কৃতান্তিকা

ব্রহ্মসনাতন হাস্যবদনে বলতে থাকলেন, “পুত্রী, জীবের কাছে ভবিষ্যৎ হলো একটি ছায়া, যাকে কেউ কেউ বলেন তাঁদের অতীত ও বর্তমানের উপর নির্ভরশীল কালব্যাপ্তি, আবার কেউ বলেন যে নিয়তি নির্মিত অথচ জীবের কাছে অজ্ঞাত কালছেত্র। আমি তোমাকে বলবো যে, এই উভয় কথাই সত্য, এবং একত্রে সত্য।

পুত্রী, পূর্বেই বলেছি তোমাকে যে, পরব্রহ্মের কারণপ্রকাশ হলেন নিয়তি, সূক্ষ্ম প্রকাশ হলেন কালী এবং স্থূল প্রকাশ হলেন প্রকৃতি। অর্থাৎ এই তিন প্রকাশই স্পষ্ট ভাবে ব্রহ্ম স্বয়ং। আর ব্রহ্ম, যার ব্যাখ্যা সম্ভবই নয়, কারণ ব্রহ্ম ব্যতীত কিচ্ছুরই কনো অস্তিত্ব সম্ভবই নয়, অর্থাৎ তিনি অসীম, আর ব্যাখ্যা কেবলই সসীমের সম্ভব। অসীমের ব্যাখ্যা দেবার মতই কেউ উপস্থিত থাকেন না, কারণ তিনি অসীম। আর তাই অসীমের ব্যাখ্যা সম্ভবই নয়।

কিন্তু তাও যদি ভৌতিক অর্থে ব্রহ্মকে ধারণা করতে হয়, তবে তিনি হলেন সমস্ত বৈপরীত্যের একত্রিত সমাহার। অর্থাৎ তিনি একই সাথে সাদা এবং কালো, একই সাথে সৎ ও অসৎ, একই সাথে নিরাকার ও সাকার। তেমনই ভাবে নিয়তিও তিনিই, কালীও তিনি, আর প্রকৃতিও তিনিই। তাই এঁরা সকলেও ঠিক একই ভাবে বৈপরীত্যের একত্রিত সমাহার।

আর ঠিক সেই কারণেই, তোমাকে প্রথমেই বললাম, ভবিষ্যৎ যা একটি কালের অবস্থা, অর্থাৎ কালীর কর্মধারা, তা একই সঙ্গে অতীত ও বর্তমানের উপর নির্ভরশীল কালব্যপ্তি, আবার একই সঙ্গে তা হলো নিয়িতির দ্বারা পূর্বনির্ধারিত কালব্যাপ্তি। যদি এই দুইকে যুক্তিদ্বারা সজ্জিত করতে পারো, তাহলে যা নির্মিত হবে, তাই হলো ভবিষ্যৎ। আর এই ভবিষ্যতের গর্ভেই, তোমার ও আমার আরো অন্য দুই অংশ অবতারের ক্রিয়াধারা সঞ্চিত আছে। এবার আমি তোমার কথা ধরেই সেই কথার শুরু করছি।

পুত্রী, তোমার কর্মকাণ্ডে তুমি একাকী থাকবেনা। তোমার সাথে যুক্ত হবেন, তোমারই সহায়িকা, এবং তোমাকে যিনি নিজের আদর্শ মনে করবেন তিনি। তাঁদের সংখ্যা এক নয় একাধিক, কিন্তু তাঁদের মধ্যে অন্যতম যিনি, তিনিও তোমারই নেই ৮ কলা ঈশ্বরকটি অবতার। পুত্রী, তুমি হলে পরানিয়িতির বিদ্যা ও জ্ঞানরূপী প্রকাশ।

তোমার আবির্ভাব না হলে, কৃতান্ত তথা কৃতান্তিকার সমস্ত অধ্যায়ের ভাবার্থ উদ্ধার অসম্ভব ছিল। তবে, তুমি তোমার কর্মের সাফল্য পাবেনা, বা বলতে পারো তুমি তোমার কর্মকে শুরুই করতে সক্ষম হবেনা। আর ততক্ষণ তা শুরু করতে পারবেনা, যতক্ষণ না তোমার সাথে পরানিয়িতির শ্রীরূপ যুক্ত হচ্ছেন।

পুত্রী, আমি আমার এই দেহের ভবলীলা ত্যাগ করার সেস অবস্থায় তোমার নিকটে তাঁকে পাবে, যিনি হবেন তোমার গুণগ্রাহী প্রেমিকা, এবং যিনি হবেন তোমার সাফল্যের চাবিকাঠি। আমি তাঁর নাম তোমাকে বলবো না, কারণ তা বলে দিলে, তোমার জীবন তোমার কাছে পূর্বে পাঠ করা প্রন্থের পুনরায় পাঠ করার ন্যায় হয়ে যাবে, এবং জীবনের প্রতি উদাসীন হয়ে উঠবে।

পুত্রী, জীবনের অনিশ্চয়তাই জীবনের প্রতি আকৃষ্ট করে রাখে আমাদেরকে। তাই সেই অনিশ্চয়তাগুলি অনিশ্চিত থাকাই ভালো, কারণ একবার যদি সেই অনিশ্চয়তা নিশ্চিত হয়ে যায়, তাহলে জীবনে অগ্রগতির উদ্যমই সমাপ্ত হয়ে যায়। সেই কারণে আমি তোমাকে তাঁর নাম তো বলবো না। তবে এটুকু অবশ্যই বলবো যে, সে তোমার জীবনে প্রবেশ করার সাথে সাথে, তুমি সাফল্যের মুখদর্শন শুরু করবে।

দেহের বয়সে সে তোমার থেকে অনেকটাই ছোট হবার কারণে, তোমার দেহাবসান ও চতুর্থ ঈশ্বরকটির উত্থানের মাঝের সময়টাতে সে-ই কৃতান্তিকদেরকে নেতৃত্ব প্রদান করবে। তবে কেবল এই ভূমিকাই নয়, সেই কন্যা তোমার গুণগ্রাহী হয়ে তোমার নৈকট্য যখন কামনা করবে, তখন সে-ই তোমার জন্য প্রাথমিক অনাথ আশ্রম গঠন করবে, এবং অনাথদের সেখানে এনে রাখা শুরু করবে।

আর সেই অনাথআশ্রম থেকেই তুমি তোমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ১০ শিষ্যকে লাভ করবে, যাদের নিয়ে তোমার কৃতান্তিক গঠন পর্বের শুরু হবে। তবে তোমার জীবনে সেই কন্যার আগমনের পূর্বেই তুমি যা শুরু করে দেবে, তা হলো আমার দ্বারা রচিত গল্পকাহিনীগুলির উপর তুমি তোমার সঙ্গিসাথিদের সাথে চিত্রনাট্য করা শুরু করে দেবে।

সত্য বলতে, তোমার এই চিত্রনাট্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়েই তোমার কাছে সেই কন্যার আগমন হবে। তোমার ও তোমার সকল সঙ্গীসাথিদের সাথে আলাপে মুখরিত হয়ে, সেই কন্যাই প্রায় অর্ধশত অনাথকে আনবে, এবং তোমার কাছে তাঁদের অর্পণ করবে, আর যখন সে তা করবে, তখন থেকেই তোমার তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পাবে।

তবে এই ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পাবার পরে পরে, যখন তুমি সেই কন্যাকে, এবং সেই কন্যা তোমাকে অধিক ঘনিষ্ঠ ভাবে চিনতে শুরু করবে, তখন সেই অর্ধশত অনাথদের শিক্ষাদান শুরু করবে, তোমার অনুপ্রেরণায় অনুপ্রেরিত হয়ে। আর তাঁদের থেকেই উঠে আসবে, ৪টি কৃতান্তিক। তবে তোমার প্রথম শিষ্যা হবে সেই কন্যাই।

এরপরে, তোমার সঙ্গীসাথিরা অনাথআশ্রমকে নিয়েই মত্ত থাকলে, অনাথ শিশুদের সংখ্যা এক শত হবে প্রথমে, আর সেই এক শত হবার কালে, সেখান থেকে তোমার মিত্র তথা কন্যাসমা সেই অষ্টকলা অবতার আরো ২ অনাথকে আশ্রম থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসবে তোমার কাছে, কৃতান্তিক গড়ার জন্য।

আর যখন এই অনাথদের সংখ্যা হয়ে উঠবে দুই শত, তখন তাঁদের থেকে তোমার দ্বারা নির্মিত অবশিষ্ট ৪টি অনাথকে বেছে নিয়ে আসবে সেই কন্যা তোমার নিকটে। পুত্রী, কৃতান্তিকদের প্রথম আশ্রমের নির্মাতা তুমি নও, আর প্রথম কৃতান্তিক নির্মাতাও তুমি নও। প্রথম কৃতান্তিকের নির্মাতা ভাগ্যক্রমে আমি, আর প্রথম কৃতান্তিক হলে তুমি। আর কৃতান্তিকদের সেই কালজয়ী আশ্রম! সে আশ্রম, যা ১৫ শতক বৎসর ব্যাপী জগতের মোক্ষদ্বার রূপে চিহ্নিত থাকবে, এবং তৎপশ্চাতে ১৫ সহস্র বৎসর মহাতীর্থ রূপে পরিগণিত হবে!

সেই আশ্রমের নির্মাতাও তুমি নও, তবে হ্যাঁ, সেই আশ্রমের প্রাণকেন্দ্র হবে তুমি। তুমি হয়ে উঠবে, সকলের আদরের সখী, আর শেষে যখন সকলেই সকলের সখা ও সখী হয়ে উঠবে, তখন তুমি হয়ে উঠবে প্রাণসখী, আর তারপর থেকে আশ্রমের অধ্যক্ষকে প্রাণসখী নামেই সম্ভাষণ করা হতে থাকবে। আর সেই আশ্রমের নির্মাতা হবে, তোমার এই পরমমিত্র, যিনি তোমার সমবয়সী নন।

তোমার দেহের আয়ু যখন আর মাত্র ১৫ বৎসর অবশিষ্ট থাকবে, তখন তোমার এই পরমমিত্র তোমার অন্য ১০টি কৃতান্তিকদের একত্রিত করে, এই আশ্রমের নির্মাণ করবে, যার নাম পরবর্তীদে তোমারই নাম ধারণ করে দেবে, শ্রীধাম। পুত্রী, তুমি তোমার জীবদ্দশাতেই, এই আশ্রমের বসতি সংখ্যা ৩৩ দেখে যাবে।

এবং তোমার দেহাবসানের পরেও, তোমার সঙ্গীসাথিদের নির্মাণ করা অনাথ আশ্রম চলবে, তবে তা পসমিত হয়ে যাবে, কারণ তোমার সঙ্গীদের পরবর্তী প্রজন্ম সেই আশ্রম চালনায় রুচি রাখবেনা। তবে তোমার এই পরম মিত্র সেই অনাথ আশ্রমকে সঞ্চালিত করবে, এবং এক সময়ে সেই আশ্রমের বসতি সংখ্যা  ৫ শত হয়ে যাবে।

পুত্রী, পরবর্তীতে এই আশ্রমকে বঙ্গসরকার অধিগ্রহণ করবেন, এবং এই কর্মের কারণে তোমার মিত্রকে বহু অর্থে ও সম্মানে ভূষিত করবে। আর তার সাথে সাথে, বঙ্গশাসক, শ্রীধামের জন্য একটি ঘণ্টার শিক্ষকতার ব্যবস্থাও করে দেবেন, যাতে এই শ্রীধামে উপযুক্ত শিশু যেতে পারে এবং কৃতান্তিক হয়ে উঠতে পারে।

তোমার এই মিত্র, নিজের আয়ুর অন্তিম ১০ বছরে যাকে পালন করবে, এবং যার হাতে শ্রীধামের দায়িত্ব দিয়ে যাবে, তিনি হলেন পরানিয়িতির ১৬ কলা অবতার, যিনি একই সঙ্গে অসামান্য মেধাবী, সাফল্যমণ্ডিত, এবং সঙ্গে সঙ্গে অক্লান্ত পরিশ্রমী এবং দূরদর্শী। আর সত্য বলতে, তাঁর হাতে পরেই, শ্রীধাম মহাধামে পরিণীত হবে। যখন তোমার মিত্র দেয়ত্যাগ করবে, তখন কৃতান্তিকের সংখ্যা ১ শত হয়ে যাবে, এবং শ্রীধামের বসতি সংখ্যা হয়ে উঠবে ৩ শত।

আর এই ১ শত কৃতান্তিকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য যেমন ১৬কলা অবতার প্রাণসখী হবে, তেমন আরো ২০ জন হবেন, যারা বঙ্গরাজ্যের শাসনের রাশ হাতে ধরবে, মহাসংগ্রাম করে। আর সেই শাসন একবার হাতে ধারণ করার পর, শ্রীধামকে আর অনাথের উপর আশ্রিত থাকতে হয়না, কারণ এঁরা শ্রীধামকে সমস্ত বঙ্গের গুরুকুল করে তোলে।

পুত্রী, সে এক আমূল পরিবর্তনের কাল। তুমি প্রথম প্রাণসখী শ্রীধামের, আর এই ১৬ কলা অবতার হলেন তৃতীয় প্রাণসখী। আর ইনার সময়কালে, সমস্ত বঙ্গদেশে, শ্রীধামের ৭টি শাখা হবে, আর সেই সমস্ত শাখা মিলিয়ে প্রায় ১০ সহস্র ছাত্র হবে, যাদের মধ্যে ১ সহস্র কৃতান্তিক প্রশিক্ষিত হবে।

পুত্রী, তাঁর সময়কালে, শ্রীধামের পরিবর্তন আমূল হবে। সাতটির প্রতিটি শ্রীধাম শাখার দুইটি করে শিক্ষাপ্রদানের ব্যবস্থা থাকবে, যাদের মধ্যে একটি হবে তাঁদের সন্তানদের জন্য, যারা তাঁদের সন্তানদের অর্থ দ্বারা পঠনপাঠন করাতে সক্ষম। এবং দ্বিতীয় বিভাগ হবে আর্থিক ভাবে দূরস্থদের জন্য। আর এঁদের থেকে যারা কৃতান্তিক হবার যোগ্য রূপে চিহ্নিত হবে, তাঁরা শাখা থেকে মূল কাণ্ডে অর্থাৎ শ্রীধামে যাত্রা করবে, এবং প্রাণসখীর থেকে কৃতান্তিক হবার শিক্ষা গ্রহণ করবে।

আর ইনার জীবনাবসানের পূর্বকালে, এমন হবে যে, বঙ্গদেশে নির্বাচন কেবলই এক লোকদেখানো ক্রীড়া হয়ে যাবে। সম্যক শাসন এবং সমস্ত কর্মসম্পাদনা শ্রীধামের শিষ্যরাই করবেন। আর এমন করতে করে, প্রাণসখীর জীবনের অন্তিম বৎসরে বঙ্গদেশ সমস্ত ভারতের কাছে হয়ে উঠবে এক বিস্ময়কর রাজ্য, কারণ ভারতের সমস্ত বিষয়ের সমস্ত শ্রেষ্ঠরা বঙ্গদেশ থেকেই কেবল হবেন, এমনই নয় কেবল, এর সাথে সাথে, বঙ্গদেশ সমস্ত পৃথিবীর সর্বাধিক ধনী রাজ্য রূপে চিহ্নিত হবে।

একটি মানুষও এখানে দরিদ্র থাকবেন না তখন। কৃষক হন বা শিল্পপতি, সকলেই স্বচ্ছল জীবনে অবস্থিত থাকবেন, আর জ্ঞান ও সাধনায় বঙ্গদেশে মোক্ষলাভের ভিড় লেগে যাবে। এমন অবস্থাতে বঙ্গদেশকে উন্নীত করার বৎসরেই প্রাণসখী দেহত্যাগ করে, সম্পূর্ণ ৯৬ কলা অবতার ক্রীড়ার সমাপন করবেন।

পুত্রী, প্রতিটি অবতার ক্রীড়ার তখনই সমাপন হয়, যখন তা ৯৬ কলার প্রকাশ সম্পূর্ণ হয়। তবে সাধারণত সেই ক্রীড়া এক বা দুই সহস্র সালব্যাপী হয়, তবে এবারে তা মাত্র ১৫০ বৎসরের মধ্যেই সমাপ্ত হবে, কারণ মানবকুলকে একটি বিশাল পরিমাণের ধাক্কা প্রদান করা আবশ্যক হয়ে গেছিল।

পুত্রী, বঙ্গদেশের এমন উত্থানের পর, বঙ্গদেশের থেকে আর্যদের সম্পূর্ণ ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়। তবে এখানেই সমস্ত কিছুর সমাপ্তি হয়না, বা বলতে পারো এই হলো শ্রীধামের উত্থান বা কৃতান্তের উত্থান। বঙ্গদেশের উত্থানের পর, সম্পূর্ণ ভারতবর্ষ শ্রীধামের প্রথম প্রাণসখার কাছে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে শ্রীধামের শাখা উন্মোচনের দাবি করলে, তাঁর আমলে ৭টি রাজ্যে একটি একটি করে শ্রীধামের স্থাপন হয়।

তাঁর পরবর্তী প্রাণসখার আমলে, সেই সংখ্যা ২০টিতে পরিণত হয়, এবং তাঁর পরবর্তী প্রাণ সখার আমলে, তা ভারতের প্রতিটি রাজ্যে স্থাপিত হয়ে যায়। সপ্তম প্রাণসখীর কালে, শ্রীধামের সংখ্যা হয়ে যায় ১ শত, কারণ একাকটি রাজ্যে একাধিক শ্রীধামের শাখা স্থাপিত হতে শুরু করে।

সপ্তম প্রাণসখীর পরে, প্রথম যিনি প্রাণসখা হয়েছিলেন, তিনি পুনরায় জন্ম নিয়ে, এবারে প্রাণসখী হয়েই আসেন, এবং ইনার আমলেও আমূল পরিবর্তন হয়, তবে এবার সম্পূর্ণ ভারতবর্ষের। ভারতবর্ষের সংবিধানের বদল হয়, এবং নবসংবিধান রচিত ও স্থাপিত হয়। এবং কেবল তাই নয়, এই নবসংবিধানের সাথে সাথে সমস্ত শাসনভার শ্রীধামের ছাত্রদের হাতে চলে যায়, এবং কৃতান্তিকরা হয়ে ওঠেন ভারতের নবধর্মযাজক এবং কৃতান্ত হয়ে ওঠে ভারতের মহাধর্ম। এবং তিনিই হন প্রথম প্রাণসখী যিনি প্রাণসখী থাকাকালীনই মোক্ষ লাভ করে, সমস্ত মানবকুলের কাছে এক মহাবার্তা প্রচার করে যান কৃতান্ত সম্বন্ধে।

পুত্রী, এতো মাত্র অষ্টম প্রাণসখী; এরপরেও আরো ২২টি প্রাণসখী আসেন, এবং নবসংবিধান তথা কৃতান্ত তথা কৃতান্তিক পরিবর্তীতে কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ থাকেনা, বরং গোটা পৃথিবীর ৩০টি দেশ কৃতান্তকে নিজেদের ধর্ম এবং ভারতের নবসংবিধানকে নিজেদের সংবিধান রূপে স্বীকার করলে, ভারত ১৫০০ বৎসরের কৃতান্তকালের অন্তের দুই শত বৎসর সমস্ত পৃথিবীর ধনীতম তথা উন্নততম দেশ হয়ে অবস্থান করে।

কিন্তু তারপর থেকে প্রাণসখীরা দুর্বল হতে শুরু করে, এবং পরবর্তী দুই শত শালের মধ্যেই ভারত পুনরায় নিজের শ্রেষ্ঠত্বের ধ্বজা হারিয়ে ফেলে, এবং ক্রমশ কৃতান্ত জগতের শ্রেষ্ঠতম এক ধর্মসম্প্রদায় রূপে চিহ্নিত হতে শুরু করে, এবং আরো এক শতবৎসরের পর, পুত্রী, তোমার মিত্রের নির্মাণ করা শ্রীধাম সমস্ত জগতের শ্রেষ্ঠ তীর্থধাম হয়ে উঠে, কৃতান্তের ইতিহাস সকলকে আরো সহস্র সহস্র বৎসর শোনাতে থাকে।

অতি সংক্ষেপেই বললাম সমস্ত ভবিষ্যৎ। এর কারণ এই যে, এই ভবিষ্যৎ অনেকেই পাঠ করবেন, কিন্তু যেমন তোমাকে বললাম ভবিষ্যৎকে সম্পূর্ণ ভাবে জেনে গেলে, জীবনের উদ্যমই সমাপ্ত হয়ে যায়, তেমনই সকলের জন্যই সেই উদ্যমকে ধারণ করে রাখার জন্যই এই সংক্ষেপ কথন। এই সমস্ত কিছুর মধ্যে মধ্যে অজস্র টানাপড়েন থাকবে, অজস্রবার আর্যরা ও বৈষ্ণবরা বাঁধা প্রদান করবে। মিত্রতা হবে কৃতান্তের সাথে ইসলামের, এবং ইসলাম কৃতান্তের যুদ্ধকে একসময়ে নিজেদের যুদ্ধ রূপেই ধারনা করবে।

পরবর্তীতে বৌদ্ধরাও ইসলামদের ধারাকে অনুসরণ করবে, এবং কৃতান্ত এর পর থেকে সমস্ত সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ জিততেই থাকবে, এবং মানবযোনির কাছে মহাপ্রেমের, মহাসমন্বয়ের, এবং ভেদভাবশূন্য মহাজ্ঞানের প্রচার করতে থাকবে।

বিরোধ কেবল ধর্মসম্প্রদায়ের থেকেই আসবেনা, কারণ বৈষ্ণব আর্যরা তো রাজনীতিতেও যুক্ত। এই আর্যদের যুদ্ধে একসময়ে পূর্বের সংবিধানের প্রণেতা অনার্যরাও আর্যদের সাথে যুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু সেই যুদ্ধ প্রত্যক্ষ ভাবে কৃতান্ত করবে না, কারণ আপামর জনতা সেই যুদ্ধ করবে কৃতান্তের হয়ে। তবে হ্যাঁ, আর্যরা ধর্মসম্প্রদায়ের সংগ্রামে যুক্ত থাকুন বা রাজনীতিতে, দুর্নীতি, অনাচার, হিংসা, এবং ঈর্ষাই এঁদের অস্ত্র। তাই সেই সমস্ত কিছু কৃতান্তকে অবশ্যই সহ্য করতে হবে, এবং সময়ে সময়ে, বহু বহু শ্রীধামের শিক্ষার্থীদের, শিক্ষকদের, এবং কিছু কৃতান্তিকদেরকেও এই সমূহ সংগ্রামে শহীদ হতে হবে।

তবে সেই সমূহ কথা আমি এখানে বলবো না। বরং সময়ে সময়ে ঐতিহাসিকদের হস্তে আমি বিরাজ করে, সকলের কলম দ্বারা আমি সেই কথার প্রত্যক্ষদর্শন সমস্ত মানবকুলের জন্য বলতে থাকবো, কারণ এই সংগ্রাম মানুষের সংগ্রাম, এই সংগ্রাম মানুষের অস্তিত্বের সংগ্রাম, এই সংগ্রাম মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব দাবির সংগ্রাম, এই সংগ্রাম মানুষের আমার কাছে বলার সংগ্রাম যে- আমরাই সেই যোনি, যেই যোনি তোমার সর্বাধিক প্রিয়, কারণ এই যোনি থেকেই, আমরা সমস্ত ভ্রমের নাশ করে, আমরা তোমার ক্রোড়ে ফিরে যেতে সক্ষম”।

দিব্যশ্রী বললেন, “আচ্ছা মা, আমার মনে একটি বিশয়ে কৌতূহল জাগছে। … আচ্ছা, মার্কণ্ড মহামুনি তাঁর মহাপুরাণে দেখিয়েছেন যে, দক্ষ হলেন আর্য, আর তিনি শিবকে অনার্য বলতেন, আর যেমন আর্যরা অনার্যদের অসভ্য বর্বর, ইত্যাদি বলেন, তেমনই বলতেন, আর সতী তাঁর কন্যা, এবং তিনি আর্যদের ত্যাগ করে অনার্য শিবের কাছে চলে গেলেন। আসলে এমন বলার অর্থ এই যে, আমার বারবার এমন মনে হচ্ছে যে, এই কাহানী যেন মার্কণ্ড মহামুনির নিজের জীবনের কাহানী। কিন্তু আমি নিশ্চিত হতে পাচ্ছিনা, এই ব্যাপারে। আপনি কি এ ব্যাপারে আমাকে আলোকপাত করতে পারবেন?”

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “সঠিক বিচার করেছ পুত্রী। আসলেই, মার্কণ্ড মহাপুরাণ হলো মহামুনি মার্কণ্ডের আত্মকথা, যেখানে সম্যক আর্যকুলকে তিনি ব্রহ্মাপুত্র ও নারায়ণভক্ত করে দেখিয়েছেন, এবং সেই আর্যকুলের তিনি স্বয়ং যতটা সম্মুখীন হয়েছেন, তাকে দক্ষ ও দক্ষের রাজত্ব করে দেখিয়েছেন।

অন্যদিকে, পিপলাদ, যাকে আর্যরা একপ্রকার উপনিষদের সঞ্চালক বলে বহিষ্কার করে দিয়েছেন, তাঁকে অনার্যকুলের শিরোমণি শিব করে দেখিয়েছেন। এবং এও দেখিয়েছেন যে তিনি স্বয়ং অর্থাৎ আদিশক্তির অবতার সতী কি ভাবে আর্য ধারাপাতের থেকে নির্গত হয়ে, অনার্য শিব অর্থাৎ পিপলাদের কাছে গেলেন। এও দেখিয়েছেন যে, এই যাত্রার কারণে তাঁর কতটা তিরস্কার করা হয়, আর এও দেখিয়েছেন যে সেই তিরস্কারের কারণে, তিনি আর্যদের দান করা দেহকে ত্যাগ করে, পুনরায় পার্বতী বেশে তন্ত্রের রচনা করলেন।

অর্থাৎ পুত্রী, মার্কণ্ড মহাপুরাণ সম্যক ভাবেই মহামুনি মার্কণ্ডের আত্মকথা। তবে হ্যাঁ, তিনি নিজেকে মাতার অবতার বলে স্ত্রীরূপে প্রদর্শন করেছেন, তাই এই সত্য অধরাই থাকে। যদিও, বেদব্যাস তা উদ্ধার করেছিলেন, আর তাই শিবপুরাণে, সমস্ত রুদ্রাবতার লিপিবদ্ধ করার কালে, তিনি আর্যদের দ্বারা চিহ্নিত পিপলাদকে প্রথম রুদ্রাবতার রূপে লিপিবদ্ধ করেছেন”।

দিব্যশ্রী উৎসাহী হয়ে বললেন, “এমন আর কনো বিচিত্র আত্মকথা আছে মা!”

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “আছে তো। … দেখো, আমি তোমাকে একটি আত্মকথার বিবরণ দিচ্ছি। তুমি চিহ্নিত করতে পারো কিনা দেখো যে, সেটি কার আত্মকথা”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43