কৃতান্তিকা

ইতিহাস শ্রবণে মহাগ্রহী দিব্যশ্রীর উদ্দেশ্যে প্রভু ব্রহ্মসনাতন বলতে থাকলেন, “পুত্রী, মাতা যেই শয়তানের গোষ্ঠীর কথা বলেছিলেন, তাদের উত্থানে ভারতমাতা কম্পিত হয়ে গেছিলেন, দিশাহিন হয়ে গেছিলেন। এখানের সমস্ত মানুষ তখন তটস্থ হয়ে গেছিলেন, কারণ ঘরের বাইরে পা দিলে, কে যে পুনরায় ঘরে ফিরবে আর কে যে আর কনোদিনও ফিরবে না, তার কনো নিশ্চয়তা ছিলনা।

সংগ্রামের বাতাবরণ সর্বত্র, কিন্তু কি কারণে সংগ্রাম, তা কেউ জানেনা। তাঁদের নাকি বহু অমীমাংসিত দাবি, কিন্তু কি তাঁদের দাবি, তা কেউ জানেনা। যদিও, অন্য কেউ না জানলেও, তাঁরা নিজেরা সেই দাবি অবশ্যই জানতেন। দাবি ছিল, হাতবদলের। যেই শাসকগোষ্ঠী দেশের শাসন করছেন, সকলের মুখে অন্ন তুলে দেবার জন্য প্রাণপণ দৌড়চ্ছেন, তাতে করে কেউ অধিক ভাগ পাচ্ছেনা, আর এই সংগ্রামী গোষ্ঠীর প্রয়োজন অধিক, সকলের থেকে অধিক, সর্বাধিক।

আর এই সর্বাধিকের নেশাই এই শয়তান গোষ্ঠীর সংগ্রামের মূলকারণ, যদিও সম্মুখে জনদরদি বলা ভুল হবে, জনগণকে মিথ্যা স্বপ্ন দেবার মত অনেক কথাই ছিল তাঁদের। আপামর জনতা কতটা সেই মিথ্যা কল্পনাতে ভুলেছিলেন, তা এক জিজ্ঞাসা চিহ্ন। আপামর জনতা খেটে খাওয়া মানুষ, তাঁরা খুব ভালো করে জানে, কোনটি বাস্তব, আর কোনটি কল্পনা। তবে দুইপাতা বিদ্যা অর্জনকারীরা কল্পনার জগতে থাকতেই পছন্দ করেন। আর তাঁরা এই শয়তান গোষ্ঠীর কল্পনা উত্তেজক শব্দে অত্যন্ত প্রভাবিত হন।

তরবারির চাইতে কলমের জোর অধিক, জানা সত্ত্বেও, কলম ত্যাগ করে, তরবারি ধরলেন তাঁরা, এবং দলে দলে কল্পনা উত্তেজক শয়তান গোষ্ঠীর সাথে হাত মেলাতে শুরু করলেন। হতকুচ্ছিত এই শয়তান গোষ্ঠী, তবে কতটা কদর্য এই শয়তানের প্রকৃত রূপ, তার ধারনা কেউ করতে পারছিলেন না। পারলেন তখন যখন এঁরা তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর থেকে শাসন ছিনিয়ে নিলেন।

সমস্ত সম্পদ কুক্ষিগত করা শুরু করলেন তাঁরা, আর একবার তা করা হয়ে গেলে, তাঁদের নাট্য তাঁরা নিজেরাই ভুলে গেলেন। ত্যাগ, বিলাসিতা বিরোধ, সমস্তই যে গালগপ্প ছিল, তা আপামর জনতা বুঝে গেছিলেন, কারণ এঁরা যে মানুষের থেকে আয় করা সমস্ত অর্থকেই আপন সম্পদ জ্ঞানে কুক্ষিগত করা শুরু করে দিলেন।

নির্বাচন করার অধিকার আছে আপামর জনতার। কিন্তু এই শয়তান অত্যাচারী নবশাসক সেই অধিকারকেও ছিনিয়ে নিলেন একপ্রকার। বিরোধ করলে ঘরবাড়ি নয়, সম্যক গ্রামই উজাড় করে দিতেন; যার যা কিছু সম্পদ সমস্ত কিছু লুণ্ঠন করে নিতে শুরু করলেন; সরকারের চাকর করার নাম করে শিক্ষিতেরও সর্বস্ব লুণ্ঠন করা শুরু করে দিলেন, এবং সেই সমস্ত লুণ্ঠন করা ধনের একাংশ দ্বারা অর্থের বলে, অস্ত্রের বলে, আপামর জনতার নির্বাচন অধিকারও কেড়ে নিলেন।

এতেই শান্তি হয়নি তাঁদের, যেমন পরানিয়িতি বঙ্গমাতাকে বলেছিলেন, ঠিক সেই উপায়ে, একের পর এক কলকারখানা বন্ধ করে, বঙ্গভূমিকে হতদরিদ্র করে দিতে শুরু করলেন। শাসকগোষ্ঠীর সাথে যারা যুক্ত, তাদেরকেই শিক্ষকের পদে নিয়োগ করে, অযোগ্য শিক্ষকের কবলে সম্যক বঙ্গের মেধার ধ্বংসলীলা শুরু করলেন। ধ্বংস করা শুরু করলেন বঙ্গের কলা, শিল্প, নাট্যকলা, সঙ্গীতকলা, সর্বস্বকিছু।

আর এই সমস্ত কিছুর অন্তরালে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন বঙ্গমাতার অবতার, কালীঘাটের তরুণী। অকৃত্তিম অমানসিক সংগ্রাম ছিল তা। দেহের সর্বত্রে এই অত্যাচারী শাসক আঘাত করতে ছাড়েন নি। যেমন বঙ্গভূমিকে অত্যাচার করে চলেছিলেন, সমান ভাবে বঙ্গমাতার অবতারকে অত্যাচার করা শুরু করলেন। যেমন বঙ্গমাতার সম্যক হত্যার পরিকল্পনা করে চললেন, তেমনই বঙ্গমাতার অবতারেরও হত্যালীলার মঞ্চ একাধিকবার সাজালেন।

কিন্তু বঙ্গমাতার অবতার তিনি। তাই বঙ্গমাতার মতই অদম্য। আর অদম্য তাঁর বঙ্গ ও বঙ্গবাসীর প্রতি প্রেম। যতই নিষ্ঠুর হতে থাকলেন এই শয়তান প্রেরিত শাসকগোষ্ঠী, ততই অধিক মমতাময়ী হয়ে উঠলেন বঙ্গমাতার অবতার। আর বঙ্গবাসী তাই ক্রমে ক্রমে, তাঁকে আঁকড়ে ধরা শুরু করলেন। কিন্তু আঁকরে ধরলে কি হবে, নির্বাচন প্রক্রিয়াকেই যে বশীভূত করে রয়েছেন এই শয়তান প্রেরিত দূত শাসকগোষ্ঠী।

কিন্তু বঙ্গমাতা মহাকালীর আশীর্বাদে, এই বশীকরণের উপায় নির্মাণ করলেন। আপামর বঙ্গবাসীর উদ্দেশ্যে বললেন, “একজনও নির্বাচনের অধিকার থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখবেন না। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে নিজের মতামত নির্বাচনী তথ্যভাণ্ডারে জমা করুন। তাহলে এই শাসকগোষ্ঠী আর আপনাদের মতামত প্রদানকে আটকাতে পারবেননা”।

বঙ্গবাসী বঙ্গমাতার  কথা শুনবেনা, তাও কি সম্ভব। যেমন বঙ্গমাতার অবতার বলেছিলেন, তেমনই করলেন বঙ্গবাসী। পরাজিত হলো শাসকগোষ্ঠী। অবসান হলো দীর্ঘ তিন দশকের শোষণ। কিন্তু হতাশ হলেন না শয়তানের গোষ্ঠী। যেই পরিমাণ শোষণ করেছেন তাঁরা, তাঁরা নিশ্চিত যে, বঙ্গদেশকে আর রক্ষা করা সম্ভব হবেনা। কনো ভাবে আর বঙ্গদেশ নিজের মেরুদণ্ডকে আর সোজা রাখতে পারবেনা। আর এই ব্যর্থতাকে পুনরায় মানুষের কাছে দেখিয়ে, তাঁরা আবার শাসকের আসনে ফিরে, পুনরায় অত্যাচার, লুণ্ঠন করবে, এবং বঙ্গমাতার চিতাকে সজ্জ করবে।

কিন্তু শয়তান স্নেহ মমতা ও মাতৃত্বের কিই বা বোঝে! বঙ্গমাতার অবতার ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে, দরিদ্র বঙ্গসন্তানদের পাশে দাঁড়াতে শুরু করে দিলেন। ধনধান্যে বঙ্গভূমি প্লাবিত হওয়া শুরু করলো। আর তাই আসতে শুরু হলো অর্থ। একদিকে যেই ঋণের বোঝায় বঙ্গমাতাকে শয়তান গোষ্ঠী মৃত্যু প্রদান করতে উদ্যত হয়েছিল, সেই ঋণ শোধ করতে থাকলেন তিনি, আর অন্য দিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কারখানা স্থাপনে সহায়িকা হয়ে উঠলেন তিনি।

সাথে সাথে অজস্র রাজস্ব আয়ের উপায় করলেন। বঙ্গদেশের বাইরের অধিবাসীদের থেকে রাজস্ব আয়ের জন্য ভ্রমণের স্থানকে সুন্দর ভাবে সাজাতে শুরু করলেন, যাতে সেখান থেকে অধিক রাজস্ব আসতে শুরু করে, এবং সাথে সাথে যেই যেই স্থানে শয়তান শাসকগোষ্ঠী নিজের শয়তান সেনাদের নিয়োগ করে রেখে দিয়েছিলেন, তাঁদেরকে অপসারিত করে, প্রবল কর্মসংস্কৃতির সঞ্চার করলেন।

ক্রমশ অধিক জনপ্রিয় হতে শুরু করলে, তিনি নিজের অর্থভাণ্ডারকে ভরিয়ে তুললেন। আর ভরিয়ে তুলেই যা করলেন, তা হলো বঙ্গবাসীদের দুর্দশার অন্ত করা শুরু করলেন। স্বল্পব্যায়ে আহার প্রদান করলেন, শিক্ষার প্রসারের জন্য বৃত্তি প্রদান করা শুরু করলেন, এবং স্বামীদের কাছে প্রহৃত স্ত্রীদের হাতে অর্থ প্রদান করে, বঙ্গবাসীর অন্তরে শয়তানশাসকের যা কিছু ভীতি ছিল, তা প্রায় সম্পূর্ণ মুছে দিলেন।

প্রথম যুদ্ধে তিনি বিজয়ী। এখন তিনি বঙ্গভূমির মহারানী। তবে প্রকৃত যুদ্ধ যে তখন কেবল শুরুই হয়েছিল। শয়তানের মহাবতারের যে সবেই জাগরণ শুরু হল্যেছিল তখন। সবেই তো সেই মহাবতার অনার্য দমনের তরবারি হস্তে ধারণ করেছিলেন। অনার্যদের হনন তখন তো তিনি সবেই শুরু করেছেন।

ছল-চাতুরী ও ঋণ নেওয়া অর্থের বিনিময়ে শয়তান যেমন যান্ত্রিকতার বিস্তার করে, তেমন করেই তিনি প্রভাসের রাজত্ব অধিগ্রহণ করেন, আর তা করার পরেপরেই আর্যদের উদ্দেশ্যে জানান দিলেন যে অনার্য নিধনকারী শয়তানের মহাবতার অবতীর্ণ হয়ে নিজের কর্মের শুরু করে দিয়েছেন। জানান দেবার পদ্ধতিও অত্যন্ত ভয়াল শয়তানী ধারাতেই সম্পন্ন করেন তিনি।

প্রভাসের বুকেই এক মহা অনার্যনিধন মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করে, শত শত অনার্যের বলি দেওয়া শুরু করে দেন, শাসকের তরবারিকে কুক্ষিগত করে রেখে। আর সেই কর্মের ফলে, আর্যরা পুনরায় সজ্জ হয়ে উঠলেন। সজ্জ হয়ে উঠলেন শামাপ্রসাদের বৃন্দগণরূপে যেই আর্যরা গাঢাকা দিয়েছিলেন, তাঁরাও। আর তাঁরা সকলে মিলে নিশ্চয় করলেন, এবার এই মহাবতারকে ভারতভূমির শাসকের পদে উন্নীত করতেই হবে। তবেই বঙ্গের নাশ হবে, আর তবেই ভারত পুনরায় আর্যবত্র হয়ে উঠবে।

কিন্তু তা যে সহজ উপায়ে সম্ভব নয়। তাই শুরু করলেন জালিয়াতি। নির্বাচন পদ্ধতির কর্মকর্তাদের পদে স্থাপিত করলেন আর্যদের এবং শাসক করে স্থাপিত করলেন মহাবতারকে। ক্রমশ বিচারকের ভূমিকায়, ও সবস্ত রাজনীতির স্তম্ভের ভূমিকায় আর্যদের স্থাপন করলেন। যেখানে তা সম্ভব হলো না, সেখানে ভীতি সঞ্চার করে বা অর্থবিনিয়োগ করে করে, সমস্ত কিছুকে কুক্ষিগত করে নিলেন।

সমস্ত দেশের সমস্ত আদালতের সমস্ত রায় এই মহাবতারের পক্ষে আসা শুরু হলো, তা অন্যায় এবং চরম অন্যায় হলেও, আর্য মহাবতারের পক্ষেই আসা শুরু হলো। এবং এই মহাবতারের যত বিরোধী আছে, তাঁদেরকে লুণ্ঠনের মিথ্যা মোকদ্দমায় নিযুক্ত করে করে, সমস্ত অনার্য ও অনার্য সহায়ককারী ব্যক্তি ও সংস্থাকে অত্যাচার করা শুরু করে, সম্যক ভারতে এক মহা অত্যাচারের বাতাবরণ শুরু করলেন সেই মহাবতার।

আর সর্বভাবে সর্বরাজ্যের অনার্যদের নিজের পদতলে স্থাপিত হতে বাধ্য করে, দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন বঙ্গদেশে। কিন্তু স্বয়ং বঙ্গমাতা এখানে স্থিতা মানবীয় রূপে। মানবীয়রূপে স্থিতা বলেই হয়তো, প্রথমদিকে সামান্য অত্যাচার করতে সক্ষম হলেন। কিন্তু সামাল দিতে থাকলেন বঙ্গমাতা। অত্যাচারের শীর্ষে রইল বঞ্চনা, তো দ্বিতীয় স্থানে রইল প্রবঞ্চনা। তৃতীয় স্থানে রইল অরাজগতা, তো চতুর্থ স্থানে রইল বিপন্নতা।

সমগ্র ভারতে অনার্য অত্যাচারের আদলে বঙ্গদেশেও একই প্রকার অরাজগতা বিস্তার করার প্রয়াস করতে ছাড়েন না শয়তানের মহাবতার, কিন্তু বঙ্গমাতার সাথে যে সাখ্যাত নিয়তির আশীর্বাদ যুক্ত রয়েছে। তাই কিছুতেই মহাবতার সুবিধা করতে পারলেন না, কিছুতেই বঙ্গদেশে আর্যসমাজ স্থাপন করতে পারলেন না।

হাজার বঞ্চনা, সহস্র প্রবঞ্চনা, শতাধিক অরাজগতা করেও না তো বঙ্গমাতার অবতারকে টলাতে পারলেন, আর না বঙ্গবাসীকে ভ্রমিত করতে পারলেন। যেই প্রবঞ্চনার কারণে সম্পূর্ণ ভারত নতমস্তক হয়েছিল মহাবতারের কাছে, সেই প্রবঞ্চনার উত্তর দেওয়া হলো বঙ্গদেশ থেকে।

এক নয়, দুই নয়, তিন তিনবার আক্রমণ হানলো শয়তানের মহাবতার এই বঙ্গদেশের উপর, কিন্তু বঙ্গমাতা তাঁর প্রতিটি আক্রমণের উত্তর দিতে থাকলে, এবং মহাবতারকে পরাজিত করতে থাকলে, ক্রমশ বঙ্গমাতার অবতার সমস্ত ভারতে শয়তানের প্রকোপ থেকে উদ্ধারের প্রেরণা হয়ে উঠলেন। যুক্ত হলেন তাঁর সাথে সকলেই। বঙ্গসন্তানদের উপর চাপ আরো অধিক হয়ে উঠতে শুরু করলো। একদিকে বঙ্গমাতার কর্মচাপ, তো অন্যদিকে বিচারালয়কে, সংবাদমাধ্যমকে, এবং অন্যান্য মহলের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকলো শয়তানের মহাবতার।

কিন্তু না তো বঙ্গমাতা আর না বঙ্গ সন্তানেরা লড়াই ছাড়লেন। মাটি কামরে পরে রইলেন সকলে। যতই আক্রমণ জরালো হলো, ততই অধিক মাটির প্রতি আকর্ষণ বাড়ল বঙ্গসন্তানদের। আর অবশেষে, বঙ্গমাতার অপরিসীম ধৈর্য, সন্তানদের প্রতি স্নেহ, এবং রাজনীতির সিদ্ধান্তকে যখন সম্পূর্ণ ভারত গ্রহণ করলো, এবং সকল অনার্যরা সংঘবদ্ধ হলেন শয়তানের প্রকোপ দূর করতে।

বিদেশিশক্তির সাথে হাত মিলিয়ে এবার মহাবতার ভারতে যান্ত্রিক শক্তি বৃদ্ধি করার চক্রান্তে অংশগ্রহণ করলেন, এবং ওষধির নাম করে যান্ত্রিকতার বিষ প্রদান করতে শুরু করলেন। বঙ্গমাতা থাকতে বঙ্গভূমি ও বঙ্গবাসীর কিসের চিন্তা? সকলকে যেমন জোর করে নিজের নিজের রাজ্যের অধিবাসীদের বিষপ্রদান শুরু করলেন, বঙ্গমাতাকেও তেমনই করতে হতো। কিন্তু তিনি নির্দেশ দিলেন অত্যন্ত লঘুমানে সেই বিষ প্রদান করতে, যাতে রাজ্যবাসীর মধ্যে সেই বিষ তেমন ক্রিয়া করতেই না পারে।

সমগ্র ভারতবাসীর মধ্যে রোগভোগের বিস্তার হলো, বিশেষ করে শহরতলিতে। কিন্তু বঙ্গদেশ সুরক্ষিত রইলেন, আর সুরক্ষিত রইলেন সমস্ত দেশের কৃষকরা, যারাও এই আর্য মহাবতারের ক্রুর মনোভাবকে উপলব্ধি করে নিয়ে, এই বিষ ওষধি থেকে দূরে থাকেন। আর এবারে বঙ্গমাতার এই অসম্ভব জয়লাভের পর, ভারতের সমস্ত অনার্য নেতাদের বিশ্বাস জন্ম নেয় যে, যদি কেউ এই শয়তান আর্য মহাবতারের বিরুদ্ধে জয়লাভ করাতে পারে অনার্যদের, তা হলেন বঙ্গমাতার অবতার স্বয়ং।

আর তাই এবার সকলে বঙ্গমাতাকে মধ্যস্থলে রেখে, নির্বাচনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। যেই বিদেশিশক্তির সাহায্যে ভারতের নির্বাচনী পদ্ধতিকে মহাবতার নিয়ন্ত্রণ করে শাসকের আসনে স্থিত ছিলেন, সেই বিদেশিশক্তিকে চারিদিক দিয়ে ঘেরার রাজনীতি করালেন তিনি। আর তার ফলে তৃতীয়বার শাসক হবার সম্মুখে এসে গেল মহাবতারের কাছে বিপদের ঘনঘটা। বিদেশিশক্তির সহায়তা এবার আর তিনি লাভ করবেন না।

নিজস্ব সামর্থ্যে জনগণের মন পেতে হবে তাঁকে। আর এমনই পরিস্থিতিতে শুরু হয় নির্বাচন প্রক্রিয়া, আর তাতে শয়তানের মহাবতারের বিশ্রী পরাজয়ের সূচনা হয়, জা চতুর্থ নির্বাচনে গিয়ে তানর পরাজয়কে নিশ্চিত করে। পরাজিত হয়ে, অনার্য শোষণ বন্ধ হলেও, আর্য প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করে মহাবতার। কিন্তু বঙ্গমাতা পশ্চাতে থেকে একটি একটি করে আইন নির্মাণ করে, সেই সমস্ত আর্য প্রতিষ্ঠার কর্মসূচিকে স্তব্ধ করে দেন।

অতঃপরে, সাধারণ জনতাকে উত্তপ্ত করার প্রয়াস করেন মহাবতার আর্যবিরোধী শাসক রূপে বিরোধী সরকারকে আক্রমণ করে। কিন্তু বঙ্গমাতা সকলকে বললেন, “সকলের আহার, নিদ্রা যেন সুসম্পন্ন হয়, সেই দিকে মন দিতে। আপামর জনতা সুখেশান্তিতে জীবনযাপন করতেই মনযোগী। তা যদি করতে পারেন তাঁরা, তাহলে কারুর কনো কথাই তাঁদের কানে প্রবেশ করবেনা।

সেই দিকে মনঃসংযোগ করতে থাকলে, মহাবতার ব্যর্থতার পর ব্যর্থতা লাভ করতে করতে, এক সময়ে দেহত্যাগ করেন, এবং সেইকালের জন্য আর্যপ্রতিষ্ঠা স্তব্ধ হয়ে যায়, এবং বঙ্গভূমি সুরক্ষিত থাকে বঙ্গমাতার অবতারের অসামান্য বৈপ্লবিক জীবনের কারণে, এবং বঙ্গবাসীর কাছে তিনি চিরস্মরণীয় থেকে, ভবলীলা ত্যাগ করে, আমার সম্মুখে উপস্থিত হলেন, এবং বললেন, “মা তুমি স্বয়ং দেহধারণ করে রইলে, অথচ আমি মানবীয় বিকারে থাকার কারণে সেই সংবাদও পেলাম না! … জানতে পারলে তোমার সাখ্যাতে সেবা করতে পারতাম”।

আমি তাঁকে হেসে বললাম, “পুত্রী, সেবা করার প্রথমাধিকার সন্তানের নয়, মাতার। আর তাই আমি সেবা পেতে আসিনি, আমি সেবা করতে এসেছি। আমার কর্মকাণ্ডের শুরু হয়েছে সবে। অনেক কর্ম এখনো বাকি। আর্যদের সমূলে বিনাশ করে, সকলের মধ্যে মৈত্রী স্থাপন করে, মোক্ষদ্বার উন্মোচন করলে, তবেই আমার কর্ম সম্পন্ন হবে। তোমার অসাধারণ বৈপ্লবিক জীবন সত্যই বঙ্গবাসীর জন্য এক উপহার। তোমার অবতার গ্রহণ সার্থক হয়েছে পুত্রী। এবার আমাকে আমার কর্ম সম্পন্ন করতে দাও”।

বঙ্গমাতা নিজের অবতারের স্থূল দেহ আগেই ত্যাগ করেছিলেন। সূক্ষ্ম দেহ ত্যাগ করে, আবার তিনি বঙ্গভূমিতে বিলীন হলেন। আর তারপর শুরু হলো এক নতুন ক্রিয়াধারা, যা তুমি এক্ষণেও দেখছ। আর পুত্রী, স্মরণ রেখো যে, এক্ষণে যা হচ্ছে, বা আগামীদিনে যা কিছু হবে, সেই সমস্ত আমার অঙ্গুলিহেলনেই সম্ভব হচ্ছে ও হবে”।

দিব্যশ্রী বললেন, “মা … আমি তোমার সম্পূর্ণ জীবনের বর্ণনা পেতে চাই। না… ভৌতিক জীবনের কথা শুনতে আগ্রহী নই আমি। আমি আগ্রহী আমার মায়ের কাণ্ড জানতে। আপনি তাঁর শ্রেষ্ঠসম্ভব অবতার। তাই আপনাকে মধ্যে রেখে, তিনি কিছুই করেন নি। যাকিছু করেছেন তা আপনিই করেছেন, কারণ আপনি স্বয়ং তিনিই। তাই মা, আমি জানতে চাই যে আপনি কি কি করেছেন। বা যদি ভৌতিক অর্থে প্রশ্ন করতে বলেন তবে আমার প্রশ্ন এই যে, পিতা, কৃপা করে আমাকে বলুন যে মাতা কি করলেন আপনাকে সম্মুখে রেখে”।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43