গুহ্য কৃতান্ত (গুপ্ত ইতিহাস)
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “বেশ, আমি তোমাকে সেই কথা বলছি। … আর তার পূর্বে অবশ্যই বলবো যে, কৃতান্ত ধারার নির্মাণই হয়েছে সেই উদ্দেশ্যে যা তোমারও প্রশ্ন করার উদ্দেশ্য, অর্থাৎ সহজ সাধন পথ। … তবে কৃতান্তের পথের কথা বলার পূর্বে আমি তোমাকে ভক্তির কথা বলবো। …
পুত্রী, ভক্তি ঈশ্বরলাভ করাতে ব্যর্থ। হ্যাঁ, ভগবান লাভ করাতে সক্ষম ভক্তি। আর ভক্তি তাঁর দ্বারা কখনোই লব্ধ নয়, যিনি সম্পূর্ণ ভাবে আত্মকেন্দ্রিক। … এই সামান্য কথা বলে, এবার তোমাকে আমি ভক্তির বিষয়ে গভীর ভাবে বলছি শ্রবণ করো।
পুত্রী, প্রথমেই জেনে নাও ভক্তি কি? পুত্রী, ভক্তি হলো হৃদয় দেশ থেকে নির্গত হওয়া একটি ভাব, যা এক ব্যক্তির অন্য ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি প্রতিফলিত হয়, আর তাতে মিশ্রিত থাকে ধারণা, বিশ্বাস ও সম্মান, এই তিন ভাব।
অর্থাৎ, প্রথম কথাই এই যে, ভক্তি কনো আবেগ নয় যে, তা মস্তিষ্কপ্রসূত হবে। এটি একটি ভাব, অর্থাৎ এঁর উদয় হয় হৃদয়দেশ থেকে। পরবর্তী কথা এই যে, এই ভাব প্রতিফলিত কার উপর হয়? কনো অন্য ব্যক্তির প্রতি এবং কনো অন্য বস্তুর প্রতি প্রতিফলিত হয়। আর এঁর উপাদান কি কি? এঁর উপাদান ধারণা, বিশ্বাস ও সম্মান।
এবার এই ধারণা কি? যা কিছু ধারণ করা হয়, বা ধারণ করা যায়, বা ধারণ করা হয়েছে, তাই হলো ধারণা। হ্যাঁ পুত্রী, ধারনার তিনটি স্তর হয়, প্রথমটি যা ধারণ করা হয়, অর্থাৎ ধারণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়, তা ধারণ করা হলেও তা ধারণা আর তা ধারণ করা না হলেও ধারণা। যেমন ধর পুরাণ সমূহ হলো দিব্যগ্রন্থ। এটি একটি ধারণ করার নির্দেশ। তা তুমি যদি ধারণ করো, তাও এটি একটি ধারণা, আবার যদি না করো, তাও এটি একটি ধারণা।
অপরদিকে দ্বিতীয় ধারণার স্তর হলো তাই, যা ধারণ করা যায়। সমস্ত কিছু ধারণা করার উপযুক্তই নয়, যেমন ব্রহ্ম বা মহাশূন্য। মহাশূন্যকে বা ব্রহ্মকে ধারণা করাই অসম্ভব। কিন্তু ভৌতিক যা কিছু, যেমন ধরো দেশ, সময়, প্রকৃতি, রাজনীতি ও বিদ্যা ধারণা করা সম্ভব। যিনি এই সমূহের মধ্যে কনো কিছুর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন, কিন্তু ধারণা করে উঠতে পারেন নি, তাঁকেও ধারক বলা হয়।
আর তৃতীয় হলো যিনি ধারণা করে নিয়েছেন ইতিমধ্যে। কি কি ধারণা করে নিয়েছেন? অবশ্যই যাকিছু ধারণা করা যায়, অর্থাৎ দেশ, সময়, প্রকৃতি, রাজনীতি ও বিদ্যা। তিনি এই সমূহের মধ্যে কনো একটিকে ধারণ করে নিয়েছেন।
অর্থাৎ বুঝতে পারছ তো পুত্রী, এই ধারণ করা যেহেতু তিনপ্রকার, তাই ভক্তিও তিন প্রকার হয়। প্রথম প্রকার ভক্তি হলো সেই ভক্তি, যেখানে ধারণা করার নির্দেশ প্রাপ্ত হয়েছে; দ্বিতীয় হলো যেখানে ধারণা করার সামগ্রী লাভ হয়েছে, আর তৃতীয় প্রকার ভক্তি হলো যেখানে ধারণা করা হয়েছে।
এবার কথা এই যে, যখন কনো কিছুকে ধারণা করা হয়নি, তখন সেই বস্তু বা সামগ্রীর সমষ্টিকরন বা একত্রীকরণ আমাদের অন্তরে মদ বা অহমিকার জন্ম দেয়। যেমন ধরো, আমি কনো গ্রন্থ পাঠ করিনি, কিন্তু সেই গ্রন্থকে আমি আমার বাড়িতে সাজিয়ে রেখেছি। এই ক্ষেত্রে একটি অহমিকার জন্ম হয়, আর সেই অহমিকা থেকে একটি চাহিদা বা কামনারও জন্ম হয়। অর্থাৎ যেমন গ্রন্থের কথা বললাম, তেমন ক্ষেত্রেই, এই কামনার জন্ম নেয় যে, আমার তারিফ করবে অনেকে, কারণ আমার কাছে শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ সমূহ আছে। আর তাই, প্রথম দুই ধরনের ধারণার থেকে অহমিকা ও আকাঙ্ক্ষার জন্ম হয়। অর্থাৎ যেখানে ধারণার কেবলই নির্দেশ লাভ হয়েছে বা ধারণার সামগ্রীর একত্রীকরণ হয়েছে, কিন্তু ধারণা করা হয়নি, সেখানে জন্ম নেয় আকাঙ্ক্ষার, কামনার এবং সেই ধারণা মিশ্রিত ভক্তি হয়ে ওঠে সকাম ভক্তি।
তৃতীয় যেই ধারণা, অর্থাৎ যেখানে গ্রন্থপাঠ হয়েছে, সেখানে আকাঙ্ক্ষার বিস্তারের সম্ভাবনা থাকলেও তা কমে যায়, আর যদি কামনা থেকে মুক্ত হয়ে ওঠে ভক্তি, তখন তা হয়ে ওঠে নিষ্কাম ভক্তি। এবার আরো একটি গুহ্য ভাবে বিচার করো পুত্রী। ধারণা কার করা হবে? বিদ্যা অর্থাৎ গ্রন্থাদির, প্রকৃতির, সময়ের। এঁরা সকলেই ভৌতিক বা সূক্ষ্ম, অর্থাৎ সকলেই এই অনিত্য বা মিথ্যা বা কাল্পনিক ব্রহ্মাণ্ডের প্রকাশ।
তাই যখন এই কাল্পনিক ব্রহ্মাণ্ডের কনো প্রকাশকেই ধারণ করে, তাঁর উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস অর্পণ করছো, তখন যে কনো ভাবেই তোমার ভাব সত্যকে স্পর্শ করতে সমর্থ নয়। পুত্রী, কল্পনার উপর বিশ্বাস কখনোই সত্যকে ধারণ করায় না, কারণ কল্পনা স্বয়ংই সত্য নয়। তেমনই পুত্রী, গ্রন্থাদির কথা যদি বলো, প্রকৃতির কথা যদি বলো, সময়ের কথা যদি বলো, এঁরা সকলেই সত্যকে প্রকাশ করতে ব্যকুল, কিন্তু তাও এঁদের প্রকাশের মধ্যে কোথাও না কোথাও অসত্য স্থাপিত থাকে, আর তা থাকে বলেই, তারা এই অলিক কাল্পনিক ব্রহ্মাণ্ডে অস্তিত্বে থেকে যায় সর্বক্ষণ।
তাই ধারণা করা হলেও, তা সত্যের স্পর্শ প্রদান করতে পারেনা। আর তাই ভক্তি সত্যের উদ্দেশ্যে ধাবমান হলেও, সত্যে স্থাপিত হতে ব্যর্থ। কেন? কারণ ধারণা এই করা হয় যে, সময় সত্য, প্রকৃতি সত্য, গ্রন্থ সত্য, এবং গ্রন্থের বর্ণনা সত্য। কিন্তু এঁদেরকে সত্য মানার কালে, গ্রন্থের পাঠক, বা সময়ের দর্শক, বা প্রকৃতির অনুধাবক অসত্য হয়ে যাচ্ছেন না, অর্থাৎ আমি অসত্য হচ্ছি না।
আর আমি কি পুত্রী? আমি হলো ব্রহ্মাণু। ব্রহ্মাণু কি? ব্রহ্মাণু হলো ব্রহ্মের অণু। আর ব্রহ্ম কি? ব্রহ্ম মানে অভেদ্য এবং সমসত্ত্ব। অভেদ্যকে কি ভাবে ভাগ করা সম্ভব? অসম্ভব তাই না! যদি তা অসম্ভবই হয়, তাহলে অণু অর্থাৎ অভেদ্যের ভাগ কি করে সত্য হয়? অসম্ভব। অর্থাৎ ব্রহ্মের অণুই সম্ভব নয়, ব্রহ্মের অণুই অসত্য। তাহলে ব্রহ্মাণু কি করে সত্য হতে পারে?
পারেনা সত্য হতে, আর তাই যতক্ষণ ‘আমি’ থাকে, ততক্ষণ সত্যলাভ সম্ভবই নয়, কারণ এই ‘আমি’ই যে শ্রেষ্ঠ অসত্য। কিন্তু ভক্তিকে এবার দেখো। ধারণা থাকে, সেই ধারণাতে বিশ্বাসও থাকে। সেই বিশ্বাসের ফলে ধারণা যার প্রতি, তাঁর প্রতি সম্মানও থাকে। কিন্তু এই ধারণা কার? এই বিশ্বাস কার? এই সম্মান কে করছেন? –‘আমি’। আর আমি কি? অসত্য। অর্থাৎ ভক্তি সত্যকে ধারণ করতে অক্ষম, যদিও তা অবশ্যই সত্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছে।
তাই পুত্রী, ভক্তি অবশ্যই প্রগতি, কিন্তু তা গন্তব্য নয়। সত্যলাভ হলো আমাদের গন্তব্য। আর সত্যলাভ তখনই সম্ভব হবে, যখন ‘আমি’ দুর্বল হয়ে যাবে, এই ‘আমি’ পরনির্ভর হয়ে যাবে, এই ‘আমি’ অহেতুক হয়ে যাবে, এই ‘আমি’ অনিত্য হয়ে যাবে। কিন্তু ভক্তিতে তা হয়না। ভক্তিতে, ‘আমার ধারণা’, ‘আমার ভাব’, ‘আমার বিশ্বাস’, ‘আমার সম্মান’ এই সমস্ত থেকেই যায়।
হ্যাঁ অবশ্যই সত্যের উদ্দেশ্যে যাত্রার পথে ভক্তি আসে, তাই ভক্তি সত্যের দিশায় যাত্রার নিশান, কিন্তু ভক্তি কখনোই সত্যলাভের নিশান নয়। ভক্তিলাভের পরেও বহুদূর যাত্রা করলে, তবেই সত্যলাভ সম্ভব। সেই জন্যই প্রথমেই বলেছিলাম পুত্রী, ভক্তি ভগবানকে লাভ করাতে পারে, ঈশ্বরকে নয়।
এবার ভগবান আর ঈশ্বরের ভেদ বোঝা আবশ্যক। ভগবান হলেন জগতসংসারের তিনি, যাকে আজকের বাণিজ্যিক জগতে বলো ম্যানেজার অর্থাৎ ব্যবস্থায়ক। এবার ব্যবস্থায়ক অনেক হতে পারেন, আর হনও, যেমন বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থায়ক, অর্থদপ্তরের ব্যবস্থায়ক, সামগ্রী দপ্তরের ব্যবস্থায়ক ইত্যাদি। তেমনই, ব্রহ্মাণ্ডের একটি ব্যবস্থায়ক হলেন সত্ত্বগুণ, যাকে আর্যরা বলেন ব্রহ্মা; দ্বিতীয়জন হলেন রজগুণ, যাকে আর্যরা বলেন বিষ্ণু; আর তৃতীয়জন হলেন তমগুণ, যাকে আর্যরা বলেন শিব।
এবার, এই ব্যবস্থায়কদের অধীনস্থ থাকে দেবরা, যারা অন্য কিছুই নন চতুর্বিংশতি তত্ত্ব আমাদের দেহের, আর এঁদের কর্ণধার হলেন আর্যদের মতে ইন্দ্র, বরুণ, অগ্নি, পবন ও ধরিত্রী, এই পঞ্চভূত, আর আমাদের ব্রহ্মাণ্ডে তাঁরা হলেন, আমাদের মন বা আকাশতত্ত্ব বা ইন্দ্র, বুদ্ধি বা জলতত্ত্ব বা বরুণ, উর্জ্জা বা অগ্নিতত্ত্ব, প্রাণবায়ু বা পবনতত্ত্ব, এবং দেহ বা ধরিত্রীতত্ত্ব।
আর এঁদের সবার উর্ধ্বে অবস্থান করছেন কে? বৌদ্ধরা যাকে বলেন বিনায়ক, আর্যরা যাকে বলেন গণেশ, বেদব্যাস যাকে বলেছিলেন কৃষ্ণ, আর বাস্তবে যিনি হলেন বিবেক। … পুত্রী, যেমন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে, সমস্ত ব্যসবস্থায়কের উপরে থাকে ম্যানিজিং ডিরেক্টর, তেমনই হলেন বিনায়ক বা গণেশ বা কৃষ্ণ বা বিবেক। চেতনার থেকে জাত, ব্রহ্মসন্তান গণেশ বা বিনায়ক সমস্ত অন্য ব্যবস্থায়কের নিয়ন্ত্রক, এবং তাঁদের শিরোপরে স্থিত।
আর এঁরাই হলেন সকল ভগবান অর্থাৎ ব্যবস্থায়ক। এঁদের সঙ্গে বিচার অর্থাৎ আর্যরা যাকে বলেন কার্ত্তিক তাঁকেও পাবে, আরো অনেককে পাবে। কিন্তু ঈশ্বর কি? ঈশ্বর তিনি যিনি অব্যাক্ত, যিনি অচিন্ত্য, যিনি অখণ্ড, যিনি অদ্বিতীয়, যিনি মহাশূন্য, যিনি সম্পূর্ণ রূপে নিরাকার। আর তিনি হলেন ব্রহ্ম, অর্থাৎ মহাশূন্য, অর্থাৎ তিনি যার দর্শন হলে ধ্যান হয়ে যায়, যাকে লাভ হলে সমাধি হয়ে যায়, আর যাতে বিলীন হলে মোক্ষ প্রাপ্তি হয়ে যায়।
বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ইনাকে বলেন মালিক, যিনি একাধিক রূপসম্পন্ন হলেও এককই এবং কনো দ্বৈততা নেই তাঁর মধ্যে। ইনি সমস্ত ব্যবস্থায়কের জননী, সমস্ত ব্যবস্থায়কের উৎস, এবং সমস্ত কিছুর সত্য। কিন্তু আমরা এই সত্যের আভাস পাই কি করে? এই সত্যই সমস্ত ব্যবস্থায়ককে এক অদৃশ্য বন্ধনে বেঁধে রেখেছেন, যাকে আমরা বলে থাকি ব্রহ্মের কারণরূপে প্রকাশ বা নিয়তি।
মালিক তিনি। তিনি কেবল শীর্ষব্যবস্থায়কদের বেঁধে রেখেই ক্ষান্ত হননা। তিনি নিম্নব্যবস্থায়ক অর্থাৎ ভূতদেরকেও বেঁধে রেখেছেন, চতুর্বিংশতিতত্ত্বকেও বেঁধে রেখেছেন। কিরূপে বেঁধে রেখেছেন? সূক্ষ্ম বেশে বেঁধে রেখেছেন সময়ের নিয়ন্ত্রক বা কালের নিয়ন্ত্রকরূপে, যাকে মহামুনি মার্কণ্ড কি নাম দিয়েছেন? মহাকালী।
এখানেই কি তাঁর বন্ধন শেষ? কি করে হতে পারে? তিনি তো মালিক, সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড তাঁরই গর্ভে অবস্থান করছে। তাই কেবল কারণপ্রকাশ বা সূক্ষ্মপ্রকাশে তিনি সমাপ্ত হতে পারেন কি ভাবে? স্থূলপ্রকাশে তিনিই প্রকৃতি, পরাপ্রকৃতি, অর্থাৎ তাঁর থেকেই আমরা আমাদের সকলে নিজের নিজের প্রকৃতি, নিজের নিজের চরিত্র ধারণ করে থাকি। আর ঈশ্বর হলেন তিনি।
কিন্তু তাঁকে ভক্তি দ্বারা প্রসন্ন করা সম্ভবই নয়। না আমি তুমি, না অন্য কেউ, আর না এই ব্যবস্থায়ক, অর্থাৎ আর্যদের মতে দেব, ত্রিদেব বা স্বয়ং বিনায়কও তাঁর নিকট ভক্তিবলে উপস্থিত হতে পারেন না। কেন পারেন না? কারণ তিনি ভক্তি স্বীকারই করেন না। কেন করেন না? কারণ তিনি তো অদ্বৈত। ভক্তি তো অদ্বৈত নয়, ভক্তিতে তো ‘আমি’ উপস্থিত থাকে, অর্থাৎ ‘আমি’ ও ‘সে’ অর্থাৎ দ্বৈত।
তাই ভক্তি তিনি স্বীকার করেন না বলা ভুল হবে। সঠিক বলতে গেলে, ভক্তির কনো মান্যতাই নেই তাঁর কাছে। তাঁর দর্শন পেতে গেলে, তাঁকে লাভ করতে গেলে, নিজের ‘আমিত্ব’কে সম্পূর্ণ ভাবে বিসর্জন দিতে হয়। … ‘আমি’ বলে কিচ্ছু থাকবে না। … শুধুই তিনি, শুধুই সত্য, সেই সত্যে কনো ‘অ’ যুক্ত নেই, তাই কনো অসত্যের অস্তিত্বই নেই।
অর্থাৎ পুত্রী, যতক্ষণ ‘আমি করছি’, ‘আমি মানছি’, ‘আমি বিশ্বাস করি’, ‘আমার বিশ্বাস’, ‘আমার ভক্তি’, ‘আমার জ্ঞান’, ‘আমার বৈরাগ্য’ এই সমস্ত থাকে, ততক্ষণ তাঁর সম্মুখে পৌঁছান অসম্ভব, সম্পূর্ণ ভাবে অসম্ভব। তবে উপায় কি?
ঈশ্বর পেতে গেলে, ঈশ্বর হতে হয়। ব্রহ্মলাভ করতে গেলে, শঙ্করের ‘অহম ব্রহ্মস্মি’ হতে হয়। … নিজের সমস্ত নিজস্বতা ত্যাগ করতে হয়। নিজের দেহবোধ, নিজের পঞ্চভূতের বোধ, নিজের গুণবোধ, অর্থাৎ সত্ত্ব, রজ, তম সমস্ত কিছু ত্যাগ করতে হয়। জ্ঞান, বিবেক, বিচার সমস্ত ঝোরে গেলে, তবেই তাঁর সান্নিধ্য লাভ হয়।
পুত্রী, যতক্ষণ জননীর গর্ভের একটি নাড়ির সাথেও সন্তানের যোগাযোগ থাকে, ততক্ষণ সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়না। যতক্ষণ একটি পুষ্পের পাতাও ফলের সাথে যুক্ত থাকে, ফল ততক্ষণ পক্বতার দিকে যাত্রা করেনা। ঠিক তেমনই, যতক্ষণ আমাদের মধ্যে লেশমাত্র আমিত্বের বোধও অবশিষ্ট থাকে, ততক্ষণ আমাদের জননীর সম্মুখীন হতে পারিনা আমরা, ব্রহ্মলাভ হয়না।
সমস্ত আমিত্ব, সমস্ত আমার গুণ, সমস্ত আমার বিশ্বাস, সমস্ত আমার ধারণা, সমস্ত আমার বিচার, সমস্ত আমার জ্ঞান, সমস্ত কিছু যখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়, তখনই তাঁর দর্শন লাভ হয়। কনো দিব্যদৃষ্টি, কনো কারুর কৃপা, কনো কারুর প্রদত্ত বরদান, কনো কিছুই তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনা। আর তাই এই সমস্ত কিছুর কনোটিই তোমাকে তাঁর সম্মুখে নিয়ে যেতে ব্যর্থ।
পুত্রী, জ্ঞান, বিচার, বৈরাগ্য, সুচরিত্র, সমস্ত কিছুর প্রয়োজন ততক্ষণই যতক্ষণ না তাঁর সকাশে উপস্থিত হচ্ছ। একবার তাঁর সকাশে উপস্থিত হয়ে গেলে, জ্ঞান, বিচার, বৈরাগ্য, সুচরিত্র, ইত্যাদির একটির প্রতিও যদি আসক্তি রাখো, তবে তাঁর দর্শন অসম্ভব। ঠাকুর রামকৃষ্ণ এই সত্যকে কি বলতেন জানো? বলতেন, কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে হয়, তারপর দুটি কাঁটাকেই ফেলে দিতে হয়।
অর্থাৎ, অজ্ঞানতা, বদ্ধধারণা, আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থচিন্তা, কামনা, মোহ, ইত্যাদি হলো প্রথম কাঁটা। সেই কাঁটাকে তুলতে হয় দ্বিতীয় কাঁটা অর্থাৎ জ্ঞান, বিচার, বৈরাগ্য এবং সুচরিত্র দ্বারা। আর একবার তা তোলা হয়ে গেলে, যেমন অজ্ঞানতাকেও ফেলতে হয়, তেমন জ্ঞানকেও; যেমন বদ্ধধারণাকে ফেলতে হয়, তেমন বিচারকেও; যেমন আত্মকেন্দ্রিকতাকে স্বার্থ চিন্তাকেও ফেলতে হয়, তেমন সুচরিত্রকেও; যেমন কামনা মোহকেও ফেলতে হয়, তেমন বৈরাগ্যকেও। তবেই তাঁর দর্শন লাভ সম্ভব।
এক কথাতে বলতে হলে, পুত্রী, এক ঈশ্বরই ঈশ্বরের দর্শন লাভ করেন। ব্রহ্মের দর্শন ব্রহ্ম বিনা কেউ লাভ করেন না। তাই পুত্রী, জ্ঞান আহরণ আবশ্যক অজ্ঞানতার দূরীকরণের জন্য, কিন্তু সেই জ্ঞান অজ্ঞান, দুইকেই ফেলতে হয়। বৈরাগ্য আবশ্যক, কামনা ও মোহের থেকে মুক্ত হবার জন্য, কিন্তু তাও ফেলতে হয়। … সমস্ত কিছুর থেকে মুক্ত হতে হয়।
সমস্ত শব্দের থেকে মুক্ত হয়ে নিঃশব্দ হতে হয়; সমস্ত দৃশ্যের থেকে মুক্ত হয়ে অদৃশ্য হতে হয়; সমস্ত ভেদের থেকে মুক্ত হয়ে অভেদ্য হতে হয়; সমস্ত বিচারের থেকে মুক্ত হয়ে নির্বিচার হতে হয়; সমস্ত ব্যখ্যার থেকে মুক্ত হয়ে অব্যাক্ত হতে হয়; সমস্ত চিন্তার থেকে মুক্ত হয়ে অচিন্ত্য হতে হয়; সমস্ত কল্পনার থেকে মুক্ত হয়ে অকল্পনীয় হতে হয়; সমস্ত অন্ধকার ও আলোকের থেকে মুক্ত হয়ে মহাশূন্য হতে হয়।
তবেই সেই পরাশূন্যের দর্শন লাভ হয়, ব্রহ্মলাভ হয়, আমাদের সর্বকালের একমাত্র জননীর সাখ্যাত প্রাপ্তি হয়। … আর একবার তা হয়ে গেলে, ওই যেমন ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলতেন, তিনিই সব বুঝিয়ে দেবেন, তেমন সমস্ত বুঝে যাই আমরা। আর কিছু বোঝা বাকি থাকেনা।
তখন আর আমরা বলিনা যে আমার ভক্তি, আমার জ্ঞান, আমার বৈরাগ্য, আমার বিচার, আমার বিশ্বাস, আমার শ্রদ্ধা, আমার মমতা… কিচ্ছু বলতে পারিনা। সাধক রামপ্রসাদ যেমন বলেছিলেন, ‘আমার আমার করতে লাগে লাজ’, তেমন হয়ে যায়। তখন বলতে ইচ্ছা হয়, মিরার মত, ‘তুম ভাই সরবর, মে ভাই মাছিয়া’। অর্থাৎ তখন বলতে ইচ্ছা হয় যে, আমার বিশ্বাস ততখানিই, যতখানি তুমি দিয়েছ; আমার ভক্তি, সেও তোমার দান; আমার জ্ঞান, সেও তোমার কৃপা; আমাকে যেই চেতনা দিলে, তাও তোমারই প্রেম।
তখন আর ভক্তি থাকেনা, তখন প্রেম হয়ে যায়। প্রেম আর ভক্তির ভেদ কি? প্রেমে কনো দুই-এর অস্তিত্ব থাকেনা, সমস্ত কিছু একাকার হয়ে যায়। এক তুমি আছো, আর কনো কিছু নেই। তুমিই আছো, আমি তো না কনোদিন ছিলাম, আর না কনোদিন সম্ভব। এই আমি যে এক অজ্ঞানতার থেকে জাত, কল্পনার বিকাশ, যা সর্বৈব ভাবে মিথ্যা। এক তুমিই সত্য, আর দ্বিতীয় কনো সত্য সম্ভবই নয়। এক তোমারই অস্তিত্ব সম্ভব, আর দ্বিতীয় কনো অস্তিত্বই সম্ভব নয়।
মালিক নেই, তো কনো কোম্পানিও নেই, ম্যানেজারও নেই। তাই এক মালিকই সত্য। এক মালিকই অস্তিত্ব, বাকি সমস্তই মালিকের ধারক, বাকি সকলেই নিজেকে নিজেকে মালিক মনে করে অভিনয়ে মত্ত, কিন্তু কাক যতই ময়ূরপুচ্ছ লাগিয়ে নিক, সে ময়ূর হয়ে যায়না। তেমনই তুমিই ছিলে, তুমিই আছো, আর এক ও একমাত্র তুমিই থাকবে।… একবার স্বয়ং ঈশ্বর হয়ে, সমাধি থেকে প্রত্যাবর্তন করলে, এই ভাবই থাকে, যেখানে কনো ‘আমি’ থাকেনা, আর এই ভাবকে বলা হয়, সমর্পণ।
আর পুত্রী, এই চরমে উন্নীত হবার ক্ষেত্রে বাঁধা কি কি? বাঁধা হলেন কল্পনা, কল্পনার থেকে উদ্ভূত চিন্তা ও ইচ্ছা, এবং এই সমস্ত কল্পনা ইচ্ছা ও চিন্তার ধারক অর্থাৎ অহংকার। আর তাই সাধক যদি এই চার শত্রুকে, অর্থাৎ অহংকার বা আমিত্ব, কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছার দমন করতে পারেন, তবে অনায়সেই ব্রহ্মময়ীর সম্মুখে উপস্থিত হতে সক্ষম। আর কৃতান্ত এই অন্তিম সাধনার কথাই বলেছে। প্রাথমিক সাধনার কথা তো মহাভারতে ব্যাস, এবং মার্কণ্ড মহাপুরাণে মার্কণ্ড বলেইছেন। বিচার করার উপায় সম্বন্ধে পিপলাদ উপনিষদে বলেছেন, অন্তিম গন্তব্য সম্বন্ধে শঙ্কর বলে গেছেন। তাই সেই সকল কিছুর সম্বন্ধে পুনরায় বলার কেন প্রয়োজন! তাঁদের ব্যাখ্যার বিস্তার করলেই সেই কাজ হয়ে যায়। কিন্তু যেই সামান্য কথা বলা ছিলনা, তাই বলার জন্য কৃতান্ত”।
দিব্যশ্রী মাঝে বাঁধা দিয়ে বললেন, “কিন্তু মা, এই ভাবের চরমে উন্নীত হওয়া যে, প্রায় অসম্ভব, এমনই বোধ হচ্ছে শুনে। … আর কি কনো দ্বিতীয় মার্গ নেই?”
ব্রহ্মসনাতন মৃদু হেসে বললেন, “আছে তো। … আর সত্য বলতে, আমি স্বয়ং, মার্কণ্ড, রামকৃষ্ণ ঠাকুর, সকলেই সেই পথেই চলে তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হয়েছি। … তবে, আমাদের চলার মধ্যে একটু বিশেষত্ব ছিল, আর বিশেষত্বটি এই যে, আমরা কেউ সেটিকে মার্গ জেনে, সেই মার্গে চলিনি। উপরন্তু, আমরা সকলেই সেই পথে চলে, তাঁকে লাভ করে, তবে জেনেছি যে এমন একটি মার্গও আছে। আর আরো একটি গোপন কথা কি জানো পুত্রী! আমরা মার্গ বলে সেটিকে জানতাম না, তাই তাঁর কাছে যেতে পেরেছি।
মার্গটি হলো মাতৃত্ব। পুত্রী, তিনি জগন্মাতা। না, তিনি পিতা তো কিছুতেই নন, কারণ তাঁর স্বভাব পিতার সাথে মেলে না। তাঁর শিক্ষা দেবার পদ্ধতি, তাঁর স্নেহ করার পদ্ধতি, তাঁর আশকারা দেবার পদ্ধতি, তাঁর প্রেম ও মমতা প্রসারের ধারা, আর তাঁর সম্পূর্ণ নিষ্কাম ভাব, এটি কনোটিই পিতার সাথে মেলে না, এক ও একমাত্র শ্রেষ্ঠ সম্ভব মাতার সাথে মেলে।
তিনি সমস্ত রূপেই মা। নিয়তি বেশেও সর্বসকলের একমাত্র জননী; মহাকালী বেশেও তিনি সর্বসকলের দিবারাত্র দেখভাল করা কালনিয়ন্তা রূপে জননী, আর প্রকৃতি বেশেও তিনি সর্বক্ষণ সকলকে স্নেহ প্রদানে জননী।
হ্যাঁ, তিনি পিতা তো ননই, কেবল ও কেবল মাতা। পিতার পুত্র সন্তান চাই, পুত্রীসন্তান হলে মুখ ফিরিয়ে নেন; গৌর বর্ণের সন্তান চান, শ্যাম বর্ণের হলে মুখ ফিরিয়ে নেন; কিন্তু মাতা! … মাতা যে সাদা কালো, পুত্র কন্যা, কনো কিছুই দেখেন না। যে যেরকমই হন না কেন, তিনি তাঁর জননী, আর তিনি তাঁকে স্তনদান করেন।
পিতার নেশামুক্ত সন্তান চাই, বাধ্য সন্তান চাই, তাঁর ইচ্ছামত চলা সন্তান চাই। কিন্তু মাতা! নেশা করেছে বলে পিতা সন্তানকে ভাত দিতে না বললেও, মাতা লুকিয়ে লুকিয়ে ভাত দেন, আর বলেন দেখিস বাবা রাগারাগি করে, তারপরেও ওইসব ছাইপাঁশ কেন গিলিস! সন্তান অবাধ্য হলে, পিতা বলেন বাড়ি থেকে বার করে দেব, মাতা বলেন যা আমি তোর সাথে কথা বলবো না, কিন্তু বাড়ি থেকে বার করে দেবার কথা মাতা মুখেও আনতে পারেন না।
পিতা যদি বাড়ি থেকে বার করেও দেয় সন্তানকে, মাতা ঠিক সন্তানের দেখভাল করতে থাকেন। কারুকে না কারুকে বলে, সন্তানের কাছে আহারের সামগ্রী দিতে থাকেন। ছেলে যখন বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র যায়, মা অনেক ধরনের রান্না করে ছেলের সাথে দিয়ে দেয়। বাবা বলেন, কত খাবে একা! এত কিছু কেন দিচ্ছ! … মা ছেলের থেকে লুকিয়ে স্বামীকে বলেন। সব বন্ধুরা ভাগ বসাবে। সবাইকে দিয়ে তো আমার বাবু খেতেই পাবে না, তাই বেশি করে দিলাম।
সংসার দুর্বিপাকে পরলে, বাবা সন্তানকে অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করে দিতেও পিছুপা হননা, কিন্তু মাতা! … মাতা নিজে বেশ্যা হয়ে যান, নিজেকে নিজে বিক্রি করে দেন, তাও সন্তানের গায়ে একটি আঁচও পরতে দেন না। যদি দেখেন যে কিছুতেই কিছু হচ্ছে না, আত্মহত্যাই একমাত্র উপায়, তবে আগে নিজের সন্তানকে হত্যা করেন, তারপরে নিজেকে হত্যা করেন, কারণ তিনি জানেন, তাঁকে ছাড়া তাঁর সন্তান একদণ্ডও বাঁচতে পারবেন না।
জগদম্বার সমস্ত স্বভাব ঠিক এমনই। তিনিই সত্য, সমস্ত সন্তান তাঁর স্বেচ্ছায়, তাঁকে ত্যাগ করে স্বয়ম্ভু হয়েছেন, তাঁকে ভুলে রয়েছেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই একদণ্ডও সন্তানদের থেকে পৃথক থাকেন না। নিয়িতি বেশে, কালী বেশে, প্রকৃতি বেশে, নিরন্তর সেবা করে চলেন প্রতিটি সন্তানের। নিরন্তর মার্গদর্শন করতে থাকেন।
সেই সমস্ত মার্গদর্শনের পরেও, মাতার কথা কারুর মনে পরে না, সকলে নিজেদের অহমকে প্রতিষ্ঠিত করতেই ব্যস্ত। তাহলেও তিনি মাতা। তাই সেই অহমকে প্রতিষ্ঠা করারই মার্গদর্শন করতে থাকেন, আর বলেন যদি এই করেই তুই সুখী, তাহলে তোর মা-ও এই ভাবেই সুখী। সন্তানের সুখেই মাতা সুখী।
বিরক্ত হয় তাঁর সন্তানেরা, কারণ তাঁদের কল্পনাকে প্রকৃতি, সময় বা নিয়তি কেউ মান্যতা প্রদান করেনা। গালমন্দ করে সন্তানরা তাঁদের মাতাকে, তিরস্কার করতেও ছাড়েনা, অপমান তো করেই। কিন্তু মা যে তিনি, শত তিরস্কার, শত অপমান, শত গালমন্দ হজম করে নেন, কিন্তু বলতে ছাড়েন না যে, বাছা, তোমার একার কল্পনাতে তুমি প্রতিষ্ঠা পাবেনা। যখন তোমার কল্পনার সাথে জড়িত সকলের কল্পনার সাথে তোমার কল্পনাকে মিলিয়ে নিতে পারবে, তখনই তোমার কল্পনা ফলিভুত হবে, আর তুমি প্রতিষ্ঠা পাবে।
প্রতিষ্ঠা লাভ করলে, সন্তান অহংকারে বশীভূত হবে, আর অহংকারে বশীভূত হলে, যেই মাতাকে এখন ভুলে রয়েছেন, সেই মাতার থেকে আরো দূরে চলে যাবেন। কিন্তু মাতা তিনি, তাই তো সন্তান সেই অহংকার করেই আনন্দ পাচ্ছে, তাই মাতাও সেই মার্গই তাঁকে দেখাচ্ছেন। তাঁর নিজের কিচ্ছু চাওয়াপাওয়া নেই। হ্যাঁ, দিনান্তে সকলে তাঁর সন্তান হয়েও, তাঁর ক্রোড় খালি, তাই বেদনা অবশ্যই আছে। কিন্তু সন্তান সুখে থাকছে, তাই মাতাও সন্তানের সুখে সুখী বলে মানিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে।
পুত্রী, ইনি কখনোই পিতা হতে পারেন না। পিতা নিজের সুখের জন্য সন্তানকে রেসের মাঠের ঘোড়াও করে দিতে পিছুপা হননা। অন্যদিকে মাতা সন্তানের সুখের জন্য নিজেকে ঘোড়া করে রেসের মাঠে স্বয়ং দৌড়াতেও ছাড়েন না। … আমাদের জগদম্বা ঠিক এমনই। জন্ম জন্মের মা তিনি। নিজের সন্তানদের মার্গদর্শন প্রদানের জন্যই, স্ত্রীদের জননী করেন তিনি, তাঁদের গর্ভবতী করেন তিনি, আর তাঁদের মাতৃত্বের সুখ প্রদান করে, তাঁরই সন্তানদের তাঁদের ক্রোড়ে রেখে দেন, ঠিক যেমন কৃতিকাদের কাছে দেবী পার্বতী স্কন্ধকে রেখে দিয়েছিলেন।
তাই জননী এক ও একমাত্র তিনি। অন্য সমস্ত জননীও আমাদের জননী, কারণ তাঁর সন্তানকে তাঁরা ধারণ করে, আমাদের পালন করেন সেই জননীরা। কিন্তু আমাদের সকলের প্রকৃত জননী? এক ও একমাত্র ব্রহ্মময়ী, যিনিই কারণবেশে নিয়তি, সূক্ষ্ম বেশে কালী, আর স্থূল বেশে প্রকৃতি। …
পুত্রী, যখন এই ভাব ঠিক ঠিক অন্তরে বসবে, আর নিজের সমস্ত ভূত অর্থাৎ মন, বুদ্ধি, দেহ, প্রাণ ও উর্জ্জা, সমস্ত চতুর্বিংশতি তত্ত্ব, সমস্ত ত্রিগুণ, বিচার, বিবেক সার্বিক ভাবে এই সত্যকেই মানবে, বিনা কনো নাট্যে, বিনা কনো প্ররোচনায়, বিনা কনো প্রকার অছিলায়, বিনা কনো প্রকার শর্তে, বিনা কনো প্রকার প্রমাণ করার প্রয়াসে, তখনই ব্রহ্মাণু তাঁর আভাস লাভ করেন, কারণ তখন সমস্ত বাঁধা স্বতঃই ব্রহ্মাণুর থেকে সরে যায়।
তখন ব্রহ্মাণু ঠিক ঠিক অনুভব করেন যে সমস্ত জীব, সমস্ত অজীব তাঁর জননীই, তাঁর গুরুই, কারণ তাঁর মা যে অনন্ত, তাঁর মা-ই যে সমস্ত কিছু হয়ে উপস্থিত রয়েছেন, তাঁকে স্নেহদানের জন্য। আর যখন এই অনুভব হয় ব্রহ্মাণুর, তখন গরু, ছাগল, হাতি, কুমির, মাছি, মৌমাছি, ঝিনুক, শামুক, কাক, চিল, অজগর, বিছা, এমনকি পাথর, উদ্ভিদ, বট, দূর্বা, সমস্ত কিছুই তাঁর গুরু হয়ে ওঠে, কারণ সমস্ত কিছুই যে তাঁর মা।
ছোট বড়, গরিব বড়লোক, অন্যসম্প্রদায়ের মানুষ, আদিবাসী, বর্বর, উন্মাদ, অভয়লিঙ্গ, সকলে তাঁর গুরু হয়ে ওঠে, সম্যক প্রকৃতি তাঁর গুরু হয়ে ওঠে, কারণ তাঁর জননীই যে সর্বস্ব কিছু হয়ে রয়েছেন। তাই সকলের সমস্ত কথার থেকে তিনি শেখেন, সমস্ত কিছুর থেকে তিনি স্নেহ লাভ করেন। সকলেই তাঁর জ্যেষ্ঠ। প্রতিটি কালের মুহূর্ত থেকে তিনি শেখেন, কারণ তাঁর জননী যে স্বয়ং মহাকালী। প্রতিটি পরিস্থিতি থেকে তিনি শেখেন, কারণ তিনি জানেন যে নিয়তিই সমস্ত পরিস্থিতির কারক, আর নিয়তি যে তাঁর জননী, ব্রহ্মময়ী মা।
আর সেই শিক্ষা পেতে পেতে, সে কখন যে সর্বজ্ঞ হয়ে ওঠে, আর কখন যে ঈশ্বরীর সম্মুখে পৌঁছে গিয়ে তাঁর সমাধি হয়ে যায়, সে নিজেই জানতে পারেনা। সে কি সাধনা করেনা! সে ভয়ানক সাধনা করে, সমস্ত জীব, অজীবের থেকে শিক্ষা গ্রহণের সাধনা, প্রতি পলকে শিক্ষা গ্রহণের কঠিন সাধনা। কিন্তু তাও তিনি সাধনা করেন না। কেন? কারণ তিনি তো কেবল নিজের মাতার প্রেমের আস্বাদন করতে সমস্ত কিছু শিক্ষা গ্রহণ করেন, শিক্ষা গ্রহণ করে পণ্ডিত হবেন বলে নয়।
বুঝতে পারছো পুত্রী, শিক্ষালাভ তাঁর কাছে নিজের জননীর প্রেম আস্বাদন হয়, অন্য কনো ভাব, অর্থাৎ পণ্ডিত হবার ভাব, জ্ঞানী হবার ভাব, কনো কিছু তাঁর অন্তরে থাকেই না। সত্য বলতে এই যে, তাঁকে অন্যরা জ্ঞানী বললে, তবে তিনি জানতে পারেন যে তিনি জ্ঞানী হয়েছেন, তার পূর্বে তিনি জানতেও পারেন না যে তিনি জ্ঞানী হয়েছেন, কারণ তিনি যে জগন্মাতার স্মেহ ও প্রেম আস্বাদনেই মত্ত ছিলেন।
অর্থাৎ শিক্ষা গ্রহণই উদ্দেশ্য নয়, আত্মকে ভুলে যাওয়াই উদ্দেশ্য। জ্ঞানলাভ সাধনা নয়, ভক্তিলাভও সাধনা নয়, পুণ্যলাভও সাধনা নয়, কনো কিছুই সাধনা নয়। সাধনা একমাত্র নিজেকে ভুলে যাওয়াতে। আর যিনি জগন্মাতাকে নিজের প্রকৃত মাতা, আর সকল জীব, সকল অজীবকে তাঁরই প্রতিচ্ছবি, প্রতিনিধি জ্ঞানে, সমস্ত কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকেন আর মাতার প্রেমকে আস্বাদন করতে থাকেন, তিনি সেই প্রেম আস্বাদনের নেশায়, কখন যে নিজের পঞ্চভূতের খেয়াল রাখতে ভুলে যান, নিজের ত্রিগুণের খেয়াল রাখতে ভুলে যান, সেটিই ভুলে যান, কারণ তিনি যে নিজের নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছেন।
তাই এই হলো সেই সাধন, যার দ্বারা সমস্ত আমির নাশ হয়, আর তা স্বতঃই হয়, কনো প্রয়াস ছাড়াই হয়, আর সেই সাধনাই আমাকে দিয়ে করিয়েছেন মাতা, রামকৃষ্ণ ঠাকুরকে দিয়ে করিয়েছেন, মার্কণ্ডকে দিয়ে করিয়েছেন, আর সহজ উদ্ধারের মার্গ প্রশস্ত করে রেখেছেন সমাজে।
আর পুত্রী, এই যে কৃতান্তে কর্তার অন্ত দেখো, এই হলো সেই কর্তার অন্ত হবার উপায়। যখন সমস্ত কল্পনা, ইচ্ছা, চিন্তাই দূর হয়ে যায় অন্তর থেকে, তখন স্বতঃই কর্তার নাশ হয়ে যায়, আর সেই ক্ষণের খবরও থাকেনা আমাদের কাছে।
পুত্রী, এই কালে আমরা কনো কল্পনা করতে পারিনা, আর সত্য বলতে কল্পনা করার প্রয়োজনও বোধ করিনা, কারণ আমাদের কাছে একটি ব্যাপার প্রত্যক্ষ হয়ে গেছে যে, আমাদের জননী সর্বক্ষণ আমাদের খেয়াল রাখেন, রাখছেন, মার্গ দর্শন প্রদান করেন সকলের চরণ দিয়ে, সকলের বচন দিয়ে, সকলের কর্ম দিয়ে, স্বয়ং সময়কে সম্মুখে স্থাপন করে, পরিস্থিতি নির্মাণ করে।
তাই কল্পনার প্রয়োজনই বোধ হয়না, কেবলই সময়কে, পরিস্থিতিকে, এবং প্রকৃতিকে প্রত্যক্ষ করতে থাকি, মার্গদর্শন লাভ করতে থাকি, আর তাঁর শাবকের ন্যায় জীবনযাপন করতে থাকি। প্রত্যক্ষ হয়ে গেছে আমাদের কাছে যে, আমাদের ইচ্ছা করার কনো মানেই হয়না, কারণ আমরা আমাদের ভালো যা বুঝি, তার থেকে ঢের ভালো বোঝেন আমাদের মা, আর তিনি সর্বক্ষণ তাই সম্মুখে রাখছেন, যা আমাদের জন্য আবশ্যক। আর তাই এটি লাভের ইচ্ছা, ওটি যাতে না হারিয়ে যায় সেই ইচ্ছা, কনোরূপ ইচ্ছার কনো প্রয়োজনই অবশিষ্ট থাকেনা।
আর অন্তে চিন্তা! চিন্তা কি জন্য করা হয়? আমার কিসে ভালো, কিসে মন্দ, কি করলে আমার ভালো হবে, আমার প্রিয়জনদের ভালো হবে, কি করলে আমার বা আমার প্রিয়জনদের মন্দ হবে, এই নিয়েই তো চিন্তা! … ওই যে বললাম, আমাদের জননী আমাদের কিসে ভালো, কিসে মন্দ, সেই বিষয়ে আমাদের থেকে ঢের ভালো বোঝেন, জানেন, আর নিরন্তর তা আমাদের সম্মুখে আনতে থাকেন। তাই চিন্তার ও প্রয়োজন নেই।
আর পরে রইল অহং বা আমিত্বের বোধ, তাই তো! … পুত্রী, এই আমিত্বের বোধ তো জন্মই নিয়েছিল আমাদের কল্পনার কারণে। কল্পনা না থাকলে যেই ব্রহ্মের ছেদনই সম্ভব নয়, তাঁর অণুর ভান কি করে আসবে আমাদের কাছে! … কিন্তু যখন কল্পনাই নেই, যখন কল্পনার দুই হস্তস্বরূপ, চিন্তা ও ইচ্ছাই নেই, তখন আর অহং-এর ভানই বা কি করে থাকতে পারে।
সম্যক ভাবে এই ভাবই বিনষ্ট হয়ে যায় যে আমি কর্তা, আমি কিছু করি, আমাকে কিছু করতে হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা স্পষ্ট বুঝে গেছি যে, না তো কনো কালে আমরা কর্তা ছিলাম, আর না কর্তা হওয়া আমাদের পক্ষে বা কারুর পক্ষে সম্ভব। কর্তা ভাব স্বয়ংই একটি মহাভ্রম। আর আমাদের কনো দ্বন্ধ থাকেনা এই বিষয়ে, কারণ আমরা যে আমাদের পৃথক অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে ফেলেছি। এক আমাদের জননী আছেন, আর কেউ নেই, আর কিচ্ছু নেই, আর কিচ্ছু সম্ভবই নয়, আর সমস্ত কিছুই ভ্রম, সমস্ত কিছুই কল্পনা, অলিক কল্পনা, অসত্যের বিস্তার।
আর এই কথা বলার জন্যই কৃতান্ত। কৃতান্ততে কি দেখবে তুমি? এই দেখবে যে বলা হয়েছে এক মাতা সর্বাম্বাই কল্পনা, চিন্তা ও ইচ্ছার নাশ করতে সক্ষম, আর তা করার জন্য, তাঁকে কিচ্ছুটি করতে হয়না। তাঁর সম্মুখে সম্যক ভাবে কল্পনা, ইচ্ছা ও চিন্তা দণ্ডায়মান হলেই, তাঁরা চিরতরে ভস্ম হয়ে যায়। কেন এমন বলা হলো?
কারণ আমরা যে কর্তা নই। আমরা নিজের ইচ্ছা করে ইচ্ছাকে নষ্ট করতে পারি কি করে? কল্পনার নাশ করবো আমরা, সেও যে এক কল্পনা, তবে কল্পনার নাশ হলো কি করে? চিন্তার নাশও এক চিন্তা, তাহলে চিন্তার নাশ হলো কি করে? আমরা কিচ্ছু করতে পারিনা, আমরা কেবল সমর্পণ করতে পারি, আমাদের সেই মায়ের কাছে সমর্পণ করতে পারি, যিনি একমাত্র অস্তিত্ব, যিনি সর্বক্ষণ নিয়তি, কালী, ও প্রকৃতি বেশে আমাদের দেখভাল করে চলেছেন, অনলস ভাবে, নিরন্তর ভাবে।
তাই আমরা কেবলই নিজেদেরকে সমর্পিত করতে পারি, মা সর্বস্ব হয়ে উঠতে পারি। আর যদি তা হতে পারি, যদি এই মা সর্বস্ব হওয়ার মধ্যে কনো প্রকার ছলনা, নিয়ম পালন, বা কনো কিছু বিধিবিধান না থাকে, শুধুই প্রেম থাকে, তবে স্বতঃই আমরা কালের থেকে, প্রকৃতির থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে করে, একসময়ে আমাদের কর্তার থেকে মুক্ত হয়ে যেতে পারি, আর যাই তেমন হই, তাই, কল্পনা, চিন্তা আর ইচ্ছাকে পরমসত্যের সম্মুখে স্থিত করতে পারি। আর যেহেতু তাঁরা ভ্রম মাত্র, তাই সত্যের দর্শনমাত্রেই তাঁরা ভস্মীভূত হয়ে যায়।
আর রইল তোমার পরবর্তী কথা? বনবাসে যাওয়া কি তবে আবশ্যক? পুত্রী, মা কি বনে থাকেন, শহরে থাকেন না বা গ্রামে থাকেন না, বা অট্টালিকায় থাকেন না, বা আকাশে থাকেননা, মাটির তলায় থাকেন না, এমন কনো ব্যাপার আছে? মা যে সর্বত্রই মা, মা যে সর্বক্ষণই মা, মা যে সমস্ত অবস্থাতেই মা।
তাই প্রয়োজন নেই গৃহত্যাগের, প্রয়োজন নেই বনবাসের। প্রয়োজন এই বিশ্বাসের যে, জগন্মাতাই আমাদের একমাত্র মা, আমাদের জন্মজন্মান্তরের মা। আর প্রয়োজন বৈরাগ্যের, অর্থাৎ সম্মুখে যা আসবে, তাই সাগ্রহে গ্রহণ করা। কেন? কারণ আমাদের মায়ের কনো অণু হয়না, সমস্ত অণু, যারা নিজেদের অণু বলছেন, ব্রহ্মাণু বলছেন, তাঁরা যে ব্রহ্মাণু, সেটি তাঁদের ভ্রম, বাস্তবে তাঁরা ব্রহ্ম স্বয়ং, অর্থাৎ আমাদের মা স্বয়ং।
আর তিনি সর্বক্ষণ সমস্ত অণুর রূপে, কালের রূপে, আমাদের যা প্রয়োজন তা প্রদান করেই চলেছেন, যা করা আবশ্যক সেই পরিস্থিতি প্রদান করেই চলেছেন। তাই সমস্ত কিছুই আমাদের মায়ের নির্দেশ, সমস্ত কিছুই আমাদের মায়ের মার্গদর্শন এই স্পষ্ট ধারণা নিয়ে, বৈরাগ্য ধারণ করে, যা সম্মুখে এসেছে, বিনা বিচারে তা গ্রহণ করা আবশ্যক, আর যা সম্মুখে আসেনি, তা বিনা বিচারে বর্জন করা উচিত।
বিনা বিচারে কেন? কারণ বিচার আবশ্যক হলে, বিচারই প্রদান করতেন আমাদের মা। যখন বিচার করে, আমরা মীমাংসায় উপস্থিত হতে সক্ষম, তখন তিনিই আমাদের অন্তরে বিচার প্রদান করেন। এঁর অন্যথা নিজেকে কর্তা সাজিয়ে বিচার করতে যাওয়ার অর্থ, আমরা আমাদের সেই মা, যিনি আমাদের উদ্ধারের জন্য, যিনি আমাদের ভ্রমের নাশের জন্য, যিনি আমাদের প্রেমদানের জন্য নিরন্তর অনলস পরিশ্রম করে চলেছেন, তাঁর সেই পরিশ্রমকেই আমরা অপমান করছি।
তাই পুত্রী, সংসার ত্যাগের কনো আবশ্যকতা নেই। যা প্রয়োজন তা হলো, সম্মুখে যা আসছে তাই গ্রহণ করা, পরিস্থিতি যেই যোগদান আমাদেরকে প্রদান করতে বলছে, সেই যোগদান প্রদান করা। যদি সাধক এটুকু করে, নিজের মাতাকে স্মরণ রেখে, অনায়সে তাঁর সাধনা সপ্তমে উঠবে, এবং অনায়সে তাঁর সাধনা পূর্ণ হয়ে, তাঁকে মোক্ষ প্রদানও করবে। এই কথা বলার জন্যই কৃতান্ত পুত্রী”।
