কৃতান্তিকা

ব্রাহ্মণরা প্রায় সর্বহারা হতে থাকলেন। কিন্তু শিকারি কুমিরের ন্যায় হিমালয় নিম্নতটে, হিন্দুকুশ নিম্নতটে, বিন্ধাঞ্চলের নিম্নতটে একপ্রকার লুক্কায়িত হয়ে জীবন অতিবাহিত করতে থাকলেন ব্রাহ্মণ আর্যরা।

গৌতম ভবলীলা ত্যাগ করলেন। ব্রাহ্মণ গুহা থেকে মুক্ত হওয়া শুরু করলেন। কিন্তু গৌতমের যেন অন্ত হয়েও অন্ত নেই। বিভিন্ন গোষ্ঠী গৌতমকে ঋষি গৌতম বলা শুরু করে দিলেন, আর তাঁর কৃপা নিয়ে অসংখ্য কাহিনী সম্মুখে আসতে থাকলো। ব্রাহ্মণ আর্যরা এক নব উপায়ের সন্ধান পেলেন। তাঁরাও এবার পিপলাদকে মহর্ষি পিপলাদ বলা শুরু করলেন, মার্কণ্ডকে মহর্ষি মার্কণ্ড বলতে শুরু করলেন, আর গৌতম বুদ্ধকে ঋষি গৌতম বলা শুরু করে, ইনারা সকলেই আর্যসমাজের নক্ষত্র, এমন দেখিয়ে পুনরায় আর্য ব্রাহ্মণকুলকে প্রতিষ্ঠিত করতে গালগল্প স্থাপন করে একাধিক পুরাণের রচনা শুরু করলেন।

কিন্তু মগধের পরে যেন তাঁদের যাত্রা অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে। ২৭ তম বুদ্ধমতধারার জনকরাজ্য মগধের থেকে বিম্বিসার পুত্র অজাতশত্রুর পৌত্রীকে বিবাহ করে নৃপতিরূপে স্থিত নন্দ সমস্ত আর্যভূমিকেই প্রায় গ্রাস করে নেয়। তাই অজাতশত্রুর অন্যবংশধর চন্দ্রগুপ্তকে গোপনে আর্যব্রাহ্মণরা পালন করে, চাণক্য নামক আর্য ব্রাহ্মণ নন্দকে কপটভাবে হত্যা করে, মগধের অধিকার গ্রহণ করালেন।

চন্দ্রগুপ্তের বৌদ্ধধারা যেন এবার আর্যদের কবচ, আর সেই কবচের অন্তরালে থাকা মহাধূর্ত আর্য, চাণক্য স্থাপন করলেন হিন্দুরাষ্ট্র। হিন্দু নামকরণ করলেন আর্যদের যবনরা, কারণ তাঁরা সিন্ধুনদীর উপকুলের বসবাসকারী, তাই। আর সেই হিন্দু নাম থেকে হিন্দুস্থান স্থাপন করলেন চাণক্য, চন্দ্রগুপ্তকে কবচরূপে ধারণ করে।

কিন্তু আর্যরা যেন নিজেদের কপটকে চিরস্থায়ী করতেই পারছিলেন না। চন্দ্রগুপ্ত পুত্র, বিন্দুসার সমস্ত আর্যদের করা কপট জেনে গেলেন, এবং বিষপ্রয়োগ করে চাণক্যের হত্যা করলেন। অপরদিকে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র অশোক পুনরায় ক্ষত্রিয়ত্বকে জাগ্রত করে, সমস্ত রাজ্যকে বাহুবলে দখল করতে আরম্ভ করলেন। আর্যদের হত্যা করে, বৌদ্ধরাজ্য স্থাপন করবেন অশোক, এই তাঁর মনস্কাম।

কিন্তু সম্মুখে এলেন জৈনরা, এবং বললেন, “শান্তির স্থাপক বৌদ্ধধারার স্থাপন তুমি কি করে লহুপান করে করবে অশোক! … এই লহুপান বন্ধ করো, আর শান্তির বিস্তার করো। প্রসার করো বৌদ্ধধারার দিকে দিকে”।

অশোক বৌদ্ধধারার স্থাপনা শুরু করলেন, আর এবার বিনাযুদ্ধে আর্যদের সমস্ত সাম্রাজ্য ছিনিয়ে নেওয়া শুরু করলেন। উত্তরকে বশীভূত করলেও, দ্রাবিড় অঞ্চল প্রায় হৃদয় থেকেই বৌদ্ধ ধারাকে স্বীকার করে, পাল, চোলা ও পান্ডেয়া কুলের রচনা হলো, এবং সম্পূর্ণ দক্ষিণ হিন্দুস্থান হয়ে গেল বৌদ্ধধারায় আবদ্ধ।

আর্যরা অতিআগ্রহে কনো প্রতিভাবানের অপেক্ষা করছিলেন, তো আর্যশিরোমণি এক শূদ্রের গর্ভে এক কৃষ্ণবর্ণের সন্তান প্রদান করলেন, যার নাম তাঁর বর্ণের ও তাঁর জন্মের স্থানের কারণে হলো কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন। একদিকে যখন গৌতমকে কেন্দ্র করে উপনিষদের নবনির্মাণ হচ্ছিল, সেই কালে, মার্কণ্ড মহাপুরাণের দহন অভিযান চালিয়ে চালিয়ে, কৃষ্ণ দ্বৈপায়নকে, তাঁর গাত্রবর্ণ কৃষ্ণ হবার কারণে দিবারাত্র বেদনা প্রদান করে, সেই বেদনা থেকে মুক্ত হবার উপায় রূপে তন্ত্রের ধারা যে কেবলই আচারবিচারের ধারা, এমন স্থাপন করে মার্কণ্ড পুরাণ রচনা করার নির্দেশ দিলেন আর্যরা।

অসামান্য মেধার অধিকারী কৃষ্ণ, আর তাই তাঁর মেধাকে ব্যবহার করে, একাধিক পুরাণ রচনা করালেন আর্য ব্রাহ্মণরা, যা বিশেষত তাঁর কৃষ্ণবর্ণ হবার কারণে, তাঁকে অনার্য রূপে প্রকাশিত হওয়া থেকে মুক্ত থাকার অছিলাতেই করলেন ব্রাহ্মণরা, যারা নিজেদেরকে দেব, অধিদেব, তথা ভগবন রূপে সম্যক হিন্দুস্থানে প্রসিদ্ধ করতে থাকছিলেন।

কিন্তু বুদ্ধের দ্বারা গভীর ভাবে প্রভাবিত কৃষ্ণ, আর তাই বিষ্ণু পুরাণ রচনার অন্তিম অধ্যায়ে লিখলেন বুদ্ধের কথা, কিন্তু আর্যদের থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখলেন, তাঁর নাম বুদ্ধ না লিখে কৌশলে পরশুরাম করে লিখলেন। সঙ্গে রাখলেন জ্ঞানের কুঠার, আর সেই কুঠারের প্রভাবে, ২৭ তম বুদ্ধের নাম না করে, ২৭ বার ক্ষত্রিয়দমন, যা সকল বুদ্ধ করেছিলেন, তার বিবরণ দিলেন।

মাতার এই অবতার কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন যখন ২৭ তম বুদ্ধের কথা ২৭বার ক্ষত্রিয়দমনকারী পরশুরামের বেশে লিখলেন, তখন মাতাও বুঝে গেলেন, কৃষ্ণ প্রস্তুত, তাঁর জন্মের মূল কর্ম সম্পাদন করার জন্য। তাই তিনি উদিত হলেন কৃষ্ণের সম্মুখে আর বললেন, “পরশুরাম তো শিক্ষাও দিয়েছিলেন পুত্র। কই সেই কথা তো লিখলেনা তুমি!”

কৃষ্ণ বললেন,  “মাতা, … তুমি এসেছ! … কবে থেকে তোমারই অপেক্ষায় বসেছিলাম। অহেতুক জন্ম নিয়ে এসেছি মনে হচ্ছিল, তোমার দর্শন লাভ না করে। … আদেশ দাও মা! … ও, তোমার প্রশ্নের উত্তর… মা, পরশুরাম যে বাহ্য শিক্ষা দেননি। তিনি যে অন্তরে দিব্যতা জাগরণী শিক্ষা দিয়েছেন। তোমার উদয়ে কি ভাবে পঞ্চানন আত্ম আর বিচার বিবেক সমস্ত অহংকারের নাশ করে, সত্যের স্থাপনা করে, সেই শিক্ষাই প্রদান করেছেন”।

মাতা হেসে বললেন, “তাহলে সেই কথা লিখছ না কেন বাছা! … সমস্ত অন্তরের শিক্ষাকে মানবীয় আকৃতি প্রদান করে, রচনা করো মহাগ্রন্থের। ব্যখ্যা দাও সেখানে সেই শিক্ষার। ব্যাখ্যা দাও সেখানে আমার জাগরণের। কি ভাবে আমি হৃদয়ের অগ্নি থেকে জন্ম গ্রহণ করি, কি ভাবে আমি বিবেকদ্বারা পঞ্চানন আত্মের মার্গদর্শন করি, আর সেই মার্গদর্শনের ফলে, সাধকের অন্তরে যেই মহাসংগ্রাম হয়, কেন লিখছ না সেই কথা!”

কৃষ্ণ বললেন,  “আদেশ দাও মা। তোমার আদেশের মধ্যে যে আশীর্বাদ নিহিত থাকে। সেই আশীর্বাদ লাভ না করলে, এতো বড় কীর্তি সম্পন্ন করবো কি করে?”

মাতা হেসে বললেন, “বেশ পুত্র, আমি তোমাকে নির্দেশ প্রদান করলাম, আমার যেকোনো নাম গ্রহণ করে, সেই মহাকাব্য রচনা সম্পন্ন করো”।

আশ্বস্ত হলেন কৃষ্ণ। রচনা করলেন জয়া, যা আজ আমাদের কাছে মহাভারত নামে প্রসিদ্ধ। স্থাপন করলেন পরশুরামকে মহাশিক্ষা প্রদানের ভূমিকায়। দেখালেন, তাঁর প্রদত্ত শিক্ষাকে কি ভাবে নিয়ে ছলনা করা হচ্ছে কর্ণের মাধ্যমে। দেখালেন পঞ্চাননের পঞ্চপাণ্ডবরূপে জন্ম। দেখালেন বিচার ও বিবেককে বলরাম ও কৃষ্ণ বেশে জন্মগ্রহণ করতে। আর দেখালেন যজ্ঞের অগ্নি থেকে স্বয়ং মাতাকে কৃষ্ণা বেশে জন্ম নিতে।

তাতে দেখালেন আন্তরিক সমস্ত তত্ত্বের কুটনীতিপূর্ণতাকে। দেখালেন কি ভাবে তাঁরা পঞ্চানন আত্মকে দমিয়ে রাখতে ব্যস্ত। দেখালেন বিচার বিবেকের সাথে পঞ্চাননের সখ্যতাকে। আর দেখালেন, কৃষ্ণাকে কি ভাবে পঞ্চানন লাভ করেন, তা। শুধু এই নয়, কৃষ্ণা স্বয়ং লজ্জার ও নিপীড়নের শিকার হয়ে, কি ভাবে ক্রমশ পঞ্চানন ও বিবেককে চালিত করে, মহাসংগ্রামের সম্মুখীন করে দেয়, এবং বিবেককে সারথি করে কি ভাবে পঞ্চানন সেই সংগ্রামে জয়লাভ করে সাধনায় সিদ্ধ হয়, তাও দেখালেন।

আর অন্তে দেখালেন যে, এই সমস্ত সংগ্রাম মাতারই লীলা, এবং বিবেকেরই ক্রিয়া, পঞ্চানন অর্থাৎ আত্মকে সম্যক সত্যের সাথে পরিচিত করার জন্য। সমস্ত কিছু দেখাতে থাকলে, মাতা পুনরায় উদিত হয়ে বললেন, “কি করছ পুত্র! … মার্কণ্ড আমার গুণকীর্তন করার কারণে, আর্যরা মার্কণ্ড মহাপুরাণের সম্যক বিনাশ করে দিয়েছে। তারপরেও তুমি প্রত্যক্ষ ভাবে আমার গুণকীর্তন করো? না পুত্র, সত্যের বাখান আবশ্যক, সত্যের যাত্রা করানো আবশ্যক। আমার গুণকীর্তন করা নয়। … তাই, বিবেককেই সামনে রাখো, আমাকে নয়। তাহলেই আর্যরা তোমার এই গ্রন্থের প্রসার হতে দেবে, নচেৎ তোমার জয়ার অবস্থাও মার্কণ্ড মহাপুরাণের ন্যায় হয়ে উঠবে”।

রচনা হলো জয়ার। নামকরণ করা হলো মহাভারত। আর্যদের বুদ্ধি এই মহাভারতের মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারলেন না। কিন্তু তাঁদের সন্দেহ হলো, নিশ্চয়ই কৃষ্ণ কিছু এমন করেছে, যা আর্যসমাজের বিরোধিতা। যাচাই করতে, ভগবৎ মহাপুরাণের রচনা করার নির্দেশ এলো। কৃষ্ণ তাও করলেন। আরো নির্দেশ এলো। এবারের নির্দেশ ভবিষ্যতের কথা লেখার। সময় সীমা রাখো এর বিস্তর, লক্ষ বৎসরেরও অধিক। তাহলে কেউ আর আর্যদের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন করবেনা।

রচনা হলো কল্কিপুরাণ ও ভবিষ্য পুরাণের। তবে তাতে গল্পকথা লেখেন নি। লিখেছেন তত্ত্বকথা, যার লেশমাত্রও আর্যরা বোঝেন না। আর আরো বুঝতে পারলেন না, কারণ সমস্ত তত্ত্বকথাকে সেখানে কৃষ্ণ মানবীয় আকৃতি প্রদান করে রাখলেন। তাই আর্যরা ভাবলেন দূরবর্তী ভবিষ্যতের আজগুবি কথা লিখেছেন কৃষ্ণ। কিন্তু সেই কথা যে আগামীদিনের তাত্ত্বিক অবস্থান, তা আর্যরা জানতেও পারলেননা।

কৃষ্ণ নিজের দেহলয়ক্ষণের নিকটে উপস্থিত হলেন। তাই এবার কৃষ্ণ, আর্য ব্রাহ্মণরা তাঁর কৃষ্ণবর্ণকে সম্মুখে রেখে, যেই ভাবে তাঁকে হেনস্তা করেছে, তার প্রতিশোধ নিতে আগ্রহী হলেন। উপনিষদের কথা পুনরায় লিখলেন তিনি, তবে এবার একটু অন্য মোড়কে। ব্রাহ্মণরা নিজেদের ভগবান, দেব, অধিদেব বলে প্রচার করেন। কৃষ্ণ নিজেকে সেখানের ভগবানশ্রেষ্ঠ করে স্থাপিত করলেন, যাতে একদিন এই ব্রাহ্মণ ভগবানদের মানুষ তুচ্ছ জ্ঞান করতে পারে।

কিন্তু সেই কথাকে প্রকাশিত না করেই চলে গেলেন কৃষ্ণ ভবলীলা ত্যাগ করে। তাঁর শিষ্যরা এই ক্ষুদ্র গ্রন্থ, যা ভগবৎ গীতা নামে আজ খ্যাত, তার প্রকাশ করলেন। তবে ব্রাহ্মণরা আবারও এর কথার মাথামুণ্ডু বুঝলেন না। কৃষ্ণ যে বিবেক, সেই তত্ত্বও কনোদিন উদ্ধার করতে পারলেন না ব্রাহ্মণরা, আর তাই তাঁকে বিষ্ণু অবতার বলে চালাতে থাকলেন। অন্যদিকে, কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন যে মার্কণ্ডের ন্যায়ই এক অবতার, তারও টের পেলেন না ব্রাহ্মণরা।

তাই, ভগবৎ গীতাকে তেমন গুরুত্ব প্রদান করলেন না। ভাবতেও পারলেন না, এই ক্ষুদ্র গ্রন্থ ধরে, মাতারই এক অংশ অবতার ব্রাহ্মণদের অস্তিত্বকেই সঙ্কটাপন্ন করে তুলবে এক সময়ে। বরং, তাঁরা কৃষ্ণ দ্বৈপায়নের রচিত বিভিন্ন পুরাণকে ধরে ধরে, এবার অশোকের নির্মিত সমস্ত বৌদ্ধমঠ, সমস্ত বৌদ্ধস্তূপকে নারায়ণশিলা বা শিবলিঙ্গ রূপে স্থাপিত করা শুরু করলেন।

২৭ তম বুদ্ধের পর আর কনো বুদ্ধ আসেন নি। বৌদ্ধকুলরা সীমান্তযুদ্ধ করতে করতে, ক্ষয় হয়ে চলেছে। পাণ্ডেয়, পল্লভ, পাল, সেন, চোল, কুশল, সমস্ত বৌদ্ধধারার পতন হতে থাকছিল। আর সেই সুবাধে, আর্যরা বৌদ্ধ মঠ আর স্তূপকে পরিবর্তন করা শুরু করে দিয়েছিল। অশোক স্থাপিত ৮০ সহস্র স্তূপকে শিবলিঙ্গ বা নারায়ণশিলা বলে প্রচার শুরু করলেন আর্যরা; অশোক স্থাপিত প্রায় এক হাজার মঠকে মন্দির করে পরিচয় প্রদান শুরু করলো ব্রাহ্মণগোষ্ঠী।

আর্যরা দ্রাবিড় সুন্দরীদের দেখে, নিজেদের কামাতুর স্বভাবিক স্বভাবকে আর আটকাতে পারলেন না। তাঁদের সঙ্গম হলে, এবার আর গোলাপি বর্ণের আর্য রইল না, মিশ্রবর্ণের আর্য বিরাজ করতে শুরু করলো বিভিন্ন স্থানে। তবে হিমালয়ের পাদতলে, ও হিন্দুকুশের পাদতলে, আর্য ব্রাহ্মণরা কারুর সাথে সঙ্গমে গেলেন না, কারণ তাঁদের নিকট কৃষ্ণবর্ণের দ্রাবিড়রা ঘৃণ্য, গৌরবর্ণের গারো খাসি ও বঙ্গবাসি তথা মগধবাসি হলেন শত্রু।

যেখানে এক শ্রেণীর ব্রাহ্মণরা অন্যশ্রেণীদের সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়ে হয়ে, বৌদ্ধ মঠ ও স্তূপদের মন্দিরে ও শিবলিঙ্গ তথা নারায়ণশিলায় পরিবর্তিত করতে ব্যস্ত রইলেন, সেইসময়ে গোঁড়া আর্যরা হোমযজ্ঞ এবং এই পরিণত মঠ ও স্তূপদের নিজেদের নির্মিত আচার অনুষ্ঠান দ্বারা পূজা করে করে, সকলকে এই বার্তা দিলেন যে, এক আর্যই আছেন, আর সমস্ত কিছুর কিছুই নেই।

দীর্ঘকাল এমন চললে, সত্যের চর্চাই এই ভারতভূমি থেকে উঠে যেতে শুরু করলো। কেবল অধিকারস্থাপন ও দক্ষিণালাভের জন্য পূজা, শোষণ করার উদ্দেশ্যে একাধিক ব্রাহ্মণীয় লোকাচার, আর অহংকারের আরাধনাই অবস্থান করলো সমাজে। আর সেই সমস্ত কিছুকে প্রশ্নচিহ্ন প্রদানের জন্য মাতা পুনরায় অবতার গ্রহণ করলেন শঙ্কর নামে।

এবারে মা বৌদ্ধের পক্ষও নিলেন না। গঠন করলেন অদ্বৈত বেদান্ত, যেখানে সম্যক জীবনের সার স্থাপিত করলেন। হিল্লোল উঠলো সম্পূর্ণ দ্রাবিড় অঞ্চলে। তবে তা দ্রাবিড় অঞ্চলেই সীমিত থাকলো না। আগুনের মত উৎকল, কলিঙ্গ, প্রয়াগ এবং কর্নটে ছড়িয়ে পরলো। আর্যদের মসনদ পুনরায় নড়বরে হয়ে গেল। এবারে আরো অধিক ভাবে, কারণ এবারে যে আর্যরা কারুকে আক্রমণ করার মতও পাচ্ছে না।

প্রকৃতি সংক্রান্ত তত্ত্বকে জ্বালিয়ে দেবার সাহস তারা দেখিয়েছিল পূর্বেই। বৌদ্ধদের অন্তরে প্রবেশ করে, অর্থনীতিকে মাধ্যম করে সম্পূর্ণ ছেত্রকে হিন্দুস্থান করে তুলেছিল। কৃষ্ণ দ্বৈপায়নকে তাঁর গাত্রবর্ণের জন্য টানাটানি করে করে, তাঁকে মাধ্যম করে জম্বুদ্বীপকে ভারতবর্ষ করে তুলতে চেয়েছিল, যাতে করে সাংখ্য, বঙ্গদেশ ও কপিলমুনির নাম সাধকদের স্মৃতিপট থেকে হারিয়ে যায়।

কিন্তু এবারে যে নাস্তিকতার দর্শনের সঙ্গে সম্যক লড়াই। কনো তর্ক, কনো শর্ত, কনো আক্রমণ, কনো ছলনা, কিছুই কাজ করলো না। আর এবারে মাতার অবতার লুক্কায়িত হয়ে ভঙ্গের বনে গিয়ে সাধনধারার নির্মাণ করলেন না। এবারে প্রত্যক্ষভাবে জনসমক্ষে সমস্ত ক্রিয়া রচলেন। নিজের হস্তে ব্যবস্থায়ন করে গেলেন, চার চারটি মঠ স্থাপন করে, আর তাতে নিজের শিষ্যদের স্থাপিত করে।

আরাধনা যদি করতেই হয়, তা একমাত্র আদিশক্তির আরাধনা হবে। এমন ধারার গঠন করে, শঙ্কর আর্যব্রাহ্মণদের কাছে ত্রাস হয়ে উঠলেন। কিন্তু বেশিদিন নয়। স্বল্প কিছুদিনের মধ্যেই, শঙ্কর ভবলীলা ত্যাগ করলেন। ব্রাহ্মণ সমাজ উঠে পরে লাগলেন, এবার দ্রাবিড় অঞ্চলকে আর ছেড়ে রাখা যাবেনা। এতদিন পর্যন্ত দ্রাবিড়দের দুর্বল ভেবে গেছিলেন।

তেমন অবস্থাতেই বৌদ্ধসঞ্চার হয়ে, দ্রাবিড় অঞ্চলে পল্লভ, পাণ্ডেয়, কেকয়, তথা বঙ্গে সেনরা প্রায় আর্যদের আচার অনুষ্ঠানের নামে হনন, দক্ষিণার নামে লুণ্ঠন, এবং নিজেদের ভগবান বলে অনাচার করতেই দেয়নি। এঁরা দুর্বল হচ্ছিলেন, তক্ষণে শঙ্কর এসে সমস্ত আর্যদের পরিশ্রমকে পণ্ডশ্রম করে দিয়েছে। এবার দ্রাবিড় অঞ্চলে না তো কনো বৌদ্ধ নৃপতির দাপট আছে, আর না রয়েছে শঙ্করের ন্যায় মহাজ্ঞানীর তেজ। এই সুযোগ, দ্রাবিড় অঞ্চলকে পুনরায় অধিকার করে নেবার।

এমন ভাবেই যখন বহুকাল কারুর সন্ধান করে ফিরছিলেন, তখন এক মেধাবী দ্রাবিড় সন্তান পেয়ে গেলেন, যার নাম রামানুজ। তাঁর হৃদয়ে বৌদ্ধ বা বৈদান্তিকদের প্রলেপ পরার আগেই, আর্যরা বেদের ছাপ রাখতে আরম্ভ করে দিল। আর এর ফলে, রামানুজের উত্থান হলো এবং দ্রাবিড় অঞ্চলে পুনরায় উত্থান হলো আর্যসমাজের।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43