কৃতান্তিকা

দিব্যশ্রী প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা মা, আর্যরা তো কেবলই যে ঈশ্বরবাদকেই বিকৃত করেছে, এমন তো নয়। তাঁরা তো শাসনধারাকেও বেশ প্রভাবিত করেছিল। ক্ষত্রিয়দের উপর এঁদের অধিকার তো কম ছিল না! কেবলমাত্র শূদ্রদের উপর তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি, আর তার কারণও তাঁরা স্বয়ংই, আসলে শূদ্রদের উপর অত্যাচার করবেন, তাঁদেরকে শোষণ করবেন, সেই কারণেই হয়তো, এঁদেরকে নিজেদের অধিকারে রাখেন নি। তা এই শাসনের উপর, এঁরা কি প্রভাব বিস্তার করেছিল? আর অর্থের উপরেও কি এঁরা প্রভাব বিস্তার করেছিল?”

ব্রহ্মসনাতন একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, “পুত্রী, যাকে এখন তোমরা রাজনীতি বলে আখ্যা দাও, তা আদপে রাজনীতিই নয়, তা হলো কূটনীতি, আর আর্যরা কি প্রভাব ফেলেছিল, প্রশ্ন করলে না! আর্যরা রাজনীতিকে কূটনীতি দ্বারা প্রতিস্থাপন করে দিয়েছিল, এবং এক কথাতে বলতে হলে, রাজনীতিকে সম্যক ভাবে বিদায় প্রদান করেছে তারা, কারণ তাঁদের প্রভাবের কারণে আজকে কূটনীতিকেই রাজনীতি বলা হয়।

আর যেমন রাজনীতির অন্তর্ভুক্তই হয় অর্থনীতি বা শিক্ষানীতি, তেমনই কূটনীতিরও অন্তর্ভুক্ত এই দুই নীতি। আর বর্তমানে সমস্ত যাকিছুকে নীতি রূপে দেখো, তা আর্যদেরই স্থাপিত… আর তা রাজনীতির থেকে সম্যক ভাবে পৃথক। সত্য বলতে, বর্তমান মানব সভ্যতা থেকেই রাজনীতি বিদায় নিয়েছে, যা রয়েছে তা কেবলই কূটনীতি”।

দিব্যশ্রী প্রশ্ন করলেন, “এই রাজনীতি আর কূটনীতির মধ্যে ভেদ কি?”

ব্রহ্মসনাতন এবার একটু মৃদু হেসে জিজ্ঞাসু কন্যার উদ্দেশ্যে বললেন, “পুত্রী, সহজ ভাবে বলতে গেলে, রাজনীতি হলো সেই পথ, যাতে রাজা ও প্রজা একই সাথে যাতায়াত করেন। আর কূটনীতি হলো সেই পথ, যাতে একা রাজা চলেন, আর প্রজা পীঠের দুই পাশে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকেন। … আরো বিস্তারে বলতে হলে, রাজনীতি হলো এই সঙ্গমস্থল যেখানে রাজার উন্নত চেতনা ও প্রজার নিত্য প্রয়োজন মিলিত হয়। আর কূটনীতিতে কনো মিলন নেই। এক রাজা আদেশ দেন, আর প্রজাকে তা মাথা পেতে গ্রহণ করতে হয়”।

দিব্যশ্রী বললেন, “এই যৎসামান্য শ্রবণ করে শান্তি পাচ্ছি না মা। রাজনীতির সম্বন্ধে বিস্তারে পাঠ প্রদান করুন আমাকে। আর সাথে সাথে, কূটনীতিরও শিক্ষা প্রদান করুন। আমার মনে হয়, এই রাজনীতি আর কূটনীতির শিক্ষা অনেকটা সত্য ও অসত্যের শিক্ষার মত। যেমন আপনি বলেন না, অসত্য জ্ঞান না থাকলে, সত্য জ্ঞানের মাহাত্ম অনুভবই করা যায়না, ঠিক তেমনই আমার মনে হচ্ছে যেন, কূটনীতির জ্ঞান না ধারণ করলে, রাজনীতির জ্ঞানও অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। … তাই আমাকে যেমন করে বললে, আমার কাছে উভয়ই বোধগম্য হবে, তেমন করে বলুন। এই বিষয়ে আমার জ্ঞাননেত্রকে উন্মোচিত করুন মা”।

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “বেশ পুত্রী, আমি তোমাকে সম্পূর্ণ কথা বিস্তারে বলছি। এতে তোমার রাজনীতি ও কূটনীতির জ্ঞান স্পষ্ট হয়ে উঠবে। কূটনীতির কথা আলাদা করে বলবো না, বরং যখন তার রাজনীতির সাথে ভেদকে প্রত্যক্ষ করাতে হবে, তখনই তার কথা বললে, কূটনীতির ভেদও জেনে যাবে”।

এত বলে ব্রহ্মসনাতন দিব্য রাজনীতির ব্যখা শুরু করলেন, “পুত্রী, রাজনীতি শব্দের মধ্যে দুটি শব্দ রয়েছে, রাজা ও নীতি। এঁদের প্রথম শব্দ অবশ্যই রাজা, আর দ্বিতীয় শব্দ হলো নীতি। তাই প্রথম রাজার সংজ্ঞা জানবো আমরা, অতঃপরে নীতি। আর তারপরেই, আমরা রাজনীতির অন্তরে প্রবেশ করবো।

রাজা কে? রাজা হলেন একটি ছেত্রের বিশিষ্ট কিছু ব্যক্তির দ্বারা নির্বাচিত এক ব্যক্তি, যাকে সেই ছেত্রের সমস্ত মানুষ দায়িত্ব প্রদান করেন সেই ছেত্রকে সম্যক ভাবে রক্ষা করার।

অর্থাৎ রাজার ভূমিকা হলো সমস্ত ছেত্রের রক্ষা করা। তাই এবার দেখে নেওয়া আবশ্যক যে, সেই ছেত্রের মধ্যে কি কি পরে? প্রথমেই যা আসে, তা হলো ভূখণ্ড ও সেই ভূখণ্ডের প্রকৃতি, অর্থাৎ পাহাড়, মালভূমি, নদী, জলাশয়, সমুদ্রতট সমস্ত কিছু। দ্বিতীয় আসে, সেই ভূখণ্ডের উপরে স্থিত সকল বনস্পতি এবং সকল জীব। তৃতীয় আসে, সেই ভূখণ্ডে স্থিত সমস্ত ধরিত্রীর সম্পত্তি, অর্থাৎ খনিজ। এবং চতুর্থ পর্যায়ে আসে সেখানের মানুষ।

অর্থাৎ রাজার কর্তব্যের মধ্যে পরে, সেই ভূখণ্ডের, যেই ভূখণ্ডের রাজা তিনি, তার সমস্ত পার্থিব সম্পদের রক্ষা করা, সমস্ত কিছুকে নির্মল রাখা, এবং সমস্ত কিছুকে প্রাকৃতিক মর্যাদাতেই সম্পন্ন করা। বনজঙ্গলকে সুরক্ষিত রাখা পশুপাখিদের জন্য, নদীর পারবাঁধানো, জলাশয়ের পার বাঁধানো, প্রয়োজনে সমুদ্রেরও পারবাঁধানোও রাজার কর্তব্য যাতে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে প্রাণহানী কম করা যায়, এবং যাতে মানুষের কারণে প্রকৃতির বিনাশকেও হ্রাস করা যায়।

যেমন মানুষকে রক্ষা করা রাজার কর্তব্য, তেমনই সম্পূর্ণ প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের রক্ষা করাও রাজার কর্তব্য। আর তাই তাঁকে উভয় দিকের সাম্যতাকে স্থাপন করে রাখতে হবে। এরপরে আসে খনিজ উত্তোলন। রাজা জানেন যে সেই খিনিজ ধরিত্রী মাতার সম্পদ, আর সেই সম্পদ সমস্ত উদ্ভিদাদিকে পুষ্টি প্রদানের কারণেই তিনি ধারণ করেন।

তাই যতটা খনিজ প্রজার জন্য ও রাজকোষের জন্য আবশ্যক, ততটাই খনন করা উচিত, আর তার অতিরিক্ত খনন ও খনিজ উত্তোলনকে বন্ধ রাখা কর্তব্য রাজার, যাতে ধরিত্রীর সাম্যতা সর্বসময়ে রক্ষিত হয়। অতিখনন ভুমিধশের কারণ হয়, যাতে বিপুল প্রাণের বলি চরে, কেবল তাই নয়, উপরন্তু প্রকৃতির আবহাওয়ারও পরিবর্তন হয় এতে, আর তাই মুহুর্মুহু আঁধি, ঘূর্ণাবাত ইত্যাদি হতে থাকে, এবং জনবসতি প্রবল উত্তাপের শিকার হতে থাকে, বা প্রবল বর্ষণে বসতি ও লোকালয়ের ক্ষয়ক্ষতি হয়।

প্রতিটি যোনি অন্য যোনির সংখ্যাকে সীমাবদ্ধ রাখে, যেমন টিকটিকি ও ব্যাং পোকামাকড়ের সংখ্যাকে সীমাবদ্ধ রাখে, সর্প টিকটিকি ও ব্যাঙের সংখ্যাকে সীমাবদ্ধ রাখে, ময়ূর সর্পের সংখ্যাকে সীমাবদ্ধ রাখে, হরিণ ও অন্য গবাদিরা তৃণ উচ্চতাকে সীমাবদ্ধ রাখে, আবার শিকারি পশুরা গবাদির সংখ্যা সীমাবদ্ধ রাখে। তাই প্রকৃতির সমস্ত যোনির সংখ্যাকে ভারসম্যতে স্থিত রাখার জন্য, কেবল প্রকৃতির রক্ষণই যথেষ্ট, কারণ বাকি কাজ প্রকৃতি স্বয়ংই করে নেন, আর তাই রাজার কর্তব্যের এক মূল কর্মই হলো প্রকৃতিকে সুরক্ষিত রাখা। তা না হলেই, লোকালয়ে যেমন সাপের উপদ্রব বাড়বে, তেমনই হিংস্র জন্তুর।

এই সমস্ত কিছুর পরে, আসে মানুষ অর্থাৎ প্রজা। প্রজাকে সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে, রাজাকে তিনটি দিকে নজর রাখতে হয়। প্রথম হলো ব্যবস্থায়ন, যা আমরা নীতির পাঠ গ্রহণ করার সময়ে দেখতে পাবো। অতঃপরে হলো দুর্বল রক্ষণ, এদের মধ্যে দরিদ্র আসেন, স্ত্রীজাতি আসেন, বৃদ্ধ আসেন, আর শিশু আসেন। এঁদেরকে বিশেষ ভাবে সুরক্ষা প্রদান করা রাজার প্রধান কর্তব্যের মধ্যে একটি।

আর সর্বশেষ হলো সকল সম্প্রদায়কে সুরক্ষিত রাখা, এবং তাঁদের মধ্যে সম্প্রীতিকে ধারণ করে রাখা। সম্প্রদায় চার প্রকার হয় পুত্রী। এই চার প্রকার সম্প্রদায়ের মধ্যে দুটি অপরিবর্তনীয়, আর দুইটি পরিবর্তনশীল। অপরিবর্তনীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি ভাষাগত সম্প্রদায় যেমন বাঙালী, পাঞ্জাবি, গুজরাতি, মারাঠি ইত্যাদি। আর অন্যটি হলো ভূখণ্ডজাত সপ্রদায়, অর্থাৎ যেই সম্প্রদায়ের উৎস যেই স্থানে, যেমন হিন্দু অর্থাৎ যাদের উৎপত্তি সিন্ধুউপত্যকায়, যেমন দ্রাবিড় অর্থাৎ যাদের উৎপত্তি দ্রাবিড় অঞ্চলে, যেমন মঙ্গল যাদের উৎপত্তি মঙ্গল অঞ্চলে।

এগুলির পরিবর্তন হয়না। অর্থাৎ যিনি বাঙালী, তিনি বিদেশে চলে গেলেও বাঙালীই থাকেন, আর তাঁর মধ্যে বাঙালী মানসিকতাই বিরাজ করবে। যিনি দ্রাবিড় বা যিনি হিন্দু, তিনি যেখানেই চলে যান না কেন, তাঁর মধ্যে সেই মানসিকতাই বিরাজ করবে। আর তাই রাজাকে সতর্ক থাকতে হয় এই সম্প্রদায়ের সম্বন্ধে, এবং এই সম্প্রদায়ের মানুষের সম্বন্ধে, এবং যেই ভাষাজাত সম্প্রদায়ের গুনাগুণ যেমন, তাকে সেই কাজেই নিযুক্ত করতে হয়। এতে সেই প্রজার তৃপ্তিও হয়, আবার তাঁর উন্নতিও, আবার তাঁর থেকে লব্ধ রাজস্বও অধিক হয়।

যেমন ধরো বাঙালী, এঁদেরকে জলাজমির কৃষি জাতিয় কর্ম দিলে, এঁরা শ্রেষ্ঠ কর্মচারী, তা জলাজমি সঙ্ক্রান্ত কৃষিকাজই হোক, বা কৃষিসংযুক্ত কনো বাণিজ্যই হোক। আবার যেমন দেখো পাঞ্জাবি, এঁদেরকে শুকনো জমির কৃষিকাজে দিলে, এঁরা শ্রেষ্ঠ শ্রমিক ও বনিক। আবার পাশাপাশি দেখো গুজরাতি। এঁদেরকে মশলা উৎপাদন ও বাণিজ্যের কাজ দিলে, এঁরা শ্রেষ্ঠ। তেমনই মারাঠি স্বর্ণ রজতের কর্মে শ্রেষ্ঠ। আবার দেখো বিহারী, এঁরা খনিজ উৎপাদনে শ্রেষ্ঠ।

তেমনই স্থানভিত্তিক সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে দেখার যে কার কি সৎগুণ আর কার কি বদগুণ। যেমন দ্রাবিড়দের সৎগুণ হলো তাঁরা অত্যন্ত পরিশ্রমী, একই ভাব মরুঅঞ্চলের অধিবাসীদেরও। কারণ খুব স্বাভাবিক। যেই প্রকৃতির বীজ তাঁদের মধ্যে উপস্থিত, সেই বীজই তাঁদেরকে পরিশ্রম করার কথা বলে। অন্যদিকে দেখো সিন্ধুর পাসে থাকা হিন্দু। এঁরা নিজেরা অলস, কিন্তু যারা অলস, তাঁদের দ্বারা এঁরা কাজ উদ্ধার করতে সক্ষম। তাই এঁদেরকে তদারকি কাজ দিলে, এঁরা শ্রেষ্ঠ।

কিন্তু সমস্যা হয় রাজার কাছে, পরবর্তী দুই ধারার সম্প্রদায়কে নিয়ে। এঁদের মধ্যে একটি হলো ধর্মসম্প্রদায় যেমন বৈদিক, বৌদ্ধ, জৈন, ইসলাম, বৈদান্তিক ইত্যাদি। … এঁদের সম্প্রদায় কিন্তু পালটাতে থাকে। যেমন ধরো একজন পূর্বে ছিলেন বৈদিক। পরবর্তীতে তিনি হলেন বৌদ্ধ বা বৈদান্তিক, বা ইসলাম। ইনার জীবনধারাও কিন্তু সম্প্রদায়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে পালটে যায়। তাই রাজাকে এঁদের ক্ষেত্রে খুব সতর্ক থাকতে হয়।

প্রথমত, এঁদের শ্রমিক বা বনিক শ্রেণীর মানুষদের ধর্মীয়সম্প্রদায়ের দিকটা দেখতেই নেই, তাঁদের মূল সম্প্রদায়, অর্থাৎ ভাষা এবং উৎসকে দেখেই এঁদেরকে কাজে লাগাতে হয়, কারণ এই দুই মানসিকতার পরিবর্তন হবেনা। অন্যদিকে, এঁদের মধ্যে যারা জ্ঞানী, ও জ্ঞানচর্চায় রত, তাঁদেরকে শিক্ষকরূপে নিয়োগ করতে হয়। সেটিই শ্রেষ্ঠ উপায়, এই প্রজাদের শান্তি বজায় রাখার।

একই ভাবে চতুর্থ যেই পরিবর্তনশীল সম্প্রদায় অবস্থান করছে, তা হলো পেশাভিত্তিক সম্প্রদায়, যেমন কৃষক, বনিক, শ্রমিক, সুরক্ষাকর্মী ইত্যাদি। এঁদের স্বভাব হলো, নিজেরা নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যে থাকবেন, এবং অন্য সম্প্রদায়ের থেকে দূরে অপসারিত থাকবেন। কৃষক, শ্রমিক মনে করেন, তাঁরা দরিদ্র, তাই দূরে থাকা উচিত; তো বনিক, শিক্ষক মনে করেন, তাঁরা শ্রেষ্ঠ তাই তাঁদের আলাদা থাকা উচিত।

এক রাজার কর্তব্য হলো, নিজের রাজ্যকে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত করে, প্রতিটি অঞ্চলে, সমস্ত পেশাসম্প্রদায়ের ব্যক্তিকে একত্রে রাখা, যাতে একে অপরের পেশাতে তাঁদের পরিশ্রম ও একাগ্রতাকে দেখেন, এবং সকলে সকলকে সম্মান ও স্নেহ করেন। আর এই ভাবে সমস্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও স্নেহ যেন সর্বদা বিরাজ করে রাজ্যে, তা দেখা আবশ্যক রাজার জন্য। তবেই তিনি সম্যক স্থান, যার রাজা রূপে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁর রক্ষা করতে সক্ষম হবেন।

একটিই স্থানে, ১০টি কৃষক, ১০টি শ্রমিক পরিবার, ৫টি বনিক পরিবার, ২টি শিক্ষক পরিবার, একটি বৈদ্য পরিবার থাকলে, এবং তাঁদেরকে বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ভাবে থাকতে দিলে, যেমন সেই স্থানের সকলে শিক্ষকের থেকে সুবুদ্ধি পাবেন, তেমনই বনিকের থেকে অর্থসাহায্যও পাবেন, তেমনই পরিশ্রমের প্রয়োজনে কৃষক ও শ্রমিকদেরকেও পাবেন, আবার তেমনই চিকিৎসার প্রয়োজনে বৈদ্যকেও পাবেন। আর এই ভাবে সকলে সকলের কাজে এসে, এক সুন্দর সুশীল সমাজ গঠন হবে।

কিন্তু এই সমস্ত কিছুকে কার্যকর করার জন্য প্রয়োজন নীতির। নীতি কি? নীতি হলো নিয়মের নির্ধারণ, যা বাঁধাকে অতিক্রম করে, সুব্যবস্থার স্থাপনা করে। এখানেই তুমি এবার কূটনীতিকে দেখতে পাবে, বিশেষ করে যখন বাঁধার কথা বলবো।

আর্যরা বাঁধার ক্ষেত্রে কি বলেন? বলেন যে, বাঁধা থাকলে রাজ্য শাসন হবে কি করে? তাই বাঁধাকে যতশীঘ্র সম্ভব অপসারিত করো। আর এই বাঁধা অপসারিত করতে, তাঁরা স্থাপন করেন একাধিক আইন বা নিয়ম, যা মূলত বাঁধাপ্রদানকারীদের শাস্তি প্রদান করে, বাঁধা অপসারণ করার জন্যই গঠিত।

এবার এই নিরিখে দৃষ্টিপাত করো পুত্রী। কূটনীতিকে যারা রাজনীতি জ্ঞান করেন, মূলত আর্যরা,তাঁদের বক্তব্য হলো এই যে, যদি বাঁধা সরাতেই সময় নষ্ট করে দিই, তাহলে শাসন করবো কখন! … অর্থাৎ এঁদের মানসিকতাকে ভালো করে লক্ষ্য করো পুত্রী। এঁদের কাছে বাঁধা অতিক্রমের নয়, অপসারণের বিষয়, আর বাঁধা অতিক্রমকে শাসনের মধ্যে ফেলেনই না।

খুবই স্বাভাবিক, কারণ এঁদের কাছে তো বাঁধা অতিক্রমের নয়, অপসারণের বিষয়। তাই তো এঁরা বিদ্রোহ কেন হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার প্রয়াসই করেনা, বিদ্রোহীদের দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে হত্যা করেন। একই কারণে এঁদের কাছে বিদ্রোহী কৃষক কি বলছেন, কি দাবি করছেন, তা গুরুত্বপূর্ণই নয়, তাঁদের এই বাঁধার জন্য, এঁদের শাসন করার অসুবিধা হচ্ছে, তাই কৃষকদেরকে গৃহবন্দি করে দাও, বেত্রাঘাত করো, লাঠির দ্বারা প্রহার করো, এই এঁদের নীতি।

আর এই সমস্ত বিদ্রোহের জন্য যে এঁদের শাসনের অসুবিধা হচ্ছে, সেই শাসন কি? সেই শাসন হলো, নিয়মের পর নিয়ম নির্মাণ করা। বিবাহবিচ্ছেদ হলে, একজন অন্যজনকে নজরানা দেবেন, তার নিয়ম; সন্তান বৃদ্ধ পিতামাতার খরচ টানছেন না, তার জন্য নিয়ম, এমন একের পর এক নিয়ম। এই নিয়ম দ্বারা তাঁরা নাকি শাসন করবেন।

সঠিক কথা, ছাত্রছাত্রীদের সাজা না দিলে, তাঁরা তো উচ্ছন্নে যাবেন, তাই না। কিন্তু শিক্ষক কখন সাজা দেন ছাত্রছাত্রীকে? একটি পড়া পড়িয়েছেন, সেই পড়া তৈরি করে আনতে বলেছেন, আর সেই পড়া তৈরি করে আনেনি ছাত্রছাত্রী, তখনই না সাজা দেন শিক্ষক। কিন্তু এই আর্যরা, অর্থাৎ যারা কূটনীতিকেই রাজনীতি বলে চালিয়ে দেন, তাঁরা তো নিজেদের ভগবান মনে করেন।

এঁরা শিক্ষা দেবেন না, কিন্তু ছাত্রছাত্রীকে পড়া করে আনতে হবে, আর না আনলে তাঁদের সাজা দেবেন। এঁরা প্রজাদের দাম্পত্য জীবন কি ভাবে অতিবাহিত করতে হয়, সেই শিক্ষা দেবেন না, কিন্তু দাম্পত্য জীবন চালাতে না পারলে, সাজা অবশ্যই দেবেন। এঁরা প্রজাকে মিলেমিশে থাকার শিক্ষা দেবেন না, কারুকে ছোট চোখে দেখতে নেই, সেই শিক্ষা দেবেন না, বৃদ্ধদের, স্ত্রীদের, দুর্বলদের কেন সম্মান করবে, সেই শিক্ষা দেবেন না, কিন্তু হ্যাঁ, প্রজা যখন স্ত্রীদের উপর অত্যাচার করবে, বৃদ্ধদের উপর অত্যাচার করবে, ইত্যাদি যখন করবে, তখন সাজা অবশ্যই দেবে।

অবশ্যই সাজার যোগ্য অপরাধ এগুলি, কিন্তু তখনই না এগুলির জন্য তুমি সাজা নির্ধারণ করতে পারো, যখন তুমি এই শিক্ষাও প্রদান করেছ, আর সেই শিক্ষার উল্লঙ্ঘন করেছে প্রজা। কিন্তু এঁরা শিক্ষা দেবে, নিজেদের অর্থাৎ আর্যদের সেই কৃতিত্বের, যা তাঁদের আদপে কৃতিত্বই নয়, আর যেই শিক্ষা দেন নি, সেই শিক্ষার জন্য সাজা অবশ্যই দেবেন। এটাই এঁদের ব্যবস্থায়ন।

এঁরা যেই সুবিধা প্রদান করেননি, তার জন্য কর নেয়। যেমন ধরো সরাইখানা। সরাইখানা নির্মাণ ও কার্যকরী করার জন্য হয়তো সেই রাজা সাহায্য করেছেন, তাই কর নিচ্ছেন তাঁদের থেকে। আলো নিচ্ছে, বাতাস নিচ্ছে, জ্বালানী নিচ্ছে, আরো কত কি নিচ্ছে সরকারের থেকে, তাই তাঁদের কর তো হয়ই। কিন্তু যারা সেই সরাইখানাতে আহার করতে এলেন, তাদের আহার প্রদান করাতে সরকার কিভাবে সাহায্য করেছেন?

যেই আসনে বসে গ্রাহক আহার গ্রহণ করছেন, সেটি কি সরকার করে দিয়েছেন? নাকি যেই আহার তারা গ্রহণ করছেন, তা সরকার প্রদান করছে? তাহলে কি কারণে তাঁদের থেকে কর নেওয়া যায়? কিন্তু এঁরা নেবে সেই কর। সমস্ত কিছু থেকে কর নেবে, কারণ এই কর নেওয়াই তাঁদের কাছে ব্যবস্থায়ন, আর বিনা পরিশ্রমে, বিনা কনো অবদানে কর আদায় করাই এঁদের ব্যবস্থায়ন। কিন্তু পুত্রী, রাজনীতি এগুলির একটি কথাও বলেনা।

রাজনীতি বলে, ব্যবস্থায়নের কথা। সেই ব্যবস্থায়নের মধ্যে প্রথম আসে সুরক্ষা, যাকে চারটি ভাগে বিভক্ত করে রাজা চালনা করেন। প্রথমটি সীমান্ত রক্ষা ও বিপর্যয় সাহায্য; দ্বিতীয়টি রাজ্যাভ্যন্তরীণ সুরক্ষা অর্থাৎ প্রজার জন্য সুরক্ষা, তৃতীয় গুপ্তসুরক্ষা পর্যবেক্ষক, এবং চতুর্থ হলো বিচারব্যবস্থা।

সীমান্ত রক্ষী বাহিনীকেই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুকাবিলা করার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, আর তাই রাজ্যে কনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় এলে, তাঁরাই তার মোকাবিলা করেন। এবং একই সাথে সেই সীমান্তেরও সুরক্ষা করেন, যেখান থেকে দুই রাজ্যের প্রজার আনাগোনা নিষিদ্ধ, আর সেই সীমান্তেরও সুরক্ষা করেন, যেখানে যথাযথ অনুমতি সহ এক রাজ্যের ব্যক্তি অন্য রাজ্যে যাত্রা করতে পারে।

অন্তর্বর্তী সুরক্ষা কর্মী রাজ্যের প্রজাদের সুরক্ষা প্রদান করবেন। রাজ্যের সমস্ত পথঘাটকে সুরক্ষিত রাখা এঁদের কর্ম, আর সেটিই তাঁদের মূলদায়িত্ব। পথঘাট, বাজার, বা ধর্মক্ষেত্র ব্যতীত অন্য সমস্ত জমায়েতের স্থানকে সুরক্ষিত করে রাখা এঁদের কর্তব্য। ধর্মক্ষেত্রের রক্ষক সেখানের সেবায়িতরাই। সেখানে এই অন্তর্বর্তী সুরক্ষা কর্মীদের একটি পলটনকে মতায়ন করে রাখা যায়, কিন্তু তাঁদের ভূমিকা তখনই কাম্য হবে, যখন সেবায়িতরা তাঁদের হস্তক্ষেপ কামনা করবে।

এছাড়া, এই কর্মীরা সাধারণ তস্করি, ডাকাতি হতে দেবেন না। যদি এঁরা থাকতেও তা হয়, তবে এঁরা রাজার কাছে জবাবদীহি করতে এবং শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য। আর গৃহমধ্যে কোন্দল হলেও, এঁদের কাছেই প্রজা এসে নিজেদের অভিযোগ দায়ের করবেন। আর এঁরা সেই সমস্ত অভিযোগের তদন্ত করবেন, এবং প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বিচারলয়ে বিচারাধীন থাকবে সেই তদন্ত।

বিচারক বিচার করবেন যে যেই অপরাধ হয়েছে, সেই সম্বন্ধে কি শিক্ষা রাজ্যের প্রজাদের প্রদান করা হয়েছে। যদি শিক্ষাবিরুদ্ধ আচারন হয় তা, তবে তা শাস্তির যোগ্য অপরাধ, এবং বিচারক তাঁকে সাজা প্রদান করতে পারেন, যা রাজদণ্ড রূপেই স্বীকৃত হবে। যদি তা শিক্ষাবহির্ভূত অপরাধ হয়, তবে সেই বিষয়ে রাজার কাছে বিচারকের পত্র যাবে যে এই বিষয়ে শিক্ষা প্রদান হয়নি, তাই প্রজার মধ্যে এই প্রকার অপরাধ বোধের জন্ম হচ্ছে, আর রাজা সেই পত্র অনুসারে শিক্ষাদপ্তরের সাথে বৈঠকে বসবেন। আর সেই অপরাধীকে বিচারক যথাযথ শিক্ষা প্রদান করার জন্য সংশোধনাগারে প্রেরণ করবেন, এবং শিক্ষাদপ্তরের কর্ম হবে, এই অপরাধীর মানসিকতাকে সংশোধন করা।

আর সবশেষে রইল গুপ্তসেনা। এঁরা বিচারক, সেনা, অভ্যন্তরীণ সেনা, শিক্ষক, আঞ্চলিক শাসক, চিকিৎসক, বনিক, সকলের কীর্তির উপর নজরদারি করবেন এবং সরাসরি রাজাকে বা উপযুক্ত মন্ত্রককে সমস্ত তথ্য প্রদান করেন, এবং মন্ত্রকের নির্দেশে গুপ্ত তদন্তও করবেন। বা এককথায় বলা চলে, এই বিভাগ ব্যবস্থায়ন সঠিক ভাবে চলমান কিনা, প্রজাকে সঠিক শিক্ষা, চিকিৎসা, সুযোগ ও সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে কিনা, সর্বক্ষণ তার তদন্ত করতে থাকেন, আর রাজ্যের সমস্ত ব্যবস্থায়ন যেন প্রজার সুবিধার্থে হয়, প্রজার উন্নতির জন্য হয়, এবং প্রজাকে বিপদে ফেলার জন্য না হয়, তার দেখভাল এঁরা করবেন।

উপযুক্ত রাজা, এরপরেও একটি পঞ্চম বিভাগ রাখতেন, আর তা হলো সেই সময়, যেখানে বিক্ষুব্ধ বা বিরোধী বা কিছু সুবুদ্ধি প্রদানে ইচ্ছুক প্রজা সরাসরি রাজার সাথে দেখা করতে পারেন। এই ব্যবস্থা স্থানে স্থানে, এবং বছরান্তে একটি দিন একটি স্থানে রাখতেন রাজা, যাতে প্রজা নিজের ভাবকে সরাসরি রাজার সম্মুখে বলতে পারেন, আর তার ভিত্তিতে রাজা নূতন কিছু ব্যস্থায়ন করতে পারেন, বা পুরাতন ব্যবস্থায়নকে পরিবর্তিত করতে পারেন।

এই হলো রাজনীতি পুত্রী, যেখানে প্রজার জন্যই রাজার অস্তিত্ব। আর কূটনীতি হলো সেই নীতি, যেখানে রাজার জন্য প্রজার অস্তিত্ব, এমন প্রমাণ করা হয় সর্বক্ষণ, আর এই কূটনীতিই আর্যদের মতে শাসন, আর তাই এর অন্যথা হলেই, আর্যরা বলেন, বাঁধার কথা শুনবো, তো শাসন কখন করবো!”

দিব্যশ্রী বললেন, “কিন্তু পিতা, শিক্ষা আর অর্থ! … রাজনীতির মতে অর্থনীতি ঠিক কি? কূটনীতিজ্ঞরাই বা কি প্রকারে অর্থনীতির গঠন করেন? … আর আমার একই প্রশ্ন শিক্ষানীতির ক্ষেত্রেও”।

ব্রহ্মসনাতন শিক্ষালাভে উৎসাহী কন্যার উদ্দেশ্যে বললেন, “পুত্রী, অর্থনীতি হলো, রাজস্ব আয়ের নীতি, এবং রাজস্ব ব্যয়ের নীতি। এবং একই সঙ্গে এই নীতি অর্থ বণ্টনের দিকেও নজর দেয়। সমাজের সমস্ত শ্রেণীর মানুষের কাছে যেন যথাযথ অর্থ থাকে, সেই সঙ্ক্রান্ত নিয়মাবলী যেমন স্থির করে অর্থনীতি, তেমনই এও দেখে যেন রাজ্য বা রাজ্যবাসী যেন অর্থসর্বস্ব না হয়ে যায়। পুত্রী, যেই রাজ্যের অধিকাংশ অধিবাসী অর্থসর্বস্ব হয়ে যায়, অর্থাৎ দিবারাত্র কেবলই তাঁর কাছে কত অর্থ আছে, তাঁর কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, আর কি ভাবে আরো অর্থ উপার্জন করা যেতে পারে, এই ভাবনায় গ্রসিত হয়, সেই সমাজ থেকে, সেই রাজ্য থেকে, আর সেই দেশ থেকে প্রকৃতি, কালী তথা নিয়তি মুখ ফিরিয়ে নেয়।

মা তিনি, তাই কর্তব্য তো পালন করেই চলেন, কিন্তু তাঁর হৃদয়ে আর সেই প্রেম অবশিষ্ট থাকেনা। আর তাই সেই সমাজ অহংকারের আরাধনাতে মেতে উঠে, শীঘ্রই শয়তানের আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়। তাই রাজার অর্থসংক্রান্ত সর্বপ্রথম কর্তব্য হলো অবশ্যই সকল প্রজার কাছে যেন তাঁর পরিশ্রম অনুপাতে অর্থ থাকে, তা দেখা, যেন কনো প্রজা অনাহারে মৃত্যু না যান তা দেখা, যেন কনো প্রজা চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর গ্রাস না হন, তা দেখা। কিন্তু পরবর্তী প্রধান কর্তব্য এই দেখা যে প্রজা যেন অর্থসর্বস্ব না হয়ে যায়।

এর প্রথম দৃষ্টান্ত রাজাকে ও রাজপরিবারকে স্থাপন করতে হয়, সহজ স্বাভাবিক এবং বিলাসিতাবিহীন অথচ গোছানো জীবনযাপন দ্বারা, অতঃপরে মন্ত্রী, মন্ত্রক, রাজ কর্মচারীদের মাধ্যমে এই শিক্ষা সমাজে স্থাপিত করতে হয়, অতঃপরে সাধারণ প্রজার জন্য নিয়মকানুনও নির্মাণ করা যেতে পারে, যাতে প্রতিটি সম্প্রদায়ের বার্ষিক আয়ের উর্ধ্বসিমা ধার্য করা যেতে পারে, এবং অবশ্যই মুদ্রাস্ফীতি ও হ্রাসের সাথে সেই ঊর্ধ্বসীমাকে নিয়ন্ত্রণ অর্থাৎ পরিবর্তনও করতে হয়।

এমন নিয়মের ফলে, সেই ঊর্ধ্বসীমার ঊর্ধ্বে আয় তাঁদের কাছে অযথা হয়ে যাবে, কারণ সেই সমস্ত অর্থ কর বাবদ রাজকোষেই যাবে, অর্থাৎ তাঁদের পরিশ্রম বৃথা চলে যাবে। তাই, প্রজার অর্থ আয়ের প্রতি দৃষ্টি সেই ঊর্ধ্বসীমা পর্যন্তই সীমিত থাকবে, তার অধিক নয়।

এই নিয়মের ফলে অর্থবণ্টনও সহজ হয়ে যায় রাজার কাছে, এবং কনো একটি বনিক বা মন্ত্রী বা মন্ত্রকের কাছে অধিক সম্পদের সমাহার থেকে অন্যত্র দারিদ্রতার রচনার সম্ভাবনা থাকেনা, এবং সর্বোপরি প্রজা ধনসর্বস্ব হবার সুযোগই লাভ করে না। যেই সমাজ ধনসর্বস্ব নয়, সেই সমাজের মানুষ স্বাভাবিক ভাবেই নিজের অন্তরে প্রতিভার সন্ধান করতে থাকে, কারণ সেই প্রতিভা তাঁর জীবনঅতিবাহিত করাকে সহজ করে দেয়।

আর এর ফলে, কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, এমনকি সাধকের সংখ্যারও বিস্তার পায়। এবং এই অর্থ আয়ের উচ্চসীমায় প্রতিবন্ধকতার কারণে, ছল-চাতুরী-ঠোকান-জোচ্চুরিও সমাজে সীমিত হয়ে যায়। পুত্রী, যখন পরিবারপিছু অর্থ আয়ের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারিত থাকেনা, তখন মানুষ অধিক অধিক অর্থ আয়ের জন্য, যা তাঁর প্রতিভা নয়, তাকেও প্রতিভা করে সম্মুখে স্থাপিত করে, সেই প্রতিভাকে বিজ্ঞাপন দ্বারা শ্রেষ্ঠ প্রতিভা রূপে সমাজের সম্মুখে স্থাপিত করে, অধিক অর্থ আয় যেমন করতে যায়, তেমন সেই প্রতিভায় যারা সত্য অর্থে প্রতিভাবান, তাঁরা অর্থের অভাবে বিজ্ঞাপন না দিতে পারার কারণে পিছিয়ে পরেন, আর ফলে রাজ্যে প্রতিভার অপপ্রচার হয়, এবং তা প্রকারন্তরে সমাজের ও সামাজিক জনজীবনের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি করে।

তাছাড়াও, যখন পরিবার পিছু আয়ের ঊর্ধ্বসীমা থাকেনা, তখন অধিক থেকে অধিক অর্থ আয়ের নেশা চেপে ধরে প্রজার মানসিকতাকে। আর এর ফলে যার কাছে রাজনৈতিক ক্ষমতা আছে, সে ছল চাতুরী ও গায়ের জোয়ারি দ্বারা অধিক আয় করে, আবার যার সেই রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই, তাঁরা জালিয়াতি করে মানুষকে ঠকিয়ে অধিক অর্থ আয় করেন। কিন্তু উচ্চআয়ের সীমা থাকলে, মানুষের কাছে এই সমস্ত জালিয়াতি, বা ছলনা, জোচ্চুরি, সমস্ত কিছু অর্থহীন হয়ে যায়।

যাদের কাছে প্রতিভা নেই, তাঁরাও ছলনার আশ্রয় করার চিন্তা করেনা, কারণ তাঁদের লোভ যে চরমে উন্নীত হবার জায়গাই পায়না। অন্যদিকে যারা সত্য অর্থে প্রতিভাবান, তাঁরা নিজেদের প্রতিভার দ্বারা সমাজকে, সমাজের মানুষকে আরো উন্নত করার চিন্তাধারায় প্লাবিত হন, আর এই ভাবে সমাজের উন্নতি হতেই থাকে।

এছাড়া, রাজাকে সমস্ত প্রজা পরিবারের উপার্জনকেও নিশ্চিত করতে হয়, এবং এও নিশ্চিত করতে হয় যাতে সমস্ত পেশায় নিযুক্ত হবার জন্য সমান চাহিদা থাকে প্রজার মধ্যে, অর্থাৎ এমন যেন না হয় যেন একটি বা দুটি পেশাতে সমস্ত প্রজা যেতে উৎসুক হন, এবং অন্য কিছু পেশায় তাঁরা যেতে অনিচ্ছুক থাকেন। এমন হলে রাজ্যের ভারসাম্যতা বিনষ্ট হয়ে যাবে, তাই সেই দিকেও রাজাকে অর্থনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে দৃষ্টি রাখতে হয়।

যারা শিক্ষালাভে মনযোগী অথচ মেধাহীন, তাঁদের জীবনধারা সঠিক রাখার জন্য সরকারি চাকুরীপদে যেমন অভ্যন্তরীণ সেনাদলে তাঁদেরকে নিয়োগ করতে হয় রাজাকে। যারা শিক্ষালাভে মেধাবী, তাঁদেরকে মন্ত্রী, মন্ত্রক, বিচারক, বা বিভিন্ন শাসকের প্রতিনিধিত্ব করার পদে নিয়োগ করা আবশ্যক। যাদের শিক্ষালাভে কনো মতি নেই, তাঁদেরকে কৃষিকাজ, শ্রমের কাজ ইত্যাদিতে নিবিষ্ট করতে হয়, আর যদি তাঁদের মধ্যে প্রতিভার আভা দেখা যায়, যেমন কাষ্ঠশিল্পীর ভাব, মৃৎশিল্পীর ভাব, বা মিস্ত্রির ভাব দেখা যায়, তাঁদের সেই প্রতিভার উপরকাজ করে, তাঁদেরকেও সেই কাজে নিবিষ্ট করা যেতে পারে।

এছাড়া মহিলাদের অধিকপরিশ্রমের কাজ সঁপা সঠিক নয়, কারণ তাঁরা জন্মদাত্রী, আর তাঁদের শারীরিক সবলতা আবশ্যক সুস্থ ভবিষ্যৎ প্রজালাভের জন্য। কিন্তু তাঁদের অন্য সমস্ত কর্মে নিয়জিত করা যেতে পারে। অর্থাৎ শাসককর্মের পদে, মন্ত্রী বা মন্ত্রকের পদে, হস্তশিল্পের কাজে, তাঁদেরকে নিয়োগ করা জেতেই পারে, যদি তাঁরা সেই দিকে রুচিশীল হন।

এছাড়া, মেধাবী স্ত্রীদের দায়িত্ব মহারানীকে রাজা সঁপতে পারেন, যাতে তাঁরা কাব্য, সাহিত্যে, বা দর্শনে ভূমিকা সাধন করতে পারেন। সন্তান পালন গুরু আশ্রমে, এবং গুরু তথা গুরুমাতার তত্ত্বাবিধানে অনুষ্ঠিত হবে, বাধ্যবাধকতা ভাবে। তাই স্ত্রীরা সন্তানকে গুরুর আলয়ে প্রেরণের পর থেকে সম্পূর্ণ ভাবে ফাঁকা। সেই মহিলাদের গুণাগুণে যাতে রাজ্যের উন্নতি ও কল্যাণ সাধিত হয়, তা দেখা অত্যন্ত আবশ্যক। মহিলাদের শ্রমের ক্ষমতা পুরুষের থেকে কম হলেও, কর্মদক্ষতা পুরুষের থেকে এই কারণে অধিক, কারণ তাঁদের অন্তরে জননীর নিবাস থাকে, তাই তাঁরা সমস্ত কর্মে নিজেদের জননীর ভাবকে কাজে লাগানই। আর সেই কারণে একই কর্ম একটি পুরুষ করলে, তা যতটা ফলদায়ক, তার থেকে অধিক ফলদায়ক হয় যদি সেই একই কর্ম মহিলারা করেন।

তাই যোগ্য মহিলাদের যদি উচ্চপদ প্রদান করা যেতে পারে, যেমন বিচারকের পদ, বা কনো মন্ত্রকের পদ, তবে রাজ্যের কল্যাণ অধিকভাবে সাধিত হবার সম্ভাবনাই অধিক। তবে অবশ্যই সেই স্ত্রীকেই সেই পদে নিযুক্ত করা যেতে পারে, যার সেই পদের ভার সামলানোর সামর্থ্য আছে, অর্থাৎ মহিলা সংরক্ষণ যেন না থাকে। যোগ্য পদাধিকারী যেই হবেন, পুরুষ বা মহিলা, তিনিই সেই পদ অধিগ্রহণ করবেন, এমন নিয়মই থাকা শ্রেয় রাজ্যের জন্য।

রাজাকে এই সমস্ত কিছুর সাথে সাথে রাজস্ব উপার্জনের দিকেও নজর দিতে হয়। অবশ্যই সেই স্থান থেকে কর আদায় করবেন না রাজা, যাতে তাঁর অর্থাৎ শাসকের অবদান নেই, তবে এমন কনো স্থান যদি থাকে, যেখানে শাসকের অবদান ছাড়া প্রজা উপার্জনাদি করছেন, তবে তা রাজা ও রাজ্যের জন্য নিন্দনীয় কীর্তি।

উপযুক্ত বনিককে রাজা অর্থদান করে, বিশিষ্ট বাণিজ্য করতে দিতে পারেন, এবং তার থেকে উপাদানের একাংশ এবং কর লাভ করতে পারেন। কিন্তু বনিক যদি নিজের অর্থ দ্বারা সেই বাণিজ্য চালনা করেন, তা রাজা ও রাজ্যের জন্য অত্যন্ত নিন্দনীয়, আর এতে অর্থবণ্টনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই সমস্ত বনিককে রাজা স্বয়ং বা অর্থদপ্তরই রাজকোষ থেকে অর্থ প্রদান করে বাণিজ্য স্থাপনে অগ্রাধিকার দেবে। আর পরিবর্তে সমস্ত উৎপাদনের একাংশ গ্রহণ করবে রাজস্ব রূপে, আর সঙ্গে বাণিজ্যিক কর।

সেই বাণিজ্য নিত্যবস্তু উৎপাদনও হতে পারে, বা পরিধানের কাপড়জামাও হতে পারে, বা কৃষিজমিও হতে পারে, বা কাষ্ঠশিল্প বা মৃৎশিল্পও হতে পারে। সমস্ত ক্ষেত্রে, উপযুক্ত ব্যক্তিকে বনিক ও বাণিজ্য স্থাপকরূপে রাজকোষ থেকে অর্থ প্রদান করা হবে, এবং পরিবর্তে উৎপাদনের ১০ থেকে ২০ শতাংশ এবং উপার্জনের বাকি সমস্ত পরিমাণের আয় থেকে ১০ শতাংশ আয়কর নেবেন রাজস্ব।

আর এই ১০ থেকে ২০ শতাংশকে রাজ্য অন্যরাজ্যে বিক্রয় করে, রাজস্ব লাভ করবে। আর এই সমস্ত রাজস্ব উপার্জনকে রাজা ব্যবহার করবেন পরিবহনে, প্রজার গৃহনির্মাণে, প্রজাকে ঋণ দেবার কারণে, এবং সেই সমস্ত কর্মীদের বেতনের জন্য, যারা আর্থিক যোগদান করেন না রাজস্বে নিজেদের কর্মের জন্য। এছাড়া, রাজ্যবাসির অর্থের সুরক্ষার উদ্দেশ্যে, রাজা প্রজাদের অর্থ জমা রাখার সুরক্ষিত স্থানও নির্ধারিত করে দিতে পারেন।

এর ফলে, প্রজাকে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে যাবার কালে অর্থ নিয়ে যেতে হবেনা, এবং পথে ডাকাতির ভয় থাকবেনা। যেই স্থানে প্রজা পৌঁছে অর্থ ব্যয় করবেন, সেখানের প্রজাকোষের যেই শাখা থাকবে, তার থেকে অর্থ গ্রহণ করে, প্রজা নিজেদের ক্রয়বিক্রয় সহজ ভাবে করতে পারবেন। আর এমন করলে, রাজার কাছে প্রজার সমস্ত উপার্জন একত্রিত হয়ে থাকবে, যাকে ব্যবফার করে, রাজা যেই প্রজাদের ঋণ প্রয়োজন, তাঁদের কাছে সেই অর্থ প্রদান করে, পুনরায় রাজস্ব আয় করতে পারেন।

স্মরণ রেখো পুত্রী, রাজস্ব আয় রাজাকে করতেই হবে, কারণ প্রজাদের বেতন দিতে হবে তাঁকে, পরিবহন, গৃহনির্মাণের ন্যায় প্রজাহিতের কর্ম করতে হবে তাঁকে, বনিকদের বাণিজ্যের অর্থ প্রদান করতে হবে তাঁকে, এই সমস্ত তো আছেই। এছাড়া, যদি কনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় হয়, রাজাকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হবে, জনজীবনকে পুনরায় শীঘ্রই সুস্থাপিত করতে। তাই প্রজাকে সাহায্য প্রদান করে, সেই সাহায্যের মাধ্যমে, রাজা নিজের কাছে রাজস্ব বৃদ্ধি করে রাখতে পারেন।

এই হলো অর্থনীতির মূল কথা পুত্রী, এবার আমি তোমাকে শিক্ষানীতির কথা বলবো, কারণ এই নীতিই সেই নীতি, যার ভিত্তিতে এক রাজ্য উড্ডীয়মান হয়, এবং যার ভিত্তিতে রাজ্যের প্রজার উন্নতি হয়, এবং যার ভিত্তিতে রাজ্য বহুকাল শ্রেষ্ঠ আসন ধারণ করে অবস্থান করে অক্ষয় হয়ে যায়। পুত্রী, খেয়াল করে দেখো, আজ আমাদের ভারতবর্ষে শিক্ষা এক প্রহসন মাত্র হয়ে রয়েছে, কিন্তু তাও ভারতবর্ষ নিজের অস্তিত্বকে বিলীন হতে দেয় নি। কেন পারলো এমন করতে?

পুরাকালে যেই অসামান্য বৌদ্ধ শিক্ষায় ভারত ও ভারতবাসী শিক্ষিত ছিলেন, তাকে আর্যদের মিথ্যাচার, এবং তৎপশ্চাতে ফিরিঙ্গিদের অর্থআয় সর্বস্ব শিক্ষাও বিনষ্ট করতে পারেনি। তাই আজ ভারতবর্ষের শিক্ষা শ্রেষ্ঠতলানিতে পৌঁছে গেলেও, সে তলিয়ে যাচ্ছেনা। এই হলো শিক্ষানীতির মাহাত্ম পুত্রী। এবার শোনো, আমি তোমাকে আদর্শ শিক্ষানীতির কথা বলছি। 

পুত্রী, আদর্শ শিক্ষা নীতি তিনটি ক্ষেত্রের উপর অবস্থান করে। একটি তাঁর স্থূল অবস্থা অর্থাৎ সেই শিক্ষাব্যবস্থার স্থান, শিক্ষাব্যবস্থার অন্তরে ছাত্র বা ছাত্রীর অবস্থান কাল, এবং কোন ছাত্র বা ছাত্রই কতকাল শিক্ষা গ্রহণ করবেন, অর্থাৎ পাত্র। একটি তাঁর সূক্ষ্ম অবস্থা অর্থাৎ কুলকুণ্ডলিনী, সুষুম্না, ইরা ও পিঙ্গলা, যাদের মধ্যে কুলকুণ্ডলিনী হলো গণিত, সুষুম্না হলো সাহিত্য, ইরা হলো ইতিহাস, এবং পিঙ্গলা হলো ভূমিবিজ্ঞান। এবং তৃতীয় ক্ষেত্র হলো কারণ অবস্থা, যেখানে ত্রিগুণকে দমন করে বিবেক ও চেতনাকে স্থাপিত করা হয়।

যদি কনো শিক্ষাব্যবস্থা এই তিন ক্ষেত্রকে ধারণ করে অবস্থান করে, তাহলে সেই শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত ছাত্রছাত্রী একাকজনই একাকজন নৃপতি নির্মিত হবেন, অর্থাৎ এই শিক্ষাব্যবস্থাকে স্থিত করে যদি এক শত বৎসরও রাখা যায়, তাহলে সমস্ত রাজ্যবাসি স্বয়ং নৃপতি হয়ে উঠবেন, এবং তাঁদের রাজা কেবলই তখন নির্দেশমান্যতা করা সরকারি কর্মচারীতে রূপান্তরিত হয়ে উঠবে।

কাজেই বুঝতে পারছো, কনো আর্য বা আর্যসমাজ এই শিক্ষাব্যবস্থাকে গ্রহণ করবে না, কারণ তাঁদের কাছে এই দিন অর্থাৎ নৃপতি অনাবশ্যক হয়ে যাবার দিন অভিশাপের সমান। যদি সমস্ত মানুষ, সমস্ত প্রজা স্বয়ং রাজা হবার যোগ্য হয়ে ওঠেন, তাহলে যে আর কেউ কখনোই আর্য শাসকের ব্যবিচারকে মানবেনা, কেউ তখন আর্য শাসকের কর্তৃত্ব, অহংকার, দম্ভও মানবে না। আর শাসক তো অনেক পরের কথা, তাঁদের ধর্মবাণী প্রচারক, যারা হয় নিজেদের ভগবান বলে দাবি করতে থাকেন, নয় সেই ভগবানকেও অভিশাপ দেবার সামর্থ্যধারি বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন, তাঁদেরকেও আর কেউ মান্যতা প্রদান করবে না।

তাই আর্য সমাজ এই শিক্ষা নীতির বিরোধও করবে, যদি তা স্থাপিত করা হয়, আর যদি স্থাপিত না হয়, তাঁরা স্বয়ং তো এই শিক্ষানীতিকে কিছুতেই স্থাপন করবেনা, কারণ তাঁরা পরাধীন করে রেখে প্রভুত্ব করাকেই নিজেদের ধর্ম বলে জ্ঞান করেন। তাই এই মহাবিজ্ঞানকে অবশ্যই মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করো ও আত্মস্থ করো পুত্রী।

প্রথমেই আসবো স্থূল অবস্থার কথা, অর্থাৎ স্থান, কাল ও পাত্র। পুত্রী, একজন শাবককে প্রথম ৮ বৎসর পিতা ও মাতার কাছেই রাখা উচিত। তাঁরাই সন্তানকে অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন করবেন, আর সন্তান তাঁদেরকাছেই খেলে বেড়াবেন। এই সময়টি শিশুর জন্য অত্যন্ত আবশ্যক, কারণ এই সময়টিতেই শিশুর অন্তরে যেই প্রতিভা সুপ্ত হয়ে রয়েছে, তা প্রকাশিত হতে শুরু করে।

শিশু যখন ক্রীড়া করার জন্য প্রকৃতির সাথে মিশে গিয়ে ক্রীড়া করবে, তখনই তাঁর মধ্যে এই প্রতিভাসমূহের বিকাশ হবে। কারুর মধ্যে সঙ্গীত, কারুর মধ্যে ক্রীড়াবিদ হবার গুণ, কারুর মধ্যে চিত্রাঙ্কন, কারুর মধ্যে নাট্য, কারুর মধ্যে অসম্ভব মেধা, কারুর মধ্যে বিচারগুণ প্রত্যক্ষ হয়ে উঠবে। প্রকৃতিই আমাদের জননীর স্থূলরূপ, আর শিশু নিজের জননী ছাড়া কার কাছে নিজের বিকাশ লাভ করতে পারে?

তাই শিশুকে এই ৮ বৎসর বয়স পর্যন্ত কেবলই প্রকৃতির সাথে মিশে থাকতে দিলে, তবেই তাঁর প্রতিভার বিকাশ হবে। যদি এই সময়ের পূর্বে শিশুকে নির্দিষ্ট শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে আবদ্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে শিশুর এই বিকাশ কনো ভাবেই সম্ভব নয়। তাই ৮ বৎসর বয়সের পূর্বে, কেবলই অক্ষরজ্ঞান, সংখ্যাজ্ঞান।

৮ বৎসর বয়সের পরে তাঁদেরকে গুরুর আশ্রমে পিতামাতা দিয়ে আসবেন। এক গুরুর আশ্রমে সমবয়সী একাদশ বালক ও একাদশ বালিকা শিষ্যের অধিক কখনোই থাকবে না। গুরু ও গুরুমাতা এই শিষ্যদের একত্রে ততক্ষণ সাহিত্য ও গণিতের শিক্ষা দেবেন, এবং সঙ্গীত ও ক্রীড়ার শিক্ষা দেবেন, যতক্ষণ না বালিকারা রজশিলা হচ্ছে।

গুরু ও গুরুমাতার কাছে অন্য আচার্য ও আচার্যপত্নীও থাকতে পারেন, এই শিক্ষাপদ্ধতিতে সহযোগ প্রদান করতে, তবে এই আচার্য ও আচার্যপত্নীর সংখ্যা কখনোই ৪ দম্পতির থেকে অধিক হবেন না, একটি গুরুকুলে, অর্থাৎ একটি গুরুকুলে, গুরু ও গুরুমাতা ছাড়া আরো চার দম্পতি আচার্য ও আচার্যপত্নী রূপে থাকতে পারেন, সকলে ছাত্রছাত্রীদের দেখাশুনা করার জন্য।

আর এঁরা কেউই ছাত্রছাত্রীদের কেবল শিক্ষক নন, এঁরা সকলেই ছাত্রছাত্রীদের তৃতীয় মাতা। এঁদের প্রথম মাতা হলেন জগজ্জননী, যারই সন্তান গর্ভে ধারণ করে, এঁদের দ্বিতীয় জননী এঁদের জননী হন, অর্থাৎ এঁদের গর্ভধারিণী মাতা, আর গুরু এবং গুরুমাতাগন হলেন এই ছাত্রছাত্রীদের তৃতীয় মাতাপিতা। আর তাঁদের কাছে উপস্থিত সকল ছাত্রছাত্রী, তাঁদের নিজেদের সন্তান, আপন সন্তান।

বালিকারা রজশিলা হলে, বালকবালিকাদের একত্রে শিক্ষা প্রদানকে স্থগিত করে, বালকদের আলাদা করে, এবং বালিকাদের আলাদা করে শিক্ষাদান শুরু হবে। আর তখন থেকেই শুরু হবে ইরাপিঙ্গলার শিক্ষা, অর্থাৎ ইতিহাস ও ভূমিবিজ্ঞানের শিক্ষা। গণিত ও সাহিত্য চর্চাও চলতে থাকবে, আর তার সাথে ইতিহাস ও ভূগোল শিক্ষা প্রদান করা হবে, ছাত্রছাত্রীদের। সঙ্গে সঙ্গীত, ক্রীড়া, চিত্রাঙ্কন, নাট্য, নৃত্য, এঁদের মধ্যে যার যেইদিকে প্রতিভা বিকশিত হবে, তাঁকে সেই দিকেও শিক্ষিত করা হবে।

আর এই সমস্ত কিছুর সাথে শিক্ষা দেওয়া হবে পঞ্চভূতের। পুরুষ ও স্ত্রীদেহ, মন, বুদ্ধি, প্রাণ, উর্জ্জা, সমস্ত পঞ্চভূতের জ্ঞান যতই ভূগোলের জ্ঞানের সাথে মেলাতে পারবে শিষ্যরা, ততই তাঁদের মধ্যে আকাশতত্ত্ব, জলতত্ত্ব, বায়ুতত্ত্ব, অগ্নিতত্ত্ব, এবং ধরিত্রীতত্ত্বের জ্ঞান প্রস্ফুটিত হবে, এবং ততই পুরুষ স্ত্রীকে, এবং স্ত্রী পুরুষদের সম্মান করতে শুরু করবে, একে অপরের সম্বন্ধে স্পষ্ট ভাবে ধারণা রাখার কারণে। আর তা যখন হবে, তখন পুনরায় স্ত্রী ও পুরুষ ছাত্রছাত্রীদের একত্রে শিক্ষা দেওয়া শুরু হবে।

কিন্তু এই শিক্ষাপর্ব শুরু হবার পরে পরেই, কিছু কিছু ছাত্রছাত্রীর মধ্যে শিক্ষার প্রতি অনীহা দেখা যাবে। তাঁদেরকে এবার শিক্ষা থেকে অপসারিত করে, যে যেই প্রতিভায় ভূষিত, অর্থাৎ কৃষি, শিল্প, কলা, ক্রীড়া, মৃতকলা, ইত্যাদির গুণে প্রতিভাশালী করে তুলে, তাঁকে রাজ কর্মের জন্য উপযোগী করে তোলাই এবার কর্তব্য।

বাকি যাদের পঠনপাঠনে মনোযোগ অবশিষ্ট আছে, এবার তাঁদের পঞ্চভূতকে বশীভূত না করলে যে, কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছার জন্ম হয়, আর এঁরা জাগ্রত থাকলে, বিবেক ও চেতনা জাগ্রত হতে পারেনা, আর বিবেক চেতনা জাগ্রত না হলে মানবজন্ম বৃথা, এই অন্তিম শিক্ষায় শিক্ষিত করা শুরু হবে।

এঁদের মধ্যেও এবার দেখা যাবে যে, কিছু অতিবুদ্ধিমান ছাত্রছাত্রী বাচাল হয়ে উঠতে শুরু করবে। এবার তাঁদেরকে পৃথক করে নিয়ে, বাণিজ্যের জ্ঞান প্রদান করা গুরু ও গুরুমাতার কর্তব্য। বনিকের ধর্ম, বনিকের জন্য অধর্ম ইত্যাদি সমস্ত কিছুর জ্ঞান প্রদান করে, তাঁকে রাজার দ্বারা চিহ্নিত বনিকের নিম্নে কর্মরত করতে হয়, যেখান থেকে বাণিজ্যবিদ্যা হাতেকলমে শিখলে, তবে বনিকের বেতনভুক্ত অবস্থা থেকে স্বয়ং বনিক হয়ে উঠবে। এই পদ্ধতিও অত্যন্ত আবশ্যক, কারণ বনিকের মধ্যে অর্থের লোভ প্রথম প্রবেশ করে, তাই সেই লোভের বীজকে বীজ অবস্থাতেই বিনষ্ট করে দেওয়া আবশ্যক।

এই শিক্ষার্থীদের পরেও কিছু শিক্ষার্থী অবশিষ্ট থাকবেন, যারা তখনও শিক্ষাগ্রহণ করতেই থাকবেন। এঁদেরও একশ্রেণী একটি সময়ের পর অমনোযোগী হয়ে উঠবে, বিশেষ করে সেই সময়ে যখন, কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছার দমন প্রক্রিয়ার মধ্যে শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করবে। এঁরা রাজার শাসন কর্মে যোগদান করার উপযুক্ত। এঁদের কেউ কেউ সেনা হবেন, তো কেউ কেউ মেধাবী সেনার অধ্যক্ষ হবেন, তো কেউ কেউ অন্য প্রকার শাসন কর্মে নিযুক্ত হবেন।

অবশিষ্ট শিক্ষার্থীরা চেতনা ও বিবেকের জাগরনে সক্ষম হলে, গুরুর আলয়ে নতুন শিক্ষকের বেশে নিযুক্ত হবেন, কিন্তু আচার্য বা আচার্যপত্নী ততক্ষণ তিনি হবেন না, যতক্ষণ না তাঁদের বিবাহ হচ্ছে। পুত্রী, এই হলো আদর্শশিক্ষা ব্যবস্থা, যা একটি সমাজকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করে থাকে। যদি সত্যই কনো রাজা রাজনীতির অভ্যাস করেন, এবং নিজের প্রজাদের সন্তানের মত স্নেহ করেন, এবং তাঁদের বাস্তবেই উন্নতি চান, ও চান যে সকলের মানবজন্ম সার্থক হোক, তবে অবশ্যই এই শিক্ষাব্যবস্থা স্থাপন করবেন।

আর পরে রইল কেবল সংস্কৃতি। সংস্কৃতির শিক্ষা তো গুরুর আলয় থেকেই শুরু হয়। তবে এই সংস্কৃতিতে সংযুক্ত যারা, তাদের প্রতিভা এতটাই বিরল যে, তাঁদেরকে মানুষ অতিরিক্ত পছন্দ করতে শুরু করেন, আর অর্থও প্রদান করতে শুরু করেন। কিন্তু একবার যদি তা হয়ে যায়, তাহলে খুবই সম্ভাবনা থাকে যে এঁরা অহংকারের পাঁকে পতিত হবে। আর সংস্কৃতির ব্যক্তিরা সমাজে সদ্ভাব, স্নেহ, এবং ভেদভাবশূন্যতার বীজ স্থাপন করেন । তাঁদের মধ্যেই যদি অহংকার এসে যায়, তাহলে সম্পূর্ণ সমাজই নষ্ট হয়ে যাবে।

তাই রাজার কর্তব্য হলো সঙ্গীতের ও আলাদা আলাদা কলার পৃথক গুরুআলয়ের নির্মাণ করে দেওয়া, আর যত স্নাতক সেই কলাতেই মন রাখে, তাঁদেরকে সেই গুরুর আলয়ে প্রতিস্থাপিত করা, এবং এঁদেরকে সরকারি কর্মী করে রেখে দিয়ে, বিভিন্ন ক্রীড়া, ও কলা প্রদর্শনীর মাধ্যমে এঁদের রুজির ব্যবস্থাও করা, এবং একই সঙ্গে সাধারণ প্রজাদের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থাও করা। … এই হলো পুত্রী, সম্পূর্ণ নীতি, যার মধ্যে একটিই কথা এখনো বলিনি তোমাকে।

আর তা হলো গুরু আলয় থেকে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের আলয়ে কখন যাবেন, সেই বিষয়ে। পুত্রী, প্রতি বৎসর একটি নির্দিষ্ট সময়ে রাজা, রাজ্যের জন্য এক উৎসবের সমারোহ করবেন। সেই উৎসবকে ঘিরে যেমন শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের পুরস্কার থাকবে, শ্রেষ্ঠ বিচারকের পুরিস্কার থাকবে, শ্রেষ্ঠ সেনা, শ্রেষ্ঠ কর্মীর পুরস্কার থাকবে, তেমন বিভিন্ন ক্রীড়া থাকবে, বিভিন্ন কলা পরিবেশন থাকবে, এবং তাঁদের জন্যও পুরস্কার থাকবে। এই উৎসবের সমারোহ আশ্বিন ও কার্ত্তিক মাস ব্যাপী হবে, যেখানে সকল প্রজা মাতৃআরাধনাও করবে, আর সাথে সাথে মনোরঞ্জন, মেলা, সঙ্গীত, ক্রীড়া, সুখাদ্য গ্রহণ, সুবস্ত্র ধারণ সমস্তই থাকবে। ছাত্রছাত্রীরা এই দুই মাস নিজেদের পিতামাতার কাছে থাকবেন”।

দিব্যশ্রী বললেন, “মা, এই সমাজ যেন এক অত্যন্ত অদ্ভুত ও দিব্য। আমি দূর দূর পর্যন্ত এই সমাজে কেবল ভ্রাতৃত্ব আর স্নেহই দেখতে পেলাম এতক্ষণ ধরে, কারণ কনো শত্রুতা, দ্বেষ, হিংসা স্থান পাবার স্থানই দেখতে পেলাম না। … এই শাসন ব্যবস্থা নিয়ে নয়, অন্য এক বিষয়ে আমার কিছু প্রশ্ন আছে মা”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43