বঙ্গ উত্থান (গুপ্ত ইতিহাস)
দিব্যশ্রী বললেন, “পিতা, এ যে চরমতম দুরাচার! … ঐতিহাসিকদের সাধারণ স্বভাবের মধ্যেই পরে যে, তাঁরা ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়সমূহকে ইতিহাসের পাতার বাইরে রাখেন। কিন্তু এখানে তো সম্পূর্ণ ইতিহাসকেই বিকৃত করে রাখা হয়েছে!”
ব্রহ্মসনাতন হাস্যমুখে বললেন, “পুত্রী, ইতিহাস মহাশক্তিধর। যেকোনো মানুষের, গোষ্ঠীর, জাতির, সমাজের প্রকৃত চিত্র উন্মোচিত করে রেখে দেয় সকলের সম্মুখে। তাই সকল সময়ে সকল শাসকই প্রয়াস করেন যাতে ইতিহাসের মুখ বন্ধ রাখা যায়। আসলে পুত্রী, প্রকৃত সত্য সম্মুখে এসে গেলে, প্রজার মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। শাসকের অনাসৃষ্টির কথা জেনে, শাসকের শাসনকে অমান্য করা শুরু করে দেয় ।
আসলে পুত্রী, রাজতন্ত্র হোক, বা লোকতন্ত্র, সর্বদাই শাসক হলেন জনপ্রতিনিধি। যেমন করে এক পিতা তাঁর সন্তানের পালক, জীবননির্মাতা নন, ভাগ্যনিয়ন্তা নিয়তি নন, তেমন করেই শাসক প্রজার ভাগ্যনিয়ন্তা নিয়তি নন। পিতার ন্যায়, তিনিও কেবলই সন্তানদের অর্থাৎ প্রজার পালক। তাই তাঁরা হলেন জনপ্রতিনিধি। আর তাই যদি প্রজা শাসককে অস্বীকার করেন, তবে শাসকের আর কিচ্ছুই করার থাকেনা।
সেই অসন্তোষকে রোধ করার জন্যই শাসক ইতিহাসকে বিকৃত করে, যাতে জনরোষ সৃষ্টি না হয়; যাতে জনসমক্ষে তাঁদের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ থাকে; এবং যাতে অবিরাম ভাবে প্রজা তাঁদের ক্ষমতায় উপস্থাপিত থাকতে দেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই উপস্থাপনের লালসা সম্ভোগ মানসিকতাসম্পন্নই হয়, যদিও সহস্র বৎসরে কনো কনো শাসকের মানসিকতা প্রজার সেবাও হয়।
আর তাই প্রজার সম্মুখে ইতিহাসকে বিকৃত করে প্রতিস্থাপন করেন শাসক, যাতে প্রজার কাছে তাঁরা ভগবানতুল্য হয়ে থাকতে পারেন। আর নিজেদের কর্তা জ্ঞান করার কারণে, ইনারা এমনই ভাবতে থাকেন যে, তাঁরা যদি ইতিহাসকে বিকৃত করে দেন, তাহলে সদাসর্বদার জন্য মানুষ ইতিহাসের ক্রুর সত্য থেকে চ্যুত থাকবেন। কিন্তু ইনারা, পরানিয়তির অবতারদেরকে প্রায়শই ভুলে যান, আর ভুলে যান যে, এই ঈশ্বরকটি ব্যক্তির কাছে সমস্ত ইতিহাস তাঁর মানসনেত্রেই ধরা পরে যায়, তাঁকে ইতিহাসের পাতা থেকে ইতিহাস উদ্ধার করতে হয়না”।
দিব্যশ্রী প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা পিতা, এই সামর্থ্য কি কেবলমাত্র ঈশ্বরকটি অবতারদেরই থাকে? কনো জীবকটির এই গুনাগুণ থাকেনা কেন?”
ব্রহ্মসনাতন হাস্য প্রদান করে বললেন, “পুত্রী, ঈশ্বরকটি আর জীবকটির মধ্যে প্রাথমিক ভাবে বিশেষ কনো ভেদ থাকেনা। তাঁদের দেহগঠন, তাঁদের জীবনযাত্রা, সমস্ত কিছুই একই হয়। হ্যাঁ, মানবিকভাবে সামান্য ভেদ থাকে বটে, আর সেই ভেদ হলো সংস্কারের ভেদ।
পুত্রী, সংস্কার অন্য কিছুই নয়, তা হলো বিভিন্ন দেহধারণ থেকে যেই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে এক ব্রহ্মাণু, তার সমষ্টি। এই সংস্কারের মধ্যে যেমন সদ্ভাব, বিনয়ের মত উচ্চকটি গুণ থাকে, তেমনই দম্ভ, ভেদাভেদের ন্যায় নীচকটি গুণও থাকে। আর ঈশ্বরকটি নিয়তি-কাল-প্রকৃতি প্রেরিত দূত হন, যার উদয় এঁদের থেকেই হয়, আর সকলের মত লয় এঁদের অন্তরেই হয়। ব্রহ্মাণুদের সংসারের কল্যাণ সাধন করাই এঁদের জন্মদানের একমাত্র উদ্দেশ্য।
আর যেহেতু এঁদের কনো পূর্বজন্ম থাকেনা, তাই এঁদের মধ্যে কনো সংস্কারও থাকেনা। আর যেহেতু এঁদের অন্তরে কনো সংস্কার না থেকেই, এঁরা সরাসরি উচ্চতমযোনিতে জন্ম নেয়, তাই পুত্রী, এঁদের মধ্যে ভেদাভেদ থাকেনা, জটিলতা থাকেনা, আমিত্বের বোধ থাকেনা, আর সেই কারণেই এঁরা সহজে সত্যমুখি হয়ে যান।
পুত্রী, যদি জীবকটিও সরাসরি এমন ভাবে মানুষ বা শ্রেষ্ঠ যোনিতে জন্ম নিতে পারতো, তবে এই কাজ তাঁদের পক্ষেও সহজ হতো। কিন্তু এঁরা স্বেচ্ছায় ভ্রমিত ব্রহ্মাণু, আর তাই নিজেদের ভ্রমের থেকে উন্নত হবার প্রয়াসের কারণে এঁরা প্রস্তর যোনি থেকে উন্নত হতে হতে, সমস্ত যোনির মধ্যে থেকে লাভ করা সমস্ত অভিজ্ঞতা ধারণ করে মানুষ বা শ্রেষ্ঠযোনিতে অবস্থান করেন। তাই এঁরা সত্য সম্বন্ধে উদ্ভ্রান্ত, দিশাহীন, দৃষ্টিহীন। আর সেই দৃষ্টিহীনতা, সেই দিশাহীনতা এবং সেই উদ্ভ্রান্ত ভাব থেকে মুক্ত করে সত্যের অভিমুখে প্রেরণ করার জন্যই নিয়তি-কাল-প্রকৃতি নিজেদের দূত প্রেরণ করেন, তাঁর সর্বসন্তানের কল্যাণ উদ্দেশ্যে।
এ ছাড়া ঈশ্বরকটি আর জীবকটির মধ্যে তেমন কনো ভেদ নেই। তবে এঁদের একটি ভেদ প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে, যখন এঁরা সত্যে অর্থাৎ মহাশূন্যে লীন হয়ে যান, এবং জীবনের লক্ষ্য বা পরমার্থ প্রাপ্তি করেন। পুত্রী, এই পরমার্থ প্রাপ্তিকে এমন ভাবার কনো কারণ নেই যে তা ঈশ্বরকটিরও পরমার্থ প্রাপ্তি। ঈশ্বরকটির পরমার্থ সত্যলাভ নয়, বরং সত্যলাভের উপরান্তে সত্যলাভের উপায় জগতকে বলায়, সত্যলাভের থেকে জগত কেন পিছিয়ে, কি করলে সেই দূরত্ব দূর হবে, তা বলায়।
সত্যলাভ জীবকটির পরমার্থ। সত্যলাভ হওয়াকেই, ব্রহ্মে বা মহাশূন্যে নিজের আমি, বা অহং, বা আত্ম, যেই ভাষাতেই বলো, তার লীন হয়ে সমাপ্তি হওয়াই জীবকটির লক্ষ্য এবং একেই জীব মোক্ষ বলে থাকে। এবার ভালোই বুঝতে পারছ পুত্রী যে, যেই মোক্ষ জীবকটির সমাপ্তি, জীবকটির মুক্তি, ঈশ্বরকটির সেখান থেকেই কর্মযজ্ঞের শুরু।
পুত্রী, জীবকটি এই মুক্তি লাভ করে, চিরতরের জন্য জীবনমৃত্যুর চক্র থেকে মুক্ত হয়ে, লীন হবার সাতদিবসের মধ্যে দেহত্যাগ করে চলে যান। আর ঈশ্বরকটি! ঈশ্বরকটির ক্ষেত্রে এটি মোক্ষ নয়, এটি নির্বিকল্প সমাধি। আর এই বিকল্পহীন মহাশূন্যে সমাধির শেষে ঈশ্বরকটির কি হয়?
পুত্রী, ঈশ্বরকটি কনো ভ্রমিত ব্রহ্মাণুর জীবনযাপন করেন না। তিনি এক আপেক্ষিক ব্রহ্মাণু, যার রচনা নিয়তি করেন লোকহিতের উদ্দেশ্যে। তাই এই সমাধির কালে, তাঁর এই আপেক্ষিক অহং বা আত্ম লীন হয়ে যায় শূন্যে, এবং তিনি স্বয়ং নিয়িতি, বা কাল বা প্রকৃতি হয়ে বিরাজ করেন।
পুত্রী, তোমাকে পূর্বেও বলেছি, স্বরূপে তিনি মহাশূন্য যাকে তোমরা বলো ব্রহ্ম। আর তাঁর তিন প্রকাশ; কারণ বেশে তিনি নিয়তি, সূক্ষ্ম বেশে তিনিই কালের নিয়ন্তা কালী, আর স্থূল বেশে তিনিই প্রকৃতি। আর অবতারও এই তিন বেশেই উপস্থাপন করেন। সম্যক ভাবে নিয়তি হলেন ৯৬ কলা বিশিষ্ট, অর্থাৎ ৯৬ তত্ত্বের অধীশ্বরী তিনি।
এই সমস্ত কলার মধ্যে প্রথম ১৬ কলার অধীশ্বরী হলেন প্রকৃতি, প্রথম ৩২ কলার অধীশ্বরী হলেন কালী, এবং সম্যক ৯৬ কলার অধীশ্বরী হলেন স্বয়ং নিয়তি। কিন্তু আজ পর্যন্ত জগৎসংসার কখনো সম্পূর্ণ ৯৬ কলার অবতার দেখেন নি। যেখানে মার্কণ্ড ছিলেন ৩২ কলার অবতার, অর্থাৎ সম্পূর্ণরূপে কালী স্বরূপা, সেখানে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ছিলেন ১৬ কলা অবতার অর্থাৎ সম্পূর্ণ রূপে প্রকৃতি। যেখানে শঙ্কর ছিলেন ২৪ কলা অবতার, সেখানে চৈতন্য মহাপ্রভু ছিলেন ৮ কলা অবতার। আবার রামকৃষ্ণ দেবকে পরানিয়তি ৩২ কলার অবতার করে স্থাপিত করেছিলেন, প্রথম ৬৪ কলা অবতার রূপে আমাকে স্থাপন করতে।
কিন্তু এই অবতারচক্র, যা এখন চলছে, তা জগতের বুকে শ্রেষ্ঠ অবতারধারা, কারণ আমাকে যেখানে ৬৪ কলার অবতার করে, নিয়িতি, কালী তথা প্রকৃতি, তিনকেই স্থাপিত রেখেছেন, সেখানে তোমাকে ৮ কলা অবতার করে স্থাপিত রেখেছেন, এবং তোমার হাত ধরেই আরো ৮ কলার অবতার প্রেরণ করবেন, এবং অন্তে ১৬ করলার পূর্ণ প্রকৃতি অবতার স্থাপন করে, সম্পূর্ণ ৯৬ কলার প্রকাশ করে, এবার পরানিয়িতি মনুষ্যকে সত্যে স্থাপনের অন্তিম প্রয়াস করবেন।
যাই হোক, পুত্রী, এই যখন আমি বা তুমি সত্যে লীন হয়ে গিয়ে, আর আমাদের আপেক্ষিক অণু বা আত্মকে ধারণ করে জীবিত থাকিনা, তখন আমরা পুর্ণাঙ্গ ভাবে মহাশূন্যের মধ্যেই বিরাজ করি। যিনি প্রকৃতি কলাতেই সীমাবদ্ধ, তিনি ব্যক্তিবিশেষের অতীত ভবিষ্যৎ দেখতে পান; আবার যিনি ১৬ কলা থেকে ৩২ কলার অবতার তিনি সম্পূর্ণ কালচক্রকেই দেখতে পান, আবার যিনি ৩২ কলার ঊর্ধ্বের অবতার, তিনি স্বয়ং নিয়তির কর্মভারে উপস্থিত থাকেন, তাই তাঁর বচনে সমগ্র ব্রহ্মাণুদের ভাগ্যনির্মাণও হয়।
তাই কথা এই যে, এমন নয় যে জীবকটি এই সামর্থ্যের অধিকারী নন। যখন তাঁরা মহাশূন্যে বিলীন হয়ে মোক্ষপ্রাপ্ত হন, তখন তাঁরা এই সামর্থ্যেরই অধিকারী হন। কিন্তু যেহেতু তাঁদের জীবনের অন্ত সেখানেই হয়, কারণ তাঁরা নিয়তিনির্মিত আপেক্ষিক ব্রহ্মাণু নন, বরং স্বয়ং ভ্রমিত ব্রহ্মাণু, সেই কারণেই তাঁরা এই অকথিত ইতিহাসকে দর্শন করতেও পারেনা, আর লাভ করতেও পারেনা”।
দিব্যশ্রী নিজের অন্তরের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর লাভ করে তৃপ্ত হয়ে বললেন, “পিতা, এবার ব্রাহ্মণদের কি হলো? আর বৈষ্ণবদেরই বা কি হলো? ব্রাহ্মণদের বিষদন্ত কি ছেদন হলো? আর বৈষ্ণবদের?”
ব্রহ্মসনাতন বললেন, “ফিরিঙ্গিদের আগমনে আর্যরা বিপাকে না পরলেও, বঙ্গে নিয়িতির কৃপাতে মনিষীর ভিড় লেগে যায়, ব্রাহ্মণদের এই পুণ্যক্ষেত্রে দমিত করার জন্য। প্রথম আঘাত আসে ব্রাহ্মসমাজের থেকে। ব্রাহ্মসমাজের পাশাপাশি ঈশ্বরচন্দ্রের আঘাত সমানে ব্রাহ্মণদের বঙ্গদেশে কোণঠাসা করতে থাকে।
এক এক করে, সতীদাহ প্রথার উৎখাত করা হয়, তথা বিধবা বিবাহ লাগু করে হয়, আর তাতে বাংলার মনিষীদের সাথে সঙ্গত দেয় ফিরিঙ্গিরা। এই দুই আঘাতেই, ব্রাহ্মণরা মোটামুটি কুপোকাত হয়ে গেছিল বঙ্গভূমিতে। কিন্তু, এর পরের দুইটি আঘাতে ব্রাহ্মণকুল সম্পূর্ণ ভাবে ঔদ্ধত্য ছেড়ে, সামান্য পুরোহিত হয়ে গেছিল, অন্তত এই বঙ্গভূমিতে তো নিশ্চিত ভাবে।
এঁই দুইয়ের মধ্যে প্রথম হলো ঈশ্বরচন্দ্রের বঙ্গভাষার নবীকরণ। পুরাতন বাংলা ভাষার কাঠিন্যের কারণে সংস্কৃতকে শিরোধার্য করে রাখছিল ব্রাহ্মণরা। কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্রের বঙ্গভাষার নবীকরণের কারণে, বাংলাভাষার এমনই উত্থান হয় যে সাহিত্য সর্বজনের জন্য হয়ে ওঠে, আর ব্রাহ্মণরা বঙ্গভূমিতে দ্বিতীয় শ্রেণীর ব্যক্তি, তৃতীয় শ্রেণীর ব্যক্তি হতে হতে, পিছিয়ে পরা জাতি হয়ে উঠতে শুরু করলো।
আর এঁর দ্বিতীয় আক্রমণ আসে ঠাকুর রামকৃষ্ণ থেকে। বেদান্ত উপনিষদ ও তন্ত্র একাকার হয়ে যখন সম্মুখে আসে, তখন ব্রাহ্মণরা আর দাঁড়াবারও স্থান খুঁজে পায়না। আধ্যাত্মবাদের প্রকোপে, ব্রাহ্মণদের সাজিয়ে রাখা ধর্মভীরুতা তাসের ঘরের মত ধসে পরে যেতে থাকলো। ক্রমশ এমন অবস্থা হলো যে, সমস্ত ব্রাহ্মণকুল বঙ্গদেশে প্রহসনের পাত্র হয়ে উঠতে থাকলো।
আর যতই তা হতে শুরু করলো, আর্যরা বঙ্গদেশের মানুষকে প্রথমে অধর্মী বলে প্রচার করতে শুরু করে, কিন্তু সেই দাবিও যখন মানুষের কাছে ধপে টিকলো না, ঠাকুর রামকৃষ্ণ, চৈতন্যদেবের কারণে, ও বিশিষ্ট তান্ত্রিক সাধকদের দাপটের কারণে, তখন বঙ্গদেশের ব্যাপারে কথা বলাই বন্ধ করে দিলেন ব্রাহ্মণরা। আর এক কথায় বলতে গেলে, প্রবল ভাবে আর্যরা বঙ্গভূমি এবং বঙ্গবাসিদের ভয় পেতে শুরু করলেন।
উত্তরভারতের বিভিন্ন স্থানে বাঙালি সম্বন্ধে এক বিচিত্র ভাবের সঞ্চার হলো। যেখানে বাঙালি নামের থেকেই আর্যরা ভয়ার্ত থাকতে শুরু করলো, সেখানে সেই সমস্ত স্থানের স্থানীয়রা বঙ্গবাসীদের পৃষ্ঠপেশন শুরু করলেন। সমগ্র জগতকে অন্ন প্রদান করে, বঙ্গদেশ হয়ে ওঠে অন্নপূর্ণা। আর সেই অন্নের আড়তদার বাঙালী বনিকরা তখন বিশ্বের ধনিতম ব্যক্তি সমূহের একাকজন না হলেও, রাজা না হয়েও ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ ধনি তখন বঙ্গদেশেরই মানুষ।
সঙ্গে তাঁরা সৌখিনও। ভেদাভেদের ধার ধারেনা, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত বঙ্গবাসী। আধুনিক বৈদান্তিক ধর্মের ধ্বজাধারি ব্রাহ্মণের অত্যাচারী হস্তের ছেদনকারী বাঙালীদের সৌখিনতা তাঁদের মুঘলদের আতরও ব্যবহার করাতো, মোঘলাই আহারও গ্রহণ করাতো, আবার ফিরিঙ্গিদের গাড়ি বা যন্ত্রেরও ব্যবহারঅ করাতো। সাথে সাথে, তাঁদের স্বভাবে রয়েছে সাহিত্য ও ভ্রমণ। আর তাই সমস্ত ভ্রমণযোগ্য স্থানে একমাত্র বাঙালীদের আনাগোনা।
আর তাই সেইস্থানের স্থানীয় মানুষরা যেই যৎসামান্য ধন উপার্জন করে, তা বাঙালীদের কারণেই। তাই বাঙালীকে আর্যরা যতই একঘরে করার প্রয়াস করলো বাংলার বাইরে, বাংলায় তাঁরা যেমন একঘরে হয়ে গেছে তার প্রতিশোধ নেবার প্রয়াসে, ততই তাঁরা নিজেরা কোণঠাসা হতে শুরু করলো।
সম্পূর্ণ ভারতভূমিতে ফিরিঙ্গিদের একমাত্র পছন্দের জাতি হলো বাঙালী। তাঁদের অসম্ভব মেধা, তাঁদের অসম্ভব পরিশ্রম করার সামর্থ্য, এবং তাঁদের উদার ভেদাভেদশূন্য মানসিকতা ফিরিঙ্গিদের অত্যন্ত প্রভাবিত করেছিল। আর সেই ফিরিঙ্গিরাই ভারতশাসন করে রেখেছিল। তাই বাঙালীদের কিছুতেই একঘরে করতে পারলো না আর্যরা, যদিও এই একঘরে করে রাখার মানসিকতাকে এবং ইচ্ছাকে তাঁরা নিজেদের স্বভাবমতই ভুলল না।
আর সেই স্মৃতিপটে তুলে রাখা বাঙালীশত্রুতাকেই কাজে লাগাল আর্যরা এক ঘরশত্রু বিভীষণ বাঙালী, শ্যামাপ্রসাদ দ্বারা। অখণ্ড বঙ্গভূমি যেন অর্ধনারীশ্বর। সমস্ত জগতের অন্নদাতা সে। তাই বঙ্গদেশ অখণ্ড থাকলে, আর্যরা কনো ভাবেই বঙ্গদেশের উপর অধিকার স্থাপনে সক্ষম নয়। উপরন্তু বঙ্গবাসী ভেদাভেদ শূন্য, আর তাই এই দেশের যেই বিস্তীর্ণ ইসলাম মানুষ ছিলেন, তাঁরাও বঙ্গবাসীদের অধিক শক্তিশালী করে রেখেছিলেন।
তাই আর্যরা এই শ্যামাপ্রসাদের মস্তিষ্কলেহন করে করে, তাঁকে আর্যভাবাপন্ন করে তুলল, আর তাঁর দ্বারা বঙ্গদেশের অর্ধনারীশ্বরমূর্তির ছেদন করাল। এই অতিঘৃণ্য কর্ম ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। এতাবৎ যেই যেই অপরাধ করে চলেছিল আর্যরা তাকে ক্ষমা করেছেন নিয়তি। কিন্তু এই বঙ্গভঙ্গ করিয়ে, স্বয়ং নিয়তিকে নিজেদের শত্রু করে নিয়েছেন। স্বয়ং প্রকৃতি অঙ্গিকার করে নিয়েছেন যে আর্য ব্রাহ্মণের কুলে, আর কনো শর্ততেই অবতরণ সম্ভব নয়।
নিমাই, রামকৃষ্ণ অবতার ব্রাহ্মণগৃহেই হয়েছিল। ব্রাহ্মণগৃহে জন্মগ্রহণ করে, তাঁরা ব্রাহ্মণের অনাচার স্তব্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ করিয়ে, ব্রাহ্মণরা নিয়তিকে নিশ্চয় করতে বাধ্য করলেন যে, আজিবতকাল ব্রাহ্মণশ্রেণী ঈশ্বরের শত্রু অর্থাৎ শয়তান জাতি হয়েই বিরাজ করবে। কনো রূপ কৃপা তাঁদের উপর বর্ষিত হবেনা। না তাঁদের গোত্রে কনো অবতার আসবেন, আর না সাধক। ধর্মভ্রষ্ট মানবজাতি করে দেবেন নিয়িতি তাঁদের, আগামী ৩ শতকের মধ্যেই।
যেই অখণ্ড বাংলার কারণে ভারত ধনিদেশ হয়ে উঠতে পারতো, সেই অখণ্ড অর্ধনারীশ্বর বঙ্গভূমির প্রকৃতি ও পুরুষকে ভাগ করে দিলেন ব্রাহ্মণশ্রেণী। আর সেই ভাগের কারণে, ভারত দরিদ্র হতে শুরু করে দিল। অর্থাৎ ভারতকে গরিবদেশে পরিণত করার কাণ্ডারি অন্যকেউ নন আর্য ব্রাহ্মণ জাতি। এই ঘৃণ্য শয়তান জাতি এবার বাঙালীকে একঘরে করার প্রয়াস করতে থাকলো।
কিন্তু বঙ্গদেশ যে কনো দেবভূমি নয়, এ যে ঐশ্বরিক ভূমি, এ যে স্বয়ং পরানিয়তির, মহাকালীর, এবং পরাপ্রকৃতির বিচরণ ছেত্র। তাই শিক্ষা, কলা, ইত্যাদিতে বঙ্গদেশকে দমিয়ে রাখা অসম্ভব। হ্যাঁ, ফিরিঙ্গিদের শাসন থেকে মুক্ত ভারতের শাসকের আসনকে আর্য ব্রাহ্মণরা বরাবরই প্রভাবিত করতে চেয়েছে। আর তাই বঙ্গপুত্র সুভাষের দেখানো পথে এই ভারতের সেনানিবেশ হলেও, বঙ্গদেশ ও বঙ্গপুত্রদের নামে কনো সেনা ছাওনি করতে দেয়নি এই আর্যরা।
একই ভাবে, শাসকের আমলার স্থান থেকে বঙ্গবাসীদের দূরে সরিয়ে রাখার জন্য সর্বস্বকিছু করল তাঁরা। কিন্তু কলা? বিদ্যা? সেখান থেকে বঙ্গবাসীকে কি করে সরিয়ে আনবে। সঙ্গীতজগতকে, শিক্ষার জগতকে, উদারতার জগতকে, কলা ও নাট্যের জগতকে বঙ্গদেশ আলোড়িত করতেই থাকলো। এবং বঙ্গভূমির গুরুত্ব কমিয়ে আনলেও, বঙ্গভূমির প্রভাবকে নিশ্চিহ্ন করতে পারলো না আর্যরা কিছুতেই।
কিন্তু হ্যাঁ, তাঁরা নিজেরা ভারতের একটি মাত্র রাজ্যে নিজেদেরকে আবদ্ধ করে ফেলেন, এই সমস্ত প্রয়াসের মধ্যে। আর এই সমস্ত কিছুর মধ্যে, দুটি ক্রিয়ার সূত্রপাত হয়। একটি হলো এই আর্যদেরকে পুনরায় সম্মুখে নিয়ে আসার জন্য, শয়তানের অবতার জন্ম গ্রহণ করে, পশ্চিম ভারতের উপকুলে। আর তাঁর অনেক পরে, বঙ্গভূমিতে জন্মগ্রহণ করে, নিয়তির ৬৪ কলা অবতার, যিনি এবার বেদান্তের স্থাপন করতে আসেন নি, এসেছেন কৃতান্তের স্থাপন করতে, এবং মানুষকে তাঁদের চরম বিপদ থেকে রক্ষা করতে। … পুত্রী, এবার আমি তোমাকে এক এক করে, সেই শয়তানের অবতারের অধিকার স্থাপিনের কথা বলবো, আর বলবো নিয়তির ৬৪ কলা অবতারের উত্থানের কাহিনী। এই দুই কথাই আমাদের বর্তমান প্রগতির কথাকে সমাপ্ত করবে, আর অতঃপরে আমরা ভবিষ্যতের বিকাশের কথায় যাত্রা করবো”।
দিব্যশ্রী বললেন, “আচ্ছা পিতা, শয়তানের মহাবতারকে কে আটকালেন? তাঁকে আটকানোর জন্যও কি প্রকৃতি কনো অবতার গ্রহণ করেছিলেন?”
ব্রহ্মসনাতন হেসে বললেন, “না পুত্রী, তাঁকে আটকাবার জন্য, নিয়তিকে কনো পৃথকভাবে অবতার গ্রহণের প্রয়োজনই বা কোথায়? স্বয়ং বঙ্গভূমি মানবীয় অবতারবেশ ধারণ করে সম্মুখে ছিলেন, সেই শয়তানের মহাবতারকে অবরুদ্ধ করতে, এবং আর্যদের অন্তিম আগ্রাসনকে সমাপ্ত করে দিতে। পুত্রী, এই বঙ্গমাতার দেহধারণের পূর্বে, কিছু দিব্য কথনও আছে, যা কনো ঐতিহাসিকের পক্ষেই লিপিবদ্ধ করা সম্ভব নয়। তাই আমি তোমাকে সেই কথাও বলছি।
পুত্রী, শয়তানের মহাবতার যখন আর্যভক্ত হয়ে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, তখন পরানিয়িতি অবতারগ্রহণে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। কিন্তু বঙ্গমাতা তাঁর উদ্দেশ্যে কিছু গহন কথা বলেন। তিনি বলেন, “হে জগদম্বা, হে মাতঃ, বঙ্গভূমি ছেদন করে, জগদম্বার কর্মে আর্যরা পূর্বেই বাঁধা দিয়েছে। ফিরিঙ্গিমুক্ত বঙ্গভূমি যেখানে সমস্ত জগতের মাতা হয়ে, সমস্ত জগতকে শান্তি, সুস্থতা এবং সৌজন্যের পাঠ প্রদান করতে উদ্যত হচ্ছিল, সেখানে আর্যরা এঁরই ছেদন করে, জগদম্বার সন্তানপালনের কর্মে বাঁধা দিয়েছে।
মা, আমি তো তখন কি হচ্ছে, বা কি হতে চলেছে, এই সম্বন্ধে অজ্ঞাতই ছিলাম। তাই তখন এই ঘৃণ্য অপরাধকে আটকাতে পারিনি। তবে আজ আমি প্রস্তুত। মাতা, আমাকে অনুমতি প্রদান করুন যাতে, আমি স্বয়ং মানবীয় দেহ ধারণ করে, এই আর্য আগ্রাসনের সমাপ্তি নিশ্চয় করতে পারি”।
জগদম্বা উত্তরে বললেন, “এই কাজ অতি সহজ হবে তা নয়। এমন ভাবার কনো কারণ নেই যে এই শয়তানের অবতারই তোমার একমাত্র প্রতিদ্বন্ধি হবে। এই শয়তানের অবতারের জন্মগ্রহণের আগেও বহু শয়তান এই বঙ্গভূমিতেই জন্মগ্রহণ করেছে। তাঁরা অনার্যের খোলস পরে থাকবে, এবং এই বঙ্গভূমির সমস্ত কলকারখানাকে বন্ধ করে দিয়ে, এঁকে সম্যক ভাবে দরিদ্র করে তুলবে।
পুত্রী, এঁরা ভয়ানক এবং এঁরাই আর্যদের প্রথম দূত। … এঁরা অন্য কেউ নয়, আর্যরা বঙ্গের নাশ করার জন্য যেই উত্তরখণ্ডে প্রবল অখণ্ড যজ্ঞ করেছিল, তার থেকে জাত এক ভয়ানক শয়তান প্রজাতি। আর্যদের পরিকল্পনা অনুসারে, প্রথমে এঁরা এই ভয়ানক ক্ষতিকর জাতিদ্বারা বঙ্গদেশকে পঙ্গু করে দেবে। অতঃপরে সেই শয়তানের মহাবতার বঙ্গদেশ সহ সম্যক ভারতকে নিজের পদতলে স্থাপিত করে পুনরায় আর্য আগ্রাসনের সূচনা করবে। … তাই এই যুদ্ধ অতি সহজ হবেনা। এক জীবকটির পক্ষে এই যুদ্ধ করা অত্যন্ত কঠিন পুত্রী”।
বঙ্গমাতা উত্তরে বললেন, “মা, তোমার আমার উপর কৃপার অন্ত নেই। মহাবতার মার্কণ্ডকে আমার হৃদয়ে স্থাপিত করে আমাকে তন্ত্র দ্বারা ধন্য করেছ তুমি। তারপূর্বে মহাবতার কপিল দ্বারা সাংখ্য রচনা করে, আমার উপর কৃপাদৃষ্টি অর্পণ করেছ। অতঃপরে নিমাই ও রামকৃষ্ণ গদাধর দ্বারা আমাকে উচ্চাসন প্রদান করেছ। তাঁদের ছাড়াও অসামান্য প্রতিভায় পরিভাষিত অজস্র সন্তান প্রদান করেছ আমাকে। কলা, বিদ্যা, শিক্ষা, সাহিত্য, ক্রীড়া থেকে আরম্ভ করে নাট্য, ধর্ম, রাজনীতি, সর্বত্র তুমি আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব পদান করেছ। … মা, এই সমস্ত কিছুর কারণে আমি তোমার কাছে ঋণী বলা ধৃষ্টতা হবে, কারণ তাকেই ঋণ বলা উচিত, যাকে শোধ করার প্রয়াস করা যায়। এই স্নেহের তো কনো পরিশোধই সম্ভব নয়।
তাই মা, একে আমি ঋণ বলতে পারছিনা, বরং তোমার প্রেম ও কৃপা বলতে চাই। আর মা, প্রেম ও কৃপা শোধ করা যায়না, কিন্তু তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করাতো যেতে পারে। তাই মা, আমি তোমার কাছে আবদার করছি, তোমার শক্তি আমাকে প্রদান করো, যাতে আমি এই শয়তানদের রাজ ও রাজত্ব উভয় থেকেই, তোমার অতিপ্রিয় এই পুণ্য বঙ্গভূমিকে রক্ষা করে, এঁকে পূর্বের মতই তোমার বিচরণক্ষেত্র করে রেখে দিতে পারি”।
মাতা এবার হাস্যমুখে বললেন, “তথাস্তু। যাও, তন্ত্রের রচনা যেই কালীঘাট থেকে হয়েছিল, সেখানেই তুমি জন্ম নাও। আমার কৃপা সদা তোমার সাথে থাকবে। অজস্র ঘাতপ্রতিঘাতের সম্মুখীন হতে হবে কিন্তু তোমাকে। একাকী তোমাকে আর্য আগ্রাসনকে রুখতে হবে। অনার্যের খোলস পরা সেই আর্যরা একাকজন বিষধর সর্পের থেকে কনো অংশে কম নয়। আর তাদের কেউ তোমাকে দংশন করা থেকে নিজেদের প্রতিহত করবেনা।
সত্য বলতে, সমস্ত যুদ্ধ জয় করে, তোমার পঞ্চভূতের দেহ এতটাই ক্লান্ত হবে যে, সেই শয়তানের মহাবতার যখন তোমার সম্মুখে আসবে, তখন তোমার দেহে তেমন কনো বল থাকবেনা। … তাই পুনরায় বিচার করে নাও, সিদ্ধান্ত নেবার আগে”।
বঙ্গমাতা নতমস্তক হয়ে বললেন, “মা, যুদ্ধ দেহবলে জয় করা যায়না। যুদ্ধ জয়ের জন্য আবশ্যক মনোবলও নয়। যুদ্ধ জয়ের জন্য যা প্রয়োজন, তা হলো তোমার আশীর্বাদ ও কৃপা। যদি তোমার আশীর্বাদ ও কৃপা অক্ষুণ্ণ থাকে আমার উপর, তাহলে আমি এই যুদ্ধে তোমারই মাধ্যম হবো মাত্র। আসলে মা, পরানিয়তি হলেন জগন্মাতা। কি বা আর্য আর কিবা অনার্য, কি বা শয়তান, আর কি বা শয়তানের মহাবতার, সকলেই তাঁর কাছে সন্তান। আর এক মাকে যদি তাঁর সন্তান নিধনের জন্য বাধ্য করা হয়, তা হলো শ্রেষ্ঠ অপরাধ।
মা, আমার নিজের কনো সামর্থ্য নেই। সমস্ত সামর্থ্য তোমার। কিন্তু আমি চাই যে এই যুদ্ধে আমি তোমার মাধ্যম হয়ে থাকি, যাতে জগন্মাতা নিজের সন্তানদের দমন করেছে, এই কালিমা আর্যরা তোমার উপর না ছেটাতে পারে। … আশীর্বাদ করো মা, যেন বঙ্গভূমিকে পুনরায় শয়তান মুক্ত করে, তোমার বিচরণছেত্র রূপে এঁকে অক্ষুণ্ণ রাখতে পারি”।
জগদম্বা তথাস্তু বলে সেখান থেকে প্রস্থান করলে, সেই শয়তানের মহাবতার জন্মের কিছুবৎসরের মধ্যেই বঙ্গমাতা মহাধাম কালীঘাটের নিকটে, মাতা মহাকালীর আশীর্বাদ ধন্য হয়ে জন্মগ্রহণ করলেন, আর শুরু হলো সেই মহাসংগ্রাম, যার অন্তের কালে শুরু হয় নিয়তির মহাবতারের লীলা”।
