কৃতান্তিকা

অশ্রুসিক্ত হয়েও, মাতার আদেশ পালন করে, মাতার লহুমিশ্রিত অঙ্গাদি নিয়ে দিকে দিকে যেতে থাকলেন তান্ত্রিক ও ভৈরবীরা। আর্যরা ভঙ্গের বাইরে কঠিন দৃষ্টি রেখে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে রেখে আত্মপ্রচারে উন্মত্ত। ব্রাহ্মণজাতির আসনে তন্ত্রের ছাপ রাখতে সচেষ্ট হলে, মা সকল মার্কণ্ডশিষ্যদের উদ্দেশ্যে বললেন কিছু দিব্যবাণী।

তিনি বললেন, “পুত্ররা, আমি জগন্মাতা, জন্ম আমি স্বেচ্ছায় কারুকে দিইনি, কারণ আমি সেই মা নই যে সন্তানকে নিজের থেকে পৃথক করে আনন্দ পায়। ব্রহ্মাণুরা আমার গুণসন্ধান করার জন্য, আমাকে অর্থাৎ নিজেদের স্বরূপ, অর্থাৎ শূন্যতাকে ত্যাগ করে, কর্তা হয়ে উঠেছে। কিন্তু তাঁদের সত্য তো আমিই, আর তাই আমি সকলের জননী। আমি জননী, তাই সময় বা কালের ন্যায় সূক্ষ্ম বেশে, এবং প্রকৃতির ন্যায় স্থূল বেশে, আমি সকলের মধ্যে মহাসমন্বয় স্থাপন করে, সকলের পালন করি।

কিন্তু এঁরই মধ্যে তোমাদের আর্য ব্রাহ্মণরা সেই ব্রহ্মাণুগণ, যারা প্রকৃতি ও সময়কে উল্লঙ্ঘন করেন এবং তেমন করারই সিদ্ধান্ত দেন। এঁরা প্রকৃতি ও সময়ের উপর ভরসা করেন না; সময় ও প্রকৃতি এঁদের সম্মুখে যেই সিদ্ধান্তকে উপস্থাপন করেন, এঁরা কেবল তাঁর অপেক্ষাই করেন না, বরং এঁরা নিজেদের ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার উপর আশ্রিত নিজেদের আত্মের সিদ্ধান্তকেই সিদ্ধান্ত বলে গ্রহণ করেন, এবং তাই জগন্মাতাকে এঁরা উপেক্ষা করেন।

তাই পুত্ররা, আর্য ব্রাহ্মণরা আমার সন্তান হলেও, আমি তাঁদেরকে সন্তানরূপে মান্যতা প্রদান করিনা, কারণ তাঁরা আমাকে মাতারূপে মান্যতা প্রদান করেনা। কাল আমি, আর কালের নিয়ন্ত্রক কালীও আমি। তাই এক না এক সময়ে, ব্রাহ্মণ জাতিকে আমি এই ভঙ্গভূমিতেই, যার নাম তখন বঙ্গভূমি হবে, সেই খানে স্থিত হয়েই উৎখাত করে দেব।

হ্যাঁ জানি আমি, এই ক্রিয়া করার আগেই, ব্রাহ্মণত্ব মানসিকতা চারিদিকে ছড়িয়ে পরবে। সাগর পারিদিয়ে এই মানসিকতা বহুকালই মিশরে ও রোমে ছড়িয়ে পরেছে, আর তা আবারও সাগরলঙ্ঘন করে পশ্চিমতম দেশে ছড়িয়ে পরবে। কিন্তু তাও ব্রাহ্মণ আমার সন্তান, তাই এই সময়ের সুযোগ তাঁদের দিতেই হবে আমাকে, যাতে তাঁরা নিজেদের উন্নত করতে সক্ষম হয়। জানি এতে তাঁদের কনো লাভ হবেনা। তাঁরা যেমন আত্মমদাচ্ছন্ন, তেমনই থাকবে। তাও মা আমি, তাই সুযোগ আমাকে দিতেই হবে।

যখন সমস্ত সুযোগের অবসান ঘটাবে তাঁরা, তখন এই ভঙ্গদেশে দাঁড়িয়েই, যাকে তখন বঙ্গদেশ বলে চিহ্নিত করা হবে, সেখানে এই ব্রাহ্মণ জাতিকে নির্দয়, অত্যাচারী এবং নৃশংস স্বার্থপর ঘৃণ্যজাতি বলে আমিই প্রমাণ করবো। কিন্তু তাতেও ব্রাহ্মণত্বের নাশ হবেনা। আর্য ব্রাহ্মণত্ব এক জাতি নয় পুত্ররা, এক মানসিকতা।

এই মানসিকতা নিজেকে সর্বেসর্বা জ্ঞান করার মানসিকতা। সময়, প্রকৃতিকে উল্লঙ্ঘন করার মানসিকতা এটি। আর তাই বঙ্গভূমি থেকে জাত ব্রাহ্মণ ত্যাজ্য ভাবের সঞ্চার অনেক স্থানে হলেও, অনেক স্থানে তা তখনও থেকে যাবে। আর অবশেষে, বঙ্গের এই মানসিকতা গ্রহণ করা ব্যক্তিরা, যারা মূলত আর্য অনুপ্রবেশেই এই পুণ্যতীর্থে প্রকাশিত হবে, তাঁরা আমারই এক অবতারের নামযশকে মাধ্যম করে, বৈষ্ণব হয়ে বিরাজ করবে, আর পুনরায় শোষণ করবে আমার অন্য সন্তানদের।

তাই পুত্ররা, আর্যভূমিতে তন্ত্রের প্রচার করার পূর্বে, এই ভঙ্গভূমিতে এবং উত্তরের অঙ্গভুমি ও প্রাগজ্যোতিষকে উদ্ভাসিত করে তন্ত্রকে জনপ্রিয় করে তলো আমার সন্তানদের মধ্যে। অতঃপরেই আর্যভূমিতে অনুপ্রবেশ করো। স্মরণ রেখো, সেখানে অনুপ্রবেশ তোমাদের করতেই হবে, আর করলেই আর্যরা সরাসরি মার্কণ্ড মহাপুরাণকে বিনাশ করার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। পুত্ররা, মার্কণ্ডের কীর্তির নাশ হবার পূর্বেই, সমস্ত উত্তরপূর্ব জম্বুদ্বীপে, অর্থাৎ, ভঙ্গে, অঙ্গে, প্রাগজ্যোতিষে, কলিঙ্গে ও মগধে মার্কণ্ডের কথাকে এমন ভাবেই প্রচার করে দাও যাতে, আর্যদের শতপ্রয়াসেও এই ভূমি থেকে মার্কণ্ডের গাঁথার সমাপ্তি না হয়”।

মার্কণ্ড শিষ্য বশিষ্ঠ উদ্বেগের সাথে বললেন, “মা, তোমার সন্তানদের শোষণ করবে এই ব্রাহ্মণ মানসিকতা, তা জেনেও, তুমি ব্রাহ্মণদের উন্নীত হবার সুযোগ প্রদান করবে? এটা জেনেও যে, ব্রাহ্মণরা কখনোই সময় ও প্রকৃতিকে নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে দেবেনা, তারপরেও এই সুযোগ এঁদেরকে প্রদান করবে?”

মা হেসে বললেন, “এঁর তিনটি কারণ পুত্র বশিষ্ঠ। প্রথমত, যতই অপ্রিয় হোক, ব্রাহ্মণ আমারই সন্তান। তাই এক মা তাঁর সন্তানের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেনা। পুত্র, সন্তানের অঙ্গের বর্ণ কৃষ্ণ হয়েছে বলে, সন্তান কৃষ হয়েছে বলে, সন্তান কন্যাশিশু হয়েছে বলে, সন্তান অকল্যাণ বহন করে এনেছে বলে, মাতা যদি সন্তানকে স্তনদান করতে অস্বীকার করে দেয়, তাহলে কি হবে সমস্ত আত্মদের সমর্পণের উদ্দেশ্যে অগ্রগতির!

পুত্র, সমস্ত আত্ম অর্থাৎ ব্রহ্মাণু নিজের নিজের ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণে ব্যস্ত, আর সকলের ব্রহ্মাণ্ডকে একত্রে তোমরা ব্রহ্মাণ্ড বলো। এই ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণ হলে, আমার কি লাভ বলতে পারো? প্রতিবার এই ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণ হয়, প্রতিবার আমার সন্তান আমার থেকে ঈষৎ দূরে চলে যায়, তারপরেও আমি এই ব্রহ্মাণ্ডের নাশ করিনা কেন, বলতে পারো?

পুত্র, এই ব্রহ্মাণ্ড গঠন যতই করে তারা, ততই তারা নিজেদেরকে সুযোগ দেয় যে, তাঁরা ইচ্ছা চিন্তা ও কল্পনার দ্বারা পদস্থ আত্মভাবনা থেকে মুক্ত হয়ে, কাল ও প্রকৃতির সিদ্ধান্তকে গ্রহণ করে, আমার নিকট অর্থাৎ সত্যের নিকট আসতে থাকবে। এই হলো কারণ যে আমি ব্রহ্মাণ্ডের বিনাশ না করে, সমস্ত ব্রহ্মাণুর নির্মিত ব্রহ্মাণ্ডকে একত্রিত করে, প্রকৃতি রূপে অবস্থান করি, এবং সময় রূপে প্রবাহিত হয়ে আমার সকল সন্তানকে, সকল আত্মকে, সকল ব্রহ্মাণুকে আমার স্তন প্রদান করে, তাঁদেরকে জীবনসংগ্রামে রত রাখি।

পুত্র, এখন আমিই যদি ভেদভাব করি, তবে আমার সন্তানদের অগ্রগতি কি করে সম্ভব হবে? সেই কারণে বশিষ্ঠ, এঁদেরকে সুযোগ দিলে আমার অন্য সন্তানরা নিপীড়িত হবে, তা জেনেও, আমাকে এঁদেরকে সুযোগ প্রদান করতেই হবে। তবে এছাড়াও আরো দুটি কারণ আছে, এঁদের সুযোগ প্রদান করার।

পুত্র বশিষ্ঠ, এতাবৎ সময় পর্যন্ত আর্য ব্রাহ্মণরা মিথ্যাচার করেছে, বৌদ্ধ গ্রন্থের থেকে তস্করি করে, নিজেদের গ্রন্থ স্থাপন করে, নিজেদেরকে ভগবান রূপে স্থাপন করেছে সম্পূর্ণ জম্বুদ্বীপে। কিন্তু এঁদের অত্যাচার এখনো চরমে উন্নীত হয়নি। এঁদের অত্যাচার চরমে উন্নীত না হওয়া পর্যন্ত, আমি এঁদেরকে বার্তা প্রদান করবো, সতর্ক করবো, কিন্তু দণ্ড দেবো না। আর একবার চরমে উন্নীত হয়ে গেলে, এঁদেরকে দণ্ডও দেব, আর সম্যক আর্য ব্রাহ্মণজাতিকে তাঁদের অস্তিত্বকাল পর্যন্ত আমার অর্থাৎ সময় ও প্রকৃতির মমতার থেকে মুক্ত করে দেব।

তখন যেখানে এঁরা নিজেদের ভগবান হবার প্রচার বন্ধ করবেন না, সেখানে কেবল আমার অন্য সন্তানরা যখন পর্যটক হয়ে আসবে, তখনই প্রকৃতি সেখানে সহায় হবে, অন্যথা সর্বক্ষণ প্রকৃতি এঁদের বিরোধীই হবে। লক্ষ্মী বা শ্রীরও কৃপাদৃষ্টি এঁদের উপর থাকবেনা, তাই এঁদের মধ্যে কনো প্রতিভাই স্থান গ্রহণ করতে পারবেনা। শ্বেতা বা সরস্বতীরও কৃপা থেকে এঁরা মুক্ত থাকবে, তাই এঁরা জ্ঞানের থেকে সদামুক্ত থাকবে, আর এঁরা জগতের শ্রেষ্ঠ অজ্ঞানী হয়েই বিরাজ করবে।

আর পুত্র, যেই যেই স্থানে এই ব্রাহ্মণরা মস্তক নিম্নে করে নেবে, যেমন এই ভঙ্গদেশ যা তখন বঙ্গদেশ রূপে স্থাপিত থাকবে, সেখানে তাঁরা কেবলই সামান্য দক্ষিণায় সংসার চালানো পুরোহিত হয়ে থাকবে। অর্থাৎ, এই যে, যতদিন আমি দিন এই জাতিকে উন্নত হবার সুযোগ প্রদান করছি, ততদিন তাঁদের আকালের অপেক্ষার কাল। কারণ আমার অপেক্ষা সমাপ্ত হলেই, তাঁদেরও আকাল শুরু হয়ে যাবে।

আর তৃতীয় কারণ এই যে পুত্র, এই ব্রহ্মাণ্ড এক কল্পভূমি, যার সত্যতা বলে কিছুই নেই। সত্য কেবল আমি, সত্য কেবল আমার স্বরূপ অর্থাৎ শূন্য বা ব্রহ্ম। না ব্রহ্মাণ্ড সত্য, না ব্রহ্মাণু, আর না আত্ম বা পরমাত্ম। সমস্ত কিছুই কল্পনামাত্র। আর তাই, যদি এই ব্রহ্মাণ্ডতে স্থিত হয়ে আমার সন্তানরা সুখের সাখ্যাতকার করতে থাকে, তাহলে এই অসত্য ব্রহ্মাণ্ডই তাঁদের কাছে সত্য হয়ে প্রকাশিত হবে। তাই, এই ব্রাহ্মণমনস্ক পাপীদের অস্তিত্বও আবশ্যক এই ব্রহ্মাণ্ডে, কারণ এঁরাই আমার বাকি সন্তানদের জীবন দুর্বিষহ করতে থাকবে।

আর যতই তাঁদের জীবন ওষ্ঠাগত হতে থাকবে, ততই ব্রহ্মাণ্ড তাঁদের কাছে পরমসত্য হয়ে প্রতিস্থাপিত হওয়া রুদ্ধ হবে। তাই ব্রাহ্মণজাতির মাথায় আমার রুষ্টদৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হবার পরেও, বৈষ্ণবের মাধ্যমে ব্রাহ্মণত্ব প্রকাশিত হতেই থাকবে, কারণ এঁদের অত্যাচারই আমার বাকি সন্তানদের ব্রহ্মাণ্ড তাঁদের কাছে সত্য হয়ে প্রকাশিত হওয়া থেকে অবরুদ্ধ হবে”।

বশিষ্ঠ গদগদ হয়ে বললেন, “অদ্ভুত তোমার লীলা মা। গুরুদেব সঠিকই বলতেন। তোমার লীলা তুমিই জানো। কেউ অন্যায় করে, তো সেই অন্যায়ও কারুকে সত্যের দর্পণ দেখায়; আবার কেউ ন্যায় করে, তো সেই ন্যায়ও কারুকে সত্যের দর্পণ দেখায়। অর্থাৎ সময় ও প্রকৃতির বেশে তুমি সকল সন্তানকে সর্বক্ষণ সত্যের দর্পণ দেখিয়েই চলেছ।

যে এই দর্পণ দেখতে দেখতে, নিজের ইচ্ছা, চিন্তা ও কল্পনার দ্বারা আবদ্ধ আত্মের বিরোধিতা করে, সময় ও প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করবে, সেই তোমার আভাস লাভ করবে। আর গুরুদেব এই তন্ত্রও এই কারণেই নির্মাণ করেছেন যে এই পথে চললে, আত্ম নিজের ইচ্ছা চিন্তা ও কল্পনার থেকে মুক্ত হয়ে উঠবে, আর তোমার সান্নিধ্য পাবে”।

মা এবার মিষ্ট হাস্য শ্রবণ করিয়ে বললেন, “পুত্র, মার্কণ্ড আমারই অবতার ছিল। আমার সাকার রূপ সে। ভাবিকালে আমার কনো পূর্ণ অবতাররূপও এই বঙ্গদেশে আসবে। সে সংসারে অবস্থান করে, আমার সান্নিধ্যলাভের উপযোগী হবার শিক্ষা প্রদান করবে। তবে তা দেরি আছে। তাই এখন তন্ত্র। যতক্ষণ না সে অবতারিত হচ্ছে, ততক্ষণ তন্ত্রই শ্রেষ্ঠ মার্গ”।

বশিষ্ঠ এবার ক্রন্দনে ভেঙ্গে পরে বললেন, “গুরুদেব আমাদের একটিবারও কেন বললেন না যে উনি আপনার সাকার প্রকাশ ছিলেন! আমরা তাঁকে স্নেহ করতাম, সন্তানের ন্যায় বিরক্তও করতাম, আর তিনি মাতার ন্যায় আমাদের সমস্ত করা অত্যাচারকে মমতার সাথে গ্রহণ করে নিতেন। কিন্তু মা, তাও আমাদের ভেদভাবের দৃষ্টিকোন আমাদেরকে এই সত্য সম্বন্ধে ভুলিয়ে দিলো যে, আমাদের মা নিরাকার, আমাদের মায়ের কনো লিঙ্গই সম্ভব নয়। সমস্ত লিঙ্গেই তিনি থাকেন। …

মা, হৃদয় আমার বড়ই বিচলিত আজ। … তোমার দর্শনে ব্যকুল লাগছে। কি ভাবে তোমার দর্শনের যোগ্যতা অর্জন করবো মা? বলো আমায়? আমি তোমার দর্শন পেতে ব্যকুল?”

মা হেসে বললেন, “অযোধ্যা পর্বতের দিশায় যাত্রা করো। আমার এই আজ্ঞাচক্রকে ধারণ করো। আর প্রথম যেখানে উষ্ণজলাশয় পাবে, সেখানের অরণ্যে উপবেশন করে, তন্ত্রের তপস্যা করো, এবং তন্ত্রের শিক্ষা প্রদান করো। তোমরা সকলেই তাই করো, সকলেই একাকজন ভৈরব হয়ে উঠে, আমার দর্শন লাভ করে মোক্ষকামী হবে। যাও পুত্ররা”।

মায়ের এমন আদেশ লাভ করে, সমস্ত ভঙ্গের সমস্ত স্থানে সকলে প্রচারের উদ্দেশ্যে লহুমিশ্রিত ধারণ করে ছড়িয়ে গেলেন। সকল আর্যস্পর্শ থেকে মুক্ত, অরণ্যনিবাসী মাতার প্রেমের গাঁথা শুনে আপ্লুত হতে শুরু করলেন। মাতার প্রেম, করুণা ও মমতা সর্বত্র প্রচারিত ও প্রসারিত হতে শুরু করলো ভঙ্গে, অঙ্গে, কামরূপে, ত্রিপুরে ও মনিপুরে।

বশিষ্ঠ মাতার সাকার দর্শন লাভ করলেন, কিন্তু স্বরূপের দর্শন না লাভ করলে, মাতা নির্দেশ দিলেন মগধে যাত্রা করতে। সেখানে মাতার এক অবতার অবস্থান করছেন, যিনি ২৭ তম ও অন্তিম বুদ্ধ। বশিষ্ঠ সেই কথাতে আপ্লুত হয়ে মগধ গেলে, সেখানে দুর্গারূপের স্থাপন করলেন দেওঘরের অমৃত হ্রদের প্রান্তে।

অবশেষে পাটনেশ্বরীকে স্থাপন করার কালে ২৭ তম বুদ্ধের সাখ্যাতকার করলেন, এবং মাতার সত্যস্বরূপ শূন্যরূপের দর্শন লাভ করলে, বুদ্ধের নির্দেশ আসে বশিষ্ঠের কাছে, “যাও পুত্র, ভঙ্গ হয়েছে, অঙ্গ হয়েছে, কামরূপ হয়েছে, মনিপুর হয়েছে, ত্রিপুর হয়েছে, কলিঙ্গেও মাতার ত্রিঅঙ্গ স্থাপন করেছ, মগধেও করেছ। এবার বাকি মাতার অঙ্গ নিয়ে আর্যদের মধ্যে যাও। সেখানেও অনেকেই মাতার আশিসের অপেক্ষায় বসে আছেন। যাও, দক্ষিণে কুমারীকা অতিক্রম করে সিংহলে যাও, পশ্চিমে সিন্ধুতট পেরিয়ে বালুকাতটে যাও, আর উত্তরে যাও কৈলাসের তলে, আর তির্গতদের রাজ্য যেখানে সমাপ্ত হয়, সেখানে যাও। স্থাপন করো তন্ত্রকে। অক্ষয় করে দাও তন্ত্রকে”।

যাত্রা করলেন মার্কণ্ড শিষ্য তান্ত্রিকগন উত্তরে। মিথিলা থেকে শুরু করে মানসসরবরে মাতার লহুমিশ্রিত অঙ্গ স্থাপন করে তপস্যা করে, ও শিষ্যের নির্মাণ করে তন্ত্রপীঠ স্থাপন করে এলেন। একই ভাবে কিছু তান্ত্রিক কুরুক্ষেত্রতে শক্তিপীঠ স্থাপন করে, উত্তরে গুরুদেবের মার্কণ্ড মহাপুরাণের ব্যাখ্যা অনুসারে এক বিশালাকায় গুহা লাভ করে, তাকেই অমরনাথ গুম্ফ বলে চিহ্নিত করে, তার অন্তরে উত্তর পূর্ব কোনে স্থাপন করলেন, মাতার বিশুদ্ধ চক্রকে।

আর অন্যরা গেলেন দক্ষিণে। সেখানেও বিভিন্ন স্থানে সমস্ত পীঠ স্থাপন করতে করতে, কুমারিকার সমুদ্রতটে পৌঁছালেন, আর সেখানে মাতার স্তনদেশ স্থাপন করে তাকে মহাশক্তিপীঠ রূপে স্থাপন করে, পূর্বকোনের প্রান্ত ধরে সিংহলে প্রবেশ করে, সেখানেও মাতার গহনা স্থাপন করে শক্তিপীঠ স্থাপন করে এলেন।

আবার কিছু তান্ত্রিক পশ্চিমকে ভেদ করতে করতে, জ্বালামুখীতে মাতা কালীর জিহ্বা স্থাপন করে, সেই জিহ্বার থেকে ঐশ্বরিক অগ্নির প্রকাশ দর্শন করে, অতিপশ্চিমে যাত্রা করে, চলে গেলেন সিন্ধুতটের উপরান্তে, বালুর দেশে, এবং সেখানে উপস্থাপন করে, মাতার মাথার খুলির উর্ধ্বদেশ স্থাপন করে, তাকে মহাশক্তিপীঠ রূপে স্থাপন করলেন।

আর্যদের মধ্যেও মাতার প্রতি এমন প্রেম ভাব উৎপন্ন হবে ভিন্নভিন্ন স্থানে, তা কল্পনাতেও ভাবেন নি মার্কণ্ডশিষ্যরা। তবে তন্ত্রের ও মার্কণ্ড মহাপুরাণ, যেখানে কেবলই মাতার জয়গান করা হয়েছে, অহংকারের আরাধনা করাই হয়নি, তার জনপ্রসিদ্ধি আর্যদের প্রতিষ্ঠাকেই নড়বরে করে তুলল। আক্রোশে ফেটে পরলো আর্যরা।

যেখানে যেখানে মার্কণ্ড মহাপুরাণ দেখতে পেলেন আর্যরা, তখন তখন সেই মহাগ্রন্থকে অগ্নিস্নান করিয়ে করিয়ে ভস্ম করতে থাকলেন আক্রোশের বশে, এবং নিজেদের বিনাশকে নিশ্চয় করতে শুরু করে দিলেন। তন্ত্রপীঠে পীঠেও আক্রমণ করলেন, কিন্তু মার্কণ্ডশিষ্যরা একাকজন ভৈরব হয়ে সেই সমস্ত পীঠের রক্ষক হয়ে উঠলে, স্থানীয়রা সেই সমস্ত ভৈরবেরও আরাধনা শুরু করে দিলেন তন্ত্রপীঠসমূহতে।

আর ঠিক তার পরে পরেই, গৌতম বুদ্ধের প্রসিদ্ধি ব্রাহ্মণদের পুনরায় বিপাকে ফেলে দিল। এক তন্ত্র, তার সাথে বৌদ্ধধারার উত্থান। তন্ত্র তো এক নবসাধনধারা, যা সরাসরি ব্রাহ্মণদের আক্রমণ করেনি, কিন্তু বৌদ্ধধারা এবার তো সরাসরি ব্রাহ্মণদের ব্যবিচারের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হয়ে উঠলো। দিকে দিকে, ব্রাহ্মণদের আধিপত্য কুণ্ঠিত হতে শুরু করলো। বিন্ধ্যের অঞ্চলে অঞ্চলে, আর হিমালয়ের পাদদেশের, হৃষীকেশ ও আরো উত্তরের অঞ্চলে, ব্রাহ্মণরা লুকিয়ে পরতে শুরু করলেন।

জনতা ব্রাহ্মণ বিরোধী হয়ে উঠেছে। বুদ্ধের প্রভাবে তাঁরা উগ্র বা উচ্ছৃঙ্খল তো হননি, কিন্তু হতে কতক্ষণ, একবার উগ্র হয়ে উঠলে, ব্রাহ্মণদের হত্যা করতেও জনতা পিছুপা হবেনা। বৌদ্ধত্বের প্রসার, ব্রাহ্মণদের ক্ষমতাবৃদ্ধির জন্য স্থাপিত ক্ষত্রিয়কুলকেও উগ্রতা ত্যাগ করতে বাধ্য করতে থাকলো।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43