কৃতান্তিকা

দিব্যশ্রী এবার জিজ্ঞাসু হয়ে বললেন, “মা, সাহিত্য হলো সুষুম্না, যা প্রকৃতিকে গুরুরূপে মানার জন্য সহায়ক। আর বঙ্গভাষায়, এই সাহিত্য মহাউর্বর, তাই সাহিত্যের উপর নতুন করে কাজ করার কিচ্ছু নেই। গণিত হলো কুলকুণ্ডলিনী, যা সময়কে গুরুরূপে স্বীকার করায়। মা আরব্যদেশের ইসলাম জাতি ও বৌদ্ধরা এই গণিতকে সেই উচ্চতা প্রদান করেছেন, যার উপর আর নতুন করে কনো কিছু করার প্রয়োজনই নেই।

ইতিহাস ও ভূগোল হলো ইরা ও পিঙ্গলা। ইতিহাসের সার তুমি আমাকে ইতিমধ্যেই বলেছ। আমার প্রয়াস হবে, স্বয়ং বা আমার ছাত্রছাত্রীদের দ্বারা ইতিহাসের সেই গ্রন্থ নির্মাণ করার যা সমস্ত কৃতান্তিককে উন্নত ও সঠিক পথ প্রদর্শন করবে। আসল কথা এই যে ইতিহাস আর্য ও অনার্যদের সংগ্রামের কথাও বলেনা, তা বলে চেতনা ও অহংকারের সংগ্রামের কথা। চেতনার বারংবার উত্থান আর অহংকারের বারংবার সেই উত্থানের নাশ করা, এই হলো ইতিহাস। আর তুমি আমাকে যথেষ্ট কথা বলেছ এই ইতিহাস সম্বন্ধে, যার বলে কৃতান্তিকদের জন্য ইতিহাস গ্রন্থের নির্মাণ করা যেতেই পারে।

কিন্তু মা, একটি বিশয় নিয়ে আমার মনে এক দ্বন্ধের সঞ্চার হয়েছে। সূর্যের থেকে তাপের কারণে যদি পৃথিবী উত্তপ্ত হতো, তাহলে পাহারের চূড়ায় নয়, ভূমিতলে বরফ থাকতো। তোমার এই কথার বিচার করার কালে আমি দেখলাম যে, সার্বিক ভাবে সঠিক যুক্তি দিয়েছ তুমি, কারণ যদি সূর্যের তাপের কারণেই বরফ আর বরফশূন্যতা হতো, তবে তো পৃথিবীর থেকে দূরে যেই যেই গ্রহ স্থিত, তা তো সম্পূর্ণ বরফে ঢেকে থাকতো। কই বৃহস্পতি তো তেমন নয়, শনিও তো তেমন নয়!

অর্থাৎ, মানুষ যেই ভূগোল জানে, তার মধ্যে কোথাও না কোথাও গলদ আছে। মা, আমি তোমার থেকে সেই গলদখানি জানতে চাই। সেই গলদখানি জানতে পারলে, আমি বা আমার ছাত্রছাত্রীরা মিলে সেই ভূগোলের গ্রন্থও নির্মাণ করতে পারি, যা সমস্ত কৃতান্তিককে সঠিক মার্গ প্রদান করবে, আর সঠিক মার্গই হলো মোক্ষদ্বার স্থাপনের উদ্দেশ্যে যাত্রা। তাই মা, আমাকে যেই স্থানে গলদ আছে এই ভূগোলের, তা বলে দাও”।

ব্রহ্মসনাতন হাস্যমুখে বললেন, “পুত্রী, যা তোমার দেহে হয়, তাই এই জগতসংসারে হয়, কারণ এঁরা দুটিই, একই উপাদান অর্থাৎ একই পঞ্চভূত দ্বারা নির্মিত। যেমন, তোমার দেহের সমস্ত ভার সামলায় তোমার উর্জ্জা, অর্থাৎ তোমার অন্দরে স্থিত অগ্নি, তেমনই এই ধরিত্রী, এবং সমস্ত জগতের ক্ষেত্রেই, সেই একই ধারা।

যেই নক্ষত্র আকারকে অগ্নির বলয় বেশে দেখবে, জানবে সেই নক্ষত্র ভ্রূণ অবস্থাতে রয়েছে, যে একটিই মাত্র মূল উপাদান অর্থাৎ অগ্নিকে ধারণ করে অবস্থান করছে। যেই নক্ষত্রকে দেখবে সেই অগ্নির থেকে ধূম্র ত্যাগ করে, বায়ুমণ্ডলের নির্মাণ করছে, জানবে যে সেই অগ্নিবলয়ের অন্তরে ধরিত্রী অর্থাৎ মৃত্তিকাতত্ত্বের বিস্তার হয়েছে, যাকে সেই অগ্নি দহন করছে বলেই ধূম্র অর্থাৎ বায়ুর সঞ্চার হচ্ছে, যেমন সূর্য, আর এও জানবে যে তাঁর মধ্যে এই সবে প্রাণের সঞ্চার হচ্ছে, অর্থাৎ তাঁর প্রাণবায়ুর সঞ্চার হচ্ছে।

এরপরের অবস্থা হলো ধরিত্রীর নমনীয় রূপ, যেখানে অগ্নিকে আর বাইরে থেকে দেখা যায়না, যেমন অবস্থা বৃহস্পতি ও শনিগ্রহের এই মুহূর্তে। কেবলই সেই ধরিত্রীর অন্তরের অগ্নির থেকে বায়ু, অর্থাৎ দহন করা ধুয়া নির্গত হয়ে হয়ে, এক বলয়ের নির্মাণ হতে থাকে, এই গ্রহের আশাপাশে। শুধু বৃহস্পতি বা শনি নয়, নেপচুনও সেই দিশাতেই এখন অগ্রসর।

এরপরের অবস্থা হলো জলসঞ্চার অর্থাৎ বুদ্ধির সঞ্চার। সেই জলসঞ্চার হবার পূর্বে অগ্নির দ্বারা দহন করা ধরিত্রীর থেকে যেই বায়ুর সঞ্চার হয়, তা জমাট বাঁধতে শুরু করে, যেমন ইউরেনাসে হচ্ছে এইক্ষণে। এরপরবর্তী অবস্থা হলো, সেই জমাট বাঁধা জলকণা অর্থাৎ বাদলের থেকে অবিরাম বৃষ্টিপাত, অর্থাৎ বুদ্ধির স্থাপনকাল। পুত্রী, আমাদের এই ধরিত্রী, সেই কাল পেরিয়ে এসেছে, আর ইউরেনাস সেই কালের দিকে অগ্রসর এখন।

বিপুল জলধারার সঞ্চার হয়ে তা সঞ্চিত হয় এরপর এবং সাগরের রচনা করে। আর সেই জলধারা একটি ছেত্রে আবদ্ধ হয়ে যাবার কারণে, নক্ষত্রের বাকি অংশের ধরিত্রী কঠিন হতে শুরু করে, যেমন আমাদের মানুষের মধ্যে বা জীবদের মধ্যে অস্থির সঞ্চার হয়। জলধারা অর্থাৎ সাগর বা জীবের ক্ষেত্রে বুদ্ধি, তার প্রভাবে অগ্নির দহনের বায়ুর সাথে বুদ্ধি অর্থাৎ জলতত্ত্ব মিশে গিয়ে নির্মিত হয় জলবায়ুর, আর সেই জলবায়ুর থেকে বৃষ্টিপাত হতেই থাকে। আর এরই কারণে কঠিন ধরিত্রীরও বিভিন্ন স্থানে জলপাত্র হতে শুরু করে।

এরই মধ্যে, অন্তরের অগ্নি, কঠিন ধরিত্রী ও জলধারার কারণে বাইরে প্রকাশিত হতে না পারার কারণে, শুরু হয় অগ্নুৎপাত, যাকে আমরা ধরিত্রীর ক্ষেত্রে বলে থাকি অগ্নেয়গিরি, আর জীবদেহে বলে থাকি তিল বা আঁচিল। পুত্রী, যার অস্থি যত অধিক কঠিন, আর যার বুদ্ধি যত অধিক বিশাল, তার অন্তরের অগ্নির প্রকাশ হবার সম্ভাবনা ততই বেড়ে যায়, আর তাই তাঁর দেহে তত অধিক তিল লক্ষণীয়।

তেমনই ধারা ধরিত্রী বা নক্ষত্ররাজির ক্ষেত্রেও। আর এই সমস্ত অগ্নুৎপাতের কারণে, ধরিত্রীর কঠিন ভূমির বেশ কিছু অঞ্চল উন্নত হয়ে যায়, আর যা উন্নত হয়ে যায়, তা অন্তরের অগ্নির থেকে অধিক দূরে চলে যায়, আর তাই জলবায়ুর প্রভাবে সেখানে দেখা যায় তুষার। আর অন্যদিকে, এই বায়ুকে নিয়ন্ত্রণ কেবল জলরাশি করেনা, জলরাশির থেকেও অধিক নিয়ন্ত্রণ যা একে করে, তা হলো ধরিত্রীর অন্তরের অগ্নি, এবং জীবের দেহের অন্তরে উদরস্থিত অগ্নি বা উর্জ্জা।

আর তাই, সমস্ত বায়ুর গতিবিধি নির্ধারিত হয়, ঠিক ধরিত্রীর মধ্যদেশ থেকে, যাকে তোমরা ভূগোলের ভাষায় বলো নিরক্ষরেখা, বা ইকুয়েটর। এবার লক্ষ্য করে দেখ, ভূতাত্ত্বিকরা কিভাবে বায়ুর অপসারণকে দেখেছেন আর এঁকেছেন? ঠিক যেই ভাবে অগ্নির দ্বারা কনকিছুর দহন হলে, ধূম্রের গতি হয় তেমন। লক্ষ্য করে দেখো পুত্রী, একবার দক্ষিণে তা অপসারিত হয়, তো একবার বামদিকে, আবার দক্ষিণে তো আবার বাম দিকে। আর খেয়াল করে দেখ, যত অধিক দূরে যাচ্ছে সেই বায়ু নিরক্ষরেখা থেকে, ততই অধিক শীতলতা প্রসারিত হচ্ছে, কারণ ধরিত্রীর অগ্নির থেকে সেই ভূমি ততই অধিক দূরে স্থিত।

আর যেখানে শীতলতা সেখানে কি আছে? ভূমি আর তার উপর থাকা তুষার। তুষার মানে কি? জমে যাওয়া জলধারা, অর্থাৎ জমাট বুদ্ধি। আর শুধু এই নয়, এই বায়ু অপসারণ যেহেতু অগ্নিকে ধারণ করে অপসারিত হয়, সেহেতু দেখো যেই যেই স্থানে বায়ুর ধারা দক্ষিণ দিশা থেকে বাম দিশায় অপসারিত হয়েছে, সেখানে সেখানে জলধারার বিস্তার হয়, অর্থাৎ সেখানে সেখানে অধিক বৃষ্টিপাত হয়, বা মানুষের ক্ষেত্রে সেখানে সেখানে অধিক স্বেদবর্ষা হয়, আর সেখানে সেখানে ধরিত্রীর ক্ষেত্রে গহন অরণ্য বিরাজ করে, আর মানুষের ক্ষেত্রে সেখানে সুদীর্ঘলোমাবলি বিরাজ করে।

আর এই জলধারাই জলবাস্পের সাথে সম্মিলিত হয়ে, বারেবারে উচুউচু পর্বতের কাছাকাছি গিয়ে সেখানে তুষারে পরিণত হয়ে গেলে, সেই তুষারের ধারা যখন মাধ্যাকর্ষণের চাপে নিচে গড়িয়ে আসে, তখন তা গলে গিয়ে নদীর রচনা করে, আর এই ভাবে জলধারা সর্বত্র অর্থাৎ বুদ্ধি দেহের সর্বত্র স্থানে ছড়িয়ে গিয়ে, দেহকে ও নক্ষত্রকে বিভিন্ন আকারে পরিভাষিত করে।

কঠিন ধরিত্রীর থেকে প্রকাশিত কঠিন আগ্নেয়শিলার উপর এই বায়ু প্রভাব বিস্তার করে করে, তাকে ক্ষরণ করে করে, তাকে রূপান্তরিত শিলা বা মেটামরফিক পাথরে পরিণত করে, বায়ুর মধ্যে থাকা অগ্নি যা ধরিত্রীর অন্তর থেকে ধাতু ও খনি ধারণ করে আনে, তার প্রভাবে এই রূপান্তরিত পাথরের মধ্যে খনিজকে স্থাপন করে, এই পাথরের ক্ষেত্র অর্থাৎ মালভূমির স্থাপন করে।

আর এই ক্ষরণের সাথে সাথে নদীর ধারা ও প্রবল বৃষ্টিপাত পাথরকে ধুতে থাকলে, তাকে পাললিক শিলাতে পরিণত করে দেয়, এবং সেই শিলাদ্বারা এবং সেই শিলার থেকে জলের প্রভাবে ধুয়ে যাওয়া অংশ অর্থাৎ মৃত্তিকা থেকে নির্মিত হয় সমতল ভূমি, আর এই ভাবে সম্পূর্ণ ধরিত্রী নির্মিত হয়, এবং মানুষের ক্ষেত্রে নরম অস্থি।

পুত্রী, আজ এই যে ধরিত্রীখণ্ড অর্থাৎ পৃথিবী দেখছ, তা নিজের যৌবন অবস্থায় রয়েছে, আর আরো কিছু লক্ষ বৎসর এই যৌবনেই সে থাকবে। অতঃপরে, তারমধ্যে বার্ধক্য বৃদ্ধি পাবে, আর যেমন বার্ধক্যের সাথে সাথে, স্বেদ কমে যায় অর্থাৎ বর্ষার অভাব হয়, আর তারফলে সমস্ত উদ্ভিদ অর্থাৎ লোমাবলি অপুষ্টির কারণে শুভ্র হয়ে যায়, তেমনই ধরিত্রীর বুকের সমস্ত বৃক্ষরাজি নষ্ট হতে শুরু করবে, আর অনাবৃষ্টি দেখা দেবে জগতে।

ক্রমে ক্রমে যেমন বার্ধক্যকালে জীবের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং তাতে স্থিত কোষের নাশ হতে শুরু করে, সমস্ত শিরাউপশিরার রক্ত প্রবাহ শুকিয়ে আসতে শুরু করে, তেমনই ধরিত্রীর সমস্ত নদীনালাও শুকিয়ে যেতে শুরু করবে, সমস্ত অঙ্গেরন্যায় সমস্ত ভূখণ্ডের নাশ হবে, আর তাতে স্থিত সমস্ত যোনিরও নাশ হবে।

আর এমন অবস্থা বহুকাল থাকার শেষে, একসময়ে যেমন দেহের মৃত্যু হয়, তেমনই এই পৃথিবীরও মৃত্যু হবে, আর তারপর কোটি কোটি বৎসর এই দেহ পচনের জন্য অবশিষ্ট থাকবে, ঠিক যেমন আজ মঙ্গল গ্রহ, বুধ গ্রহ আর শুক্র গ্রহ যেই অবস্থা আছে, তেমন হয়ে যাবে।

পুত্রী, ততদিনে ইউরেনাস যোনি ধারণ করার অবস্থায় উন্নীত হয়ে যাবে, তাই সেখানে শুরু হবে নতুন যোনির আবির্ভাব, নতুন জনজীবন, আর নতুন প্রাণের হিল্লোল। এই ভাবেই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত কিছু চলমান।

পুত্রী, তুমি যেই ভূগোলের মধ্যে থাকা মানুষের ভ্রান্তির কথা বলছিলে, আশা করি, সেই কথার উত্তর তুমি পেয়ে গেছ। মানুষ ভূগোলের ব্যাখ্যা করার কালে, সূর্যকে আর চন্দ্রকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করে ভ্রান্তি করেছে, আর সেই ভ্রান্তির কারণেই ধরিত্রীর অন্তরের অগ্নির থেকেই যে সমস্ত ধরিত্রীর সাগর, পাহাড়, নদী, ঝিল, বন, জীবনের সঞ্চার; সেই অগ্নির কারণেই যে জলবায়ুর সঞ্চার, এই সত্য সম্বন্ধে ভুলে যায় সে।

পুত্রী, চন্দ্র হলো ধরিত্রীর পিতা, কারণ চন্দ্রের অন্তরের অগ্নির থেকেই পৃথিবী নিজের অগ্নি লাভ করেছে, আর সেখান থেকেই ধরিত্রীর মধ্যে জীবনের সঞ্চার শুরু হয়। অর্থাৎ চন্দ্রই ধরিত্রীর অহংকারের জনক, ধরিত্রী নিজের অহমকে চন্দ্রের থেকেই লাভ করেছে। আর সূর্যের সাথে ধরিত্রীর যোগসূত্র কি? পুত্রী, যখন ধরিত্রী চন্দ্রের সন্তান ছিল, আর চন্দ্র নিজের যৌবনকাল যাপন করছিল, তখন ধরিত্রী যেমন চন্দ্রের কাছে সূর্য ছিল, আজ সূর্য ধরিত্রীর কাছে সেই একই প্রকাশ, তবে সূর্যের জন্ম ধরিত্রীর থেকে হয়নি।

সূর্যের জন্ম হয়েছে পৃথিবী, মঙ্গল, শুক্র, বুধ, শনি, বৃহস্পতি, ইউরেনাস ও নেপচুনের থেকে। অর্থাৎ সূর্যের বহু পিতা, আর তার কারণে সূর্যের অগ্নিবলয় এতটাই বিশাল। একদিন এই ভ্রূণও শিশু হবে, একদিন এই শিশুও যুবা হবে, আর একদিন এই যুবাও বহুবহু যোনি ধারণ করে, মহাপ্রকৃতির স্বামী হয়ে অবস্থান করবে।

পুত্রী, ঠিক যেমন আমাদের দেহের আদি হলো আমাদের উর্জ্জা। সেই উর্জ্জার থেকেই ভ্রূণের সঞ্চার হয়; সেই ভ্রূণের থেকেই প্রাণের সঞ্চার হয়, আর সেই প্রাণের থেকেই বুদ্ধির সঞ্চার হয়, আর তা হবার পরে, ব্রহ্মাণু তাঁর সাথে যুক্ত হয়ে গেলে, তা একটি শিশুর আকার ধারণ করে, তেমনই অগ্নি বলয়ের থেকেই ভ্রূণরূপ ধরিত্রীর জন্ম হয়, এই দুইয়ের থেকেই রচনা হয় বায়ুর, আর এই তিনের থেকে নির্মিত হয় জলের, আর এই সমস্ত কিছু হয়ে চলে মহাকাশে, এবং মহাকাশের যেখানে তা অনুষ্ঠিত হয়, তা আর মহাকাশ থাকে না, তা সসীম হয়ে গিয়ে আকাশ হয়ে যায়।

পুত্রী, ঠিক যেমন যৌবনকালে সর্বাধিক তাপ অনুভূত হয়, এবং সর্বাধিক স্বেদ মুক্তি পায় আমাদের, তেমনই সমস্ত নক্ষত্রের ক্ষেত্রেও, তাদের যৌবনের ক্ষেত্রেই সর্বাধিক তাপ প্রবাহিত হয় এবং তাপমাত্রার বৃদ্ধি পায়, এবং সর্বাধিক বৃষ্টি হয়। ঠিক যেমন আমাদের বৃদ্ধাবস্থায় স্বেদ কমে যায়, আর আমরা রুক্ষ হয়ে যাই, তেমনই এই পৃথিবীও আজ থেকে প্রায় এক শত লক্ষ বছর পর থেকে রুক্ষ হতে শুরু করবে, এবং একদিন তার মৃত্যু অনুষ্ঠিত হবে।

পুত্রী, এই হলো ভূগোলের গলদ, যেমন আমাদের উর্জ্জাই আমাদের সমস্ত তাপ, স্বেদ, প্রাণের প্রবাহ, সমস্ত কিছুকে নির্ধারণ করে, তেমনই ভাবে পৃথিবীর সমস্ত কিছুকে পৃথিবীর অন্তরের অগ্নিই নির্ধারণ করে। বায়ুর নির্মাণ, বায়ুর গতি, সমস্ত কিছু ধরিত্রীর অন্তরের অগ্নিই নির্ধারণ করে। অর্থাৎ এই বহিরবিশ্বে যা কিছু দেখো পুত্রী, তা এই পঞ্চভূতেরই খেলা, এর অন্যথা আর কিচ্ছুই নয়, আর বাহিরের কেউ এঁদেরকে যদি প্রভাবিতও করে, তা হলো সাময়িক, যেমন পৃথিবীর বা অন্য নক্ষত্রের ক্ষেত্রে তা হলো উল্কাপাত। বাকি সমস্ত কিছু নিজের অন্তরেরই ক্রিয়া।

কেউ আমাদের বাইরে থেকে শীতলতা দিতে পারে, যেমন আমাদের পত্নী আমাদের শীতলতা দেয়, চন্দ্র পৃথিবীকে রাত্রির শীতলতা দেয়; কেউ আমাদের বাইরে থেকে সামান্য উষ্মা দেয়, যেমন পতি পত্নীকে উষ্মা দেয়, সূর্য ধরিত্রীকে উষ্মা দেয়, কিন্তু সাম্যক তেজ তাপ ও দেহব্যবস্থা যেমন আমাদের আহার, আর আহার থেকে লাভ করা পুষ্টিই প্রদান করে, তেমনই পৃথিবীর ক্ষেত্রে তাঁর অন্তরের তাপই তা প্রদান করে।

আর হ্যাঁ, এতে মানুষের কনো হাত বা নিয়ন্ত্রণ নেই। না তো মানুষের কনো ক্রিয়া পৃথিবীকে অধিক উত্তপ্ত করে, না শীতল করে। মনুষ্যের কীর্তি মনুষ্যকেই প্রকৃতিমুখর বা যন্ত্রমুখর করে, পৃথিবীর আবহাওয়ায় সামান্য পরিবর্তন করারও সামর্থ্যও নেই মানুষ বা অন্য কনো যোনির। তোমরা বল বৃক্ষরোপণ আর বৃক্ষছেদন! পুত্রী, তোমরা স্ত্রীরা তো সর্বক্ষণ নিজেদের লোমাবলির ছেদন করে ফিরছ, তার কারণে কি তোমাদের দেহের তাপমান বেড়ে যায়! … বাড়ে না তো! … ঠিক তেমনই ধরিত্রীর ক্ষেত্রেও, তোমাদের এই কীর্তির জন্য ধরিত্রীর তাপমাত্রায় কনো পরিবর্তন যে সম্ভব, তা মানুষের অহংকার ব্যতীত কিছুই নয়।

মানুষ মানুষের উন্নতি সাধন করতে পারে, মানুষ মানুষের অবনতি সাধন করতে পারে, ধরিত্রী ধরিত্রীর নিয়মেই চলে, যাতে মানুষ চেয়ে বা না চেয়ে, কিছু করতে সক্ষম নয়, কারণ ধরিত্রীর অন্তরের অগ্নি পর্যন্ত মানুষ বা কনো যোনি না তো কনো দিন পৌছাতে পেরেছে, আর না কনোদিন পৌছাতে পারবে। যদি কেউ সেখানে পৌছাতে পারে, আর সেই তাপমানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবেই ধরিত্রীর তাপমানকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, অন্যথা নয়।

বাকি সমস্তটাই বাণিজ্য বিস্তারের, বাণিজ্যের বাজার নির্ধারণের, এবং বাণিজ্যের গতিপরিবর্তনের খেলা মাত্র, যার কারণে এই সমস্ত অহংকারী শব্দের উচ্চারণ শ্রবণ করে থাকো যে, মানুষের আচরণের জন্য প্রকৃতির পরিবর্তন হয়ে থাকে। হ্যাঁ, ছত্রক ব্যবহার করে সূর্যের তাপ থেকে সাময়িক ভাবে রক্ষা পাওয়া সম্ভব, কিন্তু সূর্যের তাপ কমানো সম্ভব নয়। তেমনই বৃক্ষরোপণ বা জলাশয় নির্মাণ করলে, তা ছত্রকের কাজ করে, এবং মানুষকে সামান্য শান্তি দিতে পারে, কিন্তু এঁদের কনো কিছুর দ্বারাই পৃথিবীর তাপমানকে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব, এবং অবৈজ্ঞানিক।

বৃক্ষছেদন করে করে, ঝিলতালকে বুজিয়ে বুজিয়ে, মানুষ নিজেকে সত্য অভিমুখী না করে, নিজেকে যন্ত্র অভিমুখী ও ধনঅভিমুখী করে তুলে, নিজের যোনিকে অবলুপ্তির পথে নিয়ে যাচ্ছে, পৃথিবীর কেশাগ্র স্পর্শ করার সামর্থ্য মানুষের না তো কনো কালে ছিল, আর না কনো কালে তা হবে। হ্যাঁ পুত্রী, যতই মানুষ ধনঅভিমুখী হচ্ছে, যতই মানুষ মোক্ষের উপায় রূপে ভণ্ডামিসুলভ নামকীর্তনকে ধারণ করছে, এবং নিজেদের ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনাকে বরণ করতেই থাকছে, ততই মানুষ নিজের অস্তিত্বকে, নিজের যোনির অস্তিত্বকে সঙ্কটের দ্বারে স্থাপন করছে, এর অধিক কিছুই নয়।

হ্যাঁ, মানুষ যাতে নিজের যোনিকে রক্ষা করতে পারে, তার উপায় আমি কৃতান্ত ও কৃতান্তিকাতে ব্যক্ত করে, তোমার কাছে অর্পণ করলাম তা। যদি মানুষ এই সত্যকে ধারণ করতে পারে, সাধন করতে পারে এই সত্যকে, তবে মানুষ নিজের যোনিকে দীর্ঘায়ু করতে সক্ষম হবে, নাহলে, মানুষ যোনির আয়ু আর ১ হাজার বৎসরও নেই”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43