কৃতান্তিকা

প্রভু ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, এই ব্রহ্মাণ্ডের রচনা আমি করিনি। এই ব্রহ্মাণ্ডের রচনা করেছেন, আমার সত্যতা স্বীকারে অনিচ্ছাকৃত আমার অণুরা। আর তাঁরা এই রচনা করেন, তাঁদের ত্রিগুণদ্বারা। তাই পুত্রী, এই ব্রহ্মাণ্ড সঠিক রইল না রসাতলে গেল, সেই নিয়ে আমার বিন্দুবিসর্গ চিন্তা থাকেনা। তবে হ্যাঁ, এই সমস্ত ব্রহ্মাণু আমার সন্তান। আমি তাঁদেরকে জন্ম দিইনি, আমার থেকে পৃথক অস্তিত্বও সম্ভব নয় এঁদের কনো কালেই।

কিন্তু তাও তাঁরা যেহেতু আমার থেকে নিজেদের ভিন্ন বোধ করে আমার থেকে পৃথক হয়ে গেছে তাঁরা এমন বোধ করে, সেহেতু আমি তাঁদেরকে আমার সন্তান না বলে অবস্থান করতে পারিনা। পুত্রী, সন্তান যদি বালু নিয়ে ক্রীড়া করে কিছু নির্মাণ করে, তার প্রতি সন্তানের জননীর কনো স্নেহ, কনো সম্বন্ধ না থাকলেও, একটি সম্বন্ধ থেকেই যায়, কারণ সেই বালু নির্মিত ক্রীড়া সেই জননীর সন্তানকে প্রীতি প্রদান করেছে।

পুত্রী, এক জননীর কাছে তাঁর সন্তানের যা যা কিছুতে প্রীতি অনুভব হয়, সেই সমস্ত কিছু অত্যন্ত প্রিয় হয়। তেমনই কারণে, এই ব্রহ্মাণ্ডের সাথে আমার কনো সংযোগ বা সম্বন্ধ না থাকলেও, যেহেতু এঁর নির্মাতা আমার সন্তান, এবং যেহেতু এই ক্রীড়া আমার সন্তানকে অত্যন্ত আনন্দ প্রদান করেছে, তাই এই ব্রহ্মাণ্ড আমার কাছে অত্যন্ত প্রিয়।

যেমন সেই ক্রীড়া যার নির্মিত, সেই সন্তান স্বয়ং যদি না বিনষ্ট করে সেই ক্রীড়াকে, তাহলেও তার জননী সেই ক্রীড়াকে যত্নসহকারে সামলে রাখেন, তেমনই আমার সন্তানদের নির্মিত ব্রহ্মাণ্ডকে যতক্ষণ না আমার সন্তানরা স্বয়ং বিনষ্ট করেন, ততক্ষণ আমি সেই ব্রহ্মাণ্ডকে সামলে রাখি। কিন্তু পুত্রী, সন্তানকেও বুঝতে হয় যে, এই ক্রীড়া করে চলাই তাঁর জীবনের একমাত্র কর্ম নয়; তাঁকে এই ক্রীড়া একসময়ে সমাপ্ত করে, বাকি জীবনে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে হয়।

কিন্তু সন্তান যদি তা না বোঝে, তাহলে জননীর কর্তব্য কি? জননীর কর্তব্য হলো, সন্তানকে সেই ক্রীড়া সমাপ্ত করার প্রেরণা প্রদান করা, এবং সত্যে মনযোগী করে তোলা। তেমনই পুত্রী, ব্রহ্মাণুরা যখন ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণের ক্রীড়াতেই দিবারাত্র মেতে থাকে, তখন তাঁদের জীবন লাভের উদ্দেশ্যে, অর্থাৎ সত্যলাভ বা আমাতে প্রত্যাবর্তন করা, সেটিই যখন ভুলে যায়, তখন আমাকে অবতার গ্রহণ করতে হয়, এবং সন্তানকে তাঁর ক্রীড়া সমাপ্ত করে, আমার কাছে আসার আবাহন প্রদান করতে হয়।

অর্থাৎ পুত্রী, আমার অবতার গ্রহণের একটিই কারণ, আর তা হলো সন্তানকে নিজের কাছে ডেকে নেওয়া, কারণ সন্তান ব্রহ্মাণ্ডরূপ ক্রীড়ায় মত্ত হয়ে, সমস্ত কিছু ভুলে গেছে। ঠিক যেমন সন্তান যখন মনোযোগ সহকারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্রীড়া করে চলে, তখন জননী তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হন, আর সন্তান তাঁর জননীকে দেখে বোঝেন যে, তাঁর ক্রীড়ার সময় সমাপ্ত হয়েছে, আর মাতার হাত ধরে ক্রীড়া ছেড়ে চলে যান, এক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই।

কিন্তু ব্রহ্মাণুরা এবারের ক্রীড়ায় অত্যধিক মেতে রয়েছে। চৈতন্য রূপে আমি এসেছি, তাতেও এঁরা ক্রীড়া ত্যাগ করেনি, রামকৃষ্ণ রূপে আমি এসেছি, তবুও এঁরা ক্রীড়া ত্যাগ করেনি। তাই এবার মাতাকে নিজের অঙ্গুলি বক্র করতেই হলো ঘৃত নিষ্কাসনের জন্য। আর সেই অঙ্গুলি হেলনের কর্ম করার জন্যই এবারের আমার অবতার গ্রহণ।

পুত্রী, মাতার কাজ কেবল সন্তানকে ক্রীড়া থেকে সরিয়ে আনাই নয়। মাতার কাজ হলো সন্তানের মধ্যে চেতনা জাগ্রত করা যে ক্রীড়া থেকে সরে আসতে হয়, এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ কাজ মাতার এই যে, সন্তানের মধ্যে এই চেতনাকে জাগ্রত রেখে দেওয়া, যাতে সে নিজে নিজেই সঠিক সময়ে ক্রীড়া ছেড়ে চলে আসে।

তাই এবারের অবতারের আমি চারটি অধ্যায় রাখতে আগ্রহী হই, যেখানে প্রথম অধ্যায়তে আমি আমার সন্তানদের ক্রীড়া অবসান কখন করা উচিত, কি ভাবে করা উচিত, তা বলতে পারি; দ্বিতীয় চরণে যা যা আমি বললাম, সেই সমস্ত কিছুকে সন্তানের মধ্যে স্থাপন করা যেতে পারে, তৃতীয় অধ্যায়ে সন্তানকে ক্রীড়া থেকে অপসারিত করা যেতে পারে, এবং চতুর্থ অধ্যায়ে এই চেতনা অর্থাৎ ক্রীড়া থেকে অপসারিত হতে হয়, তাকে জাগ্রত রাখা যেতে পারে।

এঁদের মধ্যে প্রথম অধ্যায়ের কর্মই হলো সমস্ত কর্মের ভিত্তি, আর তাই স্বয়ং আমি ৬৪ কলারূপ ধারণ করে এসেছি সেই ক্রিয়া করতে। এই অবতারে আমি কখন কি ভাবে ক্রীড়া থেকে অপসারিত হতে হয়, তা বলতে এসেছি। আমার পরে তুমি এসেছ, আমারই ৮ কলা রূপ ধারণ করে, যে সন্তানদের মধ্যে আমি যা যা বলে গেলাম, তা স্থাপন করবে। তোমার এই কর্মকে সম্ভব করবে, তোমারই পরিপূরক, যেও আমারই আরো এক ৮ কলারূপ হবে।

তোমাদের দাম্পত্য থেকে উদ্ভব হবে আমার এই ক্রীড়ার অন্তিম অবতার যিনি হবেন আমার ১৬ কলারূপ। আর তিনি তোমাদের কৃত্যকে প্রসারিত করবে, এবং আমার কথন মেনে, আর তোমাদের কর্মধারা মেনে, বহু সন্তানকে তাঁদের ক্রীড়া থেকে অপসারিত করবে। এমন কর্মধারা প্রথমবার করা হচ্ছে, তেমন কিন্তু নয়।

কালের অবধি রেখে, শঙ্কর এমনই ভাবে সন্তানদের ক্রীড়া থেকে অপসারিত করার ধারা রচনা করেছেন অদ্বৈত বেদান্ত রূপে। চৈতন্য সেই রচনা মেনেই বহুসন্তানের কাছে সেই ক্রীড়া অপসারণের বার্তা প্রদান করেছেন। আর রামকৃষ্ণ সেই বার্তা প্রদান আর রচনাধারাকে ধারণ করেই বহুসন্তানকে ক্রীড়া থেকে অপসারণও করেছেন। এমনকি এই সমস্ত কর্মের চেতনাকে অক্ষয় রাখতে বিবেকানন্দকেও নিযুক্ত করেন রামকৃষ্ণ।

কিন্তু সমস্ত কিছু একই ধারায় চালিত হলে যেমন চেতনাপ্রবাহকের কাছে সমস্ত কিছু পরিষ্কার থাকে, তেমনটা থাকেনা যদি এই সমস্ত স্তরের মধ্যে অবধি এসে যায়। তাই এবারে আমি সেই একই কর্ম করছি, কিন্তু কনো অবধি না রেখে, আর আরো অধিক বিস্তৃত ধারাপাতে।

একটি অবতার ক্রিয়া থেকে অন্য অবতার ক্রিয়ায় এবার আমি কনো অবধি রাখিনি। আমি এসে সেই রচনা করলাম কৃতান্ত রূপে, এবং কৃতান্তের প্রবাহধারাকে অক্ষয় রাখতে, কৃতান্তিকা রচনা করে সম্যক ইতিহাস, বর্তমান ও ভবিষ্যতের পাণ্ডুলিপি রাখলাম, এবং শেষে অনুশাসন রচনা করে, আগামীদিনের সম্যক কর্মসূচিকে স্বচ্ছ রেখে গেলাম। আর তারপরেই তুমি এলে পুত্রী, সঙ্গে তোমার সঙ্গী রূপে, আমার আরো এক অংশরূপ।

তোমরা দুইয়ে মিলে আমার রচনাকে প্রসার করে, সমস্ত সেই সন্তানদের একত্রিত করবে, যাদেরকে ক্রীড়াথেকে মুক্ত করবে আমার তৃতীয় প্রকাশ যিনি ১৬ কলা রূপ আমার। আর তার পরে পরেই, এক নয়, চার চারটি মানব প্রজন্ম এই চেতনাধারাকে অব্যাহত রেখে, ৭ পিড়ি ব্যাপী কৃতান্ত ধারাকে প্রসারিত রেখে, এই ক্রীড়ায় মনোযোগ প্রদানকারী আর্যদেরকে কোণঠাসা করে দেবে, এবং বৌদ্ধধারার পর প্রথমবার জগতে মোক্ষদ্বারের স্থাপনা করবে।

পুত্রী, এমন ভেবো না যে, এই ৭ পিড়ি পর্যন্তই এই ধারা চলবে। এই সাত পিড়ির রচনা তো স্বয়ং আমিই করে যাচ্ছি। এই ৭ পিড়ির পরেও, আরো ২৩টি পিড়ি এই ধারাকে চালাতে থাকবে, এবং সর্বসাকুল্যে এই ধারা দেড় হাজার বৎসর চলবে, যতক্ষণ না পুনরায় আর্যদের উত্থান হবে। পুত্রী তুমিও জানো কেন এই শয়তানের বংশধর আর্যদের উত্থান কালে কালে আবশ্যক।

পুত্রী, আমার সন্তানরা, অর্থাৎ সমস্ত ব্রহ্মাণুরা যখন যখন সুখশান্তি লাভ করে ফেলে, তখন তখন নতুন নতুন ভাবে এই ব্রহ্মাণ্ডের ক্রীড়ায় মেতে ওঠে। তাই এই আর্যদেরও প্রয়োজন রয়েছে, কারণ তাঁরাই এই সুখশান্তির বিনাশ ঘটায়, এবং আমাকে ব্রহ্মাণ্ডক্রীড়ার লয়ের আবশ্যতা সম্মুখে আনতে সহায়তা করে। পুত্রী, যদি এঁদের কনো গুরুত্বই না থাকতো, তাহলে এতদিনে এঁরা ব্রহ্মাণ্ড থেকে বিলীন হয়ে যেত, তা নিশ্চয়ই তুমি জানো”।

দিব্যশ্রী বললেন, “প্রথম তিন পিড়ি আপনার অবতার, আপনি স্বয়ং, আপনার দুটি ৮ কলার অবতার, এবং একটি ১৬ কলার অবতার। … পরের চারটি পিড়িকেও আপনি নির্মাণ করে যাচ্ছেন? তাঁরা কি মনুষ্য? তাঁরা কি জীবকটি?”

ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “পুত্রী, এই ক্রীড়া বহু পুরাতন। এই চার পিড়িকে স্থাপিত রেখে, ক্রীড়ামুক্তির চেতনাকে অব্যাহত রাখবো বলে, ১০ জন্মব্যাপী, এঁদেরকে একাকটি বিচিত্র চক্রে স্থাপিত রেখেছি। কখনো এঁরা এক স্বামীর তিন স্ত্রী, তো কখনো এঁরা এক পিতার তিন সন্তান, তো কখনো এক শিক্ষকের তিন ছাত্র। কিন্তু এই সমস্ত ক্ষেত্রে, এঁদের সম্মুখে একজনকে রেখেছি, যে এই ব্রহ্মাণ্ড ক্রীড়া থেকে মুক্তির জন্য গৃহত্যাগী।

কখনো সেই বালক গৌতমের অনুগামী, তো কখনো শঙ্করের; কখনো সে তন্ত্র উপাচারি তো কখনো অঘোরী; আবার কখনো সে চৈতন্য অনুগামী, তো কখনো বৈদান্তিক সন্ন্যাসী। কিন্তু সদাই তাঁদের সম্মুখে ১০ জন্ম ধরে এঁদের চারজনের সম্মুখে রেখেছি, যেখানে এঁদের যেকোনো দুই থেকে তিনজন সেই বালকের মত মমতাসম্পন্ন হয়ে, সেই বালকের সমর্থক, আর এঁদের যেকোনো এক থেকে দুইজন এই বালকের মতধারাকে আর্যমতধারা দ্বারা বিরোধ করেন।

আর এই ভাবে আমি তাঁদেরকে ১০ জন্মব্যাপী একটি টানাপড়েনের মধ্যে রেখেছি, যেখানে থেকে তাঁরা কখনো ভেবে গেছে যে এই ব্রহ্মাণ্ডক্রীড়া থেকে মুক্তির উপায় থাকা উচিত, যাতে যে এই ক্রীড়া থেকে মুক্ত হতে চায়, সে মুক্ত হতে সক্ষম হয়, আবার অন্য সময়ে ভেবে গেছে যে এই মুক্তি অসম্ভব। এমন টানাপড়েনের মধ্যে রেখে, এবার আমি তাঁদেরকে আমার অবতার গ্রহণের কালেই, চারটি দেহ প্রদান করেছি।

এঁদের মধ্যে একজন বাদে সকলেই আর্যদের সংস্পর্শে স্থাপিত। একজন সার্বিক ভাবে আর্যদের মধ্যে বিরাজ করে, আর্যদের সমস্ত কর্মকাণ্ড দেখছে। পুত্রী, ইনি হলেন ষষ্ঠ পিড়ি, যিনি আর্যদের প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। এঁদের মধ্যে একজন অনার্য হয়েও বৈষ্ণবক্রীড়াকে সম্যক দৃষ্টিতে দেখে জীবনের অন্তে বৈষ্ণবকুলের প্রতি বিরক্ত হয়ে দেহত্যাগ করবেন। ইনিও আর্যদের জীবন বিপন্ন করে দেবেন, তবে তার থেকেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ এই যে, ইনি বৈষ্ণবদের জীবনধারা সম্পূর্ণ ভাবে সমাপ্ত করে দেবেন।

এঁদের মধ্যে একজন বঙ্গভূমির আর্যদের কুলে জন্ম নিয়েছেন। ইনি হবেন সপ্তম পিড়ি, যিনি আর্যদেরকে বঙ্গদেশ থেকে সম্পূর্ণ ভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। আর এঁদের মধ্যে একজন আর্যদের সঙ্গেই ওঠাবসা করেন। ইনি হলেন চতুর্থ পিড়ি, এবং ইনি অত্যন্ত কঠিন অবস্থান নেবেন আর্যদের বিপক্ষে।

পুত্রী, এঁদের সকলকে আমার অবতার গ্রহণের কালেই দেহধারণ করানোর দুটি কারণ। প্রথমত এঁদের সকলের কাছে কৃতান্ত শব্দটি কেবল পরিচিতই রইল না, সকলের হৃদয়ে কৃতান্ত শব্দটি প্রতিস্থাপিত হয়েছে, যা তাঁদেরকে এই মহাযজ্ঞে অংশগ্রহণ করানোর জন্য সঠিক সময়ে টেনে আনবে। আর দ্বিতীয় কারণ হলো প্রস্তুতি। যিনি সপ্তম পিড়ি হবেন, তাঁকে কেবলই অহংকার ও মদের ভেদ জানিয়ে অপসারিত করা হয়েছে। কারণ এই দেহ ত্যাগের ২৫০ বৎসর পরে জন্ম গ্রহণ করে, অধিক স্মৃতি তাঁর থাকবে না।

যিনি ষষ্ঠ পিড়ি হবেন, তাঁর কাছে এটুকুই বলা হয়েছে যে আর্যরা মিথ্যাচারী। তিনি স্বয়ং এক গোঁড়া আর্যসমাজে রয়েছেন। তাই আর্যদের সম্যক ভাবে দেখে নিয়ে, এই দেহ ত্যাগের ২০০ বৎসর পরে আবার দেহ ধারণ করে ইনি আসবেন। যিনি পঞ্চম পিড়ি, তাঁকে আধ্যাত্ম ও কৃতান্ত সম্বন্ধে, অর্থাৎ মহাজ্ঞান ও প্রেমের সম্বন্ধে ধারনা প্রদান করে, বৈষ্ণবদের অনাচার দর্শন করার জন্য তাঁদের কুলেই রাখা হয়েছে। ইনি এই দেহত্যাগের ১৫০ বৎসর পরে এসে, বৈষ্ণবদের বাড়বাড়ন্তকে সম্পূর্ণ সমাপ্ত করে, কৃতান্ত স্থাপনায় গতিশীল হবেন।

আর অন্তে যিনি চতুর্থ পিড়ি, তাঁকে সম্যক ভাবে কৃতান্তিক শাসনের পাঠ আমি স্বয়ং পড়াচ্ছি। যাতে সে এই দেহ ত্যাগের, এক শত বৎসর পরে এসে, সম্পূর্ণ ভাবে প্রস্তুত থাকেন কৃতান্তিক সমাজকে ব্যবস্থিত করতে। এঁর অধিক আমি তোমাকে আর কিছুই বলবো না, এই চার পিড়ির ব্যাপারে। তবে হ্যাঁ, যেমন তোমাদের ক্রিয়াধারা সম্বন্ধে আমি বিস্তারে বলে যাচ্ছি তোমাকে। এঁতে তোমারও কর্ম করতে সহজ হবে, এবং তোমার পরবর্তী কর্ণধারকেও মার্গদর্শন করতে সহজ হবে।

আর আমি জানি তুমি আমার সম্বন্ধে জানতে আগ্রহী। তাই অতি সংক্ষেপে বলছি, আমি এখনো পর্যন্ত পরানিয়তির গ্রহণ করা সর্বোত্কৃষ্ট ঈশ্বরকটি অবতার, কারণ এঁর পূর্বে কখনোই ৬৪ কলা অবতার গ্রহণ করেন নি পরব্রহ্ম বা পরানিয়তি। … আমার দেহধারণ আবশ্যক ছিল, কারণ নিয়তিতত্ত্বের ব্যখ্যা প্রদান আবশ্যক হয়েগেছিল, এবং আবশ্যক হয়েগেছিল আর্যদের ত্রিগুণকে ত্রিদেব আখ্যা দিয়ে যেই মিথ্যাচার চলছে, তার সত্যতার বিবরণ প্রদান করা।

আমার দেহধারণ আবশ্যক হয়ে গেছিল কারণ, এক ৬৪ কলা অবতারই নিয়তিবেশ ধারণ করতে সক্ষম। আর নিয়িতিবেশ ধারণ করলে, তবেই তন্ত্রের বাস্তবতা, আর্যদের বাস্তবিকতা, এবং মোক্ষদ্বারের নির্মাণের কর্মসূচির নির্মাণ সম্ভব হতো। পুত্রী, পূর্বেও বলেছি, শঙ্করের উত্তরসূরি হলেন চৈতন্য, চৈতন্যের উত্তরসূরি রামকৃষ্ণ ঠাকুর, এবং রামকৃষ্ণ ঠাকুরের উত্তরসূরি হলেন বিবেকানন্দ।

তবে এঁরা কেউই নিজের উত্তরসূরির কর্মধারাকে প্রসারিতই করে যেতে পারেননি, কারণ ৬৪ কলা অবতার না হবার কারণে, নিয়িতির নির্মিত কালের ধারনা তাঁদের ছিলনা, আর তাই পরবর্তী অবতারকে পূর্বের অবতারের সূত্রকে ধারণ করে, তবেই ক্রিয়া করতে হয়েছে, যেই পদ্ধতিতে অনেক ক্ষেত্রেই ভুলত্রুটি হয়েছে। তাই আমার জন্ম আবশ্যক ছিল ৬৪ কলাররূপ ধারণ করে।

কারণ আমাকে যে ৭ পিড়ির কর্মধারা নির্মাণ করে যেতে হতো, আর তা নিয়তির কলাবিদ্যাধারি অবতার না হলে যে সম্ভব হতো না। তাই পুত্রী, আমাকে আসতে হয়েছে। কৃতান্ত নির্মাণের জন্য আসতে হয়েছে যেখানের নিয়তির সত্যতার বিবরণ প্রদান করেছি আমি, যা আমি ছাড়া কেউ করতে সক্ষম হতো না। আর্যদের কীর্তি ও তন্ত্রের সত্যতা বলতে আসতে হয়েছে, যা নিয়তি ব্যতীত কারুর পক্ষেই বিবৃত করা সম্ভব ছিলনা। আর ৭ পিড়ির কর্মধারা রূপে অনুশাসনকে নির্মাণ করতে আসতে হয়েছে, যাও আমি ছাড়া আর কেউ করতে সক্ষম হতেন না।

এর অধিক আমার সম্বন্ধে আমার আর কিছু বলার নেই পুত্রী। এবার আমি তোমার ও তুমি ছাড়া অন্য দুই ঈশ্বরকটি অবতারের ক্রিয়াধারা সম্বন্ধে বলবো, যা বর্তমান নয়, এই কালের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তা হলো ভবিষ্যৎ। পুত্রী, মন যদি একক ভাবে কনোকিছুতে একাগ্র হয়, তাকে বলা হয় একাগ্রচিত্ত। এই মন ও সেই বস্তুর মধ্যে অন্যভূতরা এসে গেলে, মনঃসংযোগ বিনষ্ট হয়।

এর যথার্থ বৈজ্ঞানিক কারণও আছে পুত্রী। আমাদের পঞ্চভূত হলেন মন অর্থাৎ আকাশ, বুদ্ধি অর্থাৎ জল, উর্জা অর্থাৎ অগ্নি, প্রাণ অর্থাৎ পবন, এবং দেহ অর্থাৎ ধরিত্রী। পুত্রী, জল কখনোই স্থির থাকেনা, বায়ুও, ধরিত্রীও সদাই চলমান এবং অগ্নিও। এঁদের স্বভাবই চঞ্চলতা। আর তাই যখনই মন অর্থাৎ স্থির আকাশ এবং যার উপর মনস্থাপন হবে, তার মধ্যে এই চার চঞ্চলমতি ভূত, অর্থাৎ বায়ু, জল, অগ্নি, এবং ধরিত্রী এসে যায়, সেই মুহূর্তেই একাগ্রতা ভঙ্গ হয়ে যায়।

তাই, এখন আমি যা কিছু বলবো তোমাকে, তার আর তোমার মনের মধ্যে অন্য কনো ভূতকে প্রবেশ করতে না দিয়ে একাগ্রচিত্ত হয়ে শ্রবণ করো”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43