কৃতান্তিকা

ব্রহ্মসনাতন পুত্রী দিব্যশ্রী একদিন তাঁর পিতার সম্মুখে এসে বললেন, “মা, আমি আপনাকে একদিন প্রশ্ন করেছিলাম যে শক্তিপীঠ এবং তন্ত্রের সম্পর্ক এত গভীর কেন? আপনি উত্তরে বলেছিলেন, এর এক বিস্তর ইতিহাস আছে, যার সম্বন্ধে বর্তমান সভ্যতা সম্পূর্ণ ভাবে অজ্ঞ। আমি আপনাকে আপনার কথার উত্তরে প্রশ্ন করেছিলাম যে, কেন, অজ্ঞ কেন? ইতিহাস তো যা বলার বলেইছে, কিন্তু তাতেও এই যোগাযোগ ঠিক করে ব্যক্ত নয় কেন। আপনি কেবলই হেসেছিলেন কথার উত্তরে।

মা, আমি তারপর ইতিহাসের বহুগ্রন্থ পাঠ করেছি। আর দেখেছি যে, ইতিহাস অদ্ভুত ভাবে সত্য কথা বলে, আর সেই ব্যাপারে কনো দ্বন্ধ নেই। তবে যেমন প্রতিটি সত্য কথকের মুখ বন্ধ করার প্রয়াস হয়, শাম দাম দণ্ড ভেদের দ্বারা, তেমন ইতিহাসেরও মুখ বন্ধ করার সমস্ত প্রয়াস সর্বদাই চলতে থাকে, যেই প্রয়াস মূলত করে থাকে শাসকরা। এঁরা ইতিহাসের মুখ বন্ধ করতে গেলে যখন দেখে, সালের হেরফের হয়ে যাচ্ছে, তখন নতুন নতুন কাহানীর রচনা করে, ইতিহাসকে বিকৃত করার কনো প্রয়াসে চ্যুত হয়না।

এই প্রক্রিয়া বর্তমানেও যেমন চলছে, তেমন পূর্বেও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে, এমনই অনুমানে আমি উপস্থিত হয়েছি। বর্তমানে যেমন বিশ্বযুদ্ধের কথা ইতিহাস বিবৃত করা হয়, অথচ সমুদ্রগর্ভে স্থিত বিশ্বজ্বালানী তেলের উপর অধিকার স্থাপনের কারণেই সেই যুদ্ধ হয়েছিল, তাকে লুকিয়ে ফেলে শাসকরা; যেমন বর্তমানে মার্ক্সের দর্শনকে প্রকাশ করতে দেয় ইতিহাসকে, লিঙ্কনের দর্শনকে প্রকাশ করতে দেওয়া হয় ইতিহাসকে, কিন্তু রাশিয়া ও আমেরিকা এই আরবের তেল কম অর্থ ব্যয় করে নিজের দেশে নিয়ে যেতে যেই ধনবণ্টনে সমস্যা হওয়ার জন্য এই দর্শন সম্মুখে আসে, তাকে মুছে ফেলা হয়; তেমনই কি হয়েছিল আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগেও? মা, যা ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা হয়েছে, তার খবর যদি কেউ দিতে পারেন, তা একমাত্র আপনি। তাই কৃপা করে বলুন, ইতিহাসের গর্ভে তন্ত্র ও শক্তিপীঠকে কেন্দ্র করে কি রহস্য লুকিয়ে রয়েছে?

মা, সেই ইতিহাসে কারচুপি সম্পূর্ণ ইতিহাসকেই পালটে রেখে দিয়ে, আমাদেরকে শিক্ষিত মূর্খ করে তুলতে ব্যস্ত! মা, শাসকরা যদি এই শক্তিপীঠ এবং তন্ত্রের যোগাযোগ সংক্রান্ত ইতিহাসের সেই পাতাগুলিকে জ্বালিয়ে দিয়ে বিকৃত করে থাকে, তাহলে সেই কথা আপনি ছাড়া আর কেউই বলতে সক্ষম নন। কৃপা করে আমাকে সেই কথা বলুন মা”।

ব্রহ্মসনাতন হাস্যমুখে বললেন, “বেশ পুত্রী, আমি তোমাকে সেই বিশেষ কথা বলছি এবার সম্পূর্ণ বিস্তারে। হ্যাঁ, এই কথাকে ইতিহাসের পাতায় পাবেনা, আর তা না পাবার কারণ তুমি যেমন অনুমান করেছ যে শাসকরা ইতিহাসকে নিয়ে কাটাছেঁড়া করে, সেটিই। এই কথা তোমাকে তন্ত্রের এবং শক্তিপীঠের আদ্যোপান্ত ব্যখ্যা করবে।

আর হ্যাঁ, তুমি যেমন বললে, যখন সময়ের সাথে মেলেনা বিকৃত ইতিহাস তখন বিকৃত কাহানী উপস্থাপন করে সেই ইতিহাসকে আজিবতকাল ঢেকে দেবার প্রয়াস করে, এই ক্ষেত্রেও সেই প্রয়াসের কারণেই আমাদের সম্মুখে সতীর দেহত্যাগের কথা পরিবেশন করা হয়েছে, যা তন্ত্রনির্মাতার তন্ত্রসারের কাহিনী, ইতিহাস নয়। বাস্তবে শক্তিপীঠের ইতিহাস সম্পূর্ণ ভিন্ন, এবং শাসকবিরোধীও। এবার শোনো তাহলে সেই ইতিহাস পূর্ণবিস্তারে”।

 ব্রহ্মসনাতন বলতে থাকলেন, “সাল এই ১১০০ খৃষ্টপূর্ব হবে। মূর্তি পূজাকে সামনে রেখে পারশ্য উপকুলে পশ্চিম গান্ধার অঞ্চলের ধূর্ত শোষণকারী শ্রেণীকে বিতাড়িত করা হয়েছে, প্রায় ৩ হাজার সাল হয়ে গেছে। মিশরে গিয়ে তাঁরা সম্রাট হয়ে শোষণক্রিয়া অব্যহত রেখেছেন যেমন, তেমন রোমান হয়েও সেই একই প্রকার অর্ধমানব ও অর্ধপশুর মূর্তি স্থাপন করে, রাজকীয় ভঙ্গিমায় শোষণ করে গেছে তাঁরা, অতি সহজ ভাবেই।

কিন্তু সেই বিতাড়িত শ্রেণীর এক তৃতীয়াংশ জম্বুদ্বীপ, যা তৎকালীন ভারতবর্ষের নাম ছিল, সেখানে এসে স্বমহিমায় শোষণক্রিয়া চালাতে পারেননি। তিব্বতীয় চীন প্রায় ১০ হাজার বৎসর ব্যাপী ২৬টি বুদ্ধের আবির্ভাব ঘটায়। সেখানেও যেমন উচ্চকটি দর্শনশাস্ত্র অর্থাৎ বৌদ্ধ ধারার বিকাশ ঘটেছে, তেমনই তা জম্বুদ্বীপেরও পূর্বাঞ্চলে অর্থাৎ আজ যাকে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, অসম বলা হয়, সেই চত্বরে বেশ প্রসার লাভ করেছিল।

এই তালিকায় বাংলার নাম না আসাই উচিত ছিল, কারণ বাংলাদেশ তখনও ঘন অরণ্যে আবৃত, প্রকৃতি দ্বারা সুরক্ষিত, এবং হিংস্র পশুদ্বারা পাহারাপ্রদত্ত অঞ্চল। তবুও বাংলার নাম নিতেই হয়, কারণ বাংলার দক্ষিণতম প্রান্তে কপিলমুনি এই বৌদ্ধধারার অধ্যায়ন করে দিগপাল হয়ে উঠে, সাংখ্যদর্শনের উপস্থাপন করেছিলেন। তাই তাঁর এই বিশেষ কৃতিত্বকে কুর্ণিশ করার কালে বাংলার নাম নিতেই হতো।

বিহার, যাকে তদানীন্তনকালে মগধ বলা হতো, সেখানে বৌদ্ধ প্রভাবে জৈন দর্শনের বিস্তার ঘটে ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল করে রেখেছিল মগধকে। আর জম্বুদ্বীপে মগধে যেই বৌদ্ধ দর্শনবাদের বিস্তার ঘটেছিল, তার আভাস মধ্যভারতেও বেশ ভালোই প্রভাব বিস্তার করেছিল। সেই সমস্ত স্থানের মানুষরা বৌদ্ধধারায় স্নান তো করেননি, তবে তৃষ্ণার্ত হলে, তৃষ্ণা মেটাতে মগধাঞ্চলে প্রায়শই আসাযাওয়া করতেন।

আর সেই কারণেই, সেই বিতাড়িত শ্রেণী যতটা সহজে মিশরে বা রোমে নিজেদের আধিপত্য স্থাপন করতে পেরেছিলেন, জম্বুদ্বীপে সেই কাজ ততটা সহজ হয়না। সুদীর্ঘকাল এঁদেরকে মাথা নামিয়ে সাধারণ মানুষ হয়েই বসবাস করতে হয়েছে এখানে। কিন্তু, এঁদের স্বভাবে, এঁদের লহুতে যে আধিপত্য করার ধারা রয়েছে। ছলে বলে অজুহাতে এঁরা যে একদিন না একদিন শাসক ও শোষক হবেনই।

তাই কিছু শতক বা এক সহস্র সাল জম্বুদ্বীপে সাধারণ মানুষ হয়ে থেকে, এঁরা বৌদ্ধধারার অধ্যায়ন করতে শুরু করেন, তবে শিক্ষা লাভ করা, বা মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটানো এঁদের সেই অধ্যায়নের লক্ষ্য ছিল না। এঁদের লক্ষ্য ছিল, মার্গ অনুসন্ধান। বৌদ্ধ ধারা এখানের মানুষের লহুর কণায় কণায় অবস্থান করছে। তাই অন্য কিছু বলে এঁদেরকে তো বশে আনা যাবেনা। যদি বশে আনতেই হয়, তাহলে এই বৌদ্ধ কথাকেই সামান্য বঙ্কিম করে, তাকে নিজেদের কৃত্য করে স্থাপন করতে হবে। তবেই এঁদেরকে বশ করতে পারবে। আর এই মানসিকতা নিয়েই বৌদ্ধ গ্রন্থের অধ্যায়ন শুরু করেন এঁরা।

সফল হতে সময়ে লেগেছিল, প্রায় দুই থেকে তিন শতক সাল সময়ে লেগে গেছিল। অবশেষে এলো সাফল্য। বৌদ্ধধারার থেকে প্রকৃতিতত্ত্বকে অপসারণ করে, অহমিকা তত্ত্বকেই ভগবানের আসনে স্থাপিত করে, অহংকারের ত্রিগুণকে ত্রিদেব রূপে স্থাপিত করে, বেদ প্রতিষ্ঠিত করে বললেন – এই গ্রন্থ আমরা লিখি নাই, এই গ্রন্থে তো যা কিছু ছিল, তা আমরা সকলেই জানিতাম, মুখে মুখে প্রসারিত ছিল আমাদের মধ্যে। এই কথা যে কত প্রাচীন, তার ধারনাও আমাদের নাই। এই বৌদ্ধরা এই গ্রন্থের আধারেই সমস্ত কথা বলে। এই সমস্ত জ্ঞান আমাদের থেকেই বৌদ্ধরা পেয়েছে। তাই আইস, আমাদের কাছে আইসো। আমরা আর্য, আমরাই আদি, আমরা কেবল ভগবানের ব্যখ্যা দিই না বৌদ্ধদের মত, আমরা তো স্বয়ং ভগবান। আইস, আমাদের নিকট আইস।

মগধ প্রভাবিত হলো না, তবে সেই সমস্ত স্থানের মানুষ প্রভাবিত হলো, যারা বৌদ্ধধারার অমৃতরসধারায় স্নান করতেন না। সিন্ধু উপত্যকায় বেদচর্চা শুরু করালেন আর্যরা, ব্রহ্মকে জানেন তাঁরা, এমন দাবি করে, ব্রাহ্মণ বলতে শুরু করলেন নিজেদের, এবং নিজেদের মিথ্যাকে মহাকৌশলে আবৃত করে, উত্তর জম্বুদ্বীপের মানুষদের অর্থাৎ তির্গত বা বর্তমান কাশ্মীর উপত্যাকার মানুষদের বশীভূত করে ফেললেন।

ক্রমে, এই বেদের প্রসার করার উদ্দেশ্যে, বেদের তত্ত্বকে কেন্দ্রে স্থাপন করে, রচনা করতে থাকলেন, ইন্দ্র পুরাণ, বরুণ পুরাণ, সূর্য পুরাণ, চন্দ্র পুরাণ, এবং অনেক কিছু। তবে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করা অত সহজ নয়, বিশেষ করে যেখানে বৌদ্ধধারার ছিটেফোঁটা অন্তত পৌঁছে গেছে, সেখানের মানুষদের। কিছু প্রত্যক্ষ প্রমাণ দিতে হবে, বোঝাতে যে তাঁরা ভগবান। এই আকাশ, জল, বায়ু সকলে তাঁদের অধীনে স্থিত, এটি প্রমাণ করতেই হবে।

তাই, এঁরা হোমানুষ্ঠান করা শুরু করলেন, এবং ঘৃত, ফলমুলাদিকে অগ্নিতে দগ্ধ করে, প্রকৃতিকে পুষ্টি প্রদান করে, বর্ষা, রৌদ্র, ইত্যাদিকে নিয়ন্ত্রণ করার চমৎকার প্রদর্শন করিয়ে বিশ্বাস অর্জন করা শুরু করলেন আর্যরা। যখন উত্তর জম্বুদ্বীপের, সিন্ধুনদ তটের নিবাসী সকলে তাঁদেরকে বিশ্বাস করা শুরু করলেন, তখন তাঁরা এবার বিস্তারের প্রয়াস করলেন।

বিহার মানে তখনকার মগধের নিকটবর্তী স্থানে গমন করে দেখলেন যে খুবএকটা সুবিধা করতে পারছেন না। প্রয়াস ছাড়লেন না, তবে বিচার করলেন যে, অন্যদিকে বিস্তার আবশ্যক। তাই সিন্ধুতট ছেড়ে যমুনাতটে এসে নিজেদের অধিকার স্থাপন করলেন। হোমযজ্ঞ দ্বারা প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে করে, চমৎকার দেখিয়ে মন জয় করা শুরু করলেন। বৌদ্ধগ্রন্থাদি পাঠ করেন নি কেউই মধ্যভারতের মানুষ, তাই বেদ যে বৌদ্ধগ্রন্থেরই বঙ্কিমপ্রকাশ, এই সত্য উদ্ধারের সামর্থ্যও কারুর রইলো না।

তাই যমুনাতট অঞ্চলকেও সহজেই অধিকার করে নিলেন ব্রাহ্মণ আর্যরা। ক্রমশ সেখান থেকেও দক্ষিণে যাত্রা করলেন তাঁরা, এবং বিন্ধাঞ্চল পর্বতমালা অতিক্রম করে দ্রাবিড় অঞ্চলকেও অধিকারে আনলেন। দ্রাবিড়রা বৌদ্ধধারার থেকে সম্পূর্ণ অন্ধকারেই ছিলেন, তাই তাঁদেরকে বশীভূত করতে অধিক সময় লাগলোই না ব্রাহ্মণদের আর্যদের। আর যখন মগধের পশ্চিমকুলের পূর্বস্থল পর্যন্ত সম্পূর্ণ ভাবে অধিগ্রহণ করে নিলেন আর্যরা, তখন জম্বুদ্বীপ, যার নামকরণ কপিলমুনির আশ্রমকে কেন্দ্র করে স্থাপিত ছিল, তা পরিবর্তিত হয়ে হয়ে উঠলো আর্যবত্র।

২৬ তম বুদ্ধ, কনকমুনির জন্ম হয়ে গেছে প্রায় ১৫০০ বছর আগে। এই দীর্ঘ অবধিতে জৈনধারার উত্থান হলেও, বৌদ্ধ ধারার ন্যায় ঋজুতা নেই তাঁদের। তাই মগধ দুর্বল হয়ে উঠেছিল। আর সেই সুযোগ নিয়ে, আর্যদের কাশ্যপ নিজেকে ২৭তম বুদ্ধ আখ্যা প্রদান করে, মগধকেও আর্যবত্রের মধ্যে অধিগ্রহণ করা শুরু করলেন। প্রয়াস করলেন মগধের সীমান্তের অঙ্গ ও ভঙ্গ দেশ, যা বর্তমানে বঙ্গদেশ নামে খ্যাত, তাকেও অধিগ্রহণ করার।

কিন্তু প্রকৃতির দ্বারা সুরক্ষিত ছিল সেই অঞ্চল। ঘন বন, তাতে বিষধর সর্প, অজস্র জোঁক, বিশালাকায় হস্তি ও গণ্ডার, এবং প্রকাণ্ড গতির ও প্রকাণ্ড শক্তিধর ব্যঘ্র এই অঞ্চলকে অভেদ্য করে রেখে দিল আর্যদের নিকটে। তাই বর্তমানের বাংলা আর্যদের থেকে মুক্তই রইল। সব কিছু মিলিয়ে আর্য ও আর্যবত্র নিজেদের মিথ্যাচারকে ঢেকেঢুকে বেশ সুন্দরভাবেই নিজেদেরকে গুছিয়ে নিয়েছিলেন।

আর যাই গছানো হয়ে গেল, তাই তাঁদের শোষণপর্বের শুরু হয়ে গেল। নিজেদেরকে ব্রাহ্মণ বলে, নিজেদের অনুগত শক্তিধরদের ক্ষত্রিয় রূপে স্থাপন করিয়ে, তাঁদেরকে দিয়ে আর্যবত্র শাসন করতে থাকলেন, আর অন্য সকলকে বৈশ্যরূপে স্থাপিত করে, নিজেদেরকে ভগবান বলে তাঁদের কাছে স্থাপিত করলেন। ব্রাহ্মণকে দান দেওয়া মহাপুণ্য, এবং এই পুণ্যের ফলে স্বর্গলাভ হবে, এমন আখ্যা দিয়ে, দানরূপে সকলের থেকে সুস্বাদু আহার তস্করি করা শুরু করলেন।

তস্করি কেবল আহারাদি বস্তু পর্যন্তই সীমিত থাকেনা। তা পরস্ত্রী, পরসম্পদ পর্যন্ত পৌঁছে যেতে এক শত বৎসরও লাগেনা। ক্রমশ আর্যদের ঔদ্ধত্য চরমে উন্নীত হলে, মগধের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ নিজেদের মধ্যে আলাপ করা শুরু করে দেয়- এঁরা ভগবান! ভগবানের এমন লোভ! আমরা বৌদ্ধদের দেখেছি, কই, তাঁরা তো এমন ছিলেন না! … কোথাও কনো গণ্ডগোল হচ্ছে নিশ্চয়ই।

এমন আলোচনা থেকে একজন মহামান্য ব্যক্তি, যিনি একই সঙ্গে পণ্ডিত এবং সাধক, তিনি বৌদ্ধধারার চর্চা পুনরায় শুরু করলেন। এই মহাশয়ের নাম হলো দধীচি। বৌদ্ধ কথার সমাহার নির্মাণের প্রয়াসে, ইনি উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠেন এবং সারকথার বিবরণ শুরু করেন, যাকে তাঁর পুত্র পিপলাদ ১১টি উপনিষদ রূপে ব্যক্ত করলেন। আর্যবত্রতে দাঁড়িয়ে এমন কাজ করাকে আর্যরা দণ্ডনীয় অপরাধ রূপেই দেখলেন।

আর তাই প্রথমত দধীচিকে দণ্ড প্রদান করলেন, মৃত্যুদণ্ড। তবে দধীচির অনুগামী অনেক। তাঁদের মধ্যে বিদ্বেষ প্রসারিত হলে, আর্যরা দধীচিকে নিয়ে কিছু রম্যরচনা করলেন পুরাণের মাধ্যমে, এবং দেখালেন যে আর্য দেবদের মহান কর্মের উদ্দেশ্যে দধীচি স্বেচ্ছায় জীবন উৎসর্গ করেছেন। অনুগামীরা শান্ত হলেও, পিপলাদ শান্ত হলেন না। তিনি নিজের উপনিষদ গঠন সমাপ্তই করলেন।

কিন্তু উপনিষদ যদি আর্যসমাজে প্রতিষ্ঠা পায়, তাহলে বেদের ভিত নড়ে যাবে। তাই পিপলাদকে একপ্রকার প্রত্যাহার করলেন আর্যরা। জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে উঠলো পিপলাদের, কিন্তু সত্য উদ্ঘাটন তাও ত্যাগ করলেন না তিনি। এই মহাসংগ্রামময় জীবনের সাক্ষী যেমন সকলের সংগ্রামের সাক্ষী হয়ে থাকেন, তেমনই ভাবে থাকলেন প্রকৃতি। কিন্তু এই সংগ্রাম এক অন্য সংগ্রাম। এই সংগ্রাম কেবল বেঁচে থাকার সংগ্রাম নয়। এই সংগ্রাম সত্য উদ্ঘাটনের সংগ্রাম, সত্যলাভের সংগ্রাম, সত্যস্থাপনের সংগ্রাম। তাই প্রকৃতিকে কেবল সাক্ষী হয়ে থাকা থেকে অপসারিত হতেই হলো।

পিপলাদের সম্মুখে তিনি আত্মপ্রকাশ করলেন দিব্যনিরাকার স্বরূপ ধারণ করে, এবং বললেন, “পুত্র পিপলাদ। কেন এই সংগ্রামে নিজেকে রত করে রেখেছ? এমন সংগ্রামে রত থাকলে, সত্য তুমি জেনে ফেললেও, তাকে স্থাপন কি রূপে করবে তুমি? কেউ যে এক সংগ্রামী, আর্যবিরোধীর কনো কথাই শুনবে না!”

পিপলাদ প্রকৃতিকে মাতা নামে আখ্যায়িত করে বললেন, “মাতা, তুমি তো মা! সকলের মা। তাই তমার কাছে আর্যও যা, আমিও তাই। তোমার কাছে কনো ভেদাভেদ নেই। কিন্তু মা, তুমি তো মা হবার সাথে সাথে পরমেশ্বর, পরব্রহ্ম। তুমি তো সমস্ত কিছুর প্রত্যক্ষদর্শী, তাই না! তাহলে তুমি এই যে আর্যদের অনবরত সত্যের দমন করার ভাব এবং সমস্ত সময়ে অহংকারের আরাধনা করার প্রয়াস এবং সমাজে অহংকারের বিস্তার করার প্রয়াস, এও নিশ্চয়ই তুমি দেখেছ। তাহলেও কি তুমি মনে করো না যে এই অসত্যের প্রতিকার করা আবশ্যক!”

নিরাকার মাতা হেসে বললেন, “সন্তানের সুখেই মাতার আনন্দ পুত্র। এতাবৎ সন্তান অসত্যকে স্থাপন করেই আনন্দ লাভ করছিল, তাই এই মাতাও তাতে আনন্দে ছিল। আজ এই সন্তান অসত্যকে স্বীকার করতে বাধ্য হয়ে ব্যথিত, সত্যের অনুসন্ধানে কাতর, তাই তো ছুটে এলাম আমার সেই সন্তানের কাছে। আজ্ঞা করো আমায়। কি করতে পারি আমি, যাতে আমার এই সন্তানও আনন্দ লাভ করে?”

পিপলাদ লজ্জিত হয়ে বললেন, “কি বলছো মা! আজ্ঞা দেবে এই সন্তান তাঁর মাকে? … না না মা, আজ্ঞা নয়, অনুরোধ জানাই, যাতে সত্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, আর সত্যের পথে যাত্রাকে নিশ্চয় করা যায়। … সম্ভব কি মা, তা করা?”

ব্রহ্মময়ী জননী হেসে বললেন, “সন্তানের আনন্দের জন্য মাতা যে সমস্ত অসম্ভবকেও সম্ভব করতে প্রস্তুত পুত্র। … পুত্র, আর্য ব্রাহ্মণরা অহংকারকে অহংকার বলেন না। তাঁরা অহং দ্বারা স্বয়ংকে প্রকাশিত না করে, আত্ম শব্দ দ্বারা স্বয়ংকে প্রকাশিত করে, আর তাই তাঁদের অনুগামীরা বিভ্রান্ত এই ভেবে যে অহং ও আত্ম পৃথক। এই আত্মই ত্রিগুণবিশিষ্ট, এবং এই ত্রিগুণকেই আর্য ব্রাহ্মণরা ত্রিদেব রূপে স্থিত করে রেখেছে।

কিন্তু পুত্র, বিভ্রান্তি এখানেই সীমিত নয়, আর শুধু আর্য ব্রাহ্মণরাই বিভ্রান্ত নয়। বিভ্রান্ত তুমিও। পুত্র, যাহা আত্ম, তাহাই আমি। আমার সাথে আত্মের কনো ভেদ নেই। ভেদ কেবল এই যে, আত্ম এই ব্যাপারে ভ্রমিত যে আমিই তাঁদের স্বরূপ, আর সেই ভ্রমের কারণেই সে নিজেকে ত্রিগুণে বিভাজিত করে রেখেছে। পুত্র পিপলাদ, যদি আমার কথা বলতে যাও, তাহলে আর্য ব্রাহ্মণরা তোমাকে কিছুতেই তা বলতে দেবেনা। আর শুধু তাই নয়, তোমাকেও তাঁরা জীবিত থাকতে দেবেনা, যেমন তোমার পিতাকেও তাঁরা জীবিত থাকতে দেয়নি।

তাই পুত্র, উপনিষদ রচনা করো, কিন্তু সেখানে আমার উল্লেখ না করে, আত্মের উল্লেখ করো। আত্ম সকল স্বরূপে আমিই। আমিই তাঁদের উৎস আর আমিই তাঁদের গন্তব্য। আর এই সত্য ভুলে থাকার কারণেই, তাঁরা নিজেদের আত্ম মনে করে, আর আমাকে প্রকৃতি। যখন এই সত্য তাঁদের বোধগম্য হয়ে যায়, তখন সেও আর আত্ম থাকেনা, ব্রহ্ম হয়ে যায়, আর আমিও পরাপ্রকৃতি থাকিনা, পরব্রহ্ম হয়ে যাই। তাই উপনিষদের রচনা করো, কিন্তু আমার নাম উল্লেখ না করে, আত্মের উল্লেখ করো।

পুত্র, আর্য ব্রাহ্মণরা আজ পর্যন্ত কোনদিন সাধনা বা তপস্যা করেও নি, আর কনো কালে করবেও না। হ্যাঁ, ভেক ধরবে তপস্বীর, এবং নিজেদেরকে ঋষি উপাধি প্রদান করে, নিজেদের মহাসাধক রূপে স্থাপন করে রাখবে, যাতে অসত্যের প্রচার আরো শক্তিশালী হয়। তাই এমন ভাবার কনো কারণ নেই যে, তোমার লিখনের ভেদ আর্য ব্রাহ্মণরা করে ফেলবে। তাঁরা কনোদিনও জানতে পারবেনা যে, আত্মই প্রকৃতি, আর প্রকৃতিই আত্ম, আর তাই তোমার উপনিষদ যে পরাপ্রকৃতিরই ব্যখ্যা প্রদান করছে, তা তাঁরা কনোদিন উদ্ধার করতেই পারবেনা।

কিন্তু তোমার উপনিষদের প্রকাশ্যে আসা অত্যন্ত আবশ্যক, কারণ তোমার উপনিষদকে উদ্দেশ্য করেই, আমার সত্য স্থাপনের উদ্দেশ্যে নেওয়া অবতার তোমার কাছে উপস্থিত হবে, এবং তোমার থেকে পূর্ণ শিক্ষা ও দীক্ষা গ্রহণ করবে। কিন্তু আমার নাম করে উপনিষদ লিখলে, তাকে আর্যরা কিছুতেই প্রকাশ্যে আসতে দেবেনা। তাই, আত্মের নামে উপনিষদ রচনা করো পুত্র। তোমার আনন্দের উদ্দেশ্যে, আমি অবতার গ্রহণ করবো।

কিন্তু অবতার দেহ ধারণ করার পর, স্বরূপ বিরূপ, কনো কিছুরই স্মরণ থাকেনা। তাই তোমার উপনিষদকে ধরে ধরেই, আমি তোমার কাছে উপস্থিত হবো, আর সত্য শিক্ষার বিস্তার ঘটাবো। তাই উপনিষদ রচনায় তৎপর হও পুত্র”।

পিপলাদ বিভোর হয়ে বললেন, “একটি ছেলের আনন্দের জন্য তুমি অবতার গ্রহণ করে নেবে মা! একি তোমার অন্য সন্তানের সাথে অবিচার করা হয়ে যাবেনা!”

মাতা হেসে উত্তর দিলেন, “পুত্র, সন্তানের আনন্দই মায়ের কাছে একমাত্র কাম্য। অসত্য বিস্তারের কারণে আমার অবতার গ্রহণ করার তো কনো আবশ্যকতাই নেই পুত্র। সমস্ত জীব এমনিই অসত্যেই বিরাজ করে। কিন্তু আমার এই পুত্র যে অসত্যে ব্যথিত, অসন্তোষে গ্রসিত। আমার কনো সন্তানকে আমি নিরানন্দে কি করে দেখতে পারি পুত্র! আমি কি আর আত্মের ন্যায় ভ্রমিত যে, নিজেকে ঈশ্বর বলেই আনন্দ পাবো! … না পুত্র, আমার কাছে ঈশ্বর পরিচয়ের থেকেও অধিক তৃপ্তি মা হবার পরিচয়। … আর মা সন্তানের আনন্দের জন্যই অবস্থান করে, তাঁর নিজের কিছু চাওয়াপাওয়া থাকেনা”।

পিপলাদ গদগদ হয়ে বললেন, “তাহলে মা, আজ থেকে এই ‘মা’ অক্ষরই আমার কাছে গুরুমন্ত্র। ঈশ্বরকে আপন করে পাবার একটিই উপায়, আর তা হলো তাঁকে জননী রূপে দেখো। ঈশ্বর বললে, সে তোমার থেকে দুরেই থেকে যাবে, আর দূরে থেকে থেকেই তোমার আনন্দের ব্যবস্থা করবে। কিন্তু একমাত্র জননী বলে, দুহাত তুলে আবাহন করলে, তিনি আর থাকতে পারেন না, সন্তানের আনন্দের ব্যবস্থা করার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন, এই হবে আমার গুরুবাণী”।

মাতা অন্তর্হিত হলেন, পিপলাদ আত্ম নামদ্বারাই উপনিষদের রচনা করলেন। আর্যরা আত্মের জয়গান গাওয়া হয়েছে, তাই পিপলাদকেও প্রত্যাবর্তন করালেন। উপনিষদ প্রসারিত হতে শুরু করলো। আর তা কর্ণকুহরে পৌঁছল, মৃকেন্দুর বিস্ময়কর মেধাবী পুত্র মার্কণ্ডের কাছে”।

দিব্যশ্রী প্রশ্ন করলেন, “এই কারণেই কি সব সময়ে, আর্যরা মগধ ও মগধনরেশকে শত্রুর আসনে থাকতে দেখিয়েছেন? এটিই কি তাহলে কারণ?”

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43