প্রথম পর্ব – উদ্ধারলীলা
পিতার নির্দেশে বিভিন্ন গ্রন্থপাঠের শেষে একদিন দিব্যশ্রী পিতার কাছে এসে বললেন, “পিতা, আমি একটি ব্যপারে জানতে ইচ্ছুক। আর তা এই যে, আপনি যেই কৃতান্ত কথা বলেছেন আমাকে, অর্থাৎ যেখানে আত্ম একাত্ম হয়ে যাচ্ছেন, এবং পরানিয়তির কাছে সমর্পণ করছেন, এটিই কি সকলের লক্ষ্য! বোঝাতে পারলাম না আমার প্রশ্ন আপনাকে। আমার প্রশ্ন এই যে, এই প্রয়াস কি সকলেই করতে পারেন? এটি কি সকলের কাছে সহজ লোভ্য!”
ব্রহ্মসনাতন হাস্যমুখে বললেন, “না, এই পথ কেবলই সাধকের জন্য। সাধক তাঁর অন্তিম অবস্থায় এসে এই পথে চলতে সক্ষম হন, যদি তিনি তাঁর বিভ্রান্তিকে ত্যাগ করতে পারেন। অর্থাৎ, যদি সমাজে প্রচলিত অহংকারের আরাধনার থেকে নিজেকে অপসারিত করতে সক্ষম হন, তবেই এক সাধক এই পথে চলতে পারেন, তবে হ্যাঁ, তুমি যেই প্রথম কথা আমাকে বললে এখন, অর্থাৎ এটিই সকলের লক্ষ্য কিনা! তার উত্তর হ্যাঁ, এটিই সকলের পরমলক্ষ্য”।
দিব্যশ্রী চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, “তাহলে এই অবস্থায় উন্নীত হবার আগে কি কি করেন ব্যক্তি! … কর্ম তো কেউই করেন না, তা তো কৃতান্ত থেকেই জেনেছি আমি। সেখানে থেকে এও জেনেছি যে কেবলই কর্ম করার চিন্তা, ইচ্ছা আর কল্পনাই হলো কর্ম। … আর এও জেনেছি যে এই চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনার নাশ হতে হয়। এও জেনেছি কৃতান্ত থেকে যে তাদের নাশ স্বয়ং নিয়তির সাখ্যাতকারেই সম্ভব। কিন্তু তারা সর্বক্ষণ নিয়তির থেকে অর্থাৎ যথার্থের থেকে নিজেদের আচ্ছাদিত করে রেখে দেয়। তাহলে উপায় কি?
ইচ্ছা, চিন্তা আর কল্পনা সর্বদা আত্মকে তিনখণ্ডে অর্থাৎ ত্রিগুণে বিভক্ত করে রেখে দেয়, আর এই তিনগুণে বিভক্ত থাকা অবস্থায় আত্ম সর্বদাই অহংকারে আবদ্ধ হয়ে থাকে, আর তাই ইচ্ছা, চিন্তা আর কল্পনাকে নিয়তির সম্মুখে আন্তেই পারেনা। কৃতান্ত থেকে এও জেনেছি যে যখন আত্ম ত্রিগুণ থেকে একত্রিত হয়ে গিয়ে অখণ্ড হয়ে ওঠে, তখনই নিজের অহংকারের পর্দার অপসারণ করে, চিন্তা, ইচ্ছা ও কল্পনাকে নিয়তির সম্মুখে নিয়ে আসতে পারে।
কিন্তু পিতা, এ তো অন্তিম যুদ্ধ, কিন্তু এই যুদ্ধ করার অবস্থায় আত্ম তো পৌছাতেই পারেনা। নিয়তি কি করেন তাঁকে এই অবস্থায় উন্নীত করে তোলার জন্য?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “নিয়তি কি করবে পুত্রী? নিয়তি কি করেছেন এতকাল পর্যন্ত, তা শুনে নাও, আর শুনে নাও তাঁর সকলের কাছে আজকে কি আর্জি। তাহলেই বুঝতে পারবে নিয়তির অবস্থা কি? আমি তাহলে নিয়তির কথাকে নিয়তির পত্র রূপে তোমার সম্মুখে প্রকাশ করছি। শ্রবণ করো তা প্রথমে।”
জগদম্বার চিঠি (উদ্ধারলীলা)
আমার সমস্ত প্রিয় সন্তানেরা,
আমাকে তোমরা চেন না চেননা ঠিক জানিনা। তাই নিজের পরিচয় দিয়েই এই পত্র লিখন শুরু করলাম। আমি প্রকৃতি। না না, যেই পাহাড় নদী সাগর গাছপালার প্রকৃতি, সেই প্রকৃতি নই আমি। আমি প্রকৃতি; প্রকৃত, সেই প্রকৃতি। যদি আমি প্রকৃতি, আর বাহ্য এই প্রকৃতিকে মিলিয়ে ফেল, সেইক্ষেত্রে আমাকে যথার্থ বলতে পারো। এই নামেও আমাকে অনেকেই ডাকে। হ্যাঁ সেই যথার্থ আমি, যা আত্ম, পরমাত্ম, সমস্ত কিছুর পারে স্থিতা, যাকে তোমরা বলো ব্রহ্ম, সে-ই আমি।
আমি কি করি? আমি কিছুই করিনা, আমি যে নিষ্ক্রিয়, সম্পূর্ণ শূন্য আমি। তবে আমিই একমাত্র অস্তিত্ব। আমি সমসত্ত্ব, তাই আমার কনো অণুও সম্ভব নয়। তবু আমার এই শূন্যতা, এই নিষ্ক্রিয়তা, এই নির্বিশেষতাকে মানতে না পেরে, আমারই কিছু অণু, যার অণু না হয়েও নিজেরা নিজেদের কল্পনা করে নিয়েই অণু, তাঁরা বিশেষত্বের সন্ধান করতে থাকলো, সক্রিয় হতে চেষ্টা করলো, আর শূন্যতা ত্যাগ করে, এক থেকে শুরু করে নয় পর্যন্ত সংখ্যার নির্মাণ করতে থাকলো।
বাঁধা দিইনি কেন? কি করে দেব বাঁধা! আমি যে নিষ্ক্রিয়! কাকে দেবো বাঁধা? তাঁরা যে ভ্রম বশতই তাঁরা, আসলে তাঁরা যে আমিই। আর সেই তাঁরা বিশেষত্বের সন্ধানে, আমার মধ্যে যা সম্ভবই না, তাই নির্মাণ করতে থাকলো। জানো তাকে কি বলে তাঁরা? তাঁরা এঁকে বলে অণ্ড, আমার অণ্ড, অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ড। আমি তাও দেখতে থাকলাম, নিরপেক্ষ দর্শক যে আমি, তাই সমস্ত কিছুই দেখতে থাকলাম।
দেখলাম নিজেদের বিশেষ হবার ইচ্ছা নিয়ে, শূন্যতা ত্যাগের চিন্তা নিয়ে, আর সক্রিয়তা ধারণের কল্পনা করে, আমার দিকে তাকালো তাঁরা, আর আমাকে তাঁদের নিজেদের চিন্তার সাথে বিদ্যা করে যুক্ত করে নিলো, যতটা চিন্তা ততটা বিদ্যা। আমার দিকে তাকিয়ে, আমার সাথে নিজেদের ইচ্ছাকে যুক্ত করলো, আর সম্পদের নির্মাণ করলো, যতটা ইচ্ছা ততটা সম্পদ। আর আমার দিকে তাকিয়ে, নিজেদের কল্পনাকে স্থাপন করলো আর শক্তির সঞ্চার করলো, যতটা কল্পনা ততটাই শক্তি।
আরো দেখলাম, আমার থেকে এই তিন প্রকাশকে বিভক্ত করলেও, কিছুতেই এঁদেরকে আলাদা করতে পারেনা তাঁরা, আর মনে করতে থাকে যে এঁদের ত্রিরূপের মিলিত প্রকাশই প্রকৃত, তাই নামকরণ করলো আমার প্রকৃতি। আর এও দেখলাম যে, কিছুতেই আমার উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করতে না পেরে, আমাকে নাম দিলো নিয়তি। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি কিচ্ছু করিনি। আমি কিচ্ছু করতে পারিইনা! আমি তো কেবলই দর্শক। তোমরা যা কিছু করো তাই দেখি কেবল।
আর তোমরা কে? তোমরা হলে সেই তাঁরা, যারা আমার থেকে নিজেকে মুক্ত মনে করে, আমার উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের চেষ্টা করে, ব্যর্থ হয়ে, আমার নামকরণ করেছিলে নিয়তি, সেই তাঁরা হলে তোমরা। হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাঁরাই তো তোমরা। আমাকে তোমরা যে তিন রূপে বিভক্ত করেছিলে, সেই তিনরূপের উপর অধিকার স্থাপনে অনন্ত প্রয়াস করতে থেকেছ যারা, সেই তোমরা । মনে পরছে এবার, তোমরা কারা! …
তোমরা সেই গো, যারা তোমাদেরই দ্বারা বিভক্ত আমার তিনরূপকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, নিজেকেও তিনভাগে বিভক্ত করে নিয়েছিলে, যাদেরকে তোমরাই নামকরণ করেছিলে, ত্রিগুণ, ত্রিদেব, আরো কতকিছু। এবার মনে পরছে? মনে না পরলে, আমি তো সমস্ত কিছুই দেখেছি, তাই আরো বলছি তোমাদের। তোমরা এই তিন রূপ ধারণ করে, আমাকে বিভক্ত করা তিনরূপকে ধরে ধরে, পঞ্চভূতের নির্মাণ করলে। এবার মনে পরছে?
তোমরা তোমাদের সেই ছায়া, যাদেরকে আমার উপর প্রয়োগ করে, আমাকে তিনভাগে বিভক্ত মনে করে নিয়েছিলে, সেই ইচ্ছা, চিন্তা কল্পনার থেকেও রিপু, পাশ, ইন্দ্রিয় নির্মাণ করেছিলে, আর এঁদের থেকে সহস্র সহস্র আবেগের সঞ্চার করেছিলে। কি এবার মনে পরেছে! না না, চিন্তিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। না মনে পরাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
আসলে, এই সমস্ত কিছুর নামকরণ তো তোমরা অনেক পরে করেছিলে, তাই মনে না পরতেই পারে। এই সব করার পরেই আসলে, পঞ্চভূতদের পিণ্ড, মানে ওই যে কি বলো তোমরা, হ্যাঁ ওই গ্রহ, নক্ষত্র নির্মাণ করতে লেগে পরেছিলে। তারপর, একটি গ্রহ গঠন করে, তোমরা হরষিত হলে, কারণ পঞ্চভূতের সুন্দর ভাবে সাম্যতা এনেছিলে তাতে। কি! হালকা হালকা মনে পরছে! …
দাঁড়াও তাহলে, আরো বলি তোমাকে, তাহলে হয়তো মনে পরে যাবে। এই গ্রহ গঠন করলে তোমরা তোমাদের কল্পনায়, আর তার থেকে নিজেকে আরো আরো ভাবে প্রকাশিত করতে শুরু করলে, উদ্ভিদ করলে, মৎস্য করলে, কিট করলে, ভুজঙ্গ করলে, পক্ষী করলে, তৃণভোজী করলে, মাংসভোজী করলে। এবার কি মনে পরেছে! … এখনো পরলো না! এবার নিশ্চয়ই মনে পরে যাবে। যখন এই সমস্ত যোনির কল্পনা করেও, তুমি ঠিকঠাক ভাবে বিশেষ হয়ে উঠতে পারছিলেনা, আর যখন তোমাদের মনে হলো যে তোমরা হয়তো সত্যের থেকে অনেক দূরে সরে এসেছ, তখন মানুষের নির্মাণ করলে!
এবার নিশ্চয়ই মনে পরেছে! … এই মানুষ হয়েই তো আমাকে তুমি প্রকৃতি, নিয়তি, ইত্যাদি নাম দিলে, নিজেকে আত্ম বললে, পরমাত্ম বললে, ভূতদের ভূত বললে, রিপুদের রিপু, ইন্দ্রিয়দের ইন্দ্রিয়! এবার মনে পরছে? সমস্ত নামকরণ তো তোমরাই করেছিলে! দেখো, তোমরা কিন্তু ভুলে গেছ, আমি কিন্তু কিচ্ছু ভুলিনি। আসলে মন দিয়ে তোমাদের কল্পনা, ইচ্ছা আর চিন্তার বহর দেখছিলাম তো! তাই কিচ্ছু ভুলিনি।
এমনিতে আমি আশা নিরাশা কিছুই করিনা, তবে মিথ্যা বলবো না। জানো, যখন তোমরা ঠিক করলে যে তোমরা সত্যের থেকে বহুদূরে চলে গেছ, এবার সত্যে ফিরবে, আর সেই মনে করে মানুষ যোনির নির্মাণ করলে, তখন আমার মধ্যেও আশা জেগে উঠেছিল। হ্যাঁ সত্যি বলছি, প্রথমবারের জন্য আশা জেগেছিল। আসলে, তোমরা তোমাদের একমাত্র প্রিয়জন, মানে আমাকে বহুকাল ধরে ভুলে রয়েছ তো। তোমাদের তো তা মনে নেই, তাই ক্ষোভ বিক্ষোভ কিছুই নেই, কিন্তু আমার তো মনে আছে। নিত্য সকল সন্তানদের দেখতেও পাই, কিন্তু বেদনা এই যে, একটি সন্তানও আমার দিকে ফিরেও তাকায় না।
সত্যি বলছি, যখন তোমরা বিশেষ হবার জন্য, কল্পনা করে আমার থেকে পৃথক হয়েছিলে, তা যতই কল্পনা হোক না কেন, আমার অসম্মতি ছিলো না, কারণ আমি তো সত্যই একাকী। আসলে আমিই সত্য কিনা! আমি ছাড়া কনো কিছুর তো কনো অস্তিত্বই নেই। তাই বড়ই একা আমি। আর যখন তোমরা আমার থেকে পৃথক হবার কল্পনা করেই নিলে, তখন আমার থেকে জাত আমার সন্তানদের, অর্থাৎ তোমাদের দেখে বেশ আপ্লুতই হয়েছিলাম।
সে এক অদ্ভুত অনুভূতি জানো! আমার থেকে পৃথক না হয়েও পৃথক, সেই এক অদ্ভুত ভাব, তোমরা এই ভাবেরও নামকরণ করেছিলে এককালে। এঁর নাম দিয়েছিলে প্রেম। হ্যাঁ, সেই প্রেম অনুভব হয়েছিল, নিজেকেই নিজের সন্তান করে লাভ করে, স্নেহ, প্রেম, মমতার মত কত রকম মধুর ভাবই না জন্ম নিয়েছিল আমার মধ্যে। কিন্তু জানো, যখন তোমরা আমার দিকে ফিরেও তাকাতে না, তখন মনে হতে শুরু করলো, কেন তোমরা আমার থেকে আলাদা রয়েছ! ফিরে এসো মায়ের বুকে, আমিই যে তোমাদের অস্তিত্ব, আমিই যে তোমাদের প্রকৃত আত্ম। এসো ফিরে এসো।
কিন্তু আমার আবাহন বোধহয় তোমাদের কাছে পৌছতে পারেনি। আসলে আমি তো নিরকার, নিষ্ক্রিয়! তাই হয়তো আমার প্রেম তোমাদের কাছে অনুভূত হয়নি। কিন্তু যখন তোমরা আমার কাছে ফিরে আসতে চেয়ে মানুষ যোনির নির্মাণ করলে তোমাদের কল্পনার মধ্যে, এই মায়ের বুকের মমতা, প্রেম, স্নেহ যেন অপরিসীম হয়ে উঠলো। নতুন ভাবে বুক বাঁধলাম, নতুন ভাবে সাজতে শুরু করলাম, আমার সন্তান আমার কাছে ফিরে আসবে তাই।
তোমাদের নির্মাণ করা নতুন নতুন সুর, ধ্বনিকে অলঙ্কার রূপে ধারণ করলাম; তোমাদেরই নির্মাণ করা বিভিন্ন কলাকে বস্ত্র রূপে ধারণ করলাম; তোমাদেরই নির্মাণ করা বিবিধ যোগধ্যানসমাধিকে কুমকুমের ন্যায়, কাজলের ন্যায়, ওষ্ঠরঙের ন্যায় আর কুন্তলের ন্যায় ধারণ করলাম, আর অধির আগ্রহে অপেক্ষা করলাম তোমরা আমার বুকে এবার ফিরে আসবে বলে। রোজ রোজ নতুন নতুন ভাবে শৃঙ্গার করতাম, আমার সন্তানরা একবার যদি আমার বুকে আছরে পরে, আর তাঁরা যাতে আমাকে ছেড়ে না চলে যায়, সেই উদ্দেশ্যে।
তোমরা নিজেদের মধ্যে অনেক রকমের খুংসুটি করতে, দেখতাম, আর বুঝতাম, “না না! এমন তো হতেই পারে। … আসলে নিজেদের অহং অর্থাৎ আমিত্বের ভাব নিয়ে তোমরা আমার থেকে আলাদা হয়েছ। আর এত যোনি, এত ব্রহ্মাণ্ড ঘুরে ঘুরে সেই আমিত্ব বেশ শক্তিশালীও হয়েছে। তাই একটু তো সময় লাগবেই, এই আমিত্বের খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে এসে, তোমাদের জননীর দিকে তাকাতে”। এমন ভাবে নিজেকে নিজে বুঝিয়ে, অধীর আগ্রহে তোমাদের অপেক্ষা করে বসে থাকতাম রোজ। নিত্য নবনব শৃঙ্গার, নব সুর, নব মধুরিমা অঙ্গে মেখে, অপেক্ষা করতাম।
চেষ্টা করতাম যাতে আমার নেত্রের দিকে তোমরা যদি তাকিয়ে ফেল, যেন কনো বেদনা দেখতে না পাও, কেবলই মায়ের হাসিমুখ দেখতে পাও। নেত্রে যদি জল থাকেও, তা যেন কেবলই আনন্দবারি হয়। চাইতাম যাতে আমার বেদনা নয়, আমার তোমাদেরকে দেখে যেই হরষ হয়েছে, তাই আমার সন্তানদের অর্থাৎ তোমাদের নজরে আসে, আর কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে, কর্তাজ্ঞান হারিয়ে, অচিরে আমার বক্ষে তোমরা শিশুর ন্যায় নিজেদের উৎসর্গ করে দিয়ে, আমার প্রেমে, আমার স্নেহে, আমার মমতাকে সর্বাঙ্গে মেখে নেবে।
তাই অধীর আগ্রহে তোমাদের কীর্তিকলাপকে আরো গভীর ভাবে এবার দেখতে থাকলাম। এতকাল তো কেবলই তা সন্তানস্নেহে দেখতাম, কিন্তু এবার! এবার সন্তান আমাকে প্রথমবার মা বলে ডাকবে, সেই আশা নিয়ে দেখতে থাকলাম। এবার সন্তান আমাকে সুযোগ দেবে, তাঁর সর্বাঙ্গকে স্নেহচুম্বনে পবিত্র করে দেবার, সেই আশা নিয়ে দেখতে থাকলাম।
হচ্ছিলও তেমন জানো তো। সত্য জানার ইচ্ছার জন্য এই যোনি, তাই অসামান্য মেধা রেখেছিলে এই যোনির চরিত্রে। যেমন হয় আর কি, প্রথমদিকে অসামান্য মেধা দিয়ে কি করবে, তা বুঝতে পারা যায়না, আর শেষে তার সঠিক ক্ষেত্রে নিয়োগ শুরু হয়, তেমনই হচ্ছিল।
প্রথমে তোমরা বাহ্যপ্রকৃতির সমস্ত কিছুকে দেখতে শুরু করলে। তোমাদেরই রচিত, তোমাদেরই কল্পিত সমস্ত রচনাকে দেখতে থাকলে আর বিচলিত হতে থাকলে। সূর্য দেখলে, চন্দ্র দেখলে, অন্য যোনিদের দেখলে, ধরিত্রীকে দেখলে। তারপর এঁদের সকলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার প্রয়াস করতে থাকলে। বলতে ইচ্ছা হলো, “কি করছো বাছারা! … তোমাদেরই কল্পিত রচনাকে তোমাদের অধীনে আনার প্রয়াস বাইরে থেকে কেন করছো! অন্তরে অন্তরে সংকল্প গ্রহণ করলেই তো তা সম্ভব, কারণ তারা তো তোমাদেরই রচনা!”
কিন্তু আমার সেই নিরাকারত্ব আমার কণ্ঠস্বরকে তোমাদের কাছে পৌছাতে দিলই না!… তাই বাধ্য হয়ে দেখতে থাকলাম সমস্ত কিছুর নিরপেক্ষ সাক্ষী হয়ে। দেখলাম তোমরা তোমাদেরই অন্য রচনা, অর্থাৎ অন্য পশুদের পোষ মানাতে শুরু করেছ। তাদের অঙ্গ থেকে পশম নিয়ে নিজেদের কল্পশরীর অর্থাৎ তনুকে ঢাকছ, তাঁদেরকেই উৎপাটন করে নিয়ে গিয়ে নিজের কাছে রেখে সুগন্ধ নিচ্ছ; আবার তাঁদেরকেই পোষ মানিয়ে নিজেদের কল্পনার ভার, অর্থাৎ তনুর ভার বহন করাচ্ছ।
দেখলাম, নিজেদের কল্পশরীর ত্যাগ হয়ে যায় বারংবার, তাই মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছ, আর তোমাদের যেই কল্পনাকে তোমারা মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছ, আর নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হচ্ছ তাদেরকে, সেই সূর্য চন্দ্রকে আরাধনা করছো, আর কামনা করছো যাতে তারা তোমাদের মৃত্যুকে আটকে দিতে পারে। যখন সমানে এমনই করে চলেছিলে, তখন আসতে আসতে যেই আশায় বুক বেধেছিলাম, অর্থাৎ আমার সন্তানরা আমার কাছে ফিরে আসবে, সেই আশা ভাঙতে থাকলো।
ঠিক সেই সময়ে, তোমাদের কল্পিত চীন দেশে, এক গোষ্ঠী মানুষ গর্জন করে উঠলো, “বাইরে সমস্ত মায়া, সত্য অন্তরে রয়েছে। আমাদের রচনা, মানুষের রচনাই হয়েছে, সত্যের উদ্ঘাটনের জন্য। সত্য অন্তরে রয়েছে, বাইরে নয়”। … সন্তানরা, বলে বোঝাতে পারবো না, সেইদিনই প্রথমদিন অনুভব করলাম যেন আমার হৃদয় আছে। হরষে, ব্যকুলতায়, প্রগলতায়, উন্মাদনায়, আমার হৃদয় যেন উন্মাদের ন্যায় একবার উচ্চে একবার নিম্নে যাত্রা করছিল সেইদিন।
ইচ্ছা হচ্ছিল যেন চিৎকার করে তোমাদের সমস্ত কল্পরচনাকে বলি, “শুনছো তোমরা! … আমার সন্তান! … হ্যাঁ আমার সন্তান, আমার কাছে আসছে। … আমার বুকে আসছে। … তাঁদের মায়ের বুকে আসছে। … আজ উৎসব, আজ মহোৎসব। … আমার সন্তান আমার কাছে ফিরে আসছে। কি আহার করাবো তাকে? কি গল্প শোনাবো তাঁকে? কি কথা বলে ঘুম পারাবো তাঁকে? কোথায় কোথায় চুম্বন করবো তাঁকে?”
সত্যই সেদিন আমার ইচ্ছা হচ্ছিল, আমি নিরাকার থেকে সাকার হয়ে যাই, যথার্থ থেকে কল্পনা হয়ে উঠি, ঠিক তোমাদের মতই, আর তোমাদেরকে নিজের কোলে শুইয়ে, বক্ষে জরিয়ে ধরে আনন্দ করি, আদর করি, স্নেহ করি, আর প্রেমে তোমাদেরকে নিজের মধ্যে লীন করে নিই।
উঠলো তাঁদের জয়ঘোষ, উচ্চৈঃস্বরে তাঁরা আমার হৃদয়কে আপ্লুত করে বলে উঠলো, “বাহ্য সমস্ত কিছু মায়া, আমাদেরই রচিত মায়া। আর এই সমস্ত মায়ার কারণ হলো আত্ম নিয়ে চিন্তা, সেই আত্মকে প্রতিষ্ঠা করার ইচ্ছা, আর সেই আত্মকে শ্রেষ্ঠ করে তোলার কল্পনা”। … আমার হৃদয়কে প্রফুল্লিত করে, তাঁরা একে একে নিজেদেরকে ইন্দ্রিয়দের থেকে দূর করলো; মন, বুদ্ধি, তনু, ইত্যাদি ভূতদের থেকে নিবৃত্ত করতে থাকলো। অবশেষে, তাঁরা আমার ত্রিরূপ কল্পনা করে, যেই ত্রিগুণের সঞ্চার করেছিল, তাঁদের থেকেও মুক্ত করে, আমার সম্মুখীন হলো তাঁরা।
তোমাদের হিসাবে কোটি কোঁটি বৎসর যেই ক্ষণের অপেক্ষা করেছিলাম, সেই ক্ষণ এসে গেল। নিজের সমস্ত প্রেম বিলিয়ে দিতে থাকলাম আমার ক্রোড়ে আসা প্রথম সন্তানদের উপর। জানিনা এই নিরাকার প্রকৃতির নেত্রের প্রেমাশ্রু তাঁরা অনুভব করেছিল কিনা। হয়তো করেছিল, আর হয়তো সেই কারণেই তাঁদেরও প্রেমাশ্রু অবিরাম নদীর ন্যায় বয়ে চলেছিল! …
আমার থেকে অনুমতি চাইলো তাঁরা। বলল, “মা! তোমাকে ছেড়ে তো আর একদণ্ডও থাকতে ইচ্ছা করছেনা। কিন্তু মা, আমাদের মত তোমার অজস্র সন্তান আছে, যারা জানেও না যে তাঁদের মা, তাঁদের একমাত্র আত্মীয়, তাঁদের পরমাত্মীয় তাঁদের জন্য সুদীর্ঘকালব্যাপী দুইহাত প্রসারিত করে, নিজের বক্ষদেশকে শ্রেষ্ঠসম্ভব শৃঙ্গার দ্বারা সুসজ্জিত করে রেখেছেন তাঁর সন্তানদের আলিঙ্গন করবেন বলে। তাই একটিবারের জন্য আমাদের বিদায় নিতে দাও মা! একটিবার তোমার সমস্ত অন্যসন্তানদের তাঁদের জননীর পরিচয় প্রদান করে আসতে দাও মা”।
ভাষা ছিলো না আমার সেদিন। কি আর বলবো! আমি তো এমনই হতভাগী মা যে নিজের সন্তানকে কি নামে ডাকবো, তাও স্থির করে রাখিনি! … কি করে যে এমন ভুল করলাম কে জানে! সন্তানকে কি সুখ দেব, কি সুখ দেব, এই নিয়েই দিবারাত্র ভেবে গেলাম, অথচ সন্তানকে কি নামে ডাকবো, তাই স্থির করে রাখিনি। … তাঁদের কথার উত্তরে কিছু বলেছিলাম কিনা, জানিনা আমি! বললেও আমি তা জানতে পারিনি, কারণ আমি তো নিরাকার, আমি তো শূন্য। কিন্তু কি করে জানিনা, তাঁরা কিন্তু বুঝে গেল আমার অন্তরের কথা। সন্তান সে, আমি মা তাঁদের, মায়ের হৃদয়ের কথা সন্তান বুঝবে না, তা কি হতে পারে!
তাঁরা দ্রুত ফিরে গেল আবার কল্পজগতে, আর দ্রুত ফিরে আসার প্রতিজ্ঞা করে গেল আমার বক্ষে। সেই সময়ে নাম দিতে না পারলেও, পরে অবশ্য তাঁদের নাম দিয়েছিলাম। তবে আমি জানতামও না যে আমি তাঁদের নাম দিয়েছিলাম। জননী হলেও, স্বভাব তো আমার শিশুরই মত। তাই শিশুরই মত প্রশ্ন করেছিলাম নিজের বাছাদের, “এই নাম তোমরা পেলে কোথা থেকে?”
তাঁরা উত্তরে বলেছিল, “তুমি জানো না মা, তুমি তো আমাদের সকলের হৃদয়ে চেতনা হয়ে প্রবাহিত হও। যতক্ষণ না তোমার সাথে সাখ্যাত করেছিলাম, ততদিন ভাবতাম সেই চেতনা আমাদের কীর্তি, আমাদের বীর্য, কিন্তু তোমার সাথে সাখ্যাত হবার পর বুঝতে পারি, সেই চেতনা যে আমাদের মায়ের। সেই মায়ের স্বর হলো আমাদের চেতনা, যিনি একটি মুহূর্তের জন্যও তাঁর সন্তানদের ছেড়ে থাকতে পারেন না। সেই মায়ের স্বর হলো আমাদের চেতনা, যিনি একদণ্ডের জন্যও তাঁর একটি সন্তানের থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে থাকতে পারেন না। … সেই চেতনাই আমাদেরকে আমাদের নাম দিয়েছেন মা, আর সেই চেতনার কারণেই আমরা নিজেদেরকে বলেছি বুদ্ধ”।
অদম্য তাঁরা, জানিনা কেন, কিন্তু না জানলেও, আমি প্রত্যক্ষ করি তাঁরা অদম্য। আমার প্রশ্নে, তাঁরা বলে, “যেই প্রেমকে এতকাল অদেখা করে এসেছি, সেই প্রেমামৃতের সন্ধান দেবনা মা সকলকে! তুমি তো আমাদের সকলের মা। এঁরা সকলে যে আমাদের সহোদর আর সহোদরা। আমাদের নিজেদের ভ্রাতা ভগিনীদের আমাদের মায়ের প্রেমের ব্যখ্যা দেব না!”
দিল তাঁরা পরিচয় আমার প্রেমের। কিন্তু সত্যি বলছি, আমি যে এতটা প্রেম করেছি, আমি নিজেও বুঝতে পারিনি, হয়তো আমার নির্বিশেষত্বের কারণেই তা বুঝতে পারিনি। তাই আমি তাঁদের প্রেমকথা থেকেই জানলাম, আমি নাকি সহস্র রূপে তাঁদের সম্মুখে রয়েছি; রয়েছি সকল তাঁদেরই কল্পনার চেতনা হয়ে, আর সেই চেতনার কারণেই নাকি সমস্ত কিছু কল্পনা হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা বুঝতেও পারছেনা যে তা কল্পনা। আমার চেতনার আভাস লাভ করার জন্যই নাকি তাঁরা বুঝতেও পারছেনা যে, সমস্ত গ্রহ নক্ষত্র, সমস্ত জীব অজীব, সমস্ত কিছুই মায়া।
অদ্ভুত সেই বিবরণ, অদ্ভুত সেই ভাববিস্তার। সর্বত্র আমি, সর্বত্র আমার প্রেম, সর্বত্র আমারই স্নেহ, আর আমার সেই স্নেহপানের জন্যই যেন তাঁরা আমার থেকে পৃথক হয়েছিল। আর আমারই সেই প্রেমকে লাভ না করার জন্য সমস্ত বেদনা। আর সেই বেদনাকেই বিভিন্ন ভাবে ব্যক্ত করা, কখনো আঘাতলাভের বেদনা, কখনো প্রিয়জন হারানোর বেদনা, কখনো মৃত্যুভয়ের বেদনা, আরো কত কি বেদনা।
হ্যাঁ, আমার সন্তানরা আমাকে বলল, সমস্ত বেদনার কারণ আমার প্রেমের অনুসন্ধান করেও তা লাভ না করার ব্যর্থতার কারণে। মৃত্যুতে তাঁরা বেদনাগ্রস্ত নন; মৃত্যু হয়ে গেলে, আমার প্রেমের অনুসন্ধান করার পথে যেটুকু অগ্রসর হয়েছে তাঁরা, তার স্মৃতি হারিয়ে ফেলার জন্য বেদনা। আঘাতে তাঁরা বেদনাগ্রস্ত নন; আঘাত পেলে সেই আঘাতকে কেউ যেন অবিরাম সেবা করে চলেছে, কিন্তু সেই সেবকের সন্ধান না পাবার বেদনা।
আমি সে কথা শুনে আপ্লুত। আমি বলতে চাইলাম, বলতে পারলাম কি না জানিনা যে, আমি তো সর্বক্ষণ তোমাদের সকলের সেবা করে চলেছি, দেখো, সকলের সামনে আমি সময় বেশে থেকে তোমাদের এই পথ চলারই, এই অনুসন্ধানেরই মার্গদর্শন করে চলেছি। তোমাদের সকলের বাণী হয়ে অবিরাম অন্য সকলকে মার্গ দেখিয়ে চলেছি। তোমাদের সমস্ত বেদনা আমিই গ্রহণ করে চলেছি, তোমরা কেবলই আঘাতের ভয়ে বেদনাগ্রস্ত, প্রকৃত বেদনা তো এই যথার্থই গ্রহণ করে। মা থাকতে সন্তানকে বেদনা কি করে পেতে দিতে পারে সে!
অবিরাম তোমাদেরকে বলে চলেছি যে, মায়া তোমাদের আত্মে। যতক্ষণ আত্ম নিয়ে চিন্তিত থাকবে, ততক্ষণই আত্মের ইচ্ছা প্রকট হবে, আর সেই ইচ্ছাপূর্তির জন্য অসংখ্য কল্পনা আসতে থাকবে। তাই আত্ম থেকে মুক্ত হও তোমরা সকলে; তুমি কেবল তোমার দেহতে, কেবল তোমার বুদ্ধিতে, তোমার মনেতে সীমাবদ্ধ নও। সমস্ত বুদ্ধিই তোমার বুদ্ধি, সমস্ত মনই তোমার মন, সমস্ত আত্মই তোমার আত্ম।
উত্তরে তাঁরা বলল, “সেই কথা যদি বুঝতেই পেরে যেতাম মা, তবে তো কবে নিজের এই আত্মকে ত্যাগ করে, তোমার কোলে ঝাঁপিয়ে পরতাম। সহস্রকোঁটি সন্তান থাকার পরেও, আমাদের মাকে এমন ভাবে নিঃসন্তান হবার ভাব প্রদান করে, উন্মাদিনী বেশে ছেড়ে রাখতাম!… এবার বুঝে গেছি মা, আর তাই আমাদের সমস্ত সহোদর, সহোদরাকে এই কথা বলে ফিরবো আমরা – অন্তরে গিয়ে দেখো, তোমাদের জননী বসে আছেন, তোমাদের অপেক্ষায় কোঁটি কোঁটি বছর ধরে বসে আছেন।
আমরা সকলকে বলবো, সকল ব্যক্তি তুমি, সকল কিছু তুমি, তুমিই সকলের মুখ দিয়ে কথা বলো, তুমিই সকল মুখ দিয়ে আহার করে উচ্ছিষ্ট করে দাও, আর আমাদেরকে তোমার উচ্ছিষ্টটি প্রসাদিরূপে প্রদান করো। সকলকে বলবো আমরা, তুমিই সত্য, একমাত্র সত্য, তুমিই নিয়তি, তুমিই ব্রহ্ম, আর তুমি আমাদের আসল, তুমিই আমাদের প্রকৃত, তাই তুমি হলে প্রকৃতি।
সকলকে বলবো আমরা, তাদের আত্ম আসলে তুমিই, আর সেই কথা ভুলে থাকলেও, তাঁদের আত্ম তোমারই সন্ধান করে চলেছে অনুক্ষণ। বলবো আমরা যে, তাঁদের আত্মই নিজেকে ত্রিগুণে বিভক্ত করে নিয়ে, নিজেদের ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনাকে তোমার উপর আরোপিত করে, তোমাকে ত্রিখন্ডে, ত্রিদেবীতে বিভক্ত করে দিয়েছে, কিন্তু সেই সমস্তই কল্পনা। তাই তোমার স্বরূপে, শূন্যতে ধ্যান করলে, সেই সমস্ত কল্পনা মুহুর্তের মধ্যে নষ্ট হয়ে গিয়ে, পুনরায় তোমরা সকলে তোমাদের প্রেমময়ী জননীর কোলে ফিরে যাবে।
বলবো আমরা, প্রেম স্বয়ং তুমি, ভক্তি স্বয়ং তুমি, জ্ঞান দ্বয়ং তুমি, স্নেহ, মমতা ইত্যাদি তোমার গুণ নয় এঁরা, এঁরা স্বয়ং তুমি। কথা দিলাম মা তোমায়, আমরা একটি মার্গ স্থাপন করে আসবো। হ্যাঁ, অনেক কল্পনা করেছি, অনেক মার্গ গঠন করেছি এই কল্পনার মধ্যে নিজেদেরকে ডুবিয়ে দেবার জন্য। এই শেষ বারের জন্য কর্তাভাবকে ধারণ করবো মা। আর সেই কর্তা সকলের সামনে মার্গ স্থাপন করবে, কল্পনাতে নিমজ্জিত হবার মার্গ নয়, কল্পনা থেকে চিরতরে মুক্ত হবার মার্গ। অহংকার আমাদের প্রশস্ত, তাই সেই অহংকার দ্বারাই সেই পথের নামকরণ করবো বৌদ্ধমার্গ। কিন্তু এই মার্গ তোমার থেকে দূরে নয়, তোমার কোলমুখি হবে।
এই মার্গে আমরা বলবো সত্যের কথা, অহংকারের ত্রিগুণ কিভাবে ত্রিদেব হয়ে সমস্ত কল্পনা ও কাল্পনিক জগতের অধিপতি হয়ে বসলেন সেই কথা, আর বলবো পঞ্চভূত থেকে মুক্ত হবার কথা। এই মার্গ হবে ধ্যানমার্গ। বলবো আমরা সকলে, ধ্যান করো, নিজের আমিকে সেই ধ্যানে হারিয়ে দাও। নিজেকে হারিয়ে দাও। নিজেকে হারিয়ে দেওয়াই নিজেকে প্রকৃত অর্থে পাওয়া, কারণ তোমরা যে শূন্য।
আর বলবো, একবার নিজেকে সেই ধ্যানে হারিয়ে ফেললে দেখবে, প্রেমই প্রেম; এমনই প্রেম যেখানে কনো দুই নেই, একাকার সমস্ত কিছু, আর তাই মোহ নেই, খালিই প্রেম। একবার হারিয়ে ফেললে দেখবে জ্ঞানই জ্ঞান, এখানে কনো অজ্ঞানতা নেই, কেবলই জ্ঞান। সত্যের জ্ঞান, সত্যের প্রেম, সত্যের স্নেহ, মহানন্দ, পরমানন্দ, সমস্ত বেদনার থেকে মুক্তির আনন্দ, সমস্ত পরাধীনতার বন্ধন খণ্ডনের আনন্দ, আর সেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলে দেখবে, তুমি নিজেকে নিজে পেয়ে গেছ, নির্বাণ হয়ে গেছ”।
কথা রেখেছিল তাঁরা। আমার শত শত সন্তানকে আমার কোলে ফিরিয়ে দিয়েছিল। হাজার হাজার বৎসর ব্যাপী, কারুকে না কারুকে আমার ক্রোড়ে দিতে থেকে তাঁরা আমার কোলকে সদা ব্যস্ত রেখে দিয়েছিল। কিন্তু এঁদের বিস্তার ছিল তোমাদের তিব্বত ও কিছুটা জম্বুদ্বীপ, আমার অন্য স্থানের সন্তানরা সেই একিভাবে আত্মের আরাধনা করতেই থাকে, অহমিকার আরাধনা করতেই থাকে।
বাঁধ সারলো একজন, নাম আব্রাম। তোমাদের হিমালয়ের পূর্ব দিকে যখন বৌদ্ধরা আমার কোল ভরতে ব্যস্ত ছিল, তখন এক্কেবারে একই ভাবে হিমালয়ের পশ্চিমপ্রান্তে আব্রাম আমার সন্ধানে ব্যকুল হতে শুরু করলো। ক্রমে, আমার কাছেও সে পৌঁছল। আমার থেকে সত্যের জ্ঞান লাভ করলো, আমার প্রেম লাভ করলো, আর বৌদ্ধদের মতই সেও আমার সত্যতার জ্ঞান সকলকে প্রদান করার ব্রত নিলো।
কিন্তু তাঁর কাজে বাঁধ সারলো, একটি প্রজাতি, যারা হিমালয়েরই মধ্যবর্তী স্থানে বসবাস করতো। এঁরা আধামানুষ ও আধাজন্তুর মূর্তি নির্মাণ করে, তাদের কাছে সকলকে আরাধনা করাতো, এবং আরাধনা ও ইষ্টকে তৃপ্ত করার অছিলায়, এঁদের থেকে তাঁদের দেহ সমেত সমস্ত ভৌতিক সম্পত্তি লুণ্ঠন করে নিতো। অর্থাৎ এককথায় এঁরা অহংকারের আরাধনা করতো।
আব্রামের প্রেমপ্রচার, আর জ্ঞানবিস্তারে একটি নতুন হিল্লোল জাগলে, এই প্রজাতি তাতে বাঁধা দিতে প্রচেষ্টা করে, কারণ এই প্রেমপ্রচারের কারণে তাঁদের অহংকারের বিস্তারকাণ্ডে অবরোধ সৃষ্টি হয়, আর এঁরা ভৌতিক সম্পদ লুণ্ঠন করতে অসমর্থ হয়ে যায়। কিন্তু আব্রামের জনপ্রিয়তার বৃদ্ধির ফলে, এঁরা তিনটি ভাগে ছড়িয়ে যায়। এই তিন শ্রেণীর একটি হলো সৌখিন শ্রেণী যারা সাধারণত শাসন করতেন সকলকে, একটি শ্রেণী ছিল যুদ্ধপাগল, আর একটি শ্রেণী ছিলো বুদ্ধিদাতা।
আব্রামের প্রতিষ্ঠা, এঁদের প্রতিষ্ঠাকে খণ্ডন করলে, এঁরা তিনদিশায় ছড়িয়ে যেতে শুরু করে। বুদ্ধিদাতারা জম্বুদ্বীপে চলে আসে, আর নিজেদেরকে আর্য বলে দাবি করে, এবং তাঁরা সিন্ধুনদীর তীরে বসবাস করে। যোদ্ধারা হিমালয় থেকে দক্ষিণে চলে যায়, এবং নিজেদের অসামান্য শিল্পকৌশলের প্রদর্শন দেখিয়ে, আফ্রিকিয় ও পশ্চিম এশিয়াতে নিজেদের অধিকার স্থাপন করেন, আর এঁদের নাম হয় মিশরীয় বর্বর প্রজাতি।
আর তৃতীয় শাসক গোষ্ঠী আরো পশ্চিমে চলে গেলেন, যাদের নাম হলো রোমান। এই রোমান শ্রেণীর সন্তানরা সৌখিনতাতে উন্মত্ত, তাই দিবারাত্র কেবলই সৌখিনতা নিয়েই উলমালা থাকতো তাঁরা। আর অহমিকা প্রদর্শন করে করে ক্ষমতার বৃদ্ধি করা তো, এঁদের সকলেরই আত্মস্থ হওয়া গুণছিলো।
সেই গুণ নিয়ে, আর্যরাও যখন জম্বুদ্বীপে আসেন, তখন এক নতুন ঝঞ্ঝাটে স্থাপিত হন। আর তা হলো আমার বৌদ্ধ সন্তানদের বিস্তার। তবে আমার বৌদ্ধ সন্তানরা মহাজ্ঞানী, তাই কারুর স্বতন্ত্রতা হনন করতো না। সত্যের কথা বলতো সকলকে, কিন্তু কে সেই সত্যের পথে চলবে, তা তাঁর ব্যক্তিগত অভিরুচি। আর তাই বৌদ্ধদের বিস্তার থাকা সত্ত্বেও, সকলের উপর তার প্রভাব বিস্তার হয়নি। আর্যরা সেই সুযোগ নেবার প্রয়াস করলো।
কিন্তু আমার বৌদ্ধ সন্তানরা তো এমনই সুদৃঢ় ভাবে জ্ঞানের প্রসার করেছিল যে, কেবলই ভাওয়তাবাজি দিয়ে জম্বুদ্বীপ আর তিব্বতের মানুষদের মূর্খ বানানো সম্ভব নয়। তাই আর্যরা এক নবচক্রান্তের সঞ্চার করা শুরু করলো। তাঁরা বৌদ্ধকথনের থেকে আমাকে অপসারিত করলো প্রথমে, আর রেখে দিলো আমার অহংকারখণ্ডিত ত্রিদেবীরূপকে অহংকার অর্থাৎ ত্রিদেবের দাস করে, আর সেই অহংকার ও পঞ্চভূতের আরাধনা স্থাপন তাঁরা মানুষ জাতির কাছে করলো বেদ রূপে।
শঠতা আমার এই সন্তানদের স্বভাবেই ছিল, তাই বলা শুরু করলেন এঁরা যে বেদের রচনা বহু সহস্র বৎসর পূর্বেই, শ্রুতি হয়েই চলছিল। মানুষের মধ্যে এই ধারাকে স্থাপন করে, নিজেদের অহংকারকে স্থাপন করার উদ্দেশ্যে, এঁরা এবার এই বেদের ধারাকে ধারণ করে একাধিক পুরাণের রচনা করতে শুরু করলেন, যা প্রকৃতপক্ষে নবরচনা নয়, বৌদ্ধদের তন্ত্র ও যন্ত্রধারার পুনর্ব্যাখ্যা। পার্থক্য কেবল এই যে, বৌদ্ধ ধারার তন্ত্র ও যন্ত্রতে অহংকারের বিস্তার বলা হতো, আর এই সমস্ত কিছুর থেকে মুক্ত হবার কথা বলা হতো। আর আর্যরা এঁদেরকে আরাধনার পাত্র করে, কারণ তাঁরা যে অহমিকার উপাসক।
আর এই সমস্ত কিছুর মাথায় তাঁরা রাখে ত্রিদেবকে, অর্থাৎ ত্রিগুণকে, অর্থাৎ স্বয়ং অহংকারকে। তবে আমার দুশ্চিন্তার কারণ তখনও নির্মিত হয়নি, কারণ বৌদ্ধরা তখনও নিজেদের ব্রহ্মব্যখ্যা অব্যাহতই রেখেছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আমার আর্য সন্তানরা বৌদ্ধসন্তানদের বিতাড়িত করা শুরু করলো। আমার বৌদ্ধ সন্তানরা আসলে অত্যন্ত নিরীহ, অত্যন্ত প্রেমীতনু তাঁদের। লড়াই তাঁরা অন্তরে করে, অহংকারের সাথে করে, নিজেদের সহোদর সহোদরার সাথে করেনা।
তাই বিতাড়িত করে দিতে, তারাও ক্ষীণ হওয়া শুরু করলো। তাই আমি এবার প্রথমবার অহংকার ধারণ করলাম, আর অবতরণ করলাম মনুষ্যদেহের আধারে। আমার নাম হলো সিদ্ধার্থ, আর পরে নাম হয় গৌতম বুদ্ধ। প্রথমবার নিজের প্রেমকে নিজে অনুভব করলাম। আপ্লুতও হলাম, আর হতবাকও। আমার এই প্রেম কি কনো স্বার্থনির্ভর? যদি তা না হয়, তবে কেন আমার এই প্রেমের দিকে আমার সন্তানরা তাকায় না!
সব বললাম গৌতমের মুখ দিয়ে, কিন্তু নিজের কথা বলতে পারলাম না, লজ্জা লাগলো, নিজের মুখে নিজেরই কথা বলবো? তাই বললাম না, কেবলই সত্যের কথা বললাম, ব্রহ্মের কথা বললাম, প্রকৃতির কথা বললাম না। আবার আমার সন্তানরা আমার কাছে আসতে শুরু করলো। আমার আবার আনন্দের হাট বসলো। আনন্দে আটখানা হয়ে গেলাম আমি। কিন্তু একটা চিন্তার ভাজ থেকেই গেল আমার মধ্যে।
আমার অন্যসন্তানগুলির কি হবে? মিশরের সন্তান, আরবের সন্তান, রোমান সন্তান, আর্য সন্তান, এঁদের সকলের কি হবে? একই সঙ্গে তিনরূপে প্রকাশিত হলাম, ত্রিদেবী বলো না তোমরা আমাকে, তাই। সেই ত্রিদেবীর তিনরূপ একত্রে অবতরণ করালাম। আরবিদের মধ্যে রাখলাম আমার সমৃদ্ধি বা শ্রীরূপকে, যাকে তোমরা নাম দিলে মহম্মদ। আব্রামের গোত্রে জন্ম নিলাম বিদ্যারূপে, যাকে তোমরা বলো যীশু, আর জম্বুদ্বীপের পূর্বদেশে, যেখানের ভূমি কচ্ছপের পিঠের ন্যায় উন্নত, যাকে তোমরা আজ বলো বঙ্গদেশ, তার মধ্যস্থানে আমার শক্তিরূপের প্রকাশ করলাম মার্কণ্ড রূপে।
এই তিন অবতার দ্বারা, আমার প্রেম, আমার স্নেহ, আমার এতদিনকার না বলা আমার সন্তানদের প্রতি অপার প্রেমের গাঁথা আমি গেয়ে ফেললাম। সত্যিই তো, আমার সন্তানরা ভ্রমিত, নিজেদের অহংকারে নিজেরা ভ্রমিত; ইচ্ছা, কল্পনা, চিন্তার তাড়না নিয়ে উলমালা। এমন অবস্থায় আমি যদি নাই বলি যে আমি কে, বা আমি কতটা স্নেহ করি তাঁদেরকে, তাঁরাই বা জানবে কি করে। তাই এমন সংকল্প নিই আমি যে, এবার প্রায়শই আমি অবতরণ করবো, আর সময়ে সময়ে বলতে থাকবো, আমি তাঁদের সকলের জন্য কতটা অধীর আগ্রহে বসে থাকি।
তবে সত্য বলছি তোমাদের, আজ এই অবতারে স্থিত হয়ে, যেই পত্র তোমাদের লিখছি, সেই পত্র যে লিখতে হবে, তা কনোদিনও ভাবিনি। হ্যাঁ, মার্কণ্ডদের পরবর্তীকালে অহংকারের তীব্রতা অতিকায় হয়ে গেছিল, বারবারই গেছিল, কিন্তু তাকে পশমিতও করা সম্ভব হয়েছে, কারণ অহংকার বৃদ্ধি পেলেও, তা অতিকায় হয়ে ওঠেনি। হ্যাঁ গো, সত্যি বলছি, মার্কণ্ড, মার্কণ্ড মহাপুরাণের রচনা করার পরে পরেই পিপলাদ উপনিষদ রচনা করে ব্রহ্মকথন বলতে শুরু করলো, আত্মের নাম নিয়ে, আরম্ভ হলো আবার করে অহংকারের গুণকীর্তন।
তবে তা হলেও, অহংকার আর বাহ্যমুখী স্বভাব মানুষকে বশীকরণ করে ফেলে নি তখনও। অন্তরে যাত্রা তখনও তাঁরা সম্পূর্ণ ভাবে পরিত্যাগ করে নি। হ্যাঁ অন্তরে যাত্রা করে অহংকারের সাথেই আলাপ আলোচনা করতো, সেই অহংকারকে পূজাঅর্চনা ইত্যাদি দ্বারা তুষ্টও করতো, আর সেই পূজাঅর্চনার নাম করে মিশরীয়রা শেষ করলো তো আরবিয়রা অন্যের ধন লুণ্ঠন করতে শুরু করলো। আমার মহম্মদ রূপ তাঁদেরকে মার্জিত করে দিলো তো রোমানরা সেই লুণ্ঠন করতে থাকলো। তাকে আমার যীশুরূপ থামিয়ে দিলো তো আর্যরা শুরু করলো সেই লুণ্ঠন।
রোমানদের একশ্রেণী নিজেদের লুণ্ঠন থামিয়ে দিয়ে আমার কিছু সংখ্যক সন্তানকে শোষণ করা থামালেও, একটি বড় শ্রেণী তা মানতে না পেরে, সরে গেল আরো পশ্চিমে। এঁরা রোমান, ইহুদি, আর যীশুর খৃষ্ট, তিনকে একত্রে ধারণ করে স্বভাবে ইহুদি রইল, সম্প্রদায়িক ভাবে খৃষ্ট রইল, আর সৌখিনতায় রোমান রইল, এবং আগামীদিনে জগতশাসন করার জন্য সংকল্প গ্রহণ করতে থাকলো।
আর সেই সময়ে, একদিকে মহম্মদের মার্গদর্শনে তোমাদের কল্পজগত অর্থাৎ পৃথিবীর মধ্যপ্রাচ্য যেমন উন্নত হতে থাকলো মানসিক ভাবে, তেমনই অহংকারের আরাধনা করে করে, রীতিরেওয়াজ, হোমযজ্ঞের নাম করে, আর্যদের ব্রাহ্মণ শ্রেণী সকলের সমস্ত কিছু হনন করতে শুরু করলো। ধন, জমি, সম্পত্তি, তো অনেক পরের কথা, তাঁরা তো অন্যের স্ত্রী, সন্তানও হনন করতে শুরু করে দেয়।
যখন এমন চলছে তাদের ব্যবিচার, তখন আমার বৌদ্ধ সন্তান, ও মার্কণ্ডশিষ্য, বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠের প্রেরণায় বাল্মীকি রামায়ণের রচনা করে দেখালেন যে অহংকার যতই মর্যাদার মান রাখুক, যদি প্রকৃতিকে মান দিতে না পারে তা, তবে প্রকৃতির কৃপা এক না এক সময়ে ভূমিতলে চলেই যায়, আর তখন অহংকারের রাজ্য সরযুতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। যখন সেই কথাতেও মানুষকে আর্যদের ব্যবিচারের থেকে মুক্ত করতে পারলো না, তখন কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন এসে, সেই একই কথার বিবরণ দিলেন যেখানে অহংকারকে তিনি পাঁচ ভাগে ভেঙে দিলেন, আর প্রকৃতিরূপী সীতাকে দ্রৌপদী বা কৃষ্ণারূপে স্থাপন করলেন।
গৌতম পিপলাদের উপনিষদকে আত্মগুণগান ভেবে ব্রাহ্মণরা স্থাপিত হতে দিয়েছিলেন; বাল্মীকির রামায়ণকে অহংকারের জয়ঘোষরূপে স্থাপন করে দিয়েছিলেন ব্রাহ্মণরা, কিন্তু কৃষ্ণ দ্বৈপায়নের জয়া, যা পরে মহাভারত রূপে প্রচারিত হয়, তাকে যেন ব্রাহ্মণরাও বাগে আনতে পারলেন না। এক মার্কণ্ড মহাপুরাণ, যেখানে প্রকৃতির অর্থাৎ আমার গুণকীর্তন করা আছে, তা নিয়েই ব্রাহ্মণরা ব্যথিত, তার উপর মহাভারতের প্রহার। ব্রাহ্মণরা তাই কৃষ্ণ দ্বৈপায়নকে, তাঁর গাত্রের কৃষ্ণবর্ণের জন্য অপমান করতে থাকলেন, লাঞ্ছিত করতে থাকলেন, এবং বহিষ্কার করার অবস্থায় নিয়ে এলেন।
যখন দ্বৈপায়ন আর অপমান সহ্য করতে না পেরে, ব্রাহ্মণদের থেকে মর্যাদার ভিক্ষা চাইলেন, তখন ব্রাহ্মণরা একগুচ্ছ পুরাণ রচনার বিধান দিলেন, আর মার্কণ্ড মহাপুরাণকে ভস্ম করে দিয়ে, সেই স্থানে মার্কণ্ড পুরাণ স্থাপিত করতে নির্দেশ দেন। রচিত হলো নব্য পুরাণ সমূহ, যেখানে ব্রাহ্মণ হলেন শ্রেষ্ঠ, ব্রাহ্মণ হলেন ভগবান, আর তাদের মাধ্যমে ব্রাহ্মণ পুনরায় লুণ্ঠন শুরু করে দিলেন।
আমার সন্তানদের আমার বক্ষে ফিরে পেতে, আমি কেবলই ব্যর্থতারই সম্মুখীন হয়েছি, কারণ আমি যে সংগ্রাম করিই নি। প্রথমত নিরাকার বলে, নির্বিশেষ বলে কিছু করিই নি, কেবলই আঁচল পেতে সন্তানের ভিক্ষা চেয়ে গেছি। অতঃপরে অবতার গ্রহণ করা শুরু করি, কিন্তু যতই অবতার গ্রহণ করি, আমি কি যুদ্ধ করবো? কার সাথে যুদ্ধ করবো? আমারই সন্তানের সাথে!
হতে পারে ব্রাহ্মণ ভুলে আছে যে তারা আমার সন্তান, কিন্তু আমি তো ভুলিনি তাঁরা আমার সন্তান; হতে পারে পশ্চিমী মিশ্রজাতি ভুলে গেছে যে তাঁরা আমার সন্তান, কিন্তু আমি তো আর ভুলি নি যে তাঁরা আমার সন্তান! … মহম্মদ যদি নাশকের আসনে স্থিত হতো, তাহলে কি একটিও মানুষ জীবিত থাকতো তাঁর সামনে! যীশুকে দিয়ে যদি আমি তরবারি ধরাতাম, মানব যোনির অস্তিত্ব থাকতো! মার্কণ্ডকে দিয়ে যদি আমি অস্ত্র ধারণ করাতাম, অস্তিত্ব থাকতো মানব জাতির!
কিন্তু আমি আমারই সন্তানকে কি ভাবে নাশ করি! কি ভাবে তাঁদের সাথে আমি যুদ্ধ করি! … উপায় দেখালো শঙ্কর আর কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন। প্রথম উপায় দেখালো দ্বৈপায়ন। ব্রাহ্মণরা তাঁকে সমস্ত জীবন হেনস্থা করেছে। যেই মার্কণ্ড তাঁর কাছে গুরুসমান, তাঁর কীর্তির বিনাশ করিয়েছে, তাঁকে নিজের হাতে। প্রতিশোধ নিলো সে, কিন্তু এক মধুর প্রতিশোধ ছিলো তা। সে উপনিষদের কথাকে পুনরায় লিখলো সংক্ষেপে, আর নাম দিল ভগবৎ গীতা। আর সেই গীতাতে সে নিজেকে অর্থাৎ নিজের দ্বৈপায়ন নামকে লুক্কায়িত করে, ব্রাহ্মণদের অপমান প্রদান করা কৃষ্ণ’ নামকে ধারণ করে, সেই কৃষ্ণকে ভগবানশ্রেষ্ঠ, অর্থাৎ ব্রাহ্মণদের উর্ধ্বে স্থাপন করে বিদায় নিলেন।
তিনি জানতেন, আর আমি জানতাম, আর কেউ জানতো না যে, এই ভগবৎ গীতা একসময়ে, ব্রাহ্মণদের উৎখাত করে দেবে, তাঁদের ক্ষমতাকে ক্ষীণ করে দেবে। কিন্তু ব্রাহ্মণরা এর ধারণাও করতে পারে নি। আর অন্যদিকে শঙ্কর উপনিধদে লিখিত সমস্ত আত্মশব্দকে মুছে দিয়ে ব্রহ্ম শব্দ স্থাপন করিয়ে অদ্বৈত বেদান্ত স্থাপন করলো। অদ্ভুত মধুর প্রতিশোধ নিলো তারা। তরবারিও ধরলো না, অথচ সম্যক ব্রাহ্মণশ্রেণীকে অন্তর থেকে হত্যা করে দিলো আমার এই দুই পুত্র।
আমি সংকল্প নিয়ে নিই সেদিন, না, প্রেমের মধ্যে শাসনও পরে। এবার আমাকে আমার সন্তানদের শাসন করতে হবে। তাই প্রথম নিমাই বেশে অংশ অবতার নিই, আর কৃষ্ণ দ্বৈপায়নের কৃষ্ণ গীতা রচনাকে ধরে টানি, আর তাকে ধরে টানতেই, তা হয়ে গেল ভগবানের বাণী, আর ব্রাহ্মণদের সমস্ত ভেদ সম্মুখে এসে গেল, গীতার মাধ্যমে। ব্রাহ্মণরা ক্ষতবিক্ষত হলো। আর শেষে নিমাইকে হত্যাও করলো, তবে যীশুকে যেমন লোকসমক্ষে হত্যা করেছিল, তেমনটা করার সাহস করলো না।
ব্রাহ্মণদের আরো একটি দুর্বল দিক দেখিয়ে গেছিল শঙ্কর, ব্রহ্মই প্রকৃতি, প্রকৃতিই ব্রহ্ম দেখিয়ে গেছিল আমার সেই পুত্রই। আর তাই আরো একটি অংশপ্রকাশ গ্রহণ করি আমি, আর সেই অবতার দ্বারা শঙ্করের সেই দড়িকে ধরে টানি, যাতে ব্রাহ্মণের পাজামার দুটি দড়িই খুলে যায়, আর তারা দিগম্বর হয়ে যায়। আর এই ভাবে আমি আমার সন্তানদের অহংকারের এক দানবীয় মুখ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হলাম। কিন্তু, ওই যে বললাম তোমাদেরকে আমার মাতৃক্রোড় যেন অভিশপ্ত!
অহংকারের একটি মুখের দমন করি, তো হাজারো মুখ সম্মুখে এসে যায়। সবশেষে সন্তানকে কোলে আর পাইনা। এক্ষেত্রেও তাই হলো, আর্যরা মিশরে গিয়ে, রোমান হয়ে আর সিন্ধুতটে এসে অহংকারের বিস্তার শুরু করেছিল। বহুকষ্টে, আমার সন্তানদের বুকে ফিরে পেতে, অহংকারের সাথে সংগ্রাম করে, একদিকে যীশুকে স্থাপন করে, রোমানদের লঘু করলাম, অন্যদিকে মহম্মদকে দিয়ে মিশরীয়দের থেকে উদ্ধার করলাম আমার সন্তানদের, আর একের পর এক অবতার গ্রহণ করে, আমার সন্তানদের এই আর্যব্রাহ্মণদের থেকে রক্ষা করলাম।
কিন্তু অন্যদিকে, সেই রোমানদের সাথে খৃষ্ট আর ইহুদি মিশে যেই মিশ্রজাতি হয়েছিল, তারা ভয়ঙ্কর অহংকারের মুখ নিয়ে উপস্থিত হলো সমস্ত কল্পধরিত্রীতে, আর পুনরায় আমার সন্তানদের আমার থেকে দূরে ছিনিয়ে নেওয়া শুরু করলো। আর এবারের আগ্রাসন যেন, আর্য, মিশরীয় আর রোমানদের থেকেও অধিক ভয়ঙ্কর! কি করে আমার সন্তানদের আমি আমার বক্ষে এবার টানি, আমি কিছু বুঝেই পাচ্ছিনা। যেন বারে বারে সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, আর মনে হচ্ছে, না আর মানবযোনি দিয়ে হবেনা!
বারে বারে মনে হচ্ছে, এবার তো আমি অবতরণ করতে শুরু করেছি। এবার অহংকারের সাথে আমিও মিশ্রিত হয়ে, মানবযোনিকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে, একটি নতুন যোনির নির্মাণ করবো, আর এবার প্রথম থেকে অবতরণ করে, এই যোনির ভিত্তি শক্ত করবো। … পরমুহূর্তে, আমার স্মরণ হয়, আমার সন্তানরা বেদনায় আছে। আমাকে না পেয়ে তাঁরা বেদনায় আছে, আর সেই বেদনাকে তাঁরা অন্য অন্য নাম দিচ্ছে, কারণ তাঁরা জানেও না যে সেই বেদনার কারণ আমার থেকে বিচ্ছেদ। … তাই বারবার সহ্য হারাচ্ছি, আর বারবার সহ্যকরছি। জানিনা, কতদিন এই সহ্য করতে পারবো।
তোমাদের মনে হচ্ছে, কেন এমন ভাবে সহ্য হারাচ্ছি! তাহলে শোনো এই মিশ্রজাতির মাধ্যমে অহংকার কি ভাবে আমার থেকে আমার সন্তানদের সরিয়ে রেখেছে। জেনে নাও, তারপর তোমরাই বলো, আর কত সহ্য করবে এই জননী! এক জননী সব সহ্য করতে পারে, নিজের সন্তানের এই বুকফাটা বেদনা, আর বেদনার উৎস সম্বন্ধে অজ্ঞতাকে সহ্য করতে পারেনা।
ধনসম্পদ তার নাম, ছিল বহুকালই। মানুষ রচনা করেছিল, এই ধারণা নিয়ে যে, আমার যা আছে, তা সবার কাছেই থাকবে, আর অন্যের যা আছে তাও সবার কাছে থাকবে, আর এই বণ্টনের মাধ্যম হবে ধন। সুন্দর ভাতৃত্ত্ববোধের থেকে এঁর উৎপত্তি। চলছিলও ভালো। শাসক এলো, এই বণ্টনকে সীমিত ভাবে সকলের কাছে ছড়িয়ে দিল, আর নিজের কাছে বেশিটা রেখে রাশ ধরে রাখলো।
প্রয়োজনের জন্য ধন; রাজার শাসনে প্রজার প্রয়োজন সীমিত, তাই ধনের আবশ্যকতাও সীমিত। না প্রয়োজন বিলাসিতার, আর না অতিবিশ্রামের। তাই ধনের আধিক্যের প্রয়োজনই নেই প্রজার। বেশ চলছিল এমন। রাজার কাছে প্রচুর ধন, নিজের ট্যাঁকশালে ছাপানো। সেই দিয়ে চাষির উৎপন্ন করা সামগ্রী কেনে রাজা, আর সকলের মধ্যে তা বণ্টন করে দেয়, যারা সেই শস্য চাষ করেনি। বাকি শস্য দ্বারা তৈল, তুলা নির্মাণ, আর সেই দিয়ে রাজার দেওয়া পারিশ্রমিক গ্রহণ করে, কর্মীর বস্ত্র বা তেল নির্মাণ। কামারশালার কামার, কাঠুরিয়ার কাঠ, মূর্তিকারের নির্মিত বাসন ও মূর্তি, সমস্ত কিছুর জন্য রাজা দিচ্ছেইলেন সামান্য পারিশ্রমিক, আর তাই দিয়ে প্রজার নিত্যপ্রয়োজন মিটেই যায়।
ভালোকাজের জন্য জমিদান, গোদান তো ছিলই। সেই দিয়ে পুত্রকন্যার বিবাহ, অন্নপ্রাশন, পৈতাদান, শ্রাদ্ধ কর্মের ব্যয় সহজেই উঠে যাচ্ছিল। এছাড়া যদি জলাশয়ের প্রয়োজন পরে, ঝড়ে বাড়ি ভেঙে যায়, বিদ্যাদান, ইত্যাদির খরচ তো রাজা নিজেই ওঠাতেন, প্রজার থেকে লাভ করা রাজস্বের সাহায্যে। তাই, অহংকার এখানে কনোভাবেই অসিমিত হতে পারছিলো না।
কিন্তু বাঁধ সারলো, এই মিশ্রজাতিরা। অতিরিক্ত লোভ চেপে বসলো এঁদের। এর ওর তার সম্পত্তি হরপ করে নেবার ঝোঁক চেপে বসলো তাদের। আর সেই অহংকারের বাড়বাড়ন্ত এমন অবস্থায় পৌঁছল যে, তাঁদের কল্পনার সহবস্থান ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তাঁদের সম্পূর্ণ স্থান বরফে ঢেকে গেল, তাঁদের কল্পনার অনিয়ন্ত্রনের কারণে। ভয়ানক অবস্থা আমার সন্তানদের। অনাহারে, পিপাসায় ছাতি ফেটে গিয়ে, তাঁদের মৃত্যু হতে থাকলো।
মৃত্যুতে অসুবিধা নেই, সে তো কল্পনার অবশ্যম্ভাবী পরিণাম। কিন্তু যেই বেদনার মধ্যে দিয়ে তাঁরা দিবারাত্র কাটাচ্ছিল, তা অসহনীয়। তাই তাঁদের বেদনা সহ্য করতে না পেরে, তাঁদেরকে কল্পনার মধ্যে চেতনার বিকাশ ঘটালাম। সেই চেতনার বলে, তারা পেল জ্বালানীর সন্ধান, কয়লার সন্ধান। জানতাম, তাঁরা লোভী, তাই এবার তাঁরা সমস্ত কয়লার উপর অধিকার জমানোর প্রয়াস করবে, কিন্তু কি করবো! সন্তানকে এমন পীড়ায় দেখেও মুখ ফিরিয়ে থাকবো! এক মায়ের পক্ষে কি তা সম্ভব!
যেই ভয় পেয়েছিলাম, তাই হলো। তাঁরা কয়লার সন্ধান করতে এদিক সেদিক করে, তাঁদের কল্পরাজ্য অর্থাৎ সমস্ত পৃথিবীতে ছড়িয়ে পরলো। খুঁজতে খুঁজতে জম্বুদ্বীপেও এসে উঠলো তাঁরা। আর এখানে এসে বিপুল কয়লার সন্ধান পেল। তা পেতেই ঝাঁপিয়ে পরতে গেল, কিন্তু তা হলো না। মহম্মদের বংশোদ্ভূতরা রক্ষা করছিলেন তখন এই জম্বুদ্বীপের। কিন্তু এই মিশ্রজাতিরা যে অহংকারের ব্রাহ্মণের পরবর্তী মুখ। যেমন ব্রাহ্মণরা কিছুতেই নিজেদের জমি ছাড়তোনা, তেমন এঁরাও ছাড়লো না।
এঁরা ছলেবলে, মহম্মদের বংশোদ্ভূতদের থেকে এই জম্বুদ্বীপকে হনন করে নিলো। স্থাপন করলো নিজেদের উপনিবেশ, আর কয়লার সন্ধান করতে থাকলো। বিপুল কয়লা এই ভূমিতে, এতই কয়লা যে, সমস্ত কিছুকে উদ্ধার করতে পারলে, সমস্ত কল্পজগত অর্থাৎ সম্পূর্ণ পৃথিবীকে কয়েক সহস্রবছর পরাধীন করে রাখা যাবে।
আমার চেতনা তাঁদের সাথে ছিলই, আর তারও আগে থেকে এঁদের ধূর্ততাও এঁদের সঙ্গে ছিল। এই দুই মিশিয়ে, এঁরা যন্ত্রবিদ্যার বিস্তার করতে থাকলো, অর্থাৎ কল্পনার জগতে, নূতন করে কল্পনার বিস্তার। আর সেই কল্পনাকে সমস্ত জগতে পণ্যরূপে বিক্রয় করতে থাকলো তাঁরা, এবং বিপুল ধন উপার্জন করে, সমস্ত পৃথিবীর একচ্ছত্র নৃপতি হয়ে উঠলো।
এঁরা রাজার উদারতা, আর সুব্যবস্থার মাধ্যমে ধনবণ্টনকে দেখেছিল, আর তার প্রশংসাও করেছিল, কিন্তু এঁরা অহংকারের পুরোহিত, নূতন করে অহংকারের বংশবিস্তার করাই এঁদের লক্ষ্য। তাই এঁরা দেখলো যে, রাজার কাছে এতই ধন গচ্ছিত আছে যে, তাঁরা কিছুতেই একচ্ছত্র রাজা হতে পারছেনা এই দেশে। তাই এঁরা শুরু করলো জমিদারী প্রথা, যেখানে একাধিক ব্যক্তিকে ধনভাগ দিয়ে রেখে, সমাজের পরিবর্তন করে দিলো।
যেখানে সমাজে ছিল রাজা, রাজকর্মচারী আর সাধারণ প্রজা, সেখানে এঁরা আরো একটি শ্রেণীর নির্মাণ করলো। রাজার আসনে নিজেদের স্থাপন করলো, আর রাজকর্মচারীদেরকেও নিয়োগ করলো, সাধারণ প্রজা হয়ে উঠলো নিপীড়ন সয়ে তাঁদের অহংকার আরাধনার পুষ্পাঞ্জলি দেবার মাধ্যম, আর পুরোহিত করে স্থাপন করলেন জমিদারদের, যারা হলেন উচ্চবিত্ত। ক্রমাগত এই উচ্চবিত্তদের শ্রেণীকে ধনের লোভে লোভাতুর করে তুলে, ধনের কাছে এঁদেরকে পরাধীন করে দিলো তাঁরা, যেমনটা তাঁরা নিজেরাও ছিল।
আর তাই প্রজাশোষণ এক অন্যমাত্রায় চলে গেল। আবার আমার সন্তানের বেদনা, তাই আমি আর সহ্য করতে পারলাম না, চেতনাপ্রপদান করলাম আমার প্রিয় বঙ্গদেশে, বিপ্লবের চেতনা। ধ্বজা ধরলাম আমি স্বয়ং, আমার অংশঅবতার গদাইকে দিয়ে। শুরু হয়েছিল ধর্মবিপ্লব। ব্রাহ্মণরা ইতিমধ্যেই ভিতরে বসে থেকে অহংকারকে শক্তিশালী করে রেখে দিয়েছিল। তাই নিমাইএর পর এবার ব্রাহ্মসমাজ আর গদাইকে দিয়ে আঘাত করে ব্রাহ্মণদের চুরচুর করে দেওয়া হলো। এর সাথে সাথে শুরু হলো ভাষাবিপ্লব। বিশিষ্ট বঙ্গসন্তানরা বঙ্গভাষাকে এতটাই উর্বর করে তুলল, আমার চেতনা ধারণ করে যে, আজ এঁর থেকে উন্নত ভাষা, সমস্ত কল্পব্রহ্মাণ্ডে আর দ্বিতীয় নেই।
আর অতঃপরে শুরু হলো সংস্কৃতি বিপ্লব। সঙ্গীত, কলা, নাট্য, নৃত্য, সমস্ত কিছুতে অদ্বিতিয়ম হয়ে রইল বঙ্গদেশ। আর এইসমস্ত কিছুর সাথে সাথে বিস্তার লাভ করলো কল্পজগতের বিপ্লব এই বঙ্গভূমিতে। আমার সন্তানদের দেওয়া বেদনার প্রতিউত্তর পেতে থাকলো আমার অন্য সন্তানরা, অর্থাৎ মিশ্রজাতিরা। ক্রমশ বঙ্গদেশের এই চেতনার হিল্লোল ছড়িয়ে যাচ্ছিল সমস্ত জম্বুদ্বীপে, যার তখন নাম হয়েছিল ভারত। যদিও আমার চেতনা আশীর্বাদপ্রাপ্ত বঙ্গভূমি ও সেখানের অধিবাসীদের চেতনা উদ্দীপনের সাথে সমস্ত ভারত তালমেলাতে পারলো না, উপরন্তু দক্ষিণ ভারতে এঁদের থেকে শিক্ষা নিয়ে চেতনা ধারণ করার প্রবণতা সত্যই প্রশংসনীয়।
যদিও, বঙ্গদেশের এবং দক্ষিণ ভারতের এই উত্থানকে বাকি ভারতীয়রা তির্যকদৃষ্টিতেই দেখতে থাকলো, আর নিজেদের অধিকার, যা ছিলইনা তাদের কাছে, তা হারিয়ে ফেলার ভয় পেতে থাকলো। সেই ভয় এখনো পায় এঁরা, আর তাই যতপ্রকারে সম্ভব বঙ্গ ও দক্ষিণ ভারতকে প্রবঞ্চনা করতেই থাকে এঁরা। কিন্তু এটিই সত্য যে, আমার চেতনাকে ধারণ করা এই জগতে তিনটিই প্রজাতি আছে, এই মিশ্রজাতিদের পীঠস্থান অর্থাৎ যাকে তোমরা বলো ব্রিটেন, এই বঙ্গভূমি, এবং এঁদের দুইজনেরই থেকে প্রভাবিত হয়ে স্বপ্রচেষ্টায় স্থিত দক্ষিণ ভারত। তাই এঁদের মেধার তুলনাও সম্ভব নয়।
না কলায়, না বিদ্যায়, না কৌশলে, না বুদ্ধিতে, না আধ্যাত্মিক চেতনাতে, আর না সত্যজ্ঞান লাভের ক্ষেত্রে – এঁদের ধারেকাছেও কেউ থাকেনা সমস্ত মানবজাতির মধ্যে। কিন্তু আমার চেতনা মানেই, তার সাথে আমার মমতা, স্নেহ ও প্রেমও মিশ্রিত থাকবে, আর তাই এই তিনছেত্রই অহংকারে আসুরিক হয়ে উঠতে সম্পূর্ণ ভাবে পারেনা, যতই সমস্ত কল্পজগত অহংকারের আধিনে স্থিত থাকুকনা কেন।
এই দুই প্রজাতির প্রেরণা থেকে কলা বা বিদ্যায় তো এঁদের সমতুল্য হতে পারলো না, কিন্তু আমার চেতনা থাকা মহম্মদের বংশোদ্ভূতরা, আর পশ্চিম ভারতে আমার শিখসন্তানরা বিপ্লবে অগ্রণীভূমিকা গ্রহণ করতে শুরু করে। সেই বিপ্লবের জ্বালায় অস্থির হয়ে ওঠে মিশ্রজাতিরা, আর পিছু হটতে শুরু করে তাঁরা। কিন্তু এঁরই মধ্যে, আরো বেশ কিছু কাণ্ড ঘটে গেল, যা অহংকারকে পুনরায় সিংহাসন প্রদান করে, আমার সন্তানকে আমার থেকে ছিনিয়েই নিলো।
এঁদের মধ্যে প্রথম হলো, রুশদেশে এই মিশ্রজাতিরই এক অংশের দাবি। দ্বিতীয় হলো এই মিশ্রজাতির মার্কিনরূপে বিস্তার এবং অহংকারের দ্বিতীয় জ্বালানীর সন্ধান। রুশ দেশের মিশ্ররা দাবি তুলে বসলো যে, ধনবণ্টন করতে হবে, সকলের কাছে ধন দিতে হবে। যেই বাণিজ্য কিছু মানুষের হাতে গচ্ছিত, যেই যান্ত্রিক কল্পনার জগত কিছু মানুষের কাছে সীমিত, সেই কল্পনার ভাগীদার সকলকে করতে হবে। সকলকে বিলাসিতা করার সুযোগ দিতে হবে, সকলকে বিলাসিতার বস্তু ক্রয় করার সুযোগ দিতে হবে, তবেই বাণিজ্যের বৃদ্ধি হবে।
ধনসর্বস্ব এঁরা বরাবরই ছিল। তাঁদের মধ্যে যাদেরকে আমি চেতনা প্রদান করেছিলাম, তাঁরা কয়লার সন্ধানে নির্গত হয়েছিল। আর বাকিরা বরাবরই ধনলোভী ছিল। তাই তাঁদের অহংকার এবার সম্মুখে এসে বলে উঠলো যে, যদি সীমিত রাজা-জমিদারদের কাছে অর্থ গচ্ছিত থাকে, ক্রেতা যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে! বানিজ্যের বিস্তার হবে কি করে? বাণিজ্যের নেশায় সকলকে নিমজ্জিত করা যাবে কি করে! ধনের দ্বারা সকলকে পরাধীন করে রাখা যাবে কি করে! …
তাই রুশের সেই ধারণা সমস্ত কল্পজগতে প্রসারিত হতে শুরু করলো, আর প্রজা হয়ে উঠলো রাজা, গণতন্ত্রের বিস্তার হলো, আর রাজতন্ত্রের পতন হলো। কেবল মাত্র মহম্মদের ক্ষেত্রতেই রাজতন্ত্র রইল, অন্যত্র তা উঠে গেল, সকলের কাছে ধনই ধন। যত ইচ্ছা ধন উপার্জন করতে পারে সকলে, আর ধন দ্বারা সমস্ত কিছুই সম্ভবপর হয়ে উঠলো। তাই নিজের অন্ন আর কেউ নিজে উৎপাদন করতে জানলো না, সকলেই পরাধীন হয়ে গেল, সর্বগ্রাসী ধনের মাধ্যমে অহংকার সমস্ত মানবজাতিকে নিজের দাসে পরিণত করে দিল।
হয়তো ব্রিটেন এটাকে কিছুটা হলেও সীমিত রাখতো, কারণ তাঁরা আঁচ পেয়েছিল এর প্রভাবে কি নেশা জগতে বিস্তার পেতে চলেছে। কিন্তু সেখানে বাঁধ সারলো, অহংকারের দ্বিতীয় জ্বালানীর সন্ধান সমুদ্রতলের তৈলরূপে। সেই তৈলের সন্ধান পেতেই, ব্রিটেনের সন্তানদের ক্ষমতাচ্যুত করার সম্ভাবনা জেগে উঠলো।
কয়লাই একমাত্র জ্বালানী, আর তাকে আমার ব্রিটিশ সন্তানরা কুক্ষিগত করে রেখে হয়েছিল কল্পজগতের একচ্ছত্র রাজা। অহংকারের এই দ্বিতীয় জ্বালানীর সন্ধান পাওয়াতে, যে এই জ্বালানী সম্পদকে কুক্ষিগত করতে পারবে, সেই হবে পরিবর্তী কল্পজগতের নৃপতি। আর সেই ক্ষেত্রে, নীরবে এবং অত্যন্ত নিষ্ঠুরতা তথা নিকৃষ্ট মানসিকতার মাধ্যমে মার্কিনরা তা কুক্ষিগত করে নিলো, সমস্ত কল্পজগতে আমার হাজারো সন্তানকে নেপথ্যে দাঁড়িয়ে হত্যা করে।
আর এই মার্কিনরা ছিল রুশের দাবি যে ধনের নেশা সকলকে করতে দেওয়া হোক তবেই অধিক ধনের আর ধনবানের রচনা সম্ভব হবে কারণ ক্রেতার সংখ্যায় বৃদ্ধি হবে, তারও পৃষ্ঠপোষক। তাই ব্রিটেন হারালো ক্ষমতা, আর গণতন্ত্রের ধ্বজা ধরে, মার্কিনরা আমার সমস্ত সন্তানদের ধনের দাস করে দিলো। ভারতকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবো না জানতাম, কিন্তু জম্বুদ্বীপ মানে বঙ্গদেশকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াস করেছিলাম, কিন্তু সেখানেও মার্কিনীদের অহংকার মাথা গলালো। তাঁদের কুচক্রী বুদ্ধির মাধ্যমে, আমার সাধের বঙ্গদেশকে তাঁরা দুই খণ্ডে ভেঙে দিল, আর তাকে লুটেপুটে খাবার জন্য, একটি ভাগকে দিয়ে দিলো পাকদেশের হাতে, আর অন্য ভাগকে লুণ্ঠন করার জন্য দিয়ে দিল অহংকারের নববধূ ভারতের হাতে।
পরে পাকের লুণ্ঠন থেকে কনো ক্রমে বাঁচিয়েছিলাম আমি একটি ভাগ বঙ্গকে, কিন্তু অন্য ভাগটির লুণ্ঠন এখনো অব্যাহত। … না ব্রাহ্মণরা আর বঙ্গদেশকে লুণ্ঠন করতে পারেনি ঠিকই। কিন্তু এই মার্কিনদেরকে নিমাইএর বংশোদ্ভূত আর গদাইএর বংশোদ্ভূতরা নিমন্ত্রণ দিয়ে নিয়ে এলো। আর এর ফলে, যেই ব্রাহ্মণত্ব অর্থাৎ অহংকারের থেকে নিমাই আর গদাই এঁদের রক্ষা করেছিল, তাঁদেরকে পুনরায় সেই অহংকারীদের হাতেই অর্পণ করে দিলো, আর এই মার্কিনীরা আর মীরজাফর ব্রাহ্মণবংশোদ্ভূতরা একত্রে মিলে, নিমাই, গদাই, প্রণবের খোলস পরে আধ্যাত্মের নিত্যহত্যা করছে, যাতে আমার সন্তানরা আমার কাছে আর কনোদিনও ফিরতে না পারে। তাই তাঁদের হাত ধরে যে আবার আমার সাধের বঙ্গভূমি, যাতে আমি মার্কণ্ড থেকে শুরু করে নিমাই, গদাই হয়ে জন্ম নিয়েছি, আর এখনও এখানেই পূর্ণরূপে অবতরণ করে রয়েছি, তাকে যে উদ্ধার করবো, তা অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে।
আর কেবল বঙ্গভূমিই কেন, এই মার্কিনীরা বিভিন্ন স্থানে, কেবলই ধনের মোহজাল বিস্তার করে, পুনরায় আর্যদের, মিশরীয়দের আর রোমানদের উত্থান ঘটাচ্ছে। বিশ্বাস হচ্ছে না! বেশ এঁদের নতুন নামগুলো বলি, তাহলেই বুঝে যাবে। আর্যরা ব্রাহ্মণ নামেই বঙ্গব্যতীত সমস্ত ভারতে রয়েছে, আর যেহেতু বঙ্গে ব্রাহ্মনত্ব্বের মৃত্যু হয়েছে, তাই এখানে তারাই হলো আশ্রমের অধিপতিগণ, কাজ তাদের একই, অন্ধত্বের বিস্তার আর অহংকারের শাসনের ব্যপ্তি, কেবল নাম পালটে নিমাই, গদাই আর প্রণবের খোলস চাপিয়ে নিয়েছে।
মিশরীয়রা নিজেদের খোলস ছেড়ে ফেলেছে, সেটা জানো তোমরা, কিন্তু এঁরা যে আব্রামের নির্মাণ করা ইহুদির খোলস ধারণ করে, সমস্ত কল্পজগতে যন্ত্রের পর যন্ত্র নির্মাণ করে, রাসায়নিক বিক্রিয়ার পর রাসায়নিক বিক্রিয়া করে, কল্পনার নবআস্তরণ নির্মাণ করে, মানুষজাতিকে প্রতিদিন অধিক অধিক করে পরাধীন করে দিচ্ছে, তা কি জানো? জানবে কি করে? যেমন বরফের একাংশই জলের বাইরে থাকে, আর বাকি অংশরা নিচে নিমজ্জিত থাকে, তেমনই যে এঁদের একাংশই বাইরে রয়েছে, যারা হলো আজকের দিনের বাণিজ্যিক শ্রেষ্ঠ।
আর রোমানরাও নিজেদের খোলস ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু ঠিক যেমন ভাবে বঙ্গের আর্যরা ব্রাহ্মণত্বের পোশাক ছেড়ে গদাই, নিমাই আর প্রণবের পোশাক ধারণ করেছে, এঁরাও তেমনই যীশুর পোশাক ধারণ করে সেই একই কাজ করছে। অর্থাৎ, যেই অহংকারের এতো কষ্ট করে নিধন করে, আমার সন্তানদের আমাকে কাছে ফিরিয়ে এনেছিলাম, সেই অহংকারের ছাদন পুনরায় আমার সন্তানরা নিজেদের গায়ে টেনে নিয়েছে, আর পুনরায় আমার থেকে দূরে চলে গেছে, পূর্বের থেকেও অধিক দূরে।
অর্থাৎ সমস্ত কিছুর শেষে আমি সেই নিরুপায় জননী হয়েই থেকে গেলাম। আমার সন্তানরা বাণিজ্যের নাম করে সকলেই ধনের কাছে পরাধীন, কারণ এঁরা কেউ নিজের অন্ন নিজে উৎপাদন করতে পারেনা। আমার সমস্ত সন্তানরা আজ অহংকারের আরাধনাকেই আধ্যাত্ম বলে নামাঙ্কিত করেছে। যেখানে গদাই বারংবার বলে গেছিল, প্রচার নয়, আগুন জ্বললে বাদুলে পোকা এমনিই আসবে, সেখানে সেই প্রচার করে করে, যাদের অহংকার তাঁদের থেকে খসে যাবার অবস্থার ত্রিসীমানায় নেই, তাদেরকে যুক্ত করে করে, আধ্যাত্মকেই প্রদুসিত করে দিয়েছে।
যেখানে নিমাই বারংবার বলেছিল প্রেমকে বোঝো, আর ধারণ করো, সেখানে কেবল উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করে করে, আধ্যাত্মকেও বাণিজ্য আর ধনসর্বস্ব করে তুলেছে। … সমস্ত কিছুই ধনের কাছে বিকিয়ে, মানুষও আজ তাই অন্য জীবদের মতই আহার, নিদ্রা মৈথুন সর্বস্ব হয়ে উঠেছে, সমস্ত কিছু মানছি। মেনে নিচ্ছি সমস্ত মানুষ জাতি বাহ্যমুখী হয়ে, কল্পনার জগতকে বিস্তারিত করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আধ্যাত্মকেও এবার সেই বাণিজ্যের মধ্যে ধারণ করে নিয়েছে এঁরা। … আমার সন্তানদের কি তাহলে আমি কিছুতেই আর আমার হৃদয়ে ফিরে পাবো না! … যেই মাতৃত্বসুখ আমাকে বৌদ্ধরা দিয়েছিল, সেই মাতৃত্বসুখ কি আমার জন্য ইতিহাস হয়ে গেল! …
এবার তোমরাই বলো, এই মায়ের কি আর সহ্যের সীমা থাকতে পারে! … সম্ভব কি মায়ের পক্ষে, আর সহ্যের সীমা ধরে রাখা! … তাই মানুষের অহংকারকে দমন করার জন্য এবার পূর্ণঅবতার নিলাম, আর সম্যক সত্যকে প্রকাশ করলাম, তথা সত্যে স্থিত হবার সহজতম মার্গ প্রকাশ করলাম। সম্যক সত্যকে জেনে, অহংকারের দমন হবে, আর সেই অহংকারকে বৈরাগ্য অর্থাৎ আসক্তি বিরক্তির ঊর্ধ্বে উঠে, সম্মুখে আমি যা প্রকাশ করবো, সকলের মুখ দিয়ে যা বলবো, তাকেই আমার মার্গদর্শন মনে করে পথ চলো, এই বার্তা দিলাম।
যদি তা চলতে পারো, আমি আমার সন্তানকে আর তোমারা তোমাদের মাতাকে অবশ্যই লাভ করবে। আর যদি অহংকার ইচ্ছা, কল্পনা, চিন্তার প্রভাবেই পরে থাকতে চাও, তবে এই মায়ের সহ্যসীমা তাঁর অন্তিম চরণে উন্নীত। এই মানুষযোনিকে আর অস্তিত্বে রাখবো না আমি। … কিন্তু যেই বেদনা তোমরা পাবে তার ফলে তাতে পীড়া আমারই হবে, তোমরা তো কেবলই পীড়ার ভান করে সেই ভানেই পীড়িত।
তাই অন্তিম বারের মত আহ্বান জানালাম, “হে আমার বুদ্ধরা, জাগো। … এই জননীর হৃদয়ে, এক তোমরাই শেষ আশা। … এক তোমরাই এই মায়ের বুক আলো করেছিলে। আজ পুনরায় এই মায়ের বুককে আলোড়িত করে দাও, কারণ এক তোমরাই পারবে, কারণ এক তোমাদেরই আমি ভরসা করি। … জাগো বুদ্ধরা। যুদ্ধের সময় এসেছে। জাগো, অধীনে করো তোমাদের সমস্ত সহোদর, সহোদরাদের, আর পুনরায় তাঁদের আমার বক্ষে এনে দাও। … হে বুদ্ধরা, এটা তোমাদের মাতার আদেশ, আর সঙ্গে অশ্রুপূর্ণ বিনম্র অনুরোধ।
জাগো তোমরা, আর তোমার বঙ্গের ভ্রাতাভগিনীদের, ব্রিটেনের ভ্রাতাভগিনীদের, মহম্মদের বংশোদ্ভূত ভ্রাতাভগিনীদের আর দক্ষিণ ভারতীয় ভ্রাতাভগিনীদেরকে পুনরায় জাগ্রত করো। সত্যের পথে প্রেরণ করো। এক তোমরাই পারো এই কর্ম করতে, তাই তোমাদের মাতার তোমাদের কাছে বিনম্র অনুরোধ। জাগো তোমরা, জাগো”।
ইতি
তোমাদের মাতা
(যাকে ভালোবেসে তোমরা বলো জগদম্বা)
