কৃতান্তিকা

ব্রহ্মসনাতন কিছু না বলে কেবলই মুচকি হাসলে, দিব্যশ্রী নিজের জিজ্ঞাসা ব্যক্ত করতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, “আচ্ছা মা, আর্যরা তো আজকে প্রত্যক্ষ ভাবে লুপ্ত, যদিও আর্যদের সেই মহাশয়তান শাসক হয়ে বসে, বেশ কিছুটা ভাবে আর্যদের উত্থান ঘটিয়ে গেছেন পুনরায়। আমার প্রশ্ন এই যে, তাহলে এই আর্য মানসিকতার নাশ হচ্ছে না কেন?

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “জানো পুত্রী, এই ধরিত্রী থেকে বহু যোনির নাশ হয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো ডাইনোসর। কিন্তু এই প্রজাতির মধ্যেও গিরগিটির নাশ হয়নি, আর সেই গিরগিটিই পরবর্তীতে টিকটিকি এবং কুমীর রূপে নিজেদের স্থাপিত করেছিল। … আচ্ছা, এই তথ্য থেকে বলতে পারো যে কেন গিরগিটির নাশ হয়নি?”

দিব্যশ্রী সহজ ভাবেই বললেন, “আসলে এঁরা রঙ পালটে নেয় যে! তাই এঁদের নাশ হয়নি”।

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “আর্যদেরও নাশ এই কারণেই হয়নি, কারণ তাঁরা হলেন এই গিরগিটি। প্রাথমিক অবস্থান উত্তরগান্ধারে। আব্রামের উত্থানে প্রতারিত হলেন, তো কোথায় কোথায় গেলেন? আফ্রিকায় মিশরিয় সভ্যতা স্থাপন করে রইলেন, রোমে রোমান সভ্যতা হয়ে রইলেন, আর ভারতে এসে আর্য হলেন। …

পুত্রী, ভারতের এই আর্যদের পূর্বের দাপট থেকে টেনে নিচে নামানো হয়েছে, প্রকৃতি মিশরিয় বর্বরতার নাশ করেছেন, কিন্তু রোমান? রোমানরা তো রয়েই গেছে। আর তারা কেবল আজকে ভারতের আর্যদের উস্কানি দিয়ে দিয়ে শয়তান অবতারকে শক্তিশালীই করেনি, তাঁরা নিজেরাও রঙ পালটেছেন। পূর্বে ধর্মের নাম করে প্রতারণা করতেন। এখন আর সেই প্রতারণাকে নতুন ভাবে জাগ্রত করতে পারছেন না। কিন্তু সেই পুরানো প্রতারণা অর্থাৎ যাকে বলা হয় হিন্দুত্ব, যা বৌদ্ধধারা থেকে তস্করি করা এক ধারা মাত্র, সেই প্রতারণা আজও চলছে, আর বর্তমানে তার নাম হলো সায়েন্স।

বুঝতে পারলে না তো? বেশ তাহলে মিলিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে। সত্য বলতে যেহেতু আমরা আর্যদের দেখেছি আর জেনেছি, সেহেতু আমাদের পক্ষে এই মিলিয়ে দেখা অনেকটাই সহজ। আসলে আর্যদের যেই বাকি দুই উপনিবেশ, অর্থাৎ মিশর ও রোম, সেখানে বৌদ্ধদের সম্মুখীন হতে হয়নি তাঁদেরকে, আর তাই তাঁরা সেখানে সরাসরি শাসন স্থাপন করেছেন, অর্থাৎ বিশ্বাস অর্জনের প্রয়াসই করেননি। তাই যদি আমাদের কাছে আর্যদের সেই রূপের সাথে পরিচয় থাকতো, আর ভারতে আর্যদের কীর্তির সাথে পরিচয় না থাকতো, তাহলে বর্তমানে তাঁরা সায়েন্সকে নিয়ে কি প্রকারে তাঁদের শাসন চালাচ্ছে, তা ধরা অসম্ভব হতো।

কিন্তু আমরা ভাগ্যবান যে, আমরা আর্যদের এই দ্বিতীয়মুখকে প্রথম থেকেই দেখে আসছি, তাই আমাদের কাছে সায়েন্সের সেই মুখকে চেনা অতিসহজ, যদি আমরা একটু সামান্য বিচার করি।

আর্যদের মূল স্বভাব হলো অধিকার স্থাপন। যদি তাঁরা ফাঁকা ময়দান পায়, তাহলে তাঁরা ফাঁকা মাঠে গোল দিতেই পছন্দ করে, যেমন মিশরে বা রোমে করেছিল তারা। কিন্তু এমন নয় যে, যদি মাঠ ফাঁকা না থাকে, তাহলে এঁরা গোল করতে উদ্যত হয়না, বা গোল করতে পারেনা। দুর্নীতি আর কূটনীতিই এঁদের বল, অহংকারই এঁদের আরাধ্য দেব, আর কল্পনাই এঁদের মূল অস্ত্র।

ভারতেও, তাঁরা এই অহংকারের আরাধনা এবং কল্পনার অস্ত্রদ্বারা আক্রমণ করে করেই, দুর্নীতি ও কূটনীতি দ্বারা সমস্ত জম্বুদ্বীপকে ভারতে পরিবর্তিত করে। বৌদ্ধদের মহাজ্ঞান পূর্ব থেকেই ছিল। তাকে ব্যবহার করে, নিজেদের কল্পনার বিস্তার করেছে, আর সেই কল্পনা যাকে কেন্দ্র করে, অর্থাৎ অহংকার, সেই অহংকারের ত্রিগুণকে দেবাসনে স্থাপিত করে, চমৎকার দেখাতে থেকেছে, আর বিশ্বাস অর্জন করতে থেকেছে। আর যখন সেই চমৎকারের দ্বারা মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে ফেললেন, তখনই নিজেদের দুর্নীতিপূর্ণ মানসিকতার দ্বারা রচিত কূটনীতিকে ধারণ করে, সমস্ত প্রজাকে অধীনস্থ করলেন।

আর যাতে তাঁরা অধীনস্থ থাকেন, তার জন্য কি করলেন? প্রচার করলেন স্বর্গের লোভ, আর নরকের ভয়। আর কি করলেন? এই লোভকে কাজে লাগিয়ে একাধিক উপাচারের বিধান দিলেন। যজ্ঞ, হোম, ব্রত, পার্বণ, ইত্যাদির প্রসার করে করে, প্রতিটি ক্ষেত্র থেকে নিজেদের উপার্জন আর দানকে নিশ্চয় করলেন, আর নিজেদের ধনী হয়ে ওঠাকে নিশ্চিত করে নিলেন। আর যারা সেই লোভে মাথা গলাবেন না, তাঁদেরকে কি তাঁরা ছেড়ে দেবেন! না তাঁদেরকেও তো এঁরা ছেড়ে দিতে পারেন না। তাই তাঁদেরকে নরকের ভয় দেখালেন, আর একই ভাবে হোম, যজ্ঞাদি, ব্রাহ্মণকে দান করার রীতি এবং একাধিক ব্রত ও তীর্থ নামক বাণিজ্য দ্বারা প্রায়শ্চিতের বিধান প্রদান করে, ধন অধিগ্রহণ করা শুরু করলেন।

আর এই ভাবে, সমস্ত সমাজকে নিজেদের অধীনস্থ করে রেখে দিলেন। এঁরই মাঝে মাঝে গৌতম বুদ্ধ এসেছেন, অশোক এসেছেন, শঙ্করাচার্য এসেছেন, মুঘোল এসেছেন। সেই সময়ে সময়ে তাঁরা দমে গেছিলেন, লুকিয়ে পরেছিলেন, নাহলে সর্বক্ষণ দাপটের সাথে মানুষদের কুসংস্কারে আচ্ছন্ন করে করে, তাঁদের লোভ ও ভয়কে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ধনী করে গেছেন, এবং পরিশ্রমী মানুষদের দরিদ্র করতে থেকেছেন।

মাঝে মাঝে লুকিয়ে পরা, আর তারপর আবার পরিস্থিতি অনুকূল দেখে বেরিয়ে পরা, আর অতিকৌশলে লুণ্ঠন অভিযান চালানো। বেশ ভালোই চলছিল। এঁরই মধ্যে ভৌতবিজ্ঞানের আবির্ভাব হলো। উত্থান হলো এই ভৌতবিজ্ঞানের যবন, ঈশাই আর ইসলামের সংমিশ্রিত প্রয়াসের ফলে, যেখানে ইসলামের থেকে এলো বীজগণিত, ঈশাইদের থেকে এলো দর্শন, আর যবনরা এই দুইকে মিলিয়ে গড়লেন ভৌতবিজ্ঞান।

সমস্ত কিছু চলছিল ভারতের বাইরে, ইউরোপের দক্ষিণউপকুলে। ধীরে ধীরে মলয় বাতাসের সাথে মিশে তা ছড়াচ্ছিল ইউরোপের পশ্চিম উপকুলে। এমন সময়ে পরাপ্রকৃতির কৃপা হয় তাঁদের উপর, আর সেখানে উপস্থিত হয়, তাঁর চেতনাস্বরূপ তুষারযুগ। সেই তুষারযুগ এই ভৌতবিজ্ঞানকে ব্যবহারিক আকারে স্থাপিত করার চেতনা প্রদান করলে, বৃত্ত আকারে নিবাসরত ব্রিটেন অধিবাসীর মধ্যে এক নবহিল্লোলের শুরু হয়, ভৌতবিজ্ঞানের ব্যবহারিক প্রকাশ ঘটানোর।

অগ্নিগোলার নির্মাণ হলো, জাহাজের মোটর তৈরি হলো, কয়লারূপ জ্বালানীর প্রয়োজন পরলো, আর তারা উপস্থিত হতে শুরু করলো সেই সেই দেশে, যেখানে কয়লার ভাণ্ডার উপস্থিত। উপস্থিত হলো তাঁরা মুঘোল অধিকৃত ভারতে, যার মানুষদের মাথা ইতিমধ্যেই আর্যরা খেয়ে বসে ছিলেন। এই বিজ্ঞানের সাথে আলাপ হলো পরানিয়তির আরো এক আশীর্বাদপ্রাপ্ত জাতি, বাঙালীর।

এবার তাঁরা এই ভৌতবিজ্ঞানকে ধারণ করতে শুরু করলেন। তাঁদের চোখে সমস্ত আর্যদ্বারা প্রতিস্থাপিত মিথ্যার পর্দা সরে যেতে শুরু করলো। আর তাই উঠে এলো বিদ্রোহ, আর সেই বিদ্রোহ বঙ্গদেশ থেকে, বিশেষ করে ভঙ্গ, অর্থাৎ মালদহ থেকে সমুদ্রতট পর্যন্ত ব্যপ্ত বঙ্গদেশ গর্জন করে উঠলো আর্যদের বিরুদ্ধে। ব্রিটিশও এঁদের উদ্যম, উন্নত মানসিকতা, এবং উদারতা দেখে আপ্লুত, এঁদের মেধা দেখে আচম্বিত। আর তাই তাঁরাও এঁদের সাথে জুড়লেন, আর দক্ষিণ বঙ্গ, অর্থাৎ ভঙ্গদেশ থেকে আর্যরা বিতাড়িত হলেন।

বাকি ভারতেও এঁর প্রভাব পরে, তবে সমান রূপে এই প্রভাব পরেনি বাকি ভারতে। মাদ্রাজ অর্থাৎ দক্ষিণ ভারত বঙ্গের এই বিজ্ঞানপ্রীতি, ও আর্যঅসম্মতিকে কুর্ণিশ করে, অগ্রসর হলেন। পাঞ্জাব দেশেও সমান মানসিকতার দেখা মিলল। মুঘোলদের মধ্যেও অর্থাৎ ভারতের ইসলামদের মধ্যেও এঁর প্রভাব দেখা গেল। তবে বাকিদের মধ্যে পূর্ব থেকে স্থিত আর্যমানসিকতাই প্রাধান্য পেল, আর তাই তাঁরা পূর্বের স্বর্গের লোভ, নরকের ভয় নিয়ে ব্রত, দানই করতে থাকলেন, আর অহংকারের আরাধনাতেই রত থাকলেন।

অন্যদিকে, বঙ্গদেশে পরাচেতনার কৃপা তো সর্বদাই ছিল, আর নিয়তি সেখানে ঈশ্বরী নন, জননী রূপে বন্দিতা। অন্যদিকে মারাঠিরা বিবেকের অর্থাৎ গণেশের আরাধনায় রত হলেন। কিন্তু তাতে কি? আর্য ব্রাহ্মণের তো আরাধনা হলেই দানপ্রাপ্তি। কিন্তু ব্রিটিশরা দেশের থেকে কয়লা লুণ্ঠন করে করে, বিশ্বের সর্বাধিক ধনীদেশ, ভারতকে দারিদ্রতার মুখে ঠেলে দিয়েছেন। বঙ্গের প্রতি তাঁদের স্নেহভাব, তাই বঙ্গদেশকে বাকি রেখে সম্পূর্ণ ভারতকে লুণ্ঠন করে করে, নিঃস্ব করে দিয়েছেন।

তাই দান করার ইচ্ছা তো আর্যপ্রেমীদের রয়ে গেল, কিন্তু দান করার মত অর্থ আর রইল না। আর আর্যরা যে দানলুণ্ঠন ছাড়া অন্য কিছু আর পারেনও না। তাই তাঁরাও দরিদ্র হতে শুরু করলেন। কিন্তু এই সমস্ত কিছু যখন একদিকে হচ্ছিল, তখন আর্য মানসিকতা গ্রহণ করা শুরু করেন ইহুদিরা, আর সাথে সাথে তারা ভৌতবিজ্ঞানের মানসিকতাও নিলেন।

কিন্তু নিয়তিদ্বারা প্রদত্ত আর অহংকার দ্বারা সংগৃহীত, দুইয়ের মধ্যে তো ভেদ থেকেই যায়। নিয়িতির হতে চেতনা লাভ করেন ব্রিটিশ, তাই তাঁদের ভৌতবিজ্ঞানের প্রয়োগ হয়, উন্নতি, অর্থাৎ পরিবাহনে উন্নতি, আলোক ও বাতাস প্রদানে উন্নতি, রন্ধনে উন্নতি, গ্রন্থনির্মাণে উন্নতি। আর অন্যদিকে আর্যশয়তান ভাবকে গ্রহণ করে ইহুদিরা ভৌতবিজ্ঞানের চর্চা করছেন। তাঁদের মধ্যে শয়তানী ভাব থাকবে, তাই স্বাভাবিক। তাই তাঁরা নির্মাণ করলেন আগ্নেয়াস্ত্র। ছলনার বলে বিমার নির্মাণ করে, সাধারণ মানুষকে সেবা করার নামে, তাঁদের ধনকে লুণ্ঠন করে করে, আগ্নেয়াস্ত্র নির্মাণ করতে থাকলেন।

ক্রমশ ভয়ানক হতে থাকলো সেই আগেয়াস্ত্রের প্রচণ্ডতা। আর তারই মধ্যে শয়তানের চেতনায় ওপেনহাইমার নির্মাণ করলেন পরমাণু অস্ত্র। পরীক্ষা হলো তার, ভয়াবহতা দেখে, স্বয়ং ওপেনহাইমার ভয় পেলেন, ভিক্ষা চাইলেন, এই আবিষ্কারকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য। কিন্তু আর্যভাব গ্রহণ করে, সম্পূর্ণ শয়তান হয়ে অবস্থান করে বসে রয়েছেন তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্ররূপী ইহুদি দেশ।

সুযোগ বুঝে, এই মরনাস্ত্রের প্রয়োগ করে, সমস্ত মানবজাতির বুকে ভীতির সঞ্চার করে দিলেন। এবার নরকের নয়, বীভৎস মৃত্যুভয় স্থাপন করল, আর্যদের দ্বিতীয় আগ্রাসন নীতি। তবে এটুকুতেই থেমে কি করে থাকে! অন্তরে আর্য মানসিকতা বইছে, স্বয়ং শয়তানের মানসিকতা। … থাকলেন না বসে। সারা পৃথিবীর মানুষ যাতে তাঁদের কথা শুনতে পায়, তাঁদেরকে দেখতে পায়, তাঁরা যেই বুলি শেখাতে চায় তা পড়তে পারে, তার জন্য পরমাণু অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে কব্জা করা সমস্ত সম্পত্তির লোভ দেখিয়ে দেখিয়ে, সমস্ত ভৌতবিজ্ঞানের ছাত্রদের একত্রিত করে, আবিষ্কার করালেন একাধিক যন্ত্র।

দূরদর্শনের যন্ত্র, ইন্টারনেটের যন্ত্র, ইত্যাদি সমস্ত কিছু। আর একদিকে যখন এই সমস্ত কিছুর নির্মাণ করাচ্ছিলেন, তখন সেই পুরাতন আর্য ধারাই ফিরে এলো। যেমন আর্যরা ভগবানের নিবাসে যাত্রা করার গল্প লিখতেন, যেমন আর্যরা ভগবানের সাথে কথাবার্তা করার গল্প লিখতেন, এঁরাও শুরু করে দিলেন, তেমনই গালগল্প।

ঠিক যেমন আর্যরা ভাবতেন যে, ভগবানকে তো কেউ দেখতেই পাচ্ছেনা, তাই যা বলবো আমরা, তাই বিশ্বাস করবে সকলে, আর এমন ভেবে গালগল্পে ভরিয়ে রাখতেন, তেমনই গালগল্প দিতে থাকলেন এই মার্কিনরা, অর্থাৎ আর্যদের দ্বিতীয় সংস্করণ। যারা সামান্য পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে পারে না, তারা চন্দ্র চলে গেলেন; যারা আকাশে সামান্যক্ষণ দাঁড়াতে পারেনা, তারা যেখানে বায়ুমণ্ডলই নেই, অর্থাৎ প্রাণবায়ুই নেই, সেখানে একজায়গায় দাঁড়িয়েও থাকলেন। আর তা মানাবেন কি করে?

তা মানাবার জন্যই তো এই দূরদর্শনাদির নির্মাণ করিয়েছিলেন বিজ্ঞানীদের দিয়ে। … যেমন আর্য ব্রাহ্মণদের গালগল্পের কনো সীমা থাকতো না, যা পারতেন কল্পনা করতেন, আর সেগুলিকে সত্যগল্প বলে চালিয়ে দিতেন, এই মার্কিনরাও তাই। আসলে তাঁদেরই তো সংস্করণ। … এক আলোকবর্ষ মানে, একটি বর্ষে আলোক যতটা স্থান যাত্রা করে। ১০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে কনো গ্রহ স্থিত, তার ছবি লাভ করতে হলে, সেই ছবি তোলার যন্ত্রের থেকে বিচ্যুত আলোককেও ১০ হাজার বছর ধরে ভ্রমণ করতে হবে। তাই তো! … কিন্তু মাত্র ১০ বছরের মধ্যে সেই ভ্রমণ হয়ে গেল, এমনই গালগল্প দেওয়া শুরু করলো আর ছবি দেখাতে থাকলো ১০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে স্থিত গ্রহের।

এক নতুন কুসংস্কার, এক নতুন রীতিরেওয়াজ, ঠিক যেমন আর্যরা করেছিল, তেমনই। আর ঠিক যেমন ভাবে, এই সমস্ত গালগল্প দিয়ে দিয়ে, আর্যরা জনপ্রিয়তা অর্জন করে, সমস্ত মানবজাতিকে মূর্খ করে রেখে, যারা তাঁদের কথাকে বিশ্বাস করেন, তাঁদেরকেই জ্ঞানী বলে প্রচার করতেন, এঁরাও ঠিক তেমনই করলেন, কারণ এঁরা তো সেই আর্যদেরই দ্বিতীয় দফা। আর একবার জনপ্রিয়তা অর্জন করে, যেমন সমস্ত কিছু আর্যরা নিজেদের অধিকারে স্থাপন করে রেখেছিলেন, ঠিক তেমনই এঁরাও করলেন।

যেই অসুখ নেই, সেই অসুখের প্রচার করে, তার ওষধির নাম করে, সমস্ত মানুষের সমস্ত স্নায়ুকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখলেন। যেই সমস্যা নেই, সেই সমস্যা আছে বলে দাবি করে, তার নিরাময়ের কারণে নিজেদের স্থাপিত যন্ত্রের প্রচলন ও বিক্রয় করাতে থাকলেন, সমস্ত দেশকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে, বিপুল অর্থের বিমিময়ে অস্ত্র বিক্রি করতে থাকলেন, এবং প্রয়োজনে ঋণ প্রদান করে, সমস্ত দেশের অর্থনীতিকেও নিজেদের অধিকারে রাখা শুরু করলেন।

কিন্তু এতেও সমাপ্ত হলো না। যেমন আর্যরা দেবদের দর্শন পেয়েছেন, এমন গালগল্প দ্বারা সকলকে মূর্খ করে ফিরতেন, এঁরাও তাই করলেন। যেমন আর্যরা বলে ফিরতেন, মানুষ তো তুচ্ছ দেবদের কাছে, আর সেই দেবদের সাথে তাঁদের সংযোগ আছে, আর তাই সমস্ত মানবজাতি তাঁদের সমক্ষে তুচ্ছ। যদি তাঁদেরকে সমীহ করে চলে, তবেই তাঁরা সুরক্ষিত, নাহলে দেবদের ক্রোধানলে তাঁরা ভস্মীভূত হয়ে যাবে, ঠিক তেমনই করলেন এই দ্বিতীয় আর্য দফা। এঁরা দেব নামকে পরিবর্তিত করে, এলিয়ান রাখেন, আর ঠিক সেই প্রচারই করেন, যা আর্যরা আমাদের কাছে করেছিলেন।

আর যেই ভাবে, এই সমস্ত ভীতি দেখিয়ে, গালগল্প দিয়ে, নিজেদের শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করে সমস্ত ভারতের মানুষকে পরাধীন করে রেখে, তাঁদেরকে রীতি রেওয়াজ, আচার অনুষ্ঠান, হোম যজ্ঞ, ব্রত পূজার মধ্যে স্থিত থাকতে বাধ্য করেছিলেন আর্যরা, ঠিক তেমনই এই মার্কিনরাও করলেন। এঁরাও ভীতি দেখিয়ে, গালগল্প শুনিয়ে দেখিয়ে, নিজেদের শ্রেষ্ঠ দাবি করে করে, সমস্ত মানুষকে তাই করালেন, যা তাঁরা চাইছিলেন।

স্ত্রীদের প্রজনন শক্তির নাশ যতক্ষণ না হয়, ততক্ষণ নারীসুরক্ষার নাম করে, তাঁদের বিবাহকে প্রতিরোধিত করে দিলেন, যাতে করে যখন তাঁরা বিবাহ করে সন্তানের প্রাপ্তি করতে চাইবেন, তখন তাঁদের কাছে একটিই উপায় অবশিষ্ট থাকবে, আর তা হলো তাঁদের নির্মিত ওষধি পদ্ধতি, জেই ওষধির বলে তাঁরা আগামীদিনের মানব সন্তানকে নিজেদের যান্ত্রিকতায় বদ্ধ রাখতে পারেন। সাধারণ মানুষ যেন কামনার দাস হয়েই থাকে। তাই জন্য কি বললেন?

বললেন যে জনসংখ্যা যেন বৃদ্ধি না পায়, আর যাতে তা না পায়, তার জন্য নিরোধের ব্যবহার করো। অর্থাৎ কামনাকে সপ্তমে উন্নীত করলেন, কারণ কামনার উদ্বেগ না থাকলে যে, তাঁদের নির্মিত যন্ত্রাদির ক্রেতা থাকবে না। … শিক্ষারূপে তাঁদেরই কৃতিত্বকে পাঠ করাতে থাকলেন সমস্ত মানবজাতিকে, ঠিক যেমন করে আর্যরাও করতেন। আর ঠিক যেমন আর্যরা শূদ্রদের নিজেদের কথা পাঠ করতে দিতেন না, আর তাঁরা যেহেতু নিজেদের নির্মিত গ্রন্থ পাঠ করেন নি, তাই তাঁদেরকে মূর্খ বলতেন, তেমনই করে এই মার্কিনরাও নিজেদের কৃতিত্বের পাঠ যারা যারা করলেন না, তাঁদেরকে মূর্খ বলে, তাঁদেরকে দরিদ্র করে রাখলেন।

আগ্রাসন এখনো চলছে পুত্রী, এঁর সমাপ্তি হয়নি এখনো, কারণ এঁদের স্বপ্ন অর্থাৎ সমস্ত মানুষ এঁদের গুলাম হবে, অর্থাৎ এঁদের কথাতে উঠবে বসবে, সমস্ত কিছু করবে, তা এখনো হয়নি। মানুষের মস্তিষ্কে যন্ত্র বসিয়েও মানুষকে বশীকরণ করার প্রয়াসে রয়েছে এঁরা। আর তাই এঁরা চায় যে, তাঁদের প্রস্তুত করা বীজ থেকেই শস্য উৎপন্ন হোক, তাঁদের প্রস্তুত করা খাদ্যই সকলে গ্রহণ করুক, তাদের প্রস্তুত করা ওষধিই সকলে গ্রহণ করুক, আর তাদের প্রস্তুত করা যন্ত্রই সকলে ধারণ করুক।

(মৃদু হাস্যে) কিন্তু এঁরা ভুলে গেছে আর্যদের পরিণতি। যেমন করে বিজ্ঞান দ্বারা আর্যদের আগ্রাসনকে অবগুণ্ঠিত করা হয়েছে, তেমনই কৃতান্ত নির্মাণই হচ্ছে এঁদের দমনের উদ্দেশ্যে। কৃতান্ত থেকে এককালে শাসকস্মৃতির জন্ম হবে যা সমস্ত ধরণীর মানুষকে পুনরায় স্বতন্ত্র করবে, সমস্ত পরাধীনতা থেকে। কৃতান্ত থেকে এককালে বিভিন্ন প্রজ্ঞার নির্মাণ হবে। জ্যোতিষপ্রজ্ঞা সম্পূর্ণ মনস্তত্বের বিজ্ঞান প্রদান করবে মানুষকে, এবং নিজেদের মনস্তত্বকে নিজেরাই যাতে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে মানুষ, তার শিক্ষাও দেবে। ধর্মপ্রজ্ঞা মানুষকে বিচারের শিক্ষা প্রদান করবে, আর বিবেক জাগরণের পথে চালনা করবে।

নির্মিত হবে ভূমি প্রজ্ঞা, যা এই ধরিত্রীর পঞ্চভূতের তত্ত্বকে পুনরায় স্থাপন করবে, আর বলবে যে সূর্যের তাপের কারণে ধরিত্রী তাপিত হয়না। বলবে যে, যদি তাই হতো তাহলে পাহাড়ের চুরার বরফ গলে যেত, আর পাহাড়ের পাদদেশে বরফ ছেয়ে থাকতো। … বলবে যে, তাপের সঞ্চার হয় ধরিত্রীর অন্তরের অগ্নির থেকে। আর তাই সেই অগ্নির থেকে যেই ভূমিখণ্ড যত দূরে স্থিত, তা ততই অধিক শীতল। বলবে আকাশ আর মহাকাশের একটিই পার্থক্য আর তা হলো বাকি চারভুত যখন আকাশের বুককে আঁকরে ধরে, তখন মহাকাশই আকাশ হয়ে যায়।

এই সমস্ত কথার থেকে আমাদের পঞ্চভূতের শিক্ষা প্রদান করবে ভূমি প্রজ্ঞা। বলবে অতীত প্রজ্ঞা, যেখানে তোমাকে যত ইতিহাসের কথা বললাম, সমস্ত কিছুকে বিস্তারে ব্যাখ্যা করবে। ধর্মপ্রজ্ঞার বিস্তার নিরোদের ব্যবহারকে বন্ধ করে দেবে, আনবে নারীপুরুষের অন্তর থেকে সংযমকে, এবং পুনরায় নারীপুরুষ ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে যুক্ত হবে, এবং কামনার দৃষ্টি থেকে মুক্ত করবে একে অপরকে। সন্তান লাভ হবে মিলন থেকে, সঙ্গম থেকে নয়। নারীরা স্বল্প বয়সে বিবাহ করবেন, এবং সঠিক বয়সে জননী হয়ে, বাকি জীবনব্যাপী রাজ্যকর্মে নিজেদের অবদান রাখবেন।

নারীর কারণেই পুরুষ সংযমিত। তাই নারীর উত্থান যতই হবে, নারী যত অধিক দায়িত্বশীল হবেন, ততই সমাজের উত্থান হবে। নারীর থেকে মমতার সঞ্চার, তাই সমস্ত সমাজে মমতার সঞ্চার হবে, স্নেহের সঞ্চার হবে। আর এই সমস্ত কিছুর মাধ্যমে সমস্ত ভারত থেকে প্রায় ৪ শত বৎসর আর্যদের লুকিয়ে থাকতে বাধ্য করে, তাঁদের বিনাশ নিশ্চিত করবে, আর সমস্ত বিশ্বে আর্যমানসিকতাকে এক শত বৎসরব্যাপী অপসারণ করে, উন্নত করে তুলবে, প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের মানসিকতাকে। আর তার ফলে, পুনরায় আর্য উত্থান হতে আরো এক সহস্র বৎসর লেগে যাবে, আর ততদিন আমার সমস্ত সন্তান শান্তিতে থাকবে, বিস্তার করবে মোক্ষচেতনার, আর আর্যদের পুনঃবিস্তারকে অত্যন্ত কঠিন করে দেবে।

সেই সুদিন সেদিন থেকেই নিশ্চিত, যেদিন আমি তোমার পিতার দেহধারণ করে অবস্থান শুরু করেছি। সেই কীর্তিরই পরবর্তী জ্যোতি তুমি ও তোমার সখী হবেন পুত্রী, আর সেই কীর্তিরই তৃতীয় প্রজন্মের জ্যোতি হবেন তোমাদেরই মানসকন্যা ও তাঁর ভ্রাতাভগিনীরা। … আর যতক্ষণ না তা ৬০ শতাংশ মানুষকে প্রভাবিত করবে, আর আমার সমস্ত সন্তানদের শান্তি প্রদান করবে, ততদিন এই অভিযান সমাপ্ত হবেনা।

পুত্রী, সন্তানদের সাময়িক শান্তি প্রদান করতে, ৬৪ কলা অবতারের প্রয়োজন থাকেনা। আর সাময়িক শান্তি প্রদান করতে এলে, আমি এতক্ষণে আত্মপ্রকাশ অবশ্যই করতাম। কিন্তু তোমার পিতার দেহে আমি ৬৪ কলাবেশে অবতরণ করেছি সুদীর্ঘ কালের শান্তি নিশ্চয় করতে। আর তাই তোমার পিতাকে আত্মপ্রকাশ করতে দিলাম না আমি। যদি ৬৪ কলা অবতার রূপের আভাস আর্যদের হয়ে যেত, তবে তাঁরা ৮ কলা, ১৬ কলা অবতারদের কিছুতেই কাজ করতে দিতেন না।

তাই তোমার পিতার দেহে আমি ৬৪ কলারূপে এসে, সমস্ত ঘুঁটি সাজিয়ে গেলাম, যেই অনুসারে তোমরা অর্থাৎ ৮ কলারা এবং ১৬ কলা কাজ করবে। যেহেতু ঘুঁটি সাজানো আছে, আর তা আর্যদের অজ্ঞাতেই রাখা রইল, তাই আর্যরা তোমাদের টিকিটিও ধরতে পারবে না, তোমরা কৃতান্তযুগের স্থাপনা করে, তাকে নদীর মত প্রবাহিত করে, সেই নদীকে সাগরের উদ্দেশ্যে প্রবাহিত করে দিয়ে চলে যাবে। পরে, সেই নদী স্বতঃই সাগরের পথ খুঁজে নেবে, এবং নিজের যাত্রা সম্পন্ন করে নেবে”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43