কৃতান্তিকা

দিব্যশ্রী উৎকণ্ঠিত হয়ে বললেন, “মা, আর একটি জিনিস আমার তোমার থেকে জানার আছে। তোমাকে সম্পূর্ণ ভাবে জানা বোধহয় তোমার নিজের পক্ষেও সম্ভব নয়। তাই সম্পূর্ণ ভাবে জানার স্পর্ধা আমি দেখাবো না। তবে একটি জিনিস সম্বন্ধে আমি জানতে ইচ্ছুক, কারণ এই জিনিসের ব্যাপারে মানুষের কৌতূহল অত্যন্ত অধিক, আর সত্য বলতে ঠিক এই দুর্বলতাকে ব্যবহার করেই আর্যরা মানুষকে ভীত ও লোভী করেছিলেন।

হ্যাঁ মা, আমি তোমার থেকে মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থা সম্বন্ধে জানতে চাই। যাতে মানুষকে এই মৃত্যুর পর অবস্থা নিয়ে কেউ আর কখনো বোকা বানাতে না পারে, বা মনগড়া গল্প শোনাতে না পারে, তাই আমি তোমার থেকে এই বিষয়ে বিস্তারে শুনতে আগ্রহী”।

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “আমি অত্যন্ত তৃপ্ত পুত্রী যে, তুমি এই জ্ঞান ও বিজ্ঞান নিজের উন্নতির জন্য নয়, বরং নিজের অন্তরের মাতৃত্বকে ধারণ করে, তোমার সমস্ত সন্তানের কল্যাণের জন্য তা শুনতে আগ্রহী। বেশ আমি তোমাকে সেই কথা এবার বিস্তারে বলছি শোনো।

পুত্রী, তোমরা যাকে মৃত্যু বলে থাকো, তা হলো এই পঞ্চভূতশরীরের মৃত্যু মাত্র, আর যাকে জন্ম বলে থাকো, তাও এই পঞ্চভূতশরীরের জন্ম মাত্র। আমাদের বাস্তবিক জন্ম তখন হয়েছিল, যখন আমরা প্রথম ব্রহ্মত্ব ত্যাগ করে ব্রহ্মাণু ধারণ করেছিলাম, আর আমাদের প্রকৃত মৃত্যুও সেইদিন হবে যেদিন আমরা মহানন্দে মোক্ষধারণ করে, পুনরায় ব্রহ্মাণু থেকে ব্রহ্মস্বরূপ হয়ে উঠবো।

এরই মাঝে আমরা আমাদের স্বরূপকে চেনার জন্য, এবং স্বরূপে প্রত্যাবর্তনের পথ সন্ধানের জন্য লক্ষ লক্ষ দেহ ধারণ করি, আর এই প্রতিটি দেহধারণকে জন্ম বলে থাকি, আর সেই দেহত্যাগকে মৃত্যু। কিন্তু এই দেহ্যত্যাগের কালে আমরা কি নিয়ে থাকি, আর কি কি ত্যাগ করি! এই হলো মানুষের সব থেকে বড় চিন্তা, সব থেকে বড় দ্বন্ধ।

পুত্রী, আমরা একটি দেহত্যাগের কালে, এই দেহের অন্তরে স্থিত রাজা অর্থাৎ ব্রহ্মাণুকে ধারণ করে থাকি অর্থাৎ আমাদের অহমকে ধারণ করে থাকি কেবল, অর্থাৎ আমিত্ববোধকেই কেবল ধারণ করে থাকি। আর এই আমিত্ববোধ নিজের সাথে ধারণ করে রাখে মন বা মানসকে, অর্থাৎ পঞ্চভূতের অধীশ্বর বা আকাশতত্ত্বকে। আর এই আকাশতত্ত্ব, নিজের সাথে ধারণ করে থাকে বাকি চার ভূতের প্রতি আসক্তিকে।

এই আসক্তির কারণে, এই বাকি চার ভূতের মধ্যে বিরাজমান সমস্ত সংস্কারকে ধারণ করে রাখে সে। আর আমাদের অহম যাকে ধারণ করে রাখতে বাধ্য হয়, তা হলো চেতনাকে। যেই যৎসামান্য চেতনার ধারণা তাঁর থাকে, তাঁকেই তিনি ধারণ করে রাখেন। কিন্তু এখানে ক্রিয়া স্বয়ং চেতনা করেন, কারণ স্বয়ং চেতনা নিজের আবেশকে, অর্থাৎ যাকে আমরা বিবেক বলে থাকি, তাঁকে সমস্ত সময়ে ব্রহ্মাণুর সাথে না চাইতেই যুক্ত রাখেন।

অর্থাৎ মধ্যা কথা এই যে, ব্রহ্মাণু নিজেকে যতই অণু মনে করুক বা কল্পনা করুক না কেন, আর যতই নিজের স্বরূপ ভুলে থাকুক সে, স্বরূপ যে তাঁকে কখনোই ভুলতে পারেনা, আর সেই স্বরূপের আভাসই হলো বিবেক, আর এই বিবেক যখন দেহের মধ্যে নিবাস করে, তখন প্রচুর স্মৃতি নিজের কাছে রাখে, যেখানে মস্তিষ্কের স্মৃতিপটের মত ঘটনা বা ঘটনার থেকে লাভ করা সম্পদ, নাম, যশ, সম্মান অসম্মান, অপমান, অপযশ থাকে না, বরং তাতে থাকে কেবলই লব্ধ ভাব, অর্থাৎ স্নেহ, মমতা, বিশ্বাস, ভক্তি, ইত্যাদি সমস্ত ভাবের ও অনুভবের স্মৃতি।

পুত্রী, মস্তিষ্ক যা কিছু ধারণ করে ছিল স্মৃতি রূপে, অর্থাৎ সমস্ত লাভ, লোকসান, মোহ, আসক্তি, বিরক্তির স্মৃতি, সমস্ত কিছু দেহত্যাগের সাথে সাথেই চলে যায়। কিন্তু যা যায়না, তা হলো বিবেকের স্মৃতি। অর্থাৎ কি কি অবশিষ্ট রইল দেহত্যাগের সাথে? অহমবোধ, অহমের বিচরণক্ষেত্র অর্থাৎ আকাশ বা মন, মনের সমস্ত ভূতের প্রতি আসক্তি আর সেই আসক্তির ফলে লব্ধ সমস্ত সংস্কার, এবং অন্তে অবশিষ্ট থাকে বিবেক অর্থাৎ চেতনার বা ব্রহ্মের ব্রহ্মাণুর প্রতি অনুরাগ, আর সেই অনুরাগের সমস্ত স্মৃতি।

পুত্রী, এই যে মনের আসক্তি অন্যভূতদের প্রতি, যার কারণে সমস্ত দেহের থেকে লব্ধ সমস্ত সংস্কার অবস্থান করে, এই আসক্তির  আয়ু সর্বাধিক ৩৪২ দিবস মানুষের ক্ষেত্রে, যার গড় আয়ু ধরে নেওয়া হয় ৭০। এবার যেই দেহের যেমন আয়ু, সেই অনুসারে এই সময়কালের ভেদ হতে থাকে। মৃত্যুর পর, এই আসক্তি থাকতেই পরবর্তী দেহধারণ করে নিতে হয়, যদি তা সম্ভব হয়, তবে সমস্ত সংস্কার পরবর্তী দেহের বুদ্ধিতে নিজেকে বিস্তৃত করে নেয়, আর বয়সের সাথে সাথে সেই সমস্ত সংস্কারকে আমরা পুনরায় ধারণ করেনি।

কিন্তু যদি এই সময়কাল, অর্থাৎ মানুষের ক্ষেত্রে যা ৩৪২ দিবস, সেই সময়কাল যদি চলে যায়, আর দেহধারণ না হয়, তবে সমস্ত সংস্কারের নাশ হয়, আর এর ফলে, আর দেহধারণ সম্ভব হয়না। বহুকাল এই বিনা দেহে থাকতে হয়, যাকে আমরা পিশাচ বলি, আর অবশেষে, পুনরায় শুরু থেকে শুরু করতে হয়, প্রস্তর যোনি থেকে, এবং পূর্বের সমস্ত দেহধারণ অহেতুক হয়ে যায়, যার কনো সংস্কারই আর স্মরণ থাকেনা।

সেই ব্যতিক্রমী সত্ত্বাদের কথাতে পরে আসছি, কারণ তাঁদের কথাতে আসার আগে, বিচিত্র কিছু কথা আমাদের জানা আবশ্যক। আর শুধু আমাদের নয়, যারা মৃত্যুলাভ করার পরেও, আসক্তির কারণে সেই স্থানেই অবস্থান করেন, তাঁদেরকেও এতক্ষণ যা কিছু বললাম আর এবার যা কিছু বলবো, তা শ্রবণ করালে, তাঁরা সহজেই পরবর্তী দেহধারণ করতে পারেন, এবং নিজেদের অসমাপ্ত জীবনকে সমাপ্তির দিকে অগ্রসর করতে পারেন।

পুত্রী, এমন ব্যক্তির সংখ্যা খুবই কম, যার মধ্যে চেতনার উদয় সম্ভব হয়েছে, অর্থাৎ বিবেক জাগরিত হয়েছে। তাই বিবেকের দংশন এক প্রচলিত শব্দ হলেও, সেই বিবেকের দংশন আমরা আমাদের জীবদ্দশায় প্রায় লক্ষ্যই করিনা। সত্য বলতে বিবেকের বা চেতনার অস্তিত্বই আমরা প্রায়শই লক্ষ্য করিনা আমাদের জীবনে, কারণ আমরা আমাদের কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছাদের নিয়েই ব্যস্ত থাকি সর্বক্ষণ।

কিন্তু মজার ঘটনা এই মৃত্যুর পশ্চাতে, অর্থাৎ দেহত্যাগের পরে ঘটে, যেখানে যার বিবেক জাগ্রত হয়েছে, আর যার জাগ্রত হয়নি, তাঁদের সকলকেই বিবেকের সম্মুখীন হতে হয়, এবং বিবেকের দংশন সহ্য করতেই হয়। আসল কথা এই যে, এই বিবেক কি? বিবেক হলেন চেতনা অর্থাৎ পরব্রহ্মের প্রকাশ, অর্থাৎ চেতনার প্রকাশ। আর এই প্রকাশ আমাদের অন্তরে সর্বক্ষণই বিরাজ করে, আমরা তাঁকে স্বীকার করি বা নাকরি, কারণ ব্রহ্মই যে সত্য, ব্রহ্মাণু নয়। ব্রহ্মাণু তো কল্পনা মাত্র।

কিন্তু তাও আমরা বিবেকের আভাস করিনা কেন? কারণ আমরা সর্বক্ষণ আমাদের চারভূতের অর্থাৎ উর্জ্জা, প্রাণবায়ু, দেহ বা ধরিত্রী এবং বুদ্ধির চাঞ্চল্যকেই দেখতে পাই মনের উপর অর্থাৎ আকাশের বুকে। আর এঁদেরকে নিয়েই সর্বক্ষণ ব্রহ্মাণু মেতে থাকে, আর বিবিধ চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনা সমানেই প্রকাশিত করতে থাকে, আর সেই কল্পনাকে, চিন্তাকে এবং ইচ্ছাকে আশ্রয় করেই জীবনকে বিস্তৃত করতে থাকে ব্রহ্মাণু।

কিন্তু দেহত্যাগের শেষে, এই চারভূত আর থাকেনা, যা অবশিষ্ট থাকে, তা হলো এই চারভূতের প্রতি ব্রহ্মাণু অর্থাৎ আত্মের বা অহমের আসক্তি। তাই পূর্ববৎ চাঞ্চল্যও আর থাকেনা, আর কল্পনা, চিন্তা বা ইচ্ছা থাকলেও, তাদের দাপট আর অবশিষ্ট থাকেনা। তাই এঁদের দাপটের কারণে যেই বিবেকের অস্তিত্বকে মান্যতাই প্রদান করেনি ব্রহ্মাণু, যেই চেতনাকে ভ্রুক্ষেপই করেনি ব্রহ্মাণু, তাঁর দিকে এবার দৃষ্টি দিতে সে বাধ্য হয়।

এই বিবেক অর্থাৎ চেতনার প্রকাশ, যাকে বুদ্ধরা জগন্মাতার সন্তান বলেছেন, তাঁর প্রকাশ, এই ব্যখ্যাকে সম্মুখে রাখার জন্য, তাঁকে বলেছেন বিনায়ক, পরাপ্রকৃতির সন্তান বিনায়ক। আর এও দেখিয়েছেন যে তিনিই হলেন কালরূপ, অর্থাৎ যম। আর এও দেখিয়েছেন যে, মৃত্যুপশ্চাতে, অর্থাৎ দেহতাগের শেষে, এই কালরূপ ব্রহ্মাণুর বিচার করেন, এবং তাঁর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করেন।

পুত্রী, এই বিচার বা যাই বলো একে, যার মাধ্যমে পরবর্তী দেহধারণকে নিশ্চিত করা হয়, এটি সত্য, আর তাই এটি প্রতিটি ধর্মশাস্ত্রতেই পাবে, যা সত্যকে দর্শনকারীরা অর্থাৎ ঈশা, বুদ্ধরা, বা মহম্মদ নির্মাণ করেছেন, তাঁরা ব্যখ্যা করেছেন।  এই সত্যের কথাকে ষোলাপুর যাত্রারূপে কৃষ্ণ দ্বৈপায়নও ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর স্কন্ধপুরাণে। কিন্তু পুত্রী, এই সমস্ত কথা অত্যন্ত গভীর ভাবে রূপকধারণ করে স্থিত, যার অর্থ ভেদ করা সাধরন পাঠকের সাধ্যের অতীত। তাই আমি তোমাকে বিনা কনো রূপক ধারণ করে, এই বিচারের কথা ব্যক্ত করছি।

তোমার পিতা মৃষু সমর্পণানন্দ স্বয়ং আমার হাত ধরে, যমালয়ের বিচার দরবারে স্থিত হয়ে, আমাকে সেই বিচার করতে দেখে এসেছেন। তাই এই ব্যখ্যা তাঁর দেখা সত্যেরও ব্যখ্যা, আর আমি আমার প্রকাশ অর্থাৎ যেই নামেই ডাকো, বিবেক বা কাল বা ধর্মরাজ, তাঁর মাধ্যমে যেই ভাবে এই বিচার করি, তারও ব্যাখ্যা মনে করতে পারো। কিন্তু এক্ষণে আমি যা বলবো তোমাকে, তা পূর্বে কথিত হলেও, এত স্পষ্ট ভাবে আগে কখনো ব্যক্ত করা হয়নি।

পুত্রী, এই সম্পূর্ণ মৃত্যু সত্য যদি এক মৃতব্যক্তির মৃত্যুর সপ্তম দিনের দ্বিপ্রহরে, তাঁর পতি বা পত্নী তথা সন্তানেরা, তিন মিনিট মুখে জলধারণ করে, তাকে না পান করে, একটি পাত্রতে রেখে, তাকে সম্মুখে রেখে, পাঠ করেন, তবে সেই মৃতব্যক্তি অত্যন্ত সাবলীল ভাবে যমের বিচারলয়ে প্রবেশ করেন, এবং তাঁর বিচার শ্রবণ করে, পরবর্তী দেহধারণ করতে পারেন।

এই আচারের কারণ কি? পতি বা পত্নী তথা সন্তানের সাথে এক ব্যক্তির সমস্ত পঞ্চভূত মৃত্যুকাল পর্যন্ত অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্ত থাকে। তাই তাঁদের পঞ্চভূতের প্রতি আসক্ত থাকেন মৃত ব্যক্তি। সেই পঞ্চভূতকে সম্মুখে স্থাপিত করার সহজ উপায় হলো মুখে ৩ মিনিট জল রেখে, তাঁকে উদরস্থ না করে, একটি পাত্রে রাখা। এই জলে তখন মৃতের সমস্ত প্রিয়পাত্রদের পঞ্চভূত উপস্থিত থাকে, আর তাই অতিসহজেই মৃত ব্রহ্মাণু সেখানে উপস্থিত হন, এবং তাঁদের কথনকে একাগ্র হয়ে শ্রবণ করেন।

যদি সেই ব্যক্তি বিপত্নীক বা বিধবা হন, এবং একই সঙ্গে সন্তানহীন হন, তবে তাঁর প্রতি যিনি অন্তিমকালে স্নেহভাব রেখেছিলেন, তিনিও এই কর্মের সঙ্গী হতে পারেন, বা উদ্যোক্তা হতে পারেন। এতো বলে এবার আমি তোমাকে সেই বিচারের ব্যাপারে বিস্তারে বলছি শ্রবণ করো। তবে সেই কথা বলার পূর্বে, আবার স্মরণ করিয়ে দিই, যা বললাম, তার মধ্যে সুপ্ত কথাটি।

পুত্রী, যিনি যমালয়ের এই বিচারে অংশগ্রহণ করেন না, তিনিই একমাত্র হন যিনি ৩৪২ দিবসের মধ্যে নূতন দেহ ধারণ করেন না। আর যিনি তা করেন না, এমন ভাবার কনো কারণ নেই যে তিনি মুক্ত হয়ে যান। তিনি সহস্র বৎসরব্যাপী আর দেহ ধারণ করতে পারেন না, কারণ পরবর্তী দেহধারণের জন্য যেই আসক্তি ও সংস্কারের প্রয়োজন, তা তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। আর তাই তাঁকে সহস্র সহস্র বৎসর পিশাচ অর্থাৎ দেহহীন ভাবে ঘুরে বেরাতে হয়, তবেই সে আবার প্রথম থেকে অর্থাৎ প্রস্তর যোনি থেকে নিজের যাত্রাকে শুরু থেকে শুরু করেন।

আর এখানে আর একটি কথা বলা আবশ্যক, আর তা হলো এই যে, ধরো এক ব্রহ্মাণুনতুন দেহধারণ করছেন। সেই দেহধারণের পূর্বেও তিনি ১০ লক্ষ দেহধারণ করেছেন, কিন্তু সেই ১০ লক্ষ দেহধারণের মধ্যে তিনি অন্তিমবার ১০ হাজার জন্মের পূর্বে পিশাচ হয়েছিলেন। যদি এমন হয়, তবে তাঁর কাছে আর ১০ লক্ষ জন্মের সংস্কার থাকেনা, বরং তাঁর কাছে মাত্র ১০ হাজার জন্মেরই সংস্কার অবশিষ্ট থাকে, তবে বিবেকের স্মৃতিভাণ্ডার ১০ লক্ষ জন্মেরই থাকে।

আর আরো একটি উল্লেখযোগ্য কথা এখানে এই যে, বিবেকের স্মৃতিপটও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খালি ও রিক্ত থাকে, কারণ অধিকাংশেরই বিবেক জাগ্রত না হবার ফলে, বিবেকের কাছে কনো স্মৃতিই থাকেনা। বিবেক যখন থেকে জাগ্রত হয় ব্যক্তির মধ্যে, তখন থেকেই সমস্ত ভাবের স্মৃতি তাঁর কাছে থাকে, তার পূর্বের কিছুই থাকেনা।

এই প্রাথমিক কথা বলে, আমি তোমাকে এবার বিচারের ব্যাপারে বিস্তারে ব্যক্ত করছি শ্রবণ করো।

এই বিচারের বেশ কিছু অধ্যায় থাকে, যাদের মধ্যে প্রথম হলো ব্যক্তি নিজের বিকাশের জন্য কি কি করেছেন সেই দেহধারণ করে। দ্বিতীয় অধ্যায় হলো ব্যক্তি পরিবারের জন্য কি করেছেন। তৃতীয় অধ্যায়ে থাকে, ব্যক্তি স্বজাতীর জন্য অর্থাৎ যেই সমুদায়ে অবস্থান করেছেন, তার জন্য কি করেছেন। আর চতুর্থ ও অন্তিম অধ্যায় হলো ব্যক্তি সম্পূর্ণ জীবনযাত্রার জন্য কি করেছেন। এই চার অধ্যায় মিলেই সম্পূর্ণ হয় এই বিচার, আর তার বিধান।

এঁদের মধ্যে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ অধ্যায় পর্যন্ত অনেকের বিচার পৌছায়ই না, কারণ সেই ব্যক্তি কেবল নিজের জীবনই বেঁচেছেন। অনেকের বিচার প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়তেই সমাপ্ত হয়ে যায়। অনেকের বিচার প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়তেই সমাপ্ত হয়ে যায়। আর সামান্য কিছু যেমন রাজা বা শাসক, সাহিত্যিক, দার্শনিক ও সাধকের বিচারই কেবল চতুর্থ অধ্যায় পর্যন্ত পৌছায়।

তাই প্রথমেই প্রথম অধ্যায়ে যাদের বিচার সমাপ্ত হয়ে যায়, তাদের বিচারের কর্মধারা দেখে নাও পুত্রী। আত্মচিন্তার মধ্যে যদি দেখা হয় যে ব্রহ্মাণু কেবল নিজের সুখচিন্তাই করেছেন, অর্থাৎ বিলাসিতার চিন্তা বা মৈথুন চিন্তা, স্বয়ং-এর আহার চিন্তা ও স্বয়ং-এর বিশ্রাম চিন্তাই করেছেন, আর অন্য কনো প্রকার বিচার করেন নি, অর্থাৎ না তো পরিবারের বিচার করেছেন, না সমাজের আর না স্বগোত্রীয় অর্থাৎ নিজের যোনির, তাহলে তাঁকে সরাসরি অতিদরিদ্র গৃহে জন্ম দেওয়া হয়, যেখানে সঠিক ভাবে অন্নের জোগানও থাকেনা।

যদি এরই সাথে, পরিবারের কারুর প্রতি বিশেষ ভাবে খারাপ ব্যবহার থাকে, তাহলে, সেই দরিদ্র ঘরে, সেই ব্যক্তির ব্যবহার অত্যধিক খারাপ হবে, এবং প্রয়োজনে পিতা বা মাতা সৎমা বা দোজপিতাও হতে পারে। এবং প্রয়োজনে ভ্রাতা বা ভগিনীও পিতার প্রথম পক্ষের হতে পারে, যারা অত্যন্ত অত্যাচারী হবেন। তবে কে কে অত্যাচারী হবেন, আর কতটা হবেন, তা নির্ভর করছে, সেই ব্রহ্মাণু কার কার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছেন, আর কতটা খারাপ ব্যবহার করেছেন, তার উপর।

কনো ব্রহ্মাণু নিজের উপরই কেবল নজর রেখে, অন্য কনোদিকে নজর না রেখেও, নিজের আহার, নিদ্রা, মৈথুনের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে, নিজের মৌলিক উন্নতির চিন্তা করতে সক্ষম নয়। তাই সেইরূপ বিচারও সম্ভব নয়।

এবার দ্বিতীয় ধারার বিচারে এসো পুত্রী। পরিবারের প্রতি আসক্তি বা বিরক্তিপূর্ণ ভাব। যদি কনো ব্রহ্মাণু পরিবারের জন্য জীবনযাপন করে থাকেন, আর নিজের আহার নিদ্রা মৈথুনের সাথে সাথে পরিবারের আহার নিদ্রা ও মৈথুনের চিন্তাও করে থাকেন, তবে তিনি সুখী ও সুন্দর পরিবার লাভ করেন। না অতিবিত্তবাণ, না অতিদরিদ্র, এমন পরিবার লাভ করেন তিনি, যেখানে পরিবারের সকলে সকলকে স্নেহ করেন।

তবে যদি ব্রহ্মাণু পরিবারের প্রতি আসক্ত থাকেন, পরবর্তী দেহে, জার প্রতি তিনি আসক্ত ছিলেন, তাঁর অভাব তাঁকে অনুভব করতেই হবে। হয় সে মাতৃহীনা হবে, নয় পিতৃহীন, নয় স্নেহের ভ্রাতাভগিনীকে স্বল্পবয়সে হারাবেন তিনি। আসলে পুত্রী, আসক্তি বিরক্তিই অগ্রগতির পথে প্রধান বাঁধা। এই আসক্তি বিরক্তি থাকলে, অন্যত্র দৃষ্টি যেতেই পারেনা, দৃষ্টিশক্তিই পরাধীন হয়ে যায়। তাই সেই আসক্তি বিরক্তির থেকে ব্রহ্মাণুকে মুক্ত করতেই হবে, আর তাই জন্যই এমন বিচার।

অন্যদিকে যদি কনো ব্রহ্মাণুর কনো পরিবারের সদস্যের প্রতি বিরক্তি থাকে, তাহলে পরজন্মে সেই সম্পর্কের থেকে অপার স্নেহ প্রদান হবে, সেই বিচার প্রদান করা হয়, যাতে তাঁর এই বিরক্তির নাশ হয়।

এছাড়া যিনি দিবারাত্র পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দেবার জন্য, নিজের আহার নিদ্রা ও মৈথুন চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে যান, তাঁর জন্য ধনী পরিবার প্রদান করা হয়, যাতে তাঁর আহার, নিদ্রা ও মৈথুনের চিন্তা না থাকে, আর সে উন্নত সাধনের দিকে অগ্রসর হতে পারে।

আর যিনি পরিবারের কারুর প্রতি পক্ষপাত করেন, যেমন বড়ছেলে, যেমন ছোটছেলে, যেমন পুত্রসন্তান, অর্থাৎ এই বিচারে নয় যে, সে অধিক যোগ্য, বরং এই বিচারে পক্ষপাত করেন যে তাঁর ধারণা পুত্রসন্তান অধিক শ্রেয়, বড়ছেলেই শ্রেয় বা ছোটছেলেই শ্রেয় ইত্যাদি, তাকে পরজন্মে সেই অবহেলিত সন্তান হয়েই জন্ম নিতে হবে, যতই পরিবারের অবস্থা দারিদ্রতার ঊর্ধ্বে থাকুক।

অন্যদিকে যদি যোগ্যতার বিচার করে পক্ষপাত করে থাকে ব্রহ্মাণু এবং যে কম যোগ্য, তাঁকে অবহেলা করে থাকে, তাহলে তাকে পিতামাতার অবহেলা সইতে হবেনা, কিন্তু ভ্রাতাভগিনীর অবহেলা অবশ্যই সহ্য করতে হবে। আর যদি, যোগ্যতার বিচার করে শ্রেষ্ঠযোগ্যকে অধিক স্নেহ ও বিশ্বাস অর্পণ করলেও, কারুকে অবহেলা না করা হয়, তাহলে সেই ব্রহ্মাণুকে উন্নত মনস্ক পরিবার প্রদান করা হয়, অর্থাৎ তাঁর পিতামাতা বা বংশমর্যাদা সুউচ্চ হয়, যেখানে জন্ম নিলে জীবনের সত্য সন্ধান অনেক অংশেই সহজ হয়ে যায়।

এরপরবর্তী বিচার হয় তাদের, যারা সমাজে নিজেদের অবদান রাখার প্রয়াস করেছেন, অর্থাৎ সমাজের জন্য চিন্তন করেছেন। এঁদের বিচার জটিলতর হয়ে যায়, কারণ এঁদের বিচার করার কালে, এঁদের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি ভাবনা, পরিবারের প্রতি ভাবনাও যেমন যুক্ত হয়, তেমন সমাজের প্রতি দৃষ্টির দিশাও এই বিচারকে নির্ধারণ করে। তাই এখানে বেশ কিছু মীমাংসা দাঁড়ায়। একটি একটি করে সকল মীমাংসার কথা বলছি, শ্রবণ করো।

যদি এই ব্যক্তি নিজের জীবনের প্রতি যত্নশীল হয়ে, অর্থাৎ নিজের আহার নিদ্রা ও মৈথুনের প্রতি আসক্ত হয়ে, পরিবারের আহার নিদ্রা ও মৈথুনের প্রতিও উদারহস্ত থেকে, সমাজের হিত চিন্তা করে থাকেন, অর্থাৎ সমাজের ব্যবস্থায়নকে সর্বজনহিতকর করার প্রয়াস করেন, তবে ইনি কনো রাজপরিবারে জন্ম নেবেন পরবর্তীতে, এবং সমস্ত জাগতিক সুখসুবিধা, এমনকি স্নেহাদিলাভও করবেন।

যদি ইনি নিজের আহার নিদ্রা ও মৈথুনের প্রতি প্রবল আসক্ত হয়ে, পরিবারের সকলেরও আহার নিদ্রা ও মৈথুনের প্রতিও আসক্ত হয়ে, সমাজের হিতচিন্তা এমন করে থাকেন যাতে সমাজের ব্যবস্থায়ন তাঁর নিজের ও তাঁর সমুদয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে ইনি মানবযোনি লাভ করবেন না, বরং তাঁর সমুদয় যেই যোনিকে ঘৃণা করে, সেই যোনিতে জন্ম নেবেন।

যদি ইনি নিজের আহার নিদ্রা ও মৈথুনের প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে, পরিবারের সকলেরও সুখচিন্তার প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে, সমাজকে যন্ত্রের দ্বারা সুচালিত করতে সচেষ্ট হন, তিনি যন্ত্রাদির উত্থানের কারণে যেই পরিবারের অন্নপ্রাপ্তির নাশ হয়, তেমন এক পরিবারে জন্ম নেবেন মনুষ্য হয়েই।

যদি ইনি নিজের আহার নিদ্রা ও মৈথুনের প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে, পরিবারের সুখাদির প্রতিও দায়িত্বশীল হয়ে, সমাজের সুচারুতাকে উন্নতি করার জন্য প্রয়াসশীল হয়ে, সকল প্রজাতি, সমুদয়ের উত্থানের চিন্তা করবেন, এবং সমস্ত দুর্বলের রক্ষক হয়ে উঠবেন, তিনি এক মহান প্রতিভার সন্তান হয়ে জন্মগ্রহণ করবেন।

যদি ইনি নিজের সুখাদির চিন্তা করেন, পরিবারের সুখাদির চিন্তা না করেন, এবং সমাজকে প্রগতিশীল করার প্রয়াস করেন, তবে ইনি এমন এক রাজনেতার সন্তান হয়ে জন্ম নেবেন, যিনি তাঁর প্রতি দৃষ্টিই দেবেন না, কিন্তু রাজনেতার সন্তান হয়ে জন্ম নেবার জন্য সমস্ত ভৌতিক সুখসুবিধা তাঁর সাথেই যুক্ত থাকবে।

যদি ইনি নিজের সুখাদির চিন্তা করে, পরিবারের সুখচিন্তা না করে, সমাজকে নিজের ও নিজের সমুদয়ের হস্তগত পুত্তলিকা নির্মাণে রত হবেন, তাঁকে কীট বা ভুজঙ্গ যোনি লাভ করতে হবে, এবং মানবযোনি তাঁর কাছে দুরস্ত হয়ে যাবে।

যদি ইনি নিজের সুখাদির চিন্তা করে, পরিবারের সুখাদির চিন্তা না করে, সমাজকে যান্ত্রিক করার প্রয়াস করবেন, তিনি পরজন্মে নিঃসন্তান হবেন, এবং সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে ইনি জন্ম নেবেন।

যদি ইনি নিজের সুখাদির চিন্তা করে, পরিবারের সুখাদির চিন্তা না করে, সমাজকে সার্বিক ভাবে স্বতন্ত্র করার জন্য প্রয়াসশীল হন, তিনি পরের জন্মে বিপত্নীক বিত্তবান পিতার সন্তান হবেন, এবং মাতাব্যতীত সমস্ত ভৌতিক সুখসুবিধা লাভ করবেন।

যদি ইনি নিজের সুখাদির চিন্তা না করে, পরিবারের সুখাদির চিন্তা করে, সমাজকে প্রগতিশীল করতে উদ্যত হন, তিনি জন্ম নেবেন সমাজের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠিত প্রতিভাশালীর সন্তান হয়ে।

যদি ইনি নিজের সুখাদির চিন্তা না করে, পরিবারের সুখাদির চিন্তা করে, সমাজকে নিজের ও নিজের সমুদয়ের হস্তে কুক্ষিগত করার প্রয়াস করেন, তাহলে ইনি সেই বৃক্ষাদি যোনিতে জন্ম নেবেন, যার একটি ফলও সেই বৃক্ষের হবেনা, উপরন্তু সকলে সেই বৃক্ষের ফলকে নিজেদের জ্ঞান করে নিয়ে চলে যাবে, আর সেই বৃক্ষ নিঃসন্তানই হয়ে থাকবে।

যদি ইনি নিজের সুখাদির চিন্তা না করে, পরিবারের সুখাদির চিন্তা করে, সমাজকে যান্ত্রিক করার স্বপ্ন দেখেন, তিনি এমন এক যন্ত্রবিজ্ঞানীর সন্তান হবেন, যিনি তাঁর সন্তান ও পরিবারকে কনো গুরুত্বই দেবেন না।

যদি ইনি নিজের সুখাদির প্রতি উদাসীন হয়ে, পরিবারের সুখাদির প্রতি চিন্তিত হয়ে, সমাজকে স্বনির্ভর গড়ে তুলতে চিন্তিত হন, তিনি কনো সাধকের সন্তান হয়ে জন্ম নেবেন।

যদি ইনি নিজের ও পরিবারের সুখাদির ব্যাপারে উদাসীন হয়ে সমাজের কল্যাণের চিন্তা করেন, তিনি এক আত্মহারা সাধকের সন্তান হবেন, যিনি পরিবারের প্রতি উদাসীন।

যদি ইনি নিজের ও পরিবারের সুখাদির ব্যাপারে উদাসীন হয়ে সমাজকে কুক্ষিগত করার মানসিকতায় গ্রস্ত হন, তিনি মৎস্য বা সর্প যোনিতে জন্ম নেবেন, যেই মৎস্য নিজের সন্তানকেই ভক্ষণ করে নেন।

যদি ইনি নিজের ও পরিবারের সুখাদির ব্যাপারে উদাসীন হয়ে সমাজকে যান্ত্রিক করে তোলার দিকে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন, তিনি মৃত্যুর পরে, যন্ত্রকে স্পর্শ করতে না পেরে, সম্পূর্ণ বিরক্ত হয়ে ওঠার কারণে কনো দেহগ্রহণ করবেন না, আর ফলে পিশাচযোনিপ্রাপ্ত হবেন।

পুত্রী, এই সমস্ত কিছুর মধ্যে প্রচুর খুঁটিনাটি মানসিকতা থাকবে, যাও সেই ব্যক্তি পরবর্তী জন্মের বিভিন্ন পর্যায়তে অনুভব করতে থাকবেন। আর এই সমস্ত কিছুর মধ্যে রাজনেতারা থাকেন, বিশালাকায় বনিক থাকেন, কবি, সাহিত্যিক থাকেন, কলাবিদরা থাকেন, ক্রীড়াবিদরা থাকেন, দার্শনিক থাকেন, এমনকি সাধকরাও থাকেন। আর এমনও নয় যে, এখানে সেই কর্মেরই হিসাব করা হবে, যা তিনি বাস্তবে করবেন। ব্যক্তির অন্তরে যেই পূর্ণবিচার থাকবে সমাজ নিয়ে, তারই প্রতিফলন হবে এখানে।

অর্থাৎ এমন কখনোই নয় যে, আমি এমন ভাবলাম যে সমাজ সুন্দর হয়ে যাক, আর আমি এই শ্রেণীতে এসে যাবো। যখন কনো ব্যক্তি নিজের সমস্ত জীবন এই সমস্ত কিছুর ভাবনার মধ্যেই স্থিত থাকেন, তাঁরাই এই শ্রেণীতে উপস্থিত হন। আর যারা ধর সরকারি বা বেসরকারি চাকুরী করেছেন কেবল বা কেবল পরিবারের খরচ চালানোর জন্য বাণিজ্য করেছেন, এবং সেই সমস্ত কিছুতেই মনপ্রান দিয়ে কর্ম করেছেন, তাঁরা এই শ্রেণীতে আসেন না, বরং নিজের জন্য জীবিত থেকেছেন যেই ব্রহ্মাণুরা এবং পরিবারের জন্য জীবনযাপন করেছেন যেই ব্রহ্মাণুরা, তাঁদের শ্রেণীতে আসেন।

এছাড়া যেই মানুষদের জন্য বিশেষ বিচার হয়, তাঁরা হলেন, সাধকের পাতাপিতা, রাজা বা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রধান মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, বা বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি, এবং থাকেন স্বয়ং সাধক। এবার আমি এঁদের ব্যাপারে বিশেষ যেই বিচার অনুষ্ঠিত হয়, তার কথা তোমাকে বলছি শ্রবণ করো।

সাধকের পিতামাতা বা ভ্রাতাভগিনী যদি সাধকের সাধনায় কনো অবদান করেন, অর্থাৎ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাহায্য, তাহলে তাঁদের জন্য সেই চেতনাই প্রদত্ত হয়, যেই চেতনায় সাধক নিজেকে স্থিত করেছেন। তবে সাধক যেই চেতনাস্তর লাভ করেছেন, অর্থাৎ অনাহত, বিশুদ্ধ, বা আজ্ঞাচক্র, তা সাধক পরবর্তী জীবনের ৬ বৎসর বয়স থেকে ভোগ করবেন, যতক্ষণ না সেই চেতনাস্তর থেকে তাঁর উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু তাঁর পিতামাতা সেই চেতনাস্তর ভোগ করবেন মাত্র ৬ বৎসর, অর্থাৎ তাঁর ১৮ বৎসর বয়স থেকে ২৪ বৎসর বয়স। সেই সময়কালে যদি সেই ব্রহ্মাণু অর্থাৎ যিনি পূর্বজন্মে সাধকের পিতামাতা ছিলেন, তিনি নিজের চেতনাস্তরের উত্থান করে নেন, তবে তাঁর সাধনজীবন অতিসহজ হয়ে যায়। এইক্ষেত্রে, আরো একটি জিনিস বলা আবশ্যক, আর তা হলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাহায্য কি?

প্রত্যক্ষ সাহায্য মানে বচন ভঙ্গি ও ভৌতিক ভাবে সাধনায় সম্মতি প্রদান করা, যা সাধককে সাধনার জগতে উন্নত হতে সাহায্য করে। পুত্রী, এই পিতামাতার মধ্যে সাধকের গুরুও স্থিত থাকেন। আর পরোক্ষ সাহায্যের মধ্যে পরে সাধককে সাধনায় যদি বাঁধা দেন। এটিও সাহায্য সাধকের জন্য, কারণ সাধক এই সাহায্য লাভ করে অধিক দৃঢ়ভাবে সাধনা করেন।

সাধক ও সাধকের পিতামাতার পরে, এবার পরে থাকে শাসক। পুত্রী, শাসক কেবল নিজের কর্মের ফল ভোগ করেন না, বা বলতে পারো তাঁর নিজস্ব কর্মের কনো বিচারই হয়না। তাঁর শাসনের মধ্যে স্থিত সমস্ত প্রজার মধ্যে যারা যারা সাধক হয়েছেন, যারা যারা সিদ্ধলাভ করেছেন, যারা যারা কলাবিদ্যার দ্বারা সমাজকে ও সমাজের সমস্ত মানুষকে উন্নত করেছেন, তাঁদের সুকর্মের ফল ভোগ করেন শাসক প্রথমে। অর্থাৎ যদি এক শাসকের শাসনকালে ১জন ব্যক্তি সিদ্ধলাভ করেন, অর্থাৎ মোক্ষলাভ করেন, তবে শাসক একটি জন্ম লাভ করেন সাধকের সন্তান হয়ে।

এই জন্মে যদি তিনি নিজেকে উন্নীত করতে পারেন, সেই কর্মফল তাঁর জন্য নিশ্চয় করা থাকলেও, যতক্ষণ না শাসকের সমস্ত কর্মফল ভোগ হয়, ততক্ষণ এই কর্মের ফল তিনি লাভ করেন না। এবার যদি তাঁর শাসনকালে ১০জন সাধক সাধনে অগ্রসর হন, অর্থাৎ নিজেদের চেতনাস্তরকে অনাহত বা তার ঊর্ধ্বে গতি প্রদান করতে পারেন, তবে সেই ব্রহ্মাণু যিনি শাসক ছিলেন, তিনি ১০ সুখসমৃদ্ধিকর জন্ম লাভ করেন, তখনই যখন সেই সাধকরা রাজার গুণগ্রাহী হন, নচেৎ নয়। এই ১০ জন্মেও যা যা তিনি ফল লাভ করেন, তা তাঁর জন্য তোলা থাকে, শাসকের সমস্ত কর্মফল লাভের পরেই তা প্রদান করা হয়।

এরপর যদি ১০জন কলাশিল্পী তাঁর আমলে সমাজকে উন্নত করে থাকে, তাহলে প্রতি ১০ কলাবিদের কারণে একটি করে জন্ম শাসক লাভ করেন, যেখানে তিনি কনো কলা বিদের সন্তান হয়ে, তাঁর চরণতলে উপস্থিত হয়ে কলাশিক্ষা লাভ করার সুযোগ পান।

আর এই সমস্ত কিছুর পরে, এবার আসে কুফল লাভ। সেই শাসকের অধীনে থাকা যতগুলি প্রজা যতদিন অনাহারে দিন কাটিয়েছেন, শাসককে একটি জন্মে ততদিন অনাহারে থেকে প্রাণ ত্যাগ করতে হয় একটি জন্মে। যতগুলি প্রজা শাসনের কারণে উদাসীন হয়ে আত্মহত্যা করেছেন, ততগুলি প্রজার জন্য একটি করে হাড় ভাঙে সেই শাসকের। আর যতগুলি জন্ম লাগে সেই হাড় ভাঙতে, ততগুলি জন্ম তাঁকে নিতেই হয়। এরপর যতগুলি প্রজা তস্কর হয়েছে অনাহারের কারণে, ততগুলি প্রহার সহ্য করতে হয় শাসককে, আর তার জন্য যতগুলি জন্ম লাগে, ততগুলি জন্ম শাসককে নিতে হয়।

এরপরে আসে মানব যোনিতে না থাকতে পারার সময়কাল। এরপর আসে ভণ্ড। শাসকের আমলে যতগুলি ভণ্ড নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছে, ততবার শাসককে গবাদি পশু হয়ে প্রহৃত হতে হয়। তারজন্য যতগুলি পশুযোনি লাভ করতে হয়, ততগুলি জন্ম নিতে হয় শাসককে। এরপর যতগুলি যন্ত্রসর্বস্ব প্রজা শাসকের শাসনে যন্ত্রমনস্ক হয়েছেন, ততবার কীট পতঙ্গ হয়ে জন্ম নিয়ে, যন্ত্রের আঘাতে মরতে হয় শাসককে। যতগুলি জীবকে শাসকের আমলে কেবলই রাজার বা রাজসমুদয়ের বিলাসিতার কারণে হত্যা করা হয়েছে, ততবার শাসককে বনজ তৃণ হয়ে জন্ম নিয়ে উৎপাটিত হতে হয়। আর শেষে থাকে পিশাচ। শাসকের রাজ্যে যতগুলি ব্রহ্মাণু পিশাচ হবে, ততবার শাসককে হিংস্র পশুর শিকার হতে হয়।

এরপরেই শাসকের বিচার সমাপ্ত হয়। আর তারপর শুরু হয়, এই সমস্ত জন্মে শাসক যেই যেই কর্ম করেছেন, তার বিচার ও তার ফলদান। অর্থাৎ পুত্রী, এক শাসকের বিচার সর্ববৃহৎ হয়, যা সমাপ্ত হতে কখনো কখনো এক সহস্র থেকে ৫ সহস্র বৎসরও লেগে যায়।

আর শেষে অন্যযোনির ব্যাপারে বলতে গেলে, সমস্ত যোনির নিম্ন থেকে ঊর্ধ্ব অবস্থান এইরূপ- প্রস্তর, তৃণ, মৎস্য, কীট, পতঙ্গ, ভুজঙ্গ, তরু, ফলাহারী পক্ষী, কীটখাদক পক্ষী, বান্দর, কুকুর, বিড়াল, শিকারি পক্ষী, বৃহতাকার মৎস্য, তৃণখাদক বনজ পশু, গবাদি পশু, বনস্পতি, শিকারি পশু, হস্তি, বটবৃক্ষ, মনুষ্য। এই ধারা অনুসারে যেই ব্রহ্মাণু যেই যোনিতে স্থিত, সেই যোনি সম্বন্ধে সমস্ত শিক্ষা অর্জন করা হয়ে গেলে, তাঁরা পরবর্তী যোনিতে উন্নত হয়।

আর এই ভাবে বিবেক অর্থাৎ কাল, বা স্বয়ং আমি আমার প্রকাশের মাধ্যমে সমস্ত ব্রহ্মাণুদের সমানে সত্যের সকাশে উন্নীত করার জন্য প্রয়াসশীল থাকি, আর এই প্রয়াসের সর্বোত্তম অধ্যায়ই হয়, মৃত্যুর পশ্চাতে, যখন আমার দরবারে ব্রহ্মাণু বিচারাধীন হয়ে উপস্থিত হয়”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43