প্রয়োজন বিজ্ঞান (উদ্ধারলীলা)
দিব্যশ্রী সমস্ত কিছু শুনে বললেন, “নিয়তি যে অসহায় মাতা! … পিতা, তাঁর এই বেদনার নিরাময় আবশ্যক। কেবল তাঁর সন্তান আমরা, আর আমাদের মাতার প্রতি আমাদের প্রেমকে ব্যক্ত করার জন্যই নয়, মানবযোনির রক্ষণের উদ্দেশ্যেও তা আবশ্যক। … কিন্তু পিতা, আমার প্রশ্ন তো এখনো প্রশ্নই রয়ে গেল। আত্ম তো সেই অবস্থায় উন্নতই হয়নি যে, সে অখণ্ড হয়ে উঠে নিয়তির কাছে সমর্পণ করবে। আর সেই কারণেই তো নিয়তি কেবলই বৌদ্ধদের কাছে এই আবেদন করেছেন, কারণ একমাত্র তাঁদেরই আত্ম অখণ্ড অবস্থায় স্থিত হবার স্তরে উন্নীত।
কলা ও বুদ্ধিমত্তার চেতনা তিনি বঙ্গবাসী, মহম্মদের বংশোদ্ভূত এবং ব্রিটিশদেরও দিয়েছেন। তাই বৌদ্ধদের তাঁদেরকে জাগিয়ে তোলার আবাহন করেছেন মাতা, কারণ মাতার চেতনা তাঁদের অন্তরে থাকার কারণে, তাঁদেরই সামর্থ্য আছে নিজেদের আত্মকে এই অন্তিম অবস্থায় উন্নীত করার। … কিন্তু আমার যেই প্রশ্ন, তার উত্তর কি পিতা? আত্ম এই অবস্থায় উন্নীত হয় কি ভাবে? কি সেই পরস্পর ধাপ, যা অতিক্রম করে আত্ম এই অবস্থায় উন্নীত হয়?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “প্রয়োজন পুত্রী। প্রয়োজনকে সম্মুখে রেখেই আত্ম অগ্রসর হয়, আর সেই পথই একসময়ে তাঁদেরকে অখণ্ড হয়ে ওঠার প্রেরণা প্রদান করে”।
দিব্যশ্রী বললেন, “বিস্তারে বলুন পিতা। আমি এই কথা জানতে চাই। আর আমার মনে হচ্ছে যেন, এই সত্য না জানলে, আমি আমার কর্মভার ঠিক ভাবে গ্রহণই করতে পারবো না। তাই কৃপা করে, আমাকে এই প্রয়োজনের বিজ্ঞান ব্যক্ত করুন”।
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, এ এক অদ্ভুত ক্রীড়া। প্রথমেই বলি তোমাকে, অহংকার ও আত্মের মধ্যে ভেদ করতে যাবেনা, কারণ এঁদের দুইজনের কনো ভেদই নেই। অহংকার মানেই হলো আত্ম বোধ, অর্থাৎ আমি’র অস্তিত্বকে স্বীকার করা। কি ভাবে যেই ব্রহ্মের অণুই সম্ভব নয়, সেই ব্রহ্মের অণু জ্ঞান করে, আত্ম নিজেকে নিজে রচনা করে স্বয়ম্ভু হয়, তা তুমি কৃতান্ত থেকে স্পষ্ট ভাবেই জেনেছ।
আর যা সেখান থেকে জেনেছ, সেই অনুসারেই, নির্বিশেষকে ত্যাগ না দিয়েও, কল্পনাবশত তাকে ত্যাগ দিয়ে, আত্ম নিজেকে আত্মজ্ঞানে, অর্থাৎ আমিত্বের জ্ঞানে ভূষিত করে আত্ম হয়ে ওঠে, তাও জেনেছ। আর অহং অর্থাৎ আমিত্ব, আর এই দুইকে মেলালেই বুঝে যাবে, যাহা অহং তাহাই আত্ম। তাই এই দুইয়ের ভেদ করার প্রয়াসও করবে না। তবে হ্যাঁ, আত্মের স্বভাবে প্রায়শই পরিবর্তন হতে থাকে। সেই পরিবর্তন বাস্তবে হয়না, কেবলই আত্মের কল্পনার মধ্যেই হয়।
প্রথম অবস্থায় আত্ম কল্পনা, ইচ্ছা ও চিন্তার প্রভাবে থেকে অহংকে ধারণ করে থাকে। এবং সেই অহংকে ধারণ করে থেকে, কল্পনার মধ্যেই কর্মের ইচ্ছা ও চিন্তা করতে থাকে। বাস্তবে যেহেতু কনো কর্মই হয়না, তাই সেই কর্মের ফল কখনোই আত্মের আকাঙ্ক্ষিত হয়না, আর তাই সে বারংবার কর্মের কল্পনা করতে থাকে। তবে কি জানো তো, এ এক অদ্ভুত মায়া, যা মায়া না হয়েও মায়া।
যেমন জগদম্বার চিঠিতে দেখলে যে বৌদ্ধরা স্পষ্ট ভাবেই বলেছেন যে, নিয়তি হলেন চেতনা, আর চেতনা কল্পনার মধ্যে যুক্ত হয়ে গেলে, আর তাকে কল্পনা মনে হয়না। যেহেতু চেতনা হলেন নিয়তি, এবং নিয়তি হলেন ব্রহ্ম অর্থাৎ যথার্থ, তাই তাঁর নিযুক্ত হবার সাথে সাথেই কল্পনাকেও বাস্তব বলে মনে হয়, আর এটিই হলো মায়া, যেখানে কেউ মায়া করার প্রয়াস না করলেও, মায়া হয়েই চলে।
আর সেই মায়ার বশেই, আত্ম কল্পনাকে বাস্তব মানতে থাকে, আর বাস্তব মানার কারণে মনে করতে থাকে যে তাঁর করা কর্মের উচিত ফললাভ সে করবেই, কিন্তু সর্বকিছুর অন্তে মায়া তো মায়াই হয়, তাই সেই মায়ার ফলরূপে আত্মের আকাঙ্ক্ষার সমাপন কিছুতেই হয়না, আর তাই তাঁর আকাঙ্ক্ষার বৃদ্ধি হতেই থাকে সমানে। এই রহস্য, অর্থাৎ মায়ার রহস্য যখন আত্ম ভেদ করতে পারে, তখন আর সে ইচ্ছা, চিন্তা বা কল্পনাকে নয়, চেতনার মাধ্যমে নিয়তিকেই একমাত্র গুরুত্ব দেয়, আর তাকে গুরুত্ব দেবার সাথে সাথেই সে আর ত্রিগুণে বিভক্ত না থেকে অখণ্ড হয়ে যায়।
তবে সেই সমস্ত কিছু অনেক পরে কথা জীবকটির ক্ষেত্রে। সেই সময় আসন্ন হবার পূর্বে, আত্ম বারংবার এই মায়াতে ভ্রমিত হতে থাকে, আর ততক্ষণ সে ভ্রমিত হতে থাকে, যতক্ষণ না সে এই মায়ার ভেদ জানতে পারে, আর নিয়তির কাছে সমর্পণ করে। তবে সেই ভ্রমের মধ্যেও একটি যথার্থ আছে, আর বহু বহু ভ্রম বিরাজ করছে। অর্থাৎ মায়ার মধ্যেও আরো অনেক মায়া বিরাজ করে। আর সেই মায়ার মধ্যে যা মায়া নয়, তা হলো প্রয়োজন।
অর্থাৎ পুত্রী, প্রয়োজনও একটি মায়া, কিন্তু মায়ার মধ্যে এই প্রয়োজনই একমাত্র যথার্থ, বাকি সমস্ত কিছু হলো মিথ্যা। এবার তুমি বলবে, বাকি সমস্ত কিছু কি আর প্রয়োজনই বা কি, তাই তো? তুমি বলবে কেন প্রয়োজন মায়ার মধ্যে বিরাজ করেই যথার্থ, আর বাকি সমস্ত মিথ্যা, তাই তো?
এই কথার সহজ উত্তর হলো চেতনা। পুত্রী নিয়তি অর্থাৎ প্রকৃতি, যা কেবলই আত্মের দৃষ্টিতেই বা অহংকারের দৃষ্টিতেই প্রকৃতি, আর আসলে শূন্যকায় ব্রহ্ম, তার আত্মদের প্রতি সন্তানপ্রেম থাকার কারণে, তিনি প্রতিমুহূর্তে প্রতিটি আত্মকে নিজের বক্ষে ফিরে পেতে চান, যেমন তুমি তাঁর চিঠি থেকে জানলে। আর তাই তিনি প্রতিটি আত্মকে নিজের কাছে ফিরে পাবার জন্য, আত্মকে মায়ার বন্ধন থেকে মুক্ত করতে চান, অহং-এর বন্ধন থেকে মুক্ত করতে চান, আর চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার বন্ধন থেকে মুক্ত করতে চান। আর সেই চাহিদাকেই আত্ম নিজের মধ্যে চেতনা রূপে অনুভব করে।
পুত্রী, আত্ম নিজের অহংকে বিস্তার করারই ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনা ধারণ করে, আর তাই অবিরাম ভাবে কিছু না কিছুর কল্পনা করে চলে, কিছু না কিছুর চিন্তা করে চলে, আর কিছু না কিছুর ইচ্ছা করতেই থাকে। কিন্তু সেই সমস্ত ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনা আত্মকে মিথ্যার দিকে অগ্রসর করে, যা স্বভাবিক ভাবে পুড়ন হয়না, আর জোর করে তা পুড়ন করতে গেলে, ছলনা, শঠতা ইত্যাদির ব্যবহার করে করে আত্ম শয়তানে পরিণত হয়ে যায়, আর যদি এই শয়তান ভাব দ্বারা সেই সমস্ত ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনাকে মায়ার মধ্যে স্থাপিত করতে সক্ষম হয় সে, তখন সে ভয়নাক অহংকারী হয়ে উঠে, এক বিকট অসুর বা রাক্ষসে পরিণীত হয়ে যায়।
কিন্তু এই মায়ার মধ্যে স্থিত থেকেও, যেই পথে আত্ম অনায়সে অগ্রসর হতে পারে, তা হলো তাঁর প্রয়োজনের পথ। এই পথ সেই পথ, এই ইচ্ছা সেই ইচ্ছা, এই কল্পনা সেই কল্পনা, এই চিন্তা সেই চিন্তা, যাতে স্বয়ং নিয়তি যুক্ত হন, অর্থাৎ যাতে চেতনা মিশ্রিত হয়। আর যেহেতু চেতনা মিশ্রিত হয়, তাই তা মায়া হয়েও যথার্থ হয়ে ওঠে, আর তাই সহজ ভাবেই সেই পথে অহং বা আত্ম অগ্রসর হতে সক্ষম হয়। এই হলো তোমার প্রশ্নের উত্তর অর্থাৎ প্রয়োজনের বিশেষত্ব”।
দিব্যশ্রী বললেন, “এর অর্থ এই দাঁড়ালো পিতা যে, আত্ম হাজারো চিন্তা, ইচ্ছা বা কল্পনা করে। এঁদেরই একটির সাথে চেতনা যুক্ত হন, আর তা হয়ে ওঠে প্রয়োজন। বাকি ইচ্ছা, চিন্তা বা কল্পনার পথেও আত্ম চলতে পারে, তবে সেই পথে চলতে আত্মকে অত্যন্ত জোর খাটাতে হয়। যেমন আপনি বলেছিলেন কৃতান্ত যে, অন্যের ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে সেই কর্মকে সিদ্ধ করতে হয়, তবেই তা ভৌতিক জগতে কর্মরূপে গণ্য করা হয়, বা সাফল্য রূপে পরিগণিত করা হয়, ঠিক তেমনই ভাবে।
আর যেই ইচ্ছা, চিন্তা বা কল্পনার সাথে নিয়তি যুক্ত হয়ে যান, সেটি হয়ে ওঠে প্রয়োজন, আর যেহেতু তা যথার্থ হয়ে ওঠে, তাই এক্ষেত্রে কনো শঠতা, কনো পরিকল্পনা, যোজনা, বা চিন্তা, বা ছলনা, কিচ্ছুই করতে হয়না। স্বাভাবিক রূপেই তা পুড়ন হতেই থাকে। … আর তাই আপনি বললেন, যেই কর্ম প্রয়োজনের উদ্দেশ্যে করা হয়, তাই যথার্থ। আর যেই কর্ম প্রয়োজনের বিরুদ্ধে করা হয়, তাই মিথ্যা, যা সার্থক হলে অহংকারের বিস্তার হয় বা রাক্ষস হয়ে ওঠে ব্যক্তি।
অর্থাৎ যেমন ধরি একটি রাজনৈতিক নেতা। তিনি যদি প্রয়োজনের তাগিদে নেতা হন, তবে অনায়সেই নির্বাচিত হন, কারণ তাঁর সমস্ত কল্পনা স্বতঃই সকলের কল্পনার সাথে মিলে যায়। আর যদি একটি অন্য ব্যক্তি কেবলই ইচ্ছাবশত নেতা হতে চান, তাঁর স্বাভাবিক কল্পনা অন্য সকলের সাথে মেলে না, আর তাই সে নির্বাচিত হয়না। এবার যদি সে সেই ক্ষেত্রে জোর খাটায়, তবে সেই ব্যক্তি শঠতা ও ছলনা করে অন্যের কল্পনার সাথে নিজের কল্পনা মিলে গেছে, এমন দেখান, আর তাই দেখিয়ে নির্বাচিত হন। আর নিজের ছলনার জোরে নির্বাচিত হয়েছেন, তাই তাঁর অহংকার তাঁকে একটি সম্পূর্ণ রাক্ষসে পরিণত করে দেয়।… এই তো পিতা?”
ব্রহ্মসনাতন হাস্যমুখ দ্বারা কন্যার কথার সমর্থন করলে, দিব্যশ্রী আবার প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন আছে আমার। আচ্ছা, এই যে ব্যক্তি, যিনি প্রয়োজনের নিরিখে রাজনীতি করেন, আর তাই তাঁর স্বাভাবিক কল্পনাই নির্বাচকদের কল্পনার সাথে মিলে যায়, তাঁর কি অহংকারের বৃদ্ধি হচ্ছে না! … তাঁরও তো অহংকারের বৃদ্ধি হচ্ছে? সেই ক্ষেত্রে, সে যথার্থতার দিকে কি ভাবে অগ্রসর হলো?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “সঠিক বলেছ পুত্রী। অহংকার সেই ব্যক্তির তখনও চরমে যায়, যখন সে নিজের এই প্রয়োজনকে সিদ্ধ করতে সক্ষম হয়। আর সেই অহংকারের প্রভাবে আরো কিছু প্রয়োজন তাঁর মধ্যে আস্তেই থাকে। তুমি যেমন রাজনেতার কথা বললে, তাঁকেই উপমা ধরলে, প্রথমে তাঁর প্রয়োজন ছিল রাজনেতা হওয়া, কিন্তু একবার তা হয়ে গেলেই, সে আবারও একটি প্রয়োজনের অনুভব করে, আর আবারও অনেক ইচ্ছা, কল্পনা চিন্তা এসে ধরে তাকে, যা তাঁর প্রয়োজনের থেকে ভিন্ন। যেই পথেই সে যাত্রা করুক, তাঁর অহংকার বৃদ্ধি পেতেই থাকে, আর সে নিজেকে বিশেষ মানতেই থাকে।
পুত্রী, এই বিশেষত্বের কামনাতেই তো সে ব্রহ্মত্ব ত্যাগ করে আত্ম হয়ে উঠেছিল, তাই এই বিশেষত্ব গ্রহণ যে তাঁর চয়নের পরিণাম, আর সে তা গ্রহণ করতেই থাকে। আর এই অহংকার একসময়ে বৃদ্ধি পেতে পেতে, সে এমন অবস্থায় উপস্থিত হয়ে যায়, যেখানে সে নিজেকে ভগবান চাইতে শুরু করে দেয়। ভগবানকে পাবার প্রয়াস শুরু করতেই, শুরু হয় তাঁর সংগ্রাম। আর এবারে তাঁর সংগ্রাম হয় যথার্থের সাথে, যেখানে তাঁর অহংকার বিশ্রী ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে, তাঁর অহংকারকে সম্পূর্ণ ভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়, ও তাঁকে ত্রিগুণকে একত্রিত করে অখণ্ড হতে বাধ্য করা হয়।
কিন্তু পুত্রী, এক জীবকটিকে এই অবস্থায় উন্নীত হতে সহস্র লক্ষ দেহধারণ করতে হয়। আর যদি এঁর মাঝে সে নিজের প্রয়োজনকে ত্যাগ করে, অন্য ইচ্ছাকে ছল, চাতুরী ও শঠতা দ্বারা পূর্ণ করার প্রয়াস করে, তবে তো আসুরিকতা তাঁর এই সহস্র লক্ষ জন্মকে সহস্র কোটি জন্মে পরিণত করে দেয়, আর তারই সাথে যখন ভয় বা শঙ্কা যুক্ত হয়ে যায়, আর প্রয়োজনকে বিকৃতপথে লাভ করার চিন্তা করে সে, তখন সেই পথ লক্ষ কোটি জন্ম পর্যন্ত ব্যপ্ত হয়, আবার মাঝে পিশাচও হয়ে যেতে পারে হতাশায়, সেই ক্ষেত্রে কবে যে সে ত্রিগুণকে একত্রিত করতে পারবে, তার কনো হিসাবই থাকেনা।
তাই প্রতিটি ব্যক্তিকে এই প্রয়োজনের পথে চালিত করার প্রেরণা দেওয়াই হলো ধর্মগুরুদের কর্তব্য, কারণ তখনই তাঁরা সর্বাধিক কম সময়ের মধ্যে জগন্মাতার ক্রোড়ের নিকটে পৌছাতে সক্ষম, ও নিজের লক্ষ্যপ্রাপ্তি করে মোক্ষলাভ করতে সক্ষম”।
দিব্যশ্রী বললেন, “যিনি প্রয়োজনের পথে চললেন না, আর নিজের ইচ্ছাগুলিকে কার্যকর করার প্রয়াস করলেন, তিনি আসুরিক হয়ে উঠলেন, কারণ তাঁর অহমিকা অতিকায় হয়ে উঠলো। আর যিনি সেই প্রয়োজনের পথে চললেন, তিনিও অহংকারী হয়ে উঠলেন। কিন্তু এই দুই অহংকারের মধ্যে ভেদটা সঠিক ভাবে বুঝতে এখনো পারিনি। হয়তো সঠিক বিষয়টা আমি এখনো ধরতে পারিনি। তাই সঠিক স্থানটি একটু ধরিয়ে দেবেন!”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, দেব ও অসুর, উভয়েই অহংকারের পূজারি। যিনি অসুর তিনি নিজেকে স্বয়ং ঈশ্বর মানতে শুরু করেন, কারণ ছল চাতুরী করে ইনি নিজের ইচ্ছাকে নিজেই সফল হবার কল্পনা করেন। আর যিনি প্রয়োজনের পথে চলেন, তিনিও নিজের ইচ্ছাকে পুড়ন হতে দেখেন, কিন্তু তিনি এও দেখেন যে তিনি স্বয়ং প্রচেষ্টা করে তা পূর্ণ করছেন না, বরং কনো এক অজানা শক্তি সমানে তাঁকে দিয়ে সমস্ত কিছু পূর্ণ করিয়ে দিচ্ছেন। তাই সেই অদৃষ্টকে তিনি ভগবান বলেন, এবং সেই ভগবানের সম্মুখীন হতে ইচ্ছা করেন শেষে। আর নিয়তি ঠিক এটিই তো চান, যেখানে আত্ম তাঁর সাখ্যাত চাইবেন।
আর সেই সাক্ষাত লাভের কামনার কালেই আত্ম সাধক হয়ে ওঠেন। অর্থাৎ পুত্রী, পরিণতি তিনটি। একটি তিনি যিনি প্রয়োজনের মার্গে না চলে, নিজের অহংএর পথে চলতে চায়, আর সেই ক্ষেত্রে যা কিছু সে কল্পনা করে, তা সেই কল্পনার সাথে সংযুক্ত অন্যদের সাথে না মেলার কারণে সে হতাশ হতে হতে পিশাচে পরিণীত হয়ে যায়। দ্বিতীয়টি তিনি, যিনি অন্যের কল্পনার সাথে নিজের কল্পনাকে মেলানোর জন্য শঠতা করেন, আর ক্রমে অসুর হয়ে ওঠেন। আর তৃতীয় তিনি, যিনি প্রয়োজনের পথে চলতে চলতে, অদৃষ্টের উপস্থিতিকে অনুভব করেন এবং তাঁর সাখ্যাত কামনা করে দেব হয়ে উঠে, সাধনায় লিপ্ত হন”।
দিব্যশ্রী বললেন, “কিন্তু পিতা, প্রয়োজনের পথে চললেও তো অহংকার নিজের আকাঙ্ক্ষাকে পূর্ণ হতেই দেখবে। তারপরেও সেই পথে চলতে চায়না কেন সে?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “চায়না, তেমন নয়। ততক্ষণ সেই পথে চলতে চায়, যতক্ষণ তাঁকে সেই পথে অগ্রসর হওয়া থেকে সকলে বাঁধা প্রদান করে, এবং তাঁর এই যাত্রাকে অবান্তর ও দুঃসাহসিক বলে চিহ্নিত করে। কিন্তু যেই মুহূর্তে, সেই পথেই চলার প্রেরণা দেওয়া হয় তাঁকে, সেই মুহূর্ত হতে সেই পথে চলার ক্ষেত্রে তাঁর মধ্যে অনীহা ক্রিয়া করে। আর এঁর কারণ হলো অহংকারের স্বভাব।
পুত্রী, অহংকার নিজেকে বিশেষ জ্ঞান করতে চায়; সে নিজেকে সকলের থেকে ভিন্ন প্রমাণ করতে ব্যস্ত; সকলের থেকে শ্রেয়, সকলের থেকে উচ্চ, সকলের থেকে উন্নত প্রমাণ করতে চায়। আর যখন কেউ তাঁকে কনো পথে যাত্রা করার সম্পূর্ণ তত্ত্ব তাঁর সামনে রেখে দেয়, তখন তাঁর ধারণা হয় যে, সে তো বিশেষ নয়, কারণ তাঁর থেকেও বিশেষ কেউ আছে। তাই সে সেই পথ থেকে সরে আস্তে চায় তখন”।
দিব্যশ্রী হেসে বললেন, “অর্থাৎ পিতা, প্রয়োজন হলো সেই ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনা, যার সাথে চেতনা যুক্ত হন, বা নিয়তি যুক্ত হন। আর তিনি সেই পথের সাথেই নিজেকে যুক্ত করেন, যেই পথে গমন করলে, একজন আত্ম সহজে এবং কম সময়ে তাঁর ক্রোড়ে উপস্থিত হতে পারেন। … আর এই পদ্ধতিতে তারমানে জগন্মাতা আত্মকে তাঁর নিজের অহংকারের সাথে তাঁর পরিচয় করিয়ে দেন, আর সে যে ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার দাস হয়ে অবস্থান করছে, তা তাঁর নেত্রের সমক্ষে তুলে ধরেন।
যতক্ষণ অহংকার প্রকাশিত থাকে, ততক্ষণ তা অধরাই থাকে আত্মের কাছে। কিন্তু অহংকার বৃদ্ধি পেতে পেতে, যখন সে ভগবানের সাখ্যাত কামনা করে, তখন সে সাখ্যাত যথার্থের ধারণামাত্রেই নিজের অহংকারকে বিশ্রী ভাবে পরাজিত হতে দেখে, আর তাই তখন সে নিজের ত্রিগুণকে একত্রিত করে নিজের অহংকারকে আত্মসাৎ করে নিয়ে, সেই অহংকার বা বিশেষত্বকে রক্ষা করার প্রয়াস করে। অর্থাৎ চেতনা বা জ্ঞানচক্ষু লাভ করে সে ত্রিগুণ থেকে অখণ্ড হয়না, একপ্রকার বাধ্য হয়েই সে অখণ্ড হয়। … হ্যাঁ কৃতান্ততে তো অখণ্ডও এই একই ভাবে একত্রিত হয়, বাধ্য হয়েই তাঁর ত্রিগুণ একত্রিত হয়ে অখণ্ড হয়।
কিন্তু পিতা, আমার একটি প্রশ্ন রয়েছে এখানে। অগুন্তি ইচ্ছা, তার মধ্যে কোনটির সাথে নিয়তি যুক্ত হয়েছেন, অর্থাৎ কোনটি প্রয়োজন, আর কোনটি নয়, তা বুঝবে কি করে জীবকটি?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “অতি উত্তম প্রশ্ন পুত্রী। … আর তোমার প্রশ্নের উত্তর হলো, প্রত্যাবর্তন। সেই প্রয়োজনকে যতই অদেখা করুক না কেন আত্ম, তা বারেবারে, ফিরে ফিরে আসে তাঁর সম্মুখে। বাকি সমস্ত ইচ্ছাকে সে অদেখা করে দিতে পারে, কিন্তু এই ইচ্ছার থেকে সে নিজেকে কিছুতেই সরিয়ে রাখতে পারেনা। যতবারই সেই ইচ্ছার থেকে নিজেকে অপসারিত করার প্রয়াস করে, সে হতাশার মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে যায়। আর তাই, সেই ইচ্ছা, যা তাঁকে শিশুকাল থেকে তরুণ অবস্থা পেরিয়ে, যুবক অবস্থা পর্যন্ত ধাওয়া করে চলে, তাই হলো প্রয়োজন, অন্যগুলি সেই ইচ্ছা, যারা বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে খসে পরে গেছে, তারা নয়”।
দিব্যশ্রী তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, “এবার বুঝলাম পিতা, প্রয়োজনের মাহাত্ম কি। বুঝলাম যে সাধারণ জীবকটি এই প্রয়োজনের পথে চলে চলে, অনায়সেই সাধনার দ্বারে উপনীত হতে পারে, এবং নিজেই নিজের উদ্ধারের মার্গ গঠন করতে পারে। আর একবার সাধনার মার্গে উত্থিত হয়ে গেলে, তারপর তো আপনি কৃতান্ত বলেইছেন, যেখানে বৈরাগ্য ধারণ করতে হয়, অর্থাৎ আসক্তি বিরক্তি উভয় থেকে মুক্ত হয়ে, সম্মুখে যা উপস্থিত তাকেই সমানে গ্রহণ করে যেতে হয়।
বুঝলাম যে প্রয়োজন হলো সেই ইচ্ছা, যেইটি সহস্র ইচ্ছার মধ্যে একটি ইচ্ছা, এবং শৈশব কালে গ্রহণ করা ইচ্ছা, যার থেকে কিছুতেই পিছু ছাড়ানো যায়না। আর এও বুঝলাম যে, যখন সেই পথে চলার কথা কেউ তাঁকে বুঝিয়ে বলে দেয়, তখন অহংকার সেই পথে চলতে চায়না, কারণ সেই পথে চললে, সে নিজের বিশেষত্বকে লাভ করতে পারবে না, এই ধারণা তাঁর মধ্যে এসে যায়। আর তখন সে অন্য একটি ইচ্ছাকে সাকার করার জন্য তেড়েফুঁড়ে ওঠে।
সেই ক্ষেত্রে সে যা কল্পনা করে, তা যদি সেই কল্পনার সাথে যুক্ত সকলের কল্পনার সাথে না মেলে, তখন আসে হতাশা, যা দানা বাঁধতে বাঁধতে একসময়ে তাঁকে এতটাই হতাশ করে দেয় যে, সে আর দেহ গ্রহণ করার মানসিকতাতেই থাকেনা, আর তাই পিশাচ হয়ে যায়। আবার যদি সেই কল্পনার সাথে সংযুক্ত অন্য আত্মদের কল্পনার সাথে মেলানোর প্রয়াসে, সে নিজের কল্পনাকে বিকৃত করার প্রয়াস করে, তখন তার অহংকার এমন স্থানে উন্নীত হয়ে যায় যে, সে নিজেকেই নিজে ভগবান মানতে শুরু করে দেয়, আর তাই অসুর হয়ে ওঠে, এবং একসময়ে সেই অহংকারের নাশ হলে, সে নিকৃষ্ট যোনিতে পতিত হয়ে, পুনরায় উন্নত যোনি লাভের সংগ্রাম করতে থাকে।
কিন্তু এই সমস্তই হলো মায়া, তাই না পিতা? এই সব কিছুই তো বাস্তবে হচ্ছেনা! কেবলই কল্পনার মধ্যের খেলা। অর্থাৎ এঁর মধ্যে যথার্থ কিছুই নেই, কিন্তু তাও প্রয়োজন হলো এই মায়ার মধ্যে থাকা যথার্থ। … কিন্তু নিয়তি বা প্রকৃতি অর্থাৎ যথার্থ কেন এই কল্পনার মধ্যে প্রবেশ করে, কনো এক ইচ্ছার সাথে যুক্ত হন? তিনি যদি এই মায়ার মধ্যে প্রবেশ না করতেন, তাহলে তো প্রয়োজন বলে কিছুই থাকতো না। আর তাহলে তো একসময়ে সমস্ত খেলা বন্ধই হয়ে যেত, তাই না!”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “না পুত্রী, বন্ধ হতো না। সমস্ত জগতে অসুরই অসুর হতো। একে অপরকে হত্যা করতো, কিন্তু তাতে কি হতো? আত্ম কি আত্মের স্বরূপের ধারণা করতে পারতো? পারতো না, তাই না! মৃত্যু তো অন্ত নয় পুত্রী। যদি মৃত্যুই অন্ত হতো, তাহলেই একমাত্র এই সার্বজনীন আসুরত্ব সমাধান প্রদান করতে পারতো আত্মকে। কিন্তু তা তো নয়। মৃত্যু তো কেবলই একটি পরিবর্তন, যাত্রাবদল মাত্র। যখন একটি দেহে বিরাজ করা আত্ম বা অহং দেখে যে সে নিজের লক্ষ্যে এই দেহে থেকে পৌছতে পারবেনা, তখনই সে যাত্রাবদলের দিকে অগ্রসর হয়।
অর্থাৎ মৃত্যু দ্বারা তো কাজ হবেনা! কাজ হবে চেতনার দ্বারা। সত্যের চেতনাই একমাত্র এই ক্রীড়াকে সমাপ্ত করতে পারে, আর তাই সত্য অর্থাৎ যথার্থকে তো এই ক্রীড়ার মধ্যে প্রবেশ করতেই হতো, তাই না! … আর তাই তিনি প্রবেশ করেন, এবং একটি ইচ্ছার সাথে যুক্ত হয়ে প্রয়োজনের প্রকাশ করেন, এবং তা করা মাত্রই তিনটি পরিণাম এসে যায় আত্মের সম্মুখে, এবং সে এই তিন মার্গের বিচার করতে বাধ্য হয়, যা এক সময়ে তাঁকে যথার্থের সম্মুখীন করেই দেয়।
হ্যাঁ, যত শীঘ্র সে প্রয়োজনের পথে চলতে শুরু করে, তত শীঘ্র সে যথার্থের সম্মুখীন স্থিত হয়। আর যত অধিক সে প্রয়োজনের পথে চলতে বিলম্ব করে, ততই কল্পকালের ক্ষয় হয়। আর হ্যাঁ, সঠিক বলেছ তুমি। মায়ার রচনা কেবল ও কেবল আত্ম বা অহংই করে, যথার্থের কনো প্রয়োজন নেই এই মায়া রচনা করার। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, অর্থাৎ সম্পূর্ণ কল্পনার কাণ্ডারি হলেন অহং অর্থাৎ আত্ম, আর তাতে যথার্থের কনো প্রকার কনো যোগদান নেই। আর যে যখন যথার্থের সম্মুখীন হয়ে যথার্থকে প্রত্যক্ষ দর্শন করে, তখন তাঁর কাছে না থাকে এই মায়া, আর না থাকে এই মায়াবী অর্থাৎ কাল্পনিক ব্রহ্মাণ্ড, আর সেই অবস্থাকেই বলা হয় সমাধি, বা মোক্ষ।
কিন্তু হ্যাঁ, যেমন জগদম্বার চিঠি থেকে জানলে তুমি, তিনি সম্পূর্ণ একাকী, আর তাই যখন আত্ম তাঁর থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় কল্পনার মাধ্যমে, তখন তিনি সন্তানসুখ লাভ করেন। তবে সেই সন্তানরা যখন তাঁকেই উপেক্ষা করে অবস্থান করে, তখন তিনি তাঁদের ফিরে পেতে ব্যাকুল হয়ে যান, আর তাই এই মায়ার মধ্যে তিনি প্রবেশ করেন, এবং চেতনা প্রদান করে, প্রয়োজনের প্রকাশ করে, সাধনাকে মাধ্যম করিয়ে, সন্তানদের নিজের কাছে টেনে আনতে ব্যকুল থাকেন”।
দিব্যশ্রী এবার বেশ চিন্তিত ভাবে বললেন, “তাহলে জগত নিয়তিকে অর্থাৎ যথার্থকে মহামায়া কেন বলে? সে কি একটি বিভ্রান্তি?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, মহামায়া নামকরণটি করেন বৌদ্ধরা, আর তাঁদের এই নামকরণের মধ্যে কনো প্রকার বিভ্রান্তি ছিলনা। কিন্তু যখন আর্যব্রাহ্মণরা এঁদের পুঁথির থেকে তস্করি করে ইনাকে মহামায়া বলে, সেখানে এসে যায় বিভ্রান্তি। বৌদ্ধদের কাছে এই নিয়ে কনো বিভ্রান্তি ছিল না যে, মায়ার রচয়িতা হলেন আত্ম বা অহং। আর সেই মায়ার মধ্যে প্রবেশ করেন যথার্থ, এবং মায়ার মধ্যে যথার্থতার যে চক্রকে তিনি চালান, তাতে আত্ম বা অহং নিজের মায়ার মধ্যে স্থিত হয়েই বিভ্রান্ত হয়ে যায়, আর তাই তাঁরা তাঁকে মহামায়া বলেছেন।
কিন্তু এই আত্মসৃষ্ট মায়া, অর্থাৎ অহংকারের দ্বারা নির্মিত মায়া, আর্যব্রাহ্মণদের কাছে ছিল শ্রেষ্ঠ উপহার। তাই তাঁরা অহংকারের ত্রিরূপ বা ত্রিদেবকে মায়াদ্বারা সুসজ্জিত করে রাখেন, এবং তাঁদের সকলকে মায়াশ্রেষ্ঠ করে স্থাপনা করেন। আর এরপরে যখন বৌদ্ধগ্রন্থের অনুকরণ করতে গিয়ে অসুরদের কথাও বলতে হয়, তখন এঁরা পড়ে যায় বিপদে। একবার মায়ার রক্ষাকর্তাকে তাঁরা ভগবান রূপে স্থাপনা করে দিয়েছেন, তাহলে মায়ার প্রসারকদের অসুর বলবেন কি করে – এই হয়ে দাঁড়ায় বিপদ।
আসলে বৌদ্ধরা কখনোই অহংকারকে, বা অহংকারের ত্রিগুণকে ভগবানের আসন দেননি, কারণ তাঁরা বিভ্রান্ত, তাঁরা স্বয়ং ব্রহ্ম হয়েও, ব্রহ্মের শূন্যতা, ব্রহ্মের নির্বিশেষতা থেকে বিমুখ। আর তাঁদেরই এই ত্রিগুণের বাড়বাড়ন্তকে তাঁরা অসুরত্ব বলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণরা যাদেরকে বৌদ্ধরা অসুরত্বের প্রথম ধাপ বলে চিহ্নিত করে রেখেছিলেন, তাঁদেরকে ইতিমধ্যেই ভগবান করে স্থাপন করে ফেলেছেন। এবার তাহলে অসুরদের কি রূপে দেখাবেন?
তাই ব্রাহ্মণরা দেখানোর আপ্রাণ প্রয়াস করতে থাকলেন যে, ত্রিদেবের সাথে ত্রিগুণের কনো সম্পর্ক নেই, আর ত্রিগুণ হলো অসুর। … আর সেই প্রয়াস থেকেই, তাঁরা দেখান যে তারকাসুরের তিনপুত্র, যারা আসলে ত্রিগুণ, আর তাঁদের দমন করছেন শিব, যিনি বৌদ্ধগ্রন্থ অনুসারে তমগুণ হলেও, ব্রাহ্মণদের রচনায় তিনি ভগবান। … আর এই বিভ্রান্তির কারণে, ব্রাহ্মণরা বাধ্য হন সেই প্রকৃতিকে নিজেদের গ্রন্থে ডেকে আনতে, যাকে তাঁরা বৌদ্ধগ্রন্থ থেকে গ্রহণ করতেই রাজিছিলেন না, কারণ তিনি অহংকারের দমন করেন।
কিন্তু তাঁকে ডেকে আনলেও, কি ভাবে রাখলেন ব্রাহ্মণরা? দেখালেন যে এই মহামায়া আসলে ত্রিদেবের দাসী, আর তাঁদেরই মায়া শক্তিই হলেন এই মহামায়া, যিনি অহংকারের মায়া, অর্থাৎ অসুরদের মায়ার নাশ করেন, যা সময়ে সময়ে ত্রিদেব স্বয়ংও করেন। … এবার বুঝতে পেরেছ পুত্রী, বৌদ্ধগ্রন্থকে বিকৃত করতে যাবার পথে, এই ব্রাহ্মণরা প্রকৃতিকে চেষ্টা করেও ত্যাগ দিতে পারলেন না। কিন্তু আরাধ্য সেই অহংকারকেই রাখলেন, প্রয়োজনে অহংকার অন্য কেউ, আর তাঁরা অহংকার মুক্ত এমন মিথ্যাচার করতে হলে, তাই করেন তাঁরা।
কিন্তু সেখানেও ব্রাহ্মণরা পদে পদে নিজেদেরকেই অপদস্থ করেছেন। এই ধরো যেমন দুর্বাসা দেখিয়ে দিয়েছেন যে, নারায়ণ অর্থাৎ রজগুণের লক্ষ্মীর উপর কনো নিয়ন্ত্রণ নেই, দেবতাদের অভিশাপের ফলে, নারায়ণকে ছেড়ে চলে গেলেন লক্ষ্মী। আবার যেমন বাল্মীকি দেখিয়েছেন, সরস্বতীর প্রতি কনো নিয়ন্ত্রণ নেই ব্রহ্মার। যেখানে ব্রহ্মা বরদান দিতে গেছেন, সেখানে কুম্ভকর্ণের জিহ্বায় সরস্বতী উপবেশন করে, তাঁকে দিয়ে ইন্দ্রাসনের পরিবর্তে নিদ্রাসন কামনা করায়।
আর আরো ক্ষতিকারক ভাবে দেখিয়েছেন মার্কণ্ড। তিনি তো দেখিয়ে দিয়েছেন যে সতী নিজের দশমহাবিদ্যা দর্শন করিয়ে, শিবের কর্তৃত্বকেই উপেক্ষা করে দক্ষের পুরীতে চলে গেলেন। অর্থাৎ বারংবার দেখানো হিয়েছে যে এই নিয়তিকে যতই ত্রিখণ্ডে বিন্যস্ত করে রাখার প্রয়াস করে, নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়াস করুক ত্রিদেব, কিন্তু নিয়তি তাঁদের নিয়ন্ত্রণে কখনোই স্থাপিত থাকেনা, কারণ তাঁরা যে স্বয়ং নিয়তির দাস।
এই সমস্ত কিছু মেলালে পুত্রী, ব্রাহ্মণদের সমস্ত রচনা কেবলই মিথ্যাচার, যাতে বাস্তবতা কিছুই নেই। হ্যাঁ সূক্ষ্মতত্ত্বকে সরাসরি বৌদ্ধদের যন্ত্রতন্ত্র থেকে তুলে ধরেছেন তাঁরা, তাই সূক্ষ্মতত্ত্ব অর্থাৎ যাকে তোমরা বলো জ্যোতিষ, তা যথার্থ ভাবেই মনোবিজ্ঞান। এখানে কেবল একটিই স্থানে তাঁরা উপরচালাকি করেছেন, আর তা হলো এই গ্রহদের যেখানে বৌদ্ধগ্রন্থ নিয়ন্ত্রণ করার প্রশিক্ষণ দেয়, সেখানে ব্রাহ্মণরা এঁদের মান্যতা প্রদান করে, এঁদের দাস হয়ে থাকার নির্দেশ দেয়।
সব কিছু মেলালে, এই আর্যরা, যারা এই সমস্ত গ্রন্থের রচনা করেছেন বলে দাবি করেন, তাঁরা সমস্তই মিথ্যাচারী, কারণ তাঁরা এই সমস্ত গ্রন্থের রচনাই করেন নি। আর্যদের মধ্যে কেউ যদি কনো গ্রন্থের রচনা করে থাকেন, তাঁরা হলেন মার্কণ্ড ও কৃষ্ণ, যেখানে মার্কণ্ডের রচনা মার্কণ্ডমহাপুরাণকে বিনষ্ট করার জন্য ব্রাহ্মণরা সদাব্যস্ত থাকতেন, কারণ তা অহংকারের আরাধনা করে না, আর কৃষ্ণের রচিত জয়া অর্থাৎ মহাভারতের গুহ্য অর্থ ব্রাহ্মণরা আজও উপলব্ধি করতে পারেন নি। অন্য সমস্ত গ্রন্থ বৌদ্ধগ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত এবং বিকৃত।
(সামান্য হেসে) আসলে পুত্রী, ব্রাহ্মণরা যেই উচ্চতায় নিজেরা পৌঁছেছেন বলে দাবি করেন, সেই উচ্চতার নখস্পর্শও কনোদিন করেন নি তাঁরা। কেবলই মিথ্যাচার, ভেল্কিবাজি, অনাচার আর নিকৃষ্ট মানসিকতার অবতার তাঁরা। যারা সত্যে কনোদিন যাত্রাই করেনি, তাঁদের কথাকে কনো গুরুত্ব প্রদানের কনো প্রয়োজন নেই”।
দিব্যশ্রী বললেন, “বেশ বুঝে গেছি পিতা এবার। সাধারণ মানুষের উদ্ধারের মার্গ কি। কিন্তু একটি কথা আমার কাছে এখনো পরিষ্কার নয়। আত্মই অহং, আর অহংই আত্ম, এই কথাকে আপনি বারবার বুঝিয়েছেন আমাকে। কিন্তু একটি জিনিসে আমি অত্যন্ত দ্বিধাগ্রস্ত। আত্ম স্বরূপে ব্রহ্ম অর্থাৎ যথার্থ। সে নিজের সত্যতাকে অবমাননা করে, ভ্রমিত হয়ে শূন্যত্ব ত্যাগ করে, কল্পনাতেই কেবল অণু। তাই আত্ম তো কনোভাবেই আমাদের অরি নয়, কিন্তু সেই আত্মই অহং, আর অহং আমাদের শত্রু। এই ব্যাপারটি বড়ই গোলমেলে”।
