি এক পিতার ৪ সন্তান থাকেন, এবং পত্নী থাকেন, আর এঁদের মধ্যে একটি সন্তান ও পত্নী তাঁদের পিতার কর্মকাণ্ডে তৃপ্ত নন, তখন সেই ব্যক্তির পরিবারের মধ্যে পত্নীর আত্মিক প্রতিষ্ঠা আর সেই সন্তানের আত্মিক প্রতিষ্ঠা অবস্থান করেনা।
আবার কিছু আত্ম হন, যাদের আত্মের চৌহদ্দি আরো একটু বিস্তৃত হয়। এঁরা কিছু কিছু ব্যক্তিকে বা দলকে বেছে নেন, আর তাঁদের প্রতিষ্ঠাকেই নিজের আত্মিক প্রতিষ্ঠা জ্ঞান করেন। আবার অন্য ক্ষেত্রে, এই ব্যপ্তি একটু বড়ও হয়। তাঁরা পরিবারের সাথে সাথে বন্ধুমহলকেও এঁর সাথে সংযুক্ত রাখেন। আবার অনেকে এমনও হন যে পরিবারের স্থানে বন্ধুদের সম্মিলিত রাখেন, এই আত্মিক প্রতিষ্ঠার চৌহদ্দিতে।
কখনো কখনো, এটি সমাজ বা ক্লাব পর্যন্ত যায়, আবার কখনো কর্মক্ষেত্র পর্যন্তও যায়। আরো বৃহৎ অবস্থায়, রাজ্য বা সমুদায় পর্যন্ত ব্যপ্ত হয় এই চৌহদ্দি, অর্থাৎ রাজ্যের বা সমুদায়ের কারুর আত্মিক প্রতিষ্ঠা লাভ হলেই, ইনার আত্ম প্রতিষ্ঠিত হন। আর এর থেকে বৃহৎ ক্ষেত্রে, ইনার আত্ম দেশ বা যোনির ক্ষেত্রেও বিস্তারিত হতে পারে। পুত্রী, অন্য সমস্ত ক্ষেত্রের কথা তো নিশ্চয়ই বুঝে গেছ, কিন্তু এই শেষ দুই, অর্থাৎ জাতির উত্থান বা সমুদয়ের উত্থান, বা রাজ্যের কারুর উত্থান, বা যোনির কারুর উত্থানে নিজের প্রতিষ্ঠাকে চিহ্নিত করেন, এমন ব্যক্তির উদাহরণ দিতে পারো?”
দিব্যশ্রী বললেন, “মা, কবি সাহিত্যিকরা আছেন এই সমুদয়ের বা জাতির বা যোনির উত্থানের ক্ষেত্রে। … কিন্তু মা, আমি একটি ব্যাপার বুঝতে পারছিনা, অবতারদেরও তো অহমিকা থাকে। কারুর ৯২ শতাংশ, তো কারুর ৭০ শতাংশ, আমার পিতা তো ব্যতিক্রমী, তাঁর কথা না বললামই না, কিন্তু যারা ব্যতিক্রম নন, তাঁদেরও তো অহংকার থাকে, প্রতিষ্ঠার চিন্তা থাকে, তাঁদের অহংকারের ব্যাপ্তি ঠিক কি?”
ব্রহ্মসনাতন বললেন, “ইনাদের কথাতে আমি এখনো আসিনি পুত্রী, প্রথম আমাকে বলো এই আসক্তদের মনোভাবের কথা কি জানলে?”
দিব্যশ্রী বললেন, “মা, এঁদের সম্মুখে যাই দর্শনিয় বা শ্রবণীয় আসুক, এঁরা তাই দেখে, তাই শোনে, যা এঁদের আত্মের প্রতিষ্ঠার সাথে সম্বন্ধনিয়, অর্থাৎ যা তাঁর আত্মের চিন্তা, ইচ্ছা বা কল্পনাকে হয় আঘাত করে, নয় বিস্তার করে, এঁরা তাই শ্রবণ করে, তাই দরশন করে, আর তাই স্মরণ রাখে, কারণ এঁরা নিজেদের আত্মের প্রতি প্রবল ভাবে আসক্ত। … আর বুঝলাম যে, এঁদের আত্মের বিভিন্ন প্রকার বিস্তার থাকে, কারুর হয় আত্মসর্বস্ব, তো কারুর কারুর আরো বিস্তৃত, কিন্তু বিস্তৃত যতই হোক, এমন কখনই নয় যে, তিনি আত্মসর্বস্ব নন, অর্থাৎ আত্মসর্বস্বের প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে, আরো কিছু জিনিসের সংযোজন থাকে”।
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “বেশ পুত্রী, এবার আমি দ্বিতীয় প্রকার মানুষের কথা বলবো। এঁরা হলেন বিরক্ত। এঁরা কি করেন? এঁরা হয় গ্রন্থ নয় গুরু নয় এইরূপ কনো বাহ্যিক প্রভাবে এসে আত্ম প্রতিষ্ঠার প্রতি বিরক্ত। কিন্তু অন্য সমস্ত কিছুর প্রতি বিরক্তি তো তাঁর পূর্বেই ছিল, অর্থাৎ আত্ম প্রতিষ্ঠা ব্যতীত অন্য কিছু দেখার থেকে সে সর্বক্ষণ বিরতই ছিল, এবার সে আত্ম প্রতিষ্ঠা নিয়ে দেখতেও বিরক্ত।
সাধারণত গুরু বা গ্রন্থের প্রভাবে এমন হলেও, আরো একটি প্রভাবে এমন হয় ব্যক্তি, আর তো হলো বিফলতা। নিজ কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছার প্রসারের প্রয়াসে, যখন ব্যক্তি বারংবার বিফল হতে থাকেন, তখন তিনি যা দেখতেন না, যা শুনতেন না, যা স্মরণ রাখতেন না, তা তো দেখলেনই না, শুনলেনই না, আর স্মরণও রাখলেন না, সঙ্গে সঙ্গে, নিজের আত্ম সংক্রান্ত যা কিছু দেখতেন, যা কিছু শুনতেন, আর যা কিছু স্মরণ রাখতেন, এবার তাও রাখা বন্ধ করে দেন, বিরক্তির প্রভাবে।
তবে কি করেন তিনি! তিনি যেই কারণেই হোক, তা নিজের অসুস্থতার কারণেই হোক, বা কারুর তিরস্কারের কারণেই হোক, আর যেই কারণেই হোক, নিজের কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছাকে স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছেন, সেই কল্পনা চিন্তা ও ইচ্ছাকে স্থাপন করার জন্য উদ্ভ্রান্তের মত আচরণ শুরু করেন। ইনি ভাবতে থাকেন, ইনার আমিত্বের নাশ হয়ে গেছে, কিন্তু ইনার আমিত্ব পূর্বের থেকেও ভয়ানক হয়ে গেছে।
পূর্বের আমিত্ব বা অহংকারে, সে যত অধঃপতনেই যাক না কেন, আমি কখনো তাঁদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিই না, বরং যাতে তাঁরা আনন্দ পাচ্ছে, তাই দেখতে থাকি, আর শিশুর ক্রিয়া জেনে হাসি। কিন্তু এই বিরক্তদের থেকে আমি মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হই, কারণ এঁরা হট ধারণ করে অবস্থান করে। এঁরা অত্যন্ত একগুয়ে হয়ে, আর অজ্ঞানতাকে আধার করে জেদ ধারণ করে থাকে, তাই আমি এঁদের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিই।
সংসারে থাকলেও, এঁরা এঁদের এই একগুয়ে মানসিকতার কারণেই সকলের থেকে নিজেদের আলাদা করে নেন, আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে, এঁরা সংসারের বাকি মানুষ, যারা আসক্ত, তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ ধারণ করে, সংসার ত্যাগ করে, গুহাবাসী হয়ে যান। কিন্তু একটি জাতি আছে, যেই সম্পূর্ণ জাতিটিই এমন, বলতে পারো, তার নাম কি?”
দিব্যশ্রী খানিক চিন্তা করে বললেন, “সঠিক কিনা জানিনা, তবে ব্যাখ্যা শুনে মনে হচ্ছে যেন আর্য। এঁরা একই মনোভাব নিয়ে নিজেদের বাসস্থান অর্থাৎ পশ্চিম গান্ধার ছেড়ে এখানে এসে সিন্ধুতীরে অবস্থান করে, সেই নিজের জেদকে স্থাপন করারই প্রয়াস করে গেছে, আর তা করার জন্য শতপ্রকার ছলনাকেও গ্রহণ করেছে, আর মনে মনে নিজেদের এই অজ্ঞানতা পূর্ণ, বাচালের ন্যায় কর্মপ্রয়াসকে নিজেরাই কুর্ণিশ করে করে, নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করে গেছে”।
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “হ্যাঁ, সঠিক বলেছ পুত্রী, আর এই কারণেই আমি এঁদের থেকে মুখ সরিয়ে নিয়েছি।…. এঁরা না তো বাহ্যসত্যকে দেখে, শোনে আর না নিজের ব্যাপারে সত্যকে জানে, কেবল নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য, যেকোনো প্রকার ছল করতে থাকে এঁরা, নয়তো একস্থানে জেদ ধরে বসে থাকে। আর এঁদের স্বভাব হলো, এঁরা যা কিছু করে, সেই কাজকেই সঠিক বলে মানতে থাকে, বিনা পরামর্শে, বিনা বিচারে এবং বিনা মার্গদর্শনে।
পুত্রী, তুমি প্রশ্ন করলেনা, কেন গুহাবাসীদের বছরে পর বছর চলে যায়, তাও কিছু হয়না, কারণ হলো এই অন্ধত্ব। এঁরা পূর্বে যেমন কনো কিছু দেখতেন না, তেমন দেখেন তো না-ই, উপরন্তু নিজের প্রতিষ্ঠা পাবার জন্য যেই লম্ফঝম্প আগে করতেন, তাও করেন না। তাই এঁদের কনো প্রকার উন্নতি হতে পারেনা।
আর এই সমস্ত কিছুর শেষে আসে তাঁরা যারা বৈরাগী। বৈরাগী মানে কি? আর্যরা এঁর বিকৃত অর্থ সমাজে স্থাপিত করে রেখে দিয়েছেন যে, বৈরাগ্য মানে বিরক্তি, কিন্তু এই কথন সম্পূর্ণ ভাবে ভিত্তিহীন ও অসত্য। বৈরাগী তিনি যিনি না তো কিছুর প্রতি আসক্ত আর না কিছুর প্রতি বিরক্ত। অর্থাৎ যিনি আসক্তি ও বিরক্তি, উভয়েরই ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন, তিনিই হলেন বৈরাগী।
তুমি অবতারদের কথা বলছিলে না, ইনাদের অহম এই বৈরাগী হয়ে বিরাজ করে। এঁদের বিশেষত্ব কি? এঁরা নিজেদের আত্মের সাথে সংযুক্ত কনো কিছুর দিকে তাকায় না। কনো কিছু দৃশ্য, কথা ইত্যাদি যদি আত্মের সাথে সংযুক্ত হয়, তাহলে যেই মুহূর্তে তাদেরকে আত্মের সাথে সংযুক্ত বলে তাদেরকে চিহ্নিত করে, সেই মুহূর্তে সেই দৃশ্য দেখা থেকে, বা সেই কথা শ্রবণ করা থেকে প্রতিহত হন ইনারা, আর সেই কথন বা দৃশ্যকে নিজেদের স্মৃতিপটে স্থাপিতও হতে দেন না।
অন্যদিকে, আত্মসম্বন্ধনিয় যা কিছু নয়, অর্থাৎ প্রকৃতি তাঁদের সম্মুখে যা কিছু আনেন, তাকে তাঁরা দেখেনও, শোনেনও আর স্মরণও রাখেন। আর এর ফলে কি হয়? এর ফলে, এঁদের কাছে প্রকৃতি তাঁদেরকে যা কিছু শিক্ষা দেন, জীবন সম্বন্ধে, সৃষ্টি সম্বন্ধে, বা ঈশ্বর সম্বন্ধে, এঁরা তাই শেখেন, আর কারুর শেখানো বুলি পাঠ করে, তাকেই সত্য বলে মানেন না, আবার কারুর কথাকে অবমাননাও করেন না, বিনা বিচার করে।
এই তৃতীয় ভাবের কারণে, অবতাররা ও সেই ধারার সাধকরা সম্যক শিক্ষাও গ্রহণ করেন, আর সংসার ত্যাগীও হননা। এঁরা কারুর প্রতি বিরক্ত নন, আবার কারুর প্রতি আসক্তও নন। এঁরা প্রতিষ্ঠা লাভ করেন, কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠা লাভ করার জন্য কিছু করেন যে, তা নয়। যেহেতু এঁদের অহম ৯২ থেকে ৭০ শতাংশ অবশিষ্ট থাকে, আর আমিও তাঁদের অন্দরে ৮ থেকে ৩২ কলা ধারণ করে অবস্থান করি, তার কারণে এঁরা প্রতিষ্ঠা পান, অর্থাৎ আমার থেকে শিক্ষা লাভ করেন, আর সেই শিক্ষাকে নিজের অহম দ্বারা প্রতিষ্ঠা করার কারণে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
আর আমাকে লাভ করেন কি ভাবে? সর্বক্ষণ নিজের অহম থেকে নিজের মনকে অপসারিত করে, সর্বক্ষণ আমি প্রকৃতি, সময় বা পরিস্থিতি অর্থাৎ নিয়তিবেশে যা কিছু সম্মুখে নিয়ে আসি এঁদের, তাকে বিনা আসক্তি ও বিনা বিরক্তি দ্বারা শিক্ষার্থীর নজর দ্বারা পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন এঁরা। আর সেই শিক্ষাই যে যথার্থ শিক্ষা। তাই তাঁরা আমাকে ধারণ কর্তে সক্ষম হন।
পুত্রী, পুস্তকের সামর্থ্য নেই সত্যকে ধারণ করে বা ব্যাখ্যা করে, কনো বচনেরও সেই সামর্থ্য নেই। সেই সামর্থ্য কেবল ও কেবল আমার আছে, কারণ আমি স্বয়ং জ্ঞান। আর তাই আমার কারণ রূপ প্রকাশ, অর্থাৎ নিয়তি বা যাকে তোমরা বলে থাকো পরিস্থিতি, সূক্ষ্ম প্রকাশ অর্থাৎ সময়ের নিয়ন্তা অর্থাৎ মহাকালী, এবং স্থূল প্রকাশ অর্থাৎ প্রকৃতিই যথার্থ জ্ঞান প্রদান করে।
যিনি, নিজের অহমের প্রতিষ্ঠা চিন্তা থেকে জাত ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার থেকে মুখ সরিয়ে, আমার এই তিনরূপের দিকে তাকায় ও সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, তিনিই যথার্থ জ্ঞানী হয়ে ওঠেন, আর তিনিই আমার সম্পূর্ণ প্রকাশসম্ভব ৯৬ কলার মধ্যে, ৮ থেকে ৩২ কলাকে ধারণ করতে সক্ষম হন, এবং যথার্থ ভাবে সাধক হয়ে মোক্ষ লাভ করতে সক্ষম।
পুত্রী, যে যতই নামজপ করুক, যে যতই মনঃসংযোগ করুক, যে যতই গ্রন্থ পাঠ করুক, যে আমার থেকে জ্ঞান লাভ করেনা, সে কখনই জ্ঞান লাভ করতে পারেনা, কারণ জ্ঞান আমার থেকে ছাড়া কারুর থেকে লাভ করা সম্ভবই নয়। আর আমার থেকে জ্ঞান ধারণ করার জন্য আমি কখনো কখনো অবতাররূপ ধারণ করে থাকি, কখনো কখনো মিরা, রামপ্রসাদ, আনন্দময়ী, সারদার মত সাধকের অন্তরে কলাবেশে থাকি, আর যখন এই অবস্থাতেও থাকিনা, তখনও সর্বক্ষণ থাকি, প্রকৃতি বেশে, সময়ের চালকের রূপে, আর পরিস্থিতি অর্থাৎ নিয়তি রূপে।
যিনি আমার এই সমস্ত রূপ ত্যাগ করে, গন্থে আমাকে খুঁজতে যায়, নামে আমাকে খুঁজতে যায়, ধামে আমাকে খুঁজতে যায়, গুহায় বসে নিজের অহমের মধ্যে আমাকে খুঁজতে চায়, যেই সাধক আমার কনো কলা লাভ করেন নি, তাঁর বচনে আমাকে খুঁজতে যায়, সে কখনোই আমাকে লাভ করেনা, কখনোই সত্য লাভ করেনা, কখনোই সত্যজ্ঞান লাভ করেনা, আর কখনোই মোক্ষ লাভ করেনা।
পুত্রী, প্রতিটি অবতারকেই দেখবে তাঁদের কথনে অজস্র উদাহরণ দেন প্রকৃতির, সময়ের ও নিয়তির। কেন এমন করেন? কারণ যখন তাঁরা দেহধারণ করে থাকবেন না, তখন এই তিনই তাঁদেরকে শিক্ষা প্রদান করবেন। সকল অবতার সঙ্গীতের সুরের সাধন করান, কেন? কারণ এই সুরকলা যে আমারই প্রকাশ। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে, প্রকৃতিকে ভারসাম্যে রেখে পরিস্থিতিকে প্রবাহিত হতে দেওয়াই হলো সঙ্গীত। তাই সঙ্গীতের সুরেই আমার প্রবাহ, সঙ্গীতের শব্দে নয়, শুধুই সুরে।
যিনি এই সমস্ত যথার্থ শিক্ষালাভের স্থান থেকে বিরক্তিসুলভ ভাবে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন, তিনি যতই গ্রন্থপাঠ করুন না কেন, যতই মনঃসংযোগ করুন না কেন, যতই নামজপ করুন না কেন, যতই কীর্তনাদিতে নাচানাচি করুন না কেন, আর যতই এইসমস্ত করে, ‘আমি’, ‘আমি’ করুক না কেন, কনোকিছুতে কনো ফল লাভ হয়না।
আর অন্যদিকে যিনি এই তিন উপায়-এর দিকে সদা দৃষ্টি রাখেন, এবং প্রকৃতি, নিয়তি তথা সময়ের থেকে সর্বক্ষণ শিক্ষা গ্রহণ করে চলেছেন, তাঁর এই একাগ্রতাপূর্ণ শিক্ষাগ্রহণের ভাবই বিবেকের জন্ম দেয়, আর বিবেকের জননী আমি, তাই বিবেকের সাথে সাথে আমিও চেতনারূপে তাঁর মধ্যে প্রকাশিত হতে বাধ্য। আর যেখানে আমার অবস্থান অর্থাৎ যার হৃদয়ে চেতনার ভাবাবেগ ঘটেগেছে, তাঁর তো কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছার হাতে হাতকড়া পরে গেছে, কারণ তাঁরা কিছুতেই আমার সম্মুখে আসবে না, আসলেই যে বিচার বিবেক তাঁদের পর্দা ভেদ করে দেবে, আর আমার সম্মুখে পরলেই, সম্পূর্ণ ভাবে ভস্ম হয়ে যাবে তারা।
তাই পুত্রী, যথার্থ সাধক হবার জন্য, নামজপ, কীর্তন, গ্রন্থপাঠ ইত্যাদি সমস্ত উৎসেচক হলেও, এরা একাকী কিছুই করতে পারেনা, যতক্ষণ না অহমের প্রতিষ্ঠা চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে, প্রকৃতি, সময় ও পরিস্থিতি বা নিয়তির থেকে শিক্ষালাভ নিয়ে তার বিচার করা হচ্ছে। তোমার ছাত্রছাত্রীদেরও যখন সাধনার সাথে পরিচিত করবে, তখন এই সত্যকে স্মরণ রাখবে। দেখবে, একাধিক সাধকের নির্মাণ হবে, আর এও দেখবে যে, এই সত্য সমাজে সাধনসত্য রূপে স্থাপিত করতে পারলে, আমার আর অবতারগ্রহণের প্রয়োজনই পরবে না, কারণ এমনি এমনিই সাধকও নির্মিত হবে, আর এমনি এমনি মোক্ষলাভও হতে থাকবে”।
