স্বগোত্রিয় আক্রমণ (গুপ্ত ইতিহাস)
কিন্তু জগন্মাতা যেন আর আর্যদের সোজা হয়ে দাঁড়াতে দেবেন না। এ যেন ভগবান আর শয়তানের সংগ্রাম। একদিকে জগন্মাতা স্বয়ং অবতার গ্রহণ করে করে, ভগবানের তরফ থেকে সংগ্রাম করে চলেছেন। আর অন্যদিকে আর্য ব্রাহ্মণরা তো চিরকালই মিথ্যাচার, মিথ্যাকথন, এবং লুণ্ঠন মানসিকতা নিয়ে, শয়তান।
কিন্তু এবারে আর জগন্মাতাকে প্রত্যক্ষ ভাবে কিচ্ছু করতে হলো না, কারণ এবার জগন্মাতা যা করলেন এই শয়তানদের কোণঠাসা করতে, তা হলো তাঁদের স্বগত্রিয়দের আনায়ন করলেন। যেই ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে, জম্বুদ্বীপে এসে নিজেদের আর্য বলে আখ্যা দিয়ে, এই দেশের মানুষদের সর্বসম্ভব উপায়ে লুণ্ঠনের প্রয়াস করছিলেন, সেই স্থান থেকেই এবার পাঠান আর মুঘল এলেন এই দেশে, আর্যদের দেশে।
প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ করার তো মুখই নেই আর্যদের। তাঁদের গাত্রবর্ণ দেখলেই মুঘল পাঠানরা বুঝে যাবেন যে, এঁরা সেই স্বৈরাচারী শয়তান, যারা পূর্বে গান্ধার ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলের মানুষদের লুণ্ঠন করছিলেন বলে, এঁদেরকে ভুমিত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। তাই প্রত্যক্ষ ভাবে এঁদের সম্মুখেও এলেন না আর্যরা। বরং, যাদেরকে শাসক করে রেখে হাতের পুতুল করে রেখে দিয়েছিলেন এঁরা, সেই ক্ষত্রিয় রাজপুতদের এঁদের সাথে যুদ্ধে রত করলেন।
কিন্তু বলের হেরফের বিস্তর। যেই রাজপুতরা আর্যদের পৃষ্ঠপোষণের কারণে অজেয় শক্তিধর আখ্যা নিয়ে ভারতে বিরাজ করছিলেন, আর সেই বিরাজের কারণে অসীম মদাচ্ছন্ন হয়ে, মদ হতে জাত সাহসে দিগবিজয়ী আখ্যা নিয়ে বিরাজ করছিলেন, তাঁরা এই বিশালাকায় মুঘল পাঠানদের দেহবলের কাছে নিতান্তই শিশু।
প্রতিটি যুদ্ধে পরাস্ত হতে হতে ক্লান্ত হতে থাকলো রাজপুতরা। শক্তিক্ষয়ের সাথে সাথে, বৈভবেরও ক্ষয় হতে শুরু করলো, আর ক্রমশ তাঁরা সমর্পণ করতে শুরু করলো মুঘলদের কাছে। আর্যরা এবার দমিত। পুনরায় তাঁরা উত্তরের খণ্ডে, হিমালয়ের পাদদেশে পলায়ন করলেন। আর সেখান থেকেই একটু একটু করে যেই যেই বৌদ্ধ মঠ এবং স্তূপকে নিজেদের মন্দির বলে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন, সেগুলিতেই সীমাবদ্ধ থাকা শুরু করলেন।
বঙ্গে প্রবেশ করলেন, মগধে বিরাজ করলেন, উৎকলে বিরাজ করলেন। প্রথমত তাঁরা সাধারণ মানুষ হয়েই বিরাজ করছিলেন সেখানে, যাতে মুঘলদের দৃষ্টি না পরে, কিন্তু স্বভাব কোথায় যাবে! স্বভাব বশত, পুনরায় তাঁরা লুণ্ঠন শুরু করলেন। একাকী কিছু করতে পারছিলেন না এই অঞ্চলে, কারণ তন্ত্র ও তান্ত্রিক বঙ্গভূমিতে অধিকার করে রয়েছে। তাই কিছু কিছু তান্ত্রিকদের প্রলোভন দেখিয়ে দেখিয়ে, তাঁদের দিয়েও স্ত্রী, ধন, ইত্যাদি লুণ্ঠন শুরু করলেন।
কিন্তু ভগবতী যেন এই শয়তানদের পিছু কিছুতেই ছাড়েন না। বঙ্গদেশের পবিত্র ভূমিতে মাতা পুনরায় অংশঅবতার নিলেন নিমাই নাম ধারণ করে। পাণ্ডিত্য, নীতিজ্ঞান দ্বারা ভূষিত হলেন এই যুবা। ব্রাহ্মণরা কৃষ্ণ দ্বৈপায়নের মত এঁকেও বশীকরণ করার প্রয়াস করলেন। তবে এবারে চরিত্র ভিন্ন। এবারে চাপে রেখে নয়, এবারে নিমাইকে পণ্ডিত আখ্যা দিয়ে, নিজেদের দলে টানার প্রয়াস করলেন।
অবতার হন বা সাধারণ জীবকটি, ভ্রমে আচ্ছন্ন হয়েই এই অসত্য ব্রহ্মাণ্ডে জন্ম নিতে হয়, নাহলে কে বা নিয়তি, কালী আর প্রকৃতি, আর কেই বা আত্ম, অহংকার, ব্রহ্মাণু! … সমস্তই শূন্য যে তখন। তাই ভ্রমের থেকে মুক্ত হবার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত নিমাইকে পণ্ডিত আখ্যা দিয়ে ভালোই চলছিলে ব্রাহ্মণদের। এবার তাঁরা নিমাইকে ভিড়িয়ে দেবেন মুঘলদের পিছনে। আর সে মুঘলদের উৎখাত করে, ব্রাহ্মণদের পুনরায় শয়তানের রাজত্ব স্থাপনের সুযোগ করে দেবে।
এই ছিল তাঁদের পরিকল্পনা। নিজেদের শয়তানের রাজত্বকে এতদিন দেবতার রাজত্ব বলে চালিয়ে এসেছেন। যেই আচার, বিচার, অন্ধবিশ্বাস, অহংকারের আরাধনার কারণে, এই দেশের মানুষদের লজিত হওয়া উচিত, এঁরা আর্য ব্রাহ্মণদের মিথ্যাচারের আর মিথ্যাপ্রচারের কারণে, সেই কারণেই উদ্যন্ড, সেই কারণেই অমার্জিত, সেই কারণেই ব্রাহ্মণকে ভগবান আখ্যা দিয়ে থাকেন।
কিন্তু চেতনার জাগরণ। কৃষ্ণ দ্বৈপায়নকেও ততদিনই ভ্রমিত করে রাখতে পেরেছিল ব্রাহ্মণরা, যতদিন না তিনি নিজের চেতনাকে ফিরে পেয়েছিলেন। আর একই কৃত্য নিমাইএর ক্ষেত্রেও। চেতনা লাভ সম্পন্ন হলো, আলাপ হলো ভগবৎ গীতার সাথে। শুরু হলো পাঠ। যেন গীতা হলেন জানালা, আর সেই জানালা দিয়ে ব্রাহ্মণদের করা সমস্ত অনাচারকে একত্রে দেখে ফেললেন। আর দেখা মাত্রই, সমস্ত পুঁথি দিলেন পুরিয়ে।
শুরু করলেন গীতার প্রচার এবং ব্যাখ্যা। আর যতই তা প্রখর হয়ে উঠলো, ততই ব্রাহ্মণদের পায়ের তলার মাটি সরতে থাকলো। তাঁদের প্রকৃত শয়তানের চরিত্র বঙ্গদেশের মানুষ জানতে শুরু করে দিয়েছে। উঠলো হিল্লোল, না সামান্য হিল্লোল নয়। মহা হিল্লোল। গীতা ধারণ হলো, ব্রাহ্মণদের ত্যাগ দেওয়া শুরু হলো বঙ্গদেশে।
ক্রমশ সেই আগুন ছড়িয়ে পরল উৎকলেও। ব্রাহ্মণদের বারে বারে বৈঠক হতে থাকলো। এবার কিছু করতেই হবে, নয়তো ভগবৎ গীতার হাত ধরে, সম্যক ব্রাহ্মণকুলকে উৎখাত করে দেবে এই বৈষ্ণব গোষ্ঠী। বহু সহজ প্রয়াস করেছেন ব্রাহ্মণরা, আপোষ করার মানসিকতাও দেখিয়েছিলেন। কিন্তু চেতনার আলোকে উদ্দীপ্ত নিমাই তখন চৈতন্যদেব। তাঁকে ধরে রাখার সামর্থ্য ব্রাহ্মণের নেই।
তাই অবশেষে বিচার করতে বসলেন ব্রাহ্মণরা। শক্তি আন্তরিক। অবতার হন আর জীবকটি বাহুবলের শক্তি মানবিক মর্যাদা মেনেই স্থাপিত থাকে। পুরাণে তো সমস্ত আন্তরিক দৈব শক্তির কথা বলা হয়েছে। বাহ্যিক শক্তি নয়। বাহ্যিক শক্তিতে চৈতন্য পেরে উঠবে না। এমন সলাপরামর্শ করে, নীলাচলের শক্তিপীঠেই গুপ্ত কক্ষে ব্রাহ্মণরা চৈতন্যের হত্যা করলেন এবং নীলাচলের সাগরে দেহ তলিয়ে দিলেন।
চৈতন্য হত্যা সম্ভব হলেও, চৈতন্য গঠিত বৈষ্ণব গোষ্ঠীর দাপট, গীতা চর্চা, আর ব্রাহ্মণবিদ্বেষকে আর্যরা কিছুতেই দমাতে পারছিলো না। তাই ধীরে ধীরে, কিছু কিছু ব্রাহ্মণ বৈষ্ণবগোষ্ঠীতে যোগদান করা শুরু করলেন, এবং সেখানে গিয়ে, ক্রমে ক্রমে নেতৃত্ব গ্রহণ করে করে, ব্রাহ্মণবিদ্বেষ স্তব্ধ করলেন। অতঃপরে, তন্ত্র প্রকৃতি আরাধনার বিরোধ শুরু করলেন তাঁরা, যা আর্যদের স্বভাব।
আর যতই তা হতে থাকলো, ততই ব্রাহ্মণরাও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে পুনরায় অত্যাচার, লুণ্ঠন শুরু করে দিলো। আর এখন তো সেই লুণ্ঠন পক্রিয়ার মধ্যে নতুন অধ্যায় শুরু হয়ে গেল, কারণ বৈষ্ণবদেরও তাঁরা অধিগ্রহণ করে নিয়েছেন। চৈতন্যমত ভুলে গেছেন তাঁরা। চৈতন্য মতের কেবল আচার অনুষ্ঠান রেখে, প্রকৃতি বিরোধ, আর কৃষ্ণ যে বিবেক অর্থাৎ গজানন, তা ভুলে গিয়ে, তাঁরই জননীর ঊর্ধ্বে তাঁকে স্থান প্রদান করে, ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণব একত্রে শুরু করলেন লুণ্ঠন।
প্রায় এক শত বৎসর ধরে বেশ ভালোই প্রসার চললে, এবার সমস্ত আর্যরা মিলে এই নবউদ্যমের সঞ্চার করবে সম্যক ভারতে, এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন সবে। কিন্তু সেই ক্ষণেই এই আর্যদের দ্বিতীয় স্বগত্রিয় এসে উপস্থিত হলো, যারা হলেন ইউরোপীয়। এঁদের সামর্থ্য মুঘলদের থেকেও অধিক। মুঘলরা দৈহিক ভাবে শক্তিশালী। কিন্তু এঁদের দেশে বরফযুগ গত হবার উপরান্তে, স্বয়ং আদিশক্তির চেতনা লাভ করে এঁরা জ্বালানী কয়লার সন্ধান পেয়েছে। তাই মাতার চেতনা যুক্ত হবার ফলে, এঁরা অত্যন্ত বলশালী। আর তাই এঁদের সম্মুখে মুঘলরা [এরে উঠলেন না।
কিন্তু আর্যদের হলো জ্বালা। মুঘলরা নিশ্চিত ভাবেই তাঁদের সনাক্ত করে নিয়েছিলেন। কিন্তু স্বগোত্রিয় তাই একটিও কথা বলেন নি। কিন্তু এঁরাও স্বগত্রিয়। যখন গান্ধার তক্ষশীলা ত্যাগ করে, তাঁরা এদিকে সেদিকে চলে গেছিলেন, তাঁদের মধ্যে একটি গোষ্ঠী মিশরে যায়, ভারতে আসা গোষ্ঠী হলো আর্য, আর তৃতীয় গোষ্ঠী রোমের দিশায় যায়। এঁরা হলেন সেই রোমে যাত্রা করা তাঁদেরই সমগোত্রীয় গোষ্ঠী। কিন্তু বরফযুগের পর মাতার চেতনা লাভ করে, এঁদের আচার অনুষ্ঠান সমস্ত কিছুর নাশ হয়ে গেছে।
এঁরা এখন কেবলই মানবিকতা এবং যান্ত্রিকতা, এই দুই হাত নিয়ে জীবিত। তাই, ব্রাহ্মণরা বিচার করতে শুরু করে, এই মুঘলরাই ভালো ছিল। আবার এই ফিরিঙ্গিরা এসে আমাদের পাকাধানে মই দিয়ে দিল কেন!
আসলে ব্রাহ্মণরা তো জানতেনও না যে, জগন্মাতা বশিষ্ঠকে এই দিনের কথাই বলেছিলেন, যেখানে ব্রাহ্মণকে বঙ্গদেশে নির্বল বিহন্নলা করে রেখে দেবেন, তবে বৈষ্ণবরা লুণ্ঠনের মার্গ সচল রেখেই দেবেন। … তাই ব্রাহ্মণরা বুঝতে পারছিলেন না, তাঁদের জন্য ঠিক কি আসছে। কিন্তু সেই সময় তো এসেই গেছে। মা’র কাণ্ডের দ্বিতীয়চরণ যে তখনই শুরু হয়ে গেছিল”।
