মহারণ (গুপ্ত ইতিহাস)
ব্রহ্মসনাতন হাস্য বদনে বললেন, “বেশ পুত্রী, আমি তাহলে সেই আত্মকথার শুরু করছি তোমার কাছে। মনোনিয়োগ করে শোনো, কারণ তোমাকে বলতে হবে যে এটি কার আত্মকথা। একটি রাজ্য, অর্থাৎ একটি ব্যক্তি। তাঁর আত্ম বা অহম হলেন তাঁর রাজা। সেই রাজা দুর্বল হলেও, শাসকরূপে প্রজার খুব পছন্দের, কারণ তাঁর মনপ্রান প্রকৃতিকেন্দ্রিক।
কিন্তু সেই আত্মের আরো এক মুখ থাকে, যা লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হয়, কারণ সে অত্যন্ত আত্মকেন্দ্রিক, অর্থাৎ কেবল স্বয়ংকে প্রত্যক্ষ করতে পারেন, বাকি সমস্ত ক্ষেত্রে তিনি অন্ধ। এই আত্ম বা রাজা একসময়ে মৃগয়া গেলেন, অর্থাৎ আনন্দউৎসবে মাতলেন, আর সেই আনন্দ উৎসবে মাতোয়ারা থাকাকালীন, তিনি একটি অপকর্ম করে ফেললেন।
অপকর্মটি কি? অপকর্মটি হলো একটি শিক্ষকের অপমান করে ফেললেন তিনি। আর তাই সেই শিক্ষক রাজাকে বললেন যে, বাছা তুমি আমাকে নয়, এক শিক্ষককে অপমান করেছ। শিশু তুমি, তাই, অজ্ঞানতা বশেই সেই অপমান করেছ। কিন্তু অপমান তো অপমানই হয়। আর যেহেতু তুমি শিশু, তাই তুমি অপমানের জ্বালা কি, তা বুঝতেই পারছ না। যেদিন প্রথমবার অপমানের জ্বালা অনুভব করবে, সেদিনকেই তোমার মৃত্যু হবে।
রাজা বললেন, একি বললেন আচার্য! … আমি যে এক রাজা! … পীড়া সহ্য করলে, তবেই যে সন্তানপ্রাপ্তি হয়। আর অপমানের থেকে শ্রেষ্ঠ পীড়া কিই বা হতে পারে! … আপনি আমাকে অপমান সইতে না পারার অভিশাপ দিয়ে দিলেন, তাহলে আমি সন্তানের পিতা হবো কি করে? আর তা যদি না পারি, তবে আমার রাজ্যকে উত্তরাধিকার কি ভাবে দেব?
কিন্তু রাজার এই কথার আর কনো উত্তর এলো না, কারণ তাঁর সেই শিক্ষক অপমানের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে, দেহত্যাগ করে দিয়েছেন। … দুখী রাজা, দুঃখের সাথে রাজ্যে প্রত্যাবর্তন করে দুঃখের সাথে ঘোষণা করলেন যে, তাঁর দ্বারা এক মহাপাপ হয়ে গেছে, তিনি এক শিক্ষককে অপমান করে ফেলেছেন। তাই তাঁর এই অপকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করতে তাঁকে বনবাসে যেতে হবে।
রাজা গেলেন বনবাসে, আর আত্মকেন্দ্রিক আত্মরূপ, অর্থাৎ সেই রাজার এক অন্য মুখ এবার রাজসিংহাসনে আঢ়ুর হলেন। পূর্বের রাজা মনোদুঃখে বনবাসী হলেও, প্রকৃতির প্রতি আকৃষ্ট ভাব তাঁর অক্ষুণ্ণই থাকে, কারণ তিনি তো আত্মকেন্দ্রিক নন, অন্ধ নন। তাই প্রকৃতি একদিন তাঁর সম্মুখে এসে বললেন, রাজন, তুমি কেন চিন্তিত?
আত্ম বললেন, দেবী আর আমি রাজন নই। আমি রাজ্য ত্যাগ করে এসেছি। আমি এখন শুধুই আপনার সন্তান। হ্যাঁ স্বয়ং নিঃসন্তান, তাই দুখী, কিন্তু আপনার সান্নিধ্য লাভে খুশী।
প্রকৃতি বললেন, আমি থাকতে আমার প্রতি অনুগত সন্তানকে আমি দুখী কিভাবে থাকতে দিই? বলো রাজন, তুমি কেমন সন্তান চাও। আমি তোমাকে ততগুলি সন্তান প্রদান করবো, তেমন তেমন সন্তান প্রদান করবো, যেমন যেমন তুমি চাইবে। আর আমার বচন স্মরণ রেখো রাজন, এই সন্তানরাই রাজাসন গ্রহণ করবে একসময়ে।
আনন্দিত আত্ম বললেন, দেবী, যদি আমার সন্তানই রাজাসনে স্থপিত হয়, তবে তো প্রজার কল্যাণ উদ্দেশ্যে, সেই সন্তানকে অসীমিত ধৈর্য থাকতে হবে! দেবী আমাকে সেই সন্তানই প্রদান করুন। … দাঁড়ান দাঁড়ান, কৃপা করে অপেক্ষা করুন। কেবল ধৈর্য থাকলেই তো আর প্রজাশাসন সম্ভব হবেনা, শত্রুর থেকে রাজ্যকে সুরক্ষাও প্রদান করতে হবে। সেই ক্ষেত্রে তো সাহস আর জেদেরও প্রয়োজন। … কিন্তু… বিদ্যা আর কৌশল ছাড়া, সাহস, জেদ, বা ধৈর্য ধারণ করে আমার সন্তান অবস্থান করে, তবে তাঁকে অসৎ সংসর্গেও পরতে হতে পারে। তাই দেবী, আমাকে একটিই সন্তান প্রদান করুন যিনি একাধারে ধৈর্য, জেদ, সাহস, বিদ্যা ও কৌশল সম্পন্ন হবে।
প্রকৃতি হাস্যবেশে বললেন, পুত্র একই দেহে এতগুণ প্রদান করা সম্ভব নয়। তাই আমি তোমাকে পাঁচ সন্তান প্রদান করলাম, তোমার কথিত পাঁচ গুণদ্বারা সুসজ্জিত করে।
আত্ম বললেন, দাঁড়ান দেবী। একটি কথা বলুন আমাকে। আপনার প্রদত্ত সন্তান তো আমার ভ্রাতা হবে, আমার সন্তান কি করে হবে তাঁরা? আপনিও আমার জননী, আর তাঁদের জননীও আপনিই!
প্রকৃতি হেসে বললেন, রাজন, রাজা হয়েও এ কেমন মূর্খের ন্যায় কথা বললে তুমি! … ভূপতি তুমি। ভূদেবী তোমাকে সন্তান প্রদান করবেনা তো কে করবে? … রাজন, এই ভূমিকে রাজা হয়েও প্রত্যক্ষ করলে না এতদিনে! এই ভূমি একাধারে মাতা ও স্ত্রী। … এই বৃক্ষকে দেখ রাজন, এর জননী আমি অর্থাৎ ভূমি। আবার এঁর বীজকে আমিই আমার গর্ভে ধারণ করে, সেই বীজের থেকে উৎপন্ন বৃক্ষেরও জননী আমি। তা আমি যদি পত্নী না হতাম, তাহলে এই বৃক্ষের বীজকে নিজের গর্ভে কেন ধারণ করতাম!
রাজন আর কনো কথা বললেন না, পঞ্চসন্তান লাভ করলেন। কিন্তু অন্তরে অন্তরে ভূমিদেবীর কটুবাক্যে অপমানিত বোধ করলেন। নিজের অন্তরে বললেন, সত্যই তো আমি অযোগ্য ভূপতি, ভূপতি হয়ে এই সহজ সত্য আমি জানতে পারলাম না যে, ভূমিই জননী, আর ভূমিই পত্নী! এই সহজ সত্য উপলব্ধি করতে পারলাম না যে, যেই মাতা, সেই পত্নী! পত্নীও মাতারই আরেক স্বরূপ! আরেক প্রবাহ! আমি তো সত্য সত্যই রাজা হবার যোগ্য ছিলামনা।
এমন যখন আত্মদংশন করছিলেন রাজন, তখন আচম্বিক তাঁর মধ্যে অপমানের জ্বালার উদ্বেগ হয়, আর রাজন মৃত্যুর মুখে পতিত হয় অন্তিমকালে শিক্ষকের প্রদত্ত অভিশাপকে স্মরণ করতে করতে। পিতার প্রয়াণে, পিতৃহারা সন্তানদের প্রকৃতি কি করে পরিত্যাগ করতে পারেন। তাই পৃথিবী তাঁদের দেখভাল করতে শুরু করলেন।
অন্যদিকে যখন পূর্বরাজার পঞ্চসন্তানের জন্ম হচ্ছে, এই বার্তা বর্তমান অন্ধ রাজা, অর্থাৎ আত্মকেন্দ্রিক আত্ম জানতে পারেন, তখন তাঁর আত্মকেন্দ্রিক ভাবনা সঙ্কটাপন্ন হয়ে যায়। তিনি বিচার করতে থাকেন যে, প্রাক্তন রাজার সন্তানই তো রাজ্য ও রাজত্ব দাবি করবে এসে! … তখন কি উপায়ে তাঁদেরকে অপসারিত করা যাবে রাজ্যের ভার প্রদান করা থেকে! …
এমন বিচার করে, ভূমিদেবীর উদ্দেশ্যে অন্ধরাজা বললেন, হে ভূমিদেবী! এ তোমার কেমন একচোখোমি! তুমি প্রাক্তন রাজাকে সন্তান দিলে, আর বর্তমান রাজাকে নিঃসন্তান রেখে দিলে! … আমাকেও সন্তান দিতে হবে। আমি ভূপতি, তোমার পতি আমি। তোমাকে আমার আদেশ মানতেই হবে। আমাকে সন্তান প্রদান করতেই হবে। …
ভূমিদেবী সম্মুখে প্রকাশিত হয়ে বললেন, আমি পত্নী হবার সাথে সাথে জননীও। কিন্তু তোমার পত্নীকে মনে পরল, কিন্তু জননীকে মনে পরল না! তো বেশ, আমি তোমাকে সন্তান প্রদান করবো। তোমার সমস্ত পূর্বজন্মের স্বরূপ আমি তোমাকে প্রদান করবো, এবং এই জন্মের স্বরূপও আমি তোমাকে প্রদান করবো। আর তাই তোমাকে আমি এক শত একটি সন্তান প্রদান করছি। তবে আমার কথা স্মরণ রেখো, তোমার কনো সন্তানই, তোমার ভাব অনুসারেই, কখনোই মাতৃত্বের কদর করবে না। রাজা ও রাজপুত্রের কাছে রাজ্য হলেন জননী। আর তোমার সন্তানরা কখনোই এই রাজ্যের কদর করবেনা। কিন্তু যখন এই রাজ্যের উপর, তাঁদের মাতার উপর তাঁরা জোর করে অধিকার স্থাপনের প্রয়াস করবে, তখনই তাঁদের বিনাশ হবে।
এত বলে, এক শত একটি সন্তান প্রদান করলেন প্রকৃতি অন্ধরাজাকে। কেউ ক্রোধ, তো কেউ লোভ; কেউ হিংসা, তো কেউ শঙ্কা; এমন ভাবে মহাবলশালী একশত পুত্র, এবং একটি কুটিল কন্যা লাভ করলেন অন্ধরাজা।
রাজ্যকে সুরক্ষিত রাখার জন্য, কুলগুরু রূপে প্রাণ তো ছিলই অন্ধ অহমের কাছে, এবার পুত্রীর বিবাহ দিলেন জলতত্ত্ব, অর্থাৎ বুদ্ধির সাথে, এবং রাজ্যকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করে নেবার প্রয়াস করলেন। কিন্তু এরই মধ্যে, রাজ্যের সত্ত্বা প্রথম রাজার পঞ্চপুত্রকে নিয়ে এলেন রাজ্যে, এবং একশত পাঁচ রাজপুত্রকে প্রাণের সম্মুখে অর্থাৎ কুলগুরুর সম্মুখে রেখে শিক্ষা প্রদান করতে শুরু করলেন।
সেই শিক্ষাপ্রদানের কিছুকাল পরে, প্রাণবায়ু সত্ত্বার সম্মুখে এসে বললেন, আমার যা শেখানোর ছিল, তা শিখিয়ে দিয়েছি। এবার রাজপুত্রদের শ্রেয় কনো গুরুর প্রয়োজন।
সেই কথা শ্রবণ করে, সত্ত্বা চিন্তা করলেন, উদরের কথা। বিচার করলেন তিনি যে, উদরের থেকে শ্রেষ্ঠ গুরু কে হতে পারে! উদরচিন্তাই জীবকে সর্বস্ব শিক্ষা প্রদান করে। … যেমন ভাবা তেমন কাজ। উদর হলেন রাজকুমারদের পরবর্তী গুরু। প্রশিক্ষণ প্রদত্ত হলো, পঞ্চ সৎগুণ অসামান্য শক্তিধর ও মেধাধর হয়ে উঠলেন, আর সাথে সাথে অন্ধরাজার একশত পুত্রের জন্য চিন্তারও কারণ হয়ে উঠলেন।
আর তাই নিজেদের শক্তিবৃদ্ধি করার দিকে মনযোগী হলেন অন্ধরাজার একশত পুত্র। শক্তিবৃদ্ধির মধ্যে প্রথম যার সাথে মিত্রতা করলেন, তিনি হলেন গুরুপুত্র, অর্থাৎ উদরের সন্তান উর্জ্জা বা অগ্নি। একদিকে ভগ্নীপতিরূপে বুদ্ধি বা জলতত্ত্ব রয়েছে, অন্যদিকে সখারূপে রইল উর্জ্জা বা অগ্নিতত্ত্ব। কুলগুরু রূপে প্রাণবায়ু বা পবন তো রয়েছেই তাঁদের সাথে, মাতার বেশে ধরিত্রীও রয়েছে। কেবল সত্ত্বা আর মন বা আকাশতত্ত্ব তাঁদের সাথে নেই।
এই সমস্ত কিছুর সাথে রয়েছে তাঁদের পরমমিত্র মহাত্মাকাঙ্ক্ষা, যে শূদ্র হয়েও মহাবীর। কিন্তু এই সমস্ত কিছু থাকা সত্ত্বেও, শঙ্কা থাকে সত্ত্বাকে নিয়ে। সত্ত্বা কিছুতেই পঞ্চসৎগুণের সঙ্গ ছাড়বে না। আর তারা যদি না ছারে সেই সঙ্গ, তাহলে কিছুতেই ধরিত্রীদেবী আর প্রাণবায়ুও তাঁদের সঙ্গ ছাড়বে না।… অর্থাৎ প্রয়োজন একচ্ছত্রের। তা কি করে সম্ভব?
যদি গুরুদেবের প্রিয়শিষ্য হওয়া সম্ভব হয়, তবে সত্ত্বা তাঁদের অনুগামী হয়ে উঠবে। এমন বিচার করে গুরুদক্ষিণা দেবার পণ নিয়ে গুরুদেব উদরের সম্মুখে গেলেন আত্মকেন্দ্রিক অহমের একশতপুত্ররা।
কিন্তু এখানে উদরের আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতার সম্মুখীন হলেন তাঁরা। উদর বললেন, হৃদয় দেশে যাও, আর হৃদয়ের নৃপতিকে ধরে নিয়ে এসো। হৃদয় আমার বন্ধু হয়েও, আমার বন্ধুত্ব স্বীকার করেনা। … যাও আর তাঁকে বেঁধে নিয়ে এসো, এই হলো আমার গুরুদক্ষিণা।
পারলেন না অসৎগুণের একশত ভ্রাতারা, নিজেদের সঙ্গে মহাত্মকাঙ্ক্ষা এবং গুরুপুত্র, উর্জ্জাকে সঙ্গে নিয়েও পারলেননা। কিন্তু তাতে তাঁদের ক্ষেদ নেই, কারণ গুরুদেবের আত্মকেন্দ্রিক ভাবের দর্শন তাঁরা পেয়ে গেছেন। তাই একবার যদি গুরুদেবকে স্বার্থ দেখিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে সৎগুণদের থেকে গুরুদেবকে অপসারিত করাই যায়।
গুরুদক্ষিণার ভার এবার পরলো সৎগুণদের কাছে, আর তাঁরা হৃদয়দেশে প্রবেশ করে, বিক্রম প্রদর্শন করলে, হৃদয়ের নৃপতি তাঁদের বীরত্বের প্রতি আকৃষ্ট হলেন, এবং বন্দি হলেন তাঁদের। উদর হৃদয়কে বন্দিবেশে দেখে, তাঁর থেকে অর্ধেক রাজ্য ছিনিয়ে নিলেন, আর হৃদয়কে বাধ্য করলেন উর্জ্জাকে স্বীকার করতে, কারণ উর্জ্জাকে সেই অর্ধেক রাজ্য প্রদান করে দিলেন উদর।
কিন্তু এই সমস্ত কিছু যখন হচ্ছিল, তখন সমস্ত রাজ্যের প্রজা সৎগুণদেরকেই ভাবীরাজা রূপে স্বীকার করতে চাইলেন, আর তা অসৎগুণদের কাছে হয়ে উঠলো বিশেষ মাথাব্যাথার বিষয়, এমনকি অন্ধরাজার জন্যও তা হয়ে উঠলো এক বিশেষ চিন্তার বিষয়। কিন্তু অন্ধরাজার কুটিলবিচার এবার এর নিরাময় করতে প্রয়াসশীল হলেন।
তিনি যুক্ত হলেন অসৎগুণদের সাথে, আর সৎগুণদের প্রেরণ করলেন যকৃত অঞ্চলে। সেখানে মাদক প্রদান করলেই অগ্নিসম্পাত হবে, আর সৎগুণদের বিনাশ হবেই, মাদকের প্রভাবে। … কিন্তু একদিকে যখন এই সমস্ত কিছু হচ্ছিল, এবং সৎগুণদের হত্যার ষড়যন্ত্র হচ্ছিল, তখন হৃদয়ের নৃপতি উদরের থেকে অপমান লাভ করে, উদরের প্রভাবকে বিনষ্ট করার সিদ্ধান্ত নিয়ে এক মহাযজ্ঞ করলেন।
সেই যজ্ঞ থেকে জন্ম নিলেন যমরাজ এবং জন্ম নিলেন স্বয়ং পরাচেতনা, তাঁর নবদুর্গা রূপের সিদ্ধিদাত্রি রূপ সারণ করে। উদরের প্রভাব থেকে রাজ্যকে মুক্ত করার দৈববাণী হলো যমরাজের জন্য, আর অর্ধনারীশ্বর রূপী হৃদয়ের পূর্ব সন্তানের জন্য দৈববাণী হলো যে তিনি হবেন সত্ত্বার বিনাশের কারণ। আর সর্বশেষে সিদ্ধিদাত্রির ক্ষেত্রে এই নির্দেশ এলো যে সম্পূর্ণ রাজ্যকে সৎহস্তে স্থাপিত করবেন তিনি।
অন্যদিকে অন্ধরাজার কুটিল বিচার অসৎগুণদের সাথে একত্রিত হয়ে যকৃতে প্রেরণ করলেন সৎগুণদের, এবং তাঁদের দহনের পরিকল্পনা করলেন। কিন্তু বাঁধ সারলেন, আত্মের আরো একগুণ। ইনি হলেন আত্মের সেই গুণ, যা রাজ্যের কল্যাণচিন্তায় রত, আর তাই তিনি জানেন যে এই পঞ্চসৎগুণই হলেন তারা, যারা রাজ্যকে সুব্যবস্থিত করতে সক্ষম। তাই দহন করে তাঁদের হত্যা করা হবে, সেই সত্য তাঁদের সম্মুখে রাখলেন এই আত্মগুণ।
আর তা শ্রবণ করে, যকৃতে মাদকদ্বারা অগ্নিসম্পাত তো করালেন সৎগুণরা, কিন্তু প্রকৃতিকে আশ্রয় করে, যকৃত থেকে সকলের অজান্তে যকৃত ত্যাগ করলেন। যকৃতের অগ্নি অসৎগুণদের আশ্বস্ত করলো যে সৎগুণদের হত্যা সম্পন্ন হয়েছে, আর তাঁরা নিশ্চিন্ত হয়ে উঠলো। অন্যদিকে, সৎগুণরা ক্রমশ মস্তকের দিকে অগ্রসর করতে থাকলেন।
পথে, পরাচেতনার কালরাত্রি রূপের সাথে সাখ্যাত হতে, কালরাত্রি জেদের সাথে পরিণয়ে আবদ্ধ হলেন। পথে, একাধিক অসৎগুণের সাথে সম্মুখীনও হতে হলো, আর সর্বক্ষেত্রে জেদ তাঁদের নাশ করতে থাকলেন। অতঃপরে, পরমাত্ম তাঁদের কাছে উদিত হয়ে তাঁদের নির্দেশ দিলেন যাতে তাঁরা হৃদয় দেশে যাত্রা করেন, কারণ সেখানে পরাচেতনার মহারূপ সিদ্ধিদাত্রীর স্বয়ম্বরসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সেখানে যাত্রা করলে, সৎগুণরা দেখলেন যে, কনো অসৎগুণই সিদ্ধিদাত্রীকে লাভ করতে পারলেন না, আর যখন মহাত্মকাঙ্ক্ষা তাঁকে জয় করতে এগিয়ে এলেন, তিনি সরাসরি বলে দিলেন, কনো আকাঙ্ক্ষীকে তিনি বিবাহ করবেন না। অবশেষে সাহস তাঁকে জয় করলে, সকল অসৎগুণ একত্রে হৃদয়দেশে আক্রমণ করতে সচেষ্ট হলেন। সেখানে চেতনার দুই পুত্র, বিবেক ও বিচারও উপস্থিত ছিলেন।
বিচার অসৎদের আক্রমণ দেখে প্রতিরোধ করতে উদ্যত হলে, বিবেক হেসে বললেন, ভ্রাতা, আমি পরাচেতনার ধনুশ, তো পরাচেতনার পঞ্চমহাবাণও এখানে উপস্থিত। তাঁদের সামর্থ্য একটু দেখে নেবেন না!
পঞ্চবাণকে সম্মুখে আসতে হলো না, কেবল জেদ আর সাহসই সমস্ত অসৎগুণদের পরাজয়ের মুখ দেখালেন। আর সেই সমস্ত কিছুর মধ্যে আরো এক কাণ্ড হলো। আকাঙ্ক্ষার দ্বারাই ব্রহ্মাণ্ড চলমান, ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত স্ফীতি সম্ভব। তাই আকাঙ্ক্ষা সর্বদাই ত্রিগুণদ্বারা সুরক্ষিত। ত্রিগুণের প্রদত্ত সুরক্ষা কবচ সর্বদাই উপস্থিত থাকে আকাঙ্ক্ষার সাথে। আর তাই মহাত্মাকাঙ্ক্ষা নিজেকে অপরাজেয় মনে করতেন।
কিন্তু চেতনা যে ত্রিগুণ নন। ভগবান নন তিনি। ভগবান তিনি যার কাছে ভক্ত উপস্থিত হতে সক্ষম। কিন্তু চেতনার কাছে যে কনো ভক্তের আগমনের অধিকারই নেই। কারণ চেতনা যে ঈশ্বর, সমস্ত ভগবানের, শয়তানের ইষ্ট তিনি, একমাত্র অস্তিত্ব তিনি। তাঁর কাছে উপস্থিত হবার জন্য ভক্তি ব্যর্থ, ভক্তও ব্যর্থ। তাঁর কাছে একমাত্র তিনিই উপস্থিত হতে পারেন, অর্থাৎ যিনি নিজের ব্রহ্মাণু হবার ভ্রম ত্যাগ করে ব্রহ্মস্বরূপ হয়েছেন, তিনিই উপস্থিত হতে পারেন। আর উপস্থিত হতে পারেন, সন্তান, কারণ তিনি যে সকলের মা।
যার মধ্যে তাঁর ভাব একমাত্র জননী, জননীস্বরূপ নন, জননীর ন্যায় নন, জগজ্জননী নন, একমাত্র জননী, জন্মজন্মান্তরের জননী রূপে যিনি পরাচেতনাকে দর্শন করেন, তিনিই তাঁর কাছে উপস্থিত হতে পারেন। তাই তাঁর ধনুশ থেকে নির্গত সাহসকে প্রতিরোধ করে এমন কনো কবচই সম্ভব নয়। যার গর্ভে, সহস্র লক্ষাধিক ব্রহ্মাণু নিবাস করে, আর প্রতিটি ব্রহ্মাণুর অন্তরে স্বস্ব ত্রিগুণ নিবাস করে, সেই ভগবানরা ঈশ্বরের বাণকে কিভাবে নির্বাপিত করবেন!
তাই সাহসের বাণ ভেদ করে দিল মহাত্মাকাঙ্ক্ষার কবচ। আর তা করতেই, তিনি যুদ্ধ থেকে বিরত হয়ে প্রত্যাবর্তনের জন্য অসৎগুণদের প্রেরণা প্রদান করলেন, আর পথে বললেন যে, সৎগুণরা যকৃতে নিহত হননি, কারণ একমাত্র সাহসেরই সামর্থ্য আছে, তাঁর কবচকে ভেদ করার, আর তা হয়েছে এই স্বয়ম্বর সভায়। যিনি সিদ্ধিদাত্রীকে ধারণ করলেন, তিনি অন্য কেউ নন, স্বয়ং সাহস।
সমস্ত সৎগুণ একত্রে সিদ্ধিদাত্রীর থেকে সিদ্ধিলাভ করলেন, এবং হৃদয়দেশের রাজা, তথা যমরাজ, এবং বিচার বিবেক সেই সিদ্ধিলাভের অনুষ্ঠানকে মহাসমারোহে পালন করলেন। সত্ত্বা, প্রাণ, এবং সকলে সৎগুণদের জীবিত থাকার বার্তা পেলে, তাঁরা এসে তাঁদেরকে প্রত্যাবর্তন করে নিয়ে গেলেন।
কিন্তু অন্ধরাজার চিন্তা বৃদ্ধি পেল। এবার তো সৎগুণরা রাজসিংহাসনের দাবি করবেন। প্রকট হলো তাঁর কুটিল বুদ্ধি, তাতে যুক্ত হলেন সমস্ত অসৎগুণ, উর্জ্জা, বুদ্ধি এবং মহাত্মাকাঙ্ক্ষা। আর সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিলে, সেই সিদ্ধান্তকে নাট্যে রুচিশীল অন্ধরাজা, সত্ত্বার সম্মুখে নাট্যদ্বারা স্থাপন করলে, সৎগুণদের মলদ্বারের অঞ্চলে প্রেরণ করলেন সকলে।
কিন্তু যাদের সাথে সাখ্যাত সিদ্ধিদাত্রী রয়েছেন, এবং বিবেক রয়েছেন, তাঁদেরকে কেই বা প্রতিরোধ করতে সক্ষম! দহন হলো মলদ্বারের দেশের লোমাবলির জঙ্গল, লাভ হলো মহাস্ত্র কুণ্ডলিনী চক্র, আর সেই চক্রকে ধারণ করলেন বিবেক। আর! … আর মায়াসুরের রক্ষণ হলো, আর সেই মায়াসুরের বলে, স্থাপিত হলো মূলাধারচক্র। চেতনার বিকাশ শুরু হলো সৎগুণদের, এবং সমস্ত রাজ্যে।
কিন্তু মূলাধারের জাগরণের পর কি? বিবেক বললেন, ভেদভাবকে অপসারণ করতে হবে, তবেই সমস্ত রাজ্যকে সৎগুণদের অধিকারে আনা সম্ভব, আর তবেই রাজ্যের কল্যাণ সাধন সম্ভব। তাই ভেদভাবকে বিনাশ করতে বিবেক জেদ এবং সাহসকে নিজের সঙ্গে নিয়ে গেলেন মস্তিষ্কের উদ্দেশ্যে। প্রবল বলশালী ভেদভাব, কারণ সে ব্যাধির দুগ্ধ পান করেছে। মায়াবীও সে, কারণ সে তো ভেদ, দুইখণ্ডে জাত, কিন্তু ব্যাধি রাক্ষসী তাঁকে একত্রিত করে প্রাণ দিয়েছে।
তাই, ভেদভাব নিজের স্থাপত্যকে যখন স্থায়ী করার জন্য, আমিত্বের আরাধনায় মত্ত, এবং উপবাসরত, তখন জেদের দ্বারা ভেদভাবকে সকলের সম্মুখে স্থাপিত করলেন, দুই খণ্ডে চিরে। বিপন্মুক্ত হলো সৎগুণদের অগ্রগতির নীতি। এবার আগ্রাসনের শুরু। সিদ্ধিদাত্রীর সিদ্ধিলাভে যেন সৎগুণদের মধ্যে বিভেদের রচনা না হয়, তাই নিয়ম নির্মিত হলো যে যেকোনো একটি সৎগুণই সিদ্ধিদাত্রীর থেকে সিদ্ধি লাভ করবেন একটি সময়ে। একটি বছর তাঁর সিদ্ধিলাভ হলে, পরবর্তী সৎগুণ সেই সুযোগ পাবেন। আর যদি কনো সৎগুণ অন্য সৎগুণের সিদ্ধিলাভের কালে, সিদ্ধিদাত্রীর সিদ্ধিপ্রদানের সভায় প্রবেশ করেন, তবে তাঁকে নির্বাসনে যেতে হবে।
সমস্তই পরাচেতনার লীলা। নবদুর্গার মাত্র দুই দুর্গাকে তাঁরা লাভ করেছেন, কালরাত্রি আর সিদ্ধিদাত্রী, অন্য সাত দুর্গা লাভ করা বাকি তখনও সৎগুণদের তাই এই লীলা। সাহসকে অনুপ্রবেশ করতে হলো রাজ্যের সুরক্ষার জন্য, আর তাঁকে নির্বাসনে যেতেও হলো। সেই নির্বাসনের কালে, তিনি লাভ করলেন শৈলপুত্রীকে, কুষ্মাণ্ডাকে এবং কাত্যায়নীকে। জেদ ধারণ করলেন চন্দ্রঘণ্টাকে। বিদ্যা ধারণ করলেন স্কন্ধমাতাকে, এবং কৌশল ধারণ করলেন মহাগৌরিকে, এবং সেই সময়কালেই ধৈর্য ধারণ করলেন ব্রহ্মচারিণীকে।
সমস্ত রাজ্যজয় সম্পন্ন হলো। অনুষ্ঠান করে, সৎগুণরা সমস্ত রাজ্যকে বার্তা দিলেন যে এবার থেকে সমস্ত রাজ্য সৎগুণদের প্রভাবে স্থাপিত থাকবে, আর তা সম্ভব হয়েছে বিবেকের কারণেই।
বিবেকের গুরুত্বকে প্রাধান্য না দেওয়া হয় যাতে, তাই ভেদভাবের অনুচর, বাচালতা সম্মুখে এসে বিবেককে কটুবাক্য বলতে থাকলেন, আর তাই বিবেক তাঁর মুণ্ডছেদ করে, বাচালতার থেকে মুক্তি প্রদান করলেন সমস্ত রাজ্যকে। তবে এই অনুষ্ঠানের কালে, সুপ্ত ক্রোধ ক্রোধাগ্নিতে পরিণত হয়ে গেল, সৎগুণদের বৈভব দর্শন করে। আর তাই অন্ধরাজাকে বাধ্য করলেন, এক দ্যূতক্রীড়ার অনুষ্ঠান করার জন্য, যেই দ্যূতক্রীড়া অর্থাৎ ছলনার মাধ্যমে সত্গুণদের সর্বস্ব হনন করবেন তিনি।
ভয় পেলেন অন্ধরাজা। রাজি করালেন এবং আশ্বস্ত করলেন তাঁরই কূটবুদ্ধি। রাজার আদেশ গেল সৎগুণশ্রেষ্ঠ ধৈর্যের কাছে। সিদ্ধিদাত্রীর সাথে সমস্ত সৎগুণভ্রাতাদের নিয়ে তাঁরা অন্ধরাজার সম্মুখে এলেন, আর শুরু হলো দ্যূতক্রীড়া।
ধৈর্যের অতি, ক্ষয়ের প্রধান কারণ। আর সেই অতির কারণেই সর্বস্ব খোয়ালেন সৎগুণরা। সমস্ত পরাচেতনার লীলা। সৎগুণদের অন্তরের অগ্নিকে প্রজ্বলিত না করলে, অসৎগুণদের বিনাশ অসম্ভব, আর অসম্ভব অন্ধরাজার আধিপত্য থেকে মুক্তি। তাই সৎগুণদের সর্বস্ব হনন করিয়েও শান্ত হলেন না পরাচেতনা। স্বয়ং সিদ্ধিদাত্রী নিজের মানকে সম্মুখে রেখে, সমস্ত অসৎশক্তির সাথে পরিচয় করালেন সৎগুণদের।
সত্ত্বা এই মানহানিতে নিরুত্তর, অন্ধরাজা ও তাঁর সমস্ত অসৎসন্তানরা নিরুত্তর, প্রাণ নিরুত্তর, বুদ্ধি উগ্র, উদর নিরুত্তর, উর্জ্জাও নিরুত্তর, মহাত্মাকাঙ্ক্ষার উগ্রতা প্রত্যক্ষ, অন্ধরাজার কুটিল বুদ্ধিও উগ্রতার চরমসীমায়। সাহস ও জেদ সকলের বিনাশ করবেন প্রতিজ্ঞা করলেন, বিদ্যা ও কৌশল অন্ধরাজার কুটিলতার সম্যক বিনাশ করবেন প্রতিজ্ঞা করলেন। কিন্তু ধৈর্য তখনও নিজের অতিধৈর্যকেই ধারণ করে রইলেন। তাই সিদ্ধিদাত্রী সকল সৎগুণদের প্রতিজ্ঞার মান রাখতে, স্বয়ংই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলেন, অসৎগুণদের অহংকারকে চুর চুর করে দিলেন, কারণ তাঁরা তাঁর মান হরণে ব্যর্থ হলেন।
অন্ধরাজা এইসমস্ত কিছুতে ভীত হলেন। সিদ্ধিদাত্রীর প্রতি কৃপা করবেন, এমন অহংকার পূর্ণ অঙ্গিকার করলেন, আর সিদ্ধিদাত্রী এই অঙ্গিকারকে কাজে লাগিয়ে, সকল সৎগুণদের মুক্ত করালেন। কিন্তু অসৎগুণ ও অন্ধরাজার কুটিলবুদ্ধি নিজেদের এইরূপ পরাজয় স্বীকার করলেন না, আর তাই সৎগুণদের বনবাসের নির্দেশ শোনালেন অন্ধরাজার মুখ থেকে। আর শোনালেন যে সৎগুণদের একটি বৎসর ছদ্মবেশে থাকতে হবে, আর যদি সেই কালে তাঁদের ছদ্মবেশকে ভেদ করা যায়, তাহলে পুনরায় বনবাস ও ছদ্মবেশের আদেশ বহাল হবে।
সম্পদ সমস্ত ছিনিয়ে নিলেন, আর শুরু হলো সৎগুণদের তপস্যার কাল। মূলাধার স্থাপিত হয়েছিল এবং মনিপুর অর্থাৎ স্বর্গলোক নিশ্চিত হয়েছিল মলদ্বারের বনাগ্নির কালেই। সেখানে আকাশতত্ত্ব অর্থাৎ ইন্দ্র এসে যুদ্ধ করতে শুরু করেছিলে সাহস ও বিবেকের সাথে, এবং সেই যুদ্ধে মন অর্থাৎ আকাশতত্ত্ব পরাজিত হতে, মনিপুর জয় হয় সৎগুণদের। সেই যুদ্ধেই, কুণ্ডলিনী সর্পের নিধন হয়ে মূলাধার নিশ্চিত হয়, আর মায়াসুরের থেকে মায়াপ্রাসাদ লাভ করে স্বাধিষ্ঠান লাভ হয়।
এই বনবাসের কালে, বিদ্যা অর্জন করে অনাহত লাভ হয়, অক্ষয়পাত্র লাভ করে সিদ্ধিদাত্রী বিশুদ্ধ প্রদান করেন সৎগুণদের। শেষে কৈলাসপতি আসেন সাহসের আজ্ঞাচক্র যাত্রাকে প্রতিরোধ করতে, কিন্তু তাতে ব্যর্থ হলে, আজ্ঞাচক্রও লাভ হয়ে যায় সৎগুণদের। সাধনা চরম স্তরে উপস্থিত হলে, এবার সৎগুণরা অজ্ঞাত অবস্থায় স্থাপিত হলেন, এবং নিজেদের শক্তিসঞ্চয় করলেন, অসৎগুণদের বিনাশের উদ্দেশ্যে।
কিনু ধৈর্যচ্যুতি তখনও ঘটেনি। তখনও ধৈর্য অসৎগুণদের আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হলেন না। তাই এবার বিবেক সম্মুখে এলেন, এবং বললেন যে তিনি স্বয়ং অসৎগুণদের সভায় যাবেন, এবং সৎগুণদের জন্য স্থান কামনা করবেন। সেখানে সত্ত্বা থাকবেন, প্রাণ থাকবেন, উর্জ্জা থাকবেন, মহাত্মাকাঙ্ক্ষা থাকবেন, অন্ধরাজা ও তাঁর কুটিলতা থাকবেন, স্বয়ং ধরিত্রী থাকবেন, বুদ্ধি থাকবেন, এমন কি সমস্ত অসৎগুণরা থাকবেন। যদি তাঁরা সৎগুণদের অবস্থান করার স্থান প্রদান করেন, তাহলে যুদ্ধের কনো প্রয়োজন নেই।
কিন্তু বিবেকের আর্জি রাখা হলো না, আর তাই যুদ্ধই নিশ্চিত করা হলো। সৎগুণদের সাথে জুড়লেন বিবেক, তাঁদের মার্গদর্শক রূপে, বা বলা চলে চেতনার ধনুশ হয়ে, অসৎগুণদের সৎগুণরূপী বাণ দ্বারা বিঁধতে। আর জুড়লেন হৃদয়দেশ, ও তাঁর দুই সন্তানরূপে অবস্থানকারক স্বয়ং লিঙ্গহীন ভাব এবং যমরাজ। সঙ্গে রইলেন বিবেকের অনুগামীরা।
বিচার যুদ্ধ থেকে বিরত থাকলেন, কারণ তাঁর এখানে কনো ভূমিকা নেই, বিশেষ করে যখন বিবেক স্বয়ং চেতনার দূত হয়ে অবস্থান করছেন যুদ্ধে। আর অসৎদের সঙ্গে প্রায় সকলেই রইলেন। রইলেন পঞ্চভূত, যাদের মধ্যে ধরিত্রীও নিজের যোগদান একপর্বে প্রদান করেন। বুদ্ধি, উর্জ্জা, প্রাণ সাখ্যাতে যোগদান করলেন যুদ্ধে অসৎগুণের তরফ থেকে। আর যোগদান করলেন স্বয়ং সত্ত্বা, এবং উদর।
যুদ্ধের শুরুতে সত্ত্বা একাকীই যুদ্ধক্ষেত্রে দাপিয়ে বেড়ালেন। সৎগুণদের মধ্যে সাহস তাঁকে প্রতিরোধ করতে থাকলেও, তাঁর দমন করতে পারলেন না। এমন সময়ে সত্ত্বাকে যুদ্ধবিরাম প্রদানের উদ্দেশ্যে, বিবেক স্থাপন করলেন লিঙ্গবৈষম্যহীনতাকে। সত্ত্বা সন্দিহান হলেন, আর বিবেকের নির্দেশে সাহস, অসংখ্য বাণের সহ্যায় সত্ত্বাকে শায়িত করলেন।
সম্মুখে এলেন উদর এবং উদরপুত্র উর্জ্জা। প্রবল অহংকার নিয়ে হৃদয়কে আক্রান্ত করলেন উদর। আর বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে, সাহসের বীজকে স্কন্ধমাতার স্কন্ধকে হত্যা করালেন। উত্তপ্ত হয়ে উঠলেন সাহস। পণ করলেন যে বুদ্ধির বিনাশ করবেন তিনি। বুদ্ধি পলায়ন করলেন, কিন্তু সাহস তাঁকে সমস্ত রণক্ষেত্র অতিক্রম করেও দমন করলেন। মুণ্ডচ্ছেদ করে, বুদ্ধির অহমিকা দমন করলেন সাহস।
এবার সম্মুখে এলেন সাহস এবং উদর, গুরুশিষ্য। প্রবল যুদ্ধের দ্বারা, সাহস উদরকে নিরস্ত্র করেদিলেন। কিন্তু গুরু তিনি, তাই তাঁর দমন করলেন না। আর সাহস যখন দমনে রুচি রাখলেন না উদরের, তখন আর কেউ তাঁকে দমন করতে পারলো না। তাই বিবেক ধৈর্যের কাছে গিয়ে ধৈর্যকে উর্জ্জার বিনাশ হয়ে গেছে, এই কথা বলতে বললেন। ধৈর্য যতশক্তিশালীই হননা কেন, সমস্ত শক্তি তাঁর ধনুশের কারণেই, অর্থাৎ বিবেকের কারণেই।
আর বিবেক চেতনা দ্বারা পরিচালিত। তাই চেতনার আবাহনকে প্রত্যাখ্যান করার সামর্থ্য যে ধৈর্যেরও নেই। আর তাই ধৈর্যের বাণী প্রকাশিত হলো, উদর ভারাক্রান্ত হলো, আর যমরাজ স্বয়ং তাঁর অহমিকা দমন করলেন অর্থাৎ তাঁর মুণ্ডচ্ছেদ করলেন। পতন হলো উদরের, সম্মুখে এলেন উর্জ্জা, বাণ প্রদান করলেন সহস্র চিন্তার। জেদ আক্রান্তও হলেন, কিন্তু বিবেক তাঁর রক্ষা করলেন।
এবার সম্মুখে এলেন মহাত্মাকাঙ্ক্ষা। প্রবল বলধারণ করে, মনবল অর্থাৎ আকাশতত্ত্ব দ্বারা সাহসের দমনে উদ্যোগী হলেন। কিন্তু চেতনার ইঙ্গিতে বিবেক সম্মুখে প্রেরণ করলেন কালরাত্রির আশীর্বাদ অর্থাৎ জ্ঞানকলসকে। জ্ঞানকলসকে মন বা আকাশতত্ত্বই একমাত্র বিনাশ করতে সক্ষম। তাই মহাত্মাকাঙ্ক্ষাকে আকাশবাণ মুক্ত করতেই হলো, আর অতঃপরে সাহস মহাত্মাকাঙ্ক্ষার অহমিকা দমন করলেন তাঁর মুণ্ডচ্ছেদ করে।
এরপরে জেদের তাণ্ডব শুরু হলো। একে একে সমস্ত অসৎগুণের বিনাশ করতে থাকলো জেদ। আর তাঁর সম্মুখে এবার এলো কামনা। কামনার সাথে প্রবল যুদ্ধ হলো জেদের। কিন্তু জেদের প্রকোপকে কামনা সইতে পারলো না। এই কামনার হাত ধরেই সিদ্ধিদাত্রীর মান হননের প্রয়াস হয়েছিল। তাই সেই কামনার ছাতি ছিঁড়ে দিলেন জেদ, এবং ভয়ানক মৃত্যু প্রদান করলেন কামনাকে।
ক্রোধ এবার পলাতক, নিজের মদমত্ততাকে সম্মুখে রাখবেন না, হত্যা হতে দেবেন না নিজের মদভাবের। তাই মায়ার আশ্রয় নিলেন। কিন্তু নিজের মিত্রের এমন অবস্থা দেখে, ক্রুদ্ধ হলেন উর্জ্জা। যমরাজকে জয় করলেন তিনি, লিঙ্গবিহীনভাবের থেকেও মুক্ত করে দিলেন রাজ্যকে, আর সৎগুণ ভেবে, সিদ্ধিদাত্রীর পঞ্চসিদ্ধির নাশ করলেন।
সৎগুণরা শোকাহত হলেন। সাহস উর্জ্জাকে আক্রমণ করে দিলেন। উর্জ্জা সাহসের ভয়ে পলাতক হলেন। নাট্যধারণ করলেন, কিন্তু জেদের হাতে ধরা পরে গেলেন, বিবেকের প্রেরণায়। আর চেতনার প্রেরণাতেই উর্জ্জার শক্তিকে বিনাশ করে, উর্জ্জাকে পলাতক হতে দিলেন। প্রাণদান দিলেন প্রাণকে। আর বিদ্যা কৌশল বিনাশ করলেন অন্ধরাজার কুটিলতাকে।
আর এবার মদমত্ত ক্রোধকে দমন করলেন জেদদ্বারা। ধরিত্রী মদমত্ত ক্রোধকে লৌহশরীর প্রদান করেছিলেন, কিন্তু চেতনার প্রভাবে মদমত্ততার দণ্ডায়মান থাকার দুই উরুকে ধরিত্রী বরদানে ভূষিত করলেন না। জেদের বলে মদের উরুভঙ্গ হলো। বিনাশ হলো সমস্ত অসৎগুণের। অন্ধরাজার চেতনার উদয় হলো, কিন্তু তাঁর সর্বস্ব হনন হয়ে যায়। আর এই ভাবে সৎগুণরা বিরাজ করলেন রাজ্যে।
এবার বলো পুত্রী, এই কথা কার আত্মকথা, আর এই কথার সারকথাই বা কি?”
