কৃতান্তিকা

ব্রহ্মসনাতন পুত্রীর প্রশ্নের প্রত্যক্ষ উত্তর দিলেন না, বরং মৃদু হাসলেন কেবল। আর বলতে থাকলেন, “প্রভাবিত হলেন মার্কণ্ড, আর তাকে মাধ্যম করেই শুরু হলো মার্কান্ড, অর্থাৎ মায়ের কাণ্ড। পরাপ্রকৃতির অঙ্গজাত তিনি, অর্থাৎ তিনি কনো ভ্রমিত ব্রহ্মাণুর সহস্র দেহধারণের মধ্যে একটি দেহধারণ করে বিরাজমান জীবকটি নন, তিনি হলেন পরমেশ্বরীর প্রেরণায়, তাঁরই অঙ্গজাত একটিই জীবনধারণ করা ঈশ্বরকটি অবতার।

জগতে সত্যের বিস্তারের যেই ভাব পিপলাদ ধারণ করেছিলেন, সেই সন্তানের আনন্দের বিধান করতে, জগন্মাতার গ্রহণ করা অবতার তিনি। তবে ভৌতিক দেহ ধারণ করতে যখন হয়েছে, ভ্রমে মজতে যে তাঁকেও হয়েছে, নাহলে নিরাকার, অনন্ত, অসীম ব্রহ্মময়ী কেনই বা সসীম দেহ ধারণ করবেন। তাই নিজের সত্য, নিজের ঈশ্বরকটি হবার ভান তাঁর শিশুকাল থেকে কি করে থাকবে?

তবে তা না থাকলেও, জীবকটির ন্যায় অজস্র দেহধারণ করে করে, নিজের ভ্রমের আস্তরণকে ঋজুতা প্রদান করেন নি তিনি, তাই অসত্যের ভরসাতেই দেহধারণ করলেও, অসত্যের পলস্তা তাঁর উপর যৎসামান্যই। আর সেই কারণে, আর্যগৃহে জন্মগ্রহণ করলেও, পরাপ্রকৃতির প্রতি তাঁর আকর্ষণ শৈশব কাল থেকেই। আর তাঁর ঈশ্বরীর প্রতি প্রেমভাবকে যে আর্য ব্রাহ্মণরা ভয় পাবেন, তাই যে স্বাভাবিক।

এই ঈশ্বরীর প্রতি প্রেমভাবের কারণে অহংকার হ্রাস পায়, স্বার্থহীন জীবন উন্নত হয়, আর স্বার্থহীন নিরহংকার ব্যক্তি যে আচারবিচারের থেকে মুক্তই হন, কারণ আচারবিচারের মধ্যে তিনিই নিজেকে আবদ্ধ রাখেন, যার নিজের স্বার্থচিন্তাকে চরিতার্থ করার বাসনা থাকে, যার নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার কামনা থাকে। জগন্মাতা যে প্রতিষ্ঠার উর্ধ্বে, জগন্মাতা যে সমস্ত কামনাবাসনা, সমস্ত প্রদর্শনী, সমস্ত বিধিবিধানের উর্ধ্বে। আর আর্য ব্রাহ্মণ তো সমাজকে শোষণ করেনই নিজেদের আচারবিচার দ্বারা।

জন্মের কালের আচারবিচার, অন্নপ্রাশনের কালে আচারবিচার, উপনয়নের আচারবিচার, নিত্যদিনের আচারবিচার, বিবাহের কালে আচারবিচার, গর্ভধারণের কালে আচারবিচার, শ্রাদ্ধের আচারবিচার, আর তা ছাড়া আজ এই কামনা, কাল সেই বাসনার পূর্তির উদ্দেশ্যে দেবতাদের তুষ্ট করার জন্য সহস্র প্রকার পূজার আচারবিচার, সহস্র প্রকার ব্রতের আচারবিচার- এই হলো আর্য ব্রাহ্মণের বিধান। আর এই বিধানের কারণ? কারণ একটিই, এই প্রতিটি অনুষ্ঠানের আচারবিচারের পালন আর্য ব্রাহ্মণ সকলকে দিয়ে করাবেন, আর তা করানোর কারণে দক্ষিণা স্বরূপ, তাঁদের যা পছন্দ লুণ্ঠন করবেন।

বাণিজ্য বলে বাণিজ্য, লুণ্ঠন প্রক্রিয়া বললে লুণ্ঠন প্রক্রিয়া, যেই নামেই বলা হউক না কেন, এই ছিল আর্য ব্রাহ্মণদের উপার্জনের পথ। অর্থাৎ স্পষ্ট কথা, সাধারণ মানুষকে কামনাবাসনায় জর্জরিত হতে হবে। তবেই না তাঁরা অন্যের উন্নতিতে ঈর্ষা অর্থাৎ মাৎসর্যপূর্ণ হবেন, আর হোমযজ্ঞাদি করবেন! তবেই না যেই জীবনের প্রতি মোহগ্রস্ত, সেই জীবনকে ভুতপ্রেতের খপ্পর থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য অভিলাষী হবেন! তবেই না, এমন বিশ্বাস রাখবেন যে, আমার মানসিকতা যাই হোক না কেন, দেবতাদের তুষ্ট রাখলে, চরম অনাচার করলেও, দাম্পত্য জীবন সুখের হবে, তাই যজ্ঞাদি করে বিবাহ অনুষ্ঠান হবে।

অর্থাৎ সহজ কথা, অহংকারের উপাসনা, কামনাবাসনার বাড়বাড়ন্ত এবং মোহবদ্ধতার মাদকতাই সম্যক সমাজে আর্য ব্রাহ্মণদের প্রতিষ্ঠা, আর যতই এই কামনাবাসনা, অহমিকা এবং মোহ প্রসারিত হবে সমাজে, ততই ব্রাহ্মণের লুণ্ঠন-বাণিজ্য লক্ষ্মীমুখ দেখবে, আর তাঁদের নিজেদের সমাজে প্রতিষ্ঠা, প্রতিপত্তি, সম্পত্তি, এবং বিলাসিতার সাধ পূর্ণ হবে।

যেই সমাজ অহমিকার আরাধনা করে, তাঁকেই না স্বর্গলাভের মোহ প্রদান করা সম্ভব, নরকলাভের ভীতি দেখানো সম্ভব, আর তবেই না ঘৃণ্য ঘৃণ্য প্রথা রেখে সর্বস্ব লুণ্ঠন করা সম্ভব। যদি স্বর্গের মোহ নাই থাকে, তবে সতীদাহ কি করে হবে? আর যদি সতীদাহ না করা যায়, তবে সম্পত্তি লুণ্ঠন কি করে হবে? যদি নরকের ভয় নাই থাকে, তবে বৃদ্ধ ব্যক্তির সাথে কেন তরুণীর বিবাহ দেওয়া হবে? ব্রাহ্মণ বৃদ্ধ হলেও, ব্রাহ্মণের সাথে বিবাহ হলে স্বর্গ নিশ্চিত, নরকের দরজা বন্ধ, এই বিশ্বাস স্থাপন না করা গেলে, ব্রাহ্মণ সম্ভোগের জন্য তরুণী কি করে লাভ করবেন?

আর সেই বৃদ্ধের মৃত্যুর পর, দ্বিতীয় বিবাহ হলে, নরকে যাত্রা নিশ্চিত, এই ভয় স্থাপিত না থাকলে, বিধবা যে ব্রাহ্মণের সম্পত্তি নিয়ে অব্রাহ্মণকে বিবাহ করে নেবে, আর ব্রাহ্মণ সেই সম্পত্তির অংশ পাবেনা, এ কি করে হতে দিতে পারে লোভসর্বস্ব আর্য ব্রাহ্মণরা! সেই কারণেই তো বেদ, পুরাণ স্থাপিত রেখে, জ্যোতিষের মত মনোবিজ্ঞানকে বিকৃত করে ভাগ্যচর্চা রূপে স্থাপিত করে, সম্পূর্ণ সমাজকে অহংকারের ত্রিগুণ অর্থাৎ ত্রিদেবের আরাধনায় মত্ত রাখেন আর্য ব্রাহ্মণ।

কিন্তু এমতবস্থায় যদি প্রকৃতির আরাধনা করা হয়, তাহলে যে সমস্ত কিছুর বিনাশ হয়ে যাবে, সমস্ত লুণ্ঠনের পথ বন্ধ হয়ে যাবে! বৌদ্ধদের প্রকৃতির আরাধনা করতে দেখেছেন আর্য ব্রাহ্মণরা। প্রকৃতি হলেন ব্রহ্মময়ী, তিনি ভগবান নন, ঈশ্বরী, আর তিনি তাই, যার ঈশ্বরী হবার প্রতিষ্ঠাতে কনোপ্রকার মনোযোগ নেই, তাঁর মনোযোগ মাতৃত্বে। সন্তানের আনন্দই তাঁর লক্ষ্য, তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য, স্বয়ং উপেক্ষাও গ্রহণ করেন সন্তানের আনন্দের উদ্দেশ্যে। বৌদ্ধদের দেখেছেন তাঁরা নিঃস্বার্থ জীবনযাপন করতে, সমস্ত অহমিকা প্রতিষ্ঠা থেকে বিমুখ থেকে অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতে। তাই জগন্মাতার প্রতি প্রেমভাবের নাম শুনলেও ভিত হয়ে যায় ব্রাহ্মণকুল।

দধীচির ক্ষেত্রেও সেই একই ভাব ছিল তাঁদের, পিপলাদের ক্ষেত্রেও অনুরূপ, আর মার্কণ্ডের ক্ষেত্রেও। একবার যদি কেউ ব্রহ্মময়ীর ভাব সমাজে বসিয়ে দেয়, আর সমাজ নিঃস্বার্থতার, নিরহঙ্কারের, মোহশূন্যতার অভ্যাস করতে শুরু করে দেয়! তাঁদের কি হবে তাহলে? তাঁদের সাজানো বাণিজ্য, আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে লুণ্ঠন করে করে সম্পত্তি বৃদ্ধি, অধিকার স্থাপন করে করে আর্যবত্র স্থাপন, এই সব যে জলে চলে যাবে! না না, অহংকারেরই আরাধনা হবে, ঈশ্বরের আরাধনাকে আর্যকুল প্রশ্রয় দিতে পারেনা, কিছুতেই পারেনা।

তাই, মার্কণ্ডের পিতা মৃকেন্দুকে আর্যসমাজ ডেকে পাঠালেন। একপ্রকার হুমকি দিয়েই বললেন, “পুত্রের এই মাতৃপ্রেমকে যথাশীঘ্র বন্ধ করো মৃকেন্দু, নাহলে তোমার একমাত্র পুত্রকে তুমি হারিয়ে ফেলবে, যাই তার বয়স ষোড়শ হবে। … আরে তুমি জানোই না তো, যেই মাতার প্রেমে তোমার পুত্র আবদ্ধ, তিনি যে সদা ষোড়শবর্ষীয়, ষোড়শের থেকে তাঁর বয়োবৃদ্ধিই হয়না। তাই তাঁর প্রতি প্রেম রাখা ব্যক্তিকেও তিনি ষোড়শ বয়স অতিক্রম করতে দেন না। … তাই যথাশীঘ্র তোমার পুত্রের মাতৃনাম জপ বন্ধ করো, না হলে ষোড়শ বৎসর হলেই, কাল নেমে আসবে তাঁর জীবনে”।

মৃকেন্দু ভয় পেলেন। গৃহে প্রত্যাবর্তন করে, নিজের পত্নীকে আর্য ব্রাহ্মণদের কথা বললেন। স্বামীস্ত্রী পরামর্শ করে কেবলই ক্রন্দন করলেন। ব্রাহ্মণ যে ভগবান, তাঁদের বচন কি করে মিথ্যা হবে! আর মার্কণ্ডের মাতৃপ্রেম যে সহজাত, তাকেই বা কি করে আটকাবেন তাঁরা! … এত অপেক্ষার পর, একটি মাত্র সন্তান লাভ করলেন, আর সেই সন্তানও ষোড়শ বৎসর হলেই চলে যাবেন। ব্যাথায় বেদনায় ভেঙ্গে পরলেও, স্বামীস্ত্রী মনস্থির করলেন, না, যতদিন মার্কণ্ড জীবিত থাকবে, ততদিন মার্কণ্ডকে সর্বপ্রকার স্নেহ প্রদান করবেন তাঁরা, সর্বপ্রকার শিক্ষাও দেবেন, এবং সর্বপ্রকার স্বতন্ত্রতাও প্রদান করবেন তাঁরা।

ব্রাহ্মণরা যেই ভয় দেখাতে চেয়েছিলেন, সেই ভয় তো মৃকেন্দু পরিবার পেলেন, কিন্তু যেই মাতৃপ্রেম বিমুখতার প্রসার করতে চেয়েছিলেন, তা হলো না, বরং তার বিপরীত হলো। মার্কণ্ড সমস্ত শাস্ত্রের শিক্ষা গ্রহণ করতে শুরু করলেন, উপনিষদের প্রতি আকৃষ্ট হলেন, এবং পিপলাদের সংসর্গ গ্রহণ করলেন। মৃকেন্দু ও তাঁর পত্নী ব্রত নিয়েছিলেন যে তাঁরা তাঁদের পুত্রের স্বল্পায়ুর স্বতন্ত্রতায় কনো হস্তক্ষেপ করবেন না।

তাই অতি সহজেই মার্কণ্ড পিপলাদের সংসর্গ লাভ করে, উপনিষদের পূর্ণজ্ঞান লাভ করতে থাকলেন। আর যখন পিপলাদ দেখলেন যে মার্কণ্ডের মধ্যে মাতৃপ্রেম কানায় কানায় রয়েছে, তখন তিনি উপনিষদের গুপ্তকথা, যেই গোপন মাতার নির্দেশে পিপলাদ ধারণ করে, আর্যসমাজে উপনিষদকে স্থাপন করেছিলেন, সেই গুপ্ত কথারও বিবরণ প্রদান করলেন।

একদিকে যখন এই সমস্ত কিছু চলছিলো, তখন আর্য ব্রাহ্মণ সমাজ মার্কণ্ডকে তাঁর ষোড়শ বৎসর অতিক্রমের দিনেই মৃত্যু উপহার দিয়ে হত্যা করবেন, এমন ষড়যন্ত্র স্থির করেন। আর সেই কথা পিপলাদ, যিনি সর্বদা আর্য ব্রাহ্মণরা কি ষড়যন্ত্র করছেন, তা জানার জন্য গুপ্তচর স্থাপিত রাখতেন, তিনি লাভ করলেন।

গুপ্ত সংবাদ লাভ করে, মার্কণ্ডের দীর্ঘায়ুর কামনায় চিন্তন করে, মার্কণ্ডকে একদিন নিজের কাছে ডেকে পাঠালেন। মার্কণ্ডের উদ্দেশ্যে পিপলাদ বললেন, “মার্কণ্ড, আমি যেই উপনিষদের রচনা করেছিলাম, তোমাকে তার গোপন কথা আগেই বলেছি। এই কথার মধ্যাতত্ত্ব ছিলেন মাতা। কিন্তু মাতা আমার সামনে উদিত হয়ে আমাকে বলেন যে অহমিকা অর্থাৎ আত্ম-সকল আর তাঁর মধ্যে এই ভেদ যে, তিনি ভ্রমমুক্ত ব্রহ্ম, আর আত্মরা ভ্রমযুক্ত ব্রহ্মাণু। তাঁরা দুই নন, একই। আর তাই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে নির্দেশ দেন, আত্ম-বিবরণ রূপে।

তিনি আমাকে বলেন যে, আত্মের প্রশংসা করে আমি যা বলবো উপনিষদে, তা তাঁরই প্রশংসা হবে, কিন্তু তাঁর প্রশংসা করলে আর্য ব্রাহ্মণরা সেই ভাবেই আমাকে মৃত্যু দেবেন, যেই ভাবে আমার পিতার মৃত্যু নিশ্চয় করেছিলেন। তাই আমি যেন সত্যের বিবরণ দেওয়া থেকে বিরতও না হই, আর সেই বিবরণ দেবার কালে, মাতার উল্লেখ না করে আত্মের উল্লেখ করি। তবেই ব্রাহ্মণরা আমাকে জীবনদান করবে।

পুত্র মার্কণ্ড, মাতার বিধানকে অনুসরণ করেই, আজ আমিও তোমাকে একই কথা বলছি। গৃহ থেকে দূরে চলে যাও। শিবলিঙ্গের স্থাপনা করো, আর মাতাকে যেই ভাবে ধারনা করো তুমি, সেই ধারনাকে আত্মের তমগুণের উপর আরোপ করে, মন্ত্রের উচ্চারণ করো। পুত্র, হট করো না। প্রথম ব্রাহ্মণদের থেকে সুরক্ষিত হও, পরবর্তীতে মাতার গুণকীর্তন করার অনেক সুযোগ পেয়ে যাবে, যদি আজ জীবিত থাকো।

আর তোমাকে আজ আরো একটি গোপন কথা বলি। আত্মের বা অহংকারের ত্রিগুণের মধ্যে এই তমগুণ অত্যন্ত বিচিত্র। এঁর বিভিন্ন দশায় বিভিন্ন প্রকার বিস্তার হয়। আর এঁর যেই চরমস্তরের বিস্তার, সেই বিস্তার সম্ভব হলে, আত্ম মাতার সত্যকে ধারণ করতে পারে, এবং সমস্ত ভ্রমের নাশ করে। যাও মার্কণ্ড, গৃহ থেকে দূরে স্থিত হয়ে, শিবলিঙ্গ স্থাপন করে, বাহ্যিক ভাবে ব্রাহ্মণদের তুষ্ট করে, জীবনদান লাভ করো। আর একই সঙ্গে সেই শিবমন্ত্রের উপর মনকে নিবদ্ধ করো। আশীর্বাদ করি তোমায়, তমগুণের সমস্ত বৈচিত্র্য তোমার হৃদয়দর্পণে চিত্রিত হোক”।

পিপলাদ মার্কণ্ডের কাছে গুরু, আর তাঁর বাণী হলো গুরুবাণী। তাই পিপলাদের কথিত প্রতিটি অক্ষরের পালন করলেন মার্কণ্ড। নিজগৃহে নাট্য করলেন যেন তিনি জেনে গেছেন তাঁর আয়ু ষোড়শ বৎসর পর্যন্ত, আর তাই দীর্ঘায়ুর প্রতি কামনা নিয়ে তিনি গৃহত্যাগ করে চলে গেলেন, এই বলে যে তিনি মহাকাল শিবের আরাধনা করে দীর্ঘায়ু লাভ করবেন।

আর সেই কথা তাঁর মাতাপিতা ভয়ার্ত হয়ে আর্যকুলকে জানালে, আর্যকুল আনন্দিত হন এই ভেবে যে, মার্কণ্ডের মাতৃপ্রেমের বিসর্জন হলো শেষমেশ। তবে বিশ্বাস তো আর্যরা কারুকে করেন না, করবেনই বা কি করে, দিবারাত্র যারা অন্যের বিশ্বাস নিয়ে ক্রীড়া করেন, তাঁরা কারুকে বিশ্বাস কি করে করতে পারেন! তাই মার্কণ্ডের শিবভক্তি দেখতে তাঁরা যাত্রা করলেন, সঙ্গে উপনিষদ রচনা করে, তাঁদের প্রিয় হয়ে ওঠা পিপলাদ কেও সঙ্গে রাখলেন।

পিপলাদ তাঁর প্রিয়শিষ্যকে সেই সময় প্রদান করতে চান, যেই সময়কালে মার্কণ্ড তমগুণের বৈচিত্র্যের সম্পূর্ণ সন্ধান পেয়ে যাবেন। তাই মার্কণ্ডের অবস্থান জানা সত্ত্বেও, আর্য ব্রাহ্মণদের এদিকসেদিক ভ্রমণ করালেন, মার্কণ্ডের সন্ধানে। অবশেষে যেইদিন তাঁর ষোড়শ বৎসর বয়স পূর্ণ হয়, সেইদিন আর্য ব্রাহ্মণদের সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হলেন মার্কণ্ডের সন্নিকটে।

ব্রাহ্মণ সকল দেখলেন মহাধ্যানে লীন হয়ে, মার্কণ্ড শিবের নামে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রের রচনা করে, অবস্থান করছেন একটি শিবলিঙ্গের সম্মুখে। ব্রাহ্মণ তুষ্ট হলেন, আর পিপলাদ অভয় লাভ করে মার্কণ্ডকে জীবনদানের বিধান প্রদান করতে বললে, আর্য ব্রাহ্মণকুল পিপলাদকেই স্বমুখে সেই অভয়দান প্রদান করতে বললেন। মার্কণ্ড অভয়দান লাভ করলেন, আর গুরু আলয়ে প্রত্যাবর্তন করে কিছু বিশেষ কথা বললেন তাঁর গুরুর উদ্দেশ্যে।

তিনি বললেন, “গুরুদেব, আপনি যেই উপায় বলেছিলেন, সেই উপায়ে আমি তমগুণের মহা উগ্র স্বরূপ দর্শন করেছি। আর এও অনুধাবন করেছি যে, যেমন যেমন উগ্র হয়ে ওঠেন তমগুণ, তেমন তেমন ব্রহ্মময়ীরও রূপবৈচিত্র্য প্রকাশিত হয়। আসল কথা এই যে, ব্রহ্মময়ী নিরাকার ও পরিবর্তনীয়, অনেকটা আকাশের মত। যেমন যেমন আকাশের বক্ষে বাদল শুভ্র থেকে ঘন কৃষ্ণবর্ণ হয়ে ওঠে, তেমন তেমন গগনের রূপ পরিবর্তিত হচ্ছে, এমনই বোধ হয়।

অবশেষে যখন বাদল সর্বোত্তম ঘনকৃষ্ণবর্ণ হয়ে উঠে বর্ষণ করে, তখন গগন উন্মুক্ত হয়ে যায়, আর গগনের স্বরূপ, অর্থাৎ বাদলমুক্ত গগন প্রদর্শিত হয়। গুরুদেব, সত্ত্বগুন যদি শুভ্র লঘু ওজনের বাদল হয়, তবে রজগুণ হলো ঘন শুভ্র বাদল, আর এঁরা সকলে মাতাকে ঢেকে রেখে, অসত্যের স্থাপনার দিকেই মনযোগী। তমগুণ হলো কৃষ্ণবর্ণ বাদল, তবে সেও প্রথম দিকে মাতাকে ঢেকেই রাখে।

তবে এই কৃষ্ণবর্ণ বাদল অর্থাৎ তমগুণের বৈচিত্র্য অনেক। অন্য বাদলের যেমন রূপান্তর হয়না, এই বাদলের তেমন ঘনঘন রূপান্তর হয়। কৃষ্ণবর্ণ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ হয়ে ওঠে, আর অবশেষে সে উগ্র হয়ে উঠে বর্ষণ করে, এবং বর্ষণ উপরান্তে মাতা অর্থাৎ সত্য অর্থাৎ নীল গগন প্রস্ফুটিত হয়। গুরুদেব, আমি এই কৃষ্ণবর্ণ বাদলের পরিণতি এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে মাতার বিভিন্নরূপ প্রকাশকে লিপিবদ্ধ করতে চাই। আমার জন্য কি বিধান গুরুদেব?

গুরুদেব, আমার বিশ্বাস, এই কাব্য রচনা করতে করতে, আমি সেই ঘনকৃষ্ণবর্ণ বর্ষণমুখি বাদল, অর্থাৎ তমগুণের চরম অবস্থারও ধারনা লাভ করবো, আর সাথে সাথে মাতারও স্বরূপের ভাব লাভ করবো। আর একবার তা যদি করতে সক্ষম হই, গুরুদেব সত্যে যাত্রার এক অনন্য পথের রচনা সম্ভবপর হয়ে যাবে। এতে আপনার বিধান কি?”

পিপলাদ মৃদু হেসে বললেন, “তুমি আমার কাছে স্থিত থেকে নিশ্চিন্তে তোমার কাব্য রচনা করো। এখানে স্থিত থাকলে, তোমার কনো অন্যচিন্তার অবকাশও থাকবেনা, আর সাথে সাথে তোমার কাব্যের প্রচুর অনুগামীও তুমি লাভ করে ফেলবে, যারা পরবর্তীতে তোমার নির্দেশিত সত্যযাত্রার মার্গকেও ধারণ করতে পারবে। তাই তেমন করাই হলো আমার বিধান”।

গুরুনির্দেশ লাভ করে, মার্কণ্ড পিপলাদের চরণতলে উপস্থিত হয়েই, তাঁর অর্জন করা মহাজ্ঞানের বহিঃপ্রকাশকে মরলোকের সম্মুখে আনলেন। কাব্যগ্রন্থের নামকরণ করলেন স্বয়ং তাঁর গুরু, মহর্ষি পিপলাদ। মার্কণ্ড মহাপুরাণ নাম হলো তার, আর তাতে রইল সম্পূর্ণ প্রকৃতিতত্ত্ব। প্রকৃতি নিষ্ক্রিয় হয়েও কি ভাবে আত্মের নিরিখে তিনি সক্রিয় প্রকৃতি হয়ে উঠলেন পরব্রহ্ম থেকে, প্রকৃতি কি রূপে কাল ও এই বাহ্য প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখেন, এবং কেন রাখেন; এবং কি ভাবে সমস্ত আত্মকে তিনি তাঁদের স্বরূপে প্রত্যাবর্তন করানোর জন্য মহামায়া হয়ে বিরাজমান- এই ছিল গ্রন্থের বৃহত্তর অংশ।

বাকি অর্ধেকের এক তৃতীয়াংশ জুরে ছিল, সাধক কি উপায়ে নিজের অন্তরে প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ ভাবে প্রকাশিত করতে সক্ষম, সেই উপায়। এই উপাখ্যানের নামকরণ করেছিলেন মার্কণ্ড নবদুর্গা। এবং এই অধ্যায়ে, প্রকৃতি সাধকের হৃদয়ে প্রাথমিক ভাবে শৈলন্যায় হয়ে থাকে সেই থেকে বিবৃতি শুরু করেন মার্কণ্ড, এবং ক্রমশ প্রকৃতিকে প্রকাশিত হতে দেখান।

শৈল বেশ থেকে, ব্রহ্মন্যায় অব্যক্ত অচিন্ত্য প্রকাশে স্থিতা প্রকৃতিকে দেখান, এবং ক্রমশ অব্যক্ত মাতার সন্তানের দায়িত্বপালনের ভূমিকাকে দেখাতে থাকেন। সন্তানের হৃদয়কে শান্ত ও আলোড়িত করতে তিনি চন্দ্রঘণ্টা হন, সন্তানের সমস্ত শক্তি সম্পদের উৎসস্থল বেশে তিনি কুষ্মাণ্ডা, আবার সন্তানকে সুরক্ষা প্রদত্তা মাতাকে বিচাররূপী স্কন্ধের মাতা বেশে বিরাজিতা- এও দেখান মার্কণ্ড।

অতঃপরে, মাতা সন্তানের আমিত্বের দমনকারী কাত্যায়নী হয়ে ওঠেন, তো সন্তানের গুপ্ত মোহসমূহকে কালরাত্রি বেশে বিনাশী মাতাকে দেখিয়ে, মাতার সন্তানের হৃদয়ে যখন সৌম্যতার রূপ ধারণ করে মহাগৌরি, সেই অপার সৌন্দর্য ও স্নিগ্ধতার বিবরণ প্রদান করে, অন্তে সন্তানের সমস্ত জ্ঞান আহরণের বাঁধা দূর করে মাতা যখন সদ্ধিদাত্রী, সেই মহাপ্রকাশের বিবরণ প্রদান করেন।

সেই বিবরণ অতিমনোরম, অতীব ভক্তিজাগরণী, আর এই বিবরণ সম্পূর্ণ ভাবে ব্যক্ত করে কিভাবে পরাপ্রকৃতি সন্তানের হৃদয়ের সমস্ত কলুষ মিটিয়ে, তাকে জ্ঞান আহরণের জন্য উপযুক্ত করে তোলেন। অসম্ভব নিখুঁত এবং অত্যাশ্চর্য সেই বিবরণ পাঠ করে, আপ্লুত পিপলাদ অতি সহজেই বুঝলেন যে, এই কাব্য প্রকাশিত হলে আর্যরা মার্কণ্ডের প্রাণ হননের জন্য প্রগল হয়ে উঠবে।

অন্যদিকে, মার্কণ্ডের এমন অদ্ভুত বিবরণে ভক্তিস্নাত হতে থাকলেন পিপলাদের সমস্ত শিষ্য। সেই দেখে, পিপলাদ কি করনিয়, সেই বিশয়ে নিশ্চিত হয়ে গেলেন, এবং অপেক্ষা করলেন, মার্কণ্ড মহাপুরাণের সমাপ্তির। অনুষ্ঠিত হলো সেই সমাপ্তি, আর মার্কণ্ড মহাপুরাণ জগতের শ্রেষ্ঠ মানবীয় কীর্তি রূপে প্রকাশিত হবার জন্য প্রস্তুতও হলো। তৃতীয় অধ্যায়ে, মার্কণ্ড মাতার শ্রেষ্ঠ সম্ভব বিবরণ প্রদান করলেন, আর সেই বিবরণ এমনই নিখুঁত ও অলৌকিক হলো যে তা বৌদ্ধধারারও কাছে এক মহাবিশ্ময় হতে চলেছিল।

প্রথম অধ্যায়ে, মার্কণ্ড সতী থেকে পার্বতীর উত্থানের ব্যখ্যা দ্বারা মাতার অব্যক্ত থেকে ব্যক্ত হয়ে ওঠার বিবরণ প্রদান করেছিলেন, নিষ্ক্রিয় থেকে সক্রিয় হয়ে ওঠার বিবরণ প্রদান করে মুগ্ধ করেছিলেন সমস্ত পাঠককে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে মাতার নবদুর্গার বিবরণ প্রদান করে, কি ভাবে সাধকের হৃদয়কে সাধনার জন্য উপযোগী করে তোলেন মাতা, সেই বিবরণে সকলকে মুগ্ধ করেছিলেন।

আর তৃতীয় ও অন্তিম উপাখ্যানে, মার্কণ্ড বললেন অনবদ্য সাধনব্যখ্যা। তমগুণকে গ্রাস করে নিয়ে মাতা হন ধূমাবতী। আর অতঃপরে মাতা তমগুণকে ক্রমশ অধিক থেকে অধিক পরিশ্রম করাতে থাকেন এবং তাঁকে নিজের কমলা রূপ দ্বারা দেখান যে তিনিই সমস্ত সম্পদা প্রদত্তা, বগলা রূপ দ্বারা দেখান তিনিই সমস্ত বাকনিয়ন্তা।

ভেদাভেদ মুক্ত করনে তিনি মাতঙ্গী, তো ত্যাগ ও দায়িত্বপালনে নিজসত্ত্বাত্যাগী জননী রূপে তিনি ছিন্নমস্তা। মাতার প্রকাশে, ত্যাগে, নিঃস্বার্থভাবে, স্নেহের অসীম অনন্ত বিকাশকে লক্ষ্য করে তমগুণ হতবম্ব হয়ে যান, তো মাতা এবার ভুবনেশ্বরী রূপ ধারণ করে তমগুণকে দেখান যে তিনিই সমস্ত লোক এবং সমস্ত লোকের অধীশ্বরী একমাত্র অস্তিত্ব। সমস্ত জীবনপ্রবাহী ধারাও তাঁর থেকেই উৎস লাভ করে, মাতার সেই অপার রূপবতী ত্রিপুরাসুন্দরী ললিতা রূপের বিবরণে সকল পিপলাদ শিষ্য মার্কণ্ডের সাথে অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্ত হয়ে গেলেন চিরতরের জন্য।

কিন্তু মার্কণ্ডের বিবরণ তখনও থামেনা। মৃত্যুর কাণ্ডারি, এবং জন্মমৃত্যুর চালিকার আসনে তিনি তমগুণকে দেখান এবার, যেখানে মাতা হন ভৈরবী, আর এবার তমগুণ ঘনকৃষ্ণবর্ণ বাদলের ন্যায় হয়ে উঠতেও শুরু করে ভৈরব হয়ে ওঠেন। প্রবল পরিবর্তনের ফলে তমগুণ যায় মূর্ছা, আর যখন তাঁর মূর্ছাত্যাগ হয়, তখন দেখেন মাতা তাঁকে স্তনপ্রদানি তারা। উগ্রতা তখন তমগুণের চরমে, এবং সেই উগ্রতার উৎস হয়ে ওঠে ভক্তি।

সকল শ্রোতা গদগদ যখন, তখন দশমহাবিদ্যা অধ্যায়ের ইতি টানেন মার্কণ্ড মহাকালীকে সম্মুখে রেখে। তমগুণ তখন আর আত্মমুখী নয়। রজ ও সত্ত্বকে সম্যক ভাবে যেন গ্রাস করে নিয়েছে তমগুণ, আর সর্বগ্রাস করে সে এখন পূর্ণ ভৈরব। আর মাতা! মাতা এবার নিজের বাস্তবিক নিরাকার, মহাশূন্য, অব্যাক্ত, অচিন্ত্য স্বরূপ মহাকালী। তিনি যেন অনন্ত রাত্রির গগন, আর সেই বাদলমুক্ত গগনের মাধ্যম হলেন ভৈরব স্বয়ং। ভৈরব যেন চূড়ান্ত উগ্রতায় সমস্ত বাদলকে বৃষ্টির বেশে প্লাবিত করে দিয়েছেন, লয় হয়ে গেছেন তিনি মহাকালীর চরণতলে, আর তাই সন্তানকে অন্তিম গন্তব্য, ব্রহ্মে লীন করে, মাতা আজ পুনরায় নিরাকার, কালনিয়ন্তা মহাকালী।

হিল্লোল উঠলো মার্কণ্ডের। পিপলাদ শিষ্যরা এখন মার্কণ্ড শিষ্য হয়ে গেছেন। দিকেদিকে মার্কণ্ডের অসম্ভব গুণের বাখান করে ফিরছেন তাঁরা। কনো কারুর কথনে নয়, সততই সেই প্রশংসাবাণী, কারণ তাঁরা যে মার্কণ্ডের মাতৃবন্দনায় আপ্লুত, ভক্তিতে গদগদ, আনন্দে আত্মহারা। প্রশ্ন এলো শিষ্যদের মার্কণ্ডের কাছে, “প্রভু, আত্মের তমগুণকে বাগে কি করে লাভ করবো? বাগে লাভ না করলে, তাঁকে ভক্ষণ করে মাতা কি করে ধূমাবতী হবেন? মাতা ধূমাবতী না হলে, কি করে তাঁতে লীন হবো? তাঁতে লীন না হলে, তাঁর মধ্যে অহংকারের নাশ না হলে, কি ভাবে সমস্ত জন্মমৃত্যু চক্র থেকে মুক্ত হবো?”

উত্তর এলো মার্কণ্ডের থেকে, “তন্ত্রধারার নির্মাণ হবে। আমাদের মোহ আমাদের পঞ্চভূতের এই শরীরের প্রতি। আকাশতত্ত্ব সেখানে মন হয়ে বিরাজমান হয়ে আমাদেরকে ভ্রমে আবদ্ধ করে রেখেছে; জলতত্ত্ব সেখানে বুদ্ধি হয়ে উপস্থিত থেকে আমাদের সর্বদা আসক্তি বিরক্তির মধ্যে বন্দি করে রেখেছে; প্রাণ রূপে পবন, দেহ রূপে ধরিত্রী, আকাশ অর্থাৎ মন এবং জল অর্থাৎ বুদ্ধির প্রভাবে প্রভাবিত অগ্নির কারণে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। অগ্নি শরীরের মধ্যে উর্জা বেশে স্থিত হয়ে মন বুদ্ধির প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে, আহার নিদ্রা ও মৈথুনে সর্বদা বদ্ধ, আর তাই ধরিত্রী ও পবনও ত্রস্ত।

তন্ত্রের ধারা নির্মাণ হবে, মন, বুদ্ধি ও উর্জাকে অত্যাচার করে করে, পঞ্চভূতকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। তবেই তমগুণ উগ্র হবে, তবেই গগনের বাদল ঘন কৃষ্ণবর্ণ হবে, আর তবেই বর্ষণ হবে। চলো, সেই তন্ত্রধারার নির্মাণ করবো আমরা, মাতার কাছে লীন হবো। গহন সমাধিতে মাতার মধ্যে চিরতরে লীন হয়ে জীবনমৃত্যুর চক্রকে ছেদন করবো”।

উপায় নিশ্চিত, তন্ত্রের নির্মাণ সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু এঁরই মধ্যে মার্কণ্ডের শিষ্যদের মার্কণ্ডকে নিয়ে উন্মাদনা আর্যদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করলো। মার্কণ্ড মাতৃবন্দনার এক অনবদ্য গীত রচনা করেছেন। সেই গীত এমন যা সমস্ত অহংকারকে চিরনিদ্রা প্রদানে তৎপর। আর্যদের ভিত ও ভিত্তি নড়ে উঠলো। এবার বোধহয় তাঁদের সমস্ত আচারানুষ্ঠানের ইতি হবে, আর তাদেরকে কেউ ভগবন মানবে না, আর কেউ তাঁদেরকে দান দেবেনা, এবার বোধহয় তাঁদের দুঃসময়ের সূচনা হলো। …এমন বিচার করতে, আর্য ব্রাহ্মণরা একত্রিত হয়ে, মার্কণ্ডকে দহন করার সিদ্ধান্ত নিলে, পিপলাদ মার্কণ্ডকে ও তাঁর শিষ্যদের ডেকে পাঠালেন।

মাতৃবন্দনা করতে পেরে আনন্দিত, ও তন্ত্রের সূচনায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকা প্রফুল্লিত মার্কণ্ড ও তাঁর শিষ্যরা পিপলাদের সম্মুখে উপস্থিত হলে, পিপলাদ বললেন, “মার্কণ্ড, তুমি তোমার শিষ্যদের নিয়ে এক্ষণে প্রস্থান করো। আর্যরা মার্কণ্ডকে জীবিত দহন করে দিতে উদ্যত। মার্কণ্ড মহাপুরাণের কারণে, আর্য ব্রাহ্মণদের অহংকারের আরাধনা আজ বন্ধ হবার যোগার, তাঁরা নিজেদের দুর্দিনকে দর্শন করে নিয়েছে। আর সেই দুর্দিনকে আটকানোর একটিই উপায় সন্ধান করেছে তাঁরা, আর তা হলো মার্কণ্ড তোমার মৃত্যু। তাই এক্ষণে পলায়ন করো”।

শিষ্যদের আনন্দের হাট মুহূর্তের মধ্যে দুশ্চিন্তায় পরিণত হয়ে গেল। তাঁরা পিপলাদকে প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু প্রভু, মার্কণ্ড যে মহামুনি! তিনি যা নির্মাণ করেছেন, তা কালের গর্ভে এই ভাবে হারিয়ে যাবে? মাতার বিবরণ জগতে অপ্রকাশিতই থেকে যাবে?”

পিপলাদ মৃদু হেসে পলায়নে অসম্মত মার্কণ্ডের দিকে তাকিয়ে বললেন, “পুত্র মার্কণ্ড, ভঙ্গের গহন অরণ্যকে আর্যরা ভয় পায়। কেবল আর্য ব্রাহ্মণই নয়, আর্য ক্ষত্রিয়রাও সেই গহন অরণ্যে প্রবেশ করতে সদাভীত। তোমার সমস্ত শিষ্যদের নিয়ে সেই অরণ্যে প্রবেশ করো মার্কণ্ড। সেই অরণ্যের দুটি খণ্ড আছে পুত্র, আর অযোধ্যা পর্বতমালা সেই দুই বনাঞ্চলকে পৃথক করে। সেই অযোধ্যা পর্বত অঞ্চলেই ভঙ্গের অসামান্য সুন্দরী এবং প্রকৃতির পূর্ণপবিত্র কন্যাদের নিবাস।

তাঁদেরও প্রয়োজন পরবে পুত্র তোমাদের তন্ত্রসাধনা করতে, কারণ তন্ত্র সাধনায় ভৈরবীর আবশ্যকতা বিপুল। সেখানে প্রস্থান করো, এবং তন্ত্রের স্থাপনা করো। সেখানেই বিস্তার করো তন্ত্রের, এবং সময় আসন্ন হলে, দিকে দিকে সেই তন্ত্রধারার বিস্তার নিশ্চয় করবে। এই অনবদ্য কৃত্য মানবজীবন থেকে হারিয়ে যেতে পারেনা। যাও মার্কণ্ড, প্রকৃতি তোমারই আগমনের জন্য ভঙ্গভূমির মহাপাবন ধামকে সুরক্ষিত রেখেছেন বনাঞ্চল ও হিংস্র পশুর পাহারা দ্বারা। সেখানে যাও, এবং তন্ত্রের স্থাপনা করো”।

মার্কণ্ড এবার পিপলাদের কথাতে আশ্বস্ত হলেন, এবং তন্ত্রের প্রগতিকে নিশ্চয় করতে, ১১জন শিষ্যকে সঙ্গে নিয়ে ভঙ্গের বনাচলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। আর্যরা মার্কণ্ডের সন্ধান করা বন্ধ করলেন না, কিন্তু দিকে দিকে সংবাদ নিতে নিতে যখন জানলেন তাঁদের আতঙ্কে মার্কণ্ড ভঙ্গের বনাঞ্চলে প্রবেশ করেছে, তখন নিশ্চিন্ত হয়ে গেলেন যে, সেই বনে যখন মার্কণ্ড প্রবেশ করেছে, তখন আর সে জীবিত থাকবে না অধিকদিন।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43