কৃতান্তিকা

দিব্যশ্রী মৃদু হেসে বললেন, “আর কি জানবো মা! … আর জানতে চাইলে, তুমি আরো জানাবে, তা আমি জানি। তুমি যে স্বয়ং জ্ঞান, তাই তোমার অজ্ঞাত যে কিছুই নেই। … তবে আর জ্ঞান আমার কাছে বিলাসিতা হয়ে যাবে বলে আমার মনে হচ্ছে। … তবে মা, একটি বিষয়ে আমার এবার কিছু বলার ইচ্ছা হচ্ছে। … যদি অনুমতি দাও, তাহলে বলি!”

ব্রহ্মসনাতন মৃদুহাস্যে সম্মতি দিলে, দিব্যশ্রী বললেন, “মা, ঈশ্বরের ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়াস কেবলই অহেতুক কালক্ষয়, কারণ ঈশ্বর যে অসীম, অনন্ত, অব্যাক্ত। … তবে মা, ঈশ্বরকে আরো এক ভাবে লাভ করা সম্ভব, আর তা হলো মা। … তিনি যখন ঈশ্বর, তখন অব্যাক্ত, কিন্তু তিনি অত্যন্ত ভাবে ব্যক্ত যখন তিনি মা, কিন্তু তাও সেই মা বেশেও, তাঁর ব্যাখ্যা সেই অসীমই থেকে যায়। … তবে সন্তানের কাছে অতিপ্রিয় নাম এই শব্দটি, অর্থাৎ মা। সন্তান জানে, এই মা শব্দের ব্যাখ্যা সে কিছুতেই সমাপ্ত করতে পারবে না, কিন্তু সে এই শব্দের ব্যাখ্যা দিতে না পারলে, নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা।

তাই মা, আজ আমি এই মা-এর ব্যাখ্যা দিতে চাই, ঈশ্বরের না। আসলে সত্য বলতে, আমি আমার পিতাকে কখনোই পাইনি, কারণ যখন তাঁর পঞ্চভূতের সম্মুখে আমার পঞ্চভূত উপস্থিত হয়েছিল, তখন তাঁর আত্মের আর তো কনো অস্তিত্বই ছিলনা। মা, তুমি স্বয়ং তাঁর গুণগান করেছ , আর যখন যখন তাঁর গুণগান করার সুযোগ পাও, তখন তখন তাঁর গুণগান করো।

মা, আমার তো ধৃষ্টতাও নেই যে, আমি তোমার মা রূপের গুণগান তাঁর মত করে করি। কি করেই বা করবো? তিনি তো তোমাতে নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে অর্পণ করে দিয়েছিলেন। এত সামর্থ্য আমার কোথায়? আমি আমার অহমকে সম্পূর্ণ ভাবে তোমাকে কোথায় অর্পণ করতে পেরেছি, তাঁর মত করে? অহম ত্যাগ হয়েও যে আমার মধ্যে অহম রয়ে গেছে মা! … তাই আমার ধৃষ্টতা নেই, তাঁর মত করে তোমার মাতৃরূপের বর্ণনা করা।

কিন্তু মা, খুব খেদ হয়। যদি তাঁকে কিছু সময়ও পেতাম, তাহলে তাঁর মুখ থেকে তাঁর মাতৃবন্দনা শুনতাম। কিন্তু মা, আমাকে তুমিও তো সেই বর্ণনা শোনাতে পারো। জানি, তাঁর বিবরণ মায়ের সম্বন্ধে হতো, কিন্তু যখন সেই বিবরণ তুমি দেবে, তখন তা তোমার নিজের বিবরণ নিজেকেই দিতে হবে, নিজের প্রশস্তি নিজেকেই গাইতে হবে, আর এই কাজে তুমি সম্পূর্ণ ভাবেই উদাসীন। তাও যদি, একটি বার, তাঁর তোমাকে দেওয়া সম্পূর্ণ বিবরণ শ্রবণ করাও, আমি ধন্য হয়ে যাই।

আসলে মা, আমি ধন্য অনুভব করতে চাই, এমন মানুষের কন্যা হবার জন্য। আমি আমার পিতাকে আমার অঙ্গে অঙ্গে, আমার কণায় কণায় ধারণ করতে চাই। আমি তাঁর গন্ধে মেখে থাকতে চাই। আমি তাঁর জন্য অশ্রু বিসর্জন করতে চাই। তাঁর উদ্দেশ্যে বলতে চাই, তাঁকে বড্ড অনুভব করতে চাই। … মা, তার তো সম্ভাবনা আর নেই। তাই তাঁর তোমার জন্য যেই ব্যখ্যা ছিল, সেটিই শুনতে চাই। তাঁর সমস্ত জীবন তোমার জন্য ছিল। তাই তাঁর বর্ণনা শোনানো কি যায় আমাকে?”

ব্রহ্মসনাতন অশ্রুসিক্ত নয়নে হেসে বললেন, “পুত্রী, নিজের কথা বলতে সত্যই আমি অপ্রস্তুতই বোধ করি, তবে তোমার পিতার ব্যাপারে বলতে পারা, আমার জন্য অত্যন্ত গর্বের। তাই তাঁর কথা আমি অবশ্যই তোমাকে বলবো। আর আরো বলবো, কারণ তোমার পিতা ছিলেন তিনি, অর্থাৎ তোমার তাঁকে ও তাঁর দর্শনকে জানার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। … তাই অবশ্যই বলবো তোমাকে তাঁর মাতৃবন্দনা। তবে তার আগে, কেন তাঁর বন্দনার বিবরণ দেওয়া আমার জন্য গর্বের, তা বলতে চাই, যদি তোমার অনুমতি হয় তো”।

দিব্যশ্রী উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠে বললেন, “মা! এমন বলো না কৃপা করে। এমন কিচ্ছু তো আমি কিছুতেই নই যে, সাখ্যাৎ জগন্মাতাকে তাঁর থেকে অনুমতি নিতে হবে”।

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “হ্যাঁ, তাঁর কথা কেন বলতে চাই, তা বলা অত্যন্ত আবশ্যক পুত্রী, কারণ এ ৭ কোটি বৎসরের মানব ইতিহাসে, এমন নিদর্শন কখনোই আসেনি, তোমার পিতার মত। অদ্ভুত তাঁর প্রেম, অদ্ভুত তাঁর বিশ্বাস, আর অদ্ভুত তাঁর সমর্পণ। পুত্রী, আমার ৪ কলার ভার উঠিয়ে আমার বাহন হয়েছিল মিরা, রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত, কুবির। আমার ৮ কলা ভার উঠিয়ে আমার বাহন হয়েছিল ঈশা, মহম্মদ, বিশ্বামিত্র ও নিমাই অর্থাৎ চৈতন্য। আমার ১৬ কলা ভার উঠিয়ে আমার বাহন হয়েছিল শঙ্কর, পিপলাদ, আর কৃষ্ণ। আমার ৩২ কলা ভার উঠিয়েছিল সিদ্ধার্থ, মার্কণ্ড ও গদাধর।

কিন্তু তোমার পিতা, এই ৭ কোটি বৎসরের মানুষের ইতিহাসে, প্রথমবার আমার ৬৪ কলা ভার উঠিয়ে আমার বাহন হয়েছে। অদ্ভুত তাঁর প্রেম, অদ্ভুত তাঁর বিশ্বাস। … পুত্রী, আমার ৪ কলা ভার ওঠাতে হলে, নিজের অহমের ৪ শতাংশ ত্যাগ করে দিতে হয়, যা মিরা, কুবির, রামপ্রসাদ, আনন্দময়ী, কমলাকান্ত করেছিল।

আমার ৮ কলার ভার ওঠানো জীবকটির সামর্থ্যের মধ্যে আসেনা, কারণ জীবকটির মধ্যে পূর্বসংস্কারের ভার তাঁর অহমকে ৫ শতাংশের কমে যেতে দেয়না, আর যদি যায়, তখন সে আমাতে বিলীন হয়ে যায়, মোক্ষ লাভ করে নেয়। ঈশ্বরকটির পক্ষেই আমার ৮ কলা ভার ওঠানো সম্ভব, আর তা ওঠাতেও ৮% অহম ত্যাগ করে দিতে হয়। এমনকি ৩২ কলা ভার ওঠানোর জন্যও, নিজের ৩৩% অহম ত্যাগ করতে হয়।

কিন্তু তোমার পিতাই প্রথম, আর স্বয়ং আমারও বিস্ময় যে, সে কি ভাবে নিজের ১০০ শতাংশ অহম ত্যাগ করে দিলো। সামান্য বলতে সামান্যও আসক্তি না রেখে, নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে কি করে ত্যাগ করে দিলো, তা আমার কাছেও অত্যন্ত বিস্ময়ের পুত্রী! অহম ত্যাগ করার জন্য, আমার প্রতি আর আমার সমস্ত সন্তান অর্থাৎ জগতের প্রতি প্রেম আবশ্যক। নিজের অহমকে অর্থাৎ আমিত্বকে অধিক থেকে অধিক ত্যাগ করে, তবেই জগতের উদ্ধারচিন্তা বাস্তবে করা সম্ভব।

কিন্তু এই ভাবে নিজেকে সম্পূর্ণ ত্যাগ করে দেওয়া সম্ভব, তা আমার কাছেও এক বিস্ময়, আর আজও তা এক বিস্ময়। নিজের জন্য শ্বাসগ্রহণ করতেও তাঁর অনীহা, নিজের জন্য আহার গ্রহণ করতেও তাঁর অনীহা, নিজের জন্য নিদ্রা যেতেও তাঁর অনীহা। আমাকে তাঁর অন্তরে আওয়াজ প্রদান করে বলতে হয়েছে যে আমার খিদা লেগেছে, তবেই সে অন্নগ্রহণ করেছে; আমাকে তাঁর অন্তরে শব্দ উচ্চারণ করে বলতে হয়েছে যে আমার নিদ্রা লেগেছে, তবেই সে নিদ্রা গেছে। আমাকে তাঁর হয়ে শ্বাস গ্রহণ করতে হয়েছে, তবেই তাঁর দেহ শ্বাস গ্রহণ করেছে।

পুত্রী, এমন প্রেম আমি কখনো অনুভব করিনি। এর পূর্বেও আমি বহু প্রেমী পেয়েছি, বহু বাহন পেয়েছি। সকলেই অন্দরে, কন্দরে, ঘরের কোনে স্থিত হয়ে ক্রন্দন করে করে বলতো, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসী, তুমি কি আমার প্রেম দেখতে পাচ্ছ না! … কিন্তু তোমার পিতাও কোনে বসে কাঁদতেন, কিন্তু কি বলতেন জানো? বলতেন, কোন মুখে আমি তোমাকে কাছে আসতে বলি। তোমার প্রেম এতই অপার যে, সেই প্রেমের লেশ মাত্রও আমার করার সামর্থ্য নেই, তাই কোন মুখে তোমার দর্শন চাই!

আমি হতবাক হয়ে যেতাম! এমন প্রেম আমি এর আগে কখনো অনুভব করিনি। জানো তোমার পিতার প্রেমবল অত্যন্ত শক্তিশালী। আমার মধ্যে মোক্ষপ্রাপ্ত হয়ে বিলীন হয়ে যাওয়া মিরাকে সে জাগিয়ে তুলেছিল। মিরাকে দিদি বলতো, আর সর্বক্ষণ দিদি দিদি করে যেত। নিদ্রা যেতও আর নিদ্রা থেকে উঠতোও। আর সেই প্রেমের মধ্যে শুধুই দিদি ছিল, আর কনো অন্য ভাব ছিলনা। মিরাকে সেই প্রেম এমনই আকর্ষণ করেছিল যে, সে পুনরায় দেহধারণ করে তার ভাইয়ের কাছে যেতে আগ্রহী হয়ে গেছিল।

ভূতকে আকর্ষণ করতে দেখেছি, কিন্তু মোক্ষপ্রাপ্ত ব্রহ্মাণুকে দেহধারণ করার জন্য ব্যকুল দেখিনি। আর কিই বা বলবো! ব্রুহ্মাণুর কথা আর কি বলবো! স্বয়ং ব্রহ্মকে মা বলে এমন আঁকড়ে ধরলো, পারলামই না কিছুতেই দূরত্ব রাখতে। মায়ের মত করে অনেকে ডেকেছে আমাকে, মা করে মেনেও, গর্ভধারিণী মায়ের উপরে রাখতে পারেনি কেউ। কিন্তু তোমার পিতা! সে তো আমাকেই একমাত্র মা মেনে, আমার জন্যই বেঁচে থাকা শুরু করে দিলো।

সেই টানে, আমি স্বয়ং ব্রহ্মই নিজেকে আটকে রাখতে পারলাম না, মিরা তো আমারই এক অণু! কি ভয়ঙ্কর বিশ্বাস আমার প্রতি! বলে, আমি নাকি তোমার দর্শন পাবার যোগ্যই নই, তাই দর্শন পাচ্ছিনা। যোগ্য হলে, তুমি ঠিকই দর্শন দিতে। … কি অপরিসীম বিশ্বাস! এই বিশ্বাস যে সে সর্বঅবস্থাতে ভুল, আর আমি সর্বঅবস্থাতে সঠিক! এমন বিশ্বাসের সাথে আমার এই প্রথমবার আলাপ।

জগতের সমস্ত জীব আমার সন্তান, আর এই সমস্ত সন্তানের জন্য, আমি দিবারাত্র কর্ম করে চলি। এই জ্ঞান লাভের পর থেকে, একদণ্ডের জন্যও তোমার পিতা, নিজের চিন্তা করেন নি। প্রথমে নিজেকে নিয়জিত করেছিল এই জগতকে চেনার জন্য, এই জগতের থেকে আমার আশা কি, তা জানার জন্য, সেই আশা পুড়নের জন্য আমি কি কি ইতিমধ্যে করেছি, তা জানার জন্য, আর কি কারণে আমার আশা পুড়ন হয়নি, তা জানার জন্য।

অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছে সে, সর্বক্ষণ, এই সমস্ত জানার কারণে। আর যখন তা জানা হয়ে গেল, তখন আমার আশা পুড়ন করার মার্গের সন্ধান করতে থাকলো। সেই অনন্ত সন্ধানের কালে, সে আমাকে আরো অধিক অধিক করে কাছে টেনেছে, আমাকে আরো আরো করে ব্যখ্যা দিয়েছে, আর সেই সমস্ত ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে সে এই অনুভব করে যে, এই আশা আমি পুড়ন করতে পারছিনা, কারণ আমি নিরাকার, আমার কনো অবয়ব নেই।

সে এই মার্গের সন্ধান করে যে, এক আমি যদি কনো অবয়বকে পূর্ণ রূপে ধারণ করতে সক্ষম হই, তবেই আমি মার্গ নির্মাণ করতে সক্ষম হবো, যেই মার্গ অনুসারে এই আশা পূর্ণ হবে, অর্থাৎ জগতে মোক্ষের দ্বার স্থাপিত হবে। এই বিচার করে, সে সিদ্ধান্ত নেয় যে, কনো না কনো ভাবে আমাকে একটি পূর্ণ অবয়ব দিতে হবে।

আমার বিভিন্ন অবতাররূপের কাছে সে ভিক্ষাপ্রার্থনা করতে থাকে, সঙ্গে সঙ্গে মিরার কাছেও ভিক্ষাপ্রার্থনা করতে থাকে যাতে এই অবয়ব আমাকে কি ভাবে দেওয়া সম্ভব, তা আমি তাঁকে বলি। মিরাকে আমি যেতে দিতে পারিনা, কারণ তা ব্রহ্মসত্ত্বের অবমাননা হবে। একবার যেই ব্রহ্মাণু ব্রহ্মে লীন হয়ে গেছে নিজের সমস্ত জীবনমৃত্যুর চক্রকে কেটে, তাকে পুনরায় সূক্ষ্মদেহপ্রদান করার অর্থও এই যে, তাঁর জীবনচক্রের পুনরায় শুরু হয়ে গেল, পুনরায় তাঁকে কর্মের ফলভোগ করতে হবে।

এই সত্য আমি তোমার পিতাকে বলার জন্য, আমার সেই অবতারের সূক্ষ্মপ্রকাশকে তোমার পিতার সম্মুখে নিয়ে যাই, যার সূক্ষ্মপ্রকাশ তখনও বিনষ্ট হয়নি, অর্থাৎ রামকৃষ্ণ বা গদাধর। পুত্রী, একটি ৩২ কলার অবতারের সূক্ষ্ম শরীর তাঁর মৃত্যুর ১৪৪ বৎসর পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকে, আমাতে পূর্ণ ভাবে বিলীন হতে। একটি ৮ কলার অবতারের সূক্ষ্মশরীর ১৯৮বৎসর পর্যন্ত অবস্থান করে, আমাতে বিলীন হতে। তাই রামকৃষ্ণ সূক্ষ্মশরীরের নাশ তখনও হয়নি। আর তাই তোমার পিতার সমক্ষে আমি তাঁকে প্রকট করে বোঝাই যেন সে মিরাকে ডাকাডাকি না করে।

পুত্রী, সাধকের জেদ সম্বন্ধে আমি পরিচিত। তাঁদের আলবুঝো ভাব সম্বন্ধেও আমি পরিচিত। তাই অবতারকেই প্রেরণ করেছিলাম। কিন্তু তোমার পিতার বিশ্বাসের সাথে আমি পরিচিত ছিলাম না। গদাধরের সূক্ষ্মশরীরের মুখ থেকে মিরাকে কেন ডাকা উচিত নয়, তা শুনে, তোমার পিতা ক্রন্দনে ভেঙে পরেছিল। ক্রন্দনে সে এই আর্তনাদ করে উঠলো, এ আমি কি করে ফেললাম! … যেই মায়ের বেদনা নিয়ে আমি সর্বক্ষণ চিন্তিত থাকি, আমি তাঁকেই বেদনা দিয়ে ফেললাম! … যেই মিরাদিদির প্রেমভাব আমাকে বাধ্য করে তাঁকে আপন মানার জন্য, আমি তাঁকেই নতুন করে জীবনচক্রে টেনে আনছিলাম।

ক্রন্দনের ভাবেই সে বলে উঠলো, আমার মা ভুল করেও ভুল করতে পারেনা। আমি তো নির্বোধ, তাই আমার কাছে কনো ধারণাই ছিলনা যে কেন মিরাদিদিকে ডাকা উচিত নয়। কিন্তু তিনি তো মা। মা কি করে সন্তানের সাথে অন্যায় হতে দিতে পারেন! … মিরাদিদির সাথে যেই অন্যায় আমি অজ্ঞানতা বশত করতে যাচ্ছিলাম, তিনি আমাকে সেই অন্যায় করা থেকে আটকে দিলেন, আর মিরাদিদিকে পুনরায় জীবনচক্রের মধ্যে এনে আমি যে তাঁর সাথে অপরাধ করতে চলেছিলাম, সেই অপরাধ করা থেকেও তিনি আমাকে প্রতিহত করে দিলেন। ধন্য আমার মা!

আমি পুনরায় আপ্লুত হলাম। কি অদ্ভুত নিঃস্বার্থ ভাব! … নিজেকে সর্বক্ষণ ভুল আর ভ্রান্ত প্রমাণ করতেই যেন সে ব্যস্ত, আর আমাকে সর্বক্ষেত্রে সঠিক প্রমাণ করাই যেন তাঁর লক্ষ্য। … রামকৃষ্ণকে আটকাতে চাইবে না চাইবেনা, সেই প্রশ্ন স্বয়ং গদাধরকেই সে করে বসলো। সে তাঁর উদ্দেশ্যে বলল, ঠাকুর, আমার প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য আপনাকে কিছুক্ষণের জন্য আটকালে কি মাকে কষ্ট দেওয়া হবে?

গদাধরের সূক্ষ্মশরীরও তাঁর এই অসম্ভব স্নেহ আর বিনয়ের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে গদগদ হয়ে বলল, বলো ছেলে, কি জানতে চাও। আমি যে আমার ৩০ শতাংশ অহম ত্যাগ করে, তাঁর ৩২ কলার ভার উঠিয়ে তাঁর বাহন হয়েছিলাম। বাকি যেই ৭০ শতাংশ রয়ে গেছে, তা যেতে ১৪৪ বৎসর সময় লাগতো, আর এই ১৪৪ বৎসরের ৫ বৎসর এখনো বাকি। এই সময়কালে তোমাদের সহায়তা করার জন্যই তো সূক্ষ্মদেহে রয়েছি। বলো ছেলে, কি জানতে চাও।

তোমার পিতা তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন, ঠাকুর, তাঁর ৩২ কলার ভার আপনি বহন করেছিলেন, এতেও কি তাঁর মার্গনির্মাণ সম্পন্ন হয়নি! মোক্ষই জগতের লক্ষ্য এবং পরমার্থ, আর সেই পরমার্থেরই পথে যাত্রার মার্গ নির্মাণ তাঁর অভিপ্রায়, তাঁর স্বপ্ন, তাঁর সমস্ত চিন্তা। সেই চিন্তার কি নিরাময় ৩২ কলার ভার অর্পণ করেও সম্ভব হয়নি!

রামকৃষ্ণ তাঁর উদ্দেশ্যে বললেন, ছেলে বলে কি দেখো! আমার আগেও সিদ্ধার্থ ছিল, মার্কণ্ড ছিল, যারা ৩২ কলার ভার উঠিয়েছিল নিজের ৩০ শতাংশ অহমকে ত্যাগ করে। মার্গ নির্মাণও হয়েছিল, সেই মার্গ স্থাপিতও হয়েছিল, কিন্তু সেই মার্গের যথোচিত মুল্যয়ন সম্ভব হয়নি।

তোমার পিতা প্রশ্ন করলেন, তাহলে কি ভাবে তা সম্ভব, ঠাকুর!

রামকৃষ্ণ উত্তরে বললেন, এক যদি সম্পূর্ণ ভাবে নিজের অহমকে বিনষ্ট করতে পারো, তাহলে হয়তো কিছু হতে পারে, কিন্তু কি হবে তাতে, তা আমারও জানা নেই। এক জগন্মাতাই তা জানেন। তা তাঁর দর্শন কামনা করে, তাঁর থেকেই জেনে নাও।

তোমার পিতা সেই কথা শুনলেন, কিন্তু তাঁর সেই বিশ্বাস, আমি যোগ্য হলে, মা আমাকে ঠিকই দেখা দিতেন। তবে এবার আরো কিছু যোগ হলো এই বিশ্বাসের সাথে। রামকৃষ্ণের কথার মর্মার্থ যোগ হলো। এবার সে বলল, ঠাকুর বলেছেন ১০০ শতাংশ অহম ত্যাগ, অর্থাৎ আমিত্বের খবরই থাকবেনা আমার কাছে, তবে কি হবে তিনি জানেন না, হয়তো মায়ের কর্মসাধন সম্ভব হতে পারে।

পুনরায় নিজের মনে বিচার করে বলে উঠলেন তোমার পিতা, সত্যিই তো, এই আমি’র থেকে কনো কাজ নেই। কি সামর্থ্য তার? কনো সামর্থ্য নেই? সে তো জগতসংসার নিজের মায়ের সুখদুখের ছেত্র জেনেও, সেই জগতকে কি ভাবে মায়ের স্বপ্নপুড়নের জন্য সাজানো যায়, সেই ধারণাই করতে পারছে না। তাহলে এঁর থেকেই বা কি লাভ!

পুত্রী, তোমার পিতার এই কথাতে, তাঁর পঞ্চভূত কেঁপে উঠেছিল। তাঁরা তোমার পিতার সম্মুখে গিয়ে বলতে শুরু করে দিল যে, এ কি বলছো? অহমের নাশ মানে জানো? সম্পূর্ণ মৃত্যু। সে প্রথমে নিজের পঞ্চভূতদের কথাতে আমলই দিলো না, অবশেষে যখন তাঁরা তাঁকে বিরক্ত করছিল, তখন সে বলে উঠলো, কি লাভ এমন জীবনের, যা নিজের মায়ের স্বপ্নপুড়ন করতেই ব্যর্থ!

হয় আমি জগতের উদ্ধারের মার্গ সন্ধান করবো, নয় তাঁকে এই সম্পূর্ণ কিছু প্রদান করে, তাঁর কাছে অনুরধ করবো যাতে তিনি সেই মার্গ স্থাপন করেন। … আর যেমন বলা, তেমন করা। তোমার পিতা, এরপর থেকে, নিজের সম্বন্ধে চিন্তনই স্তব্ধ করে দিল, সম্পূর্ণ ভাবে। আমাকে সর্বক্ষণ তাঁর সাথে থাকতে হলো, কারণ সে নিজের পঞ্চভূতকে, নিজের ত্রিগুণকে সম্পূর্ণ ভাবে উপেক্ষা করে বসে ছিল। তাই হাঁটানো থেকে বসানো, শোয়ানো থেকে খাওয়ানো, সমস্ত আমাকেই করতে হয়েছিল।

সে যে তা বোঝেনি, তা একদমই নয়। সে স্পষ্ট ভাবে জেনেগেছিল যে সে বসতে পারছে, শুতে পারছে, খেতে পাচ্ছে, বলতে পারছে, সমস্তই আমার জন্য। সে ক্রমশ নিজেকে ছেড়ে দিতে শুরু করলো। এমন বিশ্বাস রাখলো যে, সমস্ত কথক আমি, সমস্ত শ্রোতা আমি, সমস্ত কর্তা আমি, সমস্ত কথাও আমি, সমস্ত আহারও আমি, সমস্ত সত্ত্বা আমিই। প্রবল বিশ্বাস যে, আমিই একমাত্র অস্তিত্ব, আর কারুর কনো কালে কনো অস্তিত্বই ছিলনা, সম্ভবই না।

আর এমন বিশ্বাস থেকে সত্য তাঁর সম্মুখে স্থাপিত হয়ে গেল যে, আমিই একমাত্র অস্তিত্ব, আমিই একমাত্র সত্য, আর সমস্ত জীবও আমি স্বয়ংই, কিন্তু তাঁরা এই সত্য ভুলে আছে যে, তারা মিথ্যা আর আমিই সত্য। আর তা ভুলে আছে বলেই, তাঁরা নিজেদেরকে আত্মজ্ঞানে ভ্রমিত, আর মোক্ষ অর্থাৎ ব্রহ্মস্বরূপ থেকে বিচ্যুত।

সত্য জেনে, সে আমাকে স্থাপিত করার জন্য, জনে জনে এই কথা বলতে গেল। চরম ভাবে হেনস্থা হলো, অপমানিত হলো, সময়ে সময়ে প্রহৃতও হলো। নিরাশ সে হেনস্থার জন্য হয়নি, নিরাশ অপমানের জন্যও হয়নি, প্রহরণের কারণেও হয়নি। দিনের শেষে আমার কাছে এসে বসে সে কাঁদত আর বলতো, পিটুনি খেলাম, অপমান পেলাম, বেশ আনন্দ হতো, যদি তারা তোমাকে মানতো, কিন্তু মানলো না মা! … মা, আমার সামর্থ্য নেই তাঁদেরকে মানানোর, উপায় জানা নেই। এক তুমিই মানাতে পারো, মানাও মা এঁদেরকে।

প্রায় একবৎসর এমন প্রতিক্ষণ ক্রন্দন করতে থাকলে, অবশেষে আমি তাঁর এই প্রবল প্রেমের টানে, সারা না দিয়ে থাকতে পারিনা। আমি সর্বস্ব হয়ে গেছিল সে, আমাকে ছাড়া, আমার সন্তানদের ছাড়া, আর কিছু দেখতেই পাচ্ছিল না। তাই আমার পক্ষে আর পরোক্ষ হয়ে থাকা সম্ভব হয়না। প্রত্যক্ষ হই তাঁর সম্মুখে। নিরাকার রূপ প্রদান করি তাঁকে, আমাতে বিলীন হবার আনন্দ লাভ করে সে। অতঃপরে, আমি তাঁর থেকে যখন চলে আসছিলাম, সে আমার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো, মা!

সেই মা ডাকের মাধুরিমা আজও আমার কানে বাজে। সেই মা ডাকের মধ্যে কিচ্ছু চাওয়া ছিলনা, কিচ্ছু পাওয়ার ছিলনা! সে এক অদ্ভুত মধুরিমা। আমি শব্দ না করে থামলাম। সে পুনরায় বলল, মা, তোমার সন্তানদের সত্যপ্রদান করার জন্য জগতে কনো ধাম স্থাপন কি অসম্ভব! … তা যদি সম্ভব হতো, তাহলে তোমাকে এমন দুখী লাগতো না! … সকলের মা হবার পরেও, তোমার ক্রোড় খালি থাকতো না! সকলের মা হবার পরেও, কেউ তোমাকে কেবল আনন্দ লাভের জন্য মা ডাকার নেই, এমন হতো না। … সম্ভব কি মা, তা হওয়া? মার্গ জানা নেই আমার।

আমি এবার সাকার রূপে দর্শন দিলাম তোমার পিতাকে। দিনটি ছিল ৩০এ নভেম্বর ২০১৯, রাত ১১টা ১১। আমাকে দেখে, আপ্লুত হয়ে সে প্রথম কথা বলল, সাকার যতই সুন্দর হোক, নিরাকারের অসীমতাকে ধারণ করার সামর্থ্য নেই সাকারের।

আমি আর মৌন থাকতে পারলাম না, কারণ এর আগে আমার নিরাকার স্বরূপকে এমন সৌন্দর্যবাখান কেউ করেনি। আমার অসত্য সাকাররূপ সকলের কাছে প্রিয়, কিন্তু আমার সত্যস্বরূপ যেন সকলের কাছে বিভীষিকার কারণ। তোমার পিতা আমার সত্যস্বরূপের বীভৎসতা দেখতে পায়নি, দেখতে পেয়েছে তাঁর সত্যতা। আসলে আমাকে যে মনেপ্রাণে মা বলে, শুধু মুখে মা বলেনা। আর মা যে সন্তানের কাছে সমস্ত রূপে প্রিয়।

তাই আমি মৌনতা ত্যাগ করলাম। তবে তাঁর এই অপার প্রেমকে আমি তখনও বিশ্বাস করতে পারিনি। হ্যাঁ জানি, তাঁর কনো পূর্ব জন্ম নেই, যেমন কনো ঈশ্বরকটির থাকেনা। শঙ্করেরও ছিলনা, গদাধরেরও ছিলনা, মার্কণ্ডেরও ছিলনা, সিদ্ধার্থেরও ছিলনা। কিন্তু এঁরা তো কেউ আমাকে সার্বিক ভাবে মা মেনে আমার জন্যই নিজের জীবনধারণ করেনি! তাই, আমার বিশ্বাস হলো না।

আর সেই অবিশ্বাস থেকেই পরীক্ষা করার জন্য বললাম, পুত্র, সেই মার্গ নির্মাণের জন্য আমার সমস্ত কলাকে একত্রে ধারণ করতে হবে। আমার সমস্ত ৯৬ কলার ভারকে বহন করতে হবে। … আমি তোমার মধ্যে ৬৪ কলার প্রকাশ করে, সেই রথের, সেই রথের সারথির, এবং সেনার নির্মাণ করবো, আর বাকি সুপ্ত ৩২ কলার থেকে তিনটি রথীর নির্মাণ করবো, সেই রথে আঢ়ুর হয়ে, এই মার্গকে জগতে প্রশস্ত করার জন্য। তা তুমি কি আমাকে তোমার সম্পূর্ণ পঞ্চভূত দেহকে প্রদান করতে পারবে?

আসলে, যদি সম্পূর্ণ ভাবে নিজেকে অর্পণ না করো, তাহলে কিন্তু আমি নিজের সমস্ত ৯৬ কলা স্থাপিত করতেও পারবো না, আর তাই এই মার্গকে কিছুতেই স্থাপন করতে পারবো না, যেমন এতকাল পারিনি। তা বলো, দেবে নিজেকে সম্যক ভাবে নাশ করে, তোমার পঞ্চভূত দেহ আমাকে দেবে? বিচার করে নাও পুত্র, কারণ সম্যক ভাবে নিজেকে নাশ করা অর্থ এই যে, তোমার আর কনো সূক্ষ্ম আবেশও থাকবে না। সম্পূর্ণ ভাবে, তুমি বিনষ্ট হয়ে যাবে বিশ্বচরাচর থেকে, এমনই ভাবে বিনষ্ট হয়ে যাবে যে তোমার আর কনোপ্রকার অস্তিত্ব থাকবেনা।

বিচার করে নাও আবার, কারণ তোমার সম্যক আমিত্ব অর্থাৎ আত্ম আমার মধ্যে লীন হয়ে যাবে, আর তাই তোমার কনো শিষ্য থাকবেনা, কনো প্রতিষ্ঠা থাকবেনা, এমনকি তোমার নামও আমার অবস্থানের সাথে সাথে পালটে যাবে, আর তাই তোমার নামও হারিয়ে যাবে। … যদি সম্মত হও, তাহলে আমি এক্ষণে তোমার পঞ্চভূত দেহকে ধারণ করবো, আর এক্ষণে তোমাকে চিরকালের জন্য মৃত্যু গ্রহণ করতে হবে।

বিচার করে নাও পুত্র। যদি সম্যক ভাবে আমাকে তুমি নিজের পঞ্চভূত দেহ প্রদান করো, তবে মাত্র ৩ বৎসরের মধ্যে তোমার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে, কনো প্রসিদ্ধি থাকবেনা, কেউ তোমার নামও করবেনা, কারণ তোমার কনো শিষ্য বা অনুগামী কেউ থাকবে না।

যদি নিজের অহমের ৬৪ কলা রেখে, আমাকে ৩২ কলা স্থান দাও, তাহলে তোমার এই দেহ নাশের ১৪৪ বৎসর পর অবধি তোমার সূক্ষ্মদেহ অবস্থান করবে, যেমন রামকৃষ্ণের করছে, কারণ তাঁর অহমের প্রতিটি কলার নাশ হতে ২ বৎসর ৪ মাস করে সময় লাগে। আর যেহেতু তোমার ৭০% অহং বিরাজ করবে, সেহেতু তুমি গুরু হবে, তোমার বিশেষ বিশেষ শিষ্য হবে, তোমার প্রতিষ্ঠা থাকবে। যদি ৮ কলা ধারণ করো আমাকে, তাহলে তোমার ৮৮ কলা অহংকার থাকবে, আর তার নাশ হতে ১৯৮ বৎসর লাগবে, আর তোমার অহমের ৯২% তোমার কাছেই থাকার কারণে, তোমার প্রচুর প্রসিদ্ধি ও অনুচর হবে।

তাই পুনরায় বিচার করে নাও, যদি তোমার ১০০ শতাংশ অহম আমাকে দিয়ে দাও, তাহলে কিন্তু তোমার সামান্যও প্রসিদ্ধি হবেনা, কারণ তোমার কনো শিষ্য বা অনুচর হবেনা। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে আমাকে আবাহন করো, আমি তোমার মধ্যে স্থান গ্রহণ করবো।

পুত্রী, ভেবেছিলাম, তোমার পিতা এতে বিব্রত হবেন। কিন্তু আমার সমস্ত ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে, আমাকে আমারই বচনের বন্ধনে বেঁধে দিলেন তোমার পিতা। জোর হস্তে আমার সম্মুখে উপবেশন করে, আনন্দমূর্তি সজল নয়ন নিয়ে আমার উদ্দেশ্যে যা বলল, তা আমার শ্রবণ করা আজ পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ শব্দাক্ষর।

সেই বলল, “মা, অনেক তো ৮ কলার ভার ওঠানো, ১৬ কলার ভার ওঠানো, ৩২ কলার ভার ওঠানো হলো। অনেক তো গুরুশিষ্য, প্রভু অনুচর হলো। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কি হলো মা? হয় নিরাকারের বিবরণ হলো, নয় সাকারের, নয় শক্তির, নয় বলা হলো অহমের থেকে মুক্ত হয়ে অহমকে ব্রহ্মময় করার কথা। কিন্তু মা, কি ভাবে তোমার সন্তানরা অহমের ত্যাগ করবেন, সেই কথা যে কনো গুরু, কনো প্রভু বললেন না!

দোষ নেই তাঁদের যারা বলেন নি, আর না তোমার, যিনি বলতে পারেন নি। আসলে ৮ শতাংশ, ১২ বা ১৬ শতাংশ, বা ৩০ শতাংশ স্থান অধিগ্রহণ করে, তোমার পক্ষেও সেই কঠিন কথা বলা সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি, আর তাঁদের ৯২ শতাংশ, ৮৪ শতাংশ বা ৭০ শতাংশ অহম তা বলতেও পারেনি। আর তাই তোমার সন্তানদের জন্য মোক্ষদ্বার উন্মেলিত করাও সম্ভবপর হয়নি।

মা, যদি আমার প্রতিষ্ঠা দিয়েই কাজ হয়ে যেত, যদি গুরুর প্রতিষ্ঠা দিয়েই কাজ সম্পন্ন হতো, যদি প্রভুর প্রতিষ্ঠা দ্বারাই কাজ সম্পন্ন হতো, তবে তো আজ জগতে সমস্ত তোমার সন্তানের জন্য মোক্ষদ্বার স্থাপিত থাকতো, তাই না! কিন্তু তেমন তো হয়নি। অহম থেকে মুক্ত হতে হয়, যদি তোমার কিছু সন্তান জেনেও থাকে, কি ভাবে তার থেকে মুক্ত হতে হয়, তা তাঁদের জানা নেই, তাই আর তোমার ক্রোড়ে তাঁরা এসে পৌছায়ই না।

মা, আমার প্রতিষ্ঠা চাইনা, শিষ্যও চাইনা, অনুচরও চাইনা। তোমার ক্রোড় তোমার সন্তানে সর্বক্ষণ ভর্তি থাকুক, এই আমার কামনা। আর তা তো কিছুতেই আমার অহম থাকতে হতে পারবেনা, তা আমার কাছে প্রত্যক্ষ, তোমারই উচ্চারিত শব্দকে অনুসরণ করে। তাই, মা আমার সম্পূর্ণ অহমকে ধুলিস্যাত করে দাও ৩ বৎসরের মধ্যে, আর তাতে তোমার ৯৬ কলার প্রসার করে, মোক্ষদ্বার প্রতিষ্ঠিত করো। আমার প্রতিষ্ঠায়, আমার শিষ্যদের প্রতিষ্ঠা, আমার অনুচরদের প্রতিষ্ঠা, এসব তোমার সন্তানদের কল্যাণ সাধন করছেনা মা। … তাই আমাকে হত্যা করো মা, সার্বিক ভাবে হত্যা করো, আর পূর্ণ ৯৬ কলা অবতাররূপে, মোক্ষদ্বার স্থাপিত করো”।

আমি এতটা আশা করিনি, না কখনোই আশা করিনি, কনোকালে এমন কথা আমি শুনিনি। … আমার হৃদয় কেঁপে উঠলো, আমার নয়ন জলে সিক্ত হলো, নিজের উপর সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললাম। পুনরায় নিজেকে সংযত করে বললাম, “পুত্র, নিজের ৬৬ শতাংশ আমাকে দাও, আমি ৬৪ কলাবেশে তোমার মধ্যে থাকলেই, আমি সেই মার্গের নির্মাণ করতে সক্ষম হবো, সম্পূর্ণ দানের কনো প্রয়োজন নেই”।

তোমার পিতার আমাকে বিস্মিত করা তখনও সমাপ্ত হয়নি। তিনি বললেন, “মা, মার্গ নির্মাণ তো ৬৪ কলা থেকে হয়ে গেল, আর সেই মার্গ স্থাপন? তা কি করে হবে?”

আমি হেসে বললাম, “পুত্র, স্থাপনের জন্য শিষ্যের প্রয়োজন, অনুচরেরও প্রয়োজন, আর তাই অহমেরও প্রয়োজন। তাই পুত্র, ৬৪ কলা রূপে আমি তোমার মধ্যে থেকে সেই মার্গ নির্মাণ করে চলে যাবো, আর পরবর্তীতে যখন যখন আমার ৮ কলা থেকে ১৬ কলাকে কনো ঈশ্বরকটি বহন করতে চাইবে, তখন সেই মার্গের প্রসার হবে”।

তোমার পিতা বললেন, “মা, তোমার এই দুই প্রকাশের মাঝের যেই সময়ের অবধি, সেই সময়ে, অনেকে প্রবেশ করে, সমস্ত মার্গকে তছনছ করে দেয়। তাই মা, এমন কিছু কি সম্ভব নয় যে, তোমার অবতার গ্রহণ পরস্পর হোক, এবং জগতে সম্যক ভাবে মোক্ষদ্বার স্থাপিত হোক!”

আমি বিস্ময়ের সাথে বললাম, “পুত্র, তার জন্য তোমাকে সম্পূর্ণ ৯৬ কলা ধারণ করতে হবে, এবং ৩২ কলাকে সুপ্ত রেখে দিতে হবে, এবং পরবর্তীতে এই ৩২ কলাকে ধারণ করার রূপ প্রকাশ করতে দিতে হবে। তার জন্য তোমাকে সম্যক ভাবে নিহত হতে হবে!”

তোমার পিতা হেসে বললেন, “আমার পক্ষে তো এই রূপপ্রকাশ সম্ভব নয় মা। এতো তোমাকেই করতে হবে। … মা, যদি আমার যোগ্যতা থাকে, তাহলে আমাকে কি এই ৩২ কলার রূপবিস্তারের বিবরণ শোনানো সম্ভব!”

আমি বিস্মিত ও বিস্ফারিত নয়নে বললাম, “পুত্র, এর জন্য, তোমার পঞ্চভূতের থেকে একটি স্থূল প্রকাশ প্রয়োজন, এবং একটি সূক্ষ্ম প্রকাশ প্রয়োজন। স্থূল প্রকাশকে তোমার অবয়বের সন্তান জ্ঞান করা হবে, এবং সূক্ষ্মপ্রকাশ থেকে তাঁরই প্রাণসখীর প্রকাশ হবে, অন্য কনো জননীর গর্ভে। আর এই দুইজনেই আমাকে ১৬ কলা ১৬ কলা রূপে ধারণ করে, জগতে প্রচুর সংখ্যক অনুচরের নির্মাণ করবে, এবং আমার মার্গকে ধারণ করে করে মোক্ষদ্বারকে স্থাপন করবেন নিজের অনুচরদের দ্বারা”।

তোমার পিতা বললেন, “মা, দুই প্রজন্মের স্থানে এটাকি তিন প্রজন্ম করা যায়না! … যদি তা করা যেত, তবে জগতে মোক্ষদ্বার স্থাপিত হতই। মা এই জগতবাসির বিশ্বাস এমনই যে, যদি কনো কিছু তিনপ্রজন্মব্যাপী প্রবাহিত হয়, তবে তা অবশ্যই সত্যের সাথে সংযুক্ত। তাই এমন আবদার করলাম। … যদি, দ্বিতীয় প্রজন্ম ১৬ কলা ধারণ করে, ১৬ কলাকে সুপ্ত রেখে, নিজের ৭০ শতাংশ অহম ত্যাগ করেন, আর সেই ১৬ কলাকে পরবর্তীতে নিজের দুই ৮ কলার সন্তানরূপে স্থাপিত করেন, তাহলে কি হয়না!”

আমি বললাম, “কিন্তু পুত্র, এই সমস্ত ক্ষেত্রে, তোমাকে তো সম্পূর্ণ নিহত হতেই হবে! আর তারপরেও কনো প্রতিষ্ঠা ছাড়াই থাকতে হবে!”

তোমার পিতা হেসে বললেন, “মা, সকলকে কখনো না কখনো নিহত তো হতেই হবে। কিন্তু যদি সেই মায়ের চিন্তা করে করে সে নিহত হয়, যেই মা সর্বক্ষণ নিজের সমস্ত উর্জ্জা সন্তানদের হিতের জন্য দান করতে থাকেন, তাহলে মা, এর থেকে অধিক শান্তির কিই বা হতে পারে! আর প্রতিষ্ঠা! মা, আমার প্রতিষ্ঠা দিয়ে চিড়ে ভিজবেনা, যদি কারুর প্রতিষ্ঠা জগতে প্রয়োজন, তা এক ও একমাত্র তোমার। … তাই মা, প্রতিষ্ঠা তোমার হোক, এই আমার কাম্য”।

আমি আচম্বিত। আমি স্তব্ধ। নিঃশব্দ। এর আগে আমি অনেককে আলিঙ্গন প্রদান করেছি, কারণ সেই আলিঙ্গন তাঁদের কাম্য ছিল। এই প্রথম আমি আমার ইচ্ছার কারণে কারুর আলিঙ্গন কামনা করলাম। হ্যাঁ পুত্রী, আমি তোমার পিতার কাছে ভিক্ষা চাইলাম, একটি আলিঙ্গনের জন্য। না চেয়ে থাকতে পারিনি। এমন নিঃশর্ত নিঃস্বার্থতা আমি এর পূর্বে কখনো দেখিনি, কনো দিন পাইনি। …

আমি জগন্মাতা, হ্যাঁ আমার গর্ভেই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড স্থিত। কিন্তু এই প্রথমবার আমার নিজেকে রত্নগর্ভা মানতে ইচ্ছা হলো, মানতে বাধ্য হলাম আমি। তোমার পিতাকে আলিঙ্গন করে, তাঁকে বললাম, “একটি আলিঙ্গনে আমার আশ মিটলো না পুত্র। তবে দ্বিতীয় আলিঙ্গনের সাথে সাথে তোমার নিধন নিশ্চিত হয়ে যাবে। আর পরবর্তী তিন বৎসরের মধ্যে, তোমার সমস্ত অস্তিত্ব বিনষ্ট হয়ে যাবে। … কিন্তু তার পূর্বে, আমার একটি প্রশ্ন আছে। … আমার গর্ভে ভ্রমণ তুমি তো কখনো করো নি। হ্যাঁ আমার দ্বিতীয় আলিঙ্গনে তা করবে, আর তা সমাপ্ত হতেই তোমার সম্যক নিধন হয়ে যাবে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত তো তা করো নি! আর তাছাড়াও আমাকে তুমি নিরাকার রূপেই জানতে, তারপরেও আমাকে কেন তুমি মাতা মানো? এর উত্তর না জেনে, আমি তোমার নাশ হতে দিতে পারছিনা!”

তোমার পিতা এরপর যা বললেন, তাতে আমি এমনই বিবশ হয়ে যাই যে, আমি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েই তাঁকে সেই আলিঙ্গন দিয়ে ফেলি, যার কারণে তার আমার গর্ভে ভ্রমণ শুরু হয়, এবং পরের ৩ বছরের মধ্যে সে সম্পূর্ণ ভাবে নিহত হয়ে, আমাতে বিলীন হয়ে যায়। হ্যাঁ পুত্রী, আমার স্মরণ ছিলনা যে এই আলিঙ্গনের সাথে সাথেই তোমার পিতার মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে যাবে। যদি স্মরণ থাকতো, তাহলে যার কারণে আমি রত্নগর্ভা, তাঁকে আরো কিছুক্ষণ নিজের চোখের সম্মুখে দেখতে পেতাম। কিন্তু তোমার পিতার অপরূপ মাতৃব্যখ্যা, আমাকে এমনই বশীভূত করে দেয় যে, আমি নিজের উপর সম্পূর্ণ ভাবে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলি, আর তাঁকে আলিঙ্গন করে ফেলি।

তোমার পিতা নিজের ব্যাখ্যাতে বলেন, “মা, যেটুকু আমি চিনেছি তোমায়, তার থেকে প্রথম যা জেনেছি, তা হলো তুমি ঈশ্বর, তুমিই ব্রহ্ম, তুমিই কারণ বেশে নিয়তি, তিনিই সূক্ষ্ম বেশে কালের নিয়ন্ত্রক আদিশক্তি বা মহাকালী, আর তুমিই স্থূল বেশে প্রকৃতি। তবে তার থেকেও অধিক যা জেনেছি, তা হলো এই যে, তোমার কাছে তোমার এই সমস্ত পরিচয় অহেতুক, বা বলা চলে তুমি তোমার যে পরিচয়কে সর্বাধিক প্রাধান্য দাও, সেই পরিচয়ের কর্তব্য পালনে তোমার এই সমস্ত গুনাগুণ সহায়ক মাত্র।

আসলে তোমার কাছে তোমার যেই পরিচয় সর্বাধিক প্রিয়, তা হলো তুমি মা, সমস্ত ব্রহ্মাণুর জননী তুমি। না তুমি এঁদের কারুকে জন্ম দাওনি, এঁরা সকলেই স্বয়ম্ভু বা শম্ভু, অর্থাৎ এঁরা নিজেদের নিজেরা প্রকাশ করেছেন, আর তা করেছেন, তোমার সত্যতা অস্বীকার করার কারণেই, তোমার ব্রহ্মত্বকে অস্বীকার করার কারণেই। কিন্তু যতই অস্বীকার করুক তোমাকে, যতই তোমার সত্যতাকে অস্বীকার করুক তারা, যতই তোমার অনিচ্ছাতেই নিজেদের স্বয়ম্ভু করুক, তারা তোমাকে আশ্রয় করেই অস্তিত্বমান, কারণ এক তুমিই যে অস্তিত্ব, ব্রহ্মই সত্য, ব্রহ্মাণু কল্পনা মাত্র, কিন্তু ব্রহ্ম বিনা ব্রহ্মাণু! সে তো এক অলিক কল্পনা।

তাই তোমাকে আশ্রয় করেই তাঁরা অস্তিত্বমান, যতই তোমার সত্যতাকে তাঁরা অস্বীকার করুক। আর তুমি! … না মা, তুমি পিতা হতে পারো না। যিনি সন্তানের থেকে কিছু চায়, তিনিই পিতা, তা তিনি যেই লিঙ্গের দেহই ধারণ করে থাকুক না কেন। মা সন্তানের থেকে কিছু চায়না, সন্তানের জন্য চায়।

পিতা যখন ভিক্ষাও চায়, তখন নিজের জন্য সন্তানকে দিয়ে ভিক্ষা করায়। মাতা সন্তানের জন্য ভিক্ষা চায়। সন্তানকে ক্রোড়ে করে নিয়ে, সন্তানের আহারের জন্য ভিক্ষা চায়, নিজের জন্য নয়। আর্থিক সংকট এলে পিতা সন্তানকে বিক্রয় করে দেয়, কিন্তু মাতা! মাতা নিজেকে বেশ্যা করে বিক্রয় করে দেয়, কিন্তু সন্তানের গায়ে আঁচটাও আসতে দেয় না।

মা সন্তানের থেকে কিচ্ছু চান না। কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু না। নিজেকে নিশ্বেস করে দিতে হলে, তাই করবেন, কিন্তু সন্তানের অঙ্গে আঁচও আসতে দেবেন না। মা, সন্তান হলেন পিতার শক্তি। কিন্তু মাতার শক্তি কে? মাতার কনো শক্তির প্রয়োজন নেই, কারণ মা স্বয়ং সন্তানের শক্তি। অর্থাৎ মা, সন্তান পিতার শক্তি, বা বলা যায় এই পঞ্চভূতের দেহ আমাদের অহমের শক্তি, কিন্তু মা অর্থাৎ তুমি আমাদের শক্তি। …

যেটুকু তোমাকে চিনেছি মা, তুমিও ঠিক এই মা। কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু চাওনা সন্তানের থেকে। না চাও নাম, না চাও পূজা, না চাও প্রতিষ্ঠা, না চাও স্নেহ। সন্তান তোমাকে কনো প্রকার তোষামোদ করেনা, উপরন্তু উদয়স্থ কথা শোনায়, তিরস্কার করে, সমস্ত কিছুর জন্য তোমাকেই দোষারোপ করে, কিন্তু তাতেও তোমার কিচ্ছু এসে যায়না। দিবারাত্র কেবলই সন্তানের উদ্ধারের চিন্তা করে যাও।

মা, তুমি আমাকে আমার প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তা করতে বললে, কিন্তু কি করে করবো? যেই মাকে দিবারাত্র দেখে বড় হয়েছি, তাঁকে দিবারাত্র কর্ম করতে দেখেছি, দিবারাত্র সর্বস্ব ত্যাগ করতে দেখেছি, দিবারাত্র পরিশ্রম করতে দেখেছি, দিবারাত্র সকলের তিরস্কার আর অভিযোগ শুনতে দেখেছি, আর দেখেছি যে, এত কিছুর পরেও, সেই মা একদণ্ডের জন্যও নিজের প্রতিষ্ঠার চিন্তা করেনা, সর্বক্ষণ সন্তানের কল্যাণ চিন্তাই করে যায়। তাঁকে দেখে দেখে বড় হবার পর, তাঁর সন্তানদের জন্য তাঁর মার্গ প্রশস্ত করার সুযোগ যখন তাঁর কাছে এসেছে আমার সম্পূর্ণ অহমকে নিধন করে আমার সম্পূর্ণ পঞ্চভূতকে নেবার, সেইখানে দাঁড়িয়ে আমি আমার প্রতিষ্ঠার চিন্তা করবো!

তুচ্ছ নই, অতিতুচ্ছ আমি, সেই অতিতুচ্ছের প্রতিষ্ঠাতে কি হবে মা! তোমার এই অক্লান্ত পরিশ্রমের পুরিস্কার হবে এই তুচ্ছের প্রতিষ্ঠাতে! … তোমার এই অসম্ভব প্রেম যোগ্য সম্মান পাবে, এই তুচ্ছের প্রতিষ্ঠাতে! তোমার সন্তানদের জন্য মোক্ষদ্বারের রচনা হবে, এই তুচ্ছ প্রতিষ্ঠা লাভ করলে? না মা, এতদিন হয়নি এই কারণেই, আর এখনও এই কারণেই হবেনা। … আর এত বড় সুযোগ পেয়েছি আজ, যেই মা পাগলের মত প্রেম করে গেছেন, তাঁর প্রেমের যোগ্য সম্মান দেবার, সেই সুযোগ হাতছাড়া করতে পারবো না মা।

আমার কনো প্রতিষ্ঠা, কনো সুখ, কনো শিষ্য, কনো অনুচরের কনো আবশ্যকতা নেই। আবশ্যক কেবল ও কেবল তোমার কর্মকাণ্ডকে সম্পূর্ণতা দানের। তুমি বলবে, আমার এই দানকে কেউ কনোদিন স্মরণ করবেনা, কারণ আমার অহম এই কীর্তির গুণগান করবেনা। মা, গুণগান লাভের আশায় এসব করছি না! … আমার মায়ের প্রেমে, স্নেহে, আর মমতায় আমি আপ্লুত, তাই করছি এই সব। … তাই, এই সমস্ত কিছুতে যদি কেউ মহান হয়, তা এই তুচ্ছ আমি নই, তা তুমি, কারণ তোমার অপার প্রেম, মমতা আর স্নেহই এই কীর্তির জন্য প্রেরণা। … তাই যখন মহান আমি নই, তখন আমার প্রতিষ্ঠা হওয়াই তো অনুচিত, তাই না মা!”

হয়তো তোমার পিতা আরো কিছু বলতেন। তাঁর চোখে প্রবল প্রেমের আনন্দময় হাস্য, আর সেই হাস্যই আমার স্মৃতিতে থাকা তোমার পিতার অন্তিম দৃশ্য। আমি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, তোমার পিতাকে প্রবল সন্তানস্নেহে আলিঙ্গন করি। … স্মরণ ছিলনা, এই আলিঙ্গনের মুহূর্তই হবে, তোমার পিতার সম্যক অবসানের ক্ষণ। আলিঙ্গনের পরে যখন তোমার পিতার নিষ্প্রাণ দেহ আমার কাঁধে লুটিয়ে পরলো, তখন আমার স্মরণ এলো।

পুত্রী, আমার বলতে কনো লজ্জা তো নেইই, বরং আমি গর্ব অনুভব করছি এটা বলতে যে, দেহি জননীরা সন্তানহারা হলে, যেইপ্রকার উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করে ওঠেন, আমি সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত, এই প্রথমবার সেইরূপ ক্রন্দন করে উঠি, আমার প্রিয়তম সন্তানকে হারিয়ে ফেলার কষ্টতে আমি ভুলে গেছিলাম যে আমি জগন্মাতা, আমি ভুলে গেছিলাম যে আমি বৈরাগী, আমি ভুলে গেছিলাম যে আমি আবেগশূন্য মহাশূন্য ব্রহ্ম।

পুত্রী, হয়তো তোমার পিতার এই মহান ত্যাগের কথা কেউ স্মরণ রাখবেনা, কিন্তু আমি এই কথা কনোদিন ভুলতে পারবো না। … তাই আমি তোমাকে সেই কথা বলতে পেরে খুব আপ্লুত আজ, খুব গর্বিত আজ, খুব আনন্দিত আজ। … ইচ্ছা এমন হয় যেন, আর একটিও তোমার পিতার মত সন্তান না হোক আমার, কারণ আমি অনেক এমন সন্তানের ভিড়ে তাঁকে হারিয়ে ফেলতে চাইনা, আমি প্রতিনিয়ত এমন সন্তানের মস্তকচুম্বন করতে চাই। সন্তানের জন্য মাতা অনেক ত্যাগ করেন, কারণ এই ত্যাগ করাই তাঁর ধর্ম। কিন্তু মাতার জন্য সন্তানের এমন ত্যাগ! এত তাঁর ধর্ম ছিলনা ! এ যে, শুধুই তাঁর প্রেম ছিল।

সে নিজের কর্তাকে সম্পূর্ণ ভাবে ত্যাগ করে আমাতে বিলীন হয় পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে, তাই আমি আমার মার্গদর্শনকে কৃতান্ত অর্থাৎ কর্তার অন্ত রূপে স্থাপন করেছি, আমার এই পুত্রকে সদা স্মরণ রাখার জন্য, আর সারথিকে কৃতান্ত বলে, রথকে বলেছি কৃতান্তিকা, কারণ আমার পুত্র যে নিজের কর্তার নাশ করে কৃতান্তিক। আর তাঁর নাম রেখেছি আমি সমর্পণানন্দ, কারণ তাঁর যে আমার কাছে নিজেকে সমর্পণ করাতেই আনন্দ ছিল। …

পুত্রী, এই প্রথমবার আমার মনে হয়েছিল, আমি যদি ব্রহ্ম না হতাম, আমি যদি একমাত্র অস্তিত্ব না হতাম, তাহলে আমার এই পুত্রকে কখনো এমন ভাবে বিলীন হয়ে যেতে হতো না, তবে পরমুহূর্তে এই বিলাপকে বন্ধ করে দিই, কারণ এই বিলাপ যে তাঁর প্রেমে সমর্পিত কৃতান্তিক হয়ে, আমাতে বিলীন হওয়ার মহান কর্মকেই কলুষিত করে দেবে। হ্যাঁ পুত্রী, আজ আমার বলতে কনো অসুবিধা নেই যে আমি রত্নগর্ভা, আর তোমারও গর্ব হওয়া উচিত, কারণ এই জগন্মাতা তোমার পিতার কারণেই রত্নগর্ভা”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43