অনুশাসন
মহাভারতের কথন ধারণ করে, দিব্যশ্রী বললেন, “মা, এ তো এক বিকট সমস্যা! আর্যরা যে দিবারাত্র মিথ্যা পাঠ করিয়ে গেছে আমাদেরকে! সেই মিথ্যাকে সত্য মানা মানুষদের আমি সত্য প্রদান করবো কি করে? যাদের পিতামাতা আছেন, তাঁদের কাছে এই সমস্ত সত্য প্রদান অসম্ভব। তাই, ধরে নেওয়া যাক, যেমন আপনি বলেছেন, সেই অনুসারে অনাথ শিশুদের সেই শিক্ষা প্রদান করা গেল। কিন্তু তারপরেও যখন সেই অনাথরা সমাজের মধ্যে নিজেদের কদম রাখবে, সমাজকে তো সেই মিথ্যাগুলিকেই সত্য জ্ঞান করতে দেখতে থাকবে! তাহলে তাঁদেরকে এই সত্যের পথে রাখবো কি করে?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, সমাজে সত্য স্থাপনা এমন কিছু কঠিন কর্ম নয়। একটি কথা সমাজে অনেকে বলতে থাকলে, সমাজ সেই কথাকেই সত্য কথা ধরে নেয়। এতাবৎকাল অসত্যকে সেই ভাবেই মানুষ সত্য জ্ঞান করে এসেছে। একই ভাবে, এবার সত্যকে সমাজে সত্য রূপে স্থাপিত করে দেবে।
আর তা করার জন্য, প্রথমশ্রেণীর দ্বিতীয়শ্রেণীর, এবং এমন ভাবে বেশ কিছু শ্রেণীর অনাথ শিশুদের, যাদেরকে তুমি সত্য পাঠ প্রদান করবে, বা তোমার পরেও তোমার উত্তরসূরি সেই সত্য পাঠ প্রদান করবেন, তাঁদেরকে একটি নূতন সমাজ স্থাপন করে, সেই সমাজেই স্থাপিত রাখবে, যাতে সেই সমাজের বাইরে তাঁদেরকে গিয়ে জীবনযাপন করতে না হয়।
ধরে নাও, কাহিনী অবলম্বনে নাটক প্রদর্শন করে, তাঁদের অর্থআয় সম্ভব হলো, এবং ক্ষেতি করে, তাঁদের উদরপূর্তি ঘটলো। যখন এই সত্যজ্ঞাত অনাথ সন্তানের সংখ্যা বহু হয়ে যাবে, তখন যখন এঁরা সমাজে নিজেদের কদম রাখবে, তখন কিন্তু আর তাঁরা একজন নন সত্যকে সত্য বলার ক্ষেত্রে। তখন সত্যকে সত্য বলার জন্য অনেকে উপস্থিত থাকবে। আর তাই সমাজ তাঁদের কথনকে সত্য মানতে কিছুদিনের মধ্যেই বাধ্য হবে।
পুত্রী, রাতারাতি ফললাভের প্রয়াসের কারণেই মানুষ বিপ্লব করে, বিদ্রোহ করে। কিন্তু যদি এই রাতারাতি ফললাভের লালসা না রেখে, জীবনমৃত্যুকে কেবলই একটি পৃষ্ঠা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া জেনে অগ্রসর হয়, তখন মানুষের স্বভাবকে মেনেই সেই কর্ম করা যায়, এবং সেই ক্ষেত্রে বিদ্রোহ বা বিপ্লবের কনো প্রয়োজনই নেই।
পুত্রী, বিদ্রোহ বা বিপ্লবের কারণে বিদ্রোহী ও বিপ্লবীর ইতিহাসের পাতায় নাম ওঠে। এবার তুমি বলো আমায়, কোনটি আবশ্যক, সমাজে সত্য স্থাপিত হওয়াটা, নাকি ইতিহাসের পাতায় কিছু নশ্বর শরীরের নাম লিখে রাখাটা! পুত্রী, ধর তোমার ইতিহাসের পাতায় এমন নাম লেখা হলো, কারণ তুমি বিপ্লব করেছ, আর তুমি এই দেহ ত্যাগ করে, অন্য দেহ ধারণ করে, সেই ইতিহাস নিজেই পাঠ করছো? সেই ইতিহাসে তোমারই অন্য শরীরের কীর্তি পাঠ করে কি তোমার মধ্যে গর্বের অনুভব আসবে!
যদি এই সমস্ত কিছুই নশ্বর হয়, তবে এই ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম স্থাপন করে কৃতিত্ব অর্জনের প্রয়াস কেন পুত্রী? কেন না এমন ভাবে সেই কাজকেই করা যায়, যাতে ওই যে তোমরা বলো, সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না… তেমন করা যায়! … পুত্রী, মানুষের স্বভাবকে কাজে লাগিয়ে কর্ম করো। কর্ম তুমি করো, আর কর্মের পরিণামকে প্রকাশ করার অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ সময়ের হাতে ছেড়ে দাও।
পুত্রী, সময় স্বয়ং আমি। তোমার কর্ম যদি আমার সমস্ত সন্তানের কল্যাণের উদ্দেশ্য সাধন করে, তাহলে আমি স্বয়ং সময় ও প্রকৃতির বেশে, সেই সমস্ত কর্মকে সকলের মধ্যে স্থাপন করে দেব। ঠিক তেমনই ভাবে পুত্রী, রাতারাতি পরিবর্তন আনার প্রয়াস করে, তুমি সত্যের সঙ্গ কি করে দিচ্ছ! … সত্য তো এই যে পরিবর্তন প্রতিমুহূর্তে হয়, কিন্তু কখনোই তা রাতারাতি প্রকাশিত হয়না।
তাই সত্যকে সত্য মেনেই প্রকাশিত হতে দাও। … অনাথ সত্যজ্ঞ-এর সংখ্যা বৃদ্ধি করার দিকে মন দাও, তবে তা কারুর উপর বলপ্রয়োগ করে বা বিদ্রোহ করে নয়। একটি একটি করে অনাথ শিশুকে মাতৃত্ব প্রদান করে, তাঁকে সত্যের সাথে পরিচয় করাও। আর যখন এই অনাথদের সংখ্যা এমনই হয়ে যাবে যে, সমাজের একটি অংশরূপে তাঁরা নিজেদের স্থাপিত করতে পারবে, তখন তাঁদেরকে সমাজে স্থাপিত করে দাও। …
অনেকে একই কথাকে সত্য মানার কারণে সমাজ তাঁদের কথা শুনতে থাকবে, এবং কিছুকাল পরে তাকে সত্য বলে মানতেও থাকবে, আর এমন ভাবেই বিদ্রোহ এবং বিপ্লব না করেই, সত্যকে স্থাপিত করা সম্ভব হবে সমাজে”।
দিব্যশ্রী বললেন, “কিন্তু মা, সেই অতিসংখ্যার অনাথ সত্যজ্ঞরাও বা কি ভাবে সেই মানুষদের বোঝাবে যে সতীর কথা মার্কণ্ডেরই কথা, বা মহাভারতের কথা বেদব্যাসের নিজের জীবনী! … তাঁরা যে এই সমস্ত কিছু সম্বন্ধে অন্য ধারণা ইতিমধ্যেই নিজেদের মনে স্থাপিত করে রেখেছে!”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, এমন ধারণা রাখছো কেন যে, তোমার ছাত্রছাত্রীরা জনে জনে গিয়ে সকলের ভুল ভাঙাতে থাকবে! … কেন করবে, এমন কাজ? পুত্রী, পূর্বেও জনে জনে প্রচারের কাজ করেছেন অনেকে। স্বয়ং চৈতন্য মহাপ্রভু করেছেন, বিবেকানন্দ করেছেন, আর্যরা করেছেন, আরো অনেকে করেছেন। কিন্তু লাভ হয়েছে কনো কিছুতে?
পুত্রী, এই প্রচারের ধারাই জগতে আজও প্রসিদ্ধ। এই একই ধারা মেনে, আজকেও যাকে তোমরা বলো মার্কেটিং ও বিজ্ঞাপন, সেই প্রথা চলছে। এতে প্রভাব বিস্তার হয়। হয়না তেমন নয়। কিন্তু তা অত্যন্ত সাময়িক। স্বল্প কিছু সময়ের জন্য তা বিস্তার পায়, আর যখনই সেই প্রচারের উদ্যোক্তা কালের নিয়মে অপসারিত হয়, তৎক্ষণাৎ, এই প্রচার স্তব্ধ হয়ে যায়, আবার যে কে সেই। তাই পুত্রী, এই প্রচারের পুরানো পন্থার পরিবর্তন হওয়া আবশ্যক।
পুত্রী, নতুন ধারার প্রচারের শুরু করো। প্রচার না করাও একটি প্রচার। পুত্রী, দিদিমা বা ঠাকুমা যেই বাক্সতে কারুকে হাত দিতে দেননা, সকল নাতিনাতনির সেই বাক্সের দিকেই নজর থাকে। দিদিমা বা ঠাকুমা কি সেই বাক্সের প্রচার করলেন? না, তিনি প্রচার করলেন না, বরং তিনিই সঠিক ভাবে প্রচারটা করলেন, কারণ তিনি সকল নাতিনাতনির অন্তরে সেই বাক্সকে খোলার প্রবণতা ও আগ্রহকে জাগ্রত করলেন।
ঠিক একই ভাবে পুত্রী, তোমার ছাত্রছাত্রীরা যখন বহুসংখ্যায় সমাজে বিরাজমান হবে, অথচ তাঁরা কনো প্রচার করবে না, তখন সমস্ত সমাজের নজরই তোমার ছাত্রছাত্রীদের জীবনদর্শনে পরিণত হয়ে যাবে। … আর সেটিই হলো প্রচার।
আর কেবল এই নয়, কারুকে ভুল বা মিথ্যাবাদী বলে চিহ্নিত করার প্রবণতাও এক মুর্খামি, কারণ তা শত্রুতার নির্মাণ করে। যখন তোমার ছাত্রছাত্রীদের কাছে সমাজ পৌঁছাবে, তখন যদি তাঁরা এই বলা শুরু করে যে, আর্যরা মিথ্যা বলেছে, বা ব্রাহ্মণরা মিথ্যা বলেছে, বা আধুনিককালের বিজ্ঞান সমানে আমাদের মিথ্যা বলে চলেছে, সেই কথা সমাজে তাঁদের গ্রহণযোগ্য করুক আর না করুক, তাঁদের এই কথন তাঁদের অসংখ্য শত্রুকে জন্ম দিয়ে দেবে।
তাই পুত্রী, সর্বদা আক্রমণের চিন্তা কেন? সর্বদা ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম তোলার প্রবণতা কেন? কেন সহজ ভাবে সহজ কাজকে সঞ্চালিত করার প্রয়াস করো না? … পুত্রী, সত্যের বিবরণ প্রদান করো। ইতিহাসকে ব্যক্ত করো। শ্রবণকর্তা বিচার করবেন, কি সত্য আর কি অসত্য। কারুর উপর কনো ক্রীড়া করে, সেই ক্রীড়ার ফলকে সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যক্ষ করার প্রয়াসে মানুষ কেবলই অন্যকে পরাধীন করে। না তো সে নিজে স্বাধীন থাকে, আর না অন্যকে স্বাধীনতা দেয় সে।
যখন কারুকে কেবলই সত্য ইতিহাস ব্যক্ত করবে, সত্য বিজ্ঞান ব্যক্ত করবে, সত্য দর্শন ব্যক্ত করবে, তা মানুষ সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করবেনা। তারা সেই কথা শুনবেন, গৃহে প্রত্যাবর্তন করবেন, বিচার করবেন। আর সেই বিচারের পর, যদি তুমি সত্যই বলে থাকো, তবে অধিকাংশ বিচারশীল মানুষই বিচারের শেষে তা গ্রহণ করবে। আর সেই গ্রহণ করা, তাঁদের নিজেদের গ্রহণ করা হবে, জোর করে তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবেনা।
তাঁরা স্বতন্ত্র ভাবে, নিজেরা নিজেদেরকে সত্যের সাথে যুক্ত করে নেবে। তবেই তো সত্যের বাস্তবিক বিস্তার সম্ভব হবে। তাই নয় কি? কারুকে যদি, আমি বলছি তাই মানো, এই ভাবে চাপিয়ে দাও, তাহলে সত্য স্থাপিত হয় কি করে? যেই সত্য স্থাপনের প্রক্রিয়াই পরাধীনতা প্রদান, তা সত্য কি করে হতে পারে!
তাই সত্য বলো, কারুর নিন্দা করো না। … সকলেই স্বরূপে ব্রহ্ম, তাই সকলেরই বিচারশক্তি আছে। সকলেই বিচার করতে সক্ষম। তাঁরা বিচার করবেন, এবং স্বতঃই সত্যকে গ্রহণ করবেন। হ্যাঁ, তোমার কথা শ্রবণ করতে চাইবেন না পথমে। তাই অনাথ ছাত্রছাত্রী নির্মাণ করে, তাঁদের মাধ্যমে তোমার কথাকে একমুখ থেকে অজস্র মুখে নিয়ে চলে যাও। তাঁদের কথাও শ্রবণ যদি না করার প্রবণতা থাকে, তাই প্রচারের অনন্য একটি উপায় ধারণ করে, তা প্রচার করো। তবে তারমানে এই নয় যে, সত্যকে কারুর উপর জোর করে স্থাপিত করে, যিনি এতকাল অসত্যের কাছে পরাধীন ছিলেন, তাঁকে আজ নতুন ভাবে সত্যের কাছে পরাধীন করে দেবে”।
দিব্যশ্রী বললেন, “বেশ বুঝলাম মা এবার। … অনবদ্য তোমার উপায়। … তোমার উপায়ই বলে দেয় যে, মা কেমন হয়। মা সন্তানের উপর প্রভাব তো বিস্তার করে, কিন্তু সেই প্রভাব বিস্তারের মধ্যেও থাকে কেবলই কল্যাণ চিন্তা, আর সন্তানের প্রতি অপার স্নেহ। মা কখনই সন্তানের উপর জোর করে কিছু চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী হননা। … কিন্তু মা, আমার এই ক্ষেত্রে কিছু জানার আছে।
আসল কথা এই যে, কেবল ইতিহাসেরই সত্য লুক্কায়িত করা হয়নি। সত্য দর্শনেও লুক্কায়িত করা হয়েছে, আর সত্য বিজ্ঞানেও লুক্কায়িত করা হয়েছে। … সেই কালে আর্যরা দর্শনের নাম করে, অসত্যের বিস্তার করেছিল, আর আজকের আর্যরা বিজ্ঞানের নাম করে অসত্যের বিস্তার করে চলেছে। তাই মা, আমি তোমার থেকে সেই মিথ্যা ও সত্য দর্শনের সম্বন্ধে জানতে চাই।
আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, তোমার কনো সন্তানের উপর আমি কনো প্রকার জোর প্রদান করবো না। কারুকে পরাধীন করার প্রয়াস করবো না। কারুকে বলবো না যে, কি কি মিথ্যা দর্শন বা মিথ্যা বিজ্ঞান তাঁরা জেনেছে। কারুকে সেই কথা শেখাবোও না, বলবোও না। কিন্তু মা, আমাকে ও আমার ছাত্রছাত্রীদের তো অসত্য ও সত্য দুইই জানতে হবে, তাই না!
সত্য তো জানতেই হবে, সঙ্গে সঙ্গে অসত্যও। কাল এমন যেন না হয় যে, আমার ছাত্রছাত্রী আমার থেকে সত্য জেনে সমাজে গেলেন, আর সমাজে যেতে, তাঁর মুখের উপরে কিছু মানুষ বলে দিলেন, এ তো সত্য জানেই না, বাবু এই হলো সত্য। … আর সেই অসত্যকে সত্য বলে আখ্যা দিতে আমার ছাত্রছাত্রীরা বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন। এমন যেন না হয়, তার জন্য আমাদের সত্যকে জানা যতটা আবশ্যক, অসত্যকে জানাও ততটাই আবশ্যক। … তাই মা, আমাকে সেই দর্শনের ও বিজ্ঞানের মধ্যে আর্যরা যেই অসত্য ব্যক্ত করেছে, তার বিবরণ প্রদান করে, তার সত্যতা প্রদান করুন।… কৃপা করুন মা”।
দর্শন সত্য (অনুশাসন)
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “বেশ, প্রথমেই আমি তোমাকে দর্শন সংযুক্ত যে সমস্ত অসত্য বিস্তারিত আছে, আর তাদের সত্যতা ব্যক্ত করছি শ্রবণ করো।
পুত্রী, ব্রহ্মাণ্ড অসত্যেরই প্রকাশ, কারণ সত্য অর্থাৎ ব্রহ্ম এই ব্রহ্মাণ্ডের প্রকাশ করেননি, বরং সেই ব্রহ্ম যিনি সমসত্ত্ব হবার কারণে, তাঁর কনো অণু হওয়া সম্ভবই নয়, তাঁরই কিছু অসম্ভব হয়েও স্বয়ং স্বয়ংকে অণু মানেন, তাঁরা নিজেদেরকে প্রকাশিত করে স্বয়ম্ভু হয়ে এই ব্রহ্মাণ্ডের প্রকাশ করেন। অর্থাৎ সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড এক চরম অসত্য, যার লেশ মাত্রও সত্য নয়, অথচ, যারা নিজেদের স্বরূপ ভুলে স্বয়ম্ভু হয়ে এই ব্রহ্মাণ্ডের প্রকাশ করেছেন, তাঁরা যেহেতু সেই ব্রহ্মই, তাই এই ব্রহ্মাণ্ড অসত্য হয়েও সম্পূর্ণ ভাবে অসত্য নয়।
কিন্তু সম্পূর্ণ ভাবে অসত্য না হলেও, এই ব্রহ্মাণ্ড এক অলিক কল্পনা ব্যতীত কিছুই নয়, আর সেই কল্পনার ভিত্তি হলো ভ্রম। কিসের ভ্রম? ব্রহ্মাণুদের স্বরূপ ভ্রম। সেই স্বরূপ সম্বন্ধে ভ্রমিত হবার কারণেই এই ব্রহ্মাণ্ড। তাই এই ব্রহ্মাণ্ড অবশ্যই বিভ্রান্ত, আর বিভ্রান্ত হবার কারণে, এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে স্থাপিত সত্য একটিই আর তা হলো যন্ত্রণা।
সাদানন্দময় ব্রহ্মস্বরূপ সম্বন্ধে ভ্রমিত হয়ে স্বয়ম্ভু রূপে আত্মপ্রকাশিত ব্রহ্মাণু সর্বদাই বেদনাগ্রস্ত, সদাই নিরানন্দময়, আর সদাই আনন্দের সন্ধানী। কিন্তু ভ্রমিত হবার কারণে, তাঁরা এই সত্য সম্বন্ধে অজ্ঞাত যে, তাঁদের নিরানন্দের কারণ হলো তাঁদের স্বরূপ ভ্রম, আর তাই তাঁরা ব্রহ্মাণ্ডের বিকাশ করতেই থাকে, সেই আনন্দের সন্ধানের উদ্দেশ্যে, আর সমানে অধিক থেকে অধিক ভাবে নিরানন্দ অনুভব করতেই থাকে।
এর বিপরীতে, কিছু অণুর মধ্যে এই চেতনার উদয় হয়েছে যে, এই বিস্তারের ডামাডোলের কারণেই তাঁদের নিরানন্দ, আর তাই তাঁরা সংযমের পথে চালিত। পুত্রী, এই দুই, অর্থাৎ বিস্তারপ্রেমী এবং সংযমপ্রেমী, এই দুই ধারার অণুদ্বারাই এই ব্রহ্মাণ্ড অস্তিত্বশীল এবং গতিশীল। যারা সংযমপ্রেমী, তাঁরা সমস্ত সময়ে সংযমের অধ্যয়ন করতে ব্যস্ত থাকেন, আর যারা বিস্তারপ্রেমী, তাঁরা সর্বক্ষণ এই সংযমপ্রেমীদের সংযমের অধ্যয়ন থেকে বিরত করার প্রয়াস করে।
আর এই প্রয়াসের ফলে, সংযমের প্রয়াসে ব্যর্থ হবার কারণে, সর্বক্ষণ সংযমপ্রেমীরা বিকল্পের সন্ধান করেন। আর তাই যেমন বিস্তারপ্রেমীরাও গতিশীল, তেমনই সংযমপ্রেমীরাও গতিশীল না হতে চেয়েও গতিশীল, আর এই দুই অণুর গতিশীলতার কারণে, সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড গতিশীল, আর এই গতিশীলতাই আমাদেরকে কিছুতেই মানতে দেয়না যে ব্রহ্মাণ্ড হলো এক ভ্রম, আর এই ভ্রমের থেকে আমাদের মুক্ত হওয়াই হলো জীবনের এবং ব্রহ্মাণ্ডের লক্ষ্য।
এই দুইপ্রকার যে অণুদের কথা বললাম, এঁদের কনো ভারসম্য থাকেনা ব্রহ্মাণ্ডে, কারণ এখনও পর্যন্ত সংযমপ্রেমীরা নিজেদের সংযমকে ধারণ করে রাখার জন্য উপযুক্ত জ্ঞান ও ধারণা লাভ করেন নি। আর যাতে তাঁরা এই জ্ঞান ও ধারণা লাভ করেন, তার কারণেই আমি তুমি ইত্যাদি সমস্ত ঈশ্বরকটি অবতাররা বারেবারে আসি।
অপরদিকে, এই বিস্তারপ্রেমীদের দাপটই ব্রহ্মাণ্ডে সর্বাধিক, কারণ তাঁরা বিস্তারের উপায় লাভ করেছে, এবং সংযমপ্রেমীদের বিরক্ত করতেও তাঁরা সফল হয়ে এসেছে এখনোপর্যন্ত। এই সংযমপ্রেমীদেরকে আমরা বলে থাকি সাধক, যারা সংযমের সাধ ধারণ করে, ব্রহ্মাণ্ডের কল্পনা থেকে এবং ব্রহ্মাণুর ভ্রম থেকে মুক্ত হয়ে, জীবনমৃত্যুর চক্র থেকে মুক্ত হয়ে, ব্রহ্মস্বরূপ হয়ে উঠতে ব্যস্ত ও মার্গসন্ধানী।
এঁদেরকে যারা অনুসরণ করেন, বা করার প্রয়াস করেন, তাঁদেরকে আমরা বহু ভাবে নামাঙ্কিত করি, যেমন দেব, গন্ধর্ব, পিতৃ, ইত্যাদি, যেখানে দেব হলেন এই সাধকদের রক্ষা করার ভূমিকায় স্বেচ্ছায় অবতীর্ণ; গন্ধর্ব এই সাধকদের বার্তাকে সর্বসমক্ষে স্থাপনার জন্য সঙ্গীতের রচয়িতা; এবং পিতৃ এই সাধকদের অনুসরণ করার উপযোগিতা ব্যক্ত করতে ব্যস্ত থাকেন। আর সাধকরা আমার তোমার, অর্থাৎ ঈশ্বরকটি অবতারদের প্রদত্ত মার্গকে অনুসরণ করতে থাকেন।
অন্যদিকে, যারা বিস্তারপ্রেমীদের নেতৃত্ব প্রদান করেন, তাঁদেরকে আমরা শয়তান বা অসুর নামে অবিহিত করি। এঁদের অনুগামীদেরও আমরা বহু নামে অবিহিত করে থাকি, যেমন যক্ষ, রক্ষ, দানব। এঁদের মধ্যে যক্ষ হলেন তাঁরা যারা এই বিস্তারপ্রেমীদের বিস্তার ভাবনাকে বাস্তবায়িত করেন; রক্ষ বা রাক্ষস হলেন, সেই বিস্তারকে যারা রক্ষা করেন; এবং দানব হলেন তাঁরা যারা এই রক্ষদের নির্দেশানুসারে সাধক, দেব, গন্ধর্ব ও পিতৃদের বিরক্ত করেন।
কিন্তু এই দুই অসমসংখ্যার গোষ্ঠী, অর্থাৎ স্বল্প সংখ্যক সংযমপ্রেমী, এবং বিস্তরসংখ্যক বিস্তারপ্রেমীদের অন্তরালেও কিছু থাকেন। আর তিনি হলেন স্বয়ং আমাদের সকলের স্বরূপ অর্থাৎ ব্রহ্ম। পুত্রী, ব্রহ্ম নিষ্ক্রিয় ঠিকই, কিন্তু নিষ্ক্রিয় হলেও তিনি সক্রিয়, আর সত্য অর্থে, তাঁর ন্যায় সক্রিয় কিছুই সম্ভব নয়।
যেমন এই ধরিত্রীকে দেখে মনে হয় যে তা নিষ্ক্রিয়, কিন্তু যাই ধরিত্রীর পৃষ্ঠ থেকে লম্ফ দেওয়া হয়, অমনি ধরিত্রীর সক্রিয়তাকে মাধ্যাকর্ষণ রূপে অনুভব করা যায়, তেমনই ভাবে ব্রহ্ম নিষ্ক্রিয় হলেও, যখনই কিছু ব্রহ্মের থেকে অর্থাৎ স্বরূপের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখনই তাঁর সক্রিয়তাকে অনুভব করা যায়।
আর এই সক্রিয়তা তিন স্তরে অনুভূত হয় আমাদের, একটি কারণ রূপে, দ্বিতীয়টি সূক্ষ্মরূপে, এবং তৃতীয়টি হলো স্থূল রূপে। কারণ রূপে ব্রহ্মের সক্রিয়তাকে আমরা নিয়তি বলে থাকি। সূক্ষ্মবেশে ব্রহ্মের সক্রিয়তাকে আমরা সময় বলে থাকি। আর স্থূলরূপে ব্রহ্মের সক্রিয়তাকে আমরা প্রকৃতি বলে থাকি। আর এই তিন অবস্থার ব্রহ্মসক্রিয়তারই প্রকাশকে আমরা অবতার বলে থাকি।
এঁদের মধ্যে ৪ কলা থেকে ১৬ কলা অবতার হলেন প্রকৃতির প্রকাশ; ১৬’র উর্ধ্ব থেকে ৩২ কলা অবতার হলেন সময়ের অবতার, এবং ৩২ এর উর্ধ্বের সমস্ত অবতার হলেন নিয়তির অবতার। এই ভেদের অর্থ কি? এই ভেদের অর্থ এই যে, ৪ থেকে ১৬ কলা অবতারের প্রকৃতির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে, কিন্তু সময়ের উপর নয়। ১৬’র উর্ধ্ব থেকে ৩২ কলা অবতারের প্রকৃতি ও সময়ের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে, কিন্তু নিয়তির উপর কনো নিয়ন্ত্রণ থাকেনা। আর ৩২ কলার উর্ধ্বের অবতারদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে, অর্থাৎ নিয়তি, সময় ও প্রকৃতি, এই তিনের উপরই নিয়ন্ত্রণ থাকে।
পুত্রী, তোমার মনে হতেই পারে যে, এতশত অবতার গ্রহণ করে লাভ কি হলো, তাই তো? ৪ থেকে ১২ কলার অবতারদের মধ্যে রয়েছেন চৈতন্যমহাপ্রভু, বিশ্বামিত্র, পিপলাদ; ১৬ কলা অবতারদের মধ্যে রয়েছেন গৌতম, শঙ্কর, কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন; ৩২ কলা অবতারদের মধ্যে রয়েছেন রামকৃষ্ণ ঠাকুর, মার্কণ্ড। কিন্তু এতশত অবতারের ক্রিয়ার দ্বারা কি আর কার্যসিদ্ধি হলো, এমনই মনে হচ্ছে তাই না! … আর্যরা তো গৌতমের ধারাকেও প্রায় ভারতের ভূমির থেকে কেটে ফেলেই দিয়েছেন, শঙ্করের বেদান্তকেও ঢেকে রেখে দিয়েছেন, পিপলাদের উপনিষদকেও, এমনকি কৃষ্ণ দ্বৈপায়নের মহাভারতকেও ঐতিহাসিক কাহিনী বলে ভ্রম স্থাপন করে রেখে দিয়েছেন।
রামকৃষ্ণ কথামৃত তো দুর্বোধ্য আর মার্কণ্ডের মার্কণ্ড মহাপুরাণ তো কেবল লোককথা হয়েই প্রচলিত। যখন আর্যরা অবতারকৃত্যের এমন সমস্ত হাল করেই দিয়েছেন, তখন অবতারগ্রহণে কি লাভ হলো! …
(মৃদু হেসে) পুত্রী, শয়তান ভাবেন যে তাঁরাই কর্তা, তাঁরাই সমস্ত কিছু করছেন, আবার সাধকও ভাবেন যে তাঁরাই সমস্ত কিছু করছেন আর ব্যর্থ হচ্ছেন শয়তানদের কারণে। কিন্তু সত্য এই যে, না তো শয়তান কিচ্ছু করছেন, আর না সাধক। … কর্তা তো এক মাধ্যাকর্ষণ শক্তিই অর্থাৎ কর্তা এক নিয়তিই।
পুত্রী, জীবকটির সমস্যা হলো এই যে, তাঁদের কাছে তাঁদের প্রতিটি দেহধারণের স্মৃতি উপস্থিত, যাকে তাঁরা বলে থাকে পূর্বজন্মের সংস্কার। সমস্যা কেন? কারণ শয়তানরা এই সংস্কারকে নিজেদের কুবিচার, বিস্তারধারণা, ও অহমপ্রেম দ্বারা পরিবেষ্টিত রেখে দেয়। ঈশ্বরকটির কাছে সেই সংস্কার থাকেনা, সেই দিক দিয়ে যেমন ঈশ্বরকটি লাভবান, তেমন অন্য দিকে ঈশ্বরকটির সমস্যাও বিস্তর।
যেহেতু কনো অবতার কারুর পুনর্জন্ম নয়, তাই সংস্কার থাকেনা। আর তাই পূর্বের অবতার কতটা কর্ম সাধন করে গেছেন, তার ধারণাও পরবর্তী অবতারের থাকেনা। শয়তানদের থেকে নিজেদের কর্মকে সুরক্ষিত রাখার উদ্দেশ্যে, সর্বদাই অবতাররা রূপক ব্যবহার করে সমস্ত কথা বলেন, যেমন মার্কণ্ডের রূপকে সতী পার্বতী, যেমন ব্যাসের রূপকে রয়েছে হস্তিনাপুর। আর তাই পরবর্তী অবতারের জন্য এই সমস্ত রূপক ভেদ করাও কঠিন হয়ে যায়। আর যখন তা ভেদ করা সম্ভব হয়, ততক্ষণে দেহের আয়ু প্রায় সমাপ্ত। তাই কর্মের প্রগতি হয়না, এমনই আপাতদৃষ্টিতে দেখে মনে হয়।
তবে তোমাকে এক গুহ্য রহস্য বলি এবার তাহলে। সমস্ত বুদ্ধরা সত্যকে দক্ষতার সাথে অনুধাবন করে, তাদেরকে রূপক করে রেখে গেছেন। সেই সমস্ত বুদ্ধের ব্যবহার করা রূপককে ভেদ করে, পিপলাদ উপনিষদের রচনা করে গেছেন, পরবর্তী সমস্ত অবতারদের জন্য। মার্কণ্ড, ব্যাস, বিশ্বামিত্র সত্যকে আরো দৃঢ় ভাবে অনুধাবন করে রূপক আকারে সমস্ত লিখে গেছেন। আর তার উদ্ধার করে, অসম্ভব সুন্দর ভাবে বলে গেছেন চৈতন্য, শঙ্কর, এবং রামকৃষ্ণ।
আর সেই সমস্ত তত্ত্বকে একত্রিত করে, আমি তোমার হাতে তুলে গেলাম সমস্ত সত্যের তত্ত্ব। পুত্রী, এই সমস্ত কিছু এমনই গতিহীন ভাবে চলেছে যে, আর্যরা বুঝতেও পারলো না, কিভাবে তা বুদ্ধদের থেকে পিপলাদ হয়ে, মার্কণ্ডের থেকে ব্যাসের থেকে রামকৃষ্ণ শঙ্কর হয়ে আমার হাতে উঠে এলো।
আর আরো গভীর দৃষ্টি দিয়ে দেখবে তো আরো আনন্দদায়ক তথ্য পাবে। পুত্রী, পূর্বের অবতাররা নিজেদেরকে অবতার বলে আত্মপ্রকাশ করতেন না। না বুদ্ধরা করেছিলেন, না পিপলাদ, না গৌতম, না মার্কণ্ড। ব্যাস, বিশ্বামিত্র আকারেইঙ্গিতে সেই কথা বললেন, নিজেদের অবতার না বলে, নিজেদের অন্তরাত্মকে রাম বা কৃষ্ণ নাম প্রদান করে, তাঁদেরকে অবতার বললেন। শঙ্কর পুরো ব্যাপারটাই চেপে গেলেন কারণ তাঁকে যে মহাশূল বেদান্ত অস্ত্রকে রচনা করতে হতো।
কিন্তু এরপরে চৈতন্য এবং রামকৃষ্ণ উভয়েই নিজেদেরকে অবতার রূপে ঘোষণা করে দিয়ে, আর্যদের মধ্যে একটা ধারণা প্রস্তুত করে দিলেন যে অবতার এলে সকলেই জানতে পারবেন। কিন্তু চৈতন্য বা রামকৃষ্ণের মাধ্যমে নিয়তি যে, তাঁর ৬৪ কলার অবতারের অবতরণকে সহজেই আত্মগোপন করে দেবার মায়া রচলেন, তা আর্যরা ঘনাক্ষরেও টের পেলেন না।
আর আমি এসে, অতি নিরবে, সমস্ত অবতারদের কৃত্যকে সম্মুখে রেখে, কর্তা নাশের মহামন্ত্রকে নির্মাণ করে দিয়ে গেলাম। তাও কোন ভাষায়? বাংলা ভাষায়, যা অনার্যদের ভাষা। আরো নিরীক্ষণ করো পুত্রী। মার্কণ্ড ছিলেন প্রয়াগের অধিবাসী। আর্যদের দাপাদাপির কারণে তিনি কোথায় এলেন? বঙ্গদেশে।
সেই বঙ্গদেশ থেকে ফিরিঙ্গিদের হাত ধরে, কাদেরকে উৎখাত করা হয়? আর্যদের। অর্থাৎ কি দাঁড়ালো? বঙ্গদেশে সত্যের বীজ স্থাপন করিয়ে দিয়েছিলেন মার্কণ্ডের হাত ধরে। সেই বীজকেই চারাগাছ এবং বৃক্ষে পরিণত করেগেছিলেন কারা? চৈতন্যদের এবং রামকৃষ্ণ, অনেক সাধকের মাধ্যমে। আর তারই সাথে নিয়তি কি করলেন? বঙ্গদেশ থেকে আর্যদের উৎখাত করে সরিয়ে দিলেন। আর সম্পূর্ণ ভাবে আর্যদের এই দেশ থেকে, এই ভাষা থেকে অপসারিত করার শেষে, এখানে আমাকে প্রকাশ করলেন, এবং আমার মাধ্যমে আর্যদের অচর্চিত বঙ্গভাষাতেই কৃতান্ত ও কৃতান্তিকা রচনা করিয়ে, সমস্ত ইতিহাস, সমস্ত ভৌতিক সত্য, এবং সমস্ত আধ্যাত্মিক সত্যকে ব্যক্ত করে দিয়ে গেলেন।
অর্থাৎ সমস্ত সত্য, সমস্ত ইতিহাস রচিত হলো, অত্যন্ত সংক্ষেপে তা বলা হলো, আর সেই ভাষাতে বলা হল তা, যেই ভাষার চর্চাই করেন না আর্যরা, অর্থাৎ তা সুরক্ষিত থেকে গেল। আরো গভীরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করো পুত্রী।
আর্যদের দাপট ও অত্যাচার ও ব্যবিচার ও লুণ্ঠন ও মিথ্যাচার সম্বন্ধে ভারতবাসী প্রায় ভুলেই গেছিলেন। কিন্তু ঠিক যেই সময়ে এই সমস্ত সত্যকে বঙ্গভাষায় লিপিবদ্ধ করালেন পরানিয়তি, তখনই শয়তানের মহাবতারের উত্থানকে নিশ্চিত করলেন পরাপ্রকৃতি, আর পুনরায় ভারত তথা ভারতবাসীকে আর্যদের ব্যবিচার, মিথ্যাচার ও লুণ্ঠন স্মরণ করিয়ে দিলেন।
কিন্তু খেলা দেখো নিয়তির। ঠিক সেই সময়েই বঙ্গমাতা মানবদেহ ধারণ করে শয়তানের মহাবতারের বিস্তারকে সফল হওয়া থেকে রোধ করলেন। পুত্রী, একটু অন্য বিষয়েও চোখ রাখো। লোকতন্ত্রতে কি হয়? লোকতন্ত্রতে যিনি শাসকের আসনে স্থিত হন, তাঁর সর্বক্ষণ চিন্তা থাকে, সেই আসন ধরে রাখার। আর তাই যদি লোকহিত করার ইচ্ছাও থাকে তাঁর, তাও তিনি তা করতে পারেন না। তাই লোকতন্ত্রে জনদরদি নেতা এলেও, জনহিতকর শাসক লাভ করা সম্পূর্ণ ভাবে অসম্ভব। অপর দিকে রাজতন্ত্রে, শাসকের নিজের আসন হারাবার কনো চিন্তা থাকেনা।
এই নিশ্চিন্ততার কারণে, প্রায়শই শ্রেষ্ঠ অত্যাচারী শাসকের দেখা রাজতন্ত্রেই মেলে, কিন্তু শ্রেষ্ঠ লোকহিতকর শাসকেরও দেখা সেখানেই মেলে। যেই শাসকের মধ্যে লোকহিতের ভাবনা এসে যায়, তিনিও নিজের আসন হারাবার চিন্তা থেকে মুক্ত থাকার কারণে, মুক্তহস্তে লোকহিত করতে সক্ষম হন। তাই রাজতন্ত্র অবশ্যই লোকতন্ত্র অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।
কিন্তু লোকতন্ত্রে একটি বাধ্যবাধকতাও আছে যে, শাসক যতই অত্যাচারী হোকনা কেন সেখানে, সংবিধানের ঊর্ধ্বে তিনি যেতে পারেন না, আর যদি যান, তাহলে দেশের মানুষের হাতে থাকে, তাঁকে তাঁর আসন থেকে টেনে নিচে নামাবার। তাই লোকতন্ত্রকে রাজতন্ত্রদ্বারা যদি প্রতিস্থাপন করতেই হয়, তাহলে একটি নির্দিষ্ট শাসক স্মৃতি বা সংবিধানকে সম্মুখে রেখেই সেই রাজতন্ত্র স্থাপিত হওয়া উচিত, তবেই লোকহিত যথাযথ হতে পারবে।
কিন্তু ভারতের মানুষদের দেখো। আকস্মিক শয়তানের মহাবতারের উত্থানের কারণে, লোকতন্ত্র আজ প্রশ্নচিহ্নের সম্মুখে। কিন্তু সেই কাজে উদগ্রীব হলেও, বঙ্গমাতার মনুষ্যরূপী অবতারের কারণে, শয়তানের মহাবতার সেই কর্ম করতে সক্ষম হলেন না। কিন্তু তাও লোকতন্ত্র জিজ্ঞাসাচিহ্নের নিরিখেই রইল, আর তোমার অবতরণ হলো।
এবার লোকতন্ত্র প্রতিস্থাপিতও হবে, কিন্তু তা মনুস্মৃতিকে সংবিধান মেনে, আর্যশাসন রূপে হবেনা, তা হবে শাসকস্মৃতিকে সংবিধান করে, সত্যের শাসন, স্বয়ং নিয়তির শাসন, স্বয়ং জগন্মাতার প্রেমময় শাসন। অর্থাৎ দেখলে পুত্রী, কি ভাবে সকলের দৃষ্টির অগোচরে, জগন্মাতা পরানিয়তি একের পর এক অবতারকে সাজিয়ে সাজিয়ে, এবং শয়তানদের কর্তাভাবকেও কাজে লাগিয়ে, সত্যশাসনের ও সত্যযুগের বিস্তারগাঁথার নির্মাণ করলেন।
এই সম্যক নিয়তিকৃত্যকে দর্শন করাই হলো দর্শন। আর তা দর্শন করার জন্য কি প্রয়োজন? পিপলাদের উপনিষদের মতধারা অনুসারে পিয়াজের খোলা ছাড়ানোর প্রয়োজন। পুত্রী, ব্রহ্মাণ্ড সম্পূর্ণ ভাবে ভ্রমের রাজত্ব। তাই এখানে অসত্যের রাজত্ব থাকবে, তাই স্বাভাবিক। কিন্তু সত্যের সাথে ‘অ’ যুক্ত হলে, তবেই সত্য অসত্য হয়, তাই যতই অসত্যের রাজত্ব থাকুক না কেন, সত্যের ব্যাপ্তিকে রোধ করা অসম্ভব।
আর তাই সমস্ত অসত্যের খোল ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে, সত্যকে ধারণ করাই হলো দর্শন। ইন্দ্রিয়দ্বারা যা কিছু তুমি দেখবে, শুনবে, ঘ্রাণ নেবে, স্বাদ নেবে বা অনুভব করবে, তার মধ্যে কিছু ভেদক থাকবে, আর সামান্য কিছু ধ্রুবক থাকবে। প্রথমে সেই ধ্রুবকের থেকে ভেদককে পৃথক করে নিয়ে, ভেদককে পরিত্যাগ করে, ধ্রুবককে গ্রহণ করতে হয়।
অতঃপরে, সেই ধ্রুবকসমূহের মধ্যে অতিধ্রুবককে ধারণ করতে হয়, এবং অন্য সমস্ত কিছুকে পরিত্যাগ করতে হয়। অতঃপরে, সেই অতিধ্রুবকের মধ্যে নিমগ্ন হতে হয়, তবেই সত্যরূপ মহারত্নকে ধারণ করা যায়। পুত্রী, সমস্ত জগতের সকলের হাত থেকে কিছু না কিছু মুল্যবান রত্ন ভূমিতে পরে যাচ্ছে। সেই সমস্ত রত্নকে নর্দমার জল নদীতে মেশাচ্ছে, সেই নদী সমস্ত কিছুকে সাগরে নিয়ে যাচ্ছে।
তাই সাগরের তলদেশে অজস্র ধনরত্ন উপস্থিত, আর তাই যতক্ষণ না সাগরের তলে পৌছবে, ততক্ষণ দরিদ্রই থেকে যাবে। তা সেই সাগরে ডুব দিয়েই সেই তলে পৌছাও, বা আগস্তের মত সাগরের সমস্ত জলকে শোষণ করে নিয়ে সেই তলে পৌছাও, পৌছাতে সেখানেই হবে”।
দিব্যশ্রী ব্রহ্মসনাতনের কথাকে বাঁধা দিয়ে বললেন, “মা, আমাকে ধ্রুবকের থেকে ভেদককে ভেদ করার, আর ধ্রুবকের থেকে অতিধ্রুবককে উদ্ধার করার শিক্ষা প্রদান করুন। … আমি এই নিরন্তর পদ্ধতিকে ধারণা করতে পাচ্ছিনা”।
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, মন দিয়ে আমি এবার যেই বিচার স্থাপন করছি, তা শ্রবণ করো। এই বিচারধারাই তোমাকে অতিধ্রুবককে চিহ্নিত করার মার্গ শিখিয়ে দেবে। … দেহ একটি ভেদক। কেন তা ভেদক? কারণ প্রতিনিয়ত তার পরিবর্তন হয়, এবং একসময়ে সেই দেহের নাশও হয়ে যায়। এই দেহের মধ্যে ধ্রুবক কি কি? এঁর মধ্যে ধ্রুবক হলো প্রাণ, এবং একমাত্র প্রাণ। কেন প্রাণ? কারণ অন্য সমস্ত কিছু অর্থাৎ বুদ্ধি পরিবর্তনশীল, উর্জ্জা পরিবর্তনশীল, এবং এই পরিবর্তনশীল উর্জ্জা এবং বুদ্ধির কারণে, মনও পরিবর্তনশীল। কিন্তু প্রাণও তো একসময়ে দেহত্যাগ করে চলে যায়। তখন কি থেকে যায়? কেবলই বুদ্ধি, প্রাণ, উর্জ্জা এবং দেহ ছাড়া অর্থাৎ চারভূত বহির্ভূত একটি ভূত, অর্থাৎ মন বা আকাশ।
তাহলে আকাশই হলো এঁদের সকলের মধ্যে ধ্রুবক। এবার এই আকাশের বিচার করো। এই আকাশের মধ্যে কি কি অবস্থান করছে? এই চার ভূত বা ভেদক বহির্ভূত আকাশের মধ্যে বিরাজ করছে ত্রিগুণ অর্থাৎ আত্মবোধ, বা অহম, আর? আর অবস্থান করছে সেই চেতনা যা এই সমস্ত কিছুকে অবলোকন করাচ্ছে, এবং আমাকে বিচার করাচ্ছে।
অর্থাৎ সকল কিছুর মধ্যে অতিধ্রুবক কে? চেতনা। কেন? কারণ একসময়ে এই মনও আত্মে বিলীন হয়ে যায়, আর মোক্ষের কালে এই অহমবোধ বা আত্মও ব্রহ্মে বিলীন হয়ে যায়। তখন থেকে কি যায়? একমাত্র চেতনা। অর্থাৎ চেতনাই হলো সেই মহাধ্রুবক। এবার এই মহাধ্রুবকরূপ সাগরের তলদেশে যাত্রা করো।
ব্রহ্মে আত্ম বিলীন হয়ে যায়, তো ব্রহ্ম কি? ব্রহ্ম মানে সর্বস্ব কিছুর আদি, সর্বস্ব কিছুর সার, সর্বস্ব কিছুর স্বরূপ। অর্থাৎ ব্রহ্ম একমঅস্তিত্ব, অর্থাৎ তাঁর ব্যতীত কারুর কনো অস্তিত্ব সম্ভবই নয়। অর্থাৎ চেতনা, যা সমস্ত কিছুর শেষেও অবশিষ্ট থাকে, যা সমাধির কালেও অবশিষ্ট থাকে যখন ব্রহ্ম ব্যতীত কিছুই অবশিষ্ট থাকেনা, তা তাহলে কি? স্বয়ং ব্রহ্ম।
অর্থাৎ স্বয়ং ব্রহ্মই আমাদের অন্তরে চেতনার বেশে বিরাজমান, আর সেই চেতনাই আমাদেরকে সময়কে অনুধাবন করতে শেখায়, প্রকৃতির থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে শেখায়। ধ্যানের কালে, যখন স্থূলের বোধ চলে যায়, তখন প্রকৃতির বোধও চলে যায়, অর্থাৎ প্রকৃতি হলো চেতনারই অর্থাৎ ব্রহ্মেরই স্থূল প্রকাশ; সমাধির কালে সময়ের ভান চলে যায় অর্থাৎ সময় হলো চেতনা অর্থাৎ ব্রহ্মের সূক্ষ্ম প্রকাশ। আর মোক্ষকালে? মোক্ষকালে অর্থাৎ নির্বিকল্প সমাধির কালে, চেতনার ভানও চলে যায়। অর্থাৎ চেতনা কি? সাখ্যাত নিয়তি, অর্থাৎ কারণ বেশে আমাদের সাথে ব্রহ্ম অর্থাৎ সত্য সদা বিরাজ করেন, চেতনা বা নিয়তির বেশে।
এবার উপলব্ধি করতে পারলে পুত্রী, বিচার বা গহন বিচার কি? কিন্তু পুত্রী, তোমাকে আরো এক সত্য বলি এখানে। … এই বিচার করা প্রথমদিকে সহজ লাগলেও, শেষের দিকে তা মটেও সহজ হয়না। … কেন?
পুত্রী, পিয়াজের প্রথম দিকের খোলা হয় লাল। সহজেই তাকে পৃথক করা যায়। পরের দিকের স্তর হয় গোলাপি, তাকেও সহজ ভাবেই পৃথক করা যায়। কিন্তু অন্তের দিকে খোলা হয়ে যায় সাদা, অর্থাৎ সমস্ত রঙের এমত্রিত রূপ। তখন আর এই পৃথকীকরণ তেমন সহজ হয়না। তখন প্রয়োজন পরে, অত্যন্ত গভীর একাগ্রতার।
আর এই সম্পূর্ণ বিচারের কালে প্রয়োজন পরে, অন্তিম পর্যন্ত পৌঁছানর জেদ, সমস্ত বিচারকালকে একাগ্র হয়ে অবলোকন করার জন্য ধৈর্য, আর এই দুঃসাহসিক কর্ম করার জন্য সাহস। সঙ্গে বিদ্যা আর কৌশল থাকলে অতি উত্তম। আর খেয়াল করে দেখো, বেদব্যাস নিজের সৎগুণ রূপে কাদেরকে বলেছেন? যুধিষ্ঠির অর্থাৎ ধৈর্য, ভীম অর্থাৎ জেদ, অর্জুন অর্থাৎ সাহস, নকুল অর্থাৎ বিদ্যা এবং সহদেব অর্থাৎ কৌশল।
বুঝতে পারছ এবার কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন কি অভূতপূর্ব ভাবে নিজের অন্তরে সত্য ও অসত্যের লড়াইকে কি একাগ্রতার সাথে অবলোকন করেছিলেন, দর্শন করেছিলেন? পুত্রী, এই অন্তরে চলা সমূহ ঘটনাকে অবলোকন করে এসে, সেই দর্শন করা সমূহ কিছুকে ব্যক্ত যেই গ্রন্থ করে, তাকেই দর্শন বলে। যুক্তিতর্কের কচকচানিপূর্ণ গ্রন্থকে তত্ত্বকথার গ্রন্থ বলে, বা ইংরাজিতে বলে ফিলজফি, কিন্তু ফিলজফি মানে কখনোই দর্শন নয়, তা হলো তত্ত্বকথা। দর্শন তাই, যা অন্তরে দর্শন করে এসে দর্শক ব্যক্ত করেন।
আর তার কারণে প্রয়োজন একাগ্রচিত্ততা। তাই মনঃসংযোগ অভ্যাস করা অত্যন্ত আবশ্যক। এবার আমি তোমাকে সেই মনঃসংযোগ প্রক্রিয়া সম্বন্ধে বলছি, শ্রবণ করো। … তবে তারই সাথে আরো একটি কথাও বলবো, আর তা হলো কল্পনা। যেমন একাগ্রচিত্ত হতে হয়, তেমন কল্পনাকেও অপসারিত করতে হয়।
শোনো তাহলে, এই কল্পনার সম্মুখীন কেমনভাবে আমরা দৈনন্দিন জীবনে হই, আর সঙ্গে সঙ্গে এও শোনো এই কল্পনা আমাদের সত্যের পথে অগ্রগতিকে কি ভাবে প্রভাবিত করে। পুত্রী, কল্পনা এক অদ্ভুত প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ব্যক্তি বাস্তব যাই হোক, বাস্তবতা যাই হোক, প্রকাশিত যাই হোক, সেই ব্যক্তি নিজের কল্পনাকেই সত্য জ্ঞান করে থাকে।
ব্রহ্মের কনো আবেগ নেই, নিয়তি সকলের জননী, আর সকলকে স্নেহ করেন, এবং সকলকে আহ্বান করেন সত্যে প্রত্যাবর্তনের জন্য। কিন্তু যদি আবেগ থাকতো ব্রহ্ম ও নিয়তির, তবে অবশ্যই এমন বলতেন তাঁরা যে, এই কল্পনাই হলো সেই শয়তান, যার কারণে ব্রহ্মাণ্ডের রচনা হয়েছে, কারণ এই কল্পনার কারণেই, যেই ব্রহ্মের কনো ভেদ হয়না, কনো অণু সম্ভবই না, সেই অণুরূপে নিজেদেরকে কল্পনা করে, স্বয়ম্ভু হয়েছে, আর তাঁর এই কল্পনার বিস্তারের কারণেই এই ব্রহ্মাণ্ড, আর সেই কাল্পনিক ব্রহ্মাণ্ডের কারণেই সত্যের সাথে ‘অ’ যুক্ত হয়ে অসত্যের সূচনা হয়েছে।
হ্যাঁ পুত্রী, এই হলো কল্পনার প্রকৃত স্বরূপ। এই কল্পনাই সেই শয়তান, যার দ্বারা সমস্ত ব্রহ্মাণু প্রভাবিত, সকল আত্ম এবং পরামাত্ম প্রভাবিত, এবং এঁর কারণেই কেউ এই ব্রহ্মাণ্ডে ভগবান, তো কেউ শয়তান। এঁর কারণেই কেউ বিত্তবান, তো কেউ দরিদ্র; কেউ সাদা তো কেউ কালো, কেউ পুরুষ, তো কেউ স্ত্রী, বা এক কথায় বলতে গেলে, এই কল্পনার কারণেই সমস্ত ভেদাভেদ, সমস্ত ভেদভাব, আর সমস্ত কলুষতা।
কিন্তু এই সমস্ত তো কল্পনার বৃহত্তর ক্ষেত্রে কুকীর্তি। এঁর সামান্য জীবনে প্রভাব কেমন জানো? তোমাকে আমি তিরস্কার করলাম, তোমার ব্যঙ্গ করলাম। আর তুমি কল্পনা করে রেখেছ, তাই তুমি আমার তিরস্কার এবং ব্যঙ্গকে মনে করলে তোমার সম্মান গগনচুম্বী হলো। আরো সহজ ভাবে দেখো একে, তো আরো ভয়ঙ্কর রূপ দেখতে পাবে এঁর।
তুমি কিছু কল্পনা করে রেখেছ যে আমি তোমাকে কিছু একটা নির্দিষ্ট কথা বলবো। আমি তোমাকে কিছু কথা বললাম, কিন্তু সেই কথা তোমার কল্পনার সাথে মিলল না। এবার তোমার কল্পনা তোমাকে কি করাবে জানো? তোমাকে প্রথমে এই ধারণাই প্রদান করবে যে, তোমার কল্পিত শব্দই আমি তোমাকে বলছি। কিন্তু যখন আমি সমানে বলে চলছি, তখন তোমার টনক নড়ল।
আসলে কল্পনা কখনোই বৃহৎ হয়না, কালব্যাপী হয়না। অত্যন্ত স্বল্প সময়ের হয় এই কল্পনা, এবং রক্তবীজের মতন ধারা হয় তাঁর। একটি কল্পনার থেকে অজস্র কল্পনার বিস্তার হয়, আর তাই অজস্র অগুনতি কল্পনার জেরে, এক সম্পূর্ণ অসত্য ব্রহ্মাণ্ডের কল্পনা সম্ভব হয়। তাই তোমার কল্পনা তো ছিল আমি সামান্য সময়ব্যাপীই কিছু বলবো তোমাকে। কিন্তু যখন আমার কথনের কাল তোমার কল্পনার কালের সীমাকে অতিক্রম করে অগ্রসর হয়, তখন তোমার টনক নড়ে আর মনে হয় যে, আমার কল্পিত শব্দাবলী তো বলছেন না উনি!
অর্থাৎ, আমার তোমাকে যা বলার ছিল, তার অর্ধেকের অধিক কথা বলা হয়ে গেছে, তখন তোমার স্মরণ হওয়া শুরু হলো যে, আমি তোমার কল্পিত কথা বলছিনা। অর্থাৎ আমার বলা অর্ধেক কথা তুমি শুনতেই পাওনি, তা তোমার স্মৃতিপটে প্রবেশই করলো না। … এই হলো কল্পনার সব চাইতে সাধারণ প্রভাব, যা আমাদের চরম অন্ধবিশ্বাস প্রদান করে।
ধর একজন রাজনেতা আমাদের জীবনধারাকে সম্পূর্ণ ভাবে বিনষ্ট করে দিয়েছে। কিন্তু সেই রাজনেতা কনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মসম্প্রদায়কে প্রতিনিধিত্ব করছেন, এমন ধারণা প্রদান করিইয়েছেন আমাদেরকে। তখন আমরা কি করি? সেই রাজনেতা আমাদেরকে কৃতদাস করে তুললেও, আমাদেরকে সম্পূর্ণ ভাবে শোষণ করে নিলেও, আমরা দেখতে পাইনা, আমরা অন্ধবিশ্বাসী হয়ে থেকে যাই।
এমন কেন? কারণ আমরা যে ধর্মসম্প্রদায়ের প্রতিনিধি বলে তাকে মেনে নিয়েছি। আর তাই অজস্র এমন কিছু কল্পনা করে নিয়েছি তাঁর সম্বন্ধে, যা তিনি আদপে করছেনই না। আর এমন হবার ফলে, আমরা তাঁর সমস্ত কথাকে একপ্রপকার ঈশ্বরবাক্য রূপে গ্রহণ করতে থাকি, যা আমরা স্বয়ং ঈশ্বরের ক্ষেত্রেও করিনা।
এই হলো কল্পনার প্রভাব পুত্রী, আর যদি এই প্রভাব কারুর উপর বিস্তারিত থাকে, তবে তাঁর পক্ষে সত্যজ্ঞান লাভ করা অসম্ভব, কারণ তাঁর ভাবধারাই হলো অসত্যপ্রেম, সত্য কি তাঁর জানার আবশ্যকতাই তিনি মনে করেন না, নিজের কল্পনাকেই তিনি সত্য জ্ঞান করেন। তিনি ধ্যানে বসবেন, আর ধ্যানে একটি রূপকে কল্পনা করবেন, আর এসে বলবেন, তাঁর ঈশ্বরদর্শন হয়ে গেছে।
তিনি জ্ঞানসভায় উপস্থিত থেকে তোমার দিকে তাকিয়ে থাকবেন, আর কল্পনা করে নেবেন যে তাঁর সমস্ত জ্ঞান আহরিত হয়ে গেছে। তিনি কল্পনা করে নেবেন যে কনো অবতার আসবে, তাঁকে বগলদাবা করবে, আর উদ্ধার করে নিয়ে চলে যাবে। তিনি কল্পনা করে নেবেন যে, অবতার মানে এক বিশেষ ভৌতিক ক্ষমতাসম্পন্ন জীব, যিনি চমৎকার করে ফেরেন, জীবিতকে মৃত করে দেন, মৃতকে জীবিত করে দেন।
পুত্রী, এইরূপ অন্ধবিশ্বাস কখনোই কারুকে সত্যলাভ করতে দেয় না। যেই ব্যক্তি কল্পনাপ্রবণ হন, তিনি সর্বক্ষণ পরগাছা হয়ে থাকেন যে কেউ তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবেন; তিনি যদি পরগাছার ভাব থেকে উন্নত হন, তবে পূর্ণ ভাবে যান্ত্রিক হয়ে ওঠেন; আবার তিনি যদি যান্ত্রিকতাকে ত্যাগ করেন, তবে পোশাকআশাক তিলককাঞ্চন ধারণ করে ভণ্ড হয়ে চমৎকার দেখাতে থাকেন। …
আর এই সমস্ত ভাবযুক্ত অর্থাৎ কল্পনার দ্বারা গ্রসিত ব্যক্তি আর যাই হোক, সত্যলাভ করার উপযুক্তই নন। জীব জীবরূপে অবস্থান এই কারণেই করছেন কারণ তাঁরা সত্য সম্বন্ধে ভ্রমিত। যেই মুহূর্তে সত্যের ভান হয়ে যায় জীবের, সেই মুহূর্তে জীবের সহজাত ভাবে ধ্যান হয়, মহাশূন্যের সাথে পরিচয় হয়, দর্শন হয়, ভাব হয়। কিন্তু সেই সমস্ত কিছু না হওয়া সত্ত্বেও, যখন জীব কল্পনা করতে থাকেন যে, তিনি সত্য জানেন, তখন তাঁর পক্ষে সত্যলাভ অসম্ভব হয়ে যায়।
সত্যলাভ করার জন্য যেমন তোমাকে বললাম যে পেয়াজের খোল ছাড়াতে হয়, যার বাইরের দিকের খোল কেবল বিচারদ্বারাই ছাড়ানো সম্ভব, কিন্তু অন্তর্বর্তী খোল ছাড়াতে প্রয়োজন অসম্ভব একাগ্রচিত্ততা, তেমনই এই কর্মের শ্রেষ্ঠ বাঁধা হলো, কল্পনা। কল্পনা মানেই পূর্ব থেকেই কিছু ধারণাকে স্থাপিত রেখে দেওয়া অন্তরে। আর সেই পূর্বধারণাই তাঁকে নবধারণা, সত্যধারণাকে ধারণ করতেই দেয়না।
তাই পুত্রী, যেমন বিচারের প্রয়োজন, তেমনই একাগ্রচিত্ততার প্রয়োজন, আর তেমনই কল্পনামুক্ত হয়ে পূর্ণরূপে সাদা খাতা আবশ্যক সত্যলাভের জন্য। পূর্ণরূপে সাদা খাতার অর্থ এই যে, আমার খাতায় কিচ্ছু বলতে কিচ্ছু লেখা নেই। যা এই খাতায় লেখা হবে, তাই আমি জানতে থাকবো। …
পুত্রী, এই প্রথম ও তৃতীয়কর্মকে করতে হয় জীবকে স্বয়ং, বিনা কনো সাহায্য নিয়ে। এই কর্মে কেউ তাঁকে কনো সাহায্য করতে পারেনা। বিচার করতে কেমন করে হয়, তা দেখিয়ে দিতে পারে তোমাকে, যেমন তোমাকে কিছুক্ষণ পূর্বেই দেখালাম। সম্পূর্ণ সাদা খাতা হতে হয়, এমন বোঝানো সম্ভব, যেমন তোমাকে এক্ষণে বোঝালাম। কিন্তু করতে তোমাকেই হয়, কারণ তুমি নিজেই সেই ব্রহ্ম, আর তুমি নিজেই নিজের স্বরূপকে ঢেকে ও ভুলে বসে আছো। আর ব্রহ্ম অর্থ বোঝো তো! সে-ই সত্য। পুত্রী, অসত্যকে সত্য প্রদান করা যায়, কিন্তু সত্যকে সত্য প্রদান করা যায় না।
সত্য স্বয়ংকেই সত্য প্রদান করতে পারেন। তাই তোমাকে স্বয়ংকেই এই প্রথম ও তৃতীয় পর্যায় থেকে উন্নত হতে হবে। এবার আমি তোমাকে একাগ্রচিত্ত হবার ধারণা প্রদান করবো।
পুত্রী, একাগ্রচিত্ততা কেন আবশ্যক তা তো জানলে, এবার দেখো একাগ্রচিত্ত হতে কি করে হয়। মনের থেকে বাকি সমস্ত ভূতকে অপসারিত করাই হলো একাগ্রচিত্ততা, কারণ বাকি সমস্ত ভূত মনের স্থিরতাকে বিনষ্ট করে, আর মন হলো সেই আকাশ, যা স্থির হলে, তবেই দূরের নক্ষত্র দর্শন হয়। তাই মনের উপর থেকে অন্য সমস্ত ভূতের প্রভাবকে অপসারিত করতে হয়।
এবার এই বিজ্ঞানকে ভালো করে প্রত্যক্ষ করো। ইন্দ্রিয়দের যদি ভাবো যে কেবলই বহির্মুখী তারা, তবে তা হবে শ্রেষ্ঠ ভ্রান্তি। চোখ ইন্দ্রিয় নয়, দৃষ্টি নামক ইন্দ্রিয়ের বাহ্যজগত থেকে তথ্য সঞ্চয়ের যন্ত্র হলো চোখ। তেমনই, নাক ঘ্রাণের বাহ্য তথ্য সংগ্রহের যন্ত্র, ত্বক অনুভবের বাহ্য তথ্য সংগ্রহের যন্ত্র, কান বাহ্য শব্দ শ্রবণের যন্ত্র, তেমনই জিহ্বা বাহ্য স্বাদ গ্রহণের যন্ত্র।
অন্ধের মত কথাকে বিশ্বাসের কনো প্রয়োজন নেই পুত্রী। স্বয়ং বিচার করো। অন্তরে অম্ল হলে, কি করে অনুভব করো তা, জিহ্বা দিয়ে? অন্তরে অর্থাৎ উদরে বা অন্যত্র পীড়া হলে, তা কি দিয়ে অনুভব করো? ত্বক দিয়ে? সম্মুখের ব্যক্তিটি তোমার সম্বন্ধে কিছু মন্দ বিচার করছেন, কি দিয়ে তা দর্শন করো? নেত্র দিয়ে? … নয় তো? কিন্তু দেখো, এই সমস্ত তুমি দেখতে পাও, শুনতে পাও, স্বাদ পাও, অনুভব পাও, ঘ্রাণ পাও।
অর্থাৎ যদি এমন ভেবে থাকো যে কেবল বাহ্য বস্তুতের অনুভবের জন্যই ইন্দ্রিয়রা রয়েছে, তাহলে তা এক ভ্রমের বিস্তার মাত্র। বাস্তব এই যে, ইন্দ্রিয়রা আমাদের চার ভূতের সাথে অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্ত থাকে সর্বক্ষণ। দেহের যা কিছু হচ্ছে, উর্জ্জার অর্থাৎ আহার নিদ্রা ও মৈথুনের যা কিছু হচ্ছে, প্রাণের অর্থাৎ শ্বাসের বৃদ্ধি বা কষ্ট বা যা কিছু হচ্ছে, এই সমস্ত কিছুকে ইন্দ্রিয়রা সর্বক্ষণ পাঠ করছে, তথ্য সংগ্রহ করছে। আর তা করে কি করছে? তা সংগ্রহ করে, এই সমস্ত কিছু বুদ্ধির সম্মুখে স্থাপিত করছে।
আর বুদ্ধি সেই সমস্ত কিছুর বিচার করে, যেই যেই তথ্যকে প্রয়োজনীয়, সেইগুলোকে নিজের সাথে নিয়ে উপস্থিত হচ্ছে মনের সকাশে, আর সেই সমস্ত ক্ষেত্রে মনকে কনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে অনুরোধ করছে। অর্থাৎ দেখো, মন সর্বক্ষণ এই বুদ্ধির দ্বারা, এবং বুদ্ধি সর্বদা অন্য তিন ভূতের দ্বারা, এবং সেই তিন ভূত ইন্দ্রিয়দ্বারা সর্বদা গ্রসিত। আর এঁর ফলে, আমাদের মন কখনোই নিঝঞ্ঝাট নয়, স্থির নয়, আর তাই আমরাও দূরদর্শী নই।
আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে, সমস্ত গতি পথ একমুখী হয়ে রয়েছে, আর তা হলো বাইরে থেকে ভিতরে, অর্থাৎ ইন্দ্রিয় থেকে তিন ভূতে, তিন ভূত থেকে বুদ্ধিতে, এবং বুদ্ধি থেকে মনে। কিন্তু মনের থেকে বাইরে কিছুই আসছে না, বা বলতে পারো আসার সুযোগ পাচ্ছেনা। এবার প্রশ্ন এই যে, মনের থেকে বাইরে কি আসতে পারে?
মন হলো আকাশ, যা কিছুই নয়, এক মাধ্যম মাত্র, বা বলতে পারো এক রাজপথ। এই রাজপথের একদিকে রয়েছে রাজমহল, আর অন্যদিকে রয়েছে শহর। আর সেই পথে কেবলই শহর থেকে রাজপ্রাসাদে যাত্রা হচ্ছে। সেখান থেকে কেউ ফিরছেও না, অর্থাৎ রাজমহলেই সমস্ত শহরবাসী অবস্থান করতে শুরু করছে। এবার পরিস্থিতি কেমন হবে, বিচার করে দেখো।
অন্যদিকে, রাজমহল থেকে যদি কিছু আসতো, তাহলে কি আসতো? রাজমহলে নিবাস করেন আত্ম, যিনি বহু জন্মজন্মান্তরের সাক্ষী। তাঁর অভিজ্ঞতা আসতো, তাই না? রাজমহলের অন্তরে নিবাস স্বয়ং পরাচেতনার, যিনি স্বয়ং সত্য। তাঁর থেকে সত্যজ্ঞান ও সত্যভাবের বিকাশ হতো, তাই না? কিন্তু দেখো, সেই সমস্ত কিছুই আসছে না।
আর তার ফলে কি হচ্ছে? ফলে এই হচ্ছে যে, রাজমহলের জনসংখ্যা বাড়তে বাড়তে, রাজ্যশাসন প্রায় স্তব্ধই হয়ে আসছে। আর এই স্তব্ধ হয়ে যাওয়াকে বলে অহমের বৃদ্ধি। পুত্রী, যদি রাজমহল থেকেও শহরে যাত্রা চলতে থাকে, আর যদি শহর থেকেও রাজমহলে যাত্রা চলতে থাকে, তবে এক ভারসম্যের নির্মাণ হয়।
অর্থাৎ যদি বাইরের জগত থেকেই কেবল অন্তরে সমস্ত তথ্য প্রবেশ করে, আর অন্তর থেকে কিছুই বাইরে না আসতে পারে, তবে অন্তর ভারি হতে শুরু করে, আর এই ভার আমিত্বের বিস্তার করে, অর্থাৎ অহমের বৃদ্ধি হয়। অন্য দিকে, যখন অন্তর থেকেও বাইরে কিছু আসতে শুরু করে, তাহলে তাতে থাকে আত্মের পূর্বজন্মের অভিজ্ঞতা, চেতনার সত্যশিক্ষা। আর তারফলে, মন আর তখন অহেতুক তথ্য গ্রহণ করা বন্ধ করে দেয়।
যেই সমস্ত বাহ্য তথ্য সত্যের সাথে সংযুক্ত হয়, তাকেই গ্রহণ করে সে, আর অন্য সমূহ কিছুকে বর্জন করে, বুদ্ধির অহেতুক লম্ফঝম্প, অন্য তিনভূতের চাঞ্চল্য, এবং ইন্দ্রিয়দের দৌরাত্ম, সমস্ত কিছুকে হ্রাসদান করে। আর এর ফলে কি হয়? সত্যভাব ও সত্যজ্ঞানের প্রকাশে প্রকাশিত হয় সকল ভূত, সকল ইন্দ্রিয়, এবং তাঁরা সকলেই তখন সত্যঅভিমুখী হয়ে গিয়ে, সমস্ত বাহ্যজগতকেও সত্যের আতশকাঁচ দ্বারা দেখতে শুরু করে, এবং সর্বক্ষণ সর্বকিছুর থেকে শিক্ষা গ্রহণের অভিলাষী হয়ে উঠে বিনয়ী হয়ে ওঠে।
শিক্ষাগ্রহণের জন্য অভিলাষী ভাবই বিনয়, আর বিনয় হলো বিবেকের ভাব। অর্থাৎ এই বিনয় যখন অভ্যাস করে নয়, শিক্ষাগ্রহণের অভিলাষ থেকে জাত হয়, তখনই বিবেকের জন্ম হয়। পুত্রী, অনেককেই দেখবে বিনয় ও বিনম্রতাকে একাকার করে ফেলেন। পুত্রী, বিনয় হলো শিক্ষাগ্রহণের জন্য তৎপরতার ভাব, আর সেই ভাবের কারণে সময়ে সময়ে যেমন বিনম্রতাও আসে, তেমন সময়ে সময়ে উগ্রতাও স্থান পায়।
কিন্তু অসাধুরা এই সত্য জানেন না, আর তাই তাঁদেরকে দেখবে বিনম্রতার ভেক ধারণ করে অবস্থান করেন। তিরস্কারের কথা বললেও, তা তিরস্কারের ন্যায় শুনতে লাগে না, আর তাই আমরা ভ্রমিত হয়ে যাই যে, ইনি কত বিনম্র, ইনি নিশ্চয়ই বিবেকবাণ। পুত্রী, যেই দেশের এখনো ৩০ শতাংশ আর্যমানসিকতা ধারণ করে রাখেন, সেখানে এই সমস্ত ছলনা হতে থাকবে, তিলকাদি বা পোশাকআশাক ধারণ করে, বা বিভিন্ন প্রকার মালা ধারণ করে পাখন্ডদের উৎপাত লেগে থাকবে, তা অতি স্বাভাবিক।
তাই এই সমূহ জ্ঞানকে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে ধারণ করা অত্যন্ত আবশ্যক, নাহলে কখন তোমাকে কোন ভণ্ড ছলে চলে যাবে, তা টেরও পাবে না। টের না পেলেও কনো ক্ষতি নেই, কিন্তু এঁদের বিষাক্ত ভণ্ডামি প্রায়শই আমাদের প্রকৃত সাধনার নাশ করে দেয়, এবং কিছু আচার অনুষ্ঠানে আমাদেরকে আবদ্ধ করিয়ে দিয়ে, আমাদেরকেও পাখন্ড করে দেয়, তার টেরও পাবেনা, আর সেটি বিপজ্জনক। কারণ এই পাখন্ড ভাব, একজন্মে যাবার বিশয় নয়, জন্মজন্মান্তর ধরে এই সমস্ত পাখন্ড ভাব থেকে যায়।
যদি বলো, কেন থেকে যায়, তবে এঁর উত্তর এই যে, আমরা সত্যের সন্ধান না পেয়ে, প্রায়শই এই ভেবে থাকি যে সত্যলাভ নিশ্চয়ই ভীষণ কঠিন, আর সেই মানসিকতা থেকে আমরা সর্বদা ছোটপথ খুঁজতে থাকি, যেমন নাম জপলেই উদ্ধার, বৈকুণ্ঠে গেলেই মোক্ষ, দুইবার নাম নিয়ে হাত তুলে নৃত্য করলেই উদ্ধার। …
কিন্তু পুত্রী, কেউ মদ্য পান না করেও মাতলামি করতে পারে্। পারেকিনা? তাহলে কি তিনি মাতাল? চৈতন্যদেব মাতাল হয়েছিলেন, হরিনামের মদ্যপান করে উদ্ভ্রান্ত হয়ে নৃত্য করেছিলেন। … কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, হরিনাম নিয়ে নৃত্য করলেই, চৈতন্য দেব হয়ে যাবো আমি। … এই সমস্ত কিছু উদ্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের উদ্ভ্রান্ত ধারণা বা বলা চলে কল্পনা, আর এই সমস্ত কিছু সত্যের পথে যাত্রাকে অতিকায় কঠিন করে দেয়, কারণ সমাজে প্রচুর ধরনের ভ্রান্তি পূর্ব থেকেই ছিল, এঁরা আরো ভ্রান্তির যোগ করে দেন।
সত্যলাভ কঠিন নয়, বিস্তারিত সময়ও লাগেনা তার জন্য। যা প্রয়োজন, তা হলো বিবেকের জাগরণ, আর বিবেকের জাগরণের জন্য প্রয়োজন বিনয় অর্থাৎ নিরন্তর শিক্ষালাভের প্রবণতা, আর তা লাভ করতে প্রয়োজন রাজপথ অর্থাৎ মনকে কেবল একমুখি যাত্রার পথ থেকে উভয়মুখী যাত্রার পথ করে তোলা। আর তা করতেই প্রয়োজন মনসংযোগ।
মনঃসংযোগ আমাদের মন অর্থাৎ রাজপথের থেকে কিছুক্ষণ সময়ের জন্য বাহির থেকে অন্তরের যাত্রাকে স্তব্ধ করে দেয়, আর অন্তর থেকে বাহিরে যাত্রাপথকে সুগম করে দেয়। নিয়মিত কিছু সময়ে এমন বাহ্যমুখি যাত্রা হতে থাকলে, কিছু বছরের মধ্যেই, সত্যের বিকাশ হতে থাকে সমস্ত ভূতের উপর এবং ইন্দ্রিয়দের উপর, আর তখনই জন্ম নিয়ে নেয় বিবেক।
একবার বিবেক জন্ম নিয়ে নিলে, শিক্ষাগ্রহণ আর প্রয়োজন থাকেনা, তখন তা নেশায় পরিণত হয়ে যায়। আর তা একবার হয়ে গেলে, আর কনো চিন্তা নেই। যাত্রার সমাপ্তি হয়না এখানে, কিন্তু সেই যাত্রায় আর তোমাকে বা সাধককে কিছু করতে হয়না। বিবেকই যা করার করতে থাকে। সে-ই শিক্ষা গ্রহণ করে করে, তমগুণকে উত্তপ্ত করে ভৈরব করতে থাকে। আর তমগুণ একবার ভৈরব হয়ে গেলে, ইচ্ছা, চিন্তা, কল্পনাকে বেঁধে নিয়ে চলে যায় চেতনার সম্মুখে, আর তাঁর সম্মুখে সে পতিত হতেই, ভস্ম হয়ে যায়… আর তাঁরা ভস্ম হয়ে গেলেই, ব্রহ্মলাভ হয় জীবের।
প্রথমে নিয়মিত ধ্যানসমাধি হতে থাকে সততই, আর অন্তে নির্বিকল্প সমাধি হয়ে মোক্ষলাভ করে, তাঁকে জীবনমৃত্যুর চক্র থেকে চিরতরে মুক্ত করে দেয়। এই হলো সাধনা। তুমি এবার বলবে, নামজপ, কীর্তনাদির কি কনো ভূমিকা নেই? হ্যাঁ, অবশ্যই এঁদের ভূমিকা আছে। সম্পূর্ণ ভাবে সংসারঅভিমুখী মানুষ, যারা কখনোই একাগ্রচিত্ত নন, যারা নিজেদের ভাবনাকেই বিবেক বলে চালিয়ে দেন, তাঁদেরকে সামান্য আভাস দেওয়া যায় এই সমূহদ্বারা।
তবে সত্য বলতে কি জানো পুত্রী, যার অন্তরে ঈশ্বরীয় ভাব আসেনি, তাঁকে তুমি যতই এই সমস্ত করাও, তার কিছুতেই কিছু হবেনা, কারণ তাঁর মন যে অস্থির। বরং যা হবে, তা হলো এই যে, এই সমস্ত করলেই মুক্তি, এমন প্রচার করে করে, যারা এই সমস্ত কিছুকে পেশা করে নিয়ে, ধনবান হচ্ছেন, তাঁদের প্ররোচনার ফাঁদে পরে, এই মোহসর্বস্ব মানুষরা ভাবতে শুরু করেন যে, আমি তো মুক্ত হয়েই যাবো কারণ আমি কীর্তন করছি, তীর্থ করছি, নাম নিচ্ছি। আর এই ভাবের কারণে এমন অহমবোধের জন্ম হয় তাঁর মধ্যে যে, সে মোক্ষের দিকে অগ্রসর তো হয়ইনা, বরং সহস্র জন্ম পিছিয়ে যায় মোক্ষের থেকে”।
দিব্যশ্রী বললেন, “আচ্ছা, যেহেতু ইন্দ্রিয়রা তিনভূতকে, এবং তিন ভূত বুদ্ধিকে, এবং বুদ্ধি মনকে অর্থাৎ রাজপথকে জবরদখল করে বসে থাকেন, তাই আপনি যেকোনো একটি ইন্দ্রিয়কে আশ্রয় করে, অবস্থান করতে বলেন মনঃসংযোগের ক্ষেত্রে। এতে, বাকি ইন্দ্রিয়রা ভূতদের থেকে সরে যায়, আর একটি ইন্দ্রিয়কে সর্বক্ষণ ভূতরা গ্রহণ করতে থাকলে, একসময়ে এই ইন্দ্রিয়কেও অদেখা করতে শুরু করে তাঁরা।
অদেখা করা মানে, কনো তথ্য নেই, অর্থাৎ বুদ্ধিও মনের কাছে যাচ্ছেনা, অর্থাৎ রাজপথের জবরদখল উঠে যাচ্ছে। আর এমন নিয়মিত হতে থাকলে, আত্মের অভিজ্ঞতা বাইরে আসতে শুরু হয়ে যাবে আমাদের জীবনে। … এতো গেল মনঃসংযোগ। কিন্তু এর সাথে ধ্যানের পার্থক্য কি? ধ্যানের প্রক্রিয়া কি আলাদা কিছু? আর ধ্যানের উদ্দেশ্য কি অন্য কিছু? ধ্যানে কি রাজপথকে খালি করা উদ্দেশ্য নয়?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, মনের উপর জবরদখল অপসারণই মনঃসংযোগের উদ্দেশ্য, অর্থাৎ রাজপথকে খালি করে, রাজমহলের থেকে তথ্য আনায়নকে সুগম করাই মনঃসংযোগের উদ্দেশ্য। কিন্তু এতে যে কেবল আত্মই প্রকাশিত করবে নিজেকে। জন্মজন্ম ধরে, জবরদখল থাকা মনের কারণে, এত এত তথ্য গ্রহণ করে, সে তো অহমিকায় বশীভূত! তাই সে যে একাকীই এবার সমস্ত তথ্য প্রদান করতে শুরু করবে। … চেতনাকে সত্যভাব বা সত্যতথ্য প্রদানের সুযোগই সে দিতে চাইবেনা।
আর সেই সুযোগ প্রদানের জন্য হলো ধ্যান। … এই পদ্ধতিতে, আত্মকে রাজপথ বা মনকে আশ্রয় করে, বাইরে আসতে দিতে হয়, যা সে স্বভাবতই করে থাকে, মনঃসংযোগের পর থেকে। আর একবার সে বাইরে এসে গেলে, রাজপথকে বন্ধ করে, রাজমহলে যাত্রা করতে হয়, চেতনার কাছে। … পুত্রী, যখন আমরা ছোট ছিলাম, তখন আমার দিদা আমাকে গল্প বলতেন, আর মা বলতেন পড়াশুনা হয়ে গেছে?
তাই কি করতাম, পড়াশুনা শেষ করে, মায়ের কাছে পড়া দিয়ে, ছুটি নিয়ে চলে যেতাম দিদার কাছে। এও ঠিক তেমন। আত্মকে বাইরে আসতে দিয়ে, খালি রাজমহলে আমরা আমাদের মায়ের কাছে চলে যাই, পরমসত্যের কাছে চলে যাই। পুরো রাজমহলে তাঁকে তন্যতন্য করে খুঁজি, আর একসময়ে তাঁর দর্শন লাভ করে ধন্য হয়ে যাই”।
দিব্যশ্রী উৎসাহী হয়ে বললেন, “কিন্তু তা করি কি উপায়ে?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, তিনি সত্য। আর সত্য কি? সত্য হলেন মহাশূন্য, সত্য হলেন নিঃশব্দ, সত্য হলেন নিরাকার, সত্য হলেন স্পন্দনহীনতা। কিন্তু যতক্ষণ খোঁজ, ততক্ষণ যে এক উচাটন ভাব অন্তরে থেকেই যাওয়া, তাই না! … ততক্ষণ, কিছু না কিছু কল্পনা করেই চলা, তাই তো? কনো না কনো রূপ, কনো না কনো গন্ধ, কনো না কনো শব্দ, কনো না কনো অনুভব, নিরন্তর খুঁজে চলা, তাই তো?
কিন্তু তিনি যে সমস্ত গন্ধের পার, সমস্ত রূপের পার, সমস্ত শব্দ, ধ্বনি, স্বাদ, অনুভব, সমস্ত কিছুর পারে স্থিতা। তাই সামান্য বলতে সামান্য কল্পনা থাকলেও, তাঁকে কি ভাবে প্রত্যক্ষ করা যেতে পারে? সমস্ত বলতে সমস্ত রূপের বোধ, গুণের বোধ, শব্দের বোধ, সমস্ত বোধ যেখানে সমাপ্ত হয়, সেখানেই তিনি স্থিতা।
তাই পুত্রী, তন্ময় হতে হয়। কিন্তু তন্ময় হবে কি করে? আত্ম যে নিজের অভিজ্ঞতার বিবরণ দেবার জন্য সর্বক্ষণ উঁচিয়ে থাকে! সর্বক্ষণ কিছু না কিছু বলে চলেছে সে। পূর্বে বুদ্ধি বলতে থাকতো, মনঃসংযোগ দ্বারা তাঁকে চুপ করিয়েছ, এখন আত্ম বলতে থাকে। তাই এবার এই আত্মের থেকে মুক্তির সময় আসন্ন। তাঁর থেকে মুক্তি না পেলে, তাঁর সাথে যুক্ত কল্পনা, ইচ্ছা আর চিন্তার থেকেও মুক্তি সম্ভব নয়।
ধ্যান হলো, তাঁর থেকে মুক্তির প্রবন্ধ করা, যেখানে স্থির হয়ে উপস্থিত থাকতে হয়। আত্মের সমস্ত কথাতে নিরুত্তর, নিস্তাপ, নিশ্চুপ, নির্বিকার। যখন এমন হবে, আত্ম যার মূল উপাদানই অহংকার, অর্থাৎ আমিত্বের বোধ, সেই আমিত্ব বিপর্যস্ত ও অবহেলিত হচ্ছে, এই বোধ নিয়ে, আত্ম সরাসরি বুদ্ধির সংসর্গে আসার প্রবণতা দেখাবেই। আর একবার তা দেখিয়ে রাজপথ অর্থাৎ মনকে ধারণ করে সম্মুখে এগিয়ে এলে, নিজের সমস্ত দৃষ্টি রাজপ্রাসাদের দিকে ঘুরিয়ে দাও, আর পূর্ণ ভাবে মন অর্থাৎ রাজপথের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নাও।
জানি কিচ্ছু খুঁজে পাবেনা। তাই বলি কিছু খোঁজার প্রয়াসই করো না, কারণ খোঁজার চেষ্টা করে পরাচেতনার দর্শন লাভ সম্ভবই নয়। পুত্রী, যিনি কনোদিন জাহাজ দেখেননি, তিনি স্টিমার দেখেই জাহাজ জাহাজ বলে লাফান; যিনি কনোদিন ঈগল দেখেন নি, তিনি সামান্য চিল দেখেই ঈগল ঈগল বলে চেঁচান।
আসল কথা হলো এই যে, আমরা তাঁকেই খুঁজে পেতে পারি, যার সম্বন্ধে আমাদের পূর্বধারণা রয়েছে। কিন্তু নির্বিকার, নিরাকার, অনন্ত, অব্যাক্ত, অচিন্ত্য, অসীম কেমন দেখতে, তাঁর কনো ধারণাই নেই আমাদের। তাঁকে খোঁজার প্রয়াস কেমন জানো? একজন মানুষের সাথে দেখা করতে গেছি আমি, খুব জ্ঞানীগুণী মানুষ। ধারণা করে বসে আছি যে, তিনি আসবেন, তাঁর এক বিশেষ পোশাকআশাক হবে, এক বিশেষ ধারার সাজসজ্জা হবে, এক বিশেষ ভঙ্গিতে কথা বলবেন। কিন্তু তাঁর দেখা আর পেলাম না।
ফিরে এসে যিনি আমাকে সেখানে পাঠিয়েছিলেন, তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, ভায়া দেখা তো পেলামই না তাঁর! … সেই ব্যক্তি বলেন, হতেই পারেনা! … আচ্ছা শোনো, ওখানে খুব ভালো একটা চায়ের দোকান আছে, চা খেয়েছ ওখানে?
আমি বললাম, হ্যাঁ, চা তো খেয়েছি্ বেশ ভাল চা খানি। … আমার কথা শুনে হেসে সে বললে, তারপরেও বলছো, তাঁর সাথে তোমার দেখা হয়নি! সেই চায়ের দোকানে যিনি তোমাকে চা দিয়েছেন, তিনিই সে। …
যখন আমরা আমাদের মাকে খুঁজতে যাই, আমাদের অবস্থা ঠিক এইরূপ হয় পুত্রী। তিনি আমাদের সম্মুখে আসেন, চলেও যান। কিন্তু আমরা ভেবে রেখে দিই না যে, তিনি তো কালী হবেন, দুর্গা হবেন, রাজপোষাকে থাকবেন, এলোকেশী হবেন, মাথা ভর্তি সিঁদুর হবে, ত্রিনয়ন হবে। … কিন্তু পুত্রী, তিনি তো নিরাকার, তিনি তো নির্বিশেষ। … কনো রকম বিশেষত্ব থাকেনা তাঁর। সন্তানের সেবায় সর্বক্ষণ দাসীর ন্যায় খেটে চলেন তিনি।
মা যখন রান্না করছেন, তখন তাঁকে যদি আমরা না চিনি মা বলে, তবে আচমকা তাঁকে দেখে মনে হবে যেন তিনি হলেন এক রাঁধুনি পিসি। পরে, মাকে চিনতে না পারার জন্য জিব কাটবো আমরা। … তেমনই তিনি হলেন নির্বিশেষ। কনো প্রকার বিশেষত্ব ধারণ করে উনি থাকেন না। অত্যন্ত সাধারণ, অত্যন্ত সাবলীল, অত্যন্ত সামান্য, কিন্তু যখন তখন তাঁকে লাভ করবে, তখনই জানতে পারবে যে, তাঁর এই সাবলীলতা, এই সাধারনতা, এই সামান্যতা, এই বিশেষত্বহীনতাই তাঁর বিশেষত্ব।
আসলে আমাদের স্বভাব হলো রাজমহলে গিয়ে, শৃঙ্গারের ঘরে, বা স্ত্রীমহলে গিয়ে মহারানীর সন্ধান করা। কিন্তু আমাদের মহারানী যে রন্ধনশালার এক কোনে বাটনা বাটতে ব্যস্ত। তিনি যে ধোপানীর মত কাপড় ধুতে ব্যস্ত, তাঁর যে এই বোধটাই নেই যে তিনি হলেন মহারানী। … সেই ধোপানীকে আমরা দেখেছি, কিন্তু ধোপানী বলে তাঁর দিকে তাকাই নি, রাঁধুনির দিকেও দৃষ্টি নিক্ষেপ করিনি। শেষে যখন রাজপ্রাসাদে রাজসিংহাসনে সেই একই স্ত্রীকে বিরাজমান দেখি। … তখন আমাদের বুক থরথর করে কেঁপে ওঠে। সেই রাঁধুনিই মহারানী! সেই ধোপানীই মহারানী! …
তেমনই পুত্রী, তাঁকে খুঁজতে যেও না, তাঁকে খুঁজতে গেলে, তিনি তোমার সম্মুখে এসে তোমার সাথে আলাপ করলেও, তুমি তাঁকে চিনতে পারবেনা, কারণ তিনি যে অত্যন্ত সাধারন্যা। তিনি যে আমাদের মা, আমাদের নিজের মা, আমাদের একমাত্র মা… আমাদের সর্বস্ব তিনি।… (হেসে) কি ভাবছো, একবার মাকে মা বলে চীনে নিলে আর অসুবধা হবেনা! …
পুত্রী, অনেক মানুষের ঘরে, সন্তান যখন মাকে খুঁজতে আসে, তখনও সে মাকে চিনতে পারেনা। কখন যে মা রাঁধুনি হয়ে রয়েছেন, কখন যে ধোপানী হয়ে রয়েছেন, কখন যে ছাদে আচার বড়ি দিচ্ছেন, পিছন থেকে দেখে নিজের সন্তানই চিনতে পারেনা। তাই তো সে না খুঁজে, কি করে? সে হাঁক পারে, মা … মা… কোথায় তুমি। একটা কথা আছে, দরকার আছে। … মা যেই কাজ করছেন, হাতের কাজটা গুছিয়ে রেখে, সামনে এসে দাঁড়ান। উনুনে আঁচ দিচ্ছিলেন হয়তো, হাতে, কপালে কয়লার দাগ। … বলো তো এবার, সন্তান এই অবস্থায় মাকে দেখে চিনবে কি করে? …
না পুত্রী, আমরা তাঁকে হাজার বার দেখলেও চিনতে পারিনা, কারণ তিনি এতটাই সাধারণ, তিনি এতটাই সামান্য, তিনি এতটাই নির্বিশেষ। … তাই একটিই উপায়, সেই সন্তানের মত করেই ডাকা মাকে। মা, কোথায় তুমি, মা আমি এসেছি, খুব জল তেষ্টা পেয়েছে। … যত ব্যস্তই থাকুন মা, সন্তানের পিপাসা পেয়েছে, মা কি করে থাকতে পারেন তাঁর মুখে জল না দিয়ে। … হন্যে হয়ে তোমার কাছে তিনি ছুটে আসবেন।
আর একবার যখন তাঁর দেখা পেয়ে যাবে, তখন আর ধ্যান হবেনা, তখন হয়ে যাবে সমাধি। … যতক্ষণ তাঁকে খোঁজা, ততক্ষণ ধ্যান। আর একবার সেই নির্বিশেষ প্রেমউন্মাদিনীর দেখা পেয়ে গেলে, আর নিজের কনো কল্পনাকে আশ্রয় করে থাকতে পারবেনা, আর নিজের অস্তিত্বটাও স্বীকার করতে কষ্ট হবে। … প্রাণমন সমস্ত কিছু যেন একটিই কাজ করতে চাইবে, নিজের জন্মজন্মান্তরের মাকে ছুটে গিয়ে জরিয়ে ধরতে ইচ্ছা হবে। … আর এমন জরিয়ে ধরতে ইচ্ছা হবে, যেন আর কনোদিন তোমাকে ছাড়বো না। …
তাঁর এই প্রথম দর্শন, তাঁর প্রতিবারের দর্শনই হলো সমাধি পুত্রী। আর সমাধির অভিজ্ঞতা হলো তন্ময়, মহাতন্ময়, বা বলতে পারো মৃত্যু সমান। অর্থাৎ ধ্যান হলো তাঁর সন্ধানের প্রয়াস, যেখানে একাধিকবার সন্ধান করার প্রয়াস বিফল হতে হতে, অন্তে আমরা সন্ধানের প্রয়াস বন্ধ করে, শুরু করি আবাহন, আর নিজেদেরকে সম্পূর্ণ ভাবে সমর্পণ করি, আর সমাধি হলো তাঁর দর্শন।
আর দর্শনের উপরান্তে যখন তাঁর সাথে আলিঙ্গনে আবদ্ধ হই, তখন আর আত্মবোধ অবশিষ্টই থাকেনা। জীবকটি হলে, ব্রহ্মাণু নামক অর্থাৎ আত্ম নামক ভ্রম সমস্তকালের জন্য মিটে যায়, এবং জীবনমৃত্যুর চক্র, যা ব্রহ্মাণু বা আত্মের অস্তিত্বের কারণেই সম্ভব ছিল, তা সম্পূর্ণ ভাবে সমাপ্ত হয়ে যায়, আর তাকেই মোক্ষলাভ বলা হয়। ঈশ্বরকটির ক্ষেত্রে এটি মোক্ষ নয়, বরং সত্য অর্থে তাঁর অবতার জীবনের শুরু হয় এখান থেকে, যেখানে তাঁর ব্রহ্মাণু বা আত্মের বিসর্জন হয়ে যায় ব্রহ্মে, এবং অতঃপর তিনি ব্রহ্মদেহ হয়েই অবস্থান করেন, আর তাই তাঁর তখন অজ্ঞাত বলে কিছুই থাকেনা।
সমস্ত প্রকৃতি তিনি স্বয়ং, কালী তিনি স্বয়ং, নিয়তি তিনি স্বয়ং, আর তাই জীবন্ত ঈশ্বরমূর্তি হয়ে বিরাজ করে, সমস্ত ব্রহ্মাণু অর্থাৎ তাঁর সমস্ত সন্তানদের উদ্ধারের মার্গ নির্মাণ করাতে তিনি মনযোগী হন। আর তাই ঈশ্বরকটির ক্ষেত্রে যা জীবকটির মোক্ষ, তা হলো নির্বিকল্প সমাধি।
এই হলো সাধন পুত্রী। এবার এই সাধনকেই মার্কণ্ড দেখিয়েছেন চেতনা লাভ না করতে পেরে, ভৈরব হয়ে উঠে, চেতনাকে ধারণা করে করতে হয়েছে, আবার কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন দেখিয়েছেন যে চেতনার উত্থান সম্ভব হওয়ার কারণে, চেতনার হাত ধরেই সেই সাধন সম্ভব হচ্ছে। হ্যাঁ, ঈশ্বরকটিদের ক্ষেত্রে সাধারণত চেতনার হাত ধরেই এই উত্থান সম্ভব হয়, কিন্তু জীবকটিদের ক্ষেত্রে, অধিকাংশ সময়েই চেতনা নিজের ঊর্ধ্বতন অবস্থায় উন্নীত হতে পারেন না, যেমন সতী পারেন নি, এমনই দেখিয়েছেন মার্কণ্ড।
আর তখন জীবকটিকে ভৈরবের আগমন ঘটাতে হয়, এবং সাধন করতে হয়, যেমন তন্ত্রপথে মার্কণ্ড দেখিয়েছেন। এই দুইই সাধন মত সম্ভব পুত্রী, হয় চেতনার হাত ধরে, নয় ভৈরব জাগ্রত করে, এছাড়া মোক্ষ পর্যন্ত পৌঁছাবার তৃতীয় কনো মার্গ সম্ভব নয়। শঙ্কর যা করেছেন অর্থাৎ অদ্বৈত বেদান্ত করে, তা হলো এই দুই মার্গে পথ চলার ক্ষেত্রে যেই সমস্ত বাঁধা আসে, অজ্ঞানতার বাঁধা, সেই বাঁধাকে অতিক্রম করার জন্য উপযোগী।
ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবও এই যাত্রাপথের সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা প্রদানের জন্যই কথামৃত দান করেছেন। গৌতমবুদ্ধ সমস্ত যাত্রাপথের অন্তিম গন্তব্য অর্থাৎ মোক্ষ বা নির্বাণকেই ব্যাখ্যা করেছেন আর বলেছেন যে মোহ বা আসক্তিই হলো সেই যাত্রাপথের একমাত্র বাঁধা। আর চৈতন্যমহাপ্রভু, সেই যাত্রাপথের সন্ধানী করে তোলার জন্যই ভক্তির বিস্তার করেছেন।
আর কৃতান্ত? কৃতান্ত সেই সমস্ত যাত্রাপথকে সহজ করে দেবার জন্যই রচিত, সর্বজনের জন্য সেই পথ উন্মুক্ত করে দেবার জন্যই তা প্রস্তুত করা হয়েছে। তাই কৃতান্ত এই বলেছে যে, না তোমাদের গহন বনে যেতে হবেনা তন্ত্রের জন্য, আর সংসার ত্যাগীও হতে হবেনা। জীবন যেই অবস্থায় তোমাকে রেখেছে, বা সাধককে রেখেছে, সেই অবস্থাতে বিরাজমান হয়েই, মোহ বা আসক্তি থেকে মুক্ত হয়ে সমস্ত পরিস্থিতি থেকে, সমস্ত উপস্থিত জীবের থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে থাকতে হবে।
এই আসক্তি ও বিরক্তিশূন্য শিক্ষাগ্রহণই তাঁর মধ্যে বৈরাগ্য স্থাপন করে, তাঁর অন্তরে বিবেককে স্থাপন করবে, আর একবার তা হয়ে গেলে, মনঃসংযোগ ও ধ্যানের হাত ধরে, সমস্ত কল্পনা, চিন্তা, ইচ্ছা ও অহম বোধের উর্ধ্বে গমন করে, মোক্ষ লাভ সম্ভব হবে। অর্থাৎ কৃতান্ত নতুন কথা বলছে, তা একদমই নয়। যা ব্যাস বলেছেন, যা মার্কণ্ড বলেছেন, এর অতীতে কনো আর পথই সম্ভব নয়।
কিন্তু সন্ন্যাস গ্রহণ করে, বা বনবাসে যাবার কথা বলার কারণে প্রচুর সাধক যে সাধনায় উন্নীত হতে পারছেন না, তারই সমাধান হলো কৃতান্ত। তাই কৃতান্ত বলছেন যে কর্তাভাবের নাশ করো। যেখানে কর্তাই নেই, সেখানে কে-ই বা বনবাসী হবে, আর কেউ বা সন্ন্যাসী হবে! … সময়, প্রকৃতি ও নিয়তি যেই পরিস্থিতি তোমার সম্মুখে আনছেন, সেটিই হলো তোমার শিক্ষালাভের শ্রেষ্ঠ মার্গ।
সেই পরিস্থিতি যদি তোমার সম্মুখে দারিদ্রতা আনে, সেই দারিদ্রতাই তোমার শিক্ষালাভের শ্রেষ্ঠ মার্গ সেই পরিস্থিতিতে। পরিস্থিতি যদি তোমাকে সংসারী করে, সেই সংসারই তোমার শিক্ষালাভের শ্রেষ্ঠ মার্গ। পরিস্থিতি যদি তোমাকে সন্তানের মাতা বা পিতা করে, তবে সেই মাতা বা পিতা হয়ে অবস্থান করাই তোমার জন্য শ্রেষ্ঠ শিক্ষালাভের অবস্থা। অর্থাৎ পরিস্থিতি হবেন তোমার বিদ্যালয়, আর সেই বিদ্যালয় অর্থাৎ সেই পরিস্থিতি যেই যেই ব্যক্তি, জীব, উদ্ভিদ বা অজীবকে সম্মুখে আনবেন, তিনিই হবেন তোমার শিক্ষক।
আর সেই সমস্ত শিক্ষকের থেকে, সর্বক্ষণ বিদ্যালয়ে উপস্থিত থেকে, নিজের আসক্তি ও বিরক্তিকে সরিয়ে রেখে, নিজেকে কর্তা জ্ঞান করে সিদ্ধান্ত নেবার প্রয়াস থেকে সরিয়ে রেখে, বিদ্যালয় অর্থাৎ পরিস্থিতি যেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কথা তোমাকে বলছে, তাই গ্রহণ করতে থাকবে। সেই সিদ্ধান্ত যদি তোমার ক্ষতি সাধন করে, তবুও সেই সিদ্ধান্তই তোমার সিদ্ধান্ত হবে, আর যদি তোমাকে লাভবান করে, তবুও সেই সিদ্ধান্তই তোমার সিদ্ধান্ত হবে।
এই হলো কৃতান্তের মার্গদর্শন, যা তোমাকে অত্যন্ত সাধারণ করেই রেখে দেবে, না তোমাকে বনবাসী করবে, না তোমাকে সন্ন্যাসী করবে, না তোমাকে কনো বিশেষ বস্ত্র ধারণ করাবে, না তোমাকে কনো তিলক বা মাল্যে ভূষিত করবে। অর্থাৎ কেউ জানতেও পারবে না যে তুমি সাধনা করছ, না তোমার বেশভূষা দেখে, না তোমার পোশাকআশাক দেখে, আর না তোমার তিলকাদি দেখে। কিন্তু তুমি নিরন্তর সাধনা করে চলেছ।
চাকুরী করার পরিস্থিতি এলো, তুমি সেই চাকুরীর মধ্যেও বৈরাগী হয়ে থেকে, সমস্ত কিছুকে নিরন্তর দর্শন করে করে শিক্ষা লাভ করলে; বিবাহের প্রস্তাব এলো, যার সাথে বিবাহ স্থির করা হলো, তাঁরই সাথে বিবাহবন্ধনে যুক্ত হয়েও, বৈরাগী হয়ে থেকে, অকর্তা হয়ে থেকে, বৈবাহিক জীবন থেকে সমস্ত শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকলে; সন্তানাদির পিতা বা মাতা হলে, সেই দায়িত্ব পালন করতে করতেও, বৈরাগী ও অকর্তা হয়ে সমস্ত কিছুর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকলে।
দিনান্তে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে, মনঃসংযোগের অভ্যাস করলে, পারলে ওটি গোপনেই তা করলে, আর একটি সময়ে বিচার করতে থাকলে যে জীবন তোমাকে বিভিন্ন পর্যায় কি কি শিক্ষা প্রদান করেছে। এই বিচার আর এই মনঃসংযোগ, একসময়ে তোমাকে ধ্যানে উন্নীত করবে, সংসারের মধ্যে রেখেই, আর একসময়ে তা তোমাকে মোক্ষ প্রদানও করে দেবে, অর্থাৎ তোমাকে জীবনমৃত্যুর চক্র থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করে দেবে।
এই সংসারে থাকার কালেই, তুমি তোমার অন্তরে ভৈরবকে জাগ্রত করতে পারবে, আর সত্য বলতে সংসারের থেকে শ্রেষ্ঠ স্থানই সম্ভব নয় ভৈরবকে জাগ্রত করার জন্য। তুমি যদি বনে থাকো, যদি সন্ন্যাসী হয়ে থাকো, তোমাকে যেই স্থানে অবস্থান করছো, তার নিয়ম পালন করতেই হবে। বন হলে, বনের নিয়ম, বৃক্ষতল হলে, বৃক্ষতলের নিয়ম, পাহাড়ের গুহা হলে, পাহাড়ের নিয়ম, তোমাকে এইসবকে মান্যতা দিতেই হবে। তাই যদি নিজেকে অনিদ্রা প্রদান করে করে, ভৈরবকে জাগ্রত করতে হয়, তা সম্ভব হয়না; যদি নিজেকে অভুক্ত রেখে রেখে, তৃষ্ণার্ত রেখে রেখে, নিজের উর্জ্জার উপর জয়লাভ করতে হয়, তা সম্ভব হয়না।
কিন্তু তোমার সংসারে, তুমি সহজেই এই সমস্ত কিছু করতে সক্ষম, আর তাই নিজের অন্তরের উর্জ্জাকে পশমিত করতে সহজেই সক্ষম, নিজের বুদ্ধিকে স্থগিত করতে সহজেই সক্ষম। ধরো তুমি বনে রয়েছ, আর তুমি কনো ব্যাঘ্রের সম্মুখে পরেছ, বা সর্পের সম্মুখে পরেছ। যদি না অকর্তা হবার অভ্যাস তোমার ইতিমধ্যেই করা হয়ে থাকে, তাহলে কিছুতেই তখন তুমি নিজেকে অকর্তা করে রাখতে পারবেনা।
কিন্তু সংসারে কনো ব্যাঘ্র নেই, সর্প নেই, আছে কেবলই মানুষ। সেই মানুষ অকথা কুকথা বলবে, উপদ্রব করবে, শান্তিতে দুদণ্ড বসতে দেবেনা। এই সমস্ত কিছুকে সহ্য করা অনেক সহজ, ব্যাঘ্রের বা সর্পের উপদ্রবের থেকে, কারণ প্রাণ নিয়ে চিন্তা নেই সংসারে, যা ব্যঘ্রের বা সর্পের সম্মুখে থাকে। তাই সহজেই নিজেকে শান্ত করে রাখা যায়, এবং যেই ভূতের ভয় দেখিয়ে বুদ্ধি আমাদের কর্তা হতে বাধ্য করে, অর্থাৎ প্রাণের, সেই ভয় সেখানে থাকেই না।
তুমি সহজে উর্জ্জাকে পশমিত করতে সক্ষম, তোমাকে দেহের চিন্তা না করলেও, তাতে সমানে প্রয়োজন মত পুষ্টি যাচ্ছে এবং তাঁর রক্ষা করতে থাকছে, এমনকি তোমার প্রাণের ভয়ও নেই সংসারে। তো সহজ হলো না বুদ্ধিকে নিষ্ক্রিয় করা? সংসারের মধ্যে থেকে যদি সাম্যতা ধারণ করো, তাহলে সহজেই চারভূতকে সাহেস্তা করা যায়, আর তাই মনঃসংযোগ অতি সহজাত হয়ে যায়।
আর তার থেকেও বড় কথা, বনে থেকে, তোমাকে নিরন্তর পরিস্থিতির সন্ধান করতে থাকতে হবে, কারণ তুমি তো সন্ন্যাসী, তাই তোমার সম্মুখে তো স্বাভাবিকভাবে কনো পরিস্থিতি আসবে না। কিন্তু সংসারে তোমাকে সম্মুখে একের পর এক পরিস্থিতি নিরন্তর এবং অনলস ভাবে আসতেই থাকে, আর তাই তোমাকে আলাদা করে বিদ্যালয়ের সন্ধান করতে হয়না, সর্বক্ষণ তুমি বিদ্যালয়ে থেকেই, শিক্ষা গ্রহণ করতেই থাকো।
তাই কৃতান্ত বলছে, পরিস্থিতি তোমাকে যখন যেই অবস্থায় রাখছে, সেই অবস্থায় থেকে, মোহহীন হয়ে, বৈরাগী হয়ে অর্থাৎ কনো কিছুর প্রতি আসক্ত না হয়ে এবং কনো কিছুর প্রতি বিরক্ত না হয়ে, সমানে শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকো, আর নীরবে উন্নত হতে থাকো। মোক্ষপ্রাপ্তি হলো লক্ষ্য, মোক্ষপথে আমি যাত্রা করছি তার প্রচার বা বিজ্ঞাপন তো আবশ্যক নয়। তবে কেন ভিন্ন পোশাক ধারণ করা, কেন তিলক ব্যবহার করা? কেন কিছু বিশেষ মাল্য ধারণ করা?
পুত্রী, মোক্ষ হলো মিলন, আমাদের স্বরূপের সাথে আমাদের মিলন, আমাদের প্রেমের সাথে আমাদের মিলন। আর মিলনের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করে, নির্বস্ত্র হতে হয়। সেখানে নতুন করে কনো বস্ত্র ধারণের অর্থ বিলাসিতা ব্যতীত আর কি? যা পোশাক সম্মুখে আসছে, তাই ধারণ করো, সাধারণ পোশাক; যা আহার সম্মুখে আসছে, তাই গ্রহণ করা, নির্বিচারে গ্রহণ করা, এই হলো কর্তব্য।
আসল কথা হলো কর্তাবোধ। কল্পনার কারণে আমরা স্বয়ম্ভু হয়ে উঠে, নিজেদেরকে কর্তা করে রাখার কারণেই তো আমরা সত্যবিমুখ, সত্য থেকে বিচ্যুত। এবার যদি আমরা নতুন করে কর্তাকে ধারণ করে বলতে থাকি, এই বস্ত্র নয় ওই বস্ত্র ধারণ করবো, এই আহার নয় ওই আহার গ্রহণ করবো, এই গহনা নয় ওই গহনা ধারণ করবো, তাহলে তো পুনরায় এক কর্তারই জন্ম দিচ্ছি আমরা! পুনরায় আমরা সত্যবিমুখই হয়ে চলেছি।
যখন আমরা বলবো, বিবাহ করবো না, বা এই পাত্রকে ওই পাত্রকে, বা এই পাত্রীকে ওই পাত্রীকে বিবাহ করবো বা করবো না, তখন তো আমরা এক নতুন কর্তার জন্ম দিচ্ছি নিজেদের মধ্যে! এক তো একাধিক কর্তা, যেমন এই কুলের সন্তান, এই গোত্রের সন্তান, এই ধর্মসম্প্রদায়ের সন্তান, এই দেশের সন্তান, অমুক পিতার সন্তান, অমুক চাকরি করা ব্যক্তি আমি, অমুক ব্যবসা করা ব্যক্তি আমি, অমুক বিদ্যালয়ের ছাত্র আমি, অমুক বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করা ব্যক্তি আমি, ইত্যাদি ইত্যাদি হাজারো কর্তাভাবের তলায় আমাদের নিজেদের স্বরূপকে ঢেকেই রেখেছি। এরপর যদি আবারও নতুন করে বস্ত্র, আভুষন, তিলক ইত্যাদি ধারণের পথে যাই, আবার করে আমি সাকাহারি, আমি ফলাহারী, এই পথে যাই, তাহলে তো আরো এক নতুন কর্তার জন্ম হলো! পূর্বের পর্দাই সরলো না, নতুন পর্দা সত্যকে আরো দূরে ঠেলে দিল।
তাই কৃতান্ত বলছে, পরিস্থিতি তোমার সম্মুখে যা আনছে, তাকে সহজ ভাবে গ্রহণ করো। কেন? কারণ পরিস্থিতি হলেন স্বয়ং নিয়তি, আর নিয়তি হলেন সাখ্যাত ব্রহ্মময়ী, অর্থাৎ পরম সত্যের কারণরূপ প্রকাশ। আর তিনি আমাদের একমাত্র জননী। এমন জননী তিনি যে, আমরা নিজেদের ভালো তেমন করে বুঝিই না, যা তিনি বোঝেন। তাই তিনি তাই তাইকেই আমাদের সম্মুখে আনছেন পরিস্থিতি বেশে, যা আমাদের জন্য আবশ্যক, যা আমাদের জন্য শ্রেষ্ঠ।
তাই কর্তাভাবকে দূরে সরিয়ে রেখে, যা তিনি সম্মুখে আনছেন, তাকেই গ্রহণ করতে বলছে কৃতান্ত। আর সাথে সাথে এই বলছে কৃতান্ত যে, এই যে আমাদের কর্তাভাব, তার পশ্চাতে থাকে কল্পনা, ইচ্ছা ও চিন্তার ছলনা, আর সেই ছলের কারণেই আজ আমরা সত্যের থেকে বিচ্যুত, স্বয়ম্ভু, আর বিভ্রান্ত। তাই কর্তাভাবকে দূরে সরিয়ে রেখে, পরিস্থিতিকে গ্রহণ করো, তাহলে স্বতঃই কল্পনা, ইচ্ছা ও চিন্তার থেকে মুক্ত হবে, আর সত্যের সম্মুখীন হয়ে, মোক্ষপ্রাপ্ত হবে, তাঁর মধ্যে চিরতরে বিলীন হয়ে গিয়ে”।
দিব্যশ্রী প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু মা, এই যে বলে, বৈকুণ্ঠে গেলেই মোক্ষ, কৈলাসে গেলেই মোক্ষ। … এগুলি কি মোক্ষ নয়?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, কৈলাস, বৈকুণ্ঠ, ব্রহ্মলোক, স্বর্গ, গন্ধর্বলোক, পিতৃলোক, এই সমস্তই হলো একাকটি জ্ঞানলোক, যাদের প্রকাশ আমাদের দেহের অন্তরেই স্থিত। এঁরা যথাক্রমে হলো আজ্ঞাচক্র, বিশুদ্ধ, অনাহত, মনিপুর, স্বাধিষ্ঠান এবং মূলাধার। … কিন্তু এই সমস্ত কিছুর উর্দ্ধ্বেও একটি জ্ঞানছেত্র আছে, যার নাম সহস্রার। আমাদের সমাধি তখন হয়, যখন আমাদের চিত্ত এই সহস্রারে উন্নত হয়, তবে মোক্ষ তখনও লাভ হয়না।
মধ্যা কথা হলো পুত্রী, দুইয়ের অস্তিত্ব। ব্রহ্ম হলেন অসীম, আর বিচার করে বলো, যখন অসীম শব্দের উচ্চারণ করছো, তখন কি দুইয়ের অস্তিত্ব সম্ভব? এই দ্বিতীয় অস্তিত্বই তো প্রথম অস্তিত্বকে অসীম থেকে সসীম করে দেবে, তাই নয় কি? অর্থাৎ সত্য এই যে, কনো দুইএর অস্তিত্বই নেই। সেই দ্বিতীয় আমি তুমি হই, আর ব্রহ্মা বিষ্ণু হন, সমস্ত দুইই অনিত্য, সমস্ত দুইই ভ্রম।
তাই যতক্ষণ দুইএর অস্তিত্ব সম্ভব, ততক্ষণই ভ্রম বিদ্যমান, কারণ ততক্ষণ ‘আমি’র অস্তিত্ব ভাস্মর। আর যতক্ষণ ‘আমি’ অবস্থান করছে, ততক্ষণ পরিবর্তনও ঘটমান সত্য। অর্থাৎ আমি কনো একটি স্থান থেকে মুক্ত হচ্ছি, তো অন্য একটি স্থানে আবদ্ধ হচ্ছি। উলঙ্গ অবস্থা থেকে মুক্ত হচ্ছি, তো বস্ত্রের অধীনে স্থাপিত হচ্ছি; শীতকাল থেকে মুক্ত হচ্ছি, তো গ্রীষ্মকালে আবদ্ধ হচ্ছি। অর্থাৎ বন্ধন স্থাপণ ও মুক্তি একই সঙ্গে ঘটমান।
আর যখন পরিবর্তন ঘটমান, তখন তো মৃত্যুও সম্ভব, আর জীবনও। তাহলে বলো জীবনমৃত্যুর থেকে মুক্ত আমরা কি করে হলাম! … না পুত্রী, যতক্ষণ দুইএর অস্তিত্ব ততক্ষণই জীবনমৃত্যুর বন্ধন অব্যহত। জীবনমৃত্যু তখনই অবাঞ্ছিত হয়ে যায়, অহেতুক হয়ে যায়, গল্পকথা হয়ে যায়, অসত্য হয়ে যায়, যখন আমার কনো পৃথক অস্তিত্বই আর থাকেনা, আমি ব্রহ্মময় হয়ে গেছি। সমস্ত সসীমত্ব ত্যাগ করে, অসীমে লীন হয়ে গেছি।
তাই এক ও একমাত্র ব্রহ্মলাভেই মোক্ষ। না তো ব্রহ্মদর্শনে মোক্ষ, না আত্মদর্শনে, না কনো জ্ঞানলোকে স্থিত হয়ে মোক্ষলাভ সম্ভব। হ্যাঁ, যখন আমি ব্রহ্মলোকে স্থিত হলাম, অর্থাৎ আমার অনাহত জাগ্রত হলো, আমি বাহ্য শব্দের থেকে মুক্তি লাভ করলাম; যখন আমি বিশুদ্ধে বা বৈকুণ্ঠে স্থিত হলাম, তখন আমি সমস্ত বাহ্য শ্রী থেকে মুক্ত হলাম; যখন আমি কৈলাসে বা আজ্ঞাতে স্থিত হচ্ছি, তখন আমি সমস্ত বাইরের প্রভাব থেকে মুক্ত হচ্ছি, কিন্তু আমার অস্তিত্ব তখনও বর্তমান, অর্থাৎ পরিবর্তন তখনও চলমান, অর্থাৎ জীবনমৃত্যুর চক্র তখনও অব্যহত।
যখন আমি সহস্রারে উন্নীত হচ্ছি, তখন আমার ব্রহ্মদর্শন হচ্ছে, কিন্তু তখনও আমার অস্তিত্ব রয়েছে, কারণ আমি দেখছি, আর ব্রহ্মকে দেখছি। কেবল দুই, কিন্তু এক নয়। কিন্তু যখন নির্বিকল্প হচ্ছে, তখন আর কনো বিকল্প নেই, আর কনো দুই নেই। এক ও একমাত্র অসীম ব্রহ্মই উপস্থিত, মোক্ষ তখনই ভাস্মর সত্য, কারণ আর কনো ব্রহ্মাণুই নেই, আর কনো আত্মই নেই, আর কনো পরমাত্মও নেই। এক ও অনন্য মহাশূন্য উপস্থিত।
না সেখানে কনো নিয়তি আছেন, না প্রকৃতি, না মহাকালী, আর না ত্রিগুণ অর্থাৎ ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব উপস্থিত; না কনো দেব উপস্থিত সেখানে, না গন্ধর্ব, না পিতৃ, আর না কনো অসুর, যক্ষ, রক্ষ, দানব, কেউ উপস্থিত সেখানে। তাই তো তিনি অব্যাক্ত, তাই তো তিনি অচিন্ত্য, তাই তো তিনি অনন্ত, তাই তো তিনি অসীম। আর তাই তাঁতে লীন হলে, তবেই মোক্ষ, সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্তি। তার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত যখনই আমরা কিছুর থেকে মুক্ত হচ্ছি, সেই ক্ষণেই অন্য কিছুর দ্বারা আবদ্ধও হচ্ছি। কেন?
কারণ ‘আমি’ যে তখনও অস্তিত্বশীল, আত্ম যে তখনও বর্তমান, পরমাত্মও যে তখনও বর্তমান। … তাই মোক্ষ কিছুতেই সম্ভব নয় তখন। আর এমন ভেবো না যে, ব্যাস বা অন্য কেউ বৈকুণ্ঠে গমনকে মোক্ষ বলেছেন। তাঁরা তো বলেছেন মুক্তি, নিম্ন সমস্ত লোকের থেকে মুক্তি, আর পরের দেহে, অন্য কনো যোনিতে জন্ম নেওয়ার থেকে মুক্তি। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, তাঁরা এই মুক্তিকে ব্যখ্যা করেননি, আর তাই আর্যরা এই সমস্তকিছুকেই মোক্ষ বলে স্থাপিত করেছেন, আর বলে গেছেন দেখো, স্বয়ং অবতার বলছে, অহংকার যখন শ্রীযুক্ত হয়, তখনই মোক্ষ।
তাই ভক্তি করো, জোরে জোরে তাঁর নাম নাও; সেই সমস্ত কিছু, সেই সর্বস্ব কিছু, সেই অচিন্ত্য, সেই অসীম। কিন্তু মূর্খ তো আর্যরা বরাবরই ছিলেন, আর এখন তো মূর্খতাই তাঁদের শ্রেষ্ঠ আভুষন হয়ে গেছে। যাইহোক, এই আর্যদের এই সমস্ত মিথ্যাচারের থেকে মানুষকে মুক্ত করার প্রয়াসেই শঙ্কর অদ্বৈত বেদান্ত প্রদান করেছিলেন, আর বলেছিলেন যে, তিনিই অব্যাক্ত, যার অস্তিত্বসম্মুখে তোমার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। যতক্ষণ না তুমিই সেই ব্রহ্ম হচ্ছ, ততক্ষণ তিনিও সেই ব্রহ্ম নন, কারণ এক ঈশ্বরই ঈশ্বরের দর্শন করতে সক্ষম। আর তাই শঙ্কর সত্যের প্রকাশ ঘটিয়ে বললেন, স্বয়ং সেই ব্রহ্ম হয়ে ওঠো, তবেই ব্রহ্মলাভ হবে। যতক্ষণ দুই, ততক্ষণই মোহ, প্রেমে কনো দুই হয়না, কেবলই এক, কেবলই একাকার, কেবলই অব্যক্ত ব্রহ্মের অস্তিত্ব থাকে, আর তাকেই বলা হয় মোক্ষ, অর্থাৎ জীবনমৃত্যুর চক্র থেকে চিরমুক্তি”।
